#মুখোশ || ৮ম পর্ব
সাদিকের মুখ থেকে কোনো কথা বেরোচ্ছে না। মাথা চেপে ধরে শুকনো পাতার ওপর লুটিয়ে পড়ে, গলা কাটা মুরগির মতো ছটফট করছে সে।
রুদ্র দা ঠান্ডা মাথার মানুষ, সহজে ঘাবড়ান না। সাদিকের দিকে খানিকটা ঝুঁকে পড়ে ভালো করে ওকে পর্যবেক্ষণ করলেন। তারপর পিয়াসের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বললেন, ‘পিয়াস, ছেলেটাকে ভিতরে নিয়ে চলো। মনে হচ্ছে কেউ মাথায় শক্ত কিছু দিয়ে আঘাত করেছে। ওর কী হয়েছে সেটা শোনার আগে এখন ওকে সুস্থ করাটা বেশি জরুরী।’
তারপর আর দেরি না করে পিয়াস আর রুদ্র দা দু’জন মিলে সাদিককে ধরাধরি করে বাড়ির ভিতরে নিয়ে এসে চেয়ারে বসালেন। সাদিক অর্ধনিমজ্জিত চোখে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে আবার চোখ বুজলো। তীব্র ব্যথায় একটু পর পর তার মুখটা বিকৃত হয়ে উঠছে। আঘাত লেগে খানিকটা রক্ত বেরিয়ে মাথার কাছের জায়গাটা ভিজে স্যাঁতসেঁতে হয়ে গিয়েছে।
সাদিককে ভিতরে আনার পর বাকিরাও দৌড়ে এসে জড়ো হলো। পরিস্থিতি বুঝে রুদ্র দা তৎক্ষণাৎ সারার দিকে তাকিয়ে বললেন,‘সারা, উপরের ঘরে আমার ব্যাগের ভিতরে একটা ফার্স্ট এইড বক্স আছে। জলদি নিয়ে এসো।’
সারা হতবিহ্বল হয়ে মাথা নেড়ে কথামতো সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে গেল। তারপর কিছুক্ষণের মধ্যেই ছোট্ট সাইজের একটা লাল রঙের বক্স হাতে করে ফিরে এলো। রুদ্র দা বক্স খুলে পরিষ্কার তুলো আর ব্যান্ডেজ বের করে খুব সাবধানে ক্ষত স্থান পরিষ্কার করে সেখানে ওষুধ লাগালেন, তারপর মাথায় শক্ত করে ব্যান্ডেজ বেঁধে দিলেন।
সাদিকের স্বাভাবিক হতে বেশ কিছুটা সময় লাগলো। শ্বাসপ্রশ্বাস একটু স্থির হতেই রুদ্র দা আশ্বস্ত করার ভঙ্গিতে বললেন,’ভয়ের কিছু নেই। ক্ষতস্থানে ওষুধ দিয়ে ব্যান্ডেজ করে দিয়েছি। একটু ব্যথা থাকবে, কিন্তু চিন্তার কারণ নেই।’
সাদিক যেন এবার একটু স্বস্থি পেলো,একটা লম্বা শ্বাস ছেড়ে নড়চড়ে বসলো চেয়ারে।
রুদ্র দা জিজ্ঞাসা করলেন,’ এখন বলো তো এত রাতে তুমি ওখানে কি করছিলে?’
সাদিক তার মাথার ব্যান্ডেজে হাত বুলিয়ে চোখ বন্ধ করলো। ব্যান্ডেজে হাত দিতেই ঠোঁটের কোণে অদৃশ্য যন্ত্রণার ছাপ ফুটে উঠলো আবার।
কিছুক্ষণ চুপ থেকে ভারী গলায় বললো,’সন্ধ্যায় একটু বাজারে গিয়েছিলাম। একটু আগে বাজার থেকেই ফিরছিলাম। ফেরার সময় পিয়াসদের বাড়ির পিছনের ডাব গাছের পাশে কাউকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ভাবলাম হয়তো পিয়াস দাঁড়িয়ে আছে। তাই এগিয়ে গিয়েছিলাম কথা বলার জন্য। কিন্তু আমার পায়ের শব্দ শুনে মানুষটা হঠাৎ সরে গিয়ে হাঁটা শুরু করলো দেখে ভাবলাম হয়তো আমাকে দ্যাখেনি সে। তাই আমি আরও কাছে এগিয়ে গেলাম, পিয়াসের নাম ধরে ডাকতে ডাকতে।
আর তারপর আমাকে কাছে যেতে দেখে ছায়ামূর্তিটা তড়িঘড়ি করে পালানোর চেষ্টা করতেই মনে হলো লোকটা কোনো কুমতলবে ওখানে দাঁড়িয়ে ছিলো। তাই ছুটে গিয়ে পিছন থেকে জাপ্টে ধরলাম। অনেক চেষ্টা করেছিলাম তাকে আমার দিকে ঘুরিয়ে মুখটা দেখার জন্য। কিন্তু মানুষটার শরীরে যেন অসুরের শক্তি। এক ধাক্কায় আমাকে মাটির উপর ছুড়ে ফেলে দিলো।
তবুও আমি হাল ছাড়িনি। আবার উঠে ছায়ামূর্তিটাকে দেখার চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু ধস্তাধস্তির এক ফাঁকে সে আমাকে আরেকটা ধাক্কা মেরে ফেলে দিলো আর তারপর মাটিতে পড়ে থাকা একটা শুকনো ডাল তুলে নিয়ে আমার মাথায় বসিয়ে দিলো।’
এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে সাদিক মুখটা বিকৃত করে ফেলে আবার চোখ বুজলো।
রুদ্র দা তীব্রভাবে শ্বাস ফেললেন। তার চোখে মুহূর্তের জন্য উত্তেজনা আর সন্দেহের ছায়া পড়লো।
বললো,’লোকটার মুখটা দেখেছো তুমি?’
সাদিক কাঁধ ঝাঁকিয়ে বললো,’না। কালো চাদর দিয়ে মুখ ঢাকা ছিল, আর অন্ধকার হওয়াতে ঠিকমত বুঝতে পারিনি।’
রুদ্র দা একটা লম্বা শ্বাস ফেললেন। তবে এটা ভেবে মনে মনে খানিকটা খুশিও হলেন,যে রিম্পার খুনি তাদের আশপাশেই আছে। অচেনা কাউকে এবাড়িতে আসতে দেখে হয়তো সন্দেহের বশে এসেছিলো কান পাততে।
‘এটাই কি তোমার সেই বন্ধু? যার কথা আজ বিকেলে বলেছিলে?’
পিয়াসের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলো রুদ্র দা।
পিয়াস উত্তর দিলো,’হ্যাঁ রুদ্র দা।’
আজিজুল হক এতক্ষণ চুপচাপ বসে ছিলেন। হঠাৎ তার মুখে অস্বস্তির ছাপ ফুটে উঠলো। তিনি উঠে দাঁড়িয়ে বললেন,’আমি তো কিছুই বুঝতে পারছিনা। এত রাতে আমার বাড়িতে কে কান পাততে এসেছিলো? কি হচ্ছে আমার বাড়িতে?’
রুদ্র দা মৃদু হেসে বললেন,’আংকেল, আপনি চিন্তা কইরেন না। ভূত জেনে গেছে, তাকে ধরার জন্য ওঝা এসেছে, তাই একটু সতর্ক হতে এসেছিলো।’
‘ভূত! ওঝা! এসব কি বলছো, বাবা? আমার বাড়িতে ভূত এলো কীভাবে? আর ওঝাই বা কে?’
‘সময় হলেই জানতে পারবেন। আচ্ছা, অনেক রাত হয়ে গেছে পিয়াস, তুমি বরং তোমার বন্ধুকে একটু বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে আসো। সাদিক, তুমি কেমন আছো এখন?’
সাদিক একটু ইতস্তত করে বললো, আমি ঠিক আছি।
সমস্যা নেই, আমি একাই চলে যেতে পারবো।’
রুদ্র দা কোনো কথা না বলে পিয়াসকে সঙ্গে যেতে বলে চিলেকোঠার ঘরে চলে গেলেন।
..রুদ্র দা জানালার সামনে চেয়ার পেতে বসে আছেন।
খোলা জানালা দিয়ে হু হু করে ঢুকে আসা ঠান্ডা বাতাস শরীরে লাগতেই শরীরটা কেঁপে কেঁপে উঠছে, জানালার ওপরে থাকা ভারী পর্দাটা পতপত শব্দ করে দুলছে হাওয়াই। কিন্তু সেদিকে রুদ্র দার কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। এই মূহুর্তে তার মনটা অদৃশ্য কোনো গোলকধাঁধার ভেতরে ঘুরপাক খাচ্ছে।
পিয়াসের মুখে সাদিকের নাম শোনার পর প্রথম সন্দেহটা গিয়েছিল সাদিকের দিকেই। অচেনা সময়ে তার উপস্থিতি, অপ্রস্তুত আচরণ,সবকিছুই সন্দেহ জাগিয়েছিল।
কিন্তু আজকের ঘটনার পর সাদিককে আর পুরোপুরি সন্দেহের তালিকায় রাখা যাচ্ছে না। যে মানুষ নিজেই রক্তাক্ত হয়ে ফিরেছে, সে কি আদৌ শিকার, না কি পুরোটাই তার নিখুঁত অভিনয়?
রুদ্র দা চেয়ারে গা এলিয়ে দিয়ে এবার আরও তলিয়ে ভাবতে লাগলেন,খুনি যদি সাদিক না হয়ে থাকে, তাহলে কে?
তাহলে বাকি থাকে রিম্পার পরিবারের মানুষগুলো। চারজনের মধ্যে সেই রাতে পিয়াস আর সারা রিম্পার ঘরেই ছিল। তাদের বাদ দিলে থেকে যায় শুধু রিম্পার বাবা-মা। নূর জাহান বেগম?
না,একজন মা কখনোই নিজের মেয়েকে এভাবে খুন করতে পারে না। তার পক্ষে এমন নিষ্ঠুরতা অসম্ভব।
তাহলে আজিজুল হক?
রুদ্র দার চোখের সামনে ভেসে ওঠে ভেঙে পড়া একজন মানুষ যিনি মেয়েকে হারানোর শোকে নিজেই ঠিক করে দাঁড়িয়ে থাকতে পারেন না। আর সাদিকের ভাষ্যমতে, ছায়ামূর্তির শরীরে ছিল অসুরের শক্তি।
এই ভাঙা কাঁধের, নিঃস্ব মানুষটার পক্ষে তা কি আদৌও সম্ভব? না। এই মানুষটাও নয়।
তাহলে কে হতে পারে? প্রশ্নটা আরও ভয়ংকর হয়ে ওঠে।
রিম্পার হবু শ্বশুরবাড়ির কেউ?
হবু বর? হবু শ্বশুর?
নাকি এদের ভেতরেও কেউ নয়?
রুদ্র দা এবার দীর্ঘশ্বাস ফেলেন।
হতে পারে খুনি কেউই নয় যাদের তিনি এখন পর্যন্ত ভাবছেন। হতে পারে সে একজন অদৃশ্য খেলোয়াড়,যে বাইরে থেকেই সব ঘুঁটি সাজাচ্ছে, সবাইকে দাবার ঘুঁটির মতো ব্যবহার করছে।
রুদ্র দার চোখের দৃষ্টি সরু হয়ে আসে।
শিরদাঁড়া সোজা করে বসেন এবার,তারপর নিজের মনেই বলেন,’এই খেলাটা এতটাও সহজ নয়। যে খুনি সে শুধু কাছেরই নয়, হয়তো এই মুহূর্তেও কারও ছায়া হয়ে দাঁড়িয়ে আছে আশপাশে।
রুদ্র দা জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকলেন আরও কিছুক্ষণ। বাতাসের বেগ যেন হঠাৎই বেড়ে গিয়েছে। জানালার পর্দাটা এখন আগের থেকে আরও বেশি করে দুলছে। দেওয়ালের বুকে আঁচড়ে পড়ছে থেকে থেকে। সেই সাথে দূরের গাছগুলোর ছায়াগুলোও বাতাসে নড়ছে,ঠিক যেন কারও অস্থির উপস্থিতি। হঠাৎ তিনি চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালেন।
মুখ থেকে দ্বিধা সরে গিয়ে চোখে ফুটে উঠলো দৃঢ় সিদ্ধান্তের আলো। তিনি বুঝে গেছেন,এই খেলায় আর কাউকে বিশ্বাস করা যাবে না।
না পিয়াস, না সাদিক, না আজিজুল হক। কেউই পুরোপুরি নিরাপদ নয়। খুনি যদি সত্যিই আশপাশেই থাকে, তবে সবচেয়ে বড় ভুল হবে সবাইকে আগেভাগে সাবধান করে দেওয়া। রুদ্র দা সিদ্ধান্ত নিলেন,এরপর থেকে তিনি একা খেলবেন।
প্রথমত, পিয়াসকে তিনি ইচ্ছাকৃতভাবেই অন্ধকারে রাখবেন। ছেলেটা আবেগপ্রবণ, রিম্পার মৃত্যুর পর থেকে তার বিচারবুদ্ধি অনেকটা ঝাপসা,বাচ্চাদের মত হয়ে গিয়েছে। বেশি জানলে ভুল করে বসবে,আর সেই ভুলই খুনি কাজে লাগাবে।
দ্বিতীয়ত, সাদিককে আপাতত নজরে রাখতে হবে।
সে সত্য বলছে, না কি রক্ত আর যন্ত্রণাকে ঢাল বানিয়ে নিজের অবস্থান আড়াল করছে এটা বোঝার জন্য সময় দরকার। আর সময়ের জন্য সবচেয়ে ভালো অস্ত্র হলো নীরবতা। তাই এখন থেকে যা করবেন খুব গোপনে, নিরবে।
ঠিক সেই মুহূর্তেই হঠাৎ বাতাসের একটা ঝাপ্টা লেগে জানালার পাল্লা দুটোকে অস্থির করে তুললো। রুদ্র দা ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটিয়ে জানালার পাল্লা দুটো বন্ধ করে দিয়ে এসে শুয়ে পড়লেন।
তারপর নিজের মনে বললেন,’অপরাধীর সব দোষগুলোও বের করে একে একে ঠিক জানালার পাল্লা বন্ধ করার মতো, বন্ধ করে দিবো। শুধু সময়ের অপেক্ষা..’
….
ডিম লাইটের আলোয় নিস্তব্ধ ঘরের বিছানায় সারা আর পিয়াস শুয়ে আছে। দুজনের নিঃশ্বাসের শব্দ ছাড়া আর কিছুই কানে আসছে না দুজনার।
পিয়াস এবার বাড়ি আসার পর থেকে সারার সাথে ঠিকমত কথা বা সারাকে সময় দেওয়া কোনটাই হয়নি। একটার পর একটা সমস্যা যেন দুজনার মাঝে দেওয়াল হয়ে রুখে দাঁড়িয়েছে।
সারা অন্যপাশ হয়ে শুয়ে আছে,মনে হয় ঘুমাচ্ছে মেয়েটা।
পিয়াস একবার মুখ তুলে ডিম লাইটের ঝাপসা আলোই সারাকে দেখবার চেষ্টা করে বললো,’ ঘুমিয়ে গিয়েছো তুমি?’
ওপাশ হতে ক্ষীণ স্বরে উত্তর এলো,’ না। ঘুম আসছেনা।’
পিয়াস এবার সারাকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিয়ে বললো,’আচ্ছা তুমি কি মায়ের ওইদিনের ব্যবহারের জন্য এখনো রেগে আছো আমার উপরে? তোমার রেগে থাকাটা স্বাভাবিক, তোমাকে আর কি বলবো আমার নিজেরই তো সেদিন প্রচন্ড রাগ হয়েছিলো মায়ের উপরে। মা তো ভালোই জানে তুমি কেমন,তারপরও কেন যে মাঝেমাঝে এমন করে একমাত্র উপরওয়ালাই ভালো জানেন। তুমি প্লীজ আর রাগ করে থেকো না। এখন এই অবস্থায় আমরা যদি তাদের পাশে না থাকি তাহলে কোথায় যাবে তারা বলো?’
পিয়াসের হঠাৎ এমন কথায় সারা খানিকটা অপ্রস্তুত হয়ে বললো,’আমি কি একবারো তোমাকে বলেছি আমি রাগ করে আছি? পরের মেয়ে কখনো ভালো হয়না এটা আমি ভালোভাবেই জানি। ছোট থেকেই তো বউ শাশুড়ির দা কুমড়ার সম্পর্ক দেখে আসছি। তাই ওসব নিয়ে আমি রাগ করিনি। আমি ভাবছি অন্য কথা।’
‘কি কথা?’
‘রুদ্র দা কি সত্যিই রিম্পার মৃত্যু রহস্য বার করতে পারবে? রিম্পাকে কে-ই বা খুন করলো এসব চিন্তা সারাক্ষণ ঘুরঘুর করে মাথার ভিতরে।’
‘রুদ্র দার প্রতি আমার বিশ্বাস আছে। তিনি যখন এসেছেন কিছু একটা করবেই। তুমি সত্যিই আমার উপরে রাগ করে নেই তো?’
‘না।’
‘তাহলে ওপাশ ফিরে শুয়ে ছিলে কেন হুম?’
‘ওইতো ওসব নিয়েই ভাবছিলাম।’
‘ওসব ভাবনা রুদ্র দার। অনেক রাত হয়েছে, এখন ওসব ভেবে কাজ নেই।’
কথাটা বলেই পিয়াস তার স্ত্রীকে নিজের শক্ত বাহুতে টেনে নিলো। তারপর নাকে নাক ঠেকিয়ে বললো,’ভাবছি এসব ঝামেলা মিটে গেলে বাবা-মায়ের ইচ্ছেটা এবার পূরণ করে দিবো। কি বলো?’
পিয়াসের এমন কথায় সারা কি বলবে কিছু বুঝে উঠতে না পেরে লজ্জায় চোখ বন্ধ করে ফেললো। পিয়াস সেই সুযোগে সারাকে আরও শক্ত করে টেনে নিলো নিজের মাঝে।
…..
পরদিন সকালে দরজার কড়া নাড়ার শব্দে রুদ্র দা চোখ মেলে তাকালো। রুদ্র দা সবসময় ভোরেই ঘুম থেকে উঠে পড়েন,কিন্তু আজকে কেন জানি উঠতে ইচ্ছা করছিলো না তার। তাই কম্বল মুড়িয়ে চোখ বন্ধ করে শুয়ে ছিলেন এতক্ষণ। দরজায় কড়া পড়তে বিছানা ছেড়ে উঠে গিয়ে দরজা খুলে দেখলেন,বাইরে পিয়াস দাঁড়িয়ে আছে।
‘দাদা কি ঘুমাচ্ছিলেন এখনো? স্যরি সকাল সকাল কড়া নেড়ে আপনার ঘুমে ডিস্টার্ব করলাম।’
রুদ্র দা মৃদু হেসে জবাব দিলেন,’ আরে নাহ। আমি তো উঠেছি অনেক আগেই৷ তবে বিছানা ছেড়ে উঠতে আলসেমি লাগছিলো। বুঝতেই তো পারছো একা মানুষ,ধরাবাঁধা নিয়মটার মাঝে ঠিক নিজেকে বাঁধতে পারিনা। আর সেই জন্যই তো সংসারী হতে পারলাম না।
আচ্ছা আমার কথা বাদ,কিছু বলছিলে?’
পিয়াস বোকার মত তাকিয়ে থেকে বললো,’ ইয়ে মানে সকালের নাস্তা করবেন না?’
‘ওহ সেই জন্য এসেছো? আচ্ছা তুমি নিচে যাও,আমি হাত-মুখ ধুয়ে যাচ্ছি।’
পিয়াস নিচে নেমে যেতেই রুদ্র দা ফ্রেশ হতে চলে গেলেন। তারপর সবাই মিলে সকালের প্রাতরাশ সেরে আবার উপরে চলে এলেন।
…
পিয়াস দোকানে গিয়েছে একটু আগে। যাওয়ার সময় রুদ্র দাকে জানিয়ে গিয়েছে,সাথে এটাও বলে গিয়েছে যদি কিছুর প্রয়োজন হয় তবে সারা বা মাকে জানাতে।
সকাল দশটা নাগাদ চিলেকোঠার ঘরে থাকার পর কি মনে করে রুদ্র দা নিচে নেমে রোয়াকে বসে থাকা নূর জাহান বেগমকে দেখতে পেয়ে বললেন,’আন্টি আমি একটু বাইরে যাচ্ছি ফিরতে একটু দেরি হতে পারে। পিয়াস আসলে বলে দিয়েন।’
নূর জাহান বেগম পাল্টা প্রশ্ন না করে বললেন,’ আচ্ছা ঠিক আছে বাবা৷ তবে যেখানেই যাও দুপুরের আগেই ফিরে এসো। বাইরের খাবার খেয়ো না একদম।’
‘আচ্ছা ঠিক আছে আন্টি। আংকেল কি কোথাও গিয়েছেন? দেখছি না যে।’
‘হ্যাঁ বাবা,বার হলো একটু আগে। কেন কিছু বলতে?’
‘না আন্টি। আচ্ছা এখন আসি তাহলে।’
কথা শেষ করে রুদ্র দা বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলেন৷ তারপর এদিক সেদিক তাকিয়ে নিয়ে গতকাল রাতে সাদিক কে যেখানে আহত অবস্থায় পাওয়া গিয়েছিলো সেখানে গিয়ে দাঁড়ালেন। শুকনো পাতার গায়ে এখনো কয়েক ফোটা রক্ত লেগে আছে,সেগুলো শুকিয়ে শক্ত হয়ে জমে গিয়েছে। একটু দূরেই আঘাত করা লাঠিটাও দেখতে পেলেন। এগিয়ে গিয়ে লাঠিটাকে ভালোভাবে দেখার পর মুখ তুলে একবার পিয়াসদের ঘরের পিছনে থাকা ডাব গাছ টার দিকে তাকালেন।
এখান থেকে পনেরো কদম ফেললেই রিম্পার ঘরের পিছনের জানালাটা পাওয়া যাবে৷ তারমানে গতকাল সাদিক যাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছিলো সে নিশ্চয় ঘরের ভিতরে কি কথা হচ্ছে সেসব শোনার জন্যই এসেছিলো। কিন্তু বাইরের কেউ কীভাবে জানবে,যে- কেউ রিম্পার ঘরটা দেখার জন্য এই সময়টাতে ভিতরে ঢুকবে?
রুদ্র দা এক পা এক পা করে এবার সেদিকে এগিয়ে গেলেন। তারপর জানালার কাছে গিয়ে নিচের দিকে তাকাতেই দেখলেন, একজোড়া সেন্ডেলের দাগ বসে আছে মাটির উপরে। তবে দাগটা অস্পষ্ট। কারণ, যে এখানে এসে দাঁড়িয়ে ছিলো সে একভাবে দাঁড়িয়ে থাকেনি,একটু পর পর পা ফেলে জায়গা বদল করেছে।
আশপাশে তাকিয়েও তেমন কিছুই চোখে পড়লো না রুদ্র দার। তবে সেন্ডেলের ছাপ টা চোখ দিয়ে মেপে নিলেন তিনি৷
তারপর সেখান থেকে চলে আসার সময়,শুকনো বাঁশের কঞ্চিতে একটা কাপড়ের ছেঁড়া টুকরো দেখতে পেয়ে থমকে দাঁড়িয়ে গেলো রুদ্র দা। কাপড়ের ছেড়া টুকরো টা পুরোনো নয় দেখে মনে হচ্ছে সদ্য কাপড় থেকে অসাবধানবশত খোঁচায় বেঁধে ছিড়ে গিয়েছে।
রুদ্র দা কাপড়ের ছেড়া অংশটা হাতে তুলে নিয়ে প্যান্টের পকেটে ঢুকিয়ে রাখলেন৷ তিনি সিউর কাপড়ের এই ছেঁড়া অংশটা টা গতকাল যে এসেছিলো তার শরীরের৷ কারণ ঘরের পিছনের পরিত্যক্ত জায়গায় হুটহাট কোনো মানুষ আসবে না। আর যে এসেছিলো গতকাল রাতে তার গায়ে এই কাপড়ের কোনো পোষাক দ্যাখেনি সে। কাজেই খুনি সাদিক নয় অন্যকেউ।
দুপুরে আর রুদ্র দার বাড়ি ফেরা হলো না। এদিক-সেদিক ঘোরাঘুরির ফাঁকে একবার থানাতেও ঢুঁ দিলেন তিনি। থানায় গিয়ে নিজের পরিচয় দিতেই দেখলেন, ওসি সাহেব তাঁকে আগে থেকেই চেনেন। রুদ্র দাকে সামনাসামনি দেখে ওসি বেশ খুশিই হলেন। সামনে বসিয়ে তাঁর প্রখর বুদ্ধিমত্তার প্রসংসা করার পাশাপাশি তাঁকে চা খাওয়ার অনুরোধও করে বসলেন। রুদ্র দা চা খেতে খেতে গ্রামে আসার কারণটা সংক্ষেপে জানালেন। তবে সবটা আপাতত গোপন রাখার জন্য ওসি সাহেবকে বিশেষভাবে অনুরোধ করলেন।
তারপর থানার কাজ মিটিয়ে যখন বাইরে এলেন,দেখলেন, দুপুর গড়িয়ে বিকেল নামতে চলেছে। নানান কাজে তিনি নূর জাহান বেগমের কথা একপ্রকার ভুলেই গিয়েছিলেন। সকালে বেরুনোর সময় রুদ্র দাকে বার বার বলে দিয়েছিলেন তিনি, যেন দুপুরের আগে বাড়ি ফিরে৷ বাইরের খাবার যেন একদমই না খায়।’
মেয়ে হারানোর শোকে তিনি নিজে ভেঙে পড়লেও সন্তানের প্রতি তাঁর যত্নটুকু একচুলও কমেনি। কথাগুলো মনে হতেই রুদ্র দার বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেমন করে উঠলো। তাঁর নিজের মায়ের কথা মনে পড়ে গেল। বহু বছর হলো মা’কে হারিয়েছেন তিনি। মায়েরা বোধহয় এমনই হয়,নিজেদের অন্তর জ্বলে পুড়ে ছাই হয়ে গেলেও, সন্তানদের আগলে রাখার শক্তিটুকু কোথাও না কোথাও ঠিক জমিয়ে রাখেন।
এবার আর কোথাও দাঁড়ালেন না রুদ্র দা, সোজা বাড়ির পথে রওনা দিলেন। বিকেলে বাড়ি ফিরে এলে নূর জাহান বেগম নিজের হাতে রুদ্র দাকে খাবার পরিবেশন করে খাওয়ালেন। এই প্রথম রুদ্র দা মহিলার মুখে একটু হাসি দেখতে পেলেন। সেই সকালে অল্প কিছু নাস্তা মুখে দিয়ে বেরিয়েছিলেন তারপর এক কাপ চা ছাড়া আর সারাদিনে কিছু পেটে পড়েনি। অনেকদিন পর ঘরোয়া খাবার দেখে খিদে পেটে বেশ তৃপ্তি করেই খেলেন তিনি।
তারপর হাত-মুখ ধুয়ে চিলেকোঠার ঘরে উঠে গেলেন।
ঘরের তালা খুলে ভিতরে ঢুকতেই পায়ের নিচে একটা বেনামি নীলচে খাম দেখতে পেয়ে খামটা হাতে তুলে নিলেন রুদ্র দা।
তারপর তৃপ্তির ঢেকুর তুলতে তুলতে বিছানায় গিয়ে বসে খামটা খুলে ভিতরে থাকা কাগজটা বার করতেই দেখলেন, কাগজ টাতে মোটা মোটা অক্ষরে লেখা আছে,’ প্রাণে বাঁচতে চাইলে শহরে ফিরে যাও।’
চলবে…
#আশিক_মাহমুদ

