Home "ধারাবাহিক গল্প "অবহেলার মুক্তা অবহেলার মুক্তা পর্ব-১৯

অবহেলার মুক্তা পর্ব-১৯

0
15

#অবহেলার_মুক্তা
#আরিবা_নাওশীন
#পর্ব_১৯

খাসির মাংসের রেজালার সুবাস আর নতুন অতিথি রাফিকে ঘিরে সারা শেখ বাড়িতে তখন আনন্দের সুবাতাস। হাসিখুশি, চটপটে স্বভাবের সুরাইয়া মুহূর্তের মধ্যেই ঘর মাতিয়ে তুলেছে। মরিয়মের প্রতি তার অতিমাত্রায় ভালোবাসা, মিষ্টি কথা আর ভাইপোকে নিয়ে বাড়তি মাতামাতি পুরো ঘরের আবহ অনেকটাই হালকা করে দিয়েছে।

কিন্তু ঘরের এই উৎসবেও মরিয়মের মনের গহীনে একটা সূক্ষ্ম অস্বস্তি তিলে তিলে ডালপালা মেলছিল।

মরিয়ম খাটে হেলান দিয়ে শুয়ে ছিল। রাফি তখন শান্ত হয়ে তার পাশে ঘুমাচ্ছে। রান্নাঘরের দিকে সুরাইয়ার চটপটে কন্ঠের হাসির শব্দ শোনা যাচ্ছে।

মরিয়ম মনে মনে হিসাব কষতে লাগল এই শেখ ভিটেয় সে আজ কত দিন ধরে আছে! জাহিদের স্ত্রী হয়ে প্রথম যখন সে এ ঘরে পা দিয়েছিল, তখন থেকে শুরু করে আজ সন্তান প্রসবের পর পর্যন্ত সে রফিক, শাশুড়ি রাবেয়া বেগম, জাহিদ, এমনকি শিউলি ও করিমনের মুখ থেকেও সুরাইয়া নামটা একটাবারের জন্যও শোনেনি।

রাবেয়া বেগম তো নিজের আগের দিনগুলোর দুঃখের কথা বলতে গিয়ে জাহিদ ও রফিকের ছোটবেলার একশোটা গল্প শুনিয়েছেন, কিন্তু ঘরের যে একটা মেয়ে আছে, যে মেয়ে নাকি পাশে গ্রামেই বিবাহিতা তার কথা কোনোদিন ঘুণাক্ষরেও প্রকাশ করেননি কেন? কোনো মা কি নিজের বিবাহিতা মেয়ের নাম এতদিন ধরে পুরো চেপে রাখতে পারে?

আর সবচেয়ে বড় কথা আজ সকালে সুরাইয়া যখন প্রথম ঘরে ঢুকল, তখন রাবেয়া বেগম বা রফিকের চোখের কোণে আনন্দের চেয়েও এক অদ্ভুত, গোপন আতঙ্কের ছায়া খেলে গিয়েছিল।

ঝুম বৃষ্টি থামলেও দুপুরের দিকে আকাশ আবার থমথমে মেঘলা রূপ ধারণ করল। রফিক শেখ নিজের পায়ের ক্ষততে ওষধি পাতার ব্যান্ডেজ বেঁধে ধীরপায়ে ঘরে এল। ওর চোখে আজ কিসের যেন এক গভীর ক্লান্তি ও মানসিক চাপ।

ঘরের দরজাটা ভিড়িয়ে দিয়ে রফিক খাটের পাশে এসে বসে।

মরিয়ম আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। তার মনের ভেতরের সন্দেহ ও কুহেলিকা তখন এক দমবন্ধ করা সাসপেন্সে রূপ নিয়েছে। সে খুব নিচু কিন্তু পিনপতন নীরবতা চিরে দেওয়ার মতো স্পষ্ট গলায় প্রশ্ন করল, “রফিক?”

রফিক হাত বাড়িয়ে রাফির কাঁথার কোণটা টেনে দিতে দিতে উঁকি মারল, “বলো বউজান, কিছু লাগবে তোমার?”

মরিয়ম রফিকের চোখে সোজা চোখ রাখল।

“সুরাইয়া কে, রফিক?”

রফিক শেখের হাতটা হঠাৎ স্তব্ধ হয়ে গেল! ওর চোয়াল মুহূর্তেই শক্ত হয়ে উঠল, কপালে ভেসে উঠল সূক্ষ্ম এক চিন্তার ভাঁজ। ঘরের জানলার আলোয় রফিকের ফর্সা মুখটা যেন এক মুহূর্তের জন্য শ্যাওলা রঙের মতো ফ্যাকাশে হয়ে গেল!

রফিক নিজেকে সামলে নিয়ে একচিলতে শুষ্ক হাসি হাসার চেষ্টা করল, “সুরাইয়া? সুরাইয়া তো আমার ছোট বোন বউ। আজ সকালেই তো ওর সাথে পরিচয় হলো তোমার।”

“আমি সুরাইয়াকে চিনি না কেন রফিক?” মরিয়মের গলায় এবার এক বরফশীতল প্রশ্ন, “আমি এই ভিটায় আসার পর থেকে আজ পর্যন্ত শাশুড়ি মা বা আপনার মুখে কোনোদিন সুরাইয়ার নাম শুনি নাই কেন? জাহিদও কোনোদিন তার নিজের বোনকে নিয়ে একটা কথা বলল না কেন? একটা বিবাহিতা মেয়ে পাশের গ্রামে থাকে, অথচ আজ হঠাৎ করে ঝড়ের রাতে বাচ্চার জন্মের পর সে উড়ে এসে জুড়ে বসল?”

রফিক শেখ বেশ কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল। ঘরের আবহাওয়ায় এক থমথমে নিস্তব্ধতা ছেয়ে গেল। বাইরে বাতাসের খসখস শব্দ ছাড়া আর কিছুই শোনা যাচ্ছে না।

রফিক নিচু গলায় দীর্ঘশ্বাস ফেলে ওর দৃষ্টিভঙ্গি ঘুরিয়ে নিল, “মরিয়ম, কিছু কথা না জানাই ভালো। সুরাইয়া আমাদের অমতে এই গাঁয়ের বাইরে এক চালচুলোহীন ছেলের সাথে পালিয়ে বিয়ে করেছিল। এক রাতের মধ্যেই আমাদের সম্মান মাটিতে মিশে গেছিল। ওর সেই অসামাজিক কাজের জন্য মা আর আমি ওকে ত্যাজ্য করেছিলাম। ওর সাথে সব সম্পর্ক চুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এইজন্যই আমরা ওর নাম মুখে আনতাম না। তখন জাহিদ বিয়ে করে নি আমি করছিলাম তাও মাস ছয় হবে হয়তো। তাই তুমি জানো না। কিন্তু শিউলি জানে সব।”

কথাটা রফিকের মুখ দিয়ে বের হতে না হতেই মরিয়মের বুকের ভেতরে ধাক্কাটা আরও জোরে লাগল।
রফিক শেখের দেওয়া এই যুক্তি মরিয়মের যুক্তিবাদী মন কোনোভাবেই মেনে নিতে পারল না!

মরিয়ম ওর নরম হাতটা রফিকের র*ক্তমাখা পায়ের কাছাকাছি রেখে ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল, “না রফিক,,,, আপনি আমার কাছে কিছু লুকাচ্ছেন।”

রফিক চোখ তুলে তাকাল, ওর চোখের মণি দুটো কাঁপছিল। “আপনি যদি বলতে চান যে সুরাইয়া পালিয়ে বিয়ে করেছিল বলে ওকে আপনি আর শাশুড়ি মা ত্যাজ্য করেছেন তবে আমি বিশ্বাস করব না!” মরিয়মের স্বর প্রতি সেকেন্ডে ভারী হয়ে উঠল। “রাবেয়া বেগম এমন এক মা, যিনি জাহিদের শত অন্যায়, শিউলির হাজার চক্রান্ত দেখার পরও তাদের বুক দিয়ে আগলে রেখেছেন। যে মা ঘরের ভেতরে শিউলির বিষ সহ্য করতে পারেন, সেই মা নিজের গর্ভের একমাত্র মেয়েকে সামান্য পালিয়ে বিয়ের অপরাধে বছরের পর বছর ভিটেয় নিষিদ্ধ করে রাখবেন? আর আজ সকালে যখন সুরাইয়া দরজায় দাঁড়াল, তখন শাশুড়ি মার চোখে আমি কোনো রাগ দেখি নাই রফিক,,, আমি দেখছিলাম এক অসীম ভয়! এক আতঙ্কের ছায়া!”

রফিক শেখের বুকটা দ্রুত গতিতে উঠানামা করতে লাগল। সে মুখ ফুটে কিছু বলতে পারল না।

মরিয়ম থামল না, সে আরও কাছে এগিয়ে এল, “আর আপনি রফিক,,,, আপনি নিজে কত ন্যায়ের প্রতীক! আপনি যদি সত্যিই কোনো বোনকে ত্যাজ্য করতেন, তবে আজ সকালে ওকে নিজের ভিটেয় ঢুকতে দিতেন না। কিন্তু আপনি ওকে ঢুকতে দিয়েছেন ওর সব চাপাবাজি আর মিষ্টি কথা সহ্য করছেন, অথচ আপনার চোখের মনি দুটোতে সুরাইয়াকে দেখে যে ভয় ছিল তা আমি স্পষ্ট টের পেয়েছি! সুরাইয়া কি সত্যিই আপনার বোন রফিক? নাকি ওর আসার পেছনে অন্য কোনো জঘন্য সত্য লুকিয়ে আছে?”

মরিয়মের একের পর এক ধারালো প্রশ্নের সামনে রফিক শেখ যেন আজ একদম অসহায় হয়ে উঠল।

ঠিক সেই মুহূর্তে ঘরের পেছনের কাঁচের জানালার বাইরে এক অদ্ভুত খসখস শব্দ হলো!

মরিয়ম আর রফিক দুজনেই চমকে জানালার দিকে তাকাল।

হঠাৎ কেউ একজন অন্ধকারের বাঁশঝাড়ের আড়ালে মিলিয়ে গেল!

মরিয়মের বুকের ভেতরটা এক অজানা আতঙ্কে ধক করে উঠল! র*ক্ত জমে যাওয়ার মতো ঠান্ডা এক অনুভূতি তার পুরো শরীরে ছড়িয়ে পড়ল।

ওর চোখের সামনে আজ স্পষ্ট হয়ে গেল সুরাইয়া কেবল পালিয়ে যাওয়া কোনো ত্যাজ্য করা বোন নয়! সুরাইয়ার এই আচমকা আগমন, ওর অতিমাত্রায় ভালোমানুষির মুখোশ, আর রাতে সেই অঙ্গ পাচারকারী ডাকাত দলের আক্রমণের সাথে কোনো না কোনো গভীর যোগসূত্র রয়েছে!

মরিয়ম আতঙ্কে কাঁপতে কাঁপতে রফিকের হাতটা শক্ত করে চেপে ধরল, “রফিক! কে এই সুরাইয়া? সত্যিটা বলুন! আমার রাফির সুরক্ষার জন্য বলুন,,, ও আমাদের ঘরে কেন এসেছে?”

রফিক শেখ ঘরের দরজার দিকে একবার তাকাল, তারপর জানালার দিকে।

রফিক মরিয়মের কানের কাছে মাথা এনে অতি নিচু, হিমশীতল কণ্ঠে বলল, “মরিয়ম,,, সুরাইয়া আমার বোন ঠিকই, এটাই সত্য। মেনে নেও। আর বেশি ভেবে না এটাই আমাদের রাফির জন্য ভালো।”

বাইরে তখন বিজলির বিকট শব্দে পুরো পীরপুর গ্রাম থরথর করে কেঁপে উঠল।

চলবে,,,,,