#স্নিগ্ধ_প্রেমের_সম্মোহন
–[পর্ব-২০]
লেখিকা: #সাদিয়া_মেহরুজ_দোলা
পূর্ব ভাইয়া আমার এক হাত শক্ত করে নিজ হাতের মুঠোয় নিয়ে বের হতে যাবে তখনই রুমে ভাইয়ার আগমন। ভাইয়াকে দেখে স্বস্তির শ্বাস ফেলি! ভাইয়াকে দেখার পরও পূর্ব ভাইয়া আমার হাত ছাড়েননি! বরং আগের থেকে আরো শক্ত করে চেপে ধরেছেন। ওড়না বড় হওয়াতে ভাইয়া হাত চেপে ধরাটা দেখতে পারেনি।
সায়ান ভাইয়া পূর্ব ভাইয়া কে দেখে একগাল হাসলেন! ব্যাকুল কন্ঠে বললেন,,,
‘ আরে পূর্ব তুই?কখন এলি? ‘
পূর্ব ভাইয়া গম্ভীর কন্ঠে বললেন,,,,
‘ এইতো একটু আগে! ‘
‘ দোলের রুমে যে?কোনো কাজ আছে?’
‘ হ্যা! আজকেই এ বাড়িতে আসার কি হলো?কার অরা আসছে। তোদের আলাদা দেখলে কি বলবে? বাবা বলেছে তোদের বাসায় যেতে। তিনদিন থেকে এসে পড়িস। ‘
সায়ান ভাইয়া মাথা চুলকিয়ে বলল,,,
‘ দোল আসার জন্য ছটফট করছিলো তাই একেবারেই সবাইকে নিয়ে এসেছি। ডিস্টেন্স তো অনেক। বারবার যাওয়া আসা তো বেশ কঠিন! তাই বাবা মাকে সহ নিয়ে এসেছি। আচ্ছা প্রবলেম নেই। আজ রাতে তুই থেকে যা! আড্ডা দেই! কাল সকালে সবাই একসাথে আবরার ম্যানশনে যাবো। অরা কখন আসবে কাল?’
‘ রাতে, আটটার দিকে প্লেন বিডিতে ল্যান্ড করবে। ‘
‘ তাহলে তো হলোই। আজ তুই এখানেই থাক! রুমে আয়, কতদিন কথা হয়না। ‘
সায়ান ভাইয়ার ফোন বেজে উঠলো হটাৎ! তিনি পূর্ব ভাইয়াকে ইশারায় আসতে বলে বেড়িয়ে যান। ভাইয়া চলে যেতেই পূর্ব ভাইয়া আমার হাতের উল্টোপিঠে একটা চুমু খেলেন। মাথার সামনে এসে থাকা অবাধ্য ছোট চুলগুলোকে পিছে ঠেলে দিয়ে কিছুটা দৃঢ় কন্ঠে বললেন,,,
‘ রাত দুটোর সময় ছাঁদে আসবি। এক মিনিট হলে খবর আছে। ওয়ান মিনিট ইকুয়াল সিক্সটি সেকেন্ড! ৬০ টা চুমু খেতে হবে আমায় ১ মিনিট লেট হলে, মাইন্ড ইট! ‘
কথাগুলো বলে এক মূর্হতও না দাঁড়িয়ে গটগট করে চলে যায় পূর্ব ভাই।
আমি সেদিকে তাকিয়ে হতভম্ব হয়ে আছি! ৬০ টা চুমু সিরিয়াসলি?তাও পূর্ব ভাইকে?আস্তাগফিরুল্লাহ!
।
রুমের ভেতর পায়চারি করছি। মাথায় চিন্তারা যেনো ঘুরঘুর করছে। কাল অরা আপু আসছে! শুনে মনে প্রশান্তি পেলেও কোথাও না কোথাও আমার কষ্ট হচ্ছে! আমার মন কোঠরেই! সেখানে যে বেশ কিছুটা জায়গা জুরে পূর্ব ভাইয়ার বসবাস! তারই আনাগোনা, পদচারণা! জীবনে ভাবিনি আমিও কোনোদিন ‘প্রেম ‘ নামক ধাঁধায় ফেসে যাবো। তাও ভুল মানুষের প্রতি।
আমি চাইলেই পূর্ব ভাইয়াকে বলে দিতে পারি তাকে আমি পছন্দ করি! তখন তিনি হয়তো খুশিতে স্তব্ধ হয়ে যাবেন! ইশ…! তার তখনকার ফেসটা কেমন হবে ভাবতেই আনমনা মনটা ছটফটে হয়ে উঠে!
তবে আমি বলবো না! কখনোই না। অরা আপু আমার জন্য অনেক বড় সেক্রিফাইস করেছেন। আমায় আগলে রেখেছেন সবসময়। মায়ের ভালোবাসাটা তিনি দিয়েছেন ছোট বেলায়। তাকে আমি কষ্ট দেই কি করে?
আমার আজও মনে পড়ে সেই দিনটির কথা! যেদিন অরা আপু আমার জন্য সবচেয়ে বড় ত্যাগ করেছেন।
দিনটা ছিলো সোমবার। তখন আমি ক্লাস এইটে পড়াশোনা করি।
আর দশটা স্বাভাবিক দিনের মতো আমি হাসিখুশি বাড়ি ফিরতে নিলে পথিমধ্যে পথ আটকায় কিছু বখাটে! তাদের থেকে রুহ কেঁপে উঠে আমার। ছেলেগুলো ছিলো এলাকার নামকরা মাস্তান।দুদিন ধরেই আমায় বাজে চোখ দিয়ে দর্শন করতো। ছোট হওয়াতে সেদিন বুঝতে পারিনি কিছু!
বখাটে সেই ছেলেদের মাঝ থাকে ফাহিম নামক এক ছেলে আমার মুখে রুমাল বেঁধে পাশের ঝোপঝাড়ের আড়ালে নিয়ে যায়! ততক্ষণে ভয়ে আমি কেঁদে কেটে অস্থির!
ঝোপের আড়ালে নেয়া মাত্রই উপস্থিত দুজন লোলুপ দৃষ্টিতে তাকায় আমার দিকে! আমি ভয়ে চিৎকার দিতে নিলেই মুখ চেপে ধরে ফাহিম! খারাপ ভাবে স্পর্শ করার আগ মূর্হতে সেখানে অরা আপু উপস্থিত হোন! আপুকে দেখে এক ছুটে তার কাছে চলে যাই। অরা আপু বলল,,,
‘ দোল, আপুন ঠিক আছিস?’
আমি মাথা নাড়িয়ে হ্যা বলে ছেলেগুলোর দিকে দেখাতেই আপুর চোখেও ভয়ের লেশ দেখতে পারি। আপু তখন ভার্সিটিতে পড়তেন!
অরা আপুকে সেই দুই বখাটে এসে ধরে ফেলে আমাকে ধরতে নিলেই অরা আপু আমায় ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিয়ে পালিয়ে যেতে বলে!
কিন্তু আমি পালানোর বদলে আপুর কাছে যেতে নিলে তিনি রেগে বলেন,,,
‘ দোল যা আপি! ওরা ভালোনা। তোকে ছাড়বেনা। ‘
‘ কিন্তু আপি তুমি আসবেনা? ‘
ফাহিম ততক্ষণে অরা আপুর ওড়না টেনে ধরেছে। আরেক ছেলেকে নির্দেশ দেয় আমায় ধরতে। বিশ্রি হেসে বলে,,,
‘ ঐ যা, ঐ ছোট টারেও ধইরা আন। দুইটাই সেই দেখতে। ‘
তৎক্ষনাৎ অরা আপু চিল্লিয়ে বলল,,,
‘ দোল যা তুই, আমার টেনশন করিস না যা বোন। ‘
দ্বিতীয় ছেলেটি কাছাকাছি চলে আসতেই আমি কান্না করতে করতে রাস্তায় চলে আসি। আসার পথে আপুর চিৎকার শুনতে পেয়েছিলাম। আর্তনাদ ভরা চিৎকার!
সেইদিন অরা আপু চাইলে আমায় ফেলে চলে যেতে পারতেন। সেই বিপদে ফেলে! তাহলে হয়তো তিনি বেঁচে যেতেন। কিন্তু আপু তা করেননি।
সেদিনের ঘটনার পরই আপু চলে যায় বিদেশে!
ভাবনার গহীনে অবস্থান কালীন দরজায় নক পড়ে! আমি চট জলদি চোখ মুছে পিছু ফিরে দেখি আম্মু দাড়িয়ে!
আম্মু বলল,,,
‘ কিরে? বেলকনিতে দাড়িয়ে আছিস কেনো?ঠান্ডা লাগবে তো।ভেতরে আয়! ‘
আমি রুমের ভেতরে গিয়ে কাঁচের দরজাটা টেনে দিই! আম্মু আমার কাছে এসে বলল,,,
‘ এমন দেখাচ্ছে কেনো?মন খারাপ? কিছু হয়েছে? ‘
আমি মলিন হেসে বলি,,,
‘ কিছু হয়নি! এমনি ভালো লাগছে না। ও বাড়ির সবাইকে মিস করছি এই যা..! ‘
‘ তো আসতে বলেছিলো কে?ওখানে থেকে কি মেডিকেল এর কোচিং করা যেতোনা?’
আমি কথা কাটানোর জন্য বলি,,,
‘ হটাৎ আমার রুমে এলে যে?কিছু বলবে?’
‘ হ্যা, খেতে আয়! ‘
‘ আসছি তুমি যাও! ‘
আম্মু চলে যেতেই দীর্ঘশ্বাস ছাড়ি! ফ্রেশ হয়ে এসে পা বাড়াই নিচে যাওয়ার উদ্দেশ্যে!
।
ডাইনিং টেবিলে মাথা নিচু করে ভাত নড়াচড়া করছি। আমার বাম পাশেই পূর্ব ভাইয়া বসে! নিঃশব্দে চুপচাপ খাচ্ছেন আবার মাঝেমধ্যে ভাইয়ার সাথে টুকটাক কথা বলছেন!
তবে আমার যেনে ভাত গলা দিয়ে নামছেই না। বারবার হারানোর ভয়টা এসে ঝাপটে ধরছে! কষ্টগুলো দমকা হাওয়া রূপে বারংবার ছুয়ে দিচ্ছে আমায়।
‘ দোল খাচ্ছো না কেনো?’
বাবার কন্ঠস্বর শুনে হুশ ফিরে আমার!
হকচকিয়ে তার দিকে তাকাতেই খেয়াল হয় সবাই আমার দিকেই তাকিয়ে। আমি উত্তর দিবো তার আগেই ভাইয়া বলল,,,
‘ খাবার কি ভালো লাগছে না পিচ্চু?অন্য কিছু ওর্ডার করবো?’
আমি ঘাড় বাকিয়ে অসম্মতি জানাই! মুখে বলি,,,
‘ কিছু ওর্ডার করা লাগবেনা ভাইয়া! ‘
‘তাহলে খাচ্ছিস না কেনো?’
‘ কই খাচ্ছি তো, ‘
ভাইয়া কিছুক্ষন ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে থেকে খাওয়ায় মন দেয়। সবাই নিজ কাজে মনোযোগী হওয়ার পরও পূর্ব ভাইয়া এখনো আমার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। আমি ইতস্তত বোধ করে এদিক ওদিক তাকিয়ে খাওয়াতে মন দেই!
খাওয়ার মাঝে মনে হলো আমার পা কেও তার পা দিয়ে আঁকড়ে ধরেছে! সাথে সাথে খাবার বন্ধ করে মাথা উঁচু করে তাকাই।
পূর্ব ভাইয়া মিটিমিটি হাসছেন! তা দেখে বুঝতে বেগ পেতে হলোনা কাজটা কার?
আমি পা ছাড়িয়ে ওপর পা দিয়ে পূর্ব ভাইয়ার পায়ে গুতো দেই! সাথে সাথে তিনি কেশে উঠলেন! আম্মু দৌড়ে এসে পানি এগিয়ে দেন। ভাইয়া বসা থেকে উঠে তার পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে থাকে!
আম্মু বলল,,,
‘ কি হলো বাবা?’
‘ কিছুনা ছোট চাচি। আমি ঠিক আছি। আপনি খেতে বসুন’
পূর্ব ভাইয়া চোয়াল শক্ত করে আমার দিকে তাকান। আমি সেই দৃষ্টি উপেক্ষা করে খাওয়াতে মন দেই। মনে মনে শান্তির জোয়ার বইছে। যাক কিছুতে তো তাকে রিটার্ন দিতে পারলাম!
।
রাত দুইটা!
আমি ছাঁদের দরজাটা চাপিয়ে রেখে ভেতরে চলে যাই। বুকের ভেতর হৃদস্পন্দন এর স্পন্দিত করার মাত্রাটা বাড়া গিয়েছে বোধহয়!
তখনকার ঘটনার জন্য পূর্ব ভাই এখন শাস্তি না দিয়ে বসেন! আল্লাহ রক্ষা করো!
কিছুদূর গিয়ে থেমে যেতেই টের পাই কেও আমায় পেছন থেকে জরীয়ে ধরে আমার কাঁধে থুতনি রাখে! কেঁপে উঠতেই কেমন অনুভূত হয়! হাতদুটো সরাতে নিলেই পেছন থেকে বলল,,,
‘ হুসসস! নড়বিনা একদম।’
নেশাক্তময় কন্ঠস্বরটা আমায় থমকে দেয় মূর্হতেই। আহা..কি কন্ঠস্বর! এমন কন্ঠস্বর মানুষেরও হয়?
চলবে?