গোধূলীতে তুমি প্রিয় পর্ব-৩০

0
645

#গোধূলীতে_তুমি_প্রিয়
#পর্ব_৩০
#লেখিকা_রুবাইতা_রিয়া

ইথানের কথা শুনে সবাই সেখান থেকে বেরিয়ে এলো।সকাল হলে ফারিহার জ্ঞান ফিরলো।এখন আর আগের মতন কান্না করছে না ফারিহা।একদম চুপ হয়ে গেছে সে।কারোর সাথে কথা পর্যন্ত বলছে না।
ইথান একবার চেয়েছিলো ফারিহাকে সবটা বলে দিবে।কিন্তু পরে কিছু একটা ভেবে আর বললো না।

সকালে ইথান বাড়ি চলে গেলো লাবিবার সাথে টুকটাক কথা বলে।ফ্রেশ হয়ে খাবার খেয়ে আবার দুপুরে চলে এলো হস্পিটালে তবে একা আসেনি সে।সাথে তার দিদুনও এসেছে।ইথান না আনতে চাইলেও প্রচুর জোড়াজুড়ি করে এসেছে সে।

দিদুন যখন লাবিবার সাথে কথা বলছিলো তখন হুট করে লাবিবা বলে উঠলো,

—-দিদুন ইহান ভাইয়ার কাছে নিয়ে চলো না আমাকে।আমি আম্মু,কাকিয়াদের বলছি কিন্তু ওরা কিছুতেই নিয়ে যাচ্ছে না দেখো।

লাবিবার এমন কথায় চমকে উঠলো ওর দিদুন।লাবিবা কি তাহলে জানে না যে ইহান বেঁচে নেই?নাকি ইহান আসলেই বেঁচে আছে?ইথান লাবিবার পাশেই বসেছিলো তখন তাই ব্যাপারটাকে ধামাচাপা দেয়ার জন্য বলে উঠলো,

—-আরে ইহানের সাথে তো এখন দেখা করা যাবে না।তোমার শরীর দূর্বল এখন তাই বেড থেকেই নামতে পারবেনা তো ইহানের কাছে কি করে যাবে?তার থেকে বাড়িতে গেলে একেবারে ভাইয়ের সাথে মন ভরে কথা বলো কেমন।আর তার আগে ইহান সুস্থ হয়ে গেলে এমনিই তোমার সাথে দেখা করতে আসবে।

ইথানের কথা শুনে লাবিবা মুখটা গোমড়া করে রইলো।একটু হেঁটে গেলে কিই বা হতো?ইথানের দিদুন ওর দিকে সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকাতেই ও ওর দিদুনকে সাইডে ডেকে এনে বলে উঠলো,,

—-দিদুন লাবিবাকে এখন বলা যাবে না যে ইহান মরে গিছে।দেখো এমনিতেই লাবিবার শরীর দূর্বল তারঅপর এমন কথা শুনলে যদি ফারিহার মতন জ্ঞান হারায় তখন তো আরো ঝামেলা হবে তায়না?ওকে এখন কোনোরকম প্রেশার দেওয়া যাবে না।তাই আমি ওকে বলেছি ইহান বেঁচে আছে।তুমিও তাই বলো বুঝেছো।

ইথানের কথা শুনে ওর দিদুন কিছুক্ষণ ভেবে বলে উঠলো,

—-হ্যা তুই একদম ঠিকই বলছিস।আমারও মনে হয় ওকে এখন না বলাই ভালো।আমার দাদুভাইটা কত বুঝে।কথাটা বলেই সে ইথানের মাথায় হাত বুলিয়ে চলে গেলেন লাবিবার কাছে।অন্যদিকে ইথান একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেললো।আরেকটু হলেই ধরা খেয়ে যেতে হতো।

ফারিহা এখম একটু সুস্থ তাই তাকে বিকেলেই বাড়িতে নিয়ে আসা হলো।বাড়িতে আসার পর সে একা ঘরে চুপটি করে বসে আছে।কারোর সাথে কোনো কথা বলছে না সে।

সন্ধ্যার ঠিক আগমুহূর্ত।পরিবেশটা বেশ শান্ত।সূর্য প্রায় পশ্চিমে ঢুলে পড়েছে।সূর্যের লাল আভায় চারিদিকে রক্তিম বর্ণ ধারন করেছে।ব্যালকনিতে বসে গোধূলীর এই সময়টা একা একা উপোভোগ করছে ফারিহা।দূর আকাশের দিকে তার চোখজোড়া শান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর তার চোখটা ঝাপসা হয়ে এলো।দু ফোটা নোনাপানি বেরিয়ে এলো তার চোখ বেয়ে।আকাশের দিকে চেয়েই বলে উঠলো সে,,

—-গোধূলীর এই সময়টা বড়ই ধোয়াসার।না দিন না রাত এখন।বরং দিন আর রাতের মিশ্রণে এই বেলার সৃষ্টি।যেই রাত আর দিন সবসময় একে-অপরের বিপরীত সেও এই অবেলায় এসে মিলিত হয়।ধোয়াসার হলেও সৌন্দর্যে ভরা থাকে এই সময়টা।শতশত মানুষ তার প্রিয় মানুষটার সাথে এই সময়টা উপোভোগ করে।সব রাগ-অভিমান ভুলে গিয়ে দিনশেষে এই সময়টাতে তারা এক হয়ে যায় ঠিক এই দিন আর রাতের মতন আর উপভোগ করে প্রকৃতির এই সৌন্দর্যকে।কিন্তু আজ আমার প্রিয় মানুষটাই যে নেই এখানে।সে যে ওই গোধূলীর আকাশেই হারিয়ে গেছে যে আর কোনোদিন ফিরে আসবে না হয়তো।আমাকে একা রেখে চলে গেছে সে ওই দূর আকাশে।দিনশেষে মানুষ তার প্রিয়র সাথে গোধূলীর সৌন্দর্য উপোভোগ করে আর আমি এই গোধূলীর ধোয়াসাতেই তাকে খুজে চলি।হয়তো ধোয়াসার এই গোধূলীতে_তুমি_প্রিয় লুকিয়ে আছো।
খুব মিস করছি আপনাকে ইহান খুব।শেষের কথাটা বলে ডুকরে কেঁদে উঠলো ফারিহা।একসময় চোখের পানি ফুরিয়ে এলে সেখানেই ঘুমিয়ে পরলো ফারিহা ক্লান্তির জন্যে।

ফারিহার সাথে ইহান দেখা করতে চাইলেও ইথান করতে দেয়নি।তার মতে এখন ইহানের প্রচুর রেস্টের প্রয়োজন তারাতারি সুস্থ হতে হলে।তাছাড়া ফারিহার সাথে এখন দেখা করাও রিস্ক কারন দিদুন বেশিরভাগ সময় ফারিহার কাছে থাকে তাই যদি সে টের পেয়ে যায় কিছু।বিধায় ইহান ছটফট করেছে শুধু।

তিনদিন পর ইহানের বাবা বাড়ি ফিরলে তাকে সবটা জানানো হয়।প্রথমে ইহানের মৃত্যুর খবর পেয়ে সবার সামনে কান্নার নাটক করলেও সবটা জানতো সে কারন ইথান তাকে আগেই সবটা বলে দিয়েছিলো।মনে মনে নিজের মায়ের প্রতি প্রচুর রাগ জমেছে তার।ঘৃণা হচ্ছে খুব।যে মানুষটা তাকে জন্ম দিলো সেই মানুষটাই কিনা তার ছেলেকে কেড়ে নিতে চেয়েছিলো।কিসের এতো রাগ তার ইহানের প্রতি এটাই বুঝতে পারছে না সে।

ইহানের বদলে অন্য একটা ডেডবডি এনে দাফন করা হলো সবার অগোচরে।কাজটা খুব সাবধানে করাই কেউ তা টের ও পেলো না।তবে লাশটাকে ঠিক ওর দিদুনের ঘরের জানালার সামনে কবর দেওয়া হলো।সবাই প্রচুর কান্নাও করছিলো।তবে দিদুন লোক দেখানো নেকা কান্না করলো একটু যাতে কেউ সন্দেহ না করে।ফারিহা নিশব্দে কেঁদে চলেছে।তার কান্না তো সেদিন থেকেই শুরু হয়েছিলো যেদিন শুনেছিলো ইহান আর বেঁচে নেই।তবে বাড়িতে লসশ আনাি আরো কান্নায় ভেঙে পরে সে।সবথেকে বেশি কষ্ট তো সে ভোগ করছে।কোন পাপের শাস্তি দিচ্ছে আল্লাহ তাকে?ফারিহার মা এসে তাকে শান্তনা দিচ্ছে।সত্যি বলতে সেও ভেঙে পরেছে মেয়ের এমন অবস্থা দেখে।হাজার হক মা কখনো মেয়ের কষ্ট সয্য করতে পারে না।

সময় কাটতে লাগলো তার আপন গতিতে।দেখতে দেখতে এক সপ্তাহ চলে গেলো।ইহান আল্লহর রহমতে এখন অনেকটাই সুস্থ।লাবিবার আগেই তার রিকোভার হয়েছে।চাইলে এখন তাকে বাড়িতে নিয়ে যাওয়া যাবে তবে লাবিবাকে আরো কিছুদিন থাকতে হবে।ইথান তো এটারই অপেক্ষায় ছিলো এতোদিন।এবার বুড়ি বুঝবে মজা!

ইহানকে রিলিজ দেয়া হলে সে লাবিবার কাছে যেতে চাইলো।বোনকে যে তার বড্ড দেখতে ইচ্ছা করছে।কেবিনের বাহির থেকে একনজর দেখলো সে লাবিবাকে।ঘুমিয়ে আছে সে মুখটা একদম নিষ্পাপ বাচ্চাদের মতন করে।যাক একটা পাপের বোঝা তো কমলো তার।এটলিস্ট বোনটাকে বাঁচাতে তো পারলো সে এতো কষ্টের পরও।ইহানকে ভেতরে যেতে দিলো না ইথান কারন লাবিবা যদি দেখে ইহানকে তাহলে এখানেই ইমোশনাল হয়ে পরবে আর সবাইকে সবটা বলে দিবে আর তার প্লান নষ্ট হয়ে যাবে।তাই সে তাকে বাহির থেকেই নিয়ে চলে গেলো।পুলিশের কাছ থেকে ইথান অনেক আগেই কেস উঠিয়ে নিয়েছিলো তাই কোনো ঝামেলা করেনি তারা আর।তাছাড়া ইথানের মুখের উপর কথা বলার সাহসও নেই তাদের কারন ইথানের মামা একজন বড় পুলিশ অফিসার।উপর মহলে তার হাত আছে তাই তারা ঝামেলাও করেনি।

বাড়িতে মেইন গেট দিয়ে ডুকতে দিলো না ইহানকে বরল সবার থেকে লুকিয়ে বাড়ির পেছন দিক থেকে ব্যালকনি বেয়ে তাকে ঘরে ঢোকালো।ইথানের এমন কাজে বেশ অবাক হলো ইহান কিন্তু কিছু বললো না।ইহানের খাবারগুলো সে রুমেই নিয়ে এলো সবার চোখের আড়ালে।মোটামুটি ইহানকে সে সবার থেকে লুকিয়ে রাখলো রাত না হওয়া পর্যন্ত।

বাড়িতে আসার পর একবারও সে ফারিহাকে দেখেনি।মনটা তার বড্ড বেহায়া হয়ে পরেছে ফারিহাকে একটি নজর দেখার জন্য।আসলে ভালোবাসার মানুষটা যে এমনই হয়।তাকে এক নজর না দেখতে পেলে মনে হয় জানো কতকাল দেখি না।ইহান ভাবলো একবার লুকিয়ে ফারিহাকে দেখতে যাবে।কিন্তু তাও হলো না।তার আগেই ইথানসহ ওর মা-বাবা আর দুই কাকিয়া এসে রুমের দরজা আটকে দিলো।

ইহান ভালো করে তাকাতেই দেখতে পেলো তাদের হাতে কিছু অদ্ভুত টাইপের পোশাক আছে।দেখে মনে হচ্ছে রক্ত মাখা কিন্তু আসলে তা রক্ত নয় বরং আলতা।তাদের দিকে ভ্রু কুচকে তাকিয়ে ইহান বলে উঠলো,

—-তোমরা এই অসময়ে আমার রুমে?তাছাড়া তোমাদের হাতে এগুলো কি?

ইহানের এমন কথা শুনে ইথান একটা ডেভিল হাসি দিয়ে বলে উঠলো,

—-খেলা হবে বুঝলি আর এইগুলো হলো সেই খেলার জন্য কুছু সামগ্রী।এখন আমি যা বলছি চুপ করে শোন।

ইথান আর তাদের মধ্যে অনেক কথা হলো যেগুলো আমরা না শুনলেও চলবে😁।

ইহান সবটা শুনে বলে উঠলো,

—-এইগুলো করা ঠিক হবে না।মানছি দিদুন ভুল করেছে কিন্তু আমিও তো সেই একই ভুল করেছি।তাহলে আমাকে ক্ষমা করে দিলে তাকেও ক্ষমা করা উচিত

ইহানের এমন কথায় ইথান বলে উঠলো,

—-অবশ্যই ক্ষমা করতাম যদি সে তোর মতন অনুতপ্ত থাকতো।নিজের ভুল শিকার করে সেটা সুদ্রে নিতে চাইতো।কিন্তু তার মনে তো এক ফোটাও অনুতপ্তবোধ নেই।তাছাড়া তোর কাজের জন্য তুই যথেষ্ট শাস্তি পেয়েছিস তাই দিদুনকেও পেতে হবে।

কথাটা বলেই ইথান ইহানের হাতে কিছু পোশাক ধরিয়ে দিলো যা দেখে ইহান নিজেই ভয়ে আঁতকে উঠলো।ইহানের এমন কাজে ইথান হালকা হাসলো।

রাত প্রায় ১২টা।আকাশ আজকে মেঘলা অনেকটা।মাঝে মাঝে দমকা হাওয়া বইছে।সবাই ঘুমিয়ে পরেছে।ফারিহা আজকেও কাঁদতে কাঁদতে ব্যালকনিতেই ঘুমিয়ে পরেছে।বুড়ি দিদুনের ঘরের জানালা খোলা।বাহিরে হঠাৎ জোরে বাতাস হওয়ায় ওনার ঘরের জানালাটা বাড়ি খেলো যার শব্দে ওনার ঘুম ভেঙে গেলো।টেবিলের উপর হাতরিয়ে চশমাটা হাতে নিয়ো চোখে দিলো সে।তারপর জানালার দিকে তাকালো সে।জানালা খোলা দেখে তার হালকা ভয় হলো।এই সামনেই তো ইহানের কবর দেয়া।মনে মনে বলে উঠলো সে,

—-এই আপদটার কবর যে কেনো এখানে দিতে গেলো ইথান কে জানে।এখন ভয়ে মরি আমি।এইদিকে কাজের লোকগুলো বেশ তেড়া হয়ে গিছে।জানালাটা অব্দি ঠিকঠাক বন্ধ করেনি।কালই নতুন কাজের লোক নিয়ে এইগুলোকে ছাটাই করতে বলবো।

কথাগুলো বলছে আর বিছানা থেকে আস্তে করে নামছে ঠিক তখনই কিছু কুকুরের আওয়াজ পেয়ে আঁতকে উঠলো সে।পুরোন যুগের মানুষ হওয়াই সে ভুতপ্রেত বিশ্বাস করে।এটাও বিশ্বাস করে মাঝরাতে কুকুর নাকি ভুত দেখলে ডাকে।ভয়ে একটা ঢোক গিললো সে।টেবিলের উপর থেকে এক গ্লাস পানি নিয়ে ঢকঢক করে খেয়ে ফেললো সে বিছানার উপর বসে।

তারপর জানালার দিকে তাকাতেই চিৎকার করে উঠলো সে।হাতে থাকা কাঁচের গ্লাসটা নিচে পরে গিয়ে ভেঙে গেলো।জানালার ধারে ইহানকে দাড়িয়ে থাকতে দেখলো সে।তবে সাধারণ মানুষের মতন না।গায়ে বিশ্রি ভাবে রক্ত মেখে আছে তার।মুখের দু পাশে দুটো দাত বেরিয়েছে ভুতের মতন যেখানে রক্ত মেখে আছে।চুলগুলো মেয়ে মানুষের মতন ইয়া লম্বা।চোখদুটো লাল হয়ে আছে।আর তার পাশে সব সাদা কাপড় ঝুলছে যাতে কিনা লাল টকটকে রক্ত লেগে আছে।

দিদুন ভয়ে বিছানা থেকে নিচে পরে গেলো গেলো।ব্যাথা পেয়ে চিৎকার করে বলে উঠলো,,

—-বাবাগো কোমোরটা আমার গেলো বুঝি এই বুড়ি বয়সে।ওরে কেউ আমাকে তোল,,,,

#চলবে??