স্নিগ্ধ প্রেমের সম্মোহন পর্ব-৪০+৪১

0
1858

#স্নিগ্ধ_প্রেমের_সম্মোহন
#সাদিয়া_মেহরুজ_দোলা
|পর্ব-৪০|

-‘ দাদু আপনি এখানে?’

অভ্র ভাইয়ার কথায় সবাই খাওয়া থামিয়ে দিয়ে পিছে ফিরে তাকায়। বিষ্ফোরিত চোখে চেয়ে আছি দাদুর দিকে। খাবার টেবিল ছেড়ে উঠে দাঁড়ায় সবাই। আমি উঠতে নিলে পূর্ব এসে আমার হাত চেপে ধরে চোখ গরম করে তাকায়! শক্ত কন্ঠে তিনি বললেন,

-‘ দাঁড়াচ্ছিস কেনো একা একা? তোর পায়ে ব্যান্ডেজ ভুলে গিয়েছিস? এখন যদি পড়ে যেতি! ‘

আমি আমতা আমতা করে বলি,

-‘ দাদু এখানে?’

-‘ তিনি আসবেন বলেছিলেন। ‘

আমি চোখ বড় বড় করে বলি,

-‘ তারমানে আপনি জানতেন তিনি আসবে?’

-‘হু! ‘

পূর্বের দিকে একবার তাকিয়ে দাদুর দিকে তাকাই। তার চোখমুখে অসহায় চাহনি উপচে পড়ছে! সরু চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। আমি পূর্বকে ইশারা করি সামনে যাবো। পূর্ব আমার বাহু ধরে ধীরে ধীরে সামনে নিয়ে যেতে থাকেন। সাথে অভ্র, সায়ান, অরণ্য ভাইয়া আর অরিনও অবিশ্বাস্য চাহনু নিয়ে সামনে আগায়!

দাদুর কাছে এগোতেই তিনি এগিয়ে এসে অপরাধী মুখ করে বললেন,

-‘ কেমন আছিস দাদু? মাথা, পায়ের ব্যাথা কমেছে?’

আমি ঘাড় বাকিয়ে ‘হ্যা ‘ বলি!
কেমন অদ্ভুত লাগছে। কাল থাপ্পড় দিলো আর আজ এতো নরম কন্ঠ কথা বলছেন? আমি ধীর কন্ঠে বলি,

-‘ দাদু তুমি এখানে? ‘

দাদু দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। অতঃপর ড্রইং রুমে উপস্থিত সবাইকে পরখ করে গম্ভীর কন্ঠে বলল,

-‘ আমি তোমাদের সবাইকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা বলতে এসেছি। সময় হাতে নেই তেমন! তোমরা বসো বলছি। ‘

দাদুর কথামতো সবাই সোফায় বসে পড়ে। দাদু তার সাথে আনা একটা ব্যাগ থেকে ল্যাপটপ বের করে অন করে। আমি পূর্বের পাশে বসে! সে আমার একহাত শক্ত করে চেপে ধরে আছে। আমাদের সবার মুখে কৌতূহলতার ছাপ!
হটাৎ ল্যাপটপ থেকে বাবার গলার আওয়াজ পেলাম। তপ্তশ্বাস ছেড়ে পূর্বের দিকে তাকাই! তার ভ্রু দুটো কুঁচকানো। দাদু পূর্বের পাশে বসে ল্যাপটপ মাঝে রাখেন। তৎক্ষনাৎ বাবা আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,

-‘ দোল, আম্মু ঠিক আছো তুমি?’

আমি অস্বস্তি নিয়ে বলি,

-‘ ঠিক আছি বাবা! কিন্তু এসব কি হচ্ছে? দাদু? এসব ঘটনা? ‘

বাবার পিছে তখন ফ্যামিলির সবাই এসে জরো। চোখ বড়সড় করে অবাক চাহনিতে দাদুর দিকে তাকিয়ে। শুধুমাত্র বাবার চোখমুখে স্বাভাবিক ভাবটা বিদ্যমান! বাবা বলল,

-‘ আব্বা, বলো সবাইকে! ‘

দাদু ছোট করে শ্বাস ফেলে বললেন,

-‘ শুরু থেকেই বলি। আমি, সৌরভ( অরিনের দাদা), পাবেল(পূর্বের দাদা), তিনজনই আর্মি অফিসার ছিলাম তা তোমরা জানো! ছোটবেলা থেকে আমাদের বন্ধুত। আর্মি হিসেবে কাজ করার পর আমরা তিনজনই খুব সৎ ছিলাম। আমাদের একটাই স্বপ্ন দেশকে অনেক বড় করে তুলবো।দেশের জন্যই কাজ করবো। ভালোই চলছিলো দিনকাল। হটাৎ দেশে আগমন জঙ্গির। তারা শুধুমাত্র আমাদের বাংলাদেশ টাকে ধ্বংস করার জন্য এসেছিলো। কারণটা জানা নেই! তারা সিলেট, চট্রগ্রাম, ঢাকা এই তিন জেলায় হামলা করে অনেক নিরীহ মানুষকে খুন করেছিলো। দেশের কোনো ফোর্সই ওদের ধরতে পারছিলো না।তারপর দায়িত্ব আরোপ করা হয় আমাদের ওপর। ততদিনে আমরা ছিলাম সিনিয়র! আমরা বহু চেষ্টা করে ওদের লিডারকে ধরতে পেরেছিলাম। আর্মিদের রক্ত অনেক গরম থাকতো! তারা দেশের আর্দশ সৈনিক। দুর্নীতি করেনা কখনো। দেশের এতো এতো মানুষ মারার কারণে ঐ লিডার পাঁচজন কে আমরা অনেক কষ্ট দিয়ে মেরেছিলাম। গুলি করে করে শরীরের মাংস গুলোও পানির মতো করে ফেলেছিলাম। আর এই কঠিন, গুরুতর মৃত্যু দেয়াটাই আমাদের জীবনে কাল হয়ে দাঁড়িয়েছিলো। ‘

দাদু ফোস করে শ্বাস ছাড়লেন! তার চোখমুখে পানি টলমল করছে। তিনি ফের বললেন,

-‘ এই জঙ্গি চাপ্টার যখন বন্ধ করে দেই তারপর এক সপ্তাহ পর আমাদের তিনজন এর ওপর এটার্ক হয়। আমার চোখের সামনেই সৌরভ আর পাবেলকে নিষ্ঠুর ভাবে হত্যা করে। ওদের আত্ন চিৎকার আজও আমার কানে এসে বাজে! তখন আমার কিছুই করার ছিলোনা। শুধু ফোন দিয়ে আমি জোহানকে ম্যাসেজ করে বলেছিলাম যাতে ও আর প্রিয়ম( পূর্বের বাবা) সেনাবাহিনীর চাকরি ছাড়তে। যাতে ওদের জীবন ঝুঁকিতে না পড়ে! কিন্তু আমি ব্যার্থ ছিলাম। ঐ জঙ্গিদের পরিবার, বংশধর ঠিক আমাদের ফ্যামিলিকে টার্গেট করে নিয়েছিলো আগেই। ‘

দাদুর চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়লো। ল্যাপটপ স্ক্রিনে তাকিয়ে দেখি মেঝ চাচু, বড় চাচু কাঁদছেন। আমি ধরা কন্ঠে বলি,

-‘ দাদু কেদোনা প্লিজ! ‘

দাদু নাক টানলেন। আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে শীতল কন্ঠে বললেন,

-‘ ঐদিন জঙ্গিরা আমায় বলে ওদের দলে যোগ দিতে। তাহলে আমায় মারবে না। আমি অনেকক্ষণ ভেবে সিদ্ধান্ত নিয়ে রাজি হয়ে যাই। আমার ধারণা ছিলো ওদের দলে থেকে ওদের সবার সম্পর্কে খোঁজ রাখবো। বাংলাদেশের সাথে কিসের শত্রুতা ওদের জানার চেষ্টা করবো। রাজি হয়ে যাই আর ওরা ও আমায় সাদরে গ্রহণ করে! সেদিন সৌরভ, পাবেল আর আরেকজন কে মেরে পুড়িয়ে ফেলে বাসায় পাঠায়, তারপর তোমরা সবাই মনে করেছিলে ঐটা আমিই! ‘

‘ধীরে ধীরে ওদের দলের বিশ্বস্ত হওয়ার চেষ্টা করি। হয়েও যাই, ওদের লিডার প্যানেলের একজন আমি! কিন্তু মেইন লিডার টিমকে আজ পর্যন্ত ওদের কেওই দেখেনি। যার কারণে এখনো অজানা রয়েছে কারণটা কেনো ওরা বাংলাদেশের ক্ষতি করতে চায়?’

দাদুর কথার মাঝে পূর্ব বললেন,

-‘ দাদু আপনি তো তাদের শত্রু। তাহলে ওরা তোমায় ওদের দলে যোগ হওয়ার জন্য অফার কেনো করলো?’

দাদু থমথমে কন্ঠে বললেন,

-‘ আর্মিদের বড় পোস্টে ছিলাম আমি। বাংলাদেশ সম্পর্কে অনেক কিছুই জানি। তাছাড়া ওরা চাইছিলো ওদের দলে বিশ্বস্ত একজন হয়ে বাংলাদেশের সব মূল ডেটা কালেকশন! সব তথ্য বলবো। মাঝেমধ্যেই জানতে চাইতো ওরা, কিন্তু ছলে চাতুরে কথা ঘুরিয়ে নিতাম। আর ওরা কেওই আমায় চাপ দিতো না কোনো কারণ তারা সবাই ট্রেনিং আর শক্তিশালী হওয়াতে ব্যাস্ত ছিলো। এখানে খুন করতো, ওখানে ডাকাতি করে টাকার লালসায় নেমেছে তারা! লোভে সম্মোহীত হয়ে পড়েছে। তবে খুব জলদিই অ্যাটাক করে খুব বড় এটা নিশ্চিত। ‘

দাদু আরো কিছু বলতে নিলেই ফোনে টুং করে আওয়াজ হয়। তিনি তা দেখে উঠে দাঁড়ালেন। দ্রুত কন্ঠে বললেন,

-‘ বাকি কথা অন্য কোনো একদিন বলবো। আমায় এখন কানাডা ছেড়ে যেতে হবে। এই জঙ্গিদের আস্তানা মূলত লন্ডনে। এখনো পুলিশ বা কাওকে কিছু জানিও না পূর্ব। আস্তে ধীরে কাজ করতে হবে। ওরা খুবই মারাত্মক! ওদের কাছে প্রায় তিন হাজার এর মতো বাংলাদেশী বন্দী আছে। যদি ওরা যেনে যায় আমরা ওদের সম্পর্কে এতকিছু জানি তাহলে ঐ লোকদের ক্ষতি করে ফেলবে! ‘

পূর্ব উঠে দাড়িয়ে বললেন,

-‘ কিন্তু দাদু, কানাডা থেকেই তো প্রায় তিনশো জঙ্গি আটক করলাম। ওদের টিমে মোট কতজন আছে? ‘

-‘ পঞ্চাশ হাজারের মতো। আচ্ছা যেতে হবে। আর জোহান তোকে আমি বলেছিলাম পূর্বের সাথে দোলার বিয়ে ওর বিশ বছর হলে দিতে। কারণটা ছিলো ভেবেছিলাম ততদিনে আমি সবকিছু সল্ভ করে ফেলবো! কিন্তু কে জানতো যুদ্ধটা এতো লম্বা হতে চলেছে। যাইহোক যত দ্রুত সম্ভব পূর্ব দোলার বিয়ের ব্যাবস্থা কর! দোলার জীবন হুমকিতে আছে। ওকে সেফটি একমাত্র পূর্ব দিতে পারবে। তাছাড়া আর কেও না! ‘

দাদুর কথা শুনে পূর্বের চেহারাটা খুশিতে চিকচিক করে উঠলো। দাদু আর কিছুক্ষন সবার সাথে কথা বলে বেড়িয়ে যান। বাবা, চাচুদের সাথে কথা বলার এক পর্যায়ে বাবা বললেন,

-‘ তোমাদের ছুটি কবে? বাংলাদেশে আসতে পারবে ২ সপ্তাহের টাইম নিয়ে? বিয়েটা দিয়ে দেই!’

অভ্র ভাইয়া বলল,

-‘ আমাদের সবার ছুটি আর চারমাস পর! ২ সপ্তাহের জন্য দেয়া হয়। টরেন্টোর একটা উৎসবের জন্য এই ছুটিটা দেয়া হবে! ‘

বাবা হাসিমুখে বললেন,

-‘ প্রিয়ম? এই ২ সপ্তাহে তাহলে বিয়েটা দিয়ে দেই কি বলিস?’

বড় চাচু মুচকি হেসে বললেন,

-‘ অবশ্যই! আমি তো দোলাকে আগেই আমার ঘরে উঠাতাম। শুধুমাত্র তুই বলাতে চুপ ছিলাম। ‘

আরো কিছু কথা বলে ফোন কেটে দেয়! একদিন হয়ে গিয়েছে হসপিটাল থেকে এসেছি। বাবাদের সাথে কথা বলার পুরোটা সময় পূর্ব সবার অগোচরে আমার কোমড় চেপে ধরে বসে ছিলেন। অস্বস্তি নিয়ে যতোবার তার দিকে রক্তিম চোখে তাকিয়েছি তিনি টেডি স্মাইল দিয়ে কথা বলায় মনোযোগী হতেন। কথা শেষ হতেই এক দৌড়ে ওপরে চলে আসি!

রাত দুইটা!
বইগুলো সঠিক জায়গায় রেখে পড়নের চাদরটা ঠিকমতো চাপিয়ে বেলকনিতে চলে যাই। আজ এত বছর পর দাদুকে দেখে কতটা প্রশান্তি লাগছে মনে তা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব না। বেশি প্রশান্তি লেগেছে এটা জেনে দাদু জঙ্গি নয়।

দরজা লাগানোর শব্দে পিছে ফিরে তাকাই। পূর্ব! চোখদুটো গোল গোল করে তাকিয়ে থাকার এক পর্যায়ে উঁচু গলায় বলি,

-‘ আপনি এতো রাতে? আমার রুমে? ‘

পূর্ব পকেটে হাত গুজে আমার পাশে এসে দাঁড়ালেন। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে পাজাকোলা করে তুলে নিয়ে বেডে গিয়ে শুইয়ে দেন। উঠতে নিলে চট জলদি তিনি আমার পাশে শুয়ে পড়ে ঘাড়ে মুখ গুজে দেন! শীতল কন্ঠে বললেন,

-‘ ঘুমাতে দে তো! ডিস্টার্ব করিস না। ‘

বলেই চুমু দিলেন শব্দ করে। অতঃপর তার ভারী নিঃশ্বাস কানে এসে ভারী খায়! ঘুমিয়ে গিয়েছেন?

চলবে…

#স্নিগ্ধ_প্রেমের_সম্মোহন
#সাদিয়া_মেহরুজ_দোলা
|পর্ব-৪১|

শরৎকাল এর শেষভাগ! আকাশে পেজা তুলোর মতো সাদা সাদা ফালি মেঘ উড়ে বেড়াচ্ছে নিজ গতীতে! ক্ষনিক হিমেল হাওয়া গায়ে এসে বাড়ি খেয়ে উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে এলোমেলো হয়ে থাকা চুলগুলোকে! তাজা ফুলের সুঘ্রাণ চারিদিকে ছড়িয়ে গিয়েছে বাতাসের তান্ডবে। ছোট ছোট বাচ্চাদের হইচই, বড়দের কাজের আমেজ চারিদিকটা যেনো মনো মুগ্ধকর হয়ে উঠেছে ক্ষনের মাঝেই!

কফি মগে সিপ দিয়ে চারিদিকে তাকাই। নিচে গায়ে হলুদের তোড়জোড় চলছে। দেশে এসেছি আজ দুুদিন। চোখের পলকে কিভাবে যে চার চারটি মাস পার হয়ে গেলো তার খেয়ালই নেই! দেশে আসতে না আসতেই বিয়ের তোড়জোড় শুরু। বাবা, চাচুরা আগে থেকেই বিয়ের শপিং থেকে শুরু করে অনেক কিছু করে রেখেছে যেহেতু বাংলাদেশে আমাদের থাকার সময়সীমা অতি স্বল্পক্ষন! ২ সপ্তাহ পর আবারও পারি দিতে হবে টরেন্টো তে!

চার মাসে আমি বা পূর্ব কেও কাওকে ঠিকমতো বিশ মিনিটের বেশি টাইম দিতে পারিনি। বাংলাদেশে যেতে হবে বলে পূর্বের কাজ ছিলো দ্বিগুণ পরিমানের। আমার নতুন নতুন ক্লাস শুরু হওয়াতে পড়ার চাপ ছিলো বলার মতো! দুজনেই দুই প্রান্তে থেকে হাস ফাঁস করেছি। স্পেশালি পূর্ব! অভ্র ভাই তো বলেছিলো আমি বিনা পূর্বের অবস্থা করুনপ্রায়।

-‘ আজ তোর গায়ে হলুদ আর তুই ডিভানে বসে বিন্দাস কফি খাইতেছিস?’

রাগান্বিত কন্ঠস্বর শুনে পিছু ফিরে তাকাই! অরিন কটমট দৃষ্টি নিয়ে দাঁড়িয়ে। আমি জোরপূর্বক হেসে বলি,

-‘ আজব! আমার বিয়েতে আমি আর কি করবো? যা করার করবি তোরা! ‘

অরিন চোখ পাকিয়ে বলল,

-‘ বুঝলাম বাট রেডি তো নিজে হবি নাকি?’

-‘ হলুদ তো বিকালে। এখন দুপুর হলো মাত্র। এতো তাড়াতাড়ি রেডি হবো কেনো?’

-‘ পূর্ব ভাই সকাল থেকে ১২০ বার কল দিছে। তোরে দেখবে বলে। এখন এই সকিনা রূপে তোর ছবি পাঠাই কেমনে? রেডি হ! পূর্ব ভাই বলছে তার দেয়া লেহেঙ্গা পড়তে দ্যান ছবি তুলে ঠাস করে পাঠাতে! ‘

আমি কিছুক্ষণ তীক্ষ্ণ চোখে চেখে থাকি। অরিন বলার পরপরই মুখ চেপে ধরলো। বুঝলাম, এই কথাটা পূর্ব আমায় জানাতে নিষেধ করেছে। আমি মুচকি হেসে বলি,

-‘ তোর ফোনটা দে তো অরিন ‘

অরিন আমতা আমতা করে বলল,

-‘ কেন? তোর ফোন কই? আমার ফোন চাস কেন?’

আমি চোখ গরম করে বলি,

-‘ দিবি নাকি বল?’

-‘ নে! এতো রাগোস ক্যান?’

অরিন আমার হাতে ওর ফোন দিতেই সুইচড অফ করে দেই। ফোনটা নিয়ে কার্বাডে রেখে দিতেই অরিন হন্তদন্ত হয়ে বলল,

-‘ আরেহ্! কি করিস?ফোন দে? কার্বাডে ক্যানো রাখলি?’

-‘ দিবো না। আমি ফোন হাতে দিলেই তুই পূর্বকে ছবি পাঠাবি। যেটা আমি চাচ্ছি না। তার দেখার হলে এসে দেখে যাবে! ‘

-‘ পূর্ব ভাই তো অনেকবারই আসতে চাইছিলো তার বন্ধুরাই তো আসতে দেয়না। ‘

আমি ড্যাম কেয়ার ভাব নিয়ে বলি,

-‘ হু কেয়ার’স! যা বের হ তো রুম থেকে ঘুমাবো।’

-‘ আবার? ‘

-‘ হু যা! ‘

অরিন চলে যেতেই দরজা আটকে ঘুমিয়ে পড়ি। এদিকে একটা কথাই বারবার মাথায় ঘুরছে। অরিন নিশ্চিত এখন পূর্বের কাছে একটা রাম ধমক খাবে! আহা.. শান্তি!

স্টেজে স্ট্যাচুর মতে বসে আছি! এক একজন এসে হলুদ লাগিয়ে গিয়ে মিষ্টি খাইয়ে যাচ্ছে। বিকাল থেকে সন্ধ্যা হতে চলল এখনো একইভাবে বসে আছি। আম্মু বা অরিন আশপাশে নেই। নয়তো এখান থেকে উঠে যাওয়ার রাস্তা পাওয়া যেতো! বা পাশে তাকিয়ে দেখি বড় চাচি দাড়িয়ে। হেসে হেসে সবার সাথে কথা বিনিময় করছেন।একবার ইচ্ছে হলো চাচিকে ডেকে বলি আমি আর বসতে পারছিনা। কিন্তু পরক্ষণে তা আর বলা হলো না! কি না কি ভাববে? তাই ভেবে। পূর্বের দেয়া লেহেঙ্গাটা বেশ ইউনিক সাদার মাঝে হলুদ আর হালকা সবুজের কাজ! সাথে পুরো লেহেঙ্গাতে লাল রঙের স্টোন এর কাজ করা! দেখতে চোখ ধাঁধানো। লেহেঙ্গাটারা দিকে যতবারই চোখ পড়ে ততবারই ঠোঁটের কোনায় ফুটে উঠে মুচকি হাসি!

কিছু সময় পর চাচি এগিয়ে আসলেন আমার দিকে। নরম কন্ঠ বললেন,

-‘ বসে থাকতে থাকতে কষ্ট হচ্ছেনা খুব দোল? রুমে যাবি?’

আমি মাথা নিচু করে বলি,

-‘ না চাচি!সমস্যা হচ্ছে না। ‘

-‘ মিথ্যা বলছিস চাচির কাছে? আমি জানি তোর কষ্ট হচ্ছে। আমি কিছু মনে করবো না রে পাগলি!সবার হলুদ দেয়া শেষ প্রায়। তুই রুমে যা। দাঁড়া অরিনকে ডেকে দেই!’

চাচির দিকে তাকিয়ে মিষ্টি হাসি দিতেই তিনি আমায় মাথায় হাত বুলিয়ে দেন। কিছুক্ষন পর অরিন আর অরা আপু আসে। দুজন আমায় নিয়ে স্টেজ ছেড়ে নিজ রুমে দিয়ে আসেন! রুমে প্রবেশ করতেই কাচা ফুলের গয়না, হলদু সহ বেডে শুয়ে পড়তেই অরা আপু বলল,

-‘ আরে আরে কি করছিস? গয়না আর হলুদ ধুয়ে তারপর বেডে গিয়ে শুয়ে থাক! ‘

আমি ক্লান্তিমাখা কন্ঠে বলি,

-‘ আমার শক্তি নেই আপু। ক্লান্ত লাগছে প্রচুর। এতো প্যারা কেনো বিয়েতে?পিঠ ব্যাথা হয়ে গিয়েছে। ‘

অরা আপু হাসলো। অতঃপর বলল,

-‘ মাত্র তো শুরু। আরো কত ফাংশন আছে! সন্ধ্যায় মেহেদী ফাংশন তারপর সঙ্গীত! কাল বিয়ে, পরশু রিসিপশন! এর মাঝে রেষ্ট পাবি বলে মনে হয়না।তাছাড়া বিয়ের পর পূর্ব তোকে এক মিনিট ক্ষ্যান্ত দেবে কিনা দেখ! যেই অপেক্ষা করেছে।’

অরা আপু, অরিন অট্টহাসি দেয়!

আমি চট জলদি বেড থেকে উঠে বসি আপুর এমন লাগামহীন কথাবার্তা শুনে। লজ্জায় গালদুটো এতক্ষণে নিশ্চিত লাল টুকটুকে হয়ে গিয়েছে। আমি শক্ত কন্ঠে বলি,

-‘ ছিহ! কিসব বলো আপু? রুম থেকে বের হও আমি ফ্রেশ হবো। ‘

অরা আপু হাসতে হাসতে বলল,

-‘ যাচ্ছি লাজুকলতা! তবে হলুদ সব ধুবি না। একটা রীতি আছে। পাড়ার বিবাহিত মহিলারা এসে তোকে গোসল করাবে। ‘

-‘ মানে কি? আমি কি বাচ্চা? আমাকে গোসল করাবে কেনো! ‘

-‘ ঐযে বললাম রীতি! ‘

অরা আপু কথা শেষ করতেই অরিন হটাৎ তাড়া দিয়ে বলল,

-‘ আপু জলদি চলো। এখন দোলকে প্রাইভেসি দেয়া উচিত। বেচারা পূর্ব ভাই কতক্ষণ যাবৎ বেলকনিতে ওয়েট করছে। ‘

অরিন কথা সম্পূর্ণ করে অরা আপুর বাহু ধরে টেনে বাহিরে নিয়ে যায়। সেদিকে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে আছি। কি বললো ও? পূর্ব? বেলকনিতে?

ঘাড় বাকিয়ে পিছু ঘুরতেই দেখি পূর্ব দাঁড়িয়ে। দেয়ালের সাথে হেলান দিয়ে দুহাত পকেটে গুজে স্টাইল মেরে দাড়িয়ে। ঠোঁটের কোনায় বাঁকা হাসি। আমি থতমত খেয়ে তাকিয়ে আছি! বেলকনির দরাজ খোলা তারমানে এখান দিয়েই এসেছেন তিনি!

আমি আমতা আমতা করে বলি,

-‘ আ..আপনি? এখানে? ‘

পূর্ব দেয়াল ছেড়ে এগিয়ে আসেন। লম্বা লম্বা পা ফেলে দরজার কাছে গিয়ে ঠাস করে দরজা লাগিয়ে লক করে দেন। বুকে ধ্বক ধ্বক আওয়াজ ক্রমেই বাড়ছে আমার! তিনি এগিয়ে এসে আমার দুহাত ধরে হেঁচকা টান মেরে কোমড় চেপে ধরেন। আমায় নিজের সাথে চেপে ধরেন অতি জোরে! এক বিন্দুও মাঝে ফাঁকা রাখেননি। অস্বস্তি নিয়ে বারংবার এদিক সেদিক তাকাচ্ছি। কিছু সময় পার হয়ে যাওয়ার পর তার দিকে মাথা তুলে দেখি তিনি এক দৃষ্টিতে নেশাক্তময় দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। আমি থতমত খেয়ে বলি,

-‘ এই বাসায় এসেছেন কেনো? চাচা, চাচু জানেন? আপনি বাসায় যান প্লিজ! আমি চেঞ্জ করবো! ‘

পূর্ব সরলেন না বরং কোমড়ের কাছটায় আরো জোরে চেপে ধরলেন। মাথা নুইয়ে আমার কানের কাছে এনে ফিসফিসিয়ে বললেন,

-‘ আমার বউকে সবাই হলুদ লাগালো, তাহলে আমি বাদ থাকবো কেনো?হু? ‘

চোখ গোলগোল করে তাকিয়ে আছি তার দিকে। অস্বস্তি জনিত কন্ঠে বলি,

-‘ ম..মানে? আপনি কি এখানে আমাশ হলুদ লাগাতে এসেছেন?’

-‘ হু! ‘
বলেই তিনি মাথা নিচু করে নাকের ডগায় টুপ করে চুমু বসিয়ে দেন। কোমড় থেকে নিজের হাত সরিয়ে নিয়ে দ্রুত বেগে বেলকনিতে যান। ক্ষনের মাঝেই ফিরে আসেন হাতে সোনালি রঙের একটা বাটি নিয়ে। দেখতেই বোঝা যাচ্ছে তার ভিতর হলুদের বসবাস! পূর্ব এগিয়ে এসে তার একহাত দিয়ে একমুঠো হলুদ নিয়ে নিজের দুইগালে মাখেন। অতঃপর বাটিটা পাশে রেখে দিয়ে এগিয়ে এসে দাড়ান আমার সন্নিকটে ঘেঁসে দাড়ান! হলুদ মাখা হাতটি দিয়ে কোমড় ধরে হেঁচকা টান দিয়ে পুনরায় তার সাথে মিশিয়ে নেন! তার পরবর্তী স্টেপ বুঝতে না পেরে ড্যাবড্যাব করে চেয়ে আছি তার মুখপানে!

পূর্ব মাথা নিচু করলেন। তার গাল দিয়ে আমার গাল স্পর্শ করিয়ে ঘসে দিয়ে তার মুখে লেগে থাকা হলুদ আমার মুখে এঁটে সেঁটে মাখিয়ে দেন! শ্বাস আটকিয়ে স্তব্ধ হয়ে দাড়িয়ে আছি! তিনি এমন কিছু করবেন তা আসেনি আমার কল্পনাতে। পূর্ব তার গলায় নামিয়ে ঘাড়ে নিজের মুখ ঘসে হলুদ লাগিয়ে দেন। দাঁড়ির খোঁচা লেগে শিরদাঁড়া কেঁপে উঠলো! এই মূর্হতে তাকে ধাক্কা দিয়ে দূরে সরিয়ে দেয়ার ব্যাপারটা মাথা থেকে দূরে সরে যায়! ঘাড়ে নিজের দুগাল ঘসে তিনি মাথা তুলে নেন! চোখের দিকে তাকিয়ে এক পর্যায়ে মাথা নিচু করে কপালে সময় নিয়ে চুমু খান!

হার্টবিট অতীব দ্রুত গতীতে চলছে। যেনো এখনি বের হয়ে আমার হাতে এসে পড়বে। তার এহেন কান্ডে কিছু বলার শব্দ কোথায় যেনো হারিয়ে ফেলেছি। শব্দ ভান্ডার খালি খালি লাগছে! শুকিয়ে যাওয়া গলায় শুকনো ঢোক গিললাম। কাঁপা কাপি অনবরত চলছেই! বন্ধ হওয়ার নামই নেই। আকস্মিক এমন ঘটনা ব্রেন নিতে না পারায় তারা পরবর্তী প্রতিক্রিয়া জানাতে হিমশিম খাচ্ছে।

আমি চট জলদি দুহাত দিয়ে তাকে ধাক্কা দিয়ে দূরে সরিয়ে দেই। গালদুটো গরম হয়ে রক্তিম বর্ন ধারণ করেছে। পিছু ঘুরে বুকে হাত দিয়ে লম্বা শ্বাস টেনে নেই। তৎক্ষনাৎ পূর্বের কন্ঠস্বর কানে আসলো! তিনি বললেন,

-‘ এতটুকুই টার্চ করাতে যদি এই হাল হয়, তাহলে কাল রাতে কি করবি?’

পূর্বের লাগামহীন কথায় চট জলদি পিছু ঘুরে কটমট দৃষ্টি দেই! তিনি ভ্রু কুচকে দাঁড়িয়ে ছিলেন। আমি তাকাতেই সটান হয়ে দাঁড়ান! আমি খানিকটা রেগে বলি,

-‘ অসভ্য, বজ্জাত লোক! বের হোন রুম থেকে! ‘

পূর্ব স্ব-শব্দে হেঁসে দেয়। দ্রুত পায়ে এগিয়ে এসে আমার দুইপাশে হাত রেখে বন্দী করে নেন। তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে বললেন,

-‘ রিভলবার কে চালাতে শিখিয়েছে তোকে? এতগুলো মানুষকে মেরে ফেললি কিভাবে?’

আমি থতমত খেয়ে বলি,

-‘ আপনি জানলেন কি করে আমি মেরেছি?’

-‘ তোকে যেখানে আয়াফ গর্দভটা বন্দী করে রেখেছিলো ঐটা ছিলো পরিত্যাক্ত একটা রাসায়নিক গুদাম! পরিত্যাক্ত হলেও সিসি ক্যামেরা লাগানো ছিলো। ফুটেজে দেখেছি। এন্ড আ’ম সিয়র ট্রেনিং নিয়েছিস যেকোনো ভাবে! এতোটা সুক্ষ্ম, দক্ষতার সাথে ট্রেনিং প্রাপ্ত ব্যাক্তিরাই গুলি করতে পারে। বল! কে শিখিয়েছে তোকে?’

মৌনতা পালন করার এক পর্যায়ে শীতল কন্ঠ বললেন,

-‘ বাবা! সেফটির জন্য তিনি শিখিয়েছিলেন। গার্ডদের ওপর তার পূর্ণরূপে আস্থা ছিলো। ‘

পূর্ব একগাল হাসলেন! পরিশেষে বলল,

-‘ প্রথমবারের মতো কাজের মতো কাজ করেছে তোর বাবা। আ’ম প্রাউড অফ হিম! এনিওয়ে যাচ্ছি এখন। যা রেষ্ট নেয়ার আজ নিয়ে নে! কাল ফায়াজ আবরার পূর্ব তোকে কিছুতেই ছাড়ছেনা! মাইন্ড ইট!’

ফের একরাশ লজ্জা দল পাকিয়ে এসে আমায় আক্রমণ করে। পূর্ব চলে যেতেই দীর্ঘশ্বাস ছাড়ি। লোকটা নিলজ্জ!

ম্যাসেজ টোন এর আওয়াজ হতে সেদিকে তাকাই। ফোন হাতে নিতেই চক্ষু চড়কগাছে! কাঁপা হাত থেকে ফোনটা সজোরে পড়ে যায় মাটিতে। স্থির হয়ে সামনে তাকিয়ে আছি! মাত্র দেখা ছবিটা চোখের সামনে ভাসছে বারবার। কি ভয়ংকর দৃশ্য! ভাবতেই লোমকূপ সাড়ি সাড়ি ভাবে দাঁড়িয়ে পড়ে। ব্যালেন্স ধরে রাখতে না পেরে ধপ করে বেডে বসে পড়ি। মূর্হতেই যেনো হাত পা সব ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে….!

চলবে…..

_____________________

[ভুল ত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন। রি- চেইক করিনি।😪]