মনের আড়ালে পর্ব-০৬

0
1458

#মনের_আড়ালে
Part_6
লেখনীতে – #Nusrat_Hossain

অভিক ড্রাইভ করছে আর আড়চোখে তার পাশে বসা অপরিচিত মেয়েটির দিকে বারবার তাকাচ্ছে ।মেয়েটি একদম ঘুটিশুটি মেরে নিঁচু হয়ে বসে আছে ।গোলগাল চেহারাটা মলিন হয়ে আছে ।চেহারায় একরাশ চিন্তা প্রকাশ পাচ্ছে ।অভিক ভাবল কিসের এত চিন্তা মেয়েটির ? নাকি ভয় পাচ্ছে তাকে ।অভিকের খুব ইচ্ছা করল মেয়েটির সাথে কথা বলতে ।কিন্তু কি জিজ্ঞেস করবে সে একটা অপরিচিত মেয়েকে ? নাম জিজ্ঞেস করবে !হ্যাঁ আগে মেয়েটির নামই তবে জিজ্ঞেস করা হোক ।
অভিক চোখ সামনে স্থির রেখে বলে উঠল আপনার নাম ?
মেয়েটি নিরুত্তর রইল । কোনো জবাব দিল না ।জবাব না পেয়ে অভিক ভ্রু কুঁচকে মেয়েটির দিকে তাকাল ।মেয়েটি আগের ন্যায়ই নিঁচু হয়ে বসে আছে ।
অভিকের কেন যেন খুব রাগ হল ।তার মেয়েটিকে ধমকে বলতে ইচ্ছে হল এই মেয়ে আমায় ভাব দেখাও যত্তসব ।ভাব অন্য জায়গায় গিয়ে দেখাও ।মেয়েটির কারনে গাড়ি চালাতেও মন দিতে পারল না ।সে কিছুক্ষণ উশখুশ করে মনের কথাটা বলেই ফেলল

এই মেয়ে আমায় ভাব দেখাচ্ছেন যত্তসব ।অভিক আরো কিছু বলতে যাবে অমনি মেয়েটি তার দিকে ভয়ার্ত দৃষ্টিতে তাকাল ।তারপর মিনমিনে গলায় বলল দুঃখিত আমি শুনতে পাইনি ।

অভিক বিরবির করে বলল এভাবে রোবট হয়ে বসে থাকলে শুনতে পাবেন কি করে ।

জি আপনি কি আমায় কিছু বলছেন ?

অভিক থতমত খেয়ে গেল ।শুনতে পেয়ে গেল নাকি মেয়েটা ? সে নিচের ঠোট কামড়ে বলল কিছু না ।

আপনার নাম ?

মেয়েটি মিনমিনে গলায় বলল ইশমি নুসাইবা ।

অভিক ইশমি নামটা মনে মনে বারংবার আউরাল ।অভিক আর কথা বাড়াল না মন দিয়ে গাড়ি চালাতে লাগল ।কিন্তু বিপদ টা তখনি ঘটল হঠাৎ করে গাড়িটা নষ্ট হয়ে যায় ।অভিক বিরবির করে বলল শিট টায়ার পাংচার হয়ে গেছে ।

ইশমি বলে উঠল এখন কি হবে ?

অভিক বলল আমি দেখছি কি করা যায় ।অভিক গাড়ির দরজা খুলে বের হতে নিলেই ইশমি বলে উঠল বাহিরে তো প্রচুর বৃষ্টি হচ্ছে আপনি এই অবস্থায় বের হলে তো ভিজে যাবেন তারপর ঠান্ডা জ্বর এসে যাবে আপনার ।এমনিতেই তো আমার জন্য তখন বৃষ্টিতে ভিজে কষ্ট করলেন ।ব্যস ইশমির এই ছোট খাটো কেয়ারটাই অভিকের মনে প্রেম নামের ঝড়টা বয়ে গেল ।এক পশলা বৃষ্টি এসে তার মনকে ভিজিয়ে দিয়ে গেল ।অভিক ইশমির দিকে প্রেমময় দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে গাড়ির দরজা খুলতে খুলতে মুচকি হেঁসে অস্ফুটভাবে বলল কিছু হবে না আমার ।অভ্যাস আছে ।

অভিক গাড়ি থেকে বের হয়ে দেখল সত্যি সত্যি টায়ার পাংচার হয়ে গেছে ।সে আবার গাড়িতে ঢুকে ইশমিকে বলল গাড়ির টায়ার টা পাংচার হয়ে গেছে ।আপনি কি কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে পারবেন ।বৃষ্টি কমে গেলেই একটা ব্যবস্থা করব ।যদি আপনার বাসায় যাওয়ার তাড়া না থাকে তো ।

ইশমি তড়িৎগতিতে বলে উঠল না না ঠিক আছে আমার কোনো তাড়া নেই ।পরক্ষনেই ইশমি মুখ টা ঘুরিয়ে বলল কিন্তু বেশি দেরি হলে বাড়িতে সমস্যা হবে ।
অভিক মনে মনে খুব খুশি-ই হল ইশমির কথাটা শুনে ।সে নিচের ঠোট কামড়ে বলল তাহলে আমরা সামনের কোনো একটা জায়গায় অপেক্ষা করতে পারি গাড়িতে বসে না থেকে । আমার গাড়িতে বসে থাকতে বিরক্ত লাগছে ।

ইশমি অভিকের দিকে মুখ ফিরে বলল ঠিক আছে ।

অভিক মুচকি হাসল । সে মিথ্যা কথা বলেছে ইশমিকে তার একটুও গাড়িতে বসে থাকতে বিরক্ত লাগছিল না ।মূলত সে ইশমির সাথে বৃষ্টি বিলাস করতে চায় এই সময়টা উপভোগ করতে চায় তাই এই মিথ্যাটা তাকে বলতে হয়েছে ।
তারা দুজন গাড়ি থেকে বের হয়ে দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে একটা অর্ধ তৈরি বাড়ির ভেতরে ঢুকল ।একতলা ছোট বাড়িটা আনকমপ্লিট তারা গেটের ভেতরে ঢুকে বাহিরের বৃষ্টি দেখতে থাকল ।দুজনে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে ।অভিক মনে মনে বলল কি হত যদি আজকে এই অপরিচিত মেয়েটার সাথে তার আগেই দেখা হত , তারপর প্রনয় হত আর আজকে এই রোমান্টিক মোমেন্ট টা উপভোগ করতে পারত ।দুজন দুজনের শরীরের সাথে ঘেষে বৃষ্টিতে বিজতে পারত ।উফফফ তাকে এই দিনটার জন্য আরো কত দিন অপেক্ষা করতে হবে ।অভিক একবার ইশমির দিকে তাকাল মেয়েটার মুখ দেখে মনে হচ্ছে মনে মনে বৃষ্টি কমার জন্য দোয়া করছে ।
সে আবারো বাহিরে দৃষ্টি দিল ।বৃষ্টি কমার নাম নেই উল্টো আরো জোড়ে জোড়ে বাজ পরছে ।

ইশমি হঠাৎ তাকে গুঙিয়ে বলে উঠল শ্ শুনুন আ্ আমার কেমন য্ যেন লাগছে ।

অভিক খেয়াল করল ইশমির চোখগুলো কেমন লাল আর চেহারা আরো মলিন হয়ে গেছে ।সে তড়িৎ গতিতে বলে উঠল আপনি কি খুব বেশি অসুস্থ বোধ করছেন ?

ইশমি মাথা ঝুলিয়ে তাকে হ্যা বোঝাল আর আগের ন্যায় গুঙিয়ে বলল আ্ আমার মাথাটা ভার ভার লাগছে খুব ।বৃষ্টিতে ভিজলে এমন হয় ।ইশমি ঠিকভাবে দাঁড়াতেও পারছে না ।ও পরে যেতে নিলেই অভিক ওর কমোর ধরে ফেলে ।ইশমির চোখ মুদে আসছে ।অভিক এই অবস্থায় কি করবে বুজতে পারছিল না ।অভিক ইশমিকে নিজের বুকের সাথে ঝাপটে ধরে রাখল ।তখন ইশমি শরীর খারাপ লাগার কারনে অভিকের এই জড়িয়ে ধরাটা বেশি আমলে নিল না ।সেও উষ্ণতা পেয়ে অভিকের বুকে মুখ গুজে রইল ।অভিক কিছু একটা চিন্তা করে নিজের ব্লেজার টা খুলে ইশমির মাথায় ভালোভাবে পেঁচিয়ে দিল ।তারপর ইশমিকে কোলে তুলে নিয়ে কিছুটা জোড়ে হেঁটে গাড়িতে বসিয়ে দিল ।গাড়িতে বসিয়ে দিতেই ইশমি সিটে হেলান দিয়েই ঘুমে তলিয়ে পরল ।অভিক একমনে ঘুমন্ত ইশমির দিকে তাকিয়ে রইল ।ইশমিকে ঘুমন্ত অবস্থায় দেখে তার মনে এক সুপ্ত ইচ্ছা জেগে উঠল ।পরক্ষনেই নিজেকে নিজে বলে উঠল না এটা করা ঠিক হবে না ।সে কিছুক্ষণ চোখ মুখ খিঁচে রইল ।অভিক নিজের ইচ্ছাটা দমিয়ে রাখতে না পেরে ইশমির খুব কাছে গিয়ে ঠোটের কোনে শব্দহীন চুমু খেয়ে তড়িৎগতিতে আবার নিজের জায়গায় ফিরে এল ।ঠোট চেঁপে বসে রইল কিছুক্ষণ ।

প্রায় বিশ মিনিট পর বৃষ্টি কমলে সে গাড়ি থেকে বেরিয়ে একটা রিকশার খোঁজ করল ।আর রিকশা পেয়েও গেল ।সে আর দেরি না করে ঘুমন্ত ইশমিকে কোলে নিয়েই রিকশায় উঠে পরল ।তারপর ইশমির দেওয়া ঠিকানাটায় চলে এল ।এখন বাড়ির সামনে এসে বিপত্তি ঘটল ।ইশমি ঘুমিয়ে আছে তাকে ডাকবে কি ডাকবে না অভিক চিন্তায় পরে গেল ।তার ইচ্ছা করল না ইশমিকে ডেকে জাগিয়ে তুলতে ।সে ইশমিকে কোলে নিয়েই বাড়ির দিকে চলে গেল ।ইশমিদের একতলা বাড়ি ।অভিক বাড়ির দরজার সামনে এসে কlলিংবেল চাঁপল ।দরজা খুলল মধ্যবয়স্ক মহিলা ।বড় বড় চোখ দিয়ে তাকিয়ে আছে তার কোলে থাকা ইশমির দিকে আর তার দিকে ।অভিক ভাবল হয়ত ইশমির মা হবে ।এখানে আর দেরি করা যাবে না ভদ্রমহিলা হয়ত খারাপ ভাবছে ।সে বলল রাস্তায় অজ্ঞান হয়ে আমার গাড়ির সামনে পরে গিয়েছিল ।তাই আমি আমার গাড়ি করে বাসায় পৌঁছে দিলাম ।
ভদ্র মহিলা প্রচুর চালাক তাকে জিজ্ঞেস করে বসল রাস্তায় অজ্ঞান হয়ে তোমার গাড়ির সামনে পরলে আমার বাসা চিনলে কিভাবে ?
অভিক নিজেকে মনে মনে একটা বকা দিল ।তারপর সে মুচকি হেসে বলল তখনো পুরোপুরি জ্ঞান হারায়নি তাই কোনোভাবে ওর মুখ থেকে ঠিকানাটা জেনে নিই ।ভদ্র মহিলা এবার নিভল ।তাকে একটা রুম দেখিয়ে দিল ইশমিকে শুয়িয়ে দেয়ার জন্য ।ইশমিকে বিছানায় শুয়িয়ে দিয়ে ইশমির বাবা ও বাকি সদস্যদের সাথে কিছুক্ষণ আলাপ করে চলে যায় সেদিন ।আর সেদিন থেকেই শুরু হয় তার প্রেম নামের ভয়ানক রোগ ।খাওয়া নাওয়া , ঘুম সব উড়ে যায় ইশমির বিরহে ।সে খোঁজ খবর নেয় ইশমির সম্পর্কে তারপর ইশমির-ই ভার্সিটিতে চাকরি নেয় ।যেহেতু ভার্সিটি টা তার বাবারও তাই এতে বেগ পেতে হয়নি ।তারপর একদিন হুট করেই বাবা আর মাকে নিয়ে চলে যায় ইশমির বাড়িতে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে ।কিন্তু সে ভাবেনি তাকে এভাবে অপমান হতে হবে ।ভদ্রমহিলা মানে ইশমির মা সরাসরি তাকে না করে দেয় ইশমি বিয়ে করবে না সে রাজি না বিয়ের জন্য।মা বাবার সামনে তার মাথা নিচু হয়ে যায় ।খালি হাতে বিরস মুখে মা বাবাকে নিয়ে ফিরে আসে ।কদিন পর্যন্ত সে নিজের মা বাবার মুখোমুখি হতে পারেনি খুব বড় মুখ করে তাদেরকে ইশমির গুনগান করেছিল ।অতি কষ্ট পেয়ে সে কতদিন নিজের রুম থেকেও বের হয়নি ।রাত দিন নিজের রুমেই ড্রিংক করে পরে থাকত ।তারপর সে নিজেকে নিজে কথা দিল বেঁচে থাকতে ইশমিকে শান্তিতে বাঁচতে দিবে না ।কখনোই না ।ইশমি হলে শুধু তার হবে একমাত্র , না হলে কারোরই হতে দিবে না সে ইশমিকে ।

চলবে,
@Nusrat Hossain