স্নিগ্ধ প্রেমের সম্মোহন পর্ব-৩১+৩২

0
1984

#স্নিগ্ধ_প্রেমের_সম্মোহন
#সাদিয়া_মেহরুজ_দোলা
#পর্ব____৩১

কড়া রোদের তাপদাহ চারিদিকে। থাই গ্লাসের মোটা পর্দা ভেদ করে এক চিলতে রোদ প্রবেশ করে কেবিনে। পিটপিট করে চোখ খুলতেই ভেসে উঠে পূর্ব ভাইয়ার চেহারা। কানে ভেসে তার হৃদস্পন্দন এর ধ্বক ধ্বক শব্দ। খুব সাবধানে উঠে বসি যাতে তার ঘুম না ভাঙ্গে। পূর্ব ভাইয়ার বুকে ঘুমিয়ে ছিলাম এতক্ষণ যাবৎ!

সে ক্ষনটায় তিনি হুট করে আমার ওষ্ঠদ্বয় ছেড়ে তাড়া দেয় ঘুমানোর জন্য। ডাক্তারের নির্দেশ এটা। শরীর উইক হওয়াতে ঘুম প্রয়োজন ছিলো। তবে আমি জেদ ধরেছিলাম ঘুমাবো না। ঘুম আসছিলো না একদমই! এক পর্যায়ে তিনি আমার পাশে শুয়ে পড়ে আমার হাত ধরে হেঁচকা টান মেরে তার বুকে ফালান। কঠিন স্বরে বললেন,

-‘ ঘুমা। উঠবে না আর একবারও, তাহলে ঠাটিয়ে এক চড় মারবো সবকিছু উপেক্ষা করে। ‘

প্রথমে রাগী দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেও পরক্ষণে তার বুকে মাথা দেই। তিনি আলত হাতে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে থাকেন। ক্ষনের মাঝে ঘুমিয়ে পড়ি।

দুপুর দুটো বাজে। ধীরে তার হাত আমার পিঠ থেকে সরিয়ে দিতেই তিনি নড়েচড়ে বসেন। উঠে বসলেন তিনি। কড়া কন্ঠে বললেন,

-‘ কই যাচ্ছিস? বেড থেকে নামতে মানা করেছিলাম না? ‘

আমি আমতা আমতা করে বলি,

-‘ ইয়ে মানে… ওয়াশরুমে যাবো। ‘

দাঁতে দাঁত চেপে তিনি ফের বললেন,

-‘ তো আমাকে কি ডাকা যেতো না? এখন যদি মাথা ঘুরে পড়ে যেতি? দেখ দোলপরী তোর বডির প্রায় ৮০% ব্লাড চেঞ্জ করা হয়েছে। একদিন পুরো সেন্সলেস ছিলি। তুই বড্ড উইক এখনো। ‘

করুন স্বরে বললেন তিনি শেষের কথাটি। আমি বলি,

-‘ আপনি ঘুমিয়ে ছিলেন। আপনি তো সেই কতদিন ধরে ঠিকমতো ঘুমাননি। তাই ডাকিনি। সরি?’

পূর্ব ভাইয়া এগিয়ে এসে আমায় বুকে চেপে ধরলেন।ধীর কন্ঠে বললেন,

-‘ আমার চিন্তা করা লাগবে না তোর। নিজের খেয়াল রাখবি ঠিকমতো।এখন থেকে না নিলেও চলবে, আমিই কেয়ার করবো। ‘

স্বস্তির শ্বাস ছাড়ি। কোথাও যেনো ভয় অনুভূতি হচ্ছে। এসবের প্রাপ্য তো আমি? তাহলে এমন অপরাধ মূলক অনুভূতি কেন হচ্ছে? কিছু ভুল করছি নাতো?

গম্ভীর মুখ নিয়ে আমার পাশে বসে আছেন পূর্ব ভাইয়া। তিনি মুখশ্রীতে গম্ভীর ভাব বহমান রাখলেও তিনি যে বেশ রেগে আছেন তা আমি ভালো করে জানি।

পূর্ব ভাইয়ার এই রাগের কারণটা বাবা। বাবার সিদ্ধান্ত। বাবার সিদ্ধান্তটা ছিলো এরূপ,

-‘ দেখো পূর্ব, তোমার জেদের কারনে আজ এই অবস্থায় দোলের বিয়ে দিয়েছি। কিন্তু তুমি আমার মেয়েকে নিজের কাছে রাখতে পারবে না। ও এখনো ছোটো। আঠারোতে পা রাখলো নয়মাস হয়েছে। আমরা এখনি ওকে শশুর বাড়িতে পাঠাতে চাইনা।যদিও জানি তুমি ওর পূর্ণ কেয়ার করবে কিন্তু আমাদের মেয়েকে আমরা ২১ বছর হওয়ার আগ পর্যন্ত তোমার কাছে দিচ্ছিনা। বিয়েটাও এনাউন্সমেন্ট হবেনা। দোলের সঠিক বয়স হলে অফিসিয়ালি ওর বিয়ে এনাউন্সমেন্ট করে ধুমধাম করে বিয়ে দিবো।’

পূর্ব ভাইয়া কথাটা শোনার পর বেশ রেগে গিয়েছিলেন।তবে সে নিজের রাগ সংযত করে সোফায় বসে পড়েন।ড্রইংরুমে সবার দৃষ্টি এখন পূর্ব ভাইয়ার ওপর।
হসপিটাল থেকে রিলাইজ দিয়ে দিয়েছে। ইচ্ছে করে দেয়নি আমি পূর্ব ভাইয়াকে ব্লাকমেইল করে ডাক্তার দের ধমকে ধামকে রিলাইজ করান। এতে অবশ্য রেগে তিনি আমার ওপর। তবে আমার জেদের কাছে সে আত্নসমর্পণ করেছেন!

পূর্ব ভাইয়া মৌনতা কাটিয়ে বললেন,

-‘ এমন সিদ্ধান্ত নেয়ার মানে কি চাচু? আমি কি দোলের খেয়াল রাখতে পারবো না?ইনফেক্ট এতদিন ধরে তো আমিই ওর সিকিউরিটি দিয়েছি। ‘
তার কন্ঠে ব্যাকুলতার ছাপ। বড় চাচি মলিন চোখে তাকিয়ে আছে।

-‘ সেটা বুঝলাম কিন্তু তুমি আগে নিজের কোম্পানিতে ফোকাস করো বাবা। এত কষ্ট, এত শ্রম দিয়ে এতদূরে নিয়ে এসেছো কোম্পানিটাকে মাঝপথে লস খেলে তখন কিভাবে সামাল দিবে? নতুন ডিল পেয়েছে ৫০ কোটি টাকার ঐটা তো অভ্র একা সামলাতে পারবেনা।তুমি বরং কানাডা চলে যাও। দোলাও পড়াশোনা শেষ করুক ‘

পূর্ব ভাইয়ার চোখমুখে অসহায়ত্বের ছাপ।
এবার বড় চাচু বললেন,

-‘ জোহান যা বলেছে তাই তুমি করবে পূর্ব, কানাডা যাও। আমাদের সেফটি র্্যাব দিবে। সিকিউরিটি আগের থেকে কড়া করবো।’

-‘ কড়া সিকিউরিটি তো আগেই ছিলো। আশফি যে দোলকে কিডন্যাপ করলো কিছু করতে পেরেছো?’
কড়া কন্ঠে বলল পূর্ব ভাইয়া।

বড় চাচু থতমত খেলেন। তিনি বললেন,

-‘ আগের বারের থেকে আরো সাবধান হবো।কিন্তু তোমার কানাডা যাওয়াটা জরুরি। ‘

-‘ যাবোনা আমি। দরকার হলে দোলকে নিয়ে যাবো। একা না। যা খুশি করো। কোম্পানির লস হলেও কিছু আসে যায়না আমার। ‘

কথাটা বলে পূর্ব ভাইয় চলে গেলেন উপরে। অসহায় মুখে চেয়ে আছে চাচুরা। পূর্ব ভাইয়ার কোম্পানি থেকে বেশ বড় একটা এমাউন্ট আসে। আর সেখান থেকে চাচুরা টাকা নিয়ে তাদের বাংলাদেশে থাকা দুটো পোকাশ ফ্যাক্টরি তে ইনভেস্ট করেন।
তাছাড়া পূর্ব ভাই তার এই কোম্পানির পিছনে গন খাটুনি করেছেন। মাথার ঘাম পায়ে ফেলে দিনরাত এক করে কোম্পানির পিছে পড়ে ছিলেন।যার কারণে তার কোম্পানির সুনাম কানাডাতে বেশ ভালো।

এই কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা বড় চাচু। তারপর অভ্র ভাইয়া আর পূর্ব ভাই এর পিছনে লেগে থাকেন। সব থেকে বেশি সময়, মেধা, শ্রম দিয়েছেন পূর্ব ভাইয়া তাই বড় চাচু কোম্পানিটা তার নামে লিখে দিয়েছে। তবুও পূর্ব ভাই সব জায়গায় বলেন কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা তার বাবা এবং মালিকও সে!
কোম্পানিটায় অনেক টাকা ইনভেস্ট করা হয়েছে তাই হয়তো হেলাফেলা করতে বারণ করছে চাচু। কিন্তু পূর্ব ভাইয়া আদও কি যাবেন কানাডায়?

ড্রইং রুম থেকে চলে গেলেন সবাই। থেকে গেলেন বড় চাচি।

বড় চাচি এগিয়ে আসলেন আমার কাছে। কোমল কন্ঠে বললেন,

-‘ আমার ছেলেটা তোকে ছাড়া কিছুই বুঝে নারে মা। যখন ও তোকে প্রথম দেখে তখন থেকেই ওর মনে সুপ্ত অনুভূতি ছিলো তোকে নিয়ে। এই অনুভূতি ঢাকতে ও তোর সাথে খারাপ ব্যাবহার করতো। কিন্তু এক সময় না পেরে ভালোবেসে ফেলে তোকে, পাগলের মতো! আমাকেই বলেছিল প্রথম এই কথা’

আমি মাথা নিচু করে শুনছিলাম চাচির কথা। অবাক লাগছে। তাহলে ছোটবেলার সেই খারাপ ব্যাবহার এই কারণে?

বড় চাচি আমার মাথায় হাত রেখে বললেন,

-‘ একটা রিকুয়েষ্ট করি মা?রাখবি?’

আমি ব্যাকুল হয়ে বলি,

-‘ চাচি এভাবে বলছো কেন? রিকুয়েষ্ট করার দরকার নেই। তুমি আমায় ওর্ডার করো। যথাসম্ভব মানার চেষ্টা করবো। ‘

বড় চাচি মুচকে হাসলেন।অতঃপর তিনি বললেন,

-‘ তুই পূর্বকে একটু বোঝা কানাডা যেতে। এই ডিল হাত থেকে চলে গেলে অনেক ক্ষতি হয়ে যাবে কোম্পানির। পূর্বের অতি কষ্ট করে গড়ে তোলা এত বড় কোম্পানি নিমিষেই বন্ধ হয়ে যাবে। এমনিতেই কোম্পানিতে গত বছর ৩০ কোটি টাকার লস হয়ে যাবে। পূর্ব যতই মুখে বলুক ওর কিছু আসে যায় না। কিন্তু আমি জানি ওর কাছে এই কোম্পানিটা কি! তুই একটু পূর্বকে বোঝা না মা। আমি সিয়র পূর্ব তোর কথা মানবে। ‘

মাথা নিচু করে আছি। হৃদপিণ্ড দপদপ করে লাফাচ্ছে। পূর্ব ভাইয়াকে ছাড়া আমি থাকতে পারবো তো?
আমি আলত হেসে চাচির উদ্দেশ্যে বলি,

-‘ আচ্ছা চাচি বলবো। টেনশন করবেন না পূর্ব ভাইয়া রাজি হয়ে যাবেন। ‘

চাচি তৃপ্তির হাসি দিলেন।কপালে একটা চুমু দিয়ে তিনি উঠে চলে গেলেন। আমি সেদিকে চেয়ে। বুকে চাপ অনুভূত হচ্ছে। একদিকে ফ্যামিলির কথা ফালাতে পারবোনা অন্যদিকে পূর্ব ভাইয়াকে ছাড়া থাকতে হবে ভাবতেই তিক্ত অনুভব হচ্ছে। কি করবো আমি?

রাত আটটা!
আঁধারে ছেয়ে আছে পুরো চারিপাশ। হিম শীতল বায়ু এসে শরীরে বাড়ি খেতেই ভালো লাগার শিহরণ বয়ে যায় শরীরে। আকাশে আজ চাঁদ উঠেছে। আজ পূর্নিমা। চাঁদের পবিত্র আলো চারিদিকে ছড়িয়ে চিকচিক করেছে। ঠোঁটের কোনায় মৃদু হাসি নিয়ে পরিবেশ দেখতে ব্যাস্ত আমি! পূর্ব ভাইয়ার সাথে কথা বলা হয়ে উঠেনি। বাসায় নেই তিনি।

-‘ স্নিগ্ধপরী কি জানে?তার হাসিতে আছে হৃদস্পন্দন স্তব্ধ করে দেয়ার অমায়িক শক্তি? চোখের পলক না ফেলার কঠিন আদেশ? শত রাতের ঘুম কেড়ে নেয়ার একমাত্র পন্থা। ‘

চট জলদি পিছনে ফিরে তাকাই। পূর্ব ভাইয়া বুকের বা পাশে হাত দিয়ে দাড়িয়ে আছেন। দেয়ালে হেলান দেয়া সে! আমি দ্রুত পায়ে তার কাছে এগিয়ে গিয়ে অস্থির হয়ে বলি,

-‘ কি হয়েছে? বুকে হাত দিয়ে আছেন কেনো?ব্যাথা করছে?’

পূর্ব ভাইয়া মৃদু হাসলেন। মধুমাখা হাসি। তিনি বললেন,

-‘ ব্যাথা করছে তো খুব বেশি ব্যাথা। এখন তুই চট জলদি এই বুকের বা পাশটায় নিজের ঠোঁট ছোঁয়া তো, ব্যাথা কমে যাবে আমার। ‘

চোখ পাকিয়ে আমি বলি,

-‘ অসভ্য লোক! ‘

বলেই এক সেকেন্ড সেখানে না দাড়িয়ে ফের ব্যালকনীরে কর্নারে চলে আসি। রেলিং এ হাত রেখে বাহিরে তাকাই। কিন্তু মন গহীন থেকে ছটফট করছে পূর্ব ভাইয়াকে এক নজর দেখার জন্য। চোরা চোখে তার দিকে তাকাতেই চোখাচোখি হয়ে যায় আমাদের। লজ্জায় দ্রুত মাথা ঘুরিয়ে সামনে তাকাই। লম্বা শ্বাস টেনে মনে মনে নিজেকে কয়েকটা কঠিন গালি দিয়ে ক্ষ্যান্ত হই!

আচানক অনুভব হলো আমার পেছনে কেও দাড়িয়ে। চোখ খুলে পিছে ঘুরতে নেবো তার আগেই এক জোরা হাত আমায় পেছন থেকে জরীয়ে ধরে। আমার হাতের ওপর হাত রেখে কাঁধে থুতনি স্থাপন করে।
বুঝতে এক সেকেন্ডও লাগেনা ব্যাক্তিটা কে?
অস্বস্তিজনিত কন্ঠে বলি,

-‘ প..পূর্ব ভা..ই কি করছেন? সরে দাড়ান! কেও দেখলে কি বলবে?’

পূর্ব ভাইয়া পেছন থেকে আরেকটু শক্ত করে জরীয়ে ধরলেন। কাঁধে নাক ঘসে ধীর কন্ঠে বললেন,

-‘ কেও কিছুই বলবে না। আমরা হ্যাজবেন্ড ওয়াইফ। ‘

-‘ সেটা শুধুমাত্র আমার কয়েকজন জানি। তাছাড়া বাবা দূরে থাকতে বলেছে না আপনাকে?’

পূর্ব ভাইয়া ফোস করে শ্বাস ছাড়লেন। বিরক্তমাখা কন্ঠে বললেন,

-‘ তোর বাবা এমন মির জাফরী কেনো করলো বলতো? বিয়ে করে এখন সিঙ্গেলদের মতো ঘুরে বেড়াতে হচ্ছে। এতটা অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে বিয়ে করলাম শেষে কিনা তোর বাবা কুটনামি করে দূরে সরিয়ে দিলো ডিজগাস্টিং! ‘

আমি কঠিন গলায় বলি,

-‘ একদম বাবাকে নিয়ে আজেবাজে কথা বলবেন না আপনি! সরুন! ‘

ধাক্কা মেরে তাকে সরিয়ে দেই। পূর্ব ভাইয়ার পূর্ণ দৃষ্টি আমাতে। আমার ঘাড়ের পিছনের একগাছি চুল ধরে সামনে আনতে নিলেই আমি ফট করে বলি,

-‘ আপনি কানাডা চলে যান পূর্ব ভাইয়া প্লিজ। এটা আমার একটা রিকুয়েষ্ট। এই প্রথম আপনার কাছে কিছু চাইছি, দেবেন না?’

পূর্ব ভাইয়া চেখমুখ শক্ত করে নিলেন। চোয়াল শক্ত করে বললেন,

-‘ অন্য যা চাইবি আমি তা আমার প্রানের বদলে হলেও এনে দিবো। কিন্তু তোর থেকে দূরে যাওয়ার কোনো কথা বলতে পারবি না। মাইন্ড ইট! ‘

লম্বা লম্বা পা ফেলে চলে গেলেন তিনি। অসহায় চাহনি আমার। এখন কি করবো? তাকে রাজি করাবো কিভাবে?হাউ?

চলবে…

#স্নিগ্ধ_প্রেমের_সম্মোহন
#সাদিয়া_মেহরুজ_দোলা
#পর্ব_____৩২

-‘ রাত ১ টার দিকে এভাবে কিডন্যাপারদের মতো করে উঠিয়ে আনলেন কেনো? খুন করার সাথে সাথে কি এখন কিডন্যাপ করাও শুরু করেছেন পূর্ব ভাইয়া? ‘

রাগ মিশ্রিত কন্ঠে প্রশ্নটা ছুঁড়ে দেই পূর্ব ভাইয়ার দিকে। তবে সে নিশ্চুপ! এবারও!
ঘাড় বাকিয়ে অন্য দিকে তাকাই। পূর্ব ভাইয়া খুব মনোযোগ সহকারে ড্রাইভিং করছেন। যেনো এই মূর্হতে এই কাজটা তার জন্য একমাত্র জাতীয় কাজ! এটা না করলে পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে।

রুমে উপুড় হয়ে বই নিয়ে পড়ছিলাম। ব্যালকনীর দরজা খোলা ছিলো তাতে শা শা বাতাস এসে পড়ায় অন্য রকম মনোযোগ ভাব এনে দেয়।
তবে হটাৎ করেই কেও পিছন থেকে রুমাল চেপে ধরে মুখে। কাঁধে তুলে মেইন ডোর দিয়ে গাড়িতে বসিয়ে দেয়। ছটফটানি বন্ধ করে দেই সিঁড়িতেই কারণ এটা পূর্ব ভাইয়া ছিলেন তা বুঝতে পেরেছি। এই বাসাতেও প্রবেশ করার জন্য ফিঙ্গারপ্রিন্ট লাগে। পূর্ব ভাইয়া প্রায়সই আসতেন তাই বোধহয় এতো সহজে চলে এসেছেন বাসায়।

গাড়ি থেমে যেতেই নেমে পড়ি আমি। পূর্ব ভাইয়াও নেমে এসে ঠিক আমার মুখোমুখি হয়ে দাঁড়ান। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন তিনি। আমি গাড়ির সাথে চেপে দাড়িয়ে। সরতেও পারছিনা তার কারণে। কারণ পূর্ব ভাই আমার একদম সামনে দাড়িয়ে।

মৌনতা কাটিয়ে বিরক্তিমাখা কন্ঠে বলি,

-‘ কি সমস্যা? এভাবে দাড়িয়ে আছেন কেনো? আমাকে এখানে আনার – ই বা মানে কি পূর্ব ভাইয়া? ‘

পূর্ব ভাইয়া এগোলেন। ভীত চোখে পিটপিট করে চেয়ে গাড়ির সাথে মিশে যাই। গাড়ির দুই সাইডে হাত রেখে আমায় এক প্রকার বন্দী করে নেন তিনি। মুখ আমার মুখের সন্নিকটে আনেন! তার গরম নিঃশ্বাস চোখমুখে আছড়ে পড়ছে। চট জলদি চোখ বন্ধ করে নেই!
তিনি ফিচেল কন্ঠে বললেন,

-‘ ইগ্নোর করছিস কেনো? তিনদিন যাবৎ কোনো কথা বলছিস না, ফোন রিসিভ করিস না , ভিডিও কল দিলেও সেটাও কেটে দিস, দেখা করতে আসলে শত বাহানা দিয়ে সরে পড়িস! সমস্যা কি? আমায় মেরে ফেলতে চাস? আমার দিকে একবারও খেয়াল করেছিস? তিনদিন তোর সাথে দেখা না করে কথা না বলে আমার অবস্থা কি হয়েছে জানিস? ‘

টেনে টেনে চোখ খুলে তার দিকে তাকাই। তার চোখদুটোতে মলিনতার ছাপ। চুলগুলো উস্কখুস্ক হয়ে কপালের দিকটায় ছড়িয়ে আছে। শরীর দেখে মনে হচ্ছে এই তিনদিনে তিনি শুকিয়ে কাঠ!

আমি অপরাধী কন্ঠে বলি,

-‘ খাওয়া দাওয়া করেননি ঠিক মতো? আপনার এই হাল কেনো?’

তিনি জবাব দিলেন না। এক দৃষ্টিতে তৃষ্ণা মেটানো চাহনিতে চেয়ে আছেন। এমন ভাবে দেখছেন যেনো কত বছর ধরে দেখেননি আমায়!

হুট করে খারাপ লাগা কাজ করতে লাগল। তার এই অবস্থার জন্য আমি দায়ী?
তিনদিন হলো আবরার মঞ্জিল ছেড়ে নিজেদের বাসায় এসেছি। এই তিনদিন বাসা থেকে বেড় হইনি। কারনটা পূর্ব ভাইয়া। তার মুখোমুখি না হওয়া। তিনদিনে তিনি কম চেষ্টা করেননি আমার সাথে দেখা করার কিন্তু আমি পুরোদমে পাথর রূপ ধারণ করে তাকে ইগ্নোর করেছি! কারণটা ছিলো তিনি যদি একবার রাজি হয়ে যান কানাডা যাওয়ার জন্য।

আমি ফের বলি,

-‘ এখানে কোনো রেষ্টুরেন্ট নেই? ‘

পূর্ব ভাইয়া আমার কাঁধে মাথা রাখেন। কেঁপে উঠে তার বাহুতে হাত রাখতেই তিনি আষ্টেপৃষ্টে জরীয়ে ধরেন আমায়। কাঁধে মাথা রেখে দুহাত দিয়ে কোমড় শক্ত করে জরীয়ে ধরেন।
নিজেকে সামলে নিয়ে ইতস্তত বোধ করে বলি,

-‘ একটা প্রশ্নেরও জবাব দেননি আপনি পূর্ব ভাইয়া আপনি?’

পূর্ব ভাইয়া কাঁধ থেকে মাথা তুলে কটমট দৃষ্টি দেন আমাতে। ভড়কে যাই আমি! তিনি বললেন,

-‘ তুই কি চাস আমি তোর ঠোঁটদুটো খেয়ে ফেলি? নয়তো কামড় দেই? ‘

বিষ্ময়কর দৃষ্টি দিয়ে চেয়ে আমি। অবাক কন্ঠে বলি,

-‘ কি?কিসব বলছেন?দূরে সরুন! বদ লোক! সবসময় খারাপ চিন্তা মাথায় নিয়ে ঘোরেন?’

-‘ শাট আপ! আরেকবার যদি আমায় ভাইয়া ডাকিস তাহলে তোর সাথে কি কি করবো তার কোনো আইডিয়া তোর নেই দোলপরী! ‘

থতমত খেয়ে বলি,

-‘ আমি পূর্ব ভাইয়া ছাড়া অন্য কিছু ডাকতে পারবো না। টাইম লাগবে। ‘

-‘ ওকে টেক ইউর টাইম বাট আজকের মধ্যেই পূর্ব ডাকতে হবে, গট ইট?’
ভ্রু কুঁচকে তিক্ত কন্ঠে তিনি বললেন!

আমি পরিস্থিতির চাপে পরে জলদি মাথা নাড়িয়ে হ্যা বলি। তবে আদও পূর্ব ভাইয়াকে ভাইয়া ডাকা বন্ধ করতে পারবো কিনা জানিনা। এত বছরের অভ্যাস এত সহজে ছাড়া যায়?

পূর্ব ভাইয়া আমার নিকট হতে সরে দাঁড়ান। প্যান্টের পকেটে হাত দিয়ে কালো রঙের একটা ফিতা বের করেন। ভ্রু কুচকে তাকিয়ে আছি সেদিকে আমি। তিনি এগিয়ে এসে আমার চোখে কালো কাপড় দ্বারা বেঁধে দিতে থাকেন। আমি হকচকিয়ে বলি,

-‘ আরেহ্, কি করছেন?চোখ বাঁধছেন কেনো? ‘

-‘ তোকে মেরে নদীতে ফেলে দিবো তাই। ‘

আমি খানিকটা তাচ্ছিল্যের সুরে বলি,

-‘ সেটা আপনার দ্বারা কখনোই সম্ভব না। ‘

পূর্ব ভাইয়া হাসলেন। তার হাসির শব্দ আমার কানপ এসে বাজে। কিছু সময় পর চোখ বাঁধা হলে তিনি আমায় কোলে তুলে নেন। আচানক এমন কান্ডে সার্পোট হিসেবে তার দুই কাঁধে হাত দেই। শক্তি করে চেপে ধরি! ফের বললাম,

-‘ আপনি আমায় কই নিয়ে যাচ্ছেন বলুন তো? বিক্রি করে দিবেন?’

-‘ উঁহু! বললাম না মেরে ফেলবো?’

-‘ হাহ্! ফাউ কথা যত্তসব। আপনি আর হাজারটা মানুষকে মারতে পারলেও আমাকে একটু স্পর্শও করতে পারবেন না আই নো ইট! ‘

-‘ এত কনফিডেন্স? এতোটা ট্রাস্ট? হাউ?’
তিনি কিছুটা কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন। আমি মুচকি হাসি। তখন মনে হলো গালে কারো উষ্ণ ছোঁয়া! গালে হাত দিতেই তিনি বললেন,

-‘ তুই হাসলে আমি নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারি না জানিস না? তাই চুমু দিয়েছি। দোষ কিন্তু আমার না তোর। ‘

চুপ করে রইলাম। কিছু বলে লাভ নেই। তার প্রশ্নের উত্তরটাও আর দেয়া হলোনা আর না তিনি দ্বিতীয় বার জিজ্ঞেস করলেন।
কোলে নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে তিনি আমায় এক নির্দিষ্ট স্থানে নিয়ে দাড়িয়ে স্থির হলেন। কোল থেকে নামিয়ে পূর্ব ভাইয়া কানের কাছে ফিসফিস করে বললেন,

-‘ ওয়েট কর একটু। আ’ম কামিং! চোখ থেকে কাপড়টা খুলবিনা একদম।’

বলেই চলে গেলেন তিনি। পায়ের শব্দ বিলীন হয়ে যাওয়ার পর বুঝতে পারলাম তিনি কিছুটা দূরে গিয়েছেন। দমকা বাতাস এসে বাড়ি খায় শরীরে। চোখমুখে আছড়ে পড়ে এক গুচ্ছো চুল। হাত দিয়ে সরিয়ে নিয়ে স্থির হয়ে দাঁড়াই। মনে কু ডাকছে কিছু কারণে! পূর্ব ভাইয়া কেন এখানে নিয়ে আসলেন? চোখ বাঁধলেনই বা কেনো? কারণটা কি হতে পারে?

বেশ কিছুক্ষন পার হয়ে যায়। দাড়িয়ে থাকতে থাকতে পা ব্যাথা হয়ে গেছে। গলা ঝেড়ে কিছুটা উচ্চ স্বরে বলি,

-‘ পূর্ব ভাইয়া আপনি কোথায়? আমি আমার চোখের কাপড় খুলে ফেললাম?’

মাথার পিছে কারো হাতের স্পর্শ টের পেলাম। চোখে বাঁধা কাপড় খুলছে কেও। হতভম্ব হয়ে জিজ্ঞেস করি,

-‘ পূর্ব ভাইয়া এটা কি আপনি?’

কানের কাছে ঠোঁট নিয়ে বলল,

-‘ তো পূর্ব ছাড়া তার স্নিগ্ধপরীকে স্পর্শ করবে এমন কে আছে? অবিয়াসলি এটা আমি! এতদিনে আমার স্পর্শ চিনতে পারলি না?’
শেষের কথাটুকু অভিমানের ছোঁয়া লাগিয়ে বললেন তিনি। আমি নিশ্চুপ! পিছন থেকে জাষ্ট চুল স্পর্শ করলে কিভাবে বুঝবো এটা কে?

চোখের কাপড়টা সরিয়ে তিনি হাত দিলেন চোখে। ধীর কন্ঠে বললেন,

-‘ আস্তে আস্তে চোখ খুলে সামনে তাকা। ‘

বলেই হাত সরিয়ে নিলেন। পিছু সরলেন!
আমি ধীরে ধীরে চোখ খুলে থ! হৃদস্পন্দন থেমে যাওয়ার জোয়ার। সামনে তাকাতেই চোখে পানি এসে জমে। ঠোঁটদুটো কাঁপছে, বেগতীক ভাবে!

আমি পিছু ফিরে পূর্ব ভাইয়ার দিকে তাকাই। তিনি আগের ফর্মে নেই। কালো রঙের পাঞ্জাবি আর জিন্স পড়া! পকেটে হাত ঢুকিয়ে আলত হেসে তাকিয়ে আছেন আমার দিকে। হিতাহিত জ্ঞান ফেলে দৌড়ে গিয়ে তার গলা জরীয়ে ধরি। কাঁপা কন্ঠে বলি,

-‘ এসব আপনি করেছেন?’

-‘হু! আমি নাতো কে করবে?স্ট্রেন্জ কথাবার্তা বলিস কেনো দোল?’

তার কথায় পাত্তা না দিয়ে সামনে ফিরে তাকাই। সামনে একটা সুইমিংপুল। তাতে প্রদীপ দিয়ে লিখা
‘আই লাভ ইউ স্নিগ্ধপরী ‘ প্রদীপ গুলোর পাশে লাল গোলাপের পাপড়ির ছড়াছড়ি। সুইমিংপুলের পাশে রয়েছে । লাল আর কালো গোলাপের সহ শুভ্র রঙের পর্দা দিয়ে ডেকোরেশন করা। ছোটখাটো একটা ঘর বানিয়ে ফেলেছে বলা চলে! ডেকোরেশন টা চোখ ধাঁধানো কর!

জায়গাটা একটা ছাঁদের ওপর। সিঁড়ি দিয়ে তিনি আমায় নিয়ে উঠেছেন সেটা ধরতে পেরেছিলাম। পুরো ছাঁদজুরে মরিচ বাতির আবির্ভাব।
সবকিছু সহ একটা জিনিস আমায় বেশ আকর্ষণ করেছে আর তা হচ্ছে কালো গোলাপ! মাই উইকনেস।

ওড়নার আঁচলে টান পড়াতে হুশ ফিরে । পিছে ঘুরে দেখি পূর্ব ভাইয়া হাঁটু গেঁড়ে বসে। তার হাতে কালো গোলাপের তোড়া! তোড়ার ঠিক মাঝখানটায় চকলেটের আনাগোনা। আমি তাকে এভাবে হাঁটুগেড়ে বসতে দেখে অস্থির হয়ে পড়ি। চটপট কন্ঠে বলি,

-‘ এভাবে বসে আছেন কেনো? উঠে দাঁড়ান! ‘

পূর্ব ভাইয়া তার ঠোঁটে আঙ্গুল রেখে ইশারা করেন চুপ থাকতে। আমি চুপ! তিনি বলা শুরু করেন,

-‘ এক স্নিগ্ধমাখা সন্ধ্যায় তোমায় প্রথম দেখেছিলাম। কালো রঙের বেশে! ধবধবে সাদা এক পরী কালোর মাঝে গুটিয়ে ছিলো। সেই পরীটাকে দেখার সাথে সাথে আমি তার নাম ঠিক করি স্নিগ্ধপরী! কারণ তাকে দেখা মাত্র আমার শরীরে শীতলতা বয়ে যায়, কঠিন হৃদয় কোমলতা ফিরে পায়। তার রূপের মাধুরীতে হৃদস্পন্দন স্তব্ধ হয়ে যায়। স্নিগ্ধপরীর কন্ঠস্বর শুনে প্রথম বারের মতো অযাচিত কারণে কেঁপে উঠেছিলো আমার দেহ। আত্নায় বয়ে গিয়েছিলো কোমলতা। সেই ছোট্ট স্নিগ্ধপরীর প্রেমে আমি সেদিনই পড়ে যাই। তার রূপে আমি সম্মোহীত হয়ে যাই ক্ষনেই। স্নিগ্ধ পরী যে আমায় তার স্নিগ্ধ প্রেমের সম্মোহন করেছিলো। আমি তাতে সাড়া দেই! ‘

শ্বাস ফেললেন তিনি। নিস্তব্ধ হয়ে চেয়ে আছি। তিনি আবার বললেন,

-‘ ইউ নো হোয়াট স্নিগ্ধপরী? আমার কখনো মনে হয়নি আমিও কোনোদিন প্রেমে পড়বো। কাওকে নিজের থেকে বেশি ভালোবাসবো। কারো সেফটির চিন্তায় নিজের রাতের ঘুম হারাম করবো। এন্ড সি এটা হয়েছে। তোমার কারণে! প্রথম দেখার কিছুদিন পর যখন আমি অনুভব করি আমি উইক হয়ে যাচ্ছি তোমার ওপর। তখন শুরু করি খারাপ ব্যাবহার। কষ্ট দেই! তারপর এক পর্যায়ে দূরে চলে যাই। তোমার থেকে দূরে সরে যাওয়ার পর এক একটা দিন আমার কাছে নরক সমেত ছিলো! তবুও নিজেকে সামলে বেঁচে ছিলাম । তোমার ছবি নিয়ে। সেই স্নিগ্ধমাখা চেহারা দেখে! ‘

টলমলে চোখদুটো আমার! কিছু বলার জন্য হাসফাস করছি। তবে পূর্ব ভাইয়া আবার বললেন,

-‘ দেশে ফিরে আসি অন্যরূপে। কঠোর হতে চেয়েও পারিনি। হিংস্রভাবে ভালোবেসেছি ফাজ রূপে! তোমাকে যারা কষ্ট দিতো তাদের নিমিষেই শেষ করে দিতাম। তবে সেটা মাত্রই ফাজ রূপে। পূর্ব এমনটা করেনি । পূর্ব ছিলো উন্মাদ প্রেমিক। আড়ালে! আড়ালে সে ভালোবাসতো তার স্নিগ্ধপরীকে। তবে আজ খোলাসা করতে চাই।,,,, (থেমে) ভালোবাসি তোমায় স্নিগ্ধপরী! পাশে চাই তোমায়। দেহের শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার আগ পর্যন্ত পাশে চাই। তোমার হাতটা ধরে বহু বছর পার করতে চাই। দেবে কি সেই সুযোগ? ‘

গলা দিয়ে শব্দ বের হচ্ছেনা। তার সামনে হাটুগেড়ে বসে শক্ত করে গলা জরীয়ে ধরি। কান্না আঁটকে রাখার চেষ্টা চালাতে পূর্ব ভাইয়া আমায় জরীয়ে ধরে বললেন,

-‘ কাঁদো! আজ কাঁদতে নিষেধ নেই। কিছু ব্যাপারে কাঁদা বেটার। ‘

ফুপিয়ে কেঁদে দিয়ে তার ঘাড়ে মাথা নুইয়ে দেই। জীবনটা এতো সুন্দর কেনো?

চলবে….