স্নিগ্ধ প্রেমের সম্মোহন পর্ব-২৯+৩০

0
1918

#স্নিগ্ধ_প্রেমের_সম্মোহন
পর্ব-২৯
#লেখনীতে- সাদিয়া মেহরুজ দোলা

সন্ধ্যার বিরাজমান। আকাশে নীলাভ আভা। সূর্য বিদায় নিয়েছে খানিকক্ষণ আগেই। বিকেল থেকে ড্রাইভ করতে করতে সন্ধ্যায় বাসায় এসে পৌঁছাই। আবরার মঞ্জিলে যায়নি। বিয়ে হয়তো এতক্ষণে শেষ হয়ে গিয়েছে। নিজের বোনের বিয়েতে শান্তিমতো থাকতে পারলাম না। সব হয়েছে পূর্ব ভাইয়ার জন্য। একমাত্র তিনিই এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী।

এলোমেলো পায়ে সিঁড়ি ডিঙিয়ে উঠে রুমে চলে আসি। দৃষ্টি দেই সেই হাতটায় যে হাত দিয়ে কিছু সময় আগে পূর্ব ভাইয়াকে একাধারে তিনটি থাপ্পড় মেরে এসেছি। কান্না পায় হটাৎ, প্রচুর! হাতটাকে কেটে টুকরো টুকরো করে ফেলতে ইচ্ছে করছে। ইশ.. কেনো মারলাম তাকে? নিশ্চিত অনেক কষ্ট পেয়েছে। ব্যাথা পেয়েছে!

পরক্ষনেই মনে পড়ে সে তো মাতাল অবস্থায় ছিলো।নেশায় বুদ হয়ে। তাহলে তখন কি তার কোনো ফিলিং’স ছিলো?

কিছু ভাববার মতো সুযোগ আমার এই দূর্বল শরীরটা দিলো না।অতিরিক্ত মাথা ব্যাথা নিয়ে ধপ করে বিছানায় গা এলিয়ে দেই। ডাক্তার না দেখালেই নয়। তবে তার আগে এই দেশ ছাড়তে হবে দূরে কোথাও চলে যাবো। মাটিতে পুতে যাক মেডিকেলে পড়ার ইচ্ছে।

দুইদিন কেটে গিয়েছে। আজ অভ্র ভাইয়া অরিনকে নিয়ে কানাডা চলে যাবে। যেহেতু পূর্ব ভাইয়া বাংলাদেশে, কানাডায় তার কোম্পানির ক্ষতি হতে পারে। তাই পূর্ব ভাইয়া বাংলাদেশে যতদিন থাকবে ততদিন কানাডাতে পূর্ব ভাইয়ার কোম্পানি অভ্র ভাইয়া দেখবেন।

দুদিনে নিজেকে অনেকটা শক্ত করেছি। পূর্ব ভাইয়াকে সম্পূর্ণ ইগনোর লিষ্টে ফেলে রেখেছি। অদ্ভুত জনক ব্যাপার হচ্ছে এই দুইদিনে পূর্ব ভাইয়া একবারও আমার কাছে আসেননি। খোজ খবর নেননি। এমনকি এক পলক আমার দিকেও তাকাননি। তিনি এই দুইটা দিন অরা আপুর সাথে ছিলেন। অরা আপুকে বাহিরে নিয়ে যাওয়া, শপিং করিয়ে দেয়া, রেষ্টুরেন্টে ঘোরানো সব তিনি করেছেন।

এসব দেখে বাহির থেকে মনকে শক্ত করতে পারলেও ভেতর থেকে আমার অনুভূতিগুলো মৃত্য। আমি ভাবতাম হয়তোবা পূর্ব ভাইয়া আমায় ভালোবাসতেন। কিন্তু আমার ধারণাটা ছিলো সম্পূর্ণ ভুল!

-‘ আর কত কাঁদবি? কাঁদতে কাঁদতে মরে যেতে চাস?’

কারো জরানো কন্ঠস্বর শুনে পিছু ফিরে তাকাই। অরিন দাড়িয়ে মলিন মুখে। আমি মলিন হাসি দেই। ও এগিয়ে এসে বলল,

-‘ কাঁদিস না। খারাপ দিনগুলো আমাদের জীবনে বেশিক্ষণ স্থায়ী নারে দোলপাখি। ধৈর্য ধর। ‘

আমি মলিন কন্ঠে বলি,

-‘ চোখের সামনে যা হচ্ছে তা দেখেও ধৈর্য ধরতে বলছিস?’

-‘ তো কি বলবো? আর কিছু বলার আছে?তুই কি মুভ অন করতে পারবি বা চাচ্ছিস?’

-‘হু। আমি বাংলাদেশে আর থাকতে চাইনা।বাহিরে যাবো। ‘

অরিন থ! থমকানো দৃষ্টি দিয়ে তাকিয়ে আছে সে। অরিন বলল,

-‘ দোস্ত তুই পাগল? মাথা খারাপ হয়ে গেছে? তোর মেডিকেলে পড়ার স্বপ্ন চুড়মার হয়ে যাবে। পূর্ব ভাইয়াকে ভুলতে পারবি?চাচা চাচু কে ছেড়ে থাকতে পারবি? সবকিছু ছেড়ে আগাতে পারবি?’

আমি দীর্ঘশ্বাস ছাড়ি। নরম কন্ঠে বলি,

-‘ আমাদের জীবন প্রজাপতির মতোন অনেকটা। প্রজাপতি যেমন এক জায়গায় বেশিক্ষণ স্থির থাকেনা তেমনি আমাদের জীবনও এক জায়গায় স্থির থাকেনা। এগিয়ে যায় যেমনটা প্রজাপতির ক্ষেত্রে। বেশিক্ষণ এক জায়গায় থাকেনা।উড়ে বেড়ায়। মধুর সন্ধানে। আর আমরা সুখের সন্ধানে।’

অরিন অবিশ্বাস্য নজরে তাকিয়ে আছে। হয়ত আমি এতোটা শক্ত হয়েছি তা মেনে নিতে পারছে না। ছোট থেকেই নরম মনের শান্ত প্রকৃতির মানুষ আমি। বাবা ভাইরা আমায় খুব নাজুকভাবে বড় করেছে। কখনো কষ্ট কি বুঝিনি। তবে আজ যেখানে সবচেয়ে বড় কষ্ট পেয়েছি। সেখানে হটাৎ করে নিজেকে এতোটা শক্ত করলাম কিভাবে? তা আমি নিজেই মেনে নিতে পারছি না।

অরিন বলল,

-‘ তোর ডিসিশন কি ফাইনাল?’

আমি মাথা নাড়িয়ে ‘হ্যা’ বলি।

অরিন ফের বলল,

-‘ ওকে ফাইন! কোন দেশে যাবি? কানাডা চল? আমাদের সাথেই। ‘

-‘ না। কানাডা যাবোনা। অন্য কোথাও যাবো। ওখানে গেলে পূর্ব ভাইয়া খুঁজে পেয়ে যাবেন। সবার আড়ালে কোনো একদিন সুইজারল্যান্ড চলে যাবো’

অরিন অসহায় মুখে বলল,

-‘ আর একবার ভেবে দেখ দোলপাখি? তোর স্বপ্ন সব মাটি হয়ে যাবে। তোর সাদা এপ্রোন পড়ার স্বপ্নটা ভেঙে যাবে। পারবি সহ্য করতে?’

চোখে এসে জমা পানি অরিনের বর্তমান কথা শুনে টুপ করে গড়িয়ে পড়ে। শত চেষ্টা করে আটকানো যায়নি। সে নিজের ইচ্ছেতে গড়িয়ে পড়েছে। আমি বুকে পাথর চাপা দিয়ে বহুকষ্টে বলি,

-‘ ডাক্তার হওয়ার স্বপ্নটা নাহয় স্বপ্ন হিসেবেই থাক অরি? বেঁচে থাকলে বাচ্চা কাচ্চা কে ডাক্তারি পড়াবো।নয়তো সুইজারল্যান্ডে গিয়ে চেষ্টা করবো কোনো মেডিকেলে এডমিশন টেস্ট দেয়ার। ‘

অরিন হটাৎ আমায় জরীয়ে ধরে। খুব শক্ত করে। নিম্নস্বরে বলে,

-‘ বড় হয়ে গেছিস দোলপাখি। ‘

আমি হাসি দেই। সেই হাসির মাঝে লুকিয়ে আছে শত শত কষ্টের ছোপ।

এয়ারপোর্ট অরিনকে বিদায় দিয়ে আলাদা গাড়িতে একা একা ড্রাইভ করতে করতে আগের সেই জায়গাটায় যাই। নদীর পাড়ে!
মন ভালো করার অন্যতম স্থান এটা আমার।

কিছুদূর যেতেই সামনে এসে পড়ে কয়েকজন লোক। তাদের সবার হাতে রিভলবার। একদম ঘিরে ধরে দাড়িয়েছে। আমি আচানক ভয় পেয়ে যাই। ভীত কন্ঠে বলি,

-‘ কারা আপনারা? কিছু বলবেন? এভাবে দাঁড়ালেন কেন?’

লোকগুলো নিশ্চুপ!
হটাৎ পিছন থেকে কেও কর্কশ কন্ঠে বলল,

-‘ ওদের তোমায় দিয়ে কোনো কাজ নেই মিস.মেহরুজ! আমার তোমায় দিয়ে কাজ। ‘

চট জলদি পিছে তাকাই। একজন লোক দাড়িয়ে। ২০-২৫ বছরের। হলুদ দাঁত দিয়ে বিশ্রি হাসি দিচ্ছে। তার হাতেও একটা রিভলবার।
আমি থমথমে কন্ঠে বলি,

-‘ কি চাই আপনার? এভাবে পথ আঁটকে দাঁড়ালেন যে?’

লোকটি এগিয়ে এসে দ্রুত পায়ে। ভড়কে গিয়ে পিছে যেতে নিলে উপস্থিত লোকজনদের মধ্য হতে একজন আমার পায়ে লাথি দেয় যার ফলস্বরূপ মাটিতে মুখ থুবরে পড়ে যাই।
এতে করে সামনের দাড়িয়ে থাকা লোকটি রেগে যায়। সে বলল,

-‘ ঐ কু***! এই ছ্যাড়িরে লাথি দিলি কেন? এডা প্রোফেশনাল মাল বুঝছস? এরে খাতির দারি করতে হইবো বেশি। নাইলে স্যার আমাগো সবগুলারে মাইরা ফেলবো। ‘

কাচুমাচু মুখ করে সে বলল,

-‘ সরি ফাহিম ভাই। আর লাথি দিমুনা।মাইয়াডা পালাইতে নিছিলো তাই লাথি মারছি পায়ে। ‘

ফাহিম নামে ছেলেটি এবার পূর্ণ দৃষ্টি আমাতে দেয়। লোভাতুর দৃষ্টি। আমি ব্যাথায় চোখমুখ খিচে বন্ধ করে আছি।
ফাহিম আমার পাশে বসে পড়ে। ইনজেকশন বের করে হাতের রগে পুশ করে এক সিরিঞ্জ রক্ত নিয়ে সামনে গাড়ির সামনে যায়। আমি চুপসারে মাটিতে পড়ে আছি। মাথা ব্যাথা করছে খুব।চিন্তায় চিন্তায় বোধহয় জ্বর এসে পড়েছে। লোকটা আমার রক্ত নিলো কেনো?

ফাহিম হটাৎ হাতে থাকা সিরিঞ্জ মাটিতে জোরে ছুড়ে ফেলে। অতঃপর নিজের ফোন বের করে কর্কশ কন্ঠে বলল,

-‘ স্যার আপনার সন্দেহই ঠিক। অরা ম্যাডাম দেয়নাই দোলারে ইনজেকশন। পূর্বের সাথে মিলে আমাদের ধোঁকা দিছে। ‘

অপাশ থেকে কি বলল জানা নেই আমার। তবে প্রথম লাইনটা কিছুটা শুনতে পেরেছি যা আমার বোধগম্য হয়নি। কি হচ্ছে এসব?

ফাহিম ফের বলল,

-‘ আচ্ছা স্যার আমি ইনজেকশন দিতাছি নতুনডা। চারটা দিমু। তাইলে তাড়াতাড়ি মরবো।’

ফোন রেখে দেয় ফাহিম। গাড়ির ভেতর থেকে হাতে কিছু ইনজেকশন নিয়ে এগিয়ে আসে আমার দিকে। আমি নড়াচড়া করার জন্য হাসফাস করছি কিন্তু পারছিনা। হটাৎ করেই বেশ দূর্বল লাগতে শুরু করে।

ফাহিম আমার পাশে বসে একহাত টেনে ধরে। সাথে করে নিয়ে আসা ইনজেকশন গুলো এক এক করে পুশ করে দেয় আমার হাতের রগে। এতোটাই দূর্বল ছিলাম চোখের পাতা আলত করে খোলা রাখা ছাড়া আর কিছুই করতে পারিনি।

ইনজেকশন দেয়ার পর হাত ঝাড়া মেরে মাটিতে ফেলে দিয়ে চলে যায় ফাহিম নামক লোকটি আর তার দলবল! আমি চেয়ে থাকার এক পর্যায়ে অজ্ঞান হয়ে যাই।

চলবে,

#স্নিগ্ধ_প্রেমের_সম্মোহন
#সাদিয়া_মেহরুজ_দোলা
#পর্ব____৩০

-‘ সাবেক আর্মি অফিসার জোহান আবরারের একমাত্র মেয়েকে জঙ্গি গোষ্ঠী ক্যান্সারের বিষ দিয়ে মেরে ফেলার চেষ্টা করেছে। তবে বিষ পুরো বডিতে ছড়িয়ে না যাওয়াতে ডাক্তাররা সেই বিষ শরীর থেকে বের করতে সক্ষম হয়েছে। পাঁচ জন আটক হয়েছে জঙ্গি গোষ্ঠীর। তবে আটক হওয়ার পর জ্বেলে নেয়ার সময় রাস্তার মাঝেই পাঁচজন হার্ট অ্যাটাক হয়ে মারা যায়। পুলিশরা ধারণা করছে তাদের প্লান করে হার্ট অ্যাটাক করানো হয়েছে। ফারাহ্! এই ছিলো এখনকার খবর। ‘

গরগর করে এক সাংবাদিক টিভিতে এই কথাগুলো বলছিলো। আমি টিভি থেকে দৃষ্টি সরিয়ে আমার বাম পাশে বসে থাকা পূর্ব ভাইয়ার দিকে তাকাই। তার মুখপানে গাম্ভীর্যতার ছাপ বহমান! ছুড়ি দিয়ে ফল কাটছেন তিনি আবার মাঝেমধ্যে আমার হাতে লাগানো স্যালাইন ক্যানেলার দিকে তাকাচ্ছে। স্যালাইন শেষ হওয়ার আর বেশি সময় নেই। যেকোনো সময় শেষ হবে। সাথে সাথে না খুললে স্যালাইন এর ব্যাগে রক্তে ভরে যাবে তাই বারবার তাকাচ্ছেন তিনি।

আমি হতভম্ব! মনে জমে থাকা প্রশ্নের উত্তর জানার জন্য ব্যাকুল আমি। কি হয়ে গেলো এসব? টিভিতে এসব নিউজ?আমি হসপিটালে?পাশে পূর্ব ভাই?

কৌতূহল না দমিয়ে রাখতে পেরে দিশেহারা হয়ে বলি,

-‘ এসব কি পূর্ব ভাইয়া? টিভিতে নিউজ? আমি হসপিটালে কিভাবে আসলাম?’

পূর্ব ভাইয়া আমার প্রশ্নে নিজের কাজ বন্ধ করেননি। বরং আগের থেকে মনোযোগী হয়ে ফল কাটছেন যেনো আমার প্রশ্ন তার কানেই যায়নি। আমি মাথা ঘুরিয়ে দেয়াল ঘরির দিকে তাকাই। টাইম দেখে চক্ষু চড়কগাছে! সকাল নয়টা বেজে দশ মিনিট। কিন্তু কাল যখন আমি জ্ঞান হারিয়ে ছিলাম তখন মিনিমাম বারোটা বাজে। তারমানে একদিন যাবৎ আমি বেহুশ ছিলাম?

আমি অবাক কন্ঠে বলি,

-‘ ৯ টা ১০ বাজে? তারমানে আমি একদিন যাবৎ সেন্সলেস ছিলাম? ‘

এবার পূর্ব ভাইয়া নড়েচড়ে বসলেন। মাথা তুললেন তিনি। এতক্ষণ মাথা নিচু ছিলো তার। তার চেহারা দেখতেই আঁতকে উঠি এক প্রকার। চোখজোড়া প্রচন্ড লাল, হালকা ফুলে আছে। রক্তিম ঠোঁটজোরা শুকিয়ে কাঠ!
তিনি ফিচেল কন্ঠে বললেন,

-‘ হু! ‘

পূর্ব ভাইয়া কথাটা বলার পরই হুড়মুড়িয়ে কাছে এসে আমায় জরীয়ে ধরেন। কাঁধে মাথা রেখে জোরে জোরে শ্বাস টানতে থাকেন।
আমি হতবিহ্বল। মন নিভৃতে থেকে বলছে তাকে জরীয়ে ধরতে। তার অস্তিত্বে নিজের অবস্থান খুজে নিতে কিন্তু পরক্ষণেই মনে পড়ে সেই দিনগুলোর কথা। কতোটা পেইন, ইগনোর করেছেন তিনি। অযাথিত কারণে অপমান করে আমার গায়ে হাত পর্যন্ত তুলেছেন।

আমি চেপে থাকা অভিমানের কারণে ধাক্কা দেই পূর্ব ভাইয়াকে। ছিটকে দূরে সরে যান তিনি। দৃষ্টি স্বাভাবিক। যেনো এমন কিছু হবে তা আগের থেকেই জানতেন।
আমি কাট কাট কন্ঠে বলি,

-‘ খবরদার দরদ দেখাতে আসবেন না। আপনার এই দরদ রাস্তার কুকুরকে দেখান। অসভ্য লোক! নিজের প্রয়োজনে কাছে টেনে নিবেন আবার প্রয়োজন ফুঁড়িয়ে গেলে ছুড়ে মারবেন। আপনার কি আমাকে দাসী মনে হয়? হ্যা?’

শুরুটা শান্তভাবে করলেও শেষের দিকে রেগে কটমট হয়ে যাই। ভেতরে জমে থাকা অভিমান গুলো বরফে রূপান্তরিত হয়েছে। ইচ্ছে করছে পূর্ব ভাইয়াকে ক্ষতবিক্ষত করে দিতে। তার চেহারা এই মূর্হতে দেখতে ইচ্ছে করছে না।

পূর্ব ভাইয়া ফের এগোলেন তবে আমায় স্পর্শ করলেন না। আমার পাশে বসে ধীর কন্ঠে বললেন,

-‘ তুই দাসী না তুই আমার রানী দোলপরী! আমার সাম্রাজ্যের রানী তুই। ‘

কেঁপে উঠে পিছু সরে যাই। স্যালাইন শেষ। তা দেখে পূর্ব ভাইয়া চট জলদি কাছে এসে হাত থেকে খুব ধীরে সুস্থে স্যালাইন এর ক্যানেলা খুলে নেন! আমি এবার হাত টানাটানি করলাম না। তিনি তার কাজ সম্পূর্ণ আমার দিকে মনোযোগী দৃষ্টি দেন। অতঃপর বললেন,

-‘ একটা চুমু খাই দোলপরী? জাষ্ট একটা? কেমন জানি ফাকা ফাঁকা লাগছে। ‘

তার কথায় ভড়কে যাই। চোখদুটো বড় বড় করো তাকিয়ে থাকার এক পর্যায়ে আমি জোর গলায় বলি,

-‘ ফাজলামো করছেন আমার সাথে? বেড়িয়ে যান। আব্বু, আম্মু, ভাইয়া, চাচা- চাচু তারা কোথায়? আমি তাদের কাছে যাবো। ডাকুন তাদেরকে। ‘

-‘ তারা এখন আসবে না। সবাই আমাদের প্রাইভেসি দেয়ার জন্য বাহিরে গিয়েছে। ‘

-‘ আবার ফাজলামো? আপনি যান তো এখান থেকে?’
রাগে গজগজ করে বলি তাকে। তবে তিনি শান্ত কন্ঠে বললেন,

-‘ আমার ওপর এতো রাগ কেন দোলপরী? ‘

-‘ আপনি জানেন সেই কারণটা! এইযে এখন ভালো ব্যাবহার করছেন একটু পর দেখা যাবে ঠাস ঠাড করে থাপ্পড় মেরে বসে আছেন। ‘

পূর্ব ভাইয়া হাসেন। হাসিটা অন্যরকম! চাপা কষ্টে জর্জরিত। তিনি শীতল কন্ঠে বললেন,

-‘ আর কোনোদিনও তোর গায়ে হাত তুলবো না। সেদিন তোকে দু – দুটো থাপ্পড় মেরে আমি আমার নিজের হাত ছুরি দিয়ে কেটে ক্ষতবিক্ষত করেছি। থাপ্পড় গুলো তোর গালে পড়লেও তার কষ্ট, ব্যাথা আমার বুকে এসে লেগেছে। এখন আর তোকে দূরে সরিয়ে রাখতে হবেনা।সবকিছু সল্ভ হয়ে গিয়েছে। ‘

আমি বাঁকা চোখে তাকাই তার দিকে। সন্দিহান কন্ঠে বলি,

-‘ মানে? কি বলছেন এসব?খুলে বলুন।’

-‘ বলবো তার আগে ফ্রুটস গুলো খেয়ে নে। তুই উইক অনেক। রক্ত চেঞ্জ করা হয়েছে বিষের প্রতিক্রিয়া সরাতে। ‘

আমি প্লেট হাতে নিই। এক পিস মুখে নিয়ে তাকে ইশারা করে বলি, ‘ শুরু করুন?’

পূর্ব ভাইয়া উঠে দাড়িয়ে সোফায় গিয়ে গা এলিয়ে দেন। আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,

-‘ অরা যে মেঝ চাচুর আপন মেয়ে না জানিস?’

-‘হ্যা। আম্মু বলেছে। অরা আপুর দশ বছর বয়স তখন তাকে মেঝ চাচু রাস্তা থেকে আহত অবস্থায় পান। আপু অনাথ ছিলো আর মেঝ চাচির কোনো বাচ্চা হচ্ছিলো না দেখে মেঝ চাচু অরা আপুকে নিজের মেয়ে হিসেবে বড় করেন। তার কয়েক বছর পরই তো অরিন হয়। ‘

-‘ অরা অনাথ না। ওর বাবা, মা ভাই সবাই আছে। ‘

চমকিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি পূর্ব ভাইয়ার দিকে। হাতে থাকা আপেলের টুকরোটা ফট করে প্লেটে পড়ে যায়। বিষ্নয় নিয়ে বলি,

-‘ সিরিয়াসলি? তাহলে আপুর বাবা মা কোথায়?’

-‘ অরার বাবা মাকে জঙ্গি গোষ্ঠীর লিডার আটকিয়ে রেখেছে। কারনটা অরাকে ব্লাকমেইল করে আমাদের পরিবারের ক্ষতি করা। তারা সবাইকে ছেড়ে অরাকে চুজ করেছিলো আর আমাদের পরিবারে থার্ড পার্সোন হিসেবে ঢুকিয়ে দেয়। ওর বাবা মা ভাইকে আটকে রেখে ব্লাকমেইল করে। আমাদের পরিবারের ক্ষতি না করতে পারলে তারা অরার পরিবারকে মেরে ফেলবে এমন হুমকি ধামকি দেয়! অরা না চাইতেও খারাপ কাজে জরিত হয়। ১০ বছর বয়স থেকেই ওর ব্রেনওয়াশ করা হয়েছে’

একদফা শক পেয়ে আরেকদফা সহ্য হলোনা। উতলা হয়ে বলি,

-‘ আমাদের পরিবারের ক্ষতি কারা করতে চায়? আর কেনো?’

পূর্ব ভাইয়া উঠে দাঁড়ালেন। আমার সামনে এসে প্লেট থেকে ফল তুলে মুখে দিয়ে বললেন,

-‘ কারা করতে চায় ডোন্ট নো। তবে তাদের সাথে আমাদের পরিবারের বহু পুরাতন শত্রুতা। শুধু আমাদের সাথেই না বাংলাদেশের সাথে শত্রুতা। বাংলাদেশের ক্ষতি চায় তারা। এমন অনেক নিরীহ বাঙালীকে মেরেছে যাদের ছিলোনা কোনো দোষ।২৬ বছর পেরিয়ে গেছে এখনো কেও ওদের ধরতে পারেনি। না পুলিশ, র্্যাব কেও না। খুব ধূর্ত ওরা। ‘

আমি ভীত কন্ঠে বলি,

-‘ আমাদের পরিবারের সাথে কিসের শত্রুতা হতে পারে? আমাদের ক্ষতিই কেনো চায়?’

-‘ জানতে পারিনি এখনো। কোনো প্রমান ফেলে রাখেনি। যেই পাঁচজন ওদের আন্ডারে কাজ করতো বাংলাদেশে থেকে তারা মারা গেছে। আমি ভেবেছিলাম লুকিয়ে রেখে ব্যাপারটা সল্ভ করবো কিন্তু তার আগেই সব ভাইরাল করে দেয় কেও। সে আমার কাছের কেওই হবে নিশ্চিত। এখন বাংলাদেশের সবাই জানে এ ব্যাপারে তাই ওরা আরো সর্তক হয়ে গিয়েছে। নেক্সট যেই পদক্ষেপ নিবে সেটা ভয়াবহ হবে। ‘

ভয়ার্ত চাহনি দিয়ে চেয়ে আছি। এতকিছু হয়ে গিয়েছে? পূর্ব ভাইয়া আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,

-‘ ভয় পাস না। আমি আছি না? কিছু হবেনা?’

আস্বস্ততে মাথা নাড়িয়ে সায় জানাই। ফের বলি,

-‘ ওরা আমাকে কিসের ইনজেকশন দিয়েছিলো?’

-‘ ক্যান্সারের বিষ! এটা নতুন ভাইরাস। চিনের ল্যাব থেকে চুরি করে এনেছে এই বিষ নয়তো টাকা দিয়ে কিনে। কারণ এই বিষ মার্কেটে পাওয়া যায়না। যেভাবেই আনুক এটা জ্বালিয়াতি করে এনেছে। এই ইনজেকশন দেয়ার কথা ছিলো অরার। অরার ওপর ওরা ইনজেকশন দেয়া আর আমাদের ফ্যামিলির পারসোনাল ইনফরমেশন নেয়ার দায়িত্ব আরোপ করেছিলো। অরা যেদিন দেশে আসে তার দুদিন পর ও আমাকে সব ঘটনা জানায়। আমি সাথে সাথে ভেবে নেই এক্টিং করবো। ওরা চাইতো যাতে আমি অরার সাথে ক্লোজ হয়ে যাই আর তুই কষ্ট পাস। ঘুরে ফিরে এই এক জায়গাতেই আটকাতো। তোকে কষ্ট দেয়া। পরিবারের অন্য সদস্যদের এখনো কোনো ক্ষতি করেনি। কেনো এটা চাইছে তা জানতে পারিনি এখনো আর না জানা সম্ভব। সবকিছু ফাঁস হয়ে গিয়েছে। ‘

আমি আঁতকে উঠে বলি,

-‘ অরা আপুর বাবা মা? ওনারা ঠিক আছেন?’

-‘ হু। ওদের কানাডায় রাখা হয়েছিলো। ওখানকার পুলিশের তত্ত্বাবধানে সেফ আছে তারা। ‘

স্বস্তির শ্বাস ফেলি। আরো অনেক প্রশ্ন ছিলো তবে তার উত্তর পাওয়া সম্ভব নয়!
আমি হটাৎ চমকে বলি,

-‘ আপনি এতকিছু জানলেন কি করে?’

পূর্ব ভাইয়া রহস্যনয়ী হাসি দেন। আমি তা দেখে ফের বলি,

-‘ আপনার কাছে রিভলবার কোথা থেকে আসলো? ফাজ কে?ফুয়াদ মানে আপনার পিএ, আপনাকে ফাজ বলে সম্মোধন কেনে করলো?প্লিজ বলুন না? আপনি কি কোনো মাফিয়া টাফিয়া নাকি?’

পূর্ব ভাইয়াকে এই প্রথমবারের মতো চমকাতে দেখলাম। তার মানে আমার বলা কথাটি ভুল? পূর্ব ভাইয়া বললেন,

-‘ লাইক সিরিয়াসলি? তোকে আমার মাফিয়া মনে হয়? এই বাজে পেশায় আমি যাবো? ষ্টুপিড! ‘

-‘ তাহলে আপনি কে?’

-‘ গোয়েন্দা বিভাগের সিনিয়র অফিসার! ‘
গম্ভীর কন্ঠে বললেন তিনি।

আমি বিস্ময় নিয়ে চেয়ে আছি। ঠোঁটদুটো গোল গোল করে বলি,

-‘ হোয়াট?’

অবাকের চরম পর্যায় অতিক্রম করে ফেললাম বোধহয় । মানে একটা মানুষ একসাথে এতকিছু কিভাবে হয়? ফাষ্টে বিজনেসম্যান দ্যান সিঙ্গার এন্ড নাউ গোয়েন্দা বিভাগের সিনিয়র অফিসার? মাই গড!

পূর্ব ভাইয়া বললেন,

-‘ এভাবে তাকিয়ে আছিস কেনো? ফ্রুটস ফিনিশ কর ফাষ্ট। ‘

আমি কিছু বলতে নিবো তার আগেই দরজা ভিড়িয়ে হন্তদন্ত হয়ে প্রবেশ করে নীরব। ওকে দেখে খানিক অবাক হই। নীরব বলল,

-‘ পূর্ব ভাই কাজি আনছি। দোলের বাবা আমারে এই পাঞ্জাবি দিলো।আপনি যান চেঞ্জ করে আসেন। বিয়ে পড়ানো শুরু করবে। ‘

দিশেহারা চোখে পূর্ব ভাইয়ার দিকে তাকাই। তিনি মিটিমিটি হাসছেন। উঠে দাড়িয়ে নীরবের কাছে যান। আমি বলি,

-‘ বিয়ে?কার বিয়ে?’

নীরব দাঁত কেলিয়ে বলল,

-‘ ক্যান তর! তোর আর পূর্ব ভাইয়ের। ভাইয়া তোরে রাস্তা থেকে তুলে এনে সবাইকে বলল আজকেই তোরে বিয়া করবো হসপিটালেই তাই কাজি আনছি। ‘

তড়িৎ গতীতে ঘাড় বাকিয়ে পূর্ব ভাইয়ার দিকে তাকাই। তিনি চোখ টিপ মেরে ইশারায় বললেন,

-‘ ওয়েট কর বউ! আজ একদম নিজের করে নিবো তোমায়। ‘

বলেই তিনি চলে গেলেন। আমি এখনো শকে। হচ্ছেটা কি?বিয়ে?

লাল রঙের একটা ওড়না মাথায় দিয়ে চুপিসারে বসে আছি হসপিটালের বেডেই। অরা আপু পাশে বসে মিষ্টি হেসে কথা বলছেন। অতঃপর সেই ক্ষনটা থমকে এসে দাঁড়ালো। কাজি কবুল বলতে বলে। আমি বেশ সময় নেই। বাবা মায়ের দিকে তাকাতেই তারা ইশারায় কবুল বলতে বললেন।
আমি কয়েকফোটা চোখের পানি ফেলে লম্বা সময় নিয়ে কবুল বলে দেই।

সবাই আলহামদুলিল্লাহ বললেন। কাজি বলল,

-‘ আলহামদুলিল্লাহ বিয়ে হয়ে গেছে তাদের। ফায়াজ আবরার পূর্ব আর মেহরুজ দোলা এরা দুজন এখন থেকে স্বামী স্ত্রী! ‘

আমি চোখ বন্ধ করে নিই। প্রশান্তি অনুভূত হচ্ছে। পূর্ব ভাইয়া এখন সম্পূর্ণ রূপে আমার।

অরা আপু বলল,

-‘ আরেহ্ তুই কাঁদছিস কেন? পূর্ব যদি দেখে আমাদের বারোটা বাজিয়ে দেবে। ‘

বলেই আপু হাসলেন। আমি মৃদু হেসে মাথা নিচু করে নেই। বাবা মা আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে একে একে সবাই চলে যান।
খানিক বাদে আসেন পূর্ব ভাইয়া। তার মুখে তৃপ্তির হাসি। তিনি বড় বড় পা ফেলে এগিয়ে এসে আমায় কোনো কথা না বলতে দিয়ে আমার ওষ্ঠদ্বয় তার ওষ্ঠদ্বয়ের মাঝে পরম আবেশে আগলে নেন। চমকে গিয়ে তার পাঞ্জাবির কলার আঁকড়ে ধরি আমি। সে ব্যাস্ত আমার অধরের মাঝে!

চলবে……