গোধূলীতে তুমি প্রিয় পর্ব-২৯

0
630

#গোধূলীতে_তুমি_প্রিয়
#পর্ব_২৯
#লেখিকা_রুবাইতা_রিয়া

—-ইথান আমার ইহান আইসিউতে আছে কেনো?তাহলে কি আমার ছেলে বেঁচে আছে?কিছুটা অবাক হয়ে কান্নাভেজা কণ্ঠেই বলে উঠলো ইপ্শিতা।

ইপ্শিতার কথা শুনে ইথান ওনার দিকে ফিরলো।নিজের দুই হাত দিয়ে তার চোখের পানি মুছে দিয়ে বলে উঠলো,,

—-হুম কাকিয়া।তোমার ছেলে বেঁচে আছে।আমার ভাই বেঁচে আছে।এবার কান্না বন্ধ করো প্লিজ নাহলে এবার তুমি অসুস্থ হয়ে পরবে।

—-কিন্তু ইথান এটা কি করে সম্ভব।ডক্টর তো বলেছিলো যে ইহান মারা গিছে।আর তাছাড়া তুই এইকথা সবাইকে কেনো বললি না?সবাই কত কষ্ট পাচ্ছে।

—-মিথ্যা বলেছিলো ওনি কাকিয়া।সে অনেক কথা।এখন এসব বাদ দেও আর প্রাণ ভরে নিজের ছেলেকে দেখো।মনকে শান্ত করো।

ইথানের কথা শুনে ইপ্শিতা চোখের পানি মুছে বলে উঠলো,

—-আমি একটু ভেতরে যাবো ইথান।আমার ছেলেটার মাথায় একটু হাত বুলিয়ে দিবো।আচ্ছা ও চোখ মেলে কেনো তাকাচ্ছে না?

—-কাকিয়া ইহানের এখন সেন্স নেই তাই চোখ মেলে তাকাচ্ছেনা।একটুপর ওর জ্ঞান ফিরবে তখন তুমি ভেতরে গিয়ে ওর সাথে কথা বলো।

ইথানের কথা শুনে ইপ্শিতা আর কিছু বললো না।সে আইসিউর সামনে একটা চেয়ারে চুপ করে বসে রইলো ইহানের জ্ঞান ফেরার অপেক্ষায়।

ইপ্শিতাকে এই অবস্থায় একা ছাড়া যাবে না তাই ইথানও ওর পাশে বসে পরল।ফোন করে ওর আম্মুকে বলে দিলো ইপ্শিতার ব্যাপারে।বর্তমানে প্রচুর মাথা ব্যাথা করছে ইথানের তাই চোখ বুজে রইলো।ফারিহার জ্ঞান ফেরেনি এখনো।সকালের আগে ফিরবে না হয়তো।

ফজরের আজানের শব্দে চোখ মেলে তাকালো ইথান।চোখ বুজে থাকার কারনে কখন যে ঘুমিয়ে পরেছিলো টেরও পায়নি সে।পাশে তাকিয়ে দেখলো ওর ছোট এক দৃষ্টিতে এখনো আইসিউর দিকে তাকিয়ে আছে।চোখ দুটো লাল হয়ে আছে।হয়তো রাতে ঘুম হয়নি তার উপর কান্নার জন্য এমন হয়েছে।

সে ভাবলো একবার লাবিবার কাছে যাবে।যেই ভাবা সেই কাজ।উঠে দাড়িয়ে লাবিবার কাছে যাবে ঠিক তখনই একজন নার্স এসে বলে উঠলো,

—-স্যার ইহান স্যারের জ্ঞান ফিরেছে।ওনার কাছে যাওয়া প্রয়োজন মেডিসিন দেয়ার জন্য কিন্তু পুলিশরা যেতে দিচ্ছে না আপনি বলছেন বলে।

নার্সের কথা শুনে ইথান কিছু বলে উঠার আগেই ওর কাকিয়া এসে অস্থির কণ্ঠে নার্সের উদ্দেশ্যে বলে উঠলো,,

—-আমি ইহানের সাথে দেখা করবো।আমাকে নিয়ে চলেন প্লিজ।

হুট করে ইহানের আম্মুর এমন কথায় নার্স বেশ ঘাবড়ে গেলো।ঠিক তখনই ইথান বলে নার্সের উদ্দেশ্যে বলে উঠলো,

—-আমি ইহানের কাছে যাচ্ছি।আপনি একটা কাজ করুন।আমার আম্মু আর লাবিবার আম্মুকে গিয়ে বলুন আইসিউ নাম্বার ৭ এ আমি তাদের ডেকে পাঠিয়েছি।

ইথানের কথা শুনে নার্স মাথা নারিয়ে চুপটি করে চলে গেলেন।ইথান ইপ্শিতাকে নিয়ে ইহানের কাছে গেলো।

চারিদিকে মাত্র ভোরের আলো ফুটছে।পাখির কিচিরমিচির আওয়াজ শোনা যাচ্ছে বাহির থেকে।রাতের গভীর অন্ধকার কাটিয়ে সূর্য তার আলোর রশ্মি চারিদিকে ছড়িয়ে দিচ্ছে।ঠিক তেমনই সবার জীবনের অন্ধকারকে দূর করে দিয়ে আজ থেকে হয়তো নব্য অধ্যায়ের জাগরণ ঘটবে।

ইহান চোখ বুজে বেডের উপর শুয়ে ছিলো।দরজা খোলার আওয়াজে চোখ মেলে তাকালো সে।মাকে দাড়িয়ে থাকতে দেখে চোখে পানি চিকচিক করে উঠলো তার।’মা’বলে আস্তে ডেকে উঠলো সে।ছেলের ডাক শুনে দৌড়ে, ছেলের কাছে চলে গেলো ইপ্শিতা।পাশে বসে ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলেন আর কাঁদতে রইলেন নিরবে।আসলে মা মানুষটাই এমন।নিজের সন্তানের কষ্ট যে সয্য করতে পারে না।

ইহান ওর মায়ের হাত জড়িয়ে ধরে আস্তে করে বলে উঠলো,

—-কেমন আছো মা?তোমার চোখমুখের এমন অবস্থা কেন?

—-কাকিয়ার চোখমুখে এমন অবস্থা কার জন্য হয়েছে সেটা তুই খুব ভালো করে জানিস তাই অযথা ফাও কথা বলিস না।নিজের ছেলের এমন অবস্থা দেখলে যে কোনো মায়েরই এমন অবস্থাই হয়।কিছুটা তেরা ভাবে কথাটা বলে উঠলো ইথান।

ইথান পেছনে থাকায় এতোক্ষণ তাকে খেয়াল করেনি ইহান।তাকে দেখে বেশ অবাক হলো সে।হঠাৎ ইথান বলে উঠলো,,

—-আচ্ছা ইহান তুই যে চিঠিতে লিখেছিলি যে তোর মনে হয় তুই মারা যাবি এটা কি আদৌ সত্যি ছিলো?নাকি তুই নিশ্চিত ছিলিস যে তুই মারা যাবি?

ইথানের কথা শুনে থমকে গেলো ইহান।হঠাৎ ইথানের এরকম কথা বলার কারন বুঝতে পারছেনা সে কিন্তু এটা ঠিকই বুঝতে পারছে যে ইথান চিঠিতে লেখা ওই কথাটা নিয়ে সন্দেহ করছে।

সবেমাত্র আইসিউর দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকছিলো ইথানের মা আর লিয়া রহমান নার্সের কথা শুনে ঠিক তখনই ইথানের মুখ থেকে চিঠির কথা শুনে বেশ অবাক হলো তারা।এরের যখন ইহানকে জীবিত দেখলো তখন জানো ভুত দেখার মতন চমকে উঠলো তারা।যদিও ইথান আগেই বলেছিলো লাবিবাকে যে ইথান বেঁচে আছে কিন্তু তারা ভেবেছিলেন যে এটা শুধুই লাবিবাকে শান্তনা দেয়ার জন্য বলেছেন।ভাবেননি যে ইহান বেচে আছে।ইপ্শিতাও অবাক চোখে ইথানের দিকে তাকিয়ে আছে চিঠির কথা শুনে।সবার চিন্তার মাঝেই ইথান আবারো বলে উঠলো,

—-কি হলো ইহান বল?তুই জানতিস না যে ওটিতে গেলে তোর লাইফ নিয়ে রিস্ক থাকবে?আচ্ছা তুই যখন জানতিস দিদুনের প্লান তাহলে গেলি কেনো সেখানে নিজের জীবনের ঝুকি নিয়ে?আমাকে একবার বলতে পারতিস তুই সবটা।

ইথানের এমন একের পর এক প্রশ্ন শুনে ইহান থতমত খেয়ে গেলো।বাকিরা কিছুই বুঝতে পারছে না ওদের কথার আগামাথা।ইহান এবার সবাইকে আরেকদফা অবাক করে দিয়ে বলে উঠলো,

—-হ্যা আমি জানতাম দিদুনের প্লানের বিষয়ে।আমি জানতাম দিদুন আমাকে মেরে ফেলতে চেয়েছিলো।যখন লাবিবার অপারেশনের জন্য সবাই তোরজোর করছিলো তখন আমি দিদুনের কাছে যাচ্ছিলাম ক্ষমা চাইবো বলে।অনেক অন্যায় করেছি আমি জীবনে।যখন আমি দিদুনকে ডক্টরের সাথে দেখতে পেলাম আমি তখন সেখানে এগিয়ে গেলাম।আর সেখানে গিয়ে শুনতে পেলাম দিদুন আমাকে অপারেশন থিয়েটারেই মেরে ফেলার জন্য বলছে ডক্টরকে।

—-তুই যখন জানতিস তাহলে বললি না কেনো আমাকে?ইহানকে মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে রেগে বলে উঠলো ইথান কথাটা।

—-পরিবারের সবাই আমাকে ঘৃণা করে আমার জঘন্য কাজের জন্য।আমার ভালোবাসার মানুষটাও আমার থেকে মুক্তি চাইতো।আমার নিজের বোনটাকে আমি মেরে ফেলতে চেয়েছিলাম।বড় ভাইয়াকে হিংসা করতাম।সবার এতো ঘৃণা আর এতো পাপের বোঝা নিয়ে আমি ভেতরে ভেতরে এমনি তিলে তিলে শেষ হয়ে যাচ্ছিলাম।এভাবে বেচে থাকার চেয়ে মরে যাওয়া ভালো ছিলো।সবার এতো অবহেলা সয্য করার ক্ষমতা ছিলো না আমার।তাই দিদুনের কথা কাউকে বলিনি কারন আমার কাছে মরে যাওয়াটাই বেস্ট মনে হয়েছিলো।যেহেতু আমার কাছে সময় ছিলো না বেশি তাই সবার কাছে ক্ষমা চেয়ে ওই চিঠিটা লিখেছিলাম তখন।

একনাগাড়ে কথাগুলো বলে দিলো ইহান।চোখে তার পানি টলমল করছে।হয়তো ছেলে বলে এখনো জল গড়িয়ে পরেনি।সবাই ওদের কথা মন দিয়ে শুনছিলো এতোক্ষণ।তারা বুঝতে পারছে না কিছুই।ওনাদের শাশুড়ী ইহানকে কেনো মারতে চাইবে?ইথানের মা এবার রেগে বলে উঠলো,

—-ইথান কি হচ্ছে এখানে?কি সব বাজে কথা বলছো তোমরা এগুলো তোমাদের দিদুনের নামে?মানছি ওনি ইহানকে সেভাবে ভালোবাসে না কিন্তু তাই বলে ওকে মারার মতন এমন বাজে কাজ ওনি কিছুতেই করতে পারে না।

ইথান মায়ের কথা শুনে ওনার দিকে শান্ত ভাবে তাকালো।এরপর আস্তে আস্তে তাদেরকে সব বললো।পুরো ঘটোনা শুনে তাদের মাথায় জানো আজাশ ভেঙে পরলো।একজন ৬৫ বছরের বুড়ো মানুষের চিন্তাধারা এমন হতে পারে তারা স্বপ্নেও ভাবতে পারছেনা।ইপ্শিতার রাগে মন চাচ্ছে ওই বুড়ির পাকা চুলগুলো টেনে ছিড়ে ফেলতে।তার ছেলে অন্যায় করেছে মানছে সে তাই বলে তাকে মেরে ফেলার কোনো অধিকারই নেই তার।

সবাই চুপ করে আছে আসলে এমন একটা সত্য মানতে পারছে না তারা।হঠাৎ ইথান ইহানকে বলে উঠলো,

—-তুই যে মরে যেতে চাইছিলি সবাই তোকে ঘৃণা করে বলে কিন্তু একটাবারও কি ইপ্শিতা কাকিয়ার কথা ভেবে দেখছিস?পাগলের মতোন কাঁদছিলো ওনি।ফারিহা বেচারি তো কাদতে কাদতে সেন্স হারিয়ে হস্পিটালের বেডে শুয়ে আছে।ওই মেয়েটার কি দোষ ছিলো যে ওকে এতো কষ্ট দিলি?

ইথানের কথা শুনে ইহান বেশ অবাক চোখে তার দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো,

—-ও কেনো আমার জন্য কাঁদবে ভাইয়া?ওতো আমার থেকে মুক্তি চাইতো।অন্য কাউকে বিয়ে করে সুখী হতে চাইছিলো।ও নিজে আমাকে এই কথা বলছিলো।আমি তো ওর সেই ইচ্ছাটাই পুরোন করতে চেয়েছিলাম।তোমার কোথাও ভুল হচ্ছে।

—-তুই যদি এখন আইসিউতে ভর্তি না থাকতিস তাহলে তোর গালে ঠাটিয়ে একটা চড় দিতাম।সবসময় এক লাইন বেশি বুঝিস তুই।ফারিহা কথাগুলো রাগ করে বলছে।তুই যাতে আরেকটু শাস্তি পাস।আর তুই কিনা ওইগুলো সত্যি ভেবে নিলি।আরে ও তোকে পাগলের মতন ভালোবাসে।সবসময় প্রিয় মানুষের মুখে বলা কথাগুলো সত্য হয়না।তার হৃদয়েও অনেক না বলা কথা থাকে যেটা তাকে বুঝে নিতে হয়।কথাটা মনে রাখিস ইহান।আর বাকি রইলে সবার ঘৃণার কথা তো সবাই তোকে ক্ষমা করে দিয়েছে।সবারই ভুল ছিলো এইজন্য তারাও অনুতপ্ত।তুই নেই জেনে তারা অনেক কষ্ট পাচ্ছে।আর আমার রাগ তো তখনই ভেঙে গেছিলো যখন তুই লাবিবাকে বোনমেরু দিতে রাজি হয়েছিলি এটা না জেনেও যে লাবিবা তোর আপন বোন।আমি তখনই বুঝে গেছিলাম যে তুই তোর কাজের জন্য অনুতপ্ত।

ইথানের এমন কথায় চুপ করে রইলো ইহান।কি বলবে বুঝতে পারছেনা সে।ইথান এবার সবার উদ্দেশ্যে বলে উঠলো,

—-এখন এসব নিয়ে বাড়িতে কাউকে কিছু বলো না।আগে সুস্থ ভাবে বাড়িতে ফিরি তারপর দিদুনকে মজা বুঝাবো দিদুনেরই টেকনিকে।কথাটা বলে বাকা হাসলো ইথান।

ইথানের কথার আগামাথা কিছুই বুঝলোনা তারা কিন্তু এটা ঠিকই বুঝেছে যে তার মাথায় সয়তানি বুদ্ধি এসেছে।

ইহানকে মেডিসিন দিয়ে দিলো সে যার দরুন অতল ঘুমে হারিয়ে গেলো ইহান।আজ ইহানের ঘুমিয়েও শান্তুি কারন ইথান তাকে ক্ষমা করে দিয়েছে।ভাইয়ের ঘুমন্ত মুখটা দেখে ইথানের মনে এক অজানা শান্তি অনুভব হচ্ছে।

ইহানকে ঘুমোতে দেখে ইথান বলে উঠলো,

—-এখন সবাই চলো।ইহানের রেস্ট দরকার।আর তাছাড়া আইসিউতে এতো মানুষ একসাথে এলাউ না,,

#চলবে?