#এক_মুঠো_প্রেম
#Writer_Mahfuza_Akter
#পর্বঃ১৭
-প্রণব মেহরাজ চৌধুরী!!! ……
সুনশান পরিবেশে স্পৃহার মুখ থেকে অস্ফুটে নিঃসৃত শব্দ তিনটা প্রণবের কানে পৌঁছুতেই ওর ভ্রু যুগল আপনাআপনি-ই সংকুচিত হয়ে এলো। মেয়েটা প্রণবকে চেনে- এটা অস্বাভাবিক কিছু না! তবে ওর পুরো নাম কী করে এই মেয়েটা জানলো- সে ব্যাপারটাই ওর মনে প্রশ্ন সৃষ্টি করছে। প্রণব তো নিজের বাবার ‘চৌধুরী’ পদবিটা ব্যবহার করে না! তাই সন্দিগ্ধ কন্ঠে প্রশ্ন করে বসলো সে,
-আমার কয়েকজন কাছের মানুষ ব্যতীত বাইরের দুনিয়ার সবাই আমায় ‘সিঙ্গার প্রণব মেহরাজ’ নামেই জানে। আপনি আমার পুরো নাম কীভাবে জানলেন বলুন তো?…
স্পৃহা চোখ তুলে মাথা উঁচিয়ে প্রণবের মুখের ওপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করলো। এই প্রথম মুখোমুখি দেখছে তাকে স্পৃহা। সুউচ্চ বলিষ্ঠ সত্তার শ্বেত-শুভ্র সেই গাম্ভীর্য পূর্ণ মুখশ্রী এতো কাছ থেকে দেখতে পাবে, ভাবতেই পারেনি স্পৃহা। তবে সবচেয়ে চোখে পড়ছে তার কাঁধে আড়াআড়ি ভাবে ঝুলানো গিটারটা।
স্পৃহাকে দূর্বল চোখে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে বেশ বিরক্ত হলো প্রণব। মেয়েদের এমন স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকাটা ওর মা-রা-ত্ম-ক অপছন্দের একটা বিষয়। প্রচন্ড রকমের বিব্রতবোধ করে সে এমন পরিস্থিতিতে পড়লে। তাই একটু গলা ঝেড়ে বললো,
-তো মিস অর মিসেস …… হোয়াটেভার!!! আমাকে স্ক্যান করা শেষ হলে আমার কোয়েশ্শেন-এর আন্সারটা দেবেন, প্লিজ? আমার হাতে আপনার জন্য আনলিমিটেড সময় নেই। আই নিড টু গো!
কথাগুলো কর্ণকুহরে বারি খেতেই স্পৃহা যেন সম্বিৎ ফিরে পেল। হালকা নড়েচড়ে উঠতেই নিজেকে অন্য এক পুরুষের সাথে ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ছিটকে সরে এলো সে। হাটতে হাটতে এই সুনশান রাস্তায় কখন চলে এলো, টেরই পায়নি স্পৃহা।
ল্যাম্পপোস্টের আবছা আলোয় স্পৃহার অশ্রুভেজা হলদেটে মুখটা এবার ভালোভাবে চোখে ধরা পড়লো প্রণবের। মেয়েটা এতো রাতে একা এই রাস্তায় কাঁদতে কাঁদতে হাঁটছিল কেন? চিন্তিত ভঙ্গিতে তাকিয়ে থেকে প্রণব বললো,
-আপনি কি কথা পারেন না? যাইহোক, আমি আর আপনার উত্তরের আশায় দাঁড়িয়ে থাকতে পারছি না। আপনি কি উত্তর দিবেন? স্যায়, ইয়েস অর নো!
কথাগুলো স্পৃহা যেন শুনেও শুনলো না। কয়েক পা পিছিয়ে গেল সে। প্রণব ভ্রু বাঁকিয়ে তাকিয়ে আছে। বিরবির করে বললো,
-মেয়েটা কি কানেও শোনে না নাকি? পাগল-টাগল নয়তো??
স্পৃহা এবার কোনো প্রতিক্রিয়া না দেখিয়েই পা ঘুরিয়ে উল্টো ঘুরে চলে যেতে লাগলো। কিন্তু কয়েক পা এগোতেই ওর মাথা ভনভন করে উঠলো। সারা দুনিয়া ঘুরে উঠলো যেন। কয়েকবার চোখ মেলে রাখার ব্যর্থ চেষ্টা করতে করতে দূর্বল ও নিস্তেজ দেহ নিয়ে লুটিয়ে পড়লো পিচের রাস্তাতেই।
স্পৃহাকে ওভাবে ঢুলে পড়ে যেতে দেখেই প্রণব ছুটে এগিয়ে এলো। ওর পাশে হাটু মুড়ে বসে দিগ্বিদিকশূন্য হয়ে আশেপাশে একবার তাকালো। কম্পিত হাতে স্পৃহার কপাল স্পর্শ করতেই পিলে চমকে উঠলো তার। মেয়েটার গা তো প্রচন্ড গরম! জ্বরে সেন্সলেস হয়ে গেল না তো! ভাবতে ভাবতেই ওকে কোলে তুলে নিলো প্রণব। অদূরে দাঁড় করিয়ে রাখা নিজের গাড়ির দিকে এগিয়ে গেল সে।
গাড়ির কাছাকাছি যেতেই দেখলো ড্রাইভার গাড়ির সামনের বনেটের সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে সিগারেট টানছে। প্রণবকে দেখতেই হাত থেকে সিগারেটটা ফেলে পা দিয়ে পিষে দিলো। চোখ তুলে প্রণবের কোলে অপরিচিত এক মেয়েকে দেখে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো,
-এটা কি ম্যাডাম নাকি, স্যার? আপনার সাথে ভালোই মানিয়েছে। কিন্তু ওনার কী হয়েছে?
ড্রাইভারের এমন উদ্ভট কথা শুনে রাগী দৃষ্টিতে তাকালো প্রণব। দাঁতে দাঁত চেপে বললো,
-কোলে তুললেই ম্যাডাম হয়ে যায় নাকি, ইডিয়েট? মেয়েটা বিপদে পড়েছে, তাই হেল্প করবো। এখন চলো, গাড়িতে ওঠো।
বলেই স্পৃহাকে নিয়ে গাড়ির ব্যাকসিটে বসে পড়লো প্রণব। ড্রাইভার কিছুক্ষণ বোকার মতো তাকিয়ে রইলো। প্রশ্ন করার জন্য মুখ খুলতেই প্রণবের রাশভারি মুখটা দেখে কৌতূহল এক ঢেকো গিলে নিজেকে দমিয়ে নিল সে।
_________________________
ঘড়ির কাটায় রাত দুটো বাজে। এমনসময় বাড়ির ডোর বেল বেজে উঠতেই চমকে উঠলো প্রান্তি। বই বন্ধ করে পড়ার টেবিল থেকে উঠে দাঁড়ালো সে। নিচে এসে দরজা খুলতেই চোখ দুটো গোল গোল হয়ে গেল ওর। সামনে প্রণব দাঁড়িয়ে আছে, তাও স্পৃহাকে কোলে নিয়ে। হতভম্ব হয়ে প্রান্তি বলে উঠলো,
-ভাইয়া… তুই দেশে ফিরেছিস? কবে? আর তোর কোলে পি…
প্রান্তির কথা শেষ হওয়ার আগেই প্রণব বিরক্ত হয়ে বললো,
-প্রশ্ন করার অনেক সময় পাবি পরে। এখন ভেতরে ঢুকতে দে। মেয়েটা অসুস্থ!
-অ … অসুস্থ??…
প্রান্তি অবাক চোখে স্পৃহার দিকে একবার তাকিয়ে একটু সরে দাঁড়ালো। প্রণব স্পৃহাকে নিয়ে প্রান্তির ঘরে শুইয়ে দিতেই প্রান্তি স্পৃহার পাশে বসলো। ওর মাথায় কিছুই ঢুকছে না। স্পৃহা তো প্রেগন্যান্ট ছিল! কিন্তু স্পৃহাকে এখন দেখে তো তা মনে হচ্ছে না! আর এতো রাতে প্রণব কীভাবে ওকে পেল? মাথার ভেতর প্রশ্নগুলো ঘুরপাক খাচ্ছে ওর। ভাবতে ভাবতেই স্পৃহার ফ্যাকাসে মুখে হাত ছোঁয়াতেই কেঁপে উঠলো প্রান্তি। চকিত স্বরে বললো,
-ওর গা তো জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে!
প্রণব চিন্তিত স্বরে বললো,
-হুম। এতো রাতে ডক্টর পাওয়া সম্ভব নয়। তাই মাকে আসতে বলেছি।
-মা আসতে রাজী হলো?
-হয়নি। কিন্তু বুঝিয়ে বলার পর রাজী হলো।
প্রান্তি একটা শ্বাস নিয়ে কাঁদো কাঁদো কন্ঠে বললো,
-ওর এই অবস্থা কী করে হলো, ভাইয়া? ও তো ঠিক ছিল! আর ওর বেবি? মানে আমি কিছু বুঝতে পারছি না!
প্রণব কিছু বুঝতে না পেরে কনফিউজড হয়ে বললো,
-মানে? তুই ওকে চিনিস?
-আরে ও-ই তো পিহু! বলেছিলাম না তোমায়?
প্রান্তির কথা শুনে প্রণব চোখ বড়বড় করে তাকালো। এমন কথার জন্য সে মোটেই প্রস্তুত ছিল না। পুরোই হতভম্ব হয়ে গেছে সে। এতক্ষণে বুঝলো, স্পৃহা কীভাবে ওর পুরো নাম জানে!
এমনসময়ই মিসেস মেহরীনের আগমন ঘটলো। তিনি গলায় স্টেথোস্কোপ ঝুলিয়ে বললেন,
-কই তোর পেশেন্ট, প্রণব? এতো রাতে তোর কথায় শুধু এ বাড়িতে এলাম!
প্রণব কিছু বলার আগেই প্রান্তি কান্নামাখা গলায় স্পৃহাকে দেখিয়ে বললো,
-মা! প্লিজ, ওকে বাঁচাও। কী হয়েছে ওর? ওকে সুস্থ করে দাও!
মিসেস মেহরীন বেশ সময় নিয়ে স্পৃহাকে পর্যবেক্ষণ করলেন। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
-প্রান্তির কথা অনুযায়ী মেয়েটা প্রেগন্যান্ট। কিন্তু আমার ধারণা ওর বেবি মিসক্যারেজ হয়ে গেছে অনেক আগেই। এতে অতিমাত্রায় ব্লিডিং হওয়ায় ওর শরীরের অবস্থা এখন একদমই ভালো নেই। ও সুস্থ হয়ে যাবে, কিন্তু একটু সময়ের প্রয়োজন। মেডিক্যাল টেস্ট ছাড়া এর বাইরে কিছু বলতে পারছি না আমি।
প্রণব চিন্তিত মুখে তাকিয়ে আছে। খারাপ লাগছে মেয়েটার জন্য ওর। ভাগ্যিস ওকে সাথে করে নিয়ে এসেছিল! নয়তো কী হতো মেয়েটার?
প্রান্তি এসব কথা শুনে স্তব্ধ হয়ে গেছে। স্পৃহার সাথে এমন কিছু ঘটে গেল, আর ও জানতেই পারলো না?অনেক চেষ্টা করেছিল স্পৃহার সাথে যোগাযোগ করার। কিন্তু কোনোভাবেই ওর খোঁজ পায়নি। চোখ দুটো পানিতে টলমল করছে ওর।
-প্রান্তি ম্যামের সাথে একজন এসেছে দেখা করতে।
সার্ভেন্টের মুখে এমন কথা শুনে অবাক হলো সবাই। এতো রাতে কে দেখা করতে আসবে? ভাবতে ভাবতেই প্রান্তি নিচে এসে দেখলো ড্রয়িং রুমে স্পন্দন বসে আছে। স্পন্দন প্রান্তিকে দেখে ব্যস্ত স্বরে বললো,
-তুমিই প্রান্তি? পিহু কি তোমার কাছে এসেছে? তোমার সাথে কোনো কথা হয়েছিল ওর?
প্রান্তি স্পন্দনকে আশ্বস্ত করে বললো,
-ভাইয়া, শান্ত হোন। পিহু এখানেই আছে। আমার ঘরেই আছে।
স্পন্দন একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বললো,
-থ্যাংক গড!! এখানে চলে এলো কীভাবে কে জানে? কত ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম আমি!!
-ভাইয়া, ওর কী হয়েছিল? আই মিন, ওর অবস্থা দেখে ……
স্পন্দন একে একে ওকে সব খুলে বললো। প্রান্তি দু’হাতে মুখ চেপে স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলো। এতো কিছু ঘটে গেছে স্পৃহার জীবনে? আর ওরা কিছু জানতেই পারলো না!
স্পন্দন স্পৃহাকে নিয়ে যেতে চাইলে প্রান্তি বললো,
-ভাইয়া, ও আমার সাথে থাকুক না কিছুদিন! ওর মনের অবস্থা আর শারীরিক অবস্থা ভালো না হওয়া পর্যন্ত এখানে থাকলেই ভালো হবে।
-কিন্তু …
-প্লিজ, ভাইয়া। আমার মায়ের আন্ডারে ওর ট্রিটমেন্ট চলবে। আমি ওকে দেখেশুনে-ই রাখবো।
স্পন্দন প্রান্তির এমন আবদার শুনে হাসলো। মেয়েটা স্পৃহাকে অনেক ভালোবাসে। তাছাড়া স্পৃহার এখন একটা সঙ্গীর-ও অনেক দরকার। ও নিজে তো আর সারাক্ষণ বোনের সাথে থাকতে পারবে না! আর নিজের পরিবারের কথা তো বাদ-ই। সেই হিসেবে স্পৃহার প্রান্তির সাথে থাকাটাই বেটার হবে।
_____________________
সকালের মিষ্টি রোদের আলো স্পৃহার মুখের ওপর এসে পড়তেই ঘুম ভেঙে গেল স্পৃহার। দূর্বল চোখ দুটো আস্তেধীরে খুলতেই চোখের সামনে প্রান্তির হাসি মাখা মুখটা দেখতে পেল। প্রান্তি মিষ্টি হেসে বললো,
-গুড মর্নিং, পিহু!!
স্পৃহা অবাক হয়ে আশেপাশে তাকিয়ে উঠে বসলো। কিছুক্ষণের মধ্যেই গত রাতে প্রণবের সাথে দেখা হওয়ার বিষয়টা মাথায় আসতেই ও বুঝতে পারলো কীভাবে এখানে এসেছে। একটা ছোট শ্বাস ছেড়ে গুটিশুটি মেরে বসে রইলো সে।
প্রান্তি স্পৃহার এমন গুটিয়ে যাওয়া দেখে ওর মনের অবস্থা বুঝতে পারছে। জীবনের এই ছোট্ট পরিসরে কতো ঝড়ের সম্মুখীন হয়েছে মেয়েটা। প্রান্তি আবার হাসিমুখে তাকিয়ে বললো,
-চল, তোকে ফ্রেশ করিয়ে নিচে নিয়ে যাবো। ব্রেকফাস্ট করবি না?
স্পৃহা অসহায় দৃষ্টিতে তাকালো প্রান্তির দিকে। প্রান্তি বুঝতে পারলো, স্পৃহা নিচে যেতে চাইছে না। কিন্তু এভাবে চলতে থাকলে ও আরো অস্বাভাবিক হয়ে পড়বে। আর প্রান্তিও নাছোড়বান্দা। তাই জোর করে ওকে টেনে নিয়ে যেতে যেতে প্রান্তি বললো,
-আমি কোনো কথা শুনছি না। তোকে আমার সাথেই ব্রেকফাস্ট করতে হবে। আগের মতো স্বাভাবিক হয়ে উঠতে হবে।
নিচে যেতেই একজোড়া তীক্ষ্ণ চাহনি দেখে স্পৃহা মিইয়ে গিয়ে নিজেকে আরো বেশি গুটিয়ে নিল।
# চলবে……
#এক_মুঠো_প্রেম
#Writer_Mahfuza_Akter
#পর্বঃ১৮
একজোড়া তীক্ষ্ণ চাহনি দেখে স্পৃহা মিইয়ে গিয়ে নিজেকে আরো বেশি গুটিয়ে নিল। মিস্টার প্রত্যয় চৌধুরী খাওয়া বাদ দিয়ে ভ্রু কুঁচকে স্পৃহার দিকে তাকিয়ে আছেন। প্রান্তি সেটা খেয়াল করে বললো,
-বাবা, ও আমার বেস্টফ্রেন্ড। এখন থেকে এখানেই থাকবে কয়েকদিন। আর পিহু! উনি আমার বাবা।
স্পৃহা একবার চোখ তুলে তাকিয়ে আবার মাথা নিচু করে ফেললো। মিস্টার চৌধুরী স্পৃহার এমন নীরবতা দেখে বিগলিত হেসে বললেন,
-তার মানে এটাই তোর পিহু! যেমনটা বলতি, তার থেকেও বেশি চুপচাপ দেখছি মেয়েটা।
পরমুহূর্তেই স্পৃহাকে উদ্দেশ্য করে স্নেহময় কন্ঠে বললেন,
-এতো ইতস্তত কেন করছো, মা? ডোন্ট বি প্যানিকড্, মাই ডিয়ার! তুমি তো আমার দৃষ্টিতে প্রান্তির মতোই আমার মেয়ে এন্ড আমিও তোমার বাবার মতোই। এম আই রাইট?
স্পৃহা চকিত দৃষ্টিতে তাকালো মিস্টার চৌধুরীর দিকে। ‘আমিও তো তোমার বাবার মতোই’ – কথাটা শুনতেই ওর ভেতরটা শীতল হয়ে গেল। এই প্রথম কারো কন্ঠে পিতৃ স্নেহপূর্ণ কথা শুনতে পেল যেটা ওর বাবাও থেকেও কখনো পায়নি। আবেগে কান্না পাচ্ছে ওর। দাঁতে দাঁত চেপে কান্নাটাকে দমিয়ে নিল সে।
স্পৃহাকে ওভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মিস্টার চৌধুরী হালকা হেসে বললেন,
-এভাবে দাঁড়িয়ে-ই থাকবে নাকি? চাইলে এই অধমটার পাশে বসতে পারো! প্রান্তি ছাড়া তো আমাকে বোঝার মতো কেউ নেই! আপন মানুষ থেকেও নেই। তোমার মতো আরেকটা মেয়ে পেলে মন্দ হয় না।
প্রান্তি মিস্টার চৌধুরীর পাশের চেয়ারটা টেনে স্পৃহাকে বসিয়ে দিলো আর নিজে গিয়ে বাবার আরেক পাশে বসলো। মিস্টার চৌধুরী নিজে ব্রেডে বাটার লাগিয়ে স্পৃহার আর প্রান্তির প্লেটে দিতে লাগলেন। ভাইয়ের পর এই প্রথম কারো চোখে নিজের জন্য স্নেহ দেখতে পেল স্পৃহা। জলভরা চোখে তাকালো মিস্টার চৌধুরীর দিকে।
স্পৃহার চোখে পানি দেখে তিনি অবাক হলেন না। প্রান্তির কাছ থেকে মোটামুটি সবটাই শুনেছেন তিনি স্পৃহার পরিবার সম্পর্কে। তাই দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ওর মাথায় হাত রেখে বললেন,
-এভাবে কাঁদলে কষ্ট কমবে না, মা। বরং বাড়তেই থাকবে। নিজেকে আরো অনেক বেশি শক্ত করতে হবে তোমার। মনে রেখ, নরম মাটিতে সবাই আঘাত
করতে পারে। কিন্তু শক্ত মাটিতে কেউ আঘাত করতে আসে না। কারণ এতে নিজেকেই আঘাত পেতে হয়।
স্পৃহা নিজের চোখের পানি গুলো মুছে নিল। বার কয়েক মাথা দুলিয়ে বোঝাল, সে নিজেকে শক্ত করে তুলবে।
এমনসময়ই প্রণব হাই তুলতে তুলতে নিচে এলো। পরনে হোয়াইট টি-শার্ট আর গ্রে কালারের ট্রাউজার। চুলগুলো অগোছালো। ঘুম ঘুম চোখে সামনে তাকাতেই নিজের বাবাকে দেখে আর চেয়ার টেনে বসলো না। প্রান্তির দিকে তাকিয়ে বললো,
-আমার খাবারটা আমার রুমে পাঠিয়ে দিস তো!
প্রান্তি অবাক হয়ে বললো,
-আজ তোর কোনো রেকর্ডিং, অডিশন নেই?
-কাল মাত্র দেশে ফিরলাম। আজ আর বেরোচ্ছি না।
কথাটা বলেই প্রণব নিজের ঘরে চলে গেল। মিস্টার চৌধুরী নিজের মতোই খেয়ে যাচ্ছেন। যেন বর্তমানে তার আশেপাশে তিনি ব্যতীত আর কোনো মানুষ নেই। স্পৃহা এমনটা দেখে অবাক না হয়ে পারলো না। এই বাবা আর ছেলের মধ্যে কোনো বিরোধ আছে নাকি?
_____________________
আহান, নীড় আর প্রান্তি স্পৃহার সামনে গোল হয়ে বসে আছে। স্পৃহা বেডে হেলান দিয়ে বসে আছে। নীড় আপাতত কিছু একটা ভাবছে আর আহান ভেতরে ভেতরে রাগে ফুঁসছে। ওরা আসার পর-ই প্রান্তি ওদের আলাদা ডেকে সবটা বলেছে।তারপর থেকেই ওরা এভাবে বসে আছে। নীরবতা ভেঙে আহান নীড়কে কনুই মেরে বললো,
-কী এতো ভাবোস বল তো? আসার পর থেকে খালি থিংকিং মোডেই আছোস!
নীড় চোখ দিয়ে স্পৃহার দিকে ইশারা করে বললো,
-পিহুর কথা ভাবছিলাম। ও নাকি ডিভোর্সের পর থেকেই চুপ হয়ে গেছে! কোনো কথা বলছে না কারো সাথে।
আহান স্পৃহার দিকে তাকিয়ে ঝাঁঝালো কণ্ঠে বললো,
-ওই ছ্যাড়ি, সমস্যা কী তোর, হুম? এই বাড়িতে থাকতে কোনো প্রব্লেম হইতাসে? হইলে আমারে বল! আমি.……
আহানের কথা শেষ হওয়ার আগেই প্রান্তি দাঁত কটমট করতে করতে বললো,
-ওই! ওই!! কী বলতে চাইছিস তুই? আমার বাড়িতে থাকতে প্রব্লেম কেন হবে রে? আমি ওর যত্নের কোনোদিকেই কমতি রাখছি না।
আহান মুখ বাঁকিয়ে বললো,
-হ্যা, সেটা তো রাখবি-ই! বড়লোক মানুষ বলে কথা!! মা ডাক্তার, বাপে জমিদার, ভাইয়ে রকস্টার আর নিজে কোনো একদিন হইয়া যাবি সুপারস্টার। এতো নক্ষত্র মিলে পিহুটারে যদি জ্বালাইয়া ফেলে দেস? সেই জন্যই জিজ্ঞেস করলাম।
নীড় আহানের কথা শুনে মুখ লুকিয়ে হাসতে লাগলো। প্রান্তি রাগী দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আহানের দিকে যেন চোখ দিয়েয় ভস্ম করে দেবে।
দিনটা এমন আড্ডা বাজিতেই কেটে গেল ওদের।
_______________________
আদ্রের বাবা দেশে ফিরে এমন কিছু মোটেই আশা করেননি। রাগী দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন তিনি আদ্র আর মিসেস সামায়রার দিকে। আদ্র মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। আদ্রের বাবা ওর দিকে ঘৃণার দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বললেন,
-আই উইশ, এমন একটা দিন দেখার আগে আমার মৃত্যু হয়ে যেত! তুমি আমার ছেলে এই কথাটা ভাবতেই আমার নিজের প্রতি ঘৃণা হচ্ছে, আদ্র।
আদ্র চোখ তুলে আহত দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো,
-বাবা!……
-এমন কিছু তোমার কাছ থেকে এক্সপেক্ট করিনি আমি, আদ্র। স্পৃহার মতো একটা মেয়েকে তুমি কীভাবে ……… এসময়ে ওর কেউ একজনের সাপোর্ট দরকার। আর তুমি কিনা ওর হাতটাই ছেড়ে দিলে!
-বাবা, আমি অনেক ভেবেছি। ওর ভাই ওকে এ বাড়িতে পাঠাতে চায়নি। ওকে আলাদা রাখতে বলেছিল। সবদিক বিবেচনা করেই আমি সিদ্ধান্তটা নিয়েছি।
আদ্রের বাবা ছেলের দিকে তাকিয়ে থমথমে গলায় বললেন,
-তুমি ওর ভাইকে এ ব্যাপারে কোনো রিকোয়েস্ট করেছিলে? এক বারও বলেছিলে তোমাকে আরেকটা সুযোগ দিতে?
আদ্র একবার চোখ তুলে তাকিয়ে আবার অপরাধীর মতো মাথা নিচু করে ফেলে। আদ্রের বাবা নিজের ছেলের দিকে তাকিয়ে তাচ্ছিল্যের সুরে বললেন,
-মাঝপথে একটা ছোট ঝড়ের মুখে পড়েই জীবনসঙ্গীর হাত ছেড়ে দেওয়াটাকে পুরুষত্ব বলে না। এমন একটা কাজের জন্য ভবিষ্যতে তোমাকে পস্তাতে হবে, আদ্র!
আদ্র নিজের মায়ের দিকে তাকালো। কিন্তু মিসেস সামায়রার ভাবভঙ্গি দেখে বুঝতে পারলো, তার সিদ্ধান্তে তার মা-ও তেমন সন্তুষ্ট নয়। দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের ঘরে আসতেই ফোন বেজে উঠলো ওর। টেবিল থেকে ফোনটা নিয়ে কানে তুলতেই শুনতে পেল,
-কখন থেকে কল দিচ্ছি কোনো রেসপন্স-ই নেই! ফোন ফেলে কোথায় হারিয়ে গিয়েছিলি বল তো?
আদ্র শুকনো হেসে বললো,
-প্রণব, তুই? কবে দেশে ফিরলি?
-এই তো কাল রাতেই! তা কেমন চলছে তোর দিনকাল? বাবা হচ্ছিস অনেক আগেই শুনেছিলাম। তোর বউ কেমন আছে এখন?
আদ্র খানিকটা অপ্রস্তুত হয়ে গেল এমন প্রশ্নে। আমতাআমতা করতে করতে বললো,
-আব্… আ…আছে ভালোই।
-ভালো থাকলেই ভালো। আমি এখন ফ্রী-ই আছি। তোদের বিয়েটা তো এটেন্ড করা হয়নি! ভাবীকেও দেখা হলো না। তাই ভাবলাম একটা ইভেন্টের এরেঞ্জমেন্ট করি। কী বলিস?
আদ্র হকচকিয়ে গিয়ে বললো,
-এখন? এখন এসবের দরকার নেই। আসলে…
প্রণব কিছু একটা ভেবে বললো,
-ওকে ওকে… বুঝতে পেরেছি। পরে কখনো দেখা করবো তাহলে। এখন দরকার নেই।
আদ্র যেন হাফ ছেড়ে বাঁচল। প্রণবকে এসব কিছু জানতে দিলে চলবে না। বাইরের কাউকেই কিছু জানাবে না সে।
আদ্রের সাথে বেশ কিছুক্ষণ কথা বলে চিন্তিত ভঙ্গিতে ফোনটা রাখলো প্রণব। আদ্র যে ওর কাছ থেকে কিছু লুকোচ্ছে, সেটা তার কথার ভাজে ঠিকই বুঝতে পেরেছে ও। কিন্তু কী লুকোচ্ছে? ওর ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় জানান দিচ্ছে, এ ব্যাপারে জানাটা জরুরি। আবার মনে হচ্ছে, অন্যের ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে ঘাটাঘাটি করাটা ঠিক হবে না। মানসিক দোটানা নিয়েই গিটারটা হাতে নিল সে। বাইরে তাকিয়ে দেখলো রাতের আঁধার ঘনিয়ে এসেছে অনেক আগেই। তাই গিটারটা নিয়ে ছাদে চলে গেল। কিন্তু ছাদে যেতেই মাথায় রক্ত উঠে গেল প্রণবের।
# চলবে…
[ভুল ত্রুটি মার্জনীয় ]