স্নিগ্ধ প্রেমের সম্মোহন পর্ব-১৯

0
1928

#স্নিগ্ধ_প্রেমের_সম্মোহন
–[পর্ব-১৯]
লেখিকা: #সাদিয়া_মেহরুজ_দোলা

অভ্র ভাইয়া আমার থেকে কিঞ্চিত দূরে অবস্থান করছে। তার চোখমুখে উপচে পড়া খুশির লেশ! আমার মনে কু ডাকছে। বারবার দোয়া দুরুদ পড়ছি যাতে এটা শুনতে না হয় অভ্র ভাইয়া এই বিয়েতে রাজি।

অভ্র ভাইয়া মৌনতা কাটিয়ে গলা ঝেড়ে বললেন,,,

‘ থ্যাংকস এ লট দোল! তুমি যদি বিয়ে থেকে না পালাতে তাহলে হয়তো অরিনকে নিজের করে পেতাম না। তুমি বিয়ে থেকে পালিয়ে যাওয়াতে আমি কৃতজ্ঞ তোমার কাছে। ‘

ভড়কানো দৃষ্টি নিক্ষেপ করার পর আমি মুচকি হাসি দেই। যাক! অভ্র ভাইয়া বিয়েতে রাজি নন। এবার বিয়ে পুরোপুরি ভাঙ্গতে বেশ সুবিধা হবে।

আমি বলি, ‘ কিন্তু ভাইয়া বিয়েটা তো পুরোপুরি ভাঙেনি, এখন কি করবেন?’

‘ ঐটা নিয়ে টেনশন করোনা। ব্যাবস্থা হয়ে যাবে একটা। তোমার পড়া শেষ হতে হতে তো বেশ দেরী। ততদিনে একটা উপায় বের করা যাবে। ‘

আমি সন্দিহান কন্ঠে বলি, ‘ ভাইয়া আপনি অরিনকে পছন্দ করেন?’

অভ্র ভাই লাজুক কন্ঠে বললেন, ‘ হ্যা ‘

‘ তাহলে? তাহলে আমায় বিয়ে কেনো?অরিনকে বিয়ে করলেন না কেনো?’

‘ সম্ভব ছিলো না। বাবা চাইতেন তার ছেলের বউ তুমি হও। ইউ নো না? আমি বাবার ওপর কথা বলার সাহসটা এখনো অর্জন করিনি। বাট এখন সবকিছু ক্লিয়ার। হাতে অনেক সময় আছে ম্যানেজ করে নিবে। থ্যাংক’স এগেইন হা?আসি! ‘

আমি মুচকি হাসি দিয়ে সায় জানাই। অভ্র ভাইয়া দরজা খুলে বেড়িয়ে যান।
মনে প্রশান্তির ঢেউ বয়ে গেলো! অরিনের জন্য কয়েকদিন খারাপ লাগছিলো। রোহান ওকে ধোঁকা দিয়েছে। মেয়েটা ভেতর থেকে বিষিয়ে গেলেও বাহিরে তা প্রকাশ করতো না। তবে আমি তো বুঝেছিলাম ওর মনের কথা!
অভ্র ভাইয়ার সাথে বিয়ে হলে অরিন সুখী হবে।

কথাগুলো ভেবেই তৃপ্তিময়ী হাসি দেই। তখনি হন্তদন্ত হয়ে রুমের দরজা খুলে প্রবেশ করে পূর্ব ভাই! তাকে দেখে এলোমেলো লাগছে অনেকটা। তিনি দ্রুতপায়ে এগিয়ে এসে বললেন,,,

‘ অভ্র ভাইয়া তোর রুমে কেনো এসেছিলো?কি বলেছে?’
তার কন্ঠে চাপা কষ্ট আর রাগের আভাস!

আমি শান্ত কন্ঠে বলি,, ‘ থ্যাংকস বলতে এসেছে! ‘

‘ থ্যাংকস?’

‘ হু! বিয়ের আসর থেকে পালানোর জন্য থ্যাংক’স বলেছেন। তিনি নিজেও এ বিয়েতে রাজি নন। ভাইয়া অরিনকে পছন্দ করেন কিন্তু চাচু কে বলতে পারেননি। ‘

পূর্ব ভাইয়া দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে শান্ত দৃষ্টি দেন। অতঃপর তিনি বললেন,,,

‘ ভাইয়া অরিনকে পছন্দ করে?’

‘ হ্যা তাই তো বললো। ‘

‘যাক আমার বউয়ের পিছু ছেড়েছে। ‘

শেষের কথাটা বিড়বিড় করে নিম্নস্বরে বললেও আমার কানে তার কথাটি স্পষ্ট ভাবে ভেসে আসে। আমি চমকিত দৃষ্টি দিয়ে তার দিকে তাকাই।

‘ আপনি কি বললেন?আপনার বউয়ের পিছু ছেড়েছে মানে?কে আপনার বউ?’

পূর্ব ভাইয়া দুষ্ট হেসে ভ্রু নাচিয়ে বললেন,,,

‘ কেনো তুই? আমার একমাত্র বউ! ‘

চোখদুটো মার্বেল আকার করে তার দিকে অবাক হয়ে তাকাই। মানে কি? বিয়ে হলো কবে?
পরিশেষে বলি,,,

‘ আপনি পাগল? আমি আপনার বউ হতে যাবো কেনো?আমাদের বিয়ে কবে হলো?’

পূর্ব ভাইয়া আমার দুহাত ধরে তার কাছে টেনে নেন। অস্বস্তিমূলক দৃষ্টি দিয়ে তার মুখপানে চেয়ে আমি। সামনে কি করতে চাচ্ছেন তা বোঝার জন্য অগাধ চেষ্টা চালাই মন কোঠরে! তবে আমি ব্যার্থ! এই লোককে বোঝা দায়। কঠিন!

পূর্ব ভাইয়া বললেন,,,

‘ আইনগত বা ধর্মীয়ভাবে বিয়ে না হলেও আমাদের বিয়ে মনগত ভাবে বিয়ে হয়েছে। যাকে বলে ‘মন বিয়ে’! মন থেকে তিন কবুল বলে আমি তোকে আমার হৃদমোহিনি বানিয়েছি। আমার রাজ্যের রানী তো শুধু তুই! আমার স্নিগ্ধ প্রেমের সম্মোহনে সম্মোহীত কারী ব্যাক্তিটাও তুই! ‘

চোখে পানি টলমল করছে। মাথা নিচু করে পূর্ব ভাইয়ার অগোচরে চোখের পানি মুছে নেই। তিনি আমার চোখে পানি দেখলে ভয়ংকর কান্ড ঘটিয়ে ফেলবেন! তার সামনে শান্তিতে দু ফোঁটা চোখের পানিও বিষর্জন দেয়া যায়না!

দুপুর হয়ে এসেছে। পূর্ব ভাইয়াকে সেই মূর্হতটায় আমি রিপ্লে দিতে নিবো তখনই তার ফোনে কল আসে যার ফলস্বরূপ তিনি তাড়াহুড়ো করে চলে যান। তিনি যাওয়ার ফলে আমি একটা কঠিন সিদ্ধান্ত নেই। যেই সিদ্ধান্তটা আমার, পূর্ব ভাইয়া আর অরা আপু তিনজনের জন্যই ভালো!

আম্মু রুমে আসে মুখ কালো করে। আমি তা দেখে মলিন হাসি দেই। আম্মু বলল,,,

‘ দরকার টা কি এখান থেকে চলে যাওয়ার? সামনে তোর ভর্তি পরিক্ষা। ‘

আমি মলিন কন্ঠে বলি,,,

‘ তো কি হয়েছে আম্মু? ভাইয়ার ওখানে থাকলে আরো ভালে প্রিপ্রারেশন নিতে পারবো। আর আমি তো আর একা যাচ্ছিনা তোমরাও যাচ্ছো। ‘

‘ যাচ্ছি তো। কতবছর এই আবরার ম্যানশনে কাটিয়েছি। সবার প্রতি মায়া জন্মে গেছে। এভাবে হুটহাট চলে যাবো,, (থেমে…) আচ্ছা এভাবে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত কেনো মা?কিছু হয়েছে? ‘

আমি মাথা নাড়িয়ে ‘না ‘ বলি!
আম্মু হতাশা চাহনিতে তাকিয়ে বলল,,,,

‘ সবকিছু গুছিয়ে নে। সায়ান আসছে। একসাথেই বেড় হবো। ‘

আম্মু চলে যায়।
আমি সেদিকে অশ্রুভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে বেডে বসে পড়ি।

আবরার ম্যানশন ছেড়ে আজ নিজেদের বাসায় চলে যাবো। হটাৎ করেই এই সিদ্ধান্ত নেয়া। বাবাকে জানানোর পর তিনি প্রথমে বেশ কষ্ট পান! এতোটা বছর এখানে কাটিয়ে এখন শুধুমাত্র অরা আপুর জন্য কতগুলে মানুষকে কষ্ট দিচ্ছি আমি।
বাবা বেশ কষ্ট পেয়েছে তা আমি জানি। তবে আমার আর ভাইয়ার কথা ভেবে পরক্ষণে তিনি রাজি হয়ে যান। আমরা আপাতত গুলশানের নিজেদের ডুপ্লেক্স বাড়িটায় উঠবো। যেখানে এতদিন বড় ভাইয়া একা ছিলেন।

ভাইয়ার ভার্সিটি ওখান থেকে কাছে হওয়াতে তিনি ঐখানেই থাকতেন। আজ আমরা চলে যাবো। একেবারের জন্য! তারজন্য বাসার সবার বেশ মন খারাপ। কিন্তু আমি এ বাসায় থাকলে কিছুতেই পূর্ব ভাইয়ার থেকে দূরে থাকতে পারবোনা। তিনি দিবেন না।

গুলশান থেকে এখানের জায়গাটা বেশ দূরে। মাঝখানে অনেক ব্যাবধান! এতো দূর থেকে নিশ্চিত পূর্ব ভাইয়া প্রতিবার যাবেনা না আমার কাছে,

নিজের জামাকাপড় ভর্তি লাগেজ টা হাতে নিয়ে শেষবারের মতো এতো বছর কাটানো রুমটা দেখে নেই। সময়ের ব্যাবধানে, সম্পর্কতার খাতিরে কত কিছুই না বিসর্জন দিতে হয়!

নিচে নামতেই খেয়াল হয় সবার অশ্রুসিক্ত নয়ন!
বুকে মোচড় দিয়ে উঠলো! আমি কোনো অন্যায় করছি না তো? নাহ! এখানে অন্যায় কিসের? দুজন ভালোবাসার মানুষ যেখানে খুশি সেখানে এতটুকু কষ্ট তো সামান্য। তবে, পূর্ব ভাইয়া কি অরা আপুকে আপন করে নিতে পারবেন?

নিচে নামতেই বড় চাচি এসে জরীয়ে ধরে কেঁদে দেন। আমি নিজের কান্নাটাকে নিজের মাঝে চেপে রেখেছি।এখন কাঁদা যাবেনা, কিছুতেই না!

বড় চাচি বললেন,,,

‘ না গেলে হয়না মা?’

‘ চাচি এখান থেকে কোচিং বেশ দূরে হয়ে যায়। পড়ালেখায় সমস্যা হবে। তাছাড়া ভাইয়াকে ছাড়া থাকতে ভালো লাগেনা। ‘

‘ সাবধানে থাকিস। নিজের খেয়াল রাখিস মা! ‘

আমি মাথা নাড়িয়ে হ্যা বলি।
সবার থেকে বিদায় নিয়ে ভাইয়ার কাছে চলে যাই। ভাইয়াকে দেখতেই সব কষ্টগুলো ফিকে পড়ে যায়। ছোট থেকে বাবা মার ভালোবাসা বা পরিপূর্ণ সময় কোনোটাই পাইনি। তারা দুজনই জব করতেন! তখন ভাইয়া আমায় দুজন মানুষের ভালোবাসা দেয়ার চেষ্টা করেছেন।

ভাইয়াকে দেখে জরীয়ে ধরে কেদে দেই। ভাইয়া আদরমাখা হাত মাথায় রেখে বলল,,,

‘ কাঁদিস না পিচ্চি! আমার কষ্ট লাগেনা? চুপ! ‘

আমি কান্নারত কন্ঠে বলি,,,

‘ তোমাকে খুব মিস করেছি ভাইয়া। ‘

‘ মিস ইউ টু! এখন থেকে তো একসাথেই থাকছি। এখন কান্না বন্ধ কর। ‘

আমি কান্না থামিয়ে শেষ বারের মতো আবরার ম্যানশন দেখে নেই! চোখ দিয়ে পানি এখনো পড়ছে। কষ্টগুলে আজ চোখের পানির সাথে অল্প অল্প করে বেড়িয়ে আসার প্রয়াস চেষ্টা চালাচ্ছে! তবে সব কষ্ট কি একেবারে মোছা যায়?
মন কোঠরে যে তার অবস্থান! তাকে ছাড়া এই শূন্যস্থান পূরণ হবে কি?

বাসায় এসে ঘন্টাখানেক সাওয়ার এর নিচে বসে থেকে একাধারে কেঁদেছি! বারংবার পূর্ব ভাইয়ার চেহারা চোখের সামনে ভেসে উঠছে!
তার সু- মধুর কন্ঠস্বর যেনো এখনো কানে বাড়ি খাচ্ছে!

ফ্রেশ হয়ে ড্রেস বদলে বাহিরে চলে আসি।
রুমটা পুরো অন্ধকার। তা দেখে আমার ভ্রু কুচকে যায়।আমি ওয়াশরুমে যাওয়ার আগে লাইট অন করে গিয়েছিলাম।অফ কে করলো?বেশি না ভেবে লাইট অন করতেই চক্ষু চড়কগাছে! দৃষ্টি আমার সামনে নিবদ্ধ!
বেডে পূর্ব ভাই মাথার নিচে দুহাত ভাজ করে রেখে শুয়ে আছেন। তাকে দেখে ঘাবড়ে যাই ক্ষনেই!

আমি কাঁপা কন্ঠে বলি, ‘ পূর্ব ভ..ভাই আ..আপনি এখানে?’

পূর্ব ভাইয়া শোয়া থেকে উঠে বসেন। আমার দিকে রক্তচক্ষু দৃষ্টি দিয়ে তাকাতেই দম বন্ধ হওয়ার উপক্রম প্রায়! দ্রুত পায়ে তিনি এগিয়ে এসে আমার দুই বাহু শক্ত করে চেপে ধরেন। ঝাঁঝালো কন্ঠে বললেন,,,,

‘ ঐ বাসা থেকে বাহিরে পা ফেলার সাহস কি করে হয় তোর? এখানে আসার মানে কি? বল! এই বাসায় কেনো এসেছিস?’

আমি নিশ্চুপ!
তিনি আমার অনেকটা কাছে এসে আমার কাঁধে হাত রাখেন। দাঁতে দাত চেপে বললেন,,,

‘ কার জন্য এসেছিস এখানে? তুই এখনি বাসায় যাবি! রাইট নাউ, ‘

চলবে,