মুখোশ পর্ব-০১

0
288

#মুখোশ || ১ম পর্ব
#আশিক_মাহমুদ

‘ভাইয়া তুমি এখনি বাড়ির উদ্দ্যেশ্যে রওনা দাও,ভাবিকে নিয়ে সন্ধ্যায় সালিশ বসবে।’

রোজকার মত সকালে তাড়াহুড়ো করে রেডি হয়ে অফিসে যাওয়ার সময় ছোট বোনের নাম্বার থেকে টেক্সট টা পেয়ে থমকে দাঁড়িয়ে গেলো পিয়াস। কিছুক্ষণের জন্য যেন তার সময়টা থমকে গেলো চারপাশের। কাধের ব্যাগটা বিছানায় ফেলে দিয়ে পিয়াস তার বোনের নাম্বারে কল দিলো,কিন্তু নাম্বারটা বন্ধ দেখাচ্ছে।

পিয়াসের মাথাটা কেমন ঝিমঝিম করছে,হঠাৎ তার স্ত্রীকে নিয়ে সালিশ বসবে কেন? কি করেছে সারা?’

মোবাইলের ডায়াল প্যাড থেকে এবার সারার নাম্বারে কল করলো পিয়াস,কিন্তু সারাও ফোন তুলছে না। শেষমেশ বাবার নাম্বারে কল দিলে কয়েকবার রিং হওয়ার পর বাবা কলটা রিসিভ করেই বললো,’ কল করে ভালোই করেছিস খোকা,আমিও একটু পরই তোকে কল দিতাম। খোকা আজকে আর অফিসে যেতে হবেনা,একটা বাস ধরে বাড়ি চলে আয়।’

‘কেন বাবা কি হয়েছে? সারা ফোন তুলছে না কেন? রিম্পাও মেসেজ করে একই কথা বললো।’

‘ফোনে এতকথা বলা যাবেনা,আগে বাড়িতে আয়। তারপর নিজের কানেই সবটা শুনবি।’

বাবার কথায় একরকম দ্বিধাদ্বন্দ্বের ভিতরে পড়ে গেলো পিয়াস,সারাকে নিয়ে সালিশ বসবে! কেন কী করেছে সারা?’

পিয়াস গোলকধাঁধায় কোনমতে দরজায় তালা মেরে বেরিয়ে পড়লো গ্রামের উদ্দ্যেশ্যে। শহর থেকে পিয়াসের গ্রামের বাড়ি বেশ দূরে,বাস চেপে প্রায় সাত ঘন্টার মত লেগে যায়।
কিন্তু আজকে আরও বেশি সময় লাগলো। দিনের শুরুতে রওনা দিয়েছিলো,কিন্তু গ্রামে এসে যখন পৌঁছালো তখন দিনের আলো প্রায় শেষের দিকে। মাগরিবের আজান শেষ,সাজের আলো জ্বলতে শুরু করেছে এক এক করে।

বাড়ির সদর দরজায় গিয়ে দাঁড়াতেই দেখলো ইতিমধ্যে গোটা কয়েক মানুষ বাড়ির উঠানে চেয়ার পেতে বসে আছে। সাজের বেলায় একটা চাপা গুঞ্জনে বাড়ির উঠানটা সরগম হয়ে উঠেছে।
পিয়াস ধির পায়ে এগিয়ে গেলো সেদিকে,মা নূরজাহান সন্তানকে দেখতে পেয়ে ছুটে গেলো তার কাছে। তারপর ভাঙা গলায় বলে উঠলো,’ খোকা এসেছিস তুই! সমাজে আর মুখ দেখানোর জো রাখলো না তোর বউ।’

মায়ের কথার আগামাথা কিছুই বুঝলো না পিয়াস,অশান্ত চোখে সবার মাঝে সে তার স্ত্রীকে খুঁজতে লাগলো,কিন্তু কোথায় সে?
পিয়াসকে দেখে বসে থাকা সবাই এবার একটু নড়েচড়ে বসলো। যেন সবাই তারই আসার পথ চেয়ে বসে ছিলো এতক্ষণ।

ধির পায়ে এগিয়ে গিয়ে উঠানের একপ্রান্তে গিয়ে দাঁড়ালো পিয়াস,পিয়াসের বাবা আজিজুল হক-রফিক চাচার পাশের চেয়ারে চুপচাপ বসে আছেন। রিম্পা ঘরের চৌকাঠে হেলান দিয়ে দুশ্চিন্তায় আঙুল কামড়াচ্ছে। কিন্তু সারা কোথায়?’

পিয়াস জিজ্ঞাসা করলো,’ মা সারা কোথায়?’

‘কোথায় আবার থাকবে মুখপুড়ির তো আর যাওয়ার জায়গা নেই থাকলে এতক্ষণে ঠিকি চলে যেতো৷ ঘরেই বসে আছে।’

আর কথা না বাড়িয়ে ঘরের দিকে এগিয়ে গেলো পিয়াস। দরজার পাল্লা দুটো কোনোমতে ভেজানো ছিল। হাত রাখতেই ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ করে খুলে গেল দরজা। এক পা ভেতরে দিয়ে তাকাল সে। সারা খাটের এক কোণে গুটিসুটি মেরে বসে আছে। দুই হাঁটুর মাঝে মুখ লুকোনো, শরীরটা যেন আরও ছোট হয়ে গেছে তার।

চুপচাপ এগিয়ে গিয়ে সারার সামনে দাঁড়িয়ে নিচু স্বরে পিয়াস জিজ্ঞেস করল,’কী হয়েছে সারা? বাইরে সালিশ বসছে কেন?’

পিয়াসের কণ্ঠ শুনে সারা ধীরে হাঁটু থেকে মুখ তুলল। চোখজোড়া ফুলে ভেটকি মাছের মত হয়ে আছে। পিয়াস আরও একটু কাছে গিয়ে সারার পাশে বসে পড়ল। তারপর স্ত্রীর ডান হাতটা নিজের হাতে নিয়ে চোখে চোখ রাখার চেষ্টা করে আবার বলল,’কী হয়েছে সারা?’

সারা এবার ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো। যেন এতক্ষণের জমানো সকল অভিমান,দুঃখ-কষ্ট সবটা পিয়াসের কাছে নিংড়ে দিয়ে নিজেকে খানিকটা হাল্কা করে নিতে চাইছে সে।

খানিকটা পর কান্না থামিয়ে ধরা গলায় বললো,’ আমি জানিনা,সত্যিই জানিনা। মা নাকি গতকাল রাতে আমার ঘরে কাকে ঢুকতে দেখেছেন। আমি নাকি সবার অগোচরে অন্য পুরুষের সাথে…

পুরো কথাটা শেষ করতে পারলো না সারা। ফের ডুকরে কেঁদে ফেললো।

পিয়াস,সারাকে শান্ত্বনা দেওয়ার ভঙ্গিতে হাত দুটো নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে শক্ত করে ধরে চোখে চোখ রেখে বললো,’ আমার তোমার উপরে বিশ্বাস আছে। দুনিয়ার সবাই একসাথে হয়েও যদি তোমাকে এই অপবাদ দেয় তারপরও আমি বিশ্বাস করবো না। তুমি শান্ত হও আমি দেখছি।’

সারাকে বসিয়ে রেখে বিছানা ছেড়ে উঠে বাইরে গিয়ে সবার উদ্দেশ্যে বললো,’ আপনাদেরকে এতক্ষণ বসিয়ে রাখার জন্য আমি সবার কাছে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। আপনারা এখন আসতে পারেন।’

বাবার পাশে বসে থাকা পঞ্চাশোর্ধ রফিকুল মিয়া ব্যাঙ্গ মিশ্রিত কণ্ঠে বলে উঠলো,’ কি এমন বীজমন্ত্র জপে দিলো ওই মেয়ে,যে আমাদেরকে আর লাগবে না?’

পিয়াসের চোখ-মুখ শক্ত হয়ে এলো কথাগুলো শুনে। নিজেকে সামলে নিয়ে বললো,’ চাচা আপনি মুরুব্বী মানুষ আপনাকে যথেষ্ট সম্মান করি। আর সেই সম্মান থেকেই বলছি আপনারা এখন আসতে পারেন।’

রফিক মিয়া দমে গেলেন এবার,তারপর গলা খাঁকারি দিয়ে সবার উদ্দেশ্যে বলে উঠলেন,’ এই চলো চলো,দুনিয়াটা যে কোনদিকে যাচ্ছে। ব্যাটা মানুষ গুলাও সব দিনকে দিন বউয়ের গোলাম হয়ে যাচ্ছে। চলো চলো।’

এক এক করে উঠানটা ফাঁকা হয়ে এলো ক্রমশই। আজিজুল হক তখনো চুপচাপ চেয়ারে বসে ছিলেন। পিয়াস এবার সেদিকে এগিয়ে গিয়ে রাশভারী কণ্ঠে বলে উঠলো,’ বাবা সারাকে কি এমন মনে হয় তোমার? তুমি নিজেই তো সেদিন দেখে শুনে সারাকে এই ঘরে ছেলের বউ করে এনেছিলে,অন্তত আজকের দিনে তোমার নিরব থাকাটা মোটেও আশা করিনি আমি।’

আজিজুল হক কি বলবেন কিছু বুঝে উঠতে পারেন না। কিন্তু দুয়ারে দাঁড়িয়ে থাকা পিয়াসের মা নেমে এসে রূঢ় স্বরে বলে উঠলেন,’ পছন্দ করে এনেছে দেখেই কি ওই মেয়ে ধোয়া তুলসীপাতা হয়ে যাবে? আমি নিজের চোখে দেখেছি মধ্যরাতে একজন পুরুষকে ওর ঘর থেকে বেরুতে।’

‘মা তুমি নিশ্চয় ভুলে যাচ্ছো ওই ঘরে সারা একা ঘুমায় না। সারার সাথে তোমার মেয়ে রিম্পাও ঘুমায়। তাহলে তোমার কেন এমনটা মনে হলো তুমি যাকে দেখেছো সে সারার কাছেই এসেছিলো।’

পিয়াসের কথাগুলো শুনে নূর জাহান বেগম রক্তচক্ষু হয়ে উঠলেন। কড়া গলায় তিনি বলে উঠলেন,’এখন নিজের বউয়ের কলঙ্ক ঢাকতে আমার মেয়ের ওপর দোষ চাপানো হচ্ছে, তাই তো? আমার মেয়েকে আমি পেটে ধরেছি, আমি তাকে চিনব না তো তুই চিনবি? আমার মেয়ে কখনও রাতবিরেতে কাউকে বাড়িতে ডাকবে না।’

‘ঠিক আছে। সারাকে নিয়ে যখন এত সমস্যা, তখন আমি আগামীকাল ভোরেই সারাকে নিয়ে শহরে চলে যাব।’

‘শহরে নিয়ে গেলেই কি এই পাপ মুছে যাবে? আর শহরে যে নিয়ে যাওয়ার কথা বলছিস, নিয়ে গিয়ে রাখবি কোথায়? যে বেতনে চাকরি করিস, তাতে তো সংসারই চলে না। আলাদা বাড়ি নিয়ে চলবি কীভাবে?’

পিয়াসের কণ্ঠ এবার একটু চড়া হয়ে উঠল,’মা, কেন ত্যানা পেঁচাচ্ছ তুমি? আমার বউ আমি কোথায় রাখব, সেটা আমি দেখব। এতদিন তোমাদের ভালোর কথা ভেবেই গ্রামে রেখেছিলাম। কিন্তু এবার আর রাখা সম্ভব না।’

……
তখনকার মত কথা-কাটাকাটি শেষ। পিয়াস তার সিদ্ধান্ত সবাইকে জানিয়ে দিয়েছে এমনকি তার স্ত্রী সারাকেও। আগামীকাল ভোরেই সারাকে নিয়ে সে শহরে চলে যাবে।
দরকারে সাবলেট বা টিনশিডের একটা রুম ভাড়া নিয়ে নিবে তারপরও আর বউকে সে এখানে রাখবে না।

ডিসেম্বর মাস, শহরের তুলনায় গ্রামে বরাবরের মত শীতটা এবারও একটু বেশিই পড়ছে। শীতকালে গ্রামে একটু জলদিই রাত নামে। আজকে রিম্পা আলাদা ঘরে শুয়েছে সারা আর পিয়াস এক ঘরে আর বাবা-মা আরেক ঘরে। বাড়িতে তিনটা রুম,পিয়াস যখন শহরে থাকে তখন রিম্পার রুমটা ফাঁকাই পড়ে থাকে। রিম্পা আর সারা একসাথে শোয়।
কিন্তু আজকের দৃশ্যটা একটু অন্যরকম,ঘড়িতে এখন প্রায় দশটা বাজে। সচরাচর গ্রামের দিকে শীতের রাত দশটা মানে মধ্যরাতের সমান,তবুও আজকে তিনটা রুমেই আলো জ্বলছে।
বাবা-মায়ের ঘর থেকে ফিসফাসের আওয়াজ এলেও বাকি দুটো রুম নিস্তব্ধ।

সন্ধ্যার পর থেকে সারা আর ঠিকভাবে পিয়াসের সঙ্গে কথা বলেনি। পাশ ফিরে শুয়ে আছে সে। মনের ভেতর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে অশান্তির ঝড়ো হাওয়া। বারবার নিজের বাবা-মায়ের কথা মনে পড়ছে তার।

আজ যদি নিজের বাবা-মা বেঁচে থাকতেন, তাহলে হয়তো শাশুড়ি নূর জাহান এভাবে কটাক্ষ করে কথা বলতে পারতেন না। সত্যিই তো, মেয়েদের বাবা-মা বেঁচে না থাকলে যেন পুরো পৃথিবীটাই হঠাৎ ফাঁকা হয়ে যায়।

কিন্তু সারা তো পিয়াসের বাবা-মাকেই নিজের বাবা-মা হিসেবে মেনে নিয়েছিল। তাহলে আজ কেন এমনটা করলেন তাঁরা? নিজের মা হলে কি কখনও এমন মিথ্যে অপবাদ দিতে পারতেন তাঁর মেয়ের উপর?

নানান প্রশ্ন এসে ভিড় করে সারার মাথায়। মাথাটা অসহ্য যন্ত্রনায় যেন ফেটে যেতে চাইছে তার।

শীতের রাতের নিস্তব্ধতা একটু পরেই যেন আবার হঠাৎ করে শোরগোলে বদলে গেলো। বাবা-মায়ের রুম থেকে মা নূরজাহান চিৎকার করে কিছু একটা বলে চলেছে।

পিয়াস আর সারা দুজনেই চুপচাপ শুয়ে ছিলো এতক্ষণ, হঠাৎ সোরগোল শুনে দুজনেই উঠে বসলো। তারপর পিয়াস হুড়মুড়িয়ে বিছানা ছেড়ে নেমে গিয়ে দরজা খুলে বাবা-মায়ের রুমে যেতেই মা চিৎকার করে বললো,’ আমার আলমারিতে রাখা স্বর্ণের গয়না গুলো খুঁজে পাচ্ছিনা আর।….

চলবে….