মুখোশ পর্ব-০৯

0
267

#মুখোশ || ৯ম পর্ব

-নীল রঙের খামটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে রইলেন রুদ্র দা। কাগজের লেখাটা নতুন করে আর পড়ার প্রয়োজন হলো না তার। ছোট্ট একটা লাইন,কিন্তু এই এক লাইনের কয়েকটা শব্দে মিশে আছে চিঠির বাহকের রাগ,ক্ষোভ আর ধরা পড়ে যাওয়ার সংশয়। হুমকিটা খুব পরিষ্কার, খুব নির্দিষ্ট।
‘শহরে ফিরে যাও’
মানে খুনি জানে, মানুষটা শহর থেকে এসেছে। জানে, সে তদন্ত করছে। আর সবচেয়ে বড় কথা খুনি চায় না, সে এই বাড়িতে থাকুক।

রুদ্র দার ঠোঁটের কোণে মৃদু একচিলতে হাসি টেনে নিয়ে নিজের মনে বললেন,‘ভয় দেখিয়ে আমাকে সরাতে চাইছে? এই সামান্য ভয়ে তো আমি সরবো না, বাছাধন।

রুদ্র দা আসার দিন ভেবেছিলো দুটো দিন থেকে তারপর চলে যাবে। কিন্তু এই বেনামি চিঠির পাতায় পরোক্ষ হুমকিতে রুদ্র দা তাঁর সিদ্ধান্ত বদলিয়েছে। এই বেনামি চিঠির বাহক কে সে প্রকাশ্যে না এনে এখান থেকে এক পাও নড়বে না। তার আগমনে যে খুনি ভয় পেয়েছে সেটা তো হাতের এই চিঠিটাই স্পষ্ট বলে দিচ্ছে। এখন শুধু তাকে সবার সামনে আনা বাকি।

খাম আর কাগজ দুটো নিঃশব্দে ভাঁজ করে নিজের ব্যাগের ভেতরের গোপন খোপে ঢুকিয়ে রাখলেন তারপর উঠে জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন। বাইরে তখন সবে সন্ধ্যা নেমেছে, নীল আকাশের বুকে নীলচে রঙ টা হারিয়ে ধীরে ধীরে কালচে মেঘে ঢেকতে শুরু করেছে, বাতাসে কেমন একটা অদ্ভুত ভার। ঠিক যেন প্রকৃতিও কিছু একটা ঘটার অপেক্ষায় আছে।

এমন সময়ে দরজায় ঠকঠক টোকা পড়লো। রুদ্র দা ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালেন। দেখলেন দোরগোড়ায় পিয়াস দাঁড়িয়ে আছে।

‘কিছু বলবে পিয়াস?’

‘রুদ্র দা!’
পিয়াসের চোখেমুখে অস্বাভাবিকতা দেখে রুদ্র দা এগিয়ে গেলেন, তারপর শান্ত দৃষ্টিতে পিয়াসকে দেখে নিয়ে বললেন,’কিছু হয়েছে কী? ভিতরে আসো,বসো। শান্ত হও আগে।’

পিয়াস ভিতরে ঢুকে বিছানায় গিয়ে বসতেই রুদ্র দা কাছে গিয়ে পিয়াসের সামনে গ্লাসভরতি পানি এগিয়ে দিলেন। গ্লাসটা হাত থেকে নিয়ে একপ্রকার হুড়মুড়িয়ে মুখে ঢেলে দিলো পিয়াস। তারপর এক নিঃশ্বাসে সবটা পান করে কিছুক্ষণ দম নিয়ে বললো,‘রুদ্র দা, বিকেলে সাদিক এসেছিলো আমার দোকানে।’

রুদ্র দার শান্ত জোড়া এবার খানিকটা কৌতুহলী হয়ে উঠলো।
বললেন, ‘কেন এসেছিলো?’

‘আপনার সাথে না-কি তার কথা আছে।’

‘আমার সাথে!’
আমার সাথে তার কি এমন কথা থাকতে পারে?

নিজের মনে কথাগুলো আওড়ে নিয়ে বললেন,’কোথায় তোমার বন্ধু?’

‘রাতে আসবে। আমি কত করে বললাম,আমাকে বলতে। কিন্তু কোনভাবেই বললো না আমাকে। শুধু বললো, আমাদের সামনে না-কি আরও একটা ঝড় আসতে চলেছে। কথাটা শুনে মনটা কেমন অস্থির লাগছে, রুদ্র দা।’

‘আচ্ছা, শান্ত হও, রাতে তো আসবে বলেছে। তখনই না হয় শুনে নিবে।’

পিয়াস বেশিক্ষণ স্থির হয়ে বিছানায় বসে থাকতে পারলো না। চিলেকোঠার ঘর থেকে বেরিয়ে হন্তদন্ত হয়ে নিচে নেমে গেলো।

পিয়াস ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলে রুদ্র দা এবার দরজার দিক থেকে মুখ ফেরোতেই ঘরের এক কোণে রাখা টিনের ছোট বাক্সটার দিকে চোখ পড়লো। আর বাক্সটার দিকে চোখ পড়তেই তার সরু কপালে কয়েকটা ভাঁজ ফুটে উঠলো।

তিনি প্রথমবার যখন এই ঘরে ঢুকেছিলেন তখন ঘরটাকে ভালোমত দেখার সময় ঘরের এক কোণে এই বাক্সটাকে দেখেছিলেন। অনেক পুরোনো দিনের বাক্স। আগেকার দিনে কেউ কোথাও বেরোনোর সময় সাধারণতো এই ধরণের বাক্সগুলোতে তার প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সহ কাপড়চোপড় ভরে সঙ্গে করে নিয়ে যেতো। অনেকটা এখনকার দিনের লাগেজের মত। বাক্সটার সাইজ দেড় ফুটের মত হবে। রুদ্র দা যখন প্রথমবার বাক্সটাকে দেখেছিলেন তখন বাক্সটার উপরে কয়েকটা পিতলের পাতিল রাখা ছিলো। এমনকি আজ সকালে বেরিয়ে যাওয়ার সময়ও সেগুলো সাজানো অবস্থায় দেখে গিয়েছিলেন। কিন্তু এখন পাতিলগুলোর স্থান পরিবর্তন হতে দেখে তার মনে সন্দেহের দানা বাঁধলো। পাতিলগুলো এখন আর সারিবদ্ধভাবে ভাবে বাক্সের উপরে নেই বরং সেগুলো এখন বাক্সের একপাশে পড়ে আছে খানিকটা অগোছালো ভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে।

দেখে মনে হচ্ছে কেউ চটজলদি বাক্সটা খুলে বাক্স থেকে কিছু নেওয়ার পর নামিয়ে রাখা পাতিলগুলোর কথা ভুলে গিয়েছে।

তাহলে কি তার অনুপস্থিতিতে কেউ এই ঘরে ঢুকেছিল?
কৌতূহলী চোখে এগিয়ে গেলো বাক্সটার দিকে। তারপর সন্তপর্ণে হাতল ধরে বাক্সটা একটু টেনে সামনে এনে ঢাকনাটা ধরে তুলতেই কাঁচকাঁচ শব্দ করে বাক্সটার ক্যাচ ছেড়ে গেল।

বাক্সের ভেতরে চোখ রাখলেন রুদ্র দা। দেখলেন বাক্সের ভিতরে পুরোনো দিনের কিছু কাগজপত্র,বাড়ির দলিল দস্তাবেজ সবকিছু ফাইল করে রাখা আছে। আর কাগজের ভাজে আটকে আছে একটা কানের দুল!

দুলটা হাতে নিয়ে রুদ্র দা বিছানায় গিয়ে বসলেন। এমন পুরোনো একটা বাক্সের ভিতরে হাল আমলের ডিজাইনের কানের দুল তাও আবার স্বর্ণের!

তারমানে কি এই বাক্সে আরও স্বর্ণের অলঙ্কার ছিলো,এবং তার অনুপস্থিতিতে যে ঢুকেছিলো সে নিশ্চয় এগুলো নিতেই ঢুকেছিলো। পরে হয়তো তাড়াহুড়োয় এক কানের দুল পড়ে গিয়েছে। কিন্তু কে সে? তালাবদ্ধ ঘরে নিশ্চয় বাইরের কেউ ঢুকবে না,তার অনুপস্থিতিতে এই ঘরে কে ঢুকতে পারে, এই প্রশ্নটাই অস্থির করে তুললো তাকে। তাহলে কি কলকাঠি নাড়ানোর মানুষটা এ বাড়িরই কেউ?

সাদিক কি তবে এই বাড়িরই কারও সম্পর্কে কিছু বলতে চাইছে? ভাবনার জট ছাড়াতে না ছাড়াতেই সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত নামলো। পিয়াসের কথামতো রাতে সাদিকের আসার কথা ছিল। কিন্তু অনেক রাত পর্যন্ত অপেক্ষা করেও তার দেখা মিললো না দেখে রুদ্র দা ভিতরে ভিতরে আরও অস্থির হয়ে উঠলেন। রাতের নৈশভোজ সেরে খানিকটা স্বস্তি পেতে ছাদের উপর পায়চারী করছিলেন তিনি। হঠাৎ করে পিয়াসদের বাড়ির প্রাচীরের ওপাশে কাউকে দেখতে পেয়ে থমকে দাঁড়িয়ে গেলেন।

কেউ একজন মুখ তুলে দাঁড়িয়ে আছে প্রাচীরের ওপাশে,কিন্তু যে দাঁড়িয়ে আছে তার মুখটা অস্পষ্ট। রুদ্র দা বিচলিত না হয়ে ধীরস্থির হয়ে গা ঢাকা দিয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন কি ঘটতে চলেছে দেখার জন্য।

কিন্তু কোনকিছু বুঝে ওঠার আগেই ছায়ামূর্তিটা রুদ্র দা কে দেখতে পেয়ে প্রাচীর থেকে সরে গিয়ে অন্ধকারে হারিয়ে গেলো। রুদ্র দা এবার আর চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকতে পারলেন না। চটজলদি সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে বিদ্যুৎ গতিতে বেরিয়ে গেলেন বাড়ির বাইরে। তারপর ছায়ামূর্তিটার পথ অনুসরণ করে দ্রুত ছুটতে লাগলেন তাকে ধাওয়া করতে।

কিন্তু খানিকটা পথ যাওয়ার পরও কোনো কাজ হলো না। ততোক্ষণে গ্রামের আঁকাবাঁকা অসংখ্য সরু পথের মাঝে একটাতে নিজেকে লুকিয়ে নিয়েছে ছায়ামূর্তি। রুদ্র দা পরিশ্রান্ত শরীরে ফিরে এলেন আবার।

….
-পরদিন সকাল দশটা নাগাদ বাড়ি থেকে খানিকটা দূরে একটা চায়ের দোকানে বসে চা খাচ্ছিলেন রুদ্র দা। গতরাতে ঠিকমত ঘুম না হওয়ায় মাথাটা ধরেছে একটু।
একটু বেলা হয়ে যাওয়াতে দোকানটায় খুব একটা ভিড় নেই এখন, হাতে গোনা যে দু’একজন গ্রাম্য খদ্দের বসে আছে তারা নিজেদের মধ্যে গল্প করছে।

রুদ্র দা সেসবে কান না দিয়ে গতকাল রাতে ধাওয়া করা সেই ছায়ামূর্তিটার কথা ভাবছিলেন আর চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছিলেন।

ঠিক তখনই তাকে লক্ষ্য করে কেউ একজন বলে উঠলো,
‘আপনিই কি শহর থেকে এসেছেন পিয়াসদের বাড়িতে?’

রুদ্র দা চায়ের কাপ থেকে মুখ তুলে তাকালেন সেদিকে। তার ঠিক উল্টো দিকের বেঞ্চে বসে আছে বছর ত্রিশের এক যুবক। চোখেমুখে অযথা কৌতূহল থাকলেও, চেহারায় বেশ স্বাভাবিকতা ধরে রেখেছে যুবক।

যুবকের দিকে তাকিয়ে রুদ্র দা শান্ত স্বরে উত্তর দিলেন,‘হ্যাঁ। কিন্তু আপনাকে তো ঠিক চিনলাম না?’

যুবক হালকা হেসে বললো,‘আমাকে আপনি চিনবেন না। আমি পিয়াসের বন্ধু। গতকাল কথায় কথায় পিয়াসের মুখে আপনার নামটা শুনেছিলাম, তাই…।’

‘ওহ, আচ্ছা।’

যুবকের সাথে বেশি কথা বাড়ালেন না তিনি, চায়ের বিল দিয়ে বেঞ্চ ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন ,তারপর যুবকের থেকে বিদায় নিয়ে দোকান থেকে বেরিয়ে সরাসরি রওনা দিলেন সাদিকের বাড়ির উদ্দ্যেশ্যে। এই যুবকের সাথে কথা বলার থেকে সাদিকের সঙ্গে একবার দেখা করাটা এখন বেশি জরুরি হয়ে পড়েছে।

সাদিকের বাবা নেই। বাড়িতে আছে এক বৃদ্ধা মা আর বড় ভাই-ভাবি। বড় ভাই বিয়ে করে আলাদা সংসার পেতেছে, কিন্তু সাদিকের আর বিয়ে করা হয়ে ওঠেনি।
মাসে চান্দে দু-একবার গ্রামে আসে, আবার হঠাৎ করেই উধাও হয়ে যায়। কোথায় যায়,কি করে সেসব কথা বাড়ির কাউকেই বলেনা।

সাদিকের সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে দেখলেন সাদিকের প্রচন্ড জ্বর। জ্বরের চোটে ঠিকমত চোখ মেলে তাকাতে পারছে না সে। বৃদ্ধা জানালো,গতকাল বাইরে থেকে এসেই জ্বর বাঁধিয়ে শুয়ে আছে।’

সাদিক গতকাল আসবো বলেও তার না আসার কারণটা এবার বুঝতে পারলেন রুদ্র দা। একটা চেয়ার টেনে নিয়ে বসে সাদিক কে জিজ্ঞাসা করলেন,’মাথায় কি বেশি চোট লেগেছে? পরে ডাক্তার দেখিয়েছিলে?’

সাদিক জোর করে হাসার চেষ্টা করে বললো,‘আমাদের এসব ছোটখাটো ব্যাপারে ডাক্তার দেখাতে হয় নাকি! নাপা আছে না?’

‘তারপরও… মাথার চোট বলে কথা,এতটা হালকা ভাবে নিও না। জ্বর কি বেশি?’

‘আছে… তবে অতটা না।’

রুদ্র দা খানিকক্ষণ সাদিকের দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন,‘পিয়াস বলছিল, তুমি নাকি আমাকে কিছু বলতে চাইছিলে। রাতে তো তোমার আসার কথা ছিল। কিন্তু তুমি এলে না দেখে আমি নিজেই চলে এলাম। এসে দেখি তুমি জ্বরের কবলে পড়েছো।’

সাদিক এবার বিছানা ছেড়ে উঠে বসার চেষ্টা করতেই রুদ্র দা হাত তুলে বাধা দিয়ে বললেন,‘উঠতে হবে না। শুয়ে থেকেই বলো।’

সাদিক চোখ বন্ধ করে কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর বললো,‘সেদিন রাতে যার সাথে আমার ধস্তাধস্তি হয়েছিল… তার মুখটা দেখতে না পেলেও একটা জিনিস অন্ধকারেও বুঝতে পেরেছি।’

রুদ্র দার চোখ সরু হয়ে এলো। ভ্রু কুটিয়ে বললেন,‘কী সেটা?’
‘তার ডান হাতে ছয়টা আঙুল ছিল। তাকে ধরার জন্য যখন তাকে জাপ্টে ধরেছিলাম, তখনই ডান হাতের আঁচড়ে টের পেয়েছি।’

কথাটা শুনে রুদ্র দা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। যেন মাথার ভেতরে কোথাও একটা খটকা জোরে শব্দ করলো।
তারপর জিজ্ঞেস করলেন,‘আচ্ছা তার চোখ দুটো দেখেছিলে?’

‘না। অন্ধকারে ঠিক চিনতে পারিনি। কেন?’

রুদ্র দা হালকা মাথা নাড়লেন। বললেন’‘কিছু না। আচ্ছা আরেকটা কথা,পিয়াসকে তুমি ঝড়ের কথা বলতে ঠিক কীসের ইঙ্গিত দিয়েছিলে একটু বলবা?’

‘সত্য খুঁজে বার করাটা আপনার কাজ,আমি শুধু বললাম। বাকিটা আপনিই খুঁজে বার করুন এবার।’

রুদ্র দা আর কিছু জিজ্ঞেস করলেন না। উঠে দাঁড়িয়ে বললেন,’এখন একটু বিশ্রাম নাও। আর পারলে একবার ডাক্তারের কাছ থেকে ঘুরে এসো। মাথার চোট টাকে হালকা ভাবে নিও না।’

…..
আজিজুল হক চাদর মুড়িয়ে রোয়াকে একটি চেয়ার পেতে বসে আছেন। সামনে মেঝেতে বসে সারা মাথা নিচু করে তাঁর পায়ে কী যেন মাখিয়ে দিচ্ছে। একটু পর পর ব্যথার চাপে আজিজুল হকের মুখটা কুঁচকে উঠছে।

ঠিক সেই সময় বাড়িতে ঢুকে রুদ্র দার চোখ পড়লো দৃশ্যটার দিকে। তিনি ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলেন সেদিকে। রুদ্র দাকে দেখে আজিজুল হক একবার মুখ তুলে তাকালেন, কিন্তু প্রচণ্ড যন্ত্রণায় কিছু বলার আগে আবার চোখ নামিয়ে নিলেন।

রুদ্র দা জানতে চেয়ে বললেন,’কি হয়েছে আংকেল? পায়ে চোট লাগলো কীভাবে?’

পিয়াসের বাবা উত্তর দিতে গিয়েও ব্যথায় কাতর হয়ে থেমে গেলেন। তখন নিচে বসে থাকা সারা মুখ তুলে উত্তর দিলো,’ দেখুন না দাদা এই শরীরে এখন বাইরে যাওয়াটা কি খুব দরকার উনার? রোয়াকের সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে পা পিছলে পড়ে গিয়ে পায়ে খুব ব্যথা পেয়েছে তাই ওষুধ লাগিয়ে দিচ্ছি।’

সারার পাশে এতক্ষণ মনমরা হয়ে বসে থাকা নূর জাহান বেগম রুদ্র দাকে দেখে ক্ষীণ স্বরে বললেন,’কোথাও গিয়েছিলে বাবা? এমন একটা সময়ে এলে যে ঠিকমতো তোমার দেখভালটাও করতে পারছি না। জানি না একা একা সারাদিন কোথায় ঘোরো কি করো। পিয়াসটাও হয়েছে তেমন,তুমি এসেছো কোথায় তোমার সঙ্গে একটু থাকবে, তা না করে বাবার দোকান সামলাতে চলে গিয়েছে। বাবা এখানে তোমার কোনো অসুবিধা হচ্ছে না তো?’

রুদ্র দা সংক্ষেপে উত্তর দিলেন,’ না আন্টি, আমি একদম ঠিক আছি। আমাকে নিয়ে একটুও চিন্তা করবেন না।’

কথাটা বলে রুদ্র দা উপরে চলে যাচ্ছিলেন, হঠাৎ রোয়াকের এক পাশে উল্টে থাকা একজোড়া সেন্ডেলের দিকে চোখ পড়কেই দৃষ্টি আটকে গেলো তার। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে একবার সেন্ডেলের তলার দিকটা ভালো করে দেখলেন। মুহূর্তেই তাঁর ভ্রু কুঁচকে গেল। ঠিক একই সেন্ডেলের ছাপ তিনি দেখেছিলেন রিম্পার ঘরের পেছনে।

কাউকে কিছু বুঝতে না দিয়ে চটজলদি পকেট থেকে মোবাইল বের করে একটি ছবি তুলে নিলেন। তারপর নির্বিকার মুখে উপরের ঘরে উঠে গেলেন।

সন্দেহ জেগে উঠলেও হটকারিতা করলেন না। কারণ সাদিকের বয়ান আর এই সেন্ডেলের ছাপ, দুটো মিলিয়ে দু’জন ভিন্ন মানুষের ইঙ্গিত দিচ্ছে। আগে এই দু’জনকে ভালোভাবে যাচাই করতে হবে। তারপরই সিদ্ধান্ত নেবেন, আসল কালপ্রিট টা আসলে কে। শস্যের ভেতর যদি ভূত থেকেই থাকে, তবে শুরু থেকেই একে একে সব হিসাব কষবেন তিনি। তারপর এমনভাবে ধরবেন, যাতে পালাবার কোনো ফাঁকফোকর না থাকে।

এরপর কেটে গেল আরও দুটো দিন।
সেদিন সকালে পিয়াস দোকানে যাওয়ার সময় রুদ্র দাও তার সঙ্গে বেরোলেন। তারপর কিছুক্ষণ পিয়াসের সঙ্গে দোকানে বসে বসে কথা বলার একপর্যায়ে রুদ্র দা বললেন,’ পিয়াস, আমি আগামীকাল রাতের বাসে চলে যাব।’

কথাটা শুনে পিয়াস বিমর্ষ চোখে তাকিয়ে বললো,’রুদ্র দা, তাহলে রিম্পার…

পুরো কথা শেষ করতে না দিয়েই রুদ্র দা বললেন,’কী ভাবছো, রিম্পার হত্যা রহস্যের সমাধান না করেই চলে যাচ্ছি? চিন্তা কোরো না। এসেছি যখন তখন সমাধান করেই যাব। আচ্ছা, আগামীকাল দুপুরের পর সবাইকে একটু বাড়িতে উপস্থিত থাকতে বলো তো।’

অবাক চোখে প্রশ্ন পিয়াস করলো,’কেন রুদ্র দা?’

‘সেটা না হয় কালকেই জানবে। আচ্ছা এখন উঠি আমি। একটু কাজ বাকি আছে।’

কথা শেষ করে দোকান থেকে বেরিয়ে গেলেন রুদ্র দা। তারপর সারাদিন এদিক-সেদিক ঘোরাঘুরির পর সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে কুসুম গরম পানিতে গা ধুয়ে ভরপেট খাওয়ার পর লম্বা একটা ঘুম দিলেন।

রুদ্র দা এমনই যখন কোনো রহস্যের পেছনে নামেন,তখন তার সমাধান না হওয়া পর্যন্ত ঘুমও যেন তাঁর শত্রু হয়ে দাঁড়ায়।

পরদিন দ্বিপ্রহরে আজিজুল হকের বাড়িতে, রুদ্র দার কথামতো সবাই একে একে উপস্থিত হলো। রিম্পার হবু শ্বশুরবাড়ি থেকে কাওসার আর তার বাবাও এসে উপস্থিত হলো পিয়াসদের বাড়িতে।
অসময়ে তাদেরকে দেখে আজিজুল হক কিছুটা বিচলিত হলেও মুখে প্রকাশ করলেন না। চুপচাপ চেয়ারে বসে রইলেন।

সব শেষে রুদ্র দা চিলেকোঠার ঘর থেকে নিচে নেমে এলেন এবার। চারপাশে নিস্তব্ধতা যেন জেঁকে বসেছে। সবাই নিশ্বাস আটকে অপেক্ষা করছে,কেন ডাকা হয়েছে, কী বলতে চায় শহুরে এই লোকটা তা শোনার জন্য।

নিচে নামতেই কৌতূহলে সবাই নড়েচড়ে উঠলো।
রুদ্র দা একবার সবার দিকে তাকিয়ে গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন,’ সবাই এসে গেছেন তাহলে? আচ্ছা এবার শুরু করা যাক।’

এক এক করে সবার চোখে চোখ রেখে প্রতিক্রিয়া বুঝে নিলেন রুদ্র দা। তারপর মুচকি হেসে সারার সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই সারা অস্বস্তিতে সরে গিয়ে পিয়াসের পাশে দাঁড়ালো।

পিয়াস উৎকণ্ঠিত স্বরে বললো,’রুদ্র দা, আপনি ঠিক কী করতে চাইছেন একটু বলবেন?’

কোনো উত্তর না দিয়ে রুদ্র দা এবার এগিয়ে গেলেন নূর জাহান বেগমের সামনে। তারপর কোনরকম ভনিতা ছাড়াই দৃঢ় কণ্ঠে সোজাসুজি বললেন,’আন্টি, আপনি কি জানেন আপনার মেয়ে রিম্পা আত্মহত্যা করেনি। তাকে খুন করা হয়েছে।’

কথাটা শুনে নূর জাহান বেগমের চোখ বিস্ফারিত হয়ে গেল। কাঁপা গলায় বললেন,’ কী বলো বাবা! আমার মেয়েকে খুন করা হয়েছে? কে করেছে? কেন করেছে?’

কথাগুলো কোনরকমে বলে তিনি বিলাপ করে উঠলেন।

রুদ্র দা এবার সবার উদ্দেশে বললেন,’আপনাদের আজ এখানে ডেকেছি এই একটাই কারণে। আমি শহর থেকে এতদূর শুধু রিম্পার মৃত্যুর খবর শুনে আসিনি। পিয়াসের মুখে রিম্পার মৃত্যুর কিছু অস্বাভাবিক কথা শুনে এসেছি।
যে মেয়েটার আর ক’টা দিন পর তার পছন্দের মানুষের সঙ্গে বিয়ে হওয়ার কথা ছিল, সে কেন আত্মহত্যা করবে?এই প্রশ্নটাই আমাকে এখানে টেনে এনেছে।
একটু থেমে তিনি আবার বললেন,-এই কয়দিনে নিজেকে আড়াল রেখে সবার সঙ্গে মিশে, সবকিছু পর্যবেক্ষণ করে শেষমেশ সেই উত্তরটা পেয়েছি। আর সেই জন্য আপনাদের সবাইকে আজকে এখানে ডাকা। আমার মনে হয় সবারই সত্যিটা জানা উচিৎ,নয়তো সবার মনেই একটা ভুল ধারণা থেকে যাবে যে রিম্পা সেদিন কলঙ্ক ঢাকতে আত্মহত্যা করেছিলো। আসলে রিম্পার মৃত্যুটা কোনো আত্মহত্যা নয়,সে খুন হয়েছে। তাকে খুন করা হয়েছে।’

রুদ্র দার মুখে কথা গুলো একমূহুর্তের জন্য সবার মাঝে নিস্তব্ধতা নেমে এলো।

রুদ্র দা এবার খানিকটা গম্ভীর স্বরে বলে উঠলেন,’আর যে এই খুন করেছে… সে এই মুহূর্তে আমাদের মাঝেই উপস্থিত আছে।
চলবে…

#আশিক_মাহমুদ