স্নিগ্ধ প্রেমের সম্মোহন পর্ব-২৭+২৮

0
1955

#স্নিগ্ধ_প্রেমের_সম্মোহন
পর্ব-২৭
#লেখনীতে- সাদিয়া মেহরুজ দোলা

অরা হেঁচকি তুলে কাঁদছে। কাঁদার ফলে ওর চোখের সাদা অংশটুকু রক্তিম বর্ন ধারণ করেছে। ফোন বেজে উঠতেই কান্না থামায় বহুকষ্টে সে। অতঃপর ফোন রিসিভ করে বলল,

-‘ হ্যালো কে?’

-‘ আমি! ফায়াজ আবরার পূর্ব। ছাঁদে এসো।’

অরা কেঁপে উঠলো যেনো। জোরপূর্বক গলা দিয়ে শব্দ বের করে বলল, ‘আসছি।’
কথাটা বলেই সে ফোন কেটে দেয়। ওয়াশরুমে গিয়ে
পানি দিয়ে চোখমুখ ধুয়ে নেয় ভালোভাবে। নয়তো পূর্ব যদি বুঝতে পারে সে কেঁদেছে তাহলে কুরুক্ষেত্র বাধিয়ে ফেলবে।

অরা চট জলদি চলে যায় ছাঁদে।
ছাঁদের কর্নারের দিকে তাকাতেই নজরে আসে কারো প্রতিচ্ছবি। অন্ধকারে তার চেহারা না দেখা গেলেও অরা বুঝতে পারে সে পূর্ব!

পূর্বের পাশ ঘেঁষে দাঁড়ায় অরা। পূর্ব তখন মনের সুখে আকাশ পানে সিগারেটের বিষাক্ত ধোঁয়া উড়াতে ব্যাস্ত ক্ষন পালন করছে। অরার উপস্থিতি টের পেয়ে সে গম্ভীর কন্ঠে বলল,

-‘ ইনজেকশন দিয়েছো?’

-‘ হ্যা।’
দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল অরা।

-‘ দুইটা নাকি তিনটা?’

-‘ দুইটা আপাতত। তিনটা একসাথে দিলে অসুবিধা হবে অনেক। ‘

পূর্ব ফের ব্যাস্ত হয়ে পড়ে সিগারেট এর মাঝে। চোখদুটো যেনো জ্বলজ্বল করছে। আঁধারে আশপাশ ছেয়ে থাকলেও অরা ঠিকই দেখতে পায় সেই জ্বলজ্বল চোখদুটো। বুকে মোচড় দিয়ে ওঠে তার। নিজেকে সামলাতে না পারে অরা কেঁদে দিয়ে বলল,

-‘ এমনটা না করলে হয়না পূর্ব? দোলের তো কোনো দোষই নেই। মাঝখান থেকে এই মেয়েটা কেনো কষ্ট পাবে?’

পূর্ব হাতের সিগারেট টা ফেলে দেয়। পায়ের তলায় রেখে পিষে ফেলে একদম। ধরা কন্ঠে পূর্ব বলল,

-‘ এমন কিছু সময় আছে যেখানে আমাদের দোষ না থাকা সত্বেও আমাদের শাস্তি ভোগ করতে হয়। দোলার ক্ষেত্রেও তাই। ‘

অরা এবার পূর্ণ দৃষ্টি দেয় পূর্বের দিকে। পর্যবেক্ষণ করার পর সে বলল,

-‘ দোলকে ভালোবাসো?’

-‘ জানিনা।’
গম্ভীর কন্ঠে উত্তর দেয় পূর্ব।
পরিশেষে দ্রুত পায়ে ছাঁদ থেকে নেমে চলে যায়। অরা সেদিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। কিছু পরিস্থিতি আমাদের জীবনকে নরকে পরিণত করে। নরকের যন্ত্রনায় আমাদের জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ভস্ম করে দেয়। সেই যন্ত্রণার দাগ কখনো মুছে যায়না। কিছু কালো সৃতি হিসেবে তারা আমাদের চারপাশে বিচরণ করে।
অরা আর পূর্বের ক্ষেত্রেও হয়তো তাই।

ভোরবেলার হটাৎ করে ঘুম ভেঙে যায় আমার।তীব্র মাথা ব্যাথায় শ্বাস আটকে আসার উপক্রম। মাথা বালিশ থেকে তুলতেই চোখদুটো মার্বেল মতো গোল গোল হয়ে যায়। বালিশে রক্ত! বেশ খানিকটা। রক্ত আসলো কোথা থেকে?

কানের কাছটায় ভেজা অনুভূত হতেই সেখানে স্পর্শ করি। হাতটা চোখের সামনে আনতেই দৃশ্যমান হয় রক্তাক্ত হাত। কান দিয়ে রক্ত পড়ছে। মাথা আউলিয়ে যায় ক্ষনেই। বমি বমি ভাব আসাতে দৌড়ে ওয়াশরুমে চলে যাই। গলগল করে রক্ত বমি করি । শরীর নিস্তেজ হয়ে এসে ওয়াশরুমের ফ্লোরে বসে পড়ে। রক্তবমি, রক্ত কান দিয়ে কেনোই বা পড়ছে? তা ভাবার মতো সময় হলোনা যেনো। চক্ষুযুগল বন্ধ করে ফ্লোরে মাথাটা বেশ জোরেসোরে পড়ে যায়। জ্ঞান হারানোর আগে পূর্ব ভাইয়ার চেহারাটা মুখের সামনে ভেসে ওঠে!

সময়ের ব্যাবধানে জ্ঞান ফিরে আসতেই নিজেকে বেডে পাই। মাথা ধরে উঠে বসতেই ব্যালকনীতে কারো ছায়া দেখতে পেলাম। কেও দাড়িয়ে আছে! পূর্ব ভাই? তড়িৎ গতীতে বেড থেকে নামতে গিয়ে হোঁচট খেয়ে পড়ে যেতে নিলেই সামলে নিয়ে ব্যালকনীতে চলে যাই।

বহু কষ্টে শব্দগুচ্ছো গুলো এক করে নিম্নকন্ঠে বলি,

-‘ প..পূর্ব ভাই?’

তিনি পিছে ঘুরে দাঁড়ান। হ্যা পূর্ব ভাই ইনি। কেমন থমথমে চাহনি নিয়ে তাকিয়ে আছেন। আমি ঠোঁটের কোনায় হাসি টেনে সামনে এগোতেই ফের পড়ে যাই। অদ্ভুত ব্যাপার টা হচ্ছে পূর্ব ভাইয়া একবারও এগিয়ে এসে আমায় ধরলেন না। অবিশ্বাস্য চাহনি নিয়ে তার পানে তাকাই। তার দৃষ্টি স্বাভাবিক। অন্য দিকে মুখ ঘুরিয়ে নেন তিনি!

তা দেখে বুকে হু হু করে ওঠে। সোফা ধরে উঠতে নিবো শক্তি পাচ্ছি না। এতোটা দূর্বল লাগছে কেনো?ফের পূর্ব ভাইয়াকে উদ্দেশ্য করে বলি,

-‘ পূর্ব ভাইয়া আমি উঠতে পারছিনা। আপনার হাত একটু দিন?’

পূর্ব ভাইয়া এগিয়ে আসলেন। চিন্তা আর ভয়ে ছেয়ে থাকা মন গহীনে যেনো আলোর দিশা এলো। তিনি এগিয়ে এসে আমার হাত ধরে হেঁচকা টান দিয়ে উঠিয়ে নেন। অতঃপর দ্রুত পায়ে পিছে সরে যান। চোখে আমার পানিতে টুইটুম্বুর। হেচকা টান দেয়ায় হাতে প্রচন্ড ব্যাথা পেয়েছি।
আমি স্বাভাবিক হয়ে বলি,

-‘ আপনি আমার রুমে? ‘

তিনি বললেন,

-‘ ওয়াশরুমে ওভাবে পড়ে ছিলি কেনো? ‘

-‘ জানিনা। হটাৎ মাথা ঘুরে পড়ে যাই। তারপর আর কিছু মনে নেই। ‘

-‘ খাওয়া দাওয়া ঠিকমতো করিস না কেনো? বেশি খারাপ লাগছে? ডাক্তার ডাকবো?’

আমি আলত হেসে বলি,

-‘ না লাগবেনা। ঠিক আছি আমি।’

আমার উত্তর শুনে তিনি আর এক মিনিট ও দাঁড়ালেন না। গটগট পায়ে চলে যেতে নিলেই আমি পিছু ডেকে বলি,

-‘ আপনি ঠিক আছেন পূর্ব ভাইয়া?’

-‘ তো আমাকে কি তোর অস্বাভাবিক বা পাগল টাইপ মনে হচ্ছে রিসেন্ট? ‘
ধমকের সুরে বললেন তিনি।
আমি অশ্রুসিক্ত নয়নে তাকিয়ে থাকাকালীন ধীর কন্ঠে বলি,

-‘ নাহ আমার কথার মানে সেটা ছিলোনা। ‘

-‘ তো?কি মিন করেছিস তোর কথার? ডিজগাস্টিং! সময় অপচয় হলো তোর সাথে কথা বলে। ‘

চলে যান পূর্ব ভাইয়া। আমি অবাক নয়নে তাকিয়ে আছে। আচ্ছা ইনি কি সেই পূর্ব ভাইয়া? যে আমার সাথে কখনো উঁচু গলায় কথা বলতেন না? ধমক দিতেন না? আজ হটাৎ তার কি হলো?

বেলকনির দেয়াল ঠেস দিয়ে বসে অনিচ্ছা সত্বেও কেঁদে দেই। কি হলো তার?এমন ব্যাবহার তো পূর্ব ভাইয়া আমার সাথে আগে কখনো করেননি। তবে আজ?আজ এসব? এমন উদ্ভট আচরণ করলেন কেনো?

আজ অরিন আর অভ্র ভাইয়ার হলুদ। আর কাল বিয়ে হবে। অরিনকে আমাদের বাসায় আনা হয়েছে। এখান থেকে হলুদ লাগিয়ে পরবর্তী দিন বিয়ের জন্য বুক করা হোটেলে নিয়ে যাবে।

সবাই ব্যাস্ত হলুদ সন্ধ্যার আয়োজনে। তবে আমি চুপচাপ বসে তাদের কাজ দেখছি। বিষিয়ে আছে মন গহীন। সকালের পূর্ব ভাইয়ার করা ব্যাবহারের কথা মনে পড়তেই শুধু কান্না পায়। তিনি এমন করলেন কেনো?
রক্তবমি বা অসুস্থতার কথা কাওকেই জানাইনি। আম্মু কয়েকবার সন্দেহ করেছিলো আমার কিছু হয়েছে কিন্তু আম্মুকে মিথ্যা বলে কাটিয়ে নিয়েছি তার সন্দেহ। অন্যদিন হলে হয়তো বাসার সবাই এক মূর্হতেই বুঝে যেতো আমার অসুস্থতার কথা কিন্তু আজ কেও বুঝতে পারেননি। বিয়ে এবং হলুদ! এসব নিয়ে সবাই ব্যাস্ত খুব।

আবরার ম্যানশনে থেকে আসার সময় পূর্ব ভাইয়া একেবারের জন্য আমার সামনে আসেননি। একটু কথা বলেননি। যেতে বাঁধা দেননি। এসব যেনো মনে শুধু কষ্ট দিচ্ছে। স্বাভাবিক থাকতে দিচ্ছে না আমায়।

কাঁধে কারো স্পর্শ পেতে পিছে ঘুরে তাকাই। অরিন দাড়িয়ে। ওর চোখেমুখে মলিনতা ভাব। হয়তো বিয়ে হচ্ছে তাই দেখে। বাবা মার থেকে দূরে চলে যেতে তাই ভেবে। অভ্র ভাই বিয়ের পর অরিনকে কানাডা নিয়ে যাবে।

অরিন আমার পাশে বসে পড়লো। চোখদুটো ওর জানান দিচ্ছে তারা কিছু বলতে চায়, অনেক কিছু। অরিন বলল,

-‘ এভাবে মন খারাপ করে বসে আছিস যে?রেডি হবি না?ফাংশন শুরু হবে একটু পর।’

হুট করে কি হলো জানা নেই। অরিনকে জরীয়ে ধরে হু হু করে কেঁদে দেই। কান্নারত কন্ঠে পূর্ব ভাইয়ার করা বিভেবের বর্ণনা দেই ওকে। তা শুনে মলিন হাসে অরিন। ও বলল,

-‘ আমাদের জীবনটা উপন্যাস নারে দোলপাখি। সবসময় যে সুখ থাকবে তা কিন্তু নয়। আমাদের অগোচরে অনেক কিছুই হয় প্রতিনিয়ত, অনেক বড় কিছু। ইউ নো? মাঝেমধ্যে প্রিয়জনকে কাছে পেতে হলে কষ্ট পেতে হয় অনেক। তোর ক্ষেত্রেও হয়তো তাই। তবে একটা জিনিস মনে রাখবি যে তোকে কষ্ট দিয়েছে সে নিজেও ভালো নেইরে। সে ভালো নেই। কষ্টে কষ্টে জর্জরিত হয়ে আধমরা হয়ে চলাফেরা করছে সে। ‘

অরিনের কথায় কিছুটা আয়ত্তে করতে পারলেও শেষের কথাগুলো বুঝলাম না।পূর্ব ভাই কষ্টে আছেন?তাহলে আমাকে কষ্ট দেয়ার কারণ? আমি প্রশ্নোসূচক দৃষ্টিতে তাকাতেই অরিন উঠে দাড়ায়, যেতে যেতে বলল,

-‘ সব প্রশ্নের উত্তর একসাথে দেয়া সম্ভব না। অপেক্ষা কর। তবে বিশ্বাস হারাস না। সে কষ্ট পাবে।’

অরিন চলে যেতেই শত চিন্তা ফের ঝেকে ধরে আমায়। তবে উত্তর নেই!

ফাংশন এর কার্যক্রম শেষ করে দ্রুত রুমে এসে দরজা বন্ধ করে দেই। যন্ত্রণা হচ্ছে! শরীর নিস্তেজ হয়ে আসছে বারংবার।

রুমটা পুরো অন্ধকার। লাইট জ্বালাতে নিলেই কেও আমায় ঝাপটে ধরে। চেঁচাতে নিয়ে থেমে যাই। সু পরিচিত ঘ্রাণ এসে নাকি বাড়ি খেতেই শিহরণ বয়ে যায় শরীরে। পূর্ব ভাইয়া ইনি নিশ্চিত!
আমি কিছু বলতে নেবো তার আগে তিনি আমায় ছেড়ে হাতদুটো চেপে ধরেন শক্ত করে। আলতোভাবে চুমু খান। কপালে নিজের ওষ্ঠদ্বয়ের ছোঁয়া সম্পূর্ণ করে কোলে তুলে নেন আমায়। চুপ থাকার এক পর্যায়ে আমি বলি,

-‘ এসব কি পূর্ব ভাইয়া? চোরের মতো আমার রুমে কি করছেন? নিচে নামান আমায় আর চলে যান এখান থেকে।’

তিনি আমায় বেডে শুইয়ে দেন। তার দুহাত দিয়ে আমায় শক্ত করে জরীয়ে ধরে মিহি কন্ঠে বললেন,

-‘ কথা বলিস না এখন। একটু ঘুমাতে দে? লাইট অন করবিনা ভুলেও। তাহলে আমি আর তোর কাছে থাকতে পারবোনা। ‘

আমি চমকে উঠি। কথার আগামাথ বুঝতে না পেরে কিছু বলার জন্য উদ্যক্ত হতেই কানে এসে বাড়ি খায় কারো ভারী নিঃশ্বাস এর শব্দ! এর মানে তিনি ঘুমিয়ে গিয়েছেন?এতো জলদি?

চলবে….

_____________________________

রি- চেইক করা হয়নি। ভুলত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন।

#স্নিগ্ধ_প্রেমের_সম্মোহন
পর্ব-২৮
#লেখনীতে- সাদিয়া মেহরুজ দোলা

বিয়ে বাড়িতে হটাৎ কারো চিল্লানোর শব্দে থেমে যায় সবার কাজ কর্ম। গালে হাত দিয়ে অশ্রুসিক্ত নয়নে তাকিয়ে আছি পূর্ব ভাইয়ার দিকে। তিনি রাগে ফোসফাস করছেন এক প্রকার। থাপ্পড়ের কারণে গালে নিশ্চিত তার পাঁচটা আঙ্গুলের ছাপ পড়ে গিয়েছে।

আম্মু দৌড়ে এসে আমায় আগলে নেয়। বাবা পাশে দাড়িয়ে পূর্ব ভাইয়াকে ঝাঁঝালো কন্ঠে জিজ্ঞেস করলেন,

-‘ এসব কি পূর্ব? তুমি আমার মেয়েকে থাপ্পড় মারলে কেনো? আগের মতো কাহিনি শুরু করেছো? ওকে মারার বা এভাবে অপমান করার কারণটা কি?’

বাবা বেশ রেগে আছেন। তাই হয়তো আজ প্রথমবারের মতো পূর্ব ভাইয়ার সাথে এমন উঁচু গলায় শাসিয়ে কথা বলছেন। বাবা কখনোই পূর্ব ভাইয়াকে ধমকে কথা বলেন না। পূর্ব ভাইয়া তার কাছে খুব পছন্দের একজন ব্যাক্তি।

বড় চাচু আর চাচি এগিয়ে আসলেন। তাদের চোখমুখেও রাগ বিদ্যমান। চাচু বললেন,

-‘ পূর্ব, সাহস কি দিনদিন তোমার তরতর করে বাড়ছে? দোলের গায়ে আমরা একটা আঁচড় ও দেইনা আর তুমি কিনা ওকে থাপ্পড় মেরে দিলে?কি কারণে?উত্তর দাও। ‘

কারো কথা বা প্রশ্ন আমার কানে আসছে না। আমি এক ধ্যানে তাকিয়ে পূর্ব ভাইয়ার দিকে। চোখ দিয়ে অশ্রুপড়া বন্ধ হয়নি। অনবরত চলছে…

বিয়ে মহলে প্রবেশ করার পর আমি সর্বপ্রথম পূর্ব ভাইয়ার খোঁজে চারিপাশে তাকাচ্ছিলাম। হটাৎ কারো সাথে ধাক্কা লাগায় তাল সামলাতে না পেরে মাটিতে পড়ে যাই। মাথা ঘুরিয়ে পিছে তাকিয়ে দেখি পূর্ব ভাইয়াকে। তার হাতে কিছু কাগজ ছিলো। যা আমার ধাক্কা লাগার ফলে মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছে। আমি হাতে ভর দিয়ে উঠে বসে পূর্ব ভাইয়াকে কিছু বলতে নেবো তখনই সে আমার গাল ঠাস করে থাপ্পড় মেরে দেন।

থাপ্পড় খাওয়ার পর হতবিহ্বল হয়ে পড়েছিলাম আমি। নির্বাক চাহনি দিয়ে তার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকাই। ধরা কন্ঠে বলি,

-‘ প…পূর্ব ভা..ই? কিছু হয়েছে? আ..আপনি আ..মায় থাপ্পড় মা..মারলেন কেনো?’

পূর্ব ভাইয়া বাজখাঁই কন্ঠে বললেন,

-‘ ডাফার গার্ল! চোখ কই থাকে তোর?দেখে চলতে পারিস না? এই কাগজগুলো কতোটা গুরুত্বপূর্ণ তুই জানিস? সব তোর কারনে মাটিতে পড়ে নষ্ট হয়ে গেলো। ‘

পূর্ব ভাইয়ার কথায় আমি ফ্লোরের দিকে তাকাই। ফ্লোর টাইল’স করা। শুভ্র রঙের স্বচ্ছ টাইল’স। একদম পরিস্কার চারিপাশ। কাগজগুলো একদম ঝকঝকে রয়েছে। ময়লা নেই আশেপাশে। তাহলে কাগজ ময়লা কোথায় হলো?

আমি মাথা তুলে কান্না দমন করে বলি,

-‘ পূর্ব ভাইয়া এখানে তো কোনো ময়লা আবর্জনা নেই। কাগজ ময়লা হলো কিভাবে আর কোথায়? কাগজগুলো তো ঠিকই আছে। ‘

কথাটা বলার পরপরই পুনরায় বলিষ্ঠ হাতের চড় পড়ে আমার গালে। গালদুটো যেনো জ্বলে যাচ্ছে। চোখদুটো থেকে অবাধ্য পানি নিজ নিয়মে গড়াতে থাকে। তিনি ফের ঝাঁঝ মেশানো কন্ঠে বললেন,

-‘ বড়দের মুখে মুখে তর্ক করিস? লজ্জা করেনা? কাগজগুলো তুলে হাতে দে আমার। ‘

পূর্ব ভাইয়ার কথ্য সম্পূর্ণ হওয়ার পরপরই আম্মু আব্বু চলে আসে। সাথে বেশ কয়েক জোরা চক্ষু তো আমাদের অনেক আগে থেকেই লক্ষ্য করছে। কেও কেও তামাশা ভেবে মিটমিটিয়ে হাসছে। লজ্জায় মাথা নিচু করে কান্না করে দেই। কারণ তাকে কিছু বলার সাহস, মন ইচ্ছে কিছুই নেই আমার!

বড় চাচুর কথায় পূর্ব ভাইয়া তারদিকে তাকালেন। তার চোখদুটো রক্তিম আকার ধারণ করেছে। তিনি হটাৎ কিছু না বলেই চলে যান সেখান থেকে। আমি নিজেও চক্ষু লজ্জায় সেখান থেকে দৌড়ে চলে যাই। যাওয়ার আগে আম্মুকে বলে গিয়েছি বিয়েটা যেনো থেমে না থাকে। আমার জন্য টেনশন করার দরকার নেই। আমি বাসায় যাচ্ছি।

আম্মুকে বোঝাতে বেশ বেগ পেতে হয়। কারণ তিনি আমায় ছাড়তে চাইছিলেন না। কিন্তু আমি জোর গলায় বলার পর তিনি রাজি হয়ে যান।

গাড়ি নিয়ে উল্টো পাল্টা ড্রাইভ করে ঢাকার বাহিরে চলে আসি। এটা মূলত মুন্সিগন্জ! এক নদীর কিনারা। গাড়ি থেকে নেমে গিয়ে এলোমেলো পায়ে হেঁটে সামনে চলে যাই। পা দুটো বেগতিক ভাবে কাঁপছে।

নদীর পাশে ধপ করে বসে পড়ে কেঁদে দেই। চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে দূর্বল হয়ে পড়ে শরীর। ফের রক্তবমি হয়। দূর্বল শরীরটা ঘাসের মাঝে এলিয়ে দিয়ে জোরে জোরে শ্বাস নিয়ে চোখবন্ধ করে ফেলি!

পূর্ব ভাইয়াকে আচানক ঘৃণা করতে মন চাইছে। মন গহীন থেকে তারজন্য বরাদ্দকৃত জায়গাটুকুকে ধ্বংস করে দিতে ইচ্ছে করছে। এ কোন পূর্ব ভাইয়া? এতোটা কঠিন আচরণ? তার ওপর আজ গায়ে হাত তুললেন? তবে কি আমি মানুষ চিনতে ভুল করলাম? ভুল করলাম পূর্ব ভাইয়াকে পছন্দ করে? মনে মনে প্রশ্নগুলো আওড়াতে যখন আমি ব্যাস্ত তখন কারো পায়ের শব্দ ভেসে আসে কর্ণকুহরে। শোয়া থেকে উঠে বসে সামনে তাকাতেই খেয়াল হয় একজন ব্যাক্তিকে!

সে কালো রঙের একটা লম্বা কোর্ট, মাথায় হ্যাট আর সার্জিক্যাল মাস্ক পড়ে আমার থেকে তিন ফুট দূরে দাড়িয়ে আছেন। কিছুটা ভয় ঝেকে ধরে মনে। দাঁড়াতে নিবো তার আগেই সেই ব্যাক্তি তড়িৎ গতীতে এগিয়ে এসে আমায় জরীয়ে ধরেন। আমি থ!

টের পাই ঘাড়ে তরল জাতীয় কিছু পড়ছে। গুমড়ে কান্নার শব্দ ভেসে আসাতে মনে হলো ব্যাক্তিটি কাঁদছে। সে বলল,

-‘ আমায় মাফ করে দে দোলপরী! মাফ করে দে। তোর গায়ে আমি হাত তুলতে চাইনি। তোকে আঘাত করার সময় পাথর হয়ে গিয়েছিলাম। আমার মন, হৃদয় সবকিছু স্তব্ধতা ধারণ করেছিলো। হৃদস্পন্দন থেমে গিয়েছিলো মূর্হতেই। তোকে আঘাত যেই হাতটি দ্বারা আঘাত করেছি সে হাত ক্ষতবিক্ষত করে দিয়েছি। ‘

পূর্ব ভাইয়ার কথায় আমি সর্বপ্রথম তার ডান হাতের দিকে তাকাই। কারণ এই হাতটি দিয়েই তিনি আজ সকালে আমায় পরাপর দুটো থাপ্পড় দিয়েছেন। হাতটিতে ব্যান্ডেজ করা। তবুও রক্তরা যেনো বাঁধা মানছে না। সাদা ব্যান্ডেজটায় পুরো অংশটাই লাল রক্তে চুপচুপ। আমার হটাৎ রাগ উঠলো। তাকে সজোরে ধাক্কা মেরে ঠাস ঠাস করে একগালেই তিনটে থাপ্পড় মেরে দেই। রাগে গা থরথর করে কাঁপছে আমার। এমন উদ্ভট ব্যাবহারের মানে কি? কষ্ট দিবেন আবার আগলে নিবেন?হোয়াই?

আমি রাগান্বিত কন্ঠে বলি,

-‘ আপনি পাগল হয়ে গিয়েছেন পূর্ব ভাইয়া। সময় থাকতে সাইক্রিয়েটিষ্ট দেখান। নয়তো পরে পাগল হয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরতে হবে। ‘

তার হাতে গালে বহমান। দু তিন মিনিট আমার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে নিজের মুখে এঁটে সেঁটে থাকা সার্জিক্যাল মাস্কটা টেনে খুলে ফেললেন। অদ্ভুত ব্যাপারটা হচ্ছে তার ঠোঁটের কোনায় হাসি। অমায়িক হাসি!

পূর্ব ভাইয়া আমার হাতের কনুই ধরে তার সামনে এগিয়ে নিয়ে যান। সামনে পড়ে থাকা অবাধ্য চুলগুলোকে কানের পিঠে গুজে দিয়ে ধরা কন্ঠে বললেন,

-‘ পাগল তো সেই কবেই আমি হয়েছি স্নিগ্ধপরী! তোমার স্নিগ্ধময় প্রেমের সম্মোহনে আমি উন্মাদ হয়েছি। নিজের উচ্ছৃঙ্খল জীবনের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে এনেছি এই তোমার কারণে। তোমায় আগলে রাখতে কতরাত দু চোখের পাতা এক করেনি হিসেব নেই। তোমাকে হারানোর ভয়ে আমি সবসময় তটস্থ হয়ে থাকতাম। তোমার থেকে দূরে সরে হিংস্র হয়ে যেতাম আবার তোমার ছোঁয়া পেলে হয়ে যেতাম অমানুষ থেকে মানুষ। ‘

এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে দিয়ে তৃপ্তিকর শ্বাস ছাড়েন তিনি। চোখে তার পানির রেশ! কিছু বলতে চাইছে চোখদুটি। অনেক কিছু। তবে কোনো বাঁধা পেয়ে সে কিছুই বলতে পারছে না।
তরতর করে বেড়ে ওঠা রাগগুলো ক্ষনের মাঝে যেনো নিভে গেলো তার এই মোহনীয় কন্ঠের হৃদস্পন্দন থামিয়ে দেয়া কথাতে। এতোটা আবেগ মিশিয়ে কেও কথা বলতে পারে?

পূর্ব ভাইয়া আমার হাত ছেড়ে দেন। ঘাসের ওপর বসে পড়লেন। তিনি থমথমে কন্ঠে বলা শুরু করলেন,

-‘ ভালোবাসিস আমাকে?’

আচানক এমন প্রশ্নে আমি থতমত খেয়ে যাই। তবে তা বাহিরে প্রকাশ না করে দৃঢ় কন্ঠে বলি,

-‘ আপনাকে ভালোবাসতে যাবো কোন দুঃখে? আপনি তো একটা পাগল। মিনিটে মিনিটে গিরগিটীর মতো রূপ বদলান। কখনো আগলে নেন তো কখনো ছুড়ে ফেলেন। আপনাকে ভালো যদি বাসি তাহলে জীবন নরকে পরিণত হবে। ‘

পূর্ব ভাইয়া অসহায় চোখে বললেন,

-‘ ভালোবাসিস না?’

-‘ একদমই না। ‘
কাঠ কাঠ কন্ঠে জবাব দেই।

-‘ তাহলে এতোক্ষণ এভাবে চিৎকার করে কাঁদছিলি কেনো? আমি ইগ্নোর করলে এভাবে কষ্ট পাস কেনো? কাঁদিস কেনো?’

ভড়কে যাই ফের একবার। ভ্রু দুটি কুঁচকে আছে সন্দেহের কারণে। কেমন জানি লাগছে তার ব্যাবহার, কথা বার্তার ধরণ! হুট করেই মনে হলো। এতক্ষণ ভালো করে পূর্ব ভাইয়াকে খেয়াল করিনি।

আমায় নিশ্চুপ দেখে পূর্ব ভাইয়া নিজের জায়গা থেকে উঠে আসেন। আমার সন্নিকটে এসে একহাতে টেনে নিয়ে চট জলদি একটা আঙ্গুলে নিজের ওষ্ঠদ্বয়ের ছোঁয়া দেন। কিছুটা কাছে এসে মাতাল কন্ঠে বললেন,

-‘ কি হলো বল। ‘

বিদঘুটে এক বিশ্রি গন্ধ এসে নাকে বাড়ি খায়। চোখমুখ কুঁচকে এসে দ্রুত সরে বসি। গন্ধটা কিসের হতে পারে তা বুঝতে আমার দু মিনিট লাগে।
স্ব- চকিত চোখে আমি পূর্ব ভাইয়ার দিকে দৃষ্টি দেই। তিনি ড্রাংক’ড? রাগে, দুঃখে পুনরায় দলা পাকিয়ে কান্না আসে। তারমানে এতক্ষণে তিনি যা বলছিলেন সবই নেশার ঘোরে? হায় মাবুদ! আমি ভেবেছিলাম হয়তোবা সরি বলতে এসেছেন।ক্ষমা চাইতে এসেছেন।কিন্তু তিনি আমায় ভুল প্রমানিত করে দিলেন। বুকভরা কষ্ট নিয়ে জরতা নেমে আসা পা দুটো নিয়ে এগোই সামনে। যাওয়ার আগে পূর্ব ভাইয়ার দিকে তাকিয়ে বলি,

-‘ আপনি খুব খারাপ একটা লোক পূর্ব ভাই। খুব খারাপ! কখনো মাফ করবোনা আপনাকে আমি। চলে যাবো অনেক দূরে। ‘

কথাটা বলে দৌড় লাগাই। যাওয়ার আগে দৃশ্যমান হয়েছিলো পূর্ব ভাইয়া দাঁড়াতে গিয়ে ঠাস করে নিচে পড়ে যান।আমি যাইনি একবারও তার কাছে। চোখ পানি নিয়ে দৌড়ে সেখান থেকে রোডে চলে আসি।

রোডে আসতেই দেখি একটা ছেলে এ্যাশ কালার গাড়ির সামনে দাড়িয়ে। বারবার ঘড়ি দেখছে। চিন্তায় ভ্রু কুঁচকায়। আমি আমার গাড়ির দিকে যাবো তখনই ছেলেটা আমার কাছে এসে বলল,

-‘ আসসালামু আলাইকুম ম্যাম। আমি ফুয়াদ, ফাজ স্যারের পিএ! ফাজ স্যার তো আপনার সাথে দেখা করতে গিয়েছিলেন। আপনি এখানে তাহলে তিনি কোথায়?’

ফাজ? এই ফাজ কে? পরক্ষণেই মনে হয় সেই দিনের কথা। তাহলে পূর্ব ভাইয়া ফাজ রূপে কি এসব কর্মকাণ্ড করেন? এসব খুন?
আমি আর বেশি ভাবলাব না। ধীর কন্ঠে বলি,

-‘ আপনার স্যার নদীর পাড়ে মাতাল হয়ে পড়ে আছে। নিয়ে যান তাকে বাসায়।পারলে তাকে সাইক্রিয়েটিষ্ট দেখাবেন। পাগল হয়ে গিয়েছেন তিনি। ‘

ফুয়াদ বোধহয় বেশ শক খেলো। চোখমুখে সেই ভাবটা উপচে পড়ছে। চমকিত কন্ঠে বলল,

-‘ ম্যাম কি বলছেন এসব? স্যার ড্রিংক করেছেন? মানে কিভাবে, তিনি তো…’

ফুয়াদ নামক ছেলেটার কথা অর্ধসম্পূর্ণ রেখে গাড়ি স্টার্ট দেই। কিছু ভালো লাগছেনা। ইচ্ছে করছে পূর্ব ভাইয়াকে আরো চার পাঁচটা থাপ্পড় দিতে। আহ্! প্রেম, ভালোবাসায় এতো পেইন কেনো? হুয়াই?

চলবে….