তোমাতেই পরিপূর্ণ পর্ব-৩৩+৩৪

0
759

#তোমাতেই_পরিপূর্ণ
লেখিকা-জান্নাতুল ফারিয়া প্রত্যাশা
৩৩.
~
মিথি তাকিয়ে দেখল সামনের ডানপাশের একটা টেবিলে একজন সুদর্শন যুবক বসা। গায়ের রংটা তার একটু চাপা হলেও মুখ ভর্তি তার মায়া আছে। মিথি মুচকি হাসল। নেহার চোখে মুখে ফুটে উঠল কিঞ্চিত লজ্জা। এগিয়ে গেল তারা। ছেলেটা উঠে দাঁড়াল। চোখ মুখে একটা খুশি খুশি ভাব। ঠোঁট জোড়া প্রশস্ত করে হেসে বললো,

‘বসো।’

নেহা অপর পাশের চেয়ারটায় বসতে নিলেই মিথি তাকে বাধা দিয়ে বললো,

‘এই পাশে কেন বসছিস? ভাইয়ার পাশে গিয়ে বস।’

নেহা লজ্জা পেল। ইশারায় না করলো। কিন্তু মিথি তো শোনার পাত্রী না। সে জোর করেই নেহাকে সেই ছেলেটির পাশে বসালো। তারপর সেও অপর পাশের চেয়ারটায় বসলো। প্রসন্ন হেসে হাতের রজনীগন্ধা ফুলের স্টিকগুলো ছেলেটার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললো,

‘ভাইয়া, এটা আপনার জন্য।’

ছেলেটা তখন মুচকি হাসল। বললো,

‘ধন্যবাদ।’

তারপর বললো,

‘কি খাবেন বলুন?’

মিথি হেসে হেসে বললো,

‘আমাকে না আপনার পাশের উনাকে জিগ্যেস করুন সে কি খাবে? আজকের স্পেশাল গেস্ট তো উনি।’

সাদ হাসল মিথির কথা শুনে। নেহার দিকে তাকিয়ে বললো,

‘কি খাবে?’

নেহা লজ্জা পাচ্ছে, ভীষণ লজ্জা পাচ্ছে। মাথা নিচু করে হাত কচলাতে কচলাতে বললো,

‘আপনি যা খাবেন অর্ডার দিন। আমার কোনো পছন্দ নেই।’

মিথি তখন ক্ষিপ্ত কন্ঠে বললো,

‘কি তোর কোনো পছন্দ নেই? তোর না শর্মা খুব পছন্দ, হু? সারাদিন তো আমাকে বলিস একটা শর্মা খাওয়া একটা শর্মা খাওয়া, এখন তাহলে এত ঢং করছিস কেন?’

নেহা রেগে গেল। চোখ গরম করে মিথির দিকে তাকাল। মিথি ঠোঁট চেপে মিটি মিটি হাসছে। নেহা ইশারায় অনেক হুমকি দিয়ে দিল। কিন্তু মিথি সেসবে পাত্তা না দিয়ে বললো,

‘ভাইয়া, ও আসলে খুব লাজুক তো তাই বলতে পারছে না। আপনি ওর জন্য একটা শর্মা অর্ডার দিন। ওর শর্মা খুব পছন্দ।’

সাদ সরস কন্ঠে বললো,

‘ঠিক আছে। তা আপনি কি খাবেন?’

মিথি মলিন কন্ঠে বললো,

‘আমি, আসলে আমার বাইরের খাবার খাওয়া বারণ।’

মিথির কথা শুনে সাদ সপ্রতিভ হলো। বললো,

‘ও সরি আমার মনে ছিল না। নেহা আমাকে সব বলেছে।’

মিথি অবাক হয়ে বললো,

‘কিছুদিনের কথায় আপনাকে সব বলে ফেলেছে?’

সাদ জবাবে হাসল, বললো,

‘জ্বি, আপনার ফ্রেন্ডের মুখে সারাদিন কেবল আপনিই ছিলেন।’

মিথি মাথা নাড়িয়ে মেকি হতাশের সুরে বললো,

‘আহারে, মেয়েটা প্রেম করতেও জানে না। আপনি নিশ্চয়ই খুব বোরিং হয়েছেন, তাই না ভাইয়া?’

‘আরে না না। বোরিং হবো কেন? বরং আমার তো ভালো লেগেছে আপনাদের বন্ডিং দেখে।’

মিথির মুখের প্রশান্তির হাসি ফুটল। সাদ আর কথা না বাড়িয়ে একজন ওয়েটারকে ডেকে কিছু খাবার অর্ডার দিল। মিথির বারণ থাকায় সে তেমন কিছু খেল না। যদিও এতে তার মন খারাপ হয়নি। এখন এসবে মানিয়ে নিয়েছে। এইভাবেই তো বাকিটা জীবন পার করতে হবে তাকে।

মিথি অনেক আগেই রেস্ট্ররেন্ট থেকে বেরিয়ে গেছে। নেহা আর সাদ কে আলাদা করে সময় কাটানোর উপায় করে দিয়ে এসেছে। নেহা লজ্জা পাচ্ছিল একা থাকতে, মিথি কে বারণ করছিল খুব। কিন্তু মিথি শুনলো না, নেহাকে রেখে সে বেরিয়ে এসেছে। হাঁটতে হাঁটতে সামনের ফুলের দোকান গুলোর কাছে গেল মিথি। গোলাপ পছন্দ তার। গোলাপ ফুলগুলো হাত দিয়ে দেখছিল। সেই দোকানের ছোট্ট একটা ছেলে বললো,

‘আপা, গোলাপ নেবেন? এক পিছ পাঁচ টাকা।’

মিথি তাকাল ছেলেটার দিকে। মাহির সমান হবে হয়তো। কিন্তু মাহির সাথে তফাৎ টা অনেক। মিথি চেয়ে রইল অনেকক্ষণ। তারপর কি ভেবে বিশ টা গোলাপ কিনে ছেলেটার হাতে একশো টাকার একটা নোট ধরিয়ে দিল। ছেলেটা খুশি হলো খুব। মিথিও খুশি হলো। ফুলগুলো হাতে নিয়ে আরও কিছুটা সামনে এগিয়ে গেল। রাস্তার এক ধারে একটা স্টিলের বেঞ্চ করা ছিল। সেখানে গিয়ে বসলো সে। বিকেল টাইম এইদিকটা একদম ফাঁকা। চারদিকে ঠান্ডা বাতাস বইছে। গোলাপ গুলো থেকে একটা মিষ্টি ঘ্রাণ মিথির নাকে এসে ঠেকছে। মিথি নিরবে চেয়ে রইল লাল ফুলগুলোর দিকে। অনেকক্ষণ চেয়ে রইল। তারপর আশে পাশে তাকাল। বোর হচ্ছিল বসে বসে। কি করবে, কি করবে ভাবতে ভাবতেই নৈরিথ কে কল দিয়ে বসলো। নাম্বার টা ব্যস্ত দেখাচ্ছে। মিথির কিছুটা রাগ হলো। ফোনটা পাশে রেখে আবারও এদিক ওদিক তাকাল সে। মিনিট পাঁচ এক পড়েই নৈরিথ তাকে আবার কল ব্যাক করলো। কল রিসিভ করে মিথি বললো,

‘আপনি কি ব্যস্ত?’

‘না, বলো।’

মিথি সময় নিয়ে ভাবল, কি বলবে? কিছু বলার জন্য তো কল দেয়নি। মন চেয়েছে তাই দিয়ে ফেলেছে। এখন কি বলা যায়? মিথি কথা খুঁজতে থাকে। নৈরিথ আবারও বলে,

‘কি হলো, কিছু বলছো না যে?’

মিথি ফট করেই বলে ফেলল,

‘আপনাকে মিস করছিলাম!’

‘সকালেই তো দেখা হলো, বিকেল হতে না হতেই মিস করছো? বাহ, তোমার মনে তো দেখছি খুব প্রেম!’

সরব হলো মিথির ক্ষুদ্র মস্তিষ্ক। আবেগের ঠেলা সামলাতে পারে নি সে। কেন এই কথাটা বলতে গেল? কেন? এখন এই লোকটা তাকে নিয়ে যে মজা করবে, সেটা কি ভাল লাগবে?

মিথি মুখ কালো করে বসে রইল। নৈরিথ প্রশ্ন করলো,

‘কোথায় আছো?’

থমথমে গলায় মিথি জবাব দিল,

‘বাইরে।’

‘কেন, এই সময় বাইরে কেন?’

নৈরিথ কঠোর কন্ঠ শুনে মিথি সপ্রতিভ হলো। বললো,

‘না মানে, এই একটু সামনে হাঁটতে বেরিয়েছি।’

নৈরিথ পুনরায় প্রশ্ন করলো,

‘নেহা কোথায়?’

‘আছে তো। আমার পাশেই আছে।’

মিথ্যে বলে দিল। এছাড়া উপায়ও নেই। নৈরিথ বললো,

‘কই দাও তো। ওকে জিগ্যেস করি, কখন বাসায় আসবে। আমাকে তো আবার নিতে আসতে হবে।’

এবার মিথি ফেঁসে গেল। এখন, এখন কি বলবে সে? সত্যি বললে নৈরিথ তাদের দুজনকে একসাথে আছাড় দিবে। মিথ্যে বলেও লাভ হলো না, সেই তো ধরা তো পড়ে গেল। মিথি মাথা চুলকাচ্ছে। কোনা কথা সাজিয়ে উঠতে পারছে না।

নৈরিথ অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেও মিথির কোনো জবাব না পেয়ে এবার সে ধমক দিয়ে উঠল,

‘এই মেয়ে কথা বলছো না কেন? নেহা কোথায়?’

মিথি ঠোঁট কামড়াতে কামড়াতে মৃদু সুরে বললো,

‘ধমক দিচ্ছেন কেন? একটু ভালোবেসেও তো কথা বলা যায়। আর আপনি কি হ্যাঁ, আমি একটু কল দিয়েছি আপনার সাথে কথা বলার জন্য। আর আপনি তো আমার সাথে কথা বলছেনই না উল্টো নেহাকে খুঁজছেন।’

কথাগুলো বলে মিথি আহ্লাদী করে নাক টানল। নৈরিথ বললো,

‘আমি বরাবরই এইভাবেই কথা বলি। সেটা তুমিও জানো। কিন্ত কথা এটা না, কথা হলো গিয়ে তুমি আমাকে মিথ্যে বলেছো। তাই এখন কথা ঘুরানোর জন্য এসব বলছো। (একটু থেমে) এখন আর কথা না ঘুরিয়ে বলো কোথায় আছো?’

মিথি ঠোঁট উল্টে হতাশ হয়ে বসল। এই লোককে মিথ্যে বলেও শান্তি নেই। ধরা তো পড়তেই হবে। ব্যাধিগ্রস্থ কন্ঠে বললো,

‘একটু দূরেই এসেছি। তবে বেশি দূরে না, একটু খানি দূরে। চিন্তা করবেন না এক্ষুনি বাসায় চলে যাচ্ছি। টাটা।’

‘এই ফোন রাখবে না একদম। কোথায় আছো বলো, আমি আসছি।’

মিথি এবার বাক শক্তি হারাল। এবার সত্যিই সে বোবা বনে গেল। বিষন্ন সুরে বললো,

‘ফুলবাড়ির এইদিকে যে নতুন একটা রেস্ট্ররেন্ট হয়েছে সেখানেই আছি।’

নৈরিথ এবার উত্তেজিত হয়ে পড়ল। বললো,

‘তুমি রেস্ট্ররেন্টে গিয়েছ কেন? তোমার না বাইরের খাবার খাওয়া বারণ।’

‘আরে এত উত্তেজিত হবেন না। আমি কিছু খাইনি। নেহা শর্মা খাবে বলছিল, তাই ওকে নিয়ে এসেছি।’

নৈরিথ শান্ত হতে পারলো না। মিথি কে আরও কিছুক্ষণ তার ধমক খেতে হলো। তারপর ফোনটা কাটল নৈরিথ। গাড়ি নিয়ে ইতিমধ্যেই বেরিয়ে পড়েছে সে। যেকোনো সময় চলে আসবে। তাই আর রিস্ক নেয়া যাবে না। মিথি দ্রুত নেহাকে কল লাগায়,

‘হ্যালো নেহু!’

‘হ্যাঁ, মিথি বল। কই তুই?’

‘আমি আছি সামনে। শোন, তোর ভাই আসছে। জলদি সাদ ভাইয়া কে এখান থেকে যেতে বল। এমনিতেই উনি রেগে আছেন। এখন যদি এসে এসব দেখে তাহলে কিন্তু কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে।’

নেহাও ভয় পেয়ে গেল। যতই ভাইয়ের সাথে হাসি মজা করুক না কেন, ভাইকে সে ভয় পায় প্রচুর। নেহা সাদকে সঙ্গে সঙ্গেই বুঝিয়ে বললো সব। ততক্ষণে মিথিও তাদের কাছে আসে। সাদ প্রথমে চাইছিল আজই নৈরিথের সাথে কথা বলবে কিন্তু মিথির দোহায় শুনে আর পারে না। বাধ্য হয়ে চলে যেতে হয় তাকে। নেহা তখন রাগি চোখে মিথির দিকে তাকিয়ে বলে,

‘ভাই জানল কি করে আমরা যে এখানে আছি?’

মিথি ফ্যালফ্যাল করে তার দিকে তাকাল। মিথির চাহনি দেখেই নেহা বুঝে গেল এইসব কিছু এই ভদ্র শয়তানটায় করেছে। রাগি গলায় নেহা বলে উঠে,

‘মানে কোনো কথা তোর পেটে হজম হয় না, তাই না?’

মিথি কাঁদো কাঁদো চোখ মুখে বললো,

‘সরি।’

নেহা বুকের উপর দুই হাত ভাজ করে বিরক্ত হয়ে চেয়ারে বসলো। মিথি উঠে গিয়ে তার পাশে বসে তাকে মানানোর জন্য কিছু একটা বলতে যাবে তার আগেই তার চোখ যায় তাদের ঠিক বরাবর টেবিলটার দিকে। মিথি কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকেই ছুটে যায় সেই টেবিলটার কাছে। থম মেরে মাটিতে বসে পড়ে। ক্লান্ত কন্ঠে বলে উঠে,

‘সিফাত!’

ছেলেটাও স্তব্ধ। হতভম্ব হয়ে চেয়ে রইল মেয়েটার দিকে। মিথি কেঁদে ফেলল। কিছু না ভেবেই উঠে জড়িয়ে ধরলো তাকে। রেস্ট্ররেন্টে বাকি সবার সাথে নেহাও চকিত হলো। হা করে তাকিয়ে রইল সেদিকে। মিথি খুব কাঁদছে। ছেলেটার মধ্যে কোনো ভাবাবেগ হচ্ছে না। সে স্ট্যাচু হয়ে বসে আছে। মিথি এবার তাকে ছেড়ে সোজা হয়ে তার হাঁটুর সামনে বসলো। কাঁদতে কাঁদতে বললো,

‘তুই এতদিন কোথায় ছিলি? জানিস আমি তোকে কত খুঁজেছি। আমার মনে হচ্ছিল তুই আমার আশে পাশেই আছিস। কিন্তু কোনোভাবেই তোকে খুঁজে পাচ্ছিলাম না। তুই কি এখনও আমার উপর রেগে আছিস? এই সিফাত, কথা কেন বলছিস না? কিছু তো বল? দেখ আমি আর পারছি না। আমার খুব কষ্ট হচ্ছে রে, প্লীজ কিছু বল।’

ছেলেটা চোখ বুজে একটা নিশ্বাস ফেলল। তারপর মিথির দিকে তাকিয়ে শক্ত কন্ঠে বললো,

‘এতদিন পরেও দেখেও তুই আমাকে চিনতে পারলি? যাক অন্তত আমার চেহারা টা ভুলিস নি। তা এখানে কেন এসছিস? বয়ফ্রেন্ডের সাথে ডেট করতে?’

মিথি ঢোক গিলে। এতদিন পর দেখা অথচ ছেলেটা তার সাথে এইভাবে কথা বলছে? মিথি বুঝতে পারে, সিফাতের রাগ এখনও কমে নি। মিথি তার দুইহাত জড়িয়ে ধরে। কান্না ভেজা কন্ঠে বলে,

‘এখনও রেগে আছিস? আমাকে কি ক্ষমা করা যায় না? আমি তো আমার ভুলের জন্য অনেক কষ্ট পেয়েছি। তোকে ছাড়া এতগুলো দিন কাটিয়েছি। কতটা কষ্ট হয়েছে আমি জানি। তাও তোর রাগ কমলো না?’

সিফাত জবাবে কিছু বললো না। মিথি তাকে অনেক কিছু বুঝাল, অনেক ভাবে বুঝাল, অনেক বার ক্ষমাও চাইল। তবে সিফাতের কোনো জবাব পেল না। সেও তার হাত ছাড়ল না। বসে রইল ওভাবেই। সে সময় সেখানে নৈরিথ এলো। রেস্ট্ররেন্টে ঢুকে সে এদিক ওদিক তাকিয়ে মিথি আর নেহাকে খুঁজতেই সে নেহাকে দেখতে পেল। দেখতে পেল মিথিকেও। থমকে গেল নৈরিথ। মিথিকে ঐভাবে একটা ছেলের হাত ধরে বসে থাকতে দেখে সে যেন কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ল। বিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে রইল সেই এক জায়গাতেই।

চলবে..

#তোমাতেই_পরিপূর্ণ
লেখিকা-জান্নাতুল ফারিয়া প্রত্যাশা
৩৪.
~
নৈরিথ এগিয়ে গেল মিথির দিকে। নেহা নৈরিথ কে দেখে ঘাবড়ে গেল। মনে এক ভয় ঝেঁকে বসল তার। নৈরিথ নিশ্চয় রেগে মেগে আগুন হয়ে যাবে। না জানি এখন সে কি সিনক্রিয়েট করে বসে। ভয়ে নেহা তার চেয়ারে থ মেরে বসে থাকে। নৈরিথ মিথির সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। তারপর ঠান্ডা গলায় বলে,

‘কে ও মিথি?’

নৈরিথের কন্ঠস্বর শুনে মিথির হুশ এল। চমকে উপরের দিকে তাকাল। নৈরিথ কে হঠাৎ দেখে সে কথা হারিয়ে ফেলেছে। সিফাতও নিরবে তাকিয়ে আছে নৈরিথের দিকে। মিথি সিফাতের হাত ছেড়ে দিল। ঠোঁট জোড়া কাঁপছে তার। কথাগুলো গলায় আটকে যাচ্ছে। তাও সে বললো,

‘ও সিফাত, নৈরিথ। আপনাকে বলেছিলাম না ওর কথা?’

নৈরিথের মনে পড়ল। হ্যাঁ, মিথি তাকে আগেই সব কিছু বলেছে। নৈরিথ সিফাতের দিকে তাকাল। কেমন যেন তার চোখ মুখ হয়ে আছে। অতঃপর নৈরিথ বললো,

‘হ্যাঁ, বলেছিলে। কিন্তু এতদিন পর ও কোথা থেকে এসেছে? এতদিন কোথায় ছিল ও?’

মিথি জবাব না দিয়ে সিফাতের দিকে তাকাল। সে চাইছে সিফাত’ই নৈরিথের প্রশ্নের জবাব দিক। মিথি চুপ হয়ে রইল। সিফাতও কিছুক্ষণ চুপ থাকল। তবে একসময় আর পারল না। সে উঠে দাঁড়াল। নৈরিথের মুখোমুখি হয়ে বললো,

‘আপনি কে? মিথির সাথে আপনার কি সম্পর্ক?’

নৈরিথ গম্ভীর সুরে বলে,

‘আমি ওর হাজবেন্ড।’

সিফাত অবাক হওয়ার ভান করলো। মিথির দিকে তাকিয়ে উদ্বেগ নিয়ে বললো,

‘বাহ মিঠু, তুই বিয়েও করে নিলি। কনগ্রেচুলেশন!’

মিথি খুশি হলো। সিফাতের মুখে আবার ‘মিঠু’ ডাকটা শুনতে পেয়ে ভীষণ খুশি হলো সে। বললো,

‘হ্যাঁ, কিছুদিন আগেই আমাদের বিয়ে হয়েছে। সেদিনও তোকে খুব মিস করেছিলাম। তুই বলেছিলি না আমার বিয়ের সমস্ত আয়োজন তুই একা করবি, কিন্তু সেদিন তুই ছিলি না। খুব মনে পড়ছিল তোকে। জানিস তো, শুধু সেদিন না এর আগেও এমন অনেক দিন গিয়েছে যখন আমার মনে হচ্ছিল তুই আমার কাছেই আছিস। আমি এক দুবার তোকে দেখেছিও হয়তো। তুই কোথায় ছিলি এতদিন? সত্যি করে বলতো, তুই কি আমাদের পাশের বিল্ডিং টা তে থাকতি?’

সিফাত জবাব দিল না। জবাব দেয়ার প্রয়োজন বোধ করলো না সে। সে নৈরিথের দিকে তাকাল। হেসে বললো,

‘নতুন জীবনের জন্য শুভেচ্ছা। আমার মিঠু কে ভালো রাখবেন কিন্তু। আসছি তাহলে।’

সিফাত কথাটা বলে পা এগুতে নিলেই মিথি তার হাতটা খামছে ধরে। সিফাত, নৈরিথ দুজনেই তার হাতের দিকে তাকায়। মিথির চোখগুলো আবারও ভিজে উঠে। কান্না ভেজা কন্ঠে সে বলে,

‘প্লীজ, যাস না।’

মিথির এই সুর সিফাতের বুকে গিয়ে বিঁধল। কিন্তু পারছে না সে, নিজের ইগোর কাছে বারবার হেরে যাচ্ছে। নৈরিথ অবাক হয়ে মিথির দিকে তাকিয়ে থাকে। কিছু সম্পর্কের গভীরতা শুধু মুখে বলে বোঝানো যায় না। মাঝে মাঝে সেটাকে মন দিয়ে উপলব্ধি করতে হয়। এই মুহুর্তে মিথির চোখের এই পানি’ই বলে দিচ্ছে সে সিফাত কে কতটা ভালোবাসে। নৈরিথ সম্মান করে এই ভালোবাসাটা কে। কিছুটা খারাপ লাগলেও অনেক বেশি ভালো লাগে এটা ভেবে যে সত্যিই এই স্বার্থপর পৃথিবীতে এখনও বন্ধুত্ব নামক একটা সুন্দর সম্পর্ক টিকে আছে। নৈরিথ এবার তপ্ত শ্বাস ফেলল। বললো,

‘চলে যাচ্ছো কেন সিফাত? মিথি তোমাকে ছাড়া ভালো থাকতে পারবে না। আর কত রাগ নিয়ে বসে থাকবে? এবার তো ওকে ক্ষমা করতে পারো। মেয়েটা যে খুব ভালোবাসে তোমায়। আমি জানিনা তোমাদের মাঝে কি হয়েছিল। তবে এতদিনে এইটুকু জেনে গিয়েছে তোমাদের সম্পর্ক টা খুব স্পেশাল। আর আমি এটাও জানি যে তুমিও মিথিকে ছাড়া ভালো নেই। কষ্ট তোমারও হচ্ছে। তবে, কেন? কেন এই কষ্টের সুতোটাকে আরো লম্বা করছো? এবার তো থামো। নিজেকে একবার বুঝাও, এই মেয়েটার জন্য হলেও নিজের রাগটা দমিয়ে নাও। বন্ধুত্বের হাতটা আবার বাড়িয়ে দাও। প্লীজ সিফাত!’

নৈরিথের কথা শুনে সিফাত যতটা না অবাক হয়েছে তার চেয়ে অনেক বেশি অবাক হয়েছে মিথি। মিথি ভেবে নিয়েছিল তার এহেন কর্মকান্ডে হয়তো নৈরিথ রেগে যাবে। ব্যাপার টা তো অস্বাভাবিক কিছু না। নিজের বউকে অন্য একটা পুরুষের হাত ধরে বসে থাকতে দেখলে সব স্বামীই রেগে যাবে। এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু নৈরিথ, সে একজন বিচক্ষণ মানুষ। সে বুঝে সম্পর্কের গভীরতা। নিজের জীবনে খুব মূল্যবান ভালোবাসাগুলো হারিয়েছে তো তাই সে হয়তো অন্যসব ভালোবাসাগুলোকে সম্মান করতে জানে। মিথি তাকিয়ে থাকে তার মানুষটার দিকে। তারপর আবার তাকায় সিফাতের দিকে। সিফাত নিচের দিকে চেয়ে রইল। যেন কিছু একটা নিয়ে খুব গভীরভাবে ভাবছে সে।
.
.
নীরবতায় কেটে গেল অনেকটা সময়। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হয়েছে। মিথি নৈরিথ সিফাত আর নেহা সবাই’ই এক টেবিলে বসা। কারো মুখেই কোনো কথা নেই। যেন নীরবতার ব্রতে নেমেছে সবাই। অনেকটা সময় পার হবার পর নৈরিথ এবার নীরবতার ব্রত ভাঙল। থমথমে কন্ঠে বললো,

‘কি এমন হয়েছিল তোমাদের মাঝে যে তোমরা একে অন্যকে ছেড়ে চলে গেলে?’

সিফাত আর মিথি একে অন্যের দিকে চাওয়া চাওয়ি করলো। তারপর মিথি মাথা নিচু করে ফেলল। সিফাত বললো,

‘কি রে মিঠু, তুই বলবি নাকি আমিই বলবো?’

মিথি ক্ষীণ সুরে বললো,

‘তুই’ই বল।’

সিফাত দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলতে আরম্ভ করলো,

‘ওর সাথে আমার পরিচয় ক্লাস নাইনের লাস্টের দিকে। তখনও আমরা এত ক্লোস ফ্রেন্ড ছিলাম না। কেবল ক্লাসমেটই ছিলাম। ও আর আমার বাসাও এক জায়গায় ছিল, সেই সুবাধে যাওয়া আসাও এক সাথে হতো। আর ঐভাবেই আস্তে আস্তে আমাদের সম্পর্কটা আরো গভীর হতে থাকে। তবে আমরা নিজেরাও বুঝতে পারি নি যে কবে আমরা একে অন্যের পরিপূরক হয়ে উঠি। তখন এমন হয়েছিল যে মিথিও আমাকে ছাড়া কিছু বুঝতো না অর আমিও মিথিকে ছাড়া কিছু বুঝতাম না। অনেক অনেক আনন্দ করি সেসময় দুজন। অনেক পাগলামী করেছি। স্যারদের বকা খেয়েছি। বাসায়ও মার খেয়েছি খুব। কিন্তু তাও আমাদের মধ্যে কোনো হেলদোল আসেনি। আমরা আমাদের মতোই ছিলাম। আসলে সেই সুন্দর মুহুর্তগুলো এখন আমি মুখে বলে এক্সপ্লেন করতে পারবো না। সব ভালো চলছিল। দেখতে দেখতে টেনের টেস্ট পরীক্ষাও শেষ হয়ে গেছিল। ততদিনে আমাদের বন্ধুত্বের এই জুটি পুরো স্কুলে খুব প্রিয় হয়ে গেছিল। সবাই পছন্দ করতো আমাদের। কিন্তু…কিন্তু এই পছন্দের মাঝেই কারো একজনের নজর পড়ল। মিথিকে কেউ আমার নামে খুব বাজে কিছু বলে। অনেক কিছু দেখায়ও ওকে। আসলে সেই ব্যক্তিটা মিথির ব্রেইনটা কে এমন ভাবে ওয়াশ করলো যে মিথি নিমিষেই আমাদের বন্ধুত্বের কথা ভুলে গেল। ক্লাসের সবার সামনে ও আমাকে চড় মেরেছিল, শুধু এইটুকুই না সেই ব্যক্তিটা নাকি ওকে বলেছিল যে আমি ওকে ইউজ করছি। আমার ইনটেনশন ভালো না। আমি ওকে নিয়ে খুব খারাপ কিছু ভেবে রেখেছি, ব্লা ব্লা আরো কত কি। আর সেই সব কিছু মিথি বিলিভ করে। অবশ্য বিলিভ করারও কারণ আছে কারণ যেই মানুষটা ওকে এসব বলেছে সেই মানুষটার কাছে অনেক ফেইক প্রমাণ ছিল। আর এইজন্যই সে মিথিকে খুব সহজেই বুঝিয়ে ফেলতে পারে। আর আমার মিঠু তো খুব বোকা, বিশ্বাস করে ফেলে সব কিছু। ক্লাসের সবার সামনে সেদিন সে আমাকে অপমান করে। আমি কখনো বন্ধু ছাড়া ওর দিকে অন্য কোনো নজরে তাকাই নি। সেই সাহস আবার ছিল না। কিন্তু সেইদিন ও আমার সেই ব্যক্তিত্বের উপরও আঙ্গুল তুলে। মেনে নিতে পারে নি আমি। আমার আবার খুব ইগো। সেদিনই সেই স্কুল থেকে বেরিয়ে যাই। ডিরেক্ট টি সি নিয়ে ফেলি। আর বাবাকে বলে বাইরে যাওয়ার প্রস্তুতি নেই। কিন্ত মজার ব্যাপার কি জানেন? আমার যেদিন ফ্লাইট সেদিনই মিথি সব সত্যি জানতে পারে। ফ্লাইটের ঠিক দু ঘন্টা আগে ও আমার কাছে এসেছিল। সে কি কান্না মেয়ের। নাকের পানি চোখের পানি সব এক করে ফেলেছিল। তাও আমার ইগো কে তার জায়গা থেকে নড়াতে পারলো না। আমি ইগনোর করে চলে এলাম। আর তারপর ও অনেক ভাবে আমার সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করে কিন্তু আমি করেনি। সেইদিনের সেই কষ্ট টা ভুলতে পারেনি। এখনও না। তাই ওকেও কষ্ট দিয়েছিলাম খুব। তবে একপর্যায়ে আমি আর না পেরে দেশে ফিরে আসি। আর মিথিদের বিল্ডিং এর সামনের বিল্ডিং এ উঠি। যেখানে প্রথম থেকেই মিথির সন্দেহ হয়, তবে আমিও খুব কৌশলে সেটা হ্যান্ডেল করি। আর..আর আমি আগে থেকেই সব কিছু জানি। আপনাদের বিয়ে থেকে শুরু করে মিথির আর মাহির অপারেশন কোনাটাই আমার অজানা নয়। ইচ্ছে করেই এতদিন মিথির কাছ থেকে লুকিয়ে ছিলাম। কিন্তু আজ ধরা পড়ে গেলাম। মেয়েটা এক দেখায় চিনে ফেলল আমাকে। আবারও সেদিনের মতো কেঁদে উঠল। আর আমি..’

সিফাত থেমে গেল। নৈরিথ আর নেহার চোখের পলক পড়ছে না। হতভম্ব হয়ে চেয়ে আছে তারা। মিথি আবারও কাঁদছে। মেয়েটা এত কাঁদে কেন? একটু কষ্টও সহ্য করতে পারে না। সে কাঁদতে কাঁদতে বললো,

‘সরি। আমি জানি আমি অনেক বড়ো ভুল করেছি। আমি আমার বন্ধুত্বের সম্পর্কটাকে অপমান করেছি, তোকে অপমান করেছি; কিন্তু কষ্টও পেয়েছি খুব। প্লীজ, প্লীজ ক্ষমা কর আমায়। আমি আর এই কষ্ট সহ্য করতে পারছি না।’

মিথি এবার শব্দ করে কেঁদে উঠল। নৈরিথের আর ভালো লাগছে না। মিথির এই কান্না সহ্য হচ্ছে না তার। তবে কিছু তো করারও নেই। সিফাত ছাড়া তো কেউই মিথির এই কান্না থামাতে পারবে না। কিন্তু এই ছেলে তো এখনও চুপ করে বসে আছে। নৈরিথ এই সবকিছুতে হাঁপিয়ে উঠল। চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে চোখ বুজে ফেলে সে। তখনই সিফাত বলে উঠে,

‘হয়েছে এবার কান্না অফ কর। আর ভালো লাগছে না তোর এই ফ্যাচফ্যাচ দেখতে। যাহ ক্ষমা করে দিলাম। তবে কান খুলে শুনে রাখ, এটাই ফার্স্ট আর এটাই লাস্ট ক্ষমা। এরপর যদি আর কোনোদিন এমন হয় তবে আমি কিন্তু আর কোনো কথা শুনবে না, এই বলে রাখলাম।’

মিথি খুশিতে ঝলমলিয়ে উঠে। সিফাতকে জড়িয়ে ধরতে গিয়েও থেমে যায়। নৈরিথের দিকে তাকায়, মুচকি হেসে তাকে জড়িয়ে ধরে। নৈরিথ প্রথমে অবাক হলেও পরে সেও হেসে মিথির মাথায় হাত রাখে। নেহা আর সিফাতের মুখেও হাসি ফুটে উঠে। সত্যিই, ভালোবাসা সুন্দর!

চলবে..