#কারণে_অকারনে_ভালোবাসি০২
#সুরাইয়া আয়াত
৪৪.
— তারপর কি হলো?
আরুর প্রশ্নে কৌতুহল বিদ্যমান। আরিশ নম্র চাহনিতে তাকালো। আরু ভ্রু উঁচিয়ে জিজ্ঞাসু সুরে চেয়ে রইলো।
আরিশ ফিচেল হাসলো। কিছুখন আকাশের দিকে তাকিয়ে থেকে বলতে শুরু করলো।
— ধীরে ধীরে আমার মনে তৈরি হলো ভালোবাসার এক গোপন কুটির যা এক বিশেষ মানুষের জন্য গড়েছিলাম বহুদিন যাবৎ।
সেই দিনের পর থেকে তুমি আমার থেকে বেশ দূরের দূরেই থাকতে সে রাগে আর ভয়ে যে কারনেই হোক।
আদিবা আমার সাথে কথা বলতো না আর তেমন। তারপর তুমি হাটতে শিখলে, কথা বলতে শিখলে, দৌড়াতে শিখলে। তুমি ছিলে একদম একটা পুতুলের মতো। গাল দুটো ফোলাফোলা, মামী তোমার চুলদুটো গার্ডার দিয়ে বেশ সুন্দর করে দুটো ঝুটি বেধে দিতো। তার চোখের পাপড়িগুলো এখন যেমনটা ঘন আগে তার তুলনায় আরও বেশি ঘন ছিলো। আমার সবচেয়ে ভালো লাগতো কি জানো? তোমার হাতের ছোট ছোট আঙুলগুলো, মনে হতো তোমার হাত ধরে খালি সারাদিন হাটি যেন ছাড়তে ইচ্ছা না করে কখনো।
আরু মুগ্ধ নয়নে আরিশের কথা শুনছে। মানুষটার কথায় ও লজ্জা পেয়ে যাচ্ছে বেশ। কিন্তু তুমি তো বরাবরের মতোই মহা ফাজিল তুমি আমার ধারে কাছেও ঘেষতে না কখনো।
তারপর একদিন কি হয়েছিলো জানো?
আরু মাথা নাড়ালো। আরুর দিকে তাকিয়ে বলল
— আমার কথা বাদে তোমার সব কথায় মনে থাকে স্টুপিড। আমি বলছি।
আমার আম্মু তোমার চতুর্থ জন্মদিনে একটা টেডিবিয়ার কিনে নিয়ে গিয়েছিল তা আমি জানতাম না। ওটা ছিল একটু সফট পিঙ্ক কালার আর অনেক বড়ো। কিন্তু আমি যদি জানতাম তাহলে সেই পুতুল আমি কখনও কিনতেই দিতাম না।
আরু আরিশের দিকে তাকিয়ে রাগী ভাবে বলল
— কেন কেন কেন? আপনার হিংসা হয় বুঝি আপনার মা আপনার থেকে আমাকে বেশি ভালোবাসে বলে?
আরিশ হো হো করে সশব্দে হেসে উঠতেই আরু মুখ গোমরা করলো। আরিশ আরুর নাকের ঘাম আবার মুছিয়ে বলল
— কারন তুমি নিজেই একটা পুতুল ছিলে, একটা পুতুলের আর একটা পুতুলের কি দরকার বলতে পারো? তাই আমি চইনি তুমি ছাড়া আর কোন পুতুল আমার আশেপাশে থাকুক।
আরুর কপালের ভাজ গুলো ছেড়ে এলো।
— ওহহ এই ব্যাপার!
— হমম হমম এই ব্যাপার। আচ্ছা তোমার নাক এতো ঘামে কেন?
আরু নাকটা ওড়না দিয়ে নিজে আর একবার মুছে বলল
— আমি শুনেছি যাদের নাক বেশি ঘামে তাদের হাজব্যান্ড নাকি তাদেরকে অনেক ভালোবাসে।
আরিশ ছাদের রেলিং এ হাত দিয়ে শার্টের উপরের বোতামটা খুলে দিয়ে বলল
— হাসসস্ এসব ভুল কথা। আমি তো তোমাকে ভালোই বাসি না।
আরু আরিশের পিঠে সজোরে একটা কিল মেরে বলল
— তা আমার জানতে বাকি নেই, অভদ্র একটা।
আরিশ হাসতে হাসতে বলল
— আহহহ। সত্যিই আমি তোমাকে ভালবাসি না বিশ্বাস করো।
আরু রাগী ভাব নিয়ে বলল
— হয়েছে হয়েছে আমার সামনে এতো সত্যি কথা বলে লাভ নেই তার পর কি হলো বলুন।
— তারপর তোমার হাত থেকে টেডিটা নিয়ে আদিবাকে দিতেই আদিবা সে কি খুশি ধারনার বাইরে আর এদিকে তুমি ভ্যা করে কাঁদছিলে। আমি তোমার কান্না উপেক্ষা করে আম্মুর কাছে গিয়ে বললাম
আম্মু আমার ওর মতো একটা পুতুল চাই। ওকে বলো আমার পুতুল হতে তাহলে ও বড়ো হলে আমি ওকে অনেক পুতুল কিনে দেবো।
আমার কথা শুনে আম্মু পড়ে গেল ঘোর চিন্তায়, আম্মু আমার এমন জেদ আগে কখনো দেখেনি। উনি অবাক হয়ে আমাকে বলেছিল
— আরু যদি তোর পুতুল হতে রাজি না হয় তখন? আদিবা তোর পুতুল হলে চলবে?
আমি তখন মুখ গম্ভীর করে বলেছিলাম
— আমি যে পুতুল চেয়েছি সেই পুতুলই লাগবে নাহলে কোনটাই লাগবে না।
সেদিনের পর থেকে শুরু হয় তোমার প্রতি আমার অনুভুতির বহিঃপ্রকাশ।
আরিশের কথা শুনে আরু একটা হাই তুলে বলল
— হাও জল্লাদ মার্কা স্টোরি।
আরিশ ভ্রু কুঁচকে রাগী কন্ঠে বলল
— ফাইন আর বলবো না।
— আরে যেমন কাহিনী ঘটিয়েছেন তেমনই তো বলবো তাই না? একটা আট বছরের ছেলে এমন ভিলেন টাইপের তাকে আবার কি বলবো।
আরিশ চুপ করে গেল।
— আপনি আমাকে ভোলাভালা নাদান বাচ্চা পেয়ে কতোই না টরচার করেছেন। হাও আনকিউট।
আরিশ চুপ করে আছে দেখে আরু আরিশের কাধে মাথা রেখে বলল
— অভদ্র জামাই পরের টুকু বলবেন না?
— তারপর থেকে তুমি যেন আর আমাকে ভয় পেতে না একদমই। যেখানে আদিবা আমার জিনিসপত্র ছোঁয়ার সাহস দেখাতো না সেখানে তুমি আমার কতো কমিক্স বুক আর ফেয়ারি টেল বুক ছিড়েছো হিসাব নেই। আমার সব জিনিস লন্ডভন্ড করতে যা এখনো করো বরং আগের তুলনায় আরও বেশি।
আরু পাশ থেকে হি হি করে হেসে উঠলো।
— তখন আমার তেরো বছর বয়স, ক্লাস এইটে পড়তাম আমি আর তুমি তখন থ্রি তে আর আদিবা তখন ফাইভে এ। হঠাৎ করে একদিন বাসায় ফিরে দেখি তোমার আব্বু আম্মু আমাদের বাসায় এসেছেন, তোমার আম্মুর চোখ থেকে অনবরত জল গড়াচ্ছে আর আমার আম্মু মামীকে থামানোর চেষ্টা করছে। আদিবা দেখি সোফাতে ঘুমাচ্ছে আর তুমি দূরে চুপচাপ গুটিশুটি মেরে বসে আছো। সবাইকে উপেক্ষা করে আমি তোমার কাছে যেতেই তুমি আমার দিক থেকে এক পলক তাকিয়ে আবার মেঝের দিকে চোখ ফিরিয়ে নিলে। অন্যদিন তোমার সাথে আমার দেখা হলেই তুমি আমার ওপর ঝাপিয়ে পড়লে চকলেটের আবদারে। আমি তোমার কাছে শান্ত হয়ে বললাম
— এই যে পুতুল বউ কাঁদছো যে? কাদলে তোমাকে একদম পেতনি লাগে।
তখন আমার ছোট পুতুল বউ আমার দিকে ছলছল দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলেছিল
— আপনার কাছে একটা চকলেট হবে?
তোমার গলার আওয়াজ শুনে আমি আর বেশি ঘাটাইনি তাছাড়া আশেপাশের পরিবেশের কারনে বেশ বুঝতে পারছিলাম যে খারাপ কিছু একটা ঘটেছে। আমি চকলেট টা দিতেই তুমি ছুটে গেলে আদিবার কাছে, আদিবার হাতে চকলেট টা গুঁজে দিয়ে তুমি আদিবার কানে ফিসফিসিয়ে,,,,,
কথাটা শেষ হতে না হতেই আরু বলল
— বলেছিলাম যে, আপু আরিশ ভাই তোমার জন্য চকলেট এনেছে, তুমি তো খেতে ভালোবাসো তাই ভাইয়া দিয়েছে। তুমি তো ভাইয়ার কাছে চাইতে ভয় পাও তাই আমি এনে দিয়েছি। তোমাকে কিন্তু আমি অনেক ভালোবাসি আপু।
আরিশ আরুর দিকে তাকালো। আরুর চোখ ছলছল করছে।
আরিশ আরুর চোখের থেকে চোখ সরিয়ে নিয়ে ওর কাছে টেনে নিলো।
— আরু পাখি চলো ঘরে যাই আমরা, অনেক রাত হয়েছে।
আরু একটা চাপা হাসি দিয়ে বলল
— নাহ আমি শুনতে চায় আপনি বলুন।
আরিশ দীর্ঘশ্বাসের সাথে বলল
— আমি তোমাকে জিজ্ঞাসা করলাম যে তোমার মা কাঁদছে কেন। তুমি উত্তর বলেছিলে যে তোমার আপু অসুস্থ, আপু কদিন পর আমাদেরকে ছাড়া চলে যাবে তাই তখন তোমার মায়ের তোমার আপুকে ছেড়ে থাকতে কষ্ট হবে তাই কাঁদছে।
আমি সেদিন বুঝেছিলাম যে আদিবা অসুস্থ কিন্তু অসুস্থতার কারন জানতে চাইনি। তারপর বেশ কয়েক মাস পর হঠাৎ একদিন গুরুতর অসুস্থ হয়ে আদিবার অস্তিত্ব শেষ হলো। সেদিন আমার কাছে কি ছিল আমি জানিনা তবে সারাটা দিন ভেবেছিলাম মেয়েটার কথা, একটা অপরাধবোধ কাজ করছিল তখন ভীষনরকম, শুধু মনে হয়েছিল ওর প্রতি আমার অন্যায় হয়েছে। বুঝতে শুরু করলাম মানুষ থাকতে থাকতে তার কদর করতে হয়। তোমাকে নিয়ে আমার অনেক ভয় হতো। বন্ধ হলো তোমার প্রতি সব ধমক ঝমক। তোমাকে বিন্দুমাত্র বকা দিতেও আমার কষ্ট হতো। শুরু হলো সকলের থেকে তোমাকে আগলে রাখার প্রচেষ্টা, কেও তোমাকে যেন কখনো কষ্ট না দিতে পারে।
তারপর হঠাৎ খেয়াল করলাম যে তুমি উপন্যাসের বই পড়তে ভালোবাসো। বিষয়টা অদ্ভুত লাগেনি কারন আম্মুর কাছ থেকে জানলাম যে তুমি আমার থেকেই গল্প পড়া শিখেছো। শুনে বেশ খুশি হয়েছিলাম।
তারপর তুমি যখন ক্লাস টেনে উঠলে তখন সামনে তোমার এস এস সি এক্সাম। তোমাকে পড়ানোর দায়িত্ব তো আমি নিজের ওপরই নিয়েছিলাম। তোমার ভালো মন্দ ও ছিলো আমার দায়িত্ব। একদিন তোমার ম্যাথ সলভ করতে করতে তোমার বইয়ের মাঝে একটা লাভ লেটার দেখে,,,,
আরিশের কথা শেষ হতে দিলো না আরু। সে নিজে বলল।
— আপনার মাথায় আগুন জ্বলে গেছিল পরেরদিন আপনি সেই ছেলেটাকে একটা চড় প্লাস অনেক অনেক ধমক দিয়ে এসেছিলেন তারপর সে আর কখনো আমার সামনে আসেনি, ওখানেই থেমে গেল আমার আধুরা প্রেম কাহিনী।
আরিশ আরুর দিকে চোখ ছোট ছোট করে তাকিয়ে বলল
— আমার বউকে লাভ লেটার দেওয়ার সাহস দেখালো কি করে সে।
আরু ওর কাধ থেকে আরিশের হাত ছাড়িয়ে বলল
— হমম হমম থাক থাক। আর আপনি সবার সাথে বলে বেড়িয়েছিলেন যে আপনার আর আমার এনগেজমেন্ট হয়ে আছে। আপনি মেডিকেল এর স্টুডেন্ট ছিলেন তখন, আমার কতো ফ্রেন্ড আপনাকে দেখে ক্রাশ খেয়েছে তা হিসাব রাখেন? কই আমি তো তাদেরকে কিছু বলিনি।
আরিশও ধমক দিয়ে বলল
— হমম হমম তা আর বলবে কেন, আমার জন্য তুমি তো কখনো কারোর কাছে প্রপোজাল পাওনি সেটা তো আর ভুলতে পারোনি তাইনা।
— সত্যিই তাই আপনারা জন্য শুধু আপনার জন্য!
— আমি কেন তা হতে দেবো, আমার বউ।
— এই আপনি কিন্তু বাড়াবাড়ি করে ফেলেছেন।
— একদম না, বাড়াবাড়ি তুমি করতে।
— মোটেও না।
ওদের ঝগড়া তুমুল পর্যায়ে। অনিকা খান ঘুম ঘুম চোখে দরজার কাছে এসে বললেন
— তোরা থামবি? তোদের চেঁচামেচিতে পাশের বাসার ভাবী কল দিয়ে জিজ্ঞাসা করছে কোন সমস্যা হলো কি না।
আরু অনিকা খানকে গিয়ে জড়িয়ে ধরে বলল
— সব তোমার ছেলের দোষ, উনি পায়ে পা লাগিয়ে ঝগড়া করতে আসে খালি। আমি আজকে তোমার সাথে ঘুমাবো নয়তো উনি আবার ঝগড়া করবে।
আরিশ আরুর হাত ধরে ওর কাছে এনে বলল
— আম্মু তুমি যাও। ও আমার সাথেই ঘুমাবে। অন্য কোথাও গেলে পা ভেঙে দেব।
— হ্যাঁ তা তো দেবেন ই।
অনিকা খান চেঁচিয়ে বললেন
— তোরা থাম আমি ঘরে যাই।
উনি চলে যেতেই আরিশ আরু কে বুকে জড়িয়ে আরুর মাথায় ফু দিয়ে বলল
— আউযুবিল্লাহ হিমিনাশ শাইতনি রজিম। তোমার আশেপাশের সয়তান দূর হোক।
আরু রেগে বলল
— মি অভদ্র।
আরিশ হাসতে হাসতে বলল
— সয়তান পালিয়েছে।
#চলবে,,,
#কারণে_অকারণে_ভালোবাসি০২
#সুরাইয়া_আয়াত
৪৫.
আগষ্ট মাসের শুরুর দিক, গরমের রেশটা কিছুটা কম, বাতাসে এক হালকা মাদকতায় ভরা পরিবেশ। সকাল আর সন্ধ্যাবেলা এই ঠান্ডা গরমের প্রভাবটা যেন একটু কমই থাকে। আরিশদের বাড়ির একটা বিষয় আরুর খুব ভালো লাগে যেটা হলো কাঠগোলাপ গাছ আর আরিশের এতো এতো ছোট বড়ো গাছ এর সমাহার।
কাঠগোলাপ আরুর ভীষন প্রিয়। এখন তো তেমন ওপর নীচে ওঠানামা কম হয় তাই এখন আর মন চাইলেই কাঠগোলাপ গাছের নীচে গিয়ে ফুলের ঘ্রান নেওয়া হয় না, তবে মাঝে মাঝে আরিশ গাছ থেকে ফুল এনে তা কাচের বাটিতে করে জল দিয়ে জিইয়ে রাখে।
আরু ব্যালকনিতে চেয়ারে বসে রইলো, সামনের টি টেবিলে আরিশ ফল কেটে রেখে গেছে। আরিশের মতে বাসায় এই কদিন বিয়ের দরুন আরু তার নিজের কোনরকম কোন যত্ন রাখেনি তাই ফল কেটে রেখে গেছে, নেহাতই আরিশ ব্যাস্ত ছিল নতুবা আরুকে সবটা খাইয়ে যেত। আরু ফলগুলোর দিকে বাকা চোখে তাকিয়ে আছে। আপেল গুলো সাদা থেকে ধীরে ধীরে রাসায়নিক বিক্রিয়ার গতি প্রকৃতিতে বাদামী বর্ণ ধারন করছে। আরু নাক মুখ কুঁচকে চোখ সরিয়ে নিয়ে বাইরের দিকে তাকালো। আরিশ এমারজেন্সির কারনে কিছুখন আগে হসপিটাল গেছে। দারোয়ান চাচা গাড়িটা মোছামুছি করছে। আরু বিরক্তভাব নিয়ে চোখ ফিরিয়ে নিল। এখন সময় যেন কাটতেই চাইনা এমন। আরু ফোনটা হাতে নিলো। সকাল আট টা পঁচিশ বাজে। কালকে রাতে সানার বৌভাত ছিলো। আজকে এতখনে সে ঘুম থেকে উঠেছে কি তা নিয়ে আরুর মনে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। মজার ছলে একটা এস এম এস দিলো
— শুভ সকাল মাই টুইটুই ননদিনী।
সানা অফলাইন। সে ঘুম থেকে ওঠেনি। আরু বিরক্ত হয়ে ফলের প্লেটটা নিয়ে রুমে চলে এলো। এই সময়ে মুড সুইং হয় ভীষনরকম। ঘরে এসে ফলগুলো আরুর খেতে ইচ্ছা করলো বেশ। টুকটুক করে একটা দুটো খাচ্ছে। মনে মনে আরু বেশ খুশি কারন আরিশ বলেছে আজকে ওকে নিয়ে ভবঘুরের মতো অলিতে গলিতে হাটবে,দিন রাতের হিসার নেই দুজনে মিলে কতো এলোমেলো গবেষণা করবে তার হিসাব নেই। ওদের কাছে প্রত্যেক টা দিন হলো এক একটা অ্যাডভেঞ্চার।
বিছানার ওপর আরিশের আইরন করা কিছু শার্ট আরু একে একে ওয়াড্রবে রাখতে শুরু করলো, এদিকে টিভিতে কার্টুন চলছে আর টুকটাক কাজ করছে। আরু ওর কাজের ফাকে একটা চেনা পরিচিত কন্ঠস্বর শুনতে পেলো। সেই কন্ঠস্বরটা আরুর মামার। আরু দ্রুত নীচে নেমে দেখলো আরুর মামা বসে আছেন সোফাতে, তাকে দেখে বেশ খুশি খুশিই মনে হচ্ছে। ওনার সামনে প্লেটে নাস্তা রেখেছেন অনিকা খান। আজকে আরাভ আর সানার এই বাড়িতে আসার কথা তাই সকাল থেকে অনিকা খানের বিশ্রাম নেওয়ার জো নেই। তিনি খাবারগুলো দিয়ে চটজলদি উঠে গেলেন হয়তো কিচেনে কিছু রান্না করতে করতে উঠে এসেছেন। আফজাল খান বসে গল্প করছেন। আরু নীচে গিয়ে বলল
— মামু কেমন আছো তুমি। একা কেন মামী কোথায়?
উনি সশব্দে হেসে বললেন
— এই তো আমার আরু মা চলে এসেছে। আমার পাশে বসে।
আরু ওনার পাশে বসলেন। উনি আরু্র মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন
— তোর শরীর ভালো আছে তো? ঠিক আছিস তো? কোনরকম কোন দৌড়ঝাঁপ করবি না, তবে তুই যা চঞ্চল।
আরু একগাল হাসলো। ওর মামার কথাগুলো ওকে বড্ড আল্হাদী করে তুলছে, ওনার মাঝে যেন ও ওর নানাভাইকে দেখতে পাচ্ছে, উনিও আরুকে এমনটাই ভালোবাসতেন। আরু নির্বাক, ওনার এতগুলো প্রশ্নের কোনটারই উত্তর না দেওয়াতে উনি আরুর মাথায় হাত রেখে বললেন
— কি রে মা কিছু বলছিস না যে।
আফজাল খান আল্হাদী গলায় বলে উঠলেন
— মামনি শরীর খারাপ লাগছে? ডক্টর ডাকবো?
আরু কেবল মাথা নীচু করে না জানালো। এতে আরুর মামা যেন স্বস্তি পেলেন। উনি ওনার ব্যাগ থেকে পরপর কয়েকটা আচারের বয়েম বার করেতে লাগলেন। আরু অবাক হলো দেখে। উনি ধীরে ধীরে সবকটা বয়েম বার করলেন, গুনে গুনে ছোট বড়ো মিলিয়ে তাও নয়টা কি দশটা। সবকটা আচারের বয়েম, আম, তেঁতুল, জলপাই থেকে শুরু করে ভিন্ন স্বাদের আচার বার করলেন। আরু ওর মামার দিকে অবাক আর হতবিহ্বল হয়ে চেয়ে রইলো। ওর মামু ব্যাগটা পাশে রেখে আরুর হাতে আমের আচারের বয়মটা ধরিয়ে বলল
— তোর মামী সব তোর জন্য বানিয়েছে এক মাস ধরে। আমি খালি অবাক হয়ে তোর মামীর কান্ড কারখানা দেখছিলাম। তবে কালকে রাতে একটা বড়ো ব্যাগ হাতে ধরিয়ে বলল
— যাও এটা তোমার মেয়েকে দিয়ে এসো, বলবে তার মা পাঠিয়েছে তার জন্য খাস করে।
আরু্র চোখ জোড়া ভিজে আসতে লাগলো। উনি আবার বললেন
— জানিসই তো , তোর মামীর কোমরের ব্যাথা তাই আর আসতে পারেনি। মধু এখন এসে কয়েকদিন রয়েছে। তোর মামী শুধু আফশোষ করে বলে যে
সামান্য যাত্রাবাড়ী থেকে ধানমন্ডি এটুকুও তাও তোকে গিয়ে দেখে আসা হয় না। তোর মামী তোকে আর আরিশকে যেতে বলেছে, যদিও আরিশ খুব ব্যাস্ত।
এইটুকু কথা শোনার পর আরু ওনাকে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো। উনি থতমত খেয়ে গেলেন। আরু কাঁদতে কা্দতে বলে উঠলো
— তোমরা তোমাদের মেয়েকে এতো ভালোবাসো কেন বলোতো মামু।
উনার গলাটাও বেশ ধরে এলো। উনি আবেগমাখা কন্ঠে বললেন
— মেয়েকে ভালোবাসবো না তো কাকে ভালোবাসবো বলতো।
আর কাঁদতে কা্দতে বলল
— আই এম সরি মামু।
— মেয়ে হবে বাবার কাছে আবার কিসের সরি। একদম না।
…..
— সকালে উঠে দেখি সানার শরীরটা বেশ খারাপ, তাই মা চাইছে না যে এই অবস্থায় আজকে আমরা যাই। কালকে আমরা যাবো দোস্ত কিছু মনে করিস না।
আরাভের কথাতে আরিশ না করতে পারলো না। আরিশ নির্বিকারে বলল
— ঠিক আছে, পরে কথা হবে আমি বাসায় যাচ্ছি।
আরিশ গাড়ি পার্ক করে বাসায় ঢুকলো। বাসায় ঢুকতেই কাওকে কোথাও দেখলো না আরিশ, এমনি সময় তো আরু আর অনিকা খান এখানেই বসে থাকেন। আরিশ রুমে গেল, ঘড়ির কাটা বলছে সময় দুপুর সাড়ে বারোটা। আরিশ রুমে গিয়ে দেখলো আরু শাওয়ার নিয়ে ভিজে চুল ছেড়ে বিছানায় পা গুটিয়ে আয়েশে আচার খাচ্ছে আর ফোনে কথা বলছে।
আরিশ রুমে ঢুকতেই আরু বলে উঠলো
— আচ্ছা পরে কথা হবে। এনজয় ইউর ডে। মি অভদ্র এসেছেন।
কথাটা বলে আরু কলটা কেটে দিয়ে আরিশের সামনে গিয়ে বলল
— আপনি কল করে বলেননি তো এখন ফিরবেন। যদি ভেবে থাকেন যে আমাকে সারপ্রাইজ দেবেন বলে এমন করেছেন তাহলে বলে রাখি আমি কিন্তু মোটেও সারপ্রাইজড হয়নি।
আরিশ আরুর হাতের আচারের বয়েম দেখে বলল
— এলিয়েনরা কখনো সারপ্রাইজ হয় না আমি জানি তাই আমি এইসব ভবনা পোষন করি না। যাইহোক বাসায় কেও এসেছিল নাকি।
আরু আচারের বয়েমটা বিছানার ওপর রেখে বলল
— হমম হমম।
— কে এসেছিল?
— মামু এসেছিল। আমার জন্য এত এত আচার বানিয়েছে মামী সেগুলো দিতে এসেছিলেন। এগারোটার দিকে চলে গেছেন।
আরিশ ঘড়ি খুলতে খুলতে বলল
— আমাকে কল করে একবার বলতে আমি বাসায় ফিরতাম তাহলে।
— আমি ভাবলাম আপনার এমারজেন্সি কাজ আছে তাই আর ডাকিনি।
আরিশ শার্টটা খুলে বলল
— তা এভাবে ভিজে চুলে কি করছো? ঠান্ডা লেগে যাবে। আর ফলগুলো না খেয়ে কোথায় ফেলেছো?
আরু মুখ নাড়তে নাড়তে ওর পেটে হাত বোলালো।
আরিশ বাহবার দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল
— সত্যিই সেগুলো পেটে গেছে তো? নাকি মিথ্যা বলছো?
আরু বিরক্ত হয়ে কাচুমাচু মুখ করে বলল
— ধ্যাত আপনি আমার কোন কথা বিশ্বাস করেন না।
— ঠিক আছে ঠিক আছে। তুমি নীচে গিয়ে বসো আমি শাওয়ার নিয়ে আসছি, রোদে হাটবো কিছুখন। মোড়ের গলিতে দেখলাম একটা চটপটির দোকান দিয়েছে তুমি খাবে?
আরু অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো। আরিশ আরুর ভাব ভঙ্গি দেখে বলল
— জানতাম তুমি খাবেনা, তোমাকে জিজ্ঞাসা করায় বৃথা।
আরু রাগী কন্ঠে বলল
— মি অভদ্র।
আরিশ এবার হেসে ফেলল।
— আম্মুকে দেখলাম না, তাকে দেখেছো?
— ফুপি তো খাবার নিয়ে মীরপুর গেছে। সানা আর আরাভ ভাইয়ার জন্য যা যা রান্না করেছিল সেগুলো কে খাবে তাই ওগুলো নিয়ে আপনার শশুর বাসায় গেছে।
কথাটা বলে আরু মুচকি হাসতে লাগলো।
আরিশ কিছু একটা ভাবতে ভাবতে বলল
— হ্যাঁ আরাভ ফোন করেছিল, ফোন করে বলল যে সানা নাকি অসুস্থ তাই আন্টি আজকে আসতে দিচ্ছেন না।
আরু অবাক হয়ে বলল
— অসুস্থ? কে অসুস্থ! সানা তো দিব্যি সুস্থ। আরাভ ভাইয়া আপনাকে মিথ্যা বলেছেন। আজকে তো ওরা রাতে মে বি কোথাও ডিনারে যাবে তাই আসছে না। আপনি নিজেকে স্টুপিড বলে ঠিক ই করেন আপনি আসলেই স্টুপিড।
আরিশ আর কিছু বলল না কেবল আরুর সামনে তোয়ালেটা জোরে ঝাড়া দিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকে গেল। আরিশ যেতেই আরু আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে রেডি হতে নিলো, আরিশের সাথে এখন হাটতে বেরোবে।
সূর্যের মৃদু আলো ওদের শরীরকে ছুঁয়ে যাবে, রাস্তার অবাঞ্চিত ধুলো আর ইট পাথরকে সরিয়ে হাতে হাত রেখে দুজন হাটবে। মোড়ের মাথার ছোট্ট চটপটির দোকানটায় চটপটি খাবে, তো কখনো পায়ে ব্যাথার নাটক করে আরিশের কোলে উঠবে তো কখনো দুষ্টুমিষ্টি বাহানায় একটা কাঠগোলাপ গাছ থেকে পেড়ে আরুর কানে গু্জবে আরিশকে দিয়ে, তো কখনো মাঝে মাঝে আরিশের গোছানো চুলগুলো এলোমেলো করে দেবে আর কখনো থেমে থেমে বলবে
— মি অভদ্র।
তো আরিশ কখনো বলবে
— মিস টুইটুই এলিয়েন।
আসলে আমাদের প্রত্যেকের জীবন টায় একটা অ্যাডভেঞ্চার। রোজ নিজের মতো প্রান খুলে নিজের মতো বা কারোর সাথে বেঁচে থাকার লড়াইটাও একটা অ্যাডভেঞ্চার। একে অপরের সুখ দুঃখ ভাগ করে নেওয়াও জীবনের এক হিডেন অ্যাডভেঞ্চার। জীবনের প্রতিটা সময় নিজেকে ভালোবেসে আর সকলকে নিয়ে ভলোভাবে বেঁচে থাকার আর একটা সমার্থক শব্দ হলো জীবন নামের এক অ্যাডভেঞ্চার।
সুরাইয়া আয়াত💞
#চলবে,,,,,