#স্নিগ্ধ_প্রেমের_সম্মোহন
#সাদিয়া_মেহরুজ_দোলা
#পর্ব____৩৫
ভোরের স্নিগ্ধময় এক টুকরো আলো মুখে পড়তেই ঘুম ভেঙে যায়। চোখ খুলে পিটপিট করে চারিপাশে তাকাই। এই ভোরের আলোটা পরিবর্তিত! এটা বাংলাদেশের নয় টরেন্টো শহরের একফালি রৌদ্দুর। তাই তো ঠোঁটের কোনায় মুচকি হাসি ফুটে উঠার বদলে কপালে পড়েছে বিরক্তির চামড়া কুঁচকানি!
উঠে বসে বেড সাইডে রাখা ফোনটা নিয়ে এলার্ম অফ করি। এখন দুপুর ২ টা বাজে। দুই সপ্তাহের কড়া ধকলে আজ বেশ দেরী করে ঘুম ভেঙ্গেছে।
টরেন্টোতে আসা ২ সপ্তাহ ৩ দিন হলো আজ। বাংলাদেশ থেকে আসার পরপরই আলসেমিতে মেখে থাকা জীবনটা উল্টো পাল্টা হয়ে ব্যাস্ততার সাথে এঁটে সেঁটে গিয়েছে। প্রথমে এখানকার মেডিকেল ভর্তি! এটা ছিলো সবচেয়ে বড় প্যারা। বিডিতে টপ করেছি বলে এখানে এতো সহজে মেডিকেলে আমায় এডমিট করায়নি। টানা দুই সপ্তাহ নিয়ে ভাইভা, টেষ্ট এর পর টেষ্ট, এদিক সেদিক ছোটাছুটি! সব কিছু মিলিয়ে অতঃপর টরেন্টোর এক নামকড়া মেডিকেল কলেজের খাতায় নিজের নামটাকে স্থাপন করতে পেরেছি।
এখানে আসার পর থেকে বহু সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছে। প্রথমত জলবায়ু পরিবর্তন। দ্বিতীয়ত বাবা মাকে ছাড়া থাকা। তৃতীয়ত আবহাওয়া এর সাথে তাল মিলাতে না পেরে হটাৎ অসুস্থ হয়ে পড়া। তবে সায়ান ভাইয়া, অভ্র ভাইয়া তারা হেল্প করেছেন অনেক যার ফলস্বরূপ অতীব কম সময়ে এখানকার পরিবেশের সাথে খাপ খাওয়াতে পেরেছি। পূর্বকে জানানো হয়নি, সে ক্যালগ্যারীতে গিয়েছেন মিটিং এটেন্ড করতে কানাডা এসেই। কাজের চাপে তার অবস্থা বেহাল! মাঝেমধ্যে তার অবস্থা দেখে কেঁদে দেই। তার এই বেহাল দশা অনেকটা আমার কারনেই। পূর্ব আরেকটু আগে আসলে এতোটা কাজের প্রেশার পড়তো না তার ওপর।
বেড থেকে নেমে ধীর পায়ে এগিয়ে কাঁচ দিয়ে তৈরিকৃত দেয়ালটার সামনে যাই। নিচে তাকাতেই মানুষের পদচারণা লক্ষ্য করা যায়। এখানকার একটা এপার্টমেন্টে ভাড়া থাকি আমি আর ভাইয়া। পূর্ব, অভ্র শত বার বলেছিলেন তাদের বাংলো বাড়িতে থাকতে তবে থাকা সম্ভব না।বাবার কঠোর নির্দেশ বিয়ের আগে একসাথে, এক বাড়ির ছাঁদের নিচে থাকা যাবেনা কিছুতেই। তাছাড়া পূর্বদের বাংলো বাড়িটাকে আমার মেডিকেল কলেজ আর ভাইয়ার ভার্সিটি দুটোই অনেক দূর হয়ে যায়।
এই দুই সপ্তাহে কানাডা আসার পর পূর্বের সাথে সময় করে দুই মিনিট কথা বলা হয়ে উঠেনি। ব্যাস্ততা নিয়ে তিনি ফোন দিলে আমি কিছুক্ষণ কথা বলে কেটে দেই। বারংবার বাহান দেই’ টরেন্টোতে এসে কথা বলবেন, এখন আমার কাজ আছে। ‘ তখন রাগী দৃষ্টি দিতো পূর্ব! আমি সেই দৃষ্টি উপেক্ষা করে কেটে দিতাম কল! বেচারা কিছু করতেও পারতো না।
ফোন আসার শব্দে ধ্যান ভাঙ্গে! বাহির থেকে গভীর দৃষ্টি সরিয়ে বেডের কাছে গিয়ে ফোন তুলে নেই। আম্মু কল দিয়েছে। ঠোঁটে প্রসারিত হয় অমায়িক হাসি। ফোন রিসিভ করতেই আম্মুর কান্নারত কন্ঠ ভেসে। আমি স্বাভাবিক। তবে ভেতরটা ছাড়খার হয়ে যাচ্ছে। এই কদিন আম্মু যতবার ফোন দিয়েছে ততবারই তার কাঁদো কন্ঠ কানে ভেসে এসেছে।
আমি নরম সুরে বলি,
-‘ আম্মু? আজও কেঁদেছো? আমি কিন্তু তোমার কল আর রিসিভ করবো না। রাখো ফোন, বাবাকে দাও! বাবা কই?’
আম্মুর কান্নাটা ভারী হলো। তিনি মলিন কন্ঠে বললেন,
-‘ কি যে দরকার ছিলো তোদের দু’জনের কানাডা যাওয়ার। তোদের ছাড়া এক একটা মূর্হত বিষের মতো লাগে মা। দেশে ফিরে আয় না।’
জমে থাকা কান্নাটাকে দমিয়ে বলি,
-‘ বললেই তো আসা যাবেনা আম্মু। আগামী সপ্তাহ থেকে আমার ক্লাস। ভাইয়ার ক্লাস তো আগে থেকেই শুরু হয়েছে। ক্লাস নেয়া শুরু করেছে ও। তুমি আসোনা? ‘
-‘ বললেই আসা যায়? তোর বাবাকে রেঁধে খাওয়াবে কে?’
আমি দুষ্ট হেসে বলি,
-‘ বাবাকে তো বড় চাচিই রান্না করে খাওয়াতে পারে। আসল কথা বলো তুমি বা আব্বু দুজন দুজনকে ছাড়া থাকতে পারবে না। ‘
বলেই খিলখিল করে হেসে উঠি! প্রেমের বিয়ে আব্বু আম্মুর। ওপাশ থেকে আম্মু লজ্জা মিশ্রিত কন্ঠে ধমক দিয়ে বলল,
-‘ সর বেয়াদব মেয়ে। দিনদিন ফাজিল হচ্ছিস তুই। তা সায়ান কোথায়? ক্লাস নিতে গিয়েছে? ‘
-‘ হু! বাবা কোথায়?’
-‘ সে তো সকাল হতেই ফ্যাক্টরীতে ছুটেছে। ‘
আম্মুর সাথে প্রায় আধাঘন্টার মতো কথা বলে ফোন কেটে দেই। উদ্দেশ্য ফ্রেশ হয়ে বাহিরে যাওয়া। শপিং সহ টরেন্টো শহরটাকে একটু ঘুরে দেখবো। আগামী সপ্তাহ থেকে ক্লাস! সময় যেনো তরতর করে চলে যাচ্ছে।
ফোন ফের বেডে রেখে ওয়াশরুমের দিকে পা বাড়াতে কর্কশ শব্দে পুনরায় বেজে উঠে সে। বিরক্তি নিয়ে ফোন স্ক্রিনে তাকাতে ক্ষনের মাঝে তৈরি হওয়া বিরক্তিগুলো গায়েভ হয়ে যায়! পূর্ব কল দিয়েছে। চট জলদি রিসিভ করতে নিবো তার আগেই কেটে যায়। অতঃপর আসে এক আকুতিভরা ম্যাসেজ। ম্যাসেজটা এরূপ,
-‘ দোলপরী প্লিজ পিক আপ দ্যা ফোন! আমি এখন বিজি নেই। কাজ শেষ। টরেন্টো ব্যাক করছি। একটু কথা বলবো ফোনটা রিসিভ কর প্লিজ?’
ম্যাসেজটায় সম্পূর্ণ চোখ বুলাতে পুনরায় ফোন আসে। রিসিভ করার দুই মিনিট দু’পক্ষই চুপ! এক পর্যায়ে দীর্ঘ এক শ্বাস ছেড়ে পূর্ব বলল,
-‘ দোলপরী? একটু কথা বল প্লিজ? কতদিন তোর কন্ঠস্বর শুনিনা! এতদিন ইগ্নোর করেছিস, ফোন করার পর বারংবার কেটে দিয়েছিস। আজ আসছি আমি! আমাকে ইগ্নোর করার শাস্তি কড়াভাবে দিবো।’
পূর্বের হুমকিস্বরূপ কথাগুলো শুনে থেমেথেমে শরীর কাঁপুনি দেয়! একটা পরিবর্তন হয়েছে। পূর্ব ভাইয়া আমায় তুমি বলতে পারেননি। আর না আমি হজম করতে পেরেছি। তার মুখ থেকে ‘তুই’ ডাকটাই আমার জন্য প্রশান্তি। তবে আমি আর ‘ ভাইয়া ‘ ডাকতে পারিনি। যতবার ভাইয়া ডাকতে নিবো তিনি ঠোঁটের ওপর হুটহাট চুমু খেয়ে নিয়েছেন তাই আর সম্ভব হয়নি।
-‘ কথা বলবি না? চুপ থাকার পণ করেছিস? ফাইন! একটাবার আসতে দে, সব ত্যাড়ামি আমি ছুটাবো। ‘
আমি ইতস্তত বোধ করে বলি,
-‘ অদ্ভুত, কথা বলার সুযোগ তো দিবেন নাকি? নিজে কথা বলতে থাকলে আমি কখন বলবো?’
ওপাশ থেকে নিস্তব্ধতা। কিছুক্ষন পর তিনি বললেন,
-‘ কতদিন পর তোর ভয়েজ শুনলাম। মনের অশান্তকর ঢেউ আজ শান্ত হলো। কেনো তুই আমায় আমার ভালো লাগার সম্পদগুলো দূরে রাখিস বলতো? ‘
নিশ্চুপ আমি! বাম পায়ের আঙ্গুলগুলো দিয়ে সজোরে ফ্লোর আঘাত করছি। কাঁপা কন্ঠে বলি,
-‘ আপনি টরেন্টো তে ব্যাক করছেন আজ?’
-‘ হু। ‘
-‘ কাজ কমপ্লিট?’
-‘ পুরোপুরি না। ব্রেক চলছে। আবার একসপ্তাহ পর আসতে হবে। ‘
আমি ‘ওহ ‘ বলে চুপ হয়ে যাই। পূর্ব বললেন,
-‘ আমার আসতে আসতে বিকেল হবে। রেডি থাকিস। ‘
আমি চটপট করে বলি,
-‘ কেনো? কোথাও যাবেন? ‘
পূর্ব মিহি কন্ঠ বললেন,
-‘ হ্যা! আজ পুরোটা সময় তুই আমার সাথে থাকবি। এই পুরো দুই সপ্তাহ ইগনোর করার শাস্তি এটা। ‘
ফোন কেটে দিয়ে বেডে ছুড়ে মারি। দুহাতে মুখ ঢেকে মৌনতা পালন করি! কি আজব! আমি কি তাকে ইচ্ছে করে ইগনোর করেছি? তার ভালোর জন্যই তো এমনটা করা। এরজন্য আবার শাস্তি কেন?
।
কালো রঙের জিন্স সাথে সাদা রঙের কূর্তি! গলায় কালো স্কাফ জুলিয়ে বিষন্ন মুখে বসে আছি। অবাধ্য চুলগুলো ফ্লোরে গড়াগড়ি খাচ্ছে। পাশ থেকে অরিন ফোন স্ক্রল করা বাদ দিয়ে তীক্ষ্ণকর দৃষ্টি দিয়ে বলল,
-‘ পূর্ব ভাই যখন থাকে না তখন দেবদাশ এর মতো থাকবি। যখন আসবে তখন থাকবি থাকবি পেত্নী মার্কা ফেস বানাইয়া, মানে এসব কি?’
বাঁকা চোখে তাকাই অরিনের দিকে। ও উত্তরের আশায় আমার দিকে তাকিয়ে আছি। আমি থমথমে কন্ঠে বলি,
-‘ পূর্ব বলেছে তাকে ইগনোর করার জন্য আমায় শাস্তি দিবে। বুঝতে পারতেছিস? আগের বার যখন শাড়ী পড়লাম তখন তিনি আমায় শাস্তিস্বরূপ কান ধরে উঠবস করিয়েছেন। এবার না জানি কি করেন, আল্লাহ মাবুদ! ‘
অরিন হেসে কুতকুত। রক্তিম চোখে ওর দিকে তাকাতেই ও চুপসে যায়। আলত কন্ঠে বলল,
-‘ আরে রাগিস কেন আজব? আচ্ছা চিল ইয়ার! পূর্ব ভাই তোকে ভালোবাসে। কড়া কোনো শাস্তি দিবে না নিশ্চিত। ‘
গাড়ির হর্নের আওয়াজ শুনে অরিন আমি একে অপরের মুখ চাওয়া চাওয়ি করি। একজন সার্ভেন্ট তখনি এসে বলল,
-‘ Mam Purbo Sir has come, told you to go down ‘
[ম্যাম পূর্ব স্যার এসেছেন। আপনাকে নিচে যেতে বলেছেন। ]
আমি অরিনের দিকে তাকাতেই ও ইশারায় বায় জানায়! সিড়ি বেয়ে নিচে নেমে দেখি পূর্বকে। গাড়ির সাথে হেলান দিয়ে এক মোহনীয় দৃষ্টি দিয়ে তাকিয়ে আছেন আমার দিকে। ফরমাল লুকে তিনি! পরনে সাদা শার্ট। ওপরের দুটো বোতাম খোলা। সিল্কি লম্বা চুলগুলো কপালের কাছে এঁটে সেঁটে আছে।
আমি থমকে দাঁড়াতে তিনি দ্রুত পায়ে হেঁটে আমার সামনে দাঁড়ান। দিক বেদিক না দেখে পাজাকোলা করে কোলে তুলে নেন তিনি! হতভম্ব হয়ে তার কাঁধে হাত দিই। নিম্নকন্ঠে বলি,
-‘ কোলে নিচ্ছেন কেনো? নিচে নামান! আমি হাঁটতে পারি ‘
পূর্ব আমায় কোলে নিয়ে সামনে এগোতে এগোতে বললেন,
-‘ সেটা আমিও জানি ষ্টুপিড! চুপ থাক। ‘
গাড়ির ফ্রন্টসিটে তিনি আমায় বসিয়ে দিয়ে নিজে ড্রাইভিং সিটে গিয়ে বসে পড়লেন। আমি সিটবেল্ট লাগিয়ে তার দিকে আড়চোখে তাকাই তবে তিনি ব্যাস্ত ড্রাইভিং করাতে!
কুইন্স পার্কের পাশে এসে গাড়ি থামায় পূর্ব! ইশারায় আমায় নামতে বলতেই চট জলদি নেমে চারিপাশ মুগ্ধ নয়নে দেখতে থাকি। রাতে এখানকার সৌন্দর্যটা দ্বিগুণ হয় অরিন বলেছিলো। তা একদম কাঁটায় কাঁটায় সত্যি!
পিছন থেকে কেও জরীয়ে ধরাতে কেঁপে উঠি খানিকটা। পূর্ব ভাইয়া আমার কাঁধে থুতনি রাখেন। গালে দুটো চুমু খেয়ে ফিসফিস করে বললেন,
-‘ কতটা মিস করেছি তোকে এই দুই সপ্তাহ জানিস? এক একটা মিনিট আমার অস্থিরতায় কেটেছে। কাজে ঠিকমতো মন দিতে পারতাম। ভাইয়া তো হেঁসে বলে, আমি নাকি বউ পাগল হয়ে গিয়েছি। আমারও তাই মনে হচ্ছে। এতোটা গভীর ভাবে তোর প্রতি আসক্ত হয়ে পড়বো ভাবনায় আসেনি। ‘
পূর্ব চুপ হয়ে যান। পিছন থেকে জরীয়ে ধরে থাকেন। নড়াচড়া করতে নিলেই রাম ধমক দেন যার ফলস্বরূপ চুপ হয়ে যাই।
চলবে….
#স্নিগ্ধ_প্রেমের_সম্মোহন
#সাদিয়া_মেহরুজ_দোলা
|পর্ব-৩৬+৩৭|
_______________
-‘ আরে সাদাপরী কোথায় যাও?’
………
-‘ ব্রো, মেয়ের ফিগার কিন্তু জোস! একে আজকের জন্য পেলে রাতটা অস্থির কাটবে’
……….
-‘ ওরে ধরে আন যা। আজকে একে দিয়ে রাত কাটাবো।’
ফরাসি ভাষায় বলা অশ্লীল কথাগুলো তীরের মতো কানে এসে লাগে আমার। অল্প কয়েকদিন এর মাঝে ফরাসি ভাষা রপ্ত করে ফেলেছি তাই দূরে বাইকে বসে থাকা ছেলেগুলোর কথা স্পষ্টরূপে বুঝতে পেরেছি।
কাঁপা হাতে থাকে অর্ধগলিত আইসক্রিমটা মাটিতে পড়ে যায়। চোখের কার্নিশে অল্প অল্প পানি এসে জমা হয়ে। ডান দিকে মাথা বাকিয়ে পূর্বকে দেখি! তিনি শান্ত! মুখভাব স্বাভাবিক। তা দেখে আমার অবাক হওয়ার পরিমান আকাশ ছুই ছুই। ছেলেগুলো আমায় নিয়ে এতো বাজে কথা বললো আর পূর্ব স্বাভাবিক? ব্যাপারটা গতানুগতিক হজম হচ্ছেনা। আঁড়চোখে পিছে চেয়ে দেখি চারজন সাদা চামড়ার ছেলে বাইকে বসে বিয়ার খাচ্ছে আর আমার দেখে বিশ্রী কটুক্তি করছে! মাঝেমধ্যে মুখ দিয়ে উদ্ভট শব্দ বের করে বাজে ভাবে পুরো শরীর স্ক্রল করছে!
কাঁদো কাঁদো চোখে পূর্বের শার্টের এক কোনা ধরে টান দেই। তিনি ফোন থেকে দৃষ্টি সরিয়ে আমাতে তাকান। চোখদুটো দেখেও বুঝতে পারছিনা তিনি আসলেই কি শান্ত?
পূর্ব জিজ্ঞেস করলেন,
-‘ কি হয়েছে? কিছু বলবি?’
আমি রাগে দুঃখে দাঁতে দাঁত চেপে বলি,
-‘ ঐ ছেলেগুলো আমায় নিয়ে কটুক্তি করছে আর আপনি চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছেন? তাও নরমালি ভাবে?’
পূর্ব হাই তোলার ভাব করে বললেন,
-‘ ওরা তোকে বলেছে আমাকে নয়! তুই গিয়ে প্রতিবাদ কর। ‘
অবিশ্বাস্য চাহনিতে তাকিয়ে আছি তার দিকে। হাত মুঠো করে বলি,
-‘ আপনি কি কিছুই বলবেন না ওদের? আদার’স টাইম তো কেও বাজে ভাবে তাকালেই তাকে শাসাতেন, তো আজ কি হলো?’
পূর্ব আমার ঘাড় ধরে ধীর কন্ঠে বললেন,
-‘ তখন ছিলাম আমি। আর ভবিষ্যতে যে তোর পাশে থাকতে পারবো তার কোনো গ্যারান্টি আছে? নিজের সেফটি নিজে তৈরি কর! যদি আমার কিছু হয়ে যায় তখন তোকে কে সেফ করবে? গার্ড? তারা কখনোই পারবেনা। ‘
শেষের কথাগুলো ধরা কন্ঠে বললেন পূর্ব। কাঁপাটে চোখে তারদিকে তাকিয়ে আছি। ফুপিয়ে উঠে বলি,
-‘ এসব কি বলছেন আপনি? আপনার কি হবে? উল্টো পাল্টা কথা বলবেন না। ‘
-‘ এসব নিয়ে পরেও কথা বলা যাবে, আগে ঐ ছেলেগুলোকে প্রমান করে দিয়ে আয় তুই দূর্বল না! নারীজাতি দূর্বল না। তারা চাইলেই সব পারে। গো! ‘
আমি কিছু সময় পূর্বের দিকে তাকিয়ে থেকে পিছু ফিরে লম্বা লম্বা পা ফেলে বাইকের ওপর বসে থাকা ছেলেটাকে পাঁচটা থাপ্পড় মেরে দেই রাগের বসে। বাকি চারজন যারা পাশে দাঁড়িয়ে ছিলো সেই ছেলেগুলো থাপ্পড় দেওয়া দেখে এগিয়ে আসে। একজন বলল,
-‘ ঐ *** তোর সাহস তো কম না। বসের গায়ে হাত তুলিস। ‘
সাথে সাথে সেই ছেলেটার গালেও দুইটা থাপ্পড় মেরে দেই। ভয় যেনো আজ আমায় একটুও ধরতে পারছেনা। রাগে গজগজ তাদের ভাষায় বলি,
-‘ বাসায় কি মা বোন নেই? এভাবে রাস্তায় এসে অন্য মেয়েদের টিজ করিস, পরিবার থেকে কোনো শিক্ষা পাসনি? আজ যদি আমার জায়গায় তোদের মা বা বোন থাকতো তাহলে এভাবে টিজ করতে পারতি?’
আমার কথা সম্পূর্ণ হওয়ার পর পরই একজন হুংকার দিয়ে উঠলো। যাকে বাকি ছেলেগুলো ‘বস’ বলে আখ্যায়িত করেছে। ছেলেটি বলল,
-‘ মুখ সামলে কথা বল ব্লাডি বিচ! আওয়াজ নিচে,’
আমি তাচ্ছিল্যের সুরে বলি,
-‘ নিজের মা, বোনের কথা আসতেই অন্যকে গালি দিয়ে, হুমকি ধামকি দিয়ে কথা বললেন? আর আমি যে অন্য কারো বোন, সেটা মাথায় আসলো না? নারীজাতিকে কি আপনাদের দূর্বল মনে হয়? যে আওয়াজ নিচু করে কথা বলবো? এখন যে আপনার মা, বোনকে নিয়ে বলাতে রেগে গেলেন আমি যদি আপনার আপন বোন হতাম তাহলে এমনটা করতে পারতেন আমার সাথে?এমন বিশ্রী ভাষায় কথা বলতে পারতেন? ‘
খেয়াল হলো ছেলেটার চুপসে যাওয়া মুখ। বাকি ছেলে গুলোও মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। আমি তা দেখে স্বস্তির শ্বাস নেই। ফের বলি,
-‘ যদি নিজের মা, বোনের প্রতি ভালোবাসা থাকে তাহলে অন্যদের প্রতিও ভালোবাসা, সম্মান দেখাতে শিখুন। মানুষ মানুষে ভেদাভেদ করা অবশ্যই বুদ্ধি হীনতার কাজ। আজ আপনি আমার প্রতি যেমন আচরণ করলেন কাল আপনাকে দেখে অন্যকেও সেই আচরণ শিখবে, একদিন দেখা যাবে আপনার বোনকে রাস্তায় টিজ করা শুরু করেছে। তা ভালো লাগবে আপনার? আপনাকে দেখে ভালো পরিবারের মনে হচ্ছে কিন্তু আপনি নিজেকে আজ একজন নিচু লোক প্রমানিত করলেন। কারণ ইসলাম ধর্মে বলা আছে, ‘ নিচু লোকের প্রধান হাতিয়ার হচ্ছে অশ্লীল বাক্য।[হযরত উমর (রাঃ)]’এবং আপনি অশ্লীল ভাষা ব্যাবহার করেই আমাকে টিজ করেছেন কিন্তু। ‘
আমি কথা সম্পূর্ণ করতেই ছেলেটা ফরাসি ভাষায় বলল,
-‘ মাফ করবেন! আপনার পা ধরে মাফ চাইছি। ভুল হয়ে গেছে আমার। অনেক বড় ভুল! আপনাকে এই খারাপ কথা গুলো বলার আগে নিজের বোনের কথা মাথায় আনা উচিত ছিলো। ওকেও তো টিজ করতে পারে অন্যকেও! মাফ করে দিবেন বোন। আমার ভুল বিশাল বড় জানি তবুও মাফ চাইছি। ‘
আলত হেসে নরম কন্ঠে বলি,
-‘ মাফ করে দিয়েছি। ভুল বুঝতে পেরেছেন এটাই অনেক। ভালো থাকবেন।’
কথাটা বলে দ্রুত পায়ে চলে আসি পূর্বের কাছে। সে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছেন। আমি যেতেই হাতে তালি দিয়ে খানিক হেসে বললেন,
-‘ আমার দোলপরী এতোটা বুদ্ধিমতী জানতাম না তো! প্রাউড অফ ইউ! ‘
আমি তার কথায় কিছু না বলে সামনে হাঁটতে থাকি। এতে তিনি বেশ খানিকটা অবাক হোন। আমার পিছে দৌড়ে এসে বললেন,
-‘ এই? কি হয়েছে? এত দ্রুত হাঁটছিস কেনো? কথা বলছিস না কেনো?’
আমি তবুও না দাঁড়িয়ে দ্রুত হেঁটে সামনে আগাই। জন মানবহীন রাস্তা। কুইন্স পার্কের রাস্তা সম্পর্কে আমার কোনো ধারণা নেই। তাই একপাশে দাড়িয়ে থাকি মুখ ফুলিয়ে। পূর্ব কাছে এসে বললেন,
-‘ এভাবে মুখ ফুলিয়ে আছিস কেনো?কথা বলবিনা?’
……( নিশ্চুপ আমি)
-‘ তুই কি রেগে আছিস? আমি ওদের কিছু বলিনি দেখে?’
মাথা নাড়িয়ে ‘ না’ বলি!
তিনি এতে অবাক হয়ে পুনরায় বললেন,
-‘ তাহলে কথা বলছিস না কেনো?’
আমি কিছু না বলে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকাকালীন হুট করে হাতে টান পড়ে। পাশে তাকাতেই পূর্ব মাথা নিচু করে তার ওষ্ঠদ্বয় আমার ঠোঁটের স্পর্শ করান। চোখদুটো বড় বড় করে তারদিকে তাকিয়ে ধাক্কা মেরে সরিয়ে দেই! চোখদুটো গোলগোল করে কন্ঠে অবাক স্বর টেনে বলি,
-‘ কি সমস্যা? আপনি তো ভারী অসভ্য লোক। বিনা অনুমতিতে স্পর্শ করেন। ‘
পূর্ব ঠোঁট বাকিয়ে বললেন,
-‘ তোর হ্যাজবেন্ড হই আমি! অনুমতি নেয়ার কি আছে?’
আঁড়চোখে তাকাতেই তিনি একহাত চেপে ধরে বললেন,
-‘ কথা বলছিস না কেনো? কি হয়েছে সেটা তো বলবি? আমি কি কোনো ভুল করেছি?’
আমি ফুপিয়ে কেঁদে বলি,
-‘ ঐ সময় ঐ কথাটা কেনো বললেন? ভবিষ্যতে পাশে থাকবো না, এটা কেনো বললেন?’
পূর্ব হাসলো! এগিয়ে এসে বিনাবাক্যে আমায় কোলে তুলে নেয়। আমি ভ্যাবাচেকা খেয়ে বলি,
-‘ অদ্ভুত! কথায় কথায় কোলে তুলে নেয়ার রোগ আছে নাকি আপনার?নিচে নামান। ‘
পূর্ব বললেন না কিছু। লম্বা লম্বা পা ফেলে একটা বেঞ্চিতে বসিয়ে দিয়ে আমার পাশে বসলেন। একহাত তার হাত মুঠোয় নিয়ে অপর হাত দিয়ে চোখ দিয়ে খানিকক্ষণ আগে গড়িয়ে পড়া অশ্রুগুলোকে নিজ হাতে মুছে দেন।
নরম কন্ঠে তিনি বললেন,
-‘ অযথা কোনো কথা বলিনা আমি দোল। কথাটা বলা দরকার ছিলো। আমি তোকে আর কতদিন সেভ করতে পারবো জানিনা। গোয়েন্দা বিভাগে জয়েন করার পর এ পর্যন্ত অনেক মানুষকে নিজ হাতে কঠিন থেকে কঠিনতর মৃত্যু দিয়েছি। ওদের আত্নীয়,স্বজন বন্ধু বান্ধব আময় হন্য হয়ে খুঁজেছে মেরে ফেলার জন্য কিন্তু আমায় খুজে পায়নি। কারণ ফাজ রূপে আমি খুব অল্প সময়ের জন্য থাকতাম। আমার আসল পরিচয়, আমার পরিবার বা আমার সম্পর্কে কেও কিছু জানতো না। আমাকে দেখেইনি কেও! নিজেকে আড়াল করে রাখতাম পরিবারের জন্য। তোর জন্য! কারণ এরা আমায় উইক করতে আমার পরিবারকেই প্রথমে অ্যাটাক করতো। তবুও আজকাল কিছু মাফিয়া আছে যারা আমাকে খোঁজার জন্য হন্য হয়ে লেগেছে। পেয়েও যাবে আমার পরিচয় হয়তো। তাই বলছি, শক্ত হ! নিজের সেফটি নিজে দিতে শেখ। যাতে আমি না থাকলে তোর কোনো সমস্যা না হয়। ওরা যদি আমায় একবার খুঁজে পায় এক মূর্হতের জন্যও আমায় বাঁচিয়ে রাখবে না দোলপরী! ‘
অশ্রুসিক্ত নয়নে তাকিয়ে আছি পূর্বের দিকে। শেষে না পেরে তার বুকে মাথা রেখে হু হু করে কেঁদে দেই। তার শার্ট খামচে ধরে কান্না দমন করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি কিন্তু কান্নারা আজ আমার বারণ শুনছেই না।
পূর্ব অস্থিরতা নিয়ে বললেন,
-‘ দোল? কাঁদিস না প্লিজ! কষ্ট হয় আমার, আমাকে কষ্ট দিতে এতো কেনো তোর ভালোলাগে বলতো?প্লিজ স্টপ ক্রায়িং! ‘
আমি ওপরের ঠোঁট দিয়ে নিজের নিচের ঠোঁট চেপে ধরি। অতঃপর কান্নারত অবস্থাতাতেই বলি,
-‘ আপনি ক..কেনো এই পেশায় গ..গেলেন? ক..কি দরকার ছ..ছিলো?’
দীর্ঘ শ্বাস ছাড়লেন তিনি! নিম্নস্বরে বললেন,
-‘ প্রথম যখন বাংলাদেশে আসি তখন একরাতে তোর বাবা আর আমার বাবাকে কিছু কথা বলতে শুনি। তারা খুব চিন্তিত কন্ঠে কথা বলছিলেন। যতটুকু সেদিন শুনতে পেরেছিলাম তারা বলছিলেন আমাদের ফ্যামিলি ঝুঁকিতে আছে। কেও বহু বছর ধরে আবরার মঞ্জিলের অস্তিত্ব ধ্বংস করার চেষ্টা করছে। আমাদের দাদার মৃত্যু স্বাভাবিক ভাবে হয়নি। তারাই মেরে ফেলেছিলেন যারা আবরার মঞ্জিলের অস্তিত্ব ধ্বংস করার চেষ্টা করছিলেন। এবার তারা আমাদের পিছে লেগেছে। বাবা আর চাচু পুলিশ, সি.আই.ডি তে এফআইআর ও করেছিলো কাজ হয়নি! তারা কেনো যেনো এই কেসটা নিয়েই হেলাফেলা করতো খুব। তাই সেদিন সিদ্ধান্ত নেই আমিই খুজে বের করবো কালপ্রিট কে, সাড়ে পাঁচ বছরের চেষ্টায় গোয়েন্দা বিভাগের অফিসার হই! বহু চেষ্টায় তারপর প্রমোশন পেয়ে হয়ে যাই সিনিয়র অফিসার! তারপর থেকেই আস্তে আস্তে এই পেশার সাথে আষ্ঠেপৃষ্টে জরীয়ে যাই! নতুন কেস আসে, হ্যান্ডেল করে দোষীদের কঠিন শাস্তি দেয়া নেশা হয়ে দাঁড়িয়েছিলো!লাইফ রিস্কও ছিলো পদে পদে। নয়তো এসবে যুক্ত হওয়ার আগে বিজন্যাস আর সিঙ্গার লাইফ নিয়েই ভালো ছিলাম’
পূর্ব থেমে যান! একদম নিশ্চুপ। তার হাতজোড়া আমার পিঠে অবস্থান করছে। আমি নাক টেনে বলি,
-‘ আপনার কিছু হলে আমি সেদিনই সুইসাইড করবো। ‘
পূর্ব আমার দুবাহু ধরে টান মেরে তার বুক থেকে সরিয়ে তার সামনে আনেন। গর্জে উঠে বললেন,
-‘ একদম এসব ফালতু কাজের কথা মাথায় আনবি না দোল! একদমই না। আত্মহত্যা মহাপাপ! তাছাড়া আমি চাই আমার কিছু হয়ে গেলে তুই একদম নরমাল লাইফ লিড করবি। বুঝতে পেরেছিস?’
-‘ আপনার কিছু হয়ে গেলে আমি বাঁচতে পারবো না পূর্ব। আর আপনার কিছু হবেনা। একদম উল্টো পাল্টা কথা বলবেন না। ‘
-‘ আমার কিছু হলে তোর কি? ভালোবাসিস আমাকে? ‘
হুট করে এই কথায় থতমত খেয়ে যাই। আমতা আমতা করে বলি,
-‘ হটাৎ এই কথা বলছেন কেনো?’
-‘ জানতে চাইছি! ভালোবাসিস আমাকে? ‘
আমি মাথা নিচু করে বলি,
-‘ জানিনা! ‘
পূর্ব তপ্তশ্বাস ফেললেন। তিনি বললেন,
-‘ মারা যাওয়ার আগে কি তোর মুখে ‘ভালোবাসি’ টা শুনে যেতে পারবো না? ভালোবাসিস না আমায়? একটু ভালোবাসলে কি হয়? ‘
আমি চোখ পাকিয়ে বলি,
-‘ আরেকবার মারা যাওয়ার কথা বললে আমি আপনার থেকে অনেক দূরে চলে যাবো। ‘
পূর্ব আমার হাত ধরে টেনে তার বুকের বা পাশে আমার মাথা চেপে ধরলেন! ধুকধুক আওয়াজটা কানে মধুর মতো করে বাজছে। তিনি মাথা নিচু করে গালে গভীর চুমু একে দিয়ে বললেন,
-‘ যেতে দিলে তো যাবি! তুই পূর্বের একান্ত সম্পদ! আমাকে ছেড়ে যাওয়ার কথা মাথায় আনলে খবর আছে। ‘
চলবে…..