Home "ধারাবাহিক গল্প মুখোশ মুখোশ পর্ব-১০ এবং শেষ পর্ব

মুখোশ পর্ব-১০ এবং শেষ পর্ব

0
542

#মুখোশ || ১০ পর্ব (সমাপ্ত)

রুদ্র দার কথা শুনে সবাই বাকরুদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে একে অপরের মুখের দিকে তাকিয়ে মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগলো। এতক্ষণ ধরে নিস্তব্ধ থাকা আজিজুল হকের বাড়ির রোয়াকটা হঠাৎ করেই ফিসফাস আর গুঞ্জনে ভরে উঠলো আবার।

কিছুক্ষণ নীরব থেকে রুদ্র দা আবার সবার উদ্দ্যেশে বললেন,‘এত উতলা হওয়ার কিছু নেই। ডেকেছি যখন, তখন নিশ্চয় সব জানতে পারবেন। তবে তার আগে কয়েকটা কথা পরিষ্কার করে নেওয়া দরকার।’

কথাটা বলে তিনি ঘুরে দাঁড়িয়ে কাওসারের বাবার দিকে তাকালেন। তারপর কয়েক কদম এগিয়ে গিয়ে শান্ত গলায় প্রশ্ন করলেন,‘আচ্ছা, রিম্পার বাবা,মানে আজিজুল হককে আপনি কতদিন ধরে চেনেন?’

ভদ্রলোক একবার চারপাশে তাকিয়ে নিয়ে উত্তর দিলেন,
‘অনেকদিন ধরেই।’

পিয়াস চমকে উঠল। কণ্ঠে চাপা ক্ষোভ নিয়ে বলল,
‘মানে! বাবা, তুমি তো বলেছিলে রিম্পার বিয়েটা দেখাশোনা করে ঠিক করছো। তুমি তো কখনো বলোনি তোমার আর আংকেলের আগে থেকেই পরিচয় ছিল। এমনকি কাওসার যে রিম্পাকে পছন্দ করত,তাহলে এখন এসব কথা কেন উঠছে? বাড়ির বাইরে থাকি বলে কি কোনকিছুই জানানোর প্রয়োজন মনে করো নি আমাকে।’

রুদ্র দা হাত তুলে পিয়াসকে থামালেন।
‘পিয়াস, একটু চুপ করবে? না হলে আমার কথাগুলো বলা কঠিন হয়ে যাবে। তোমার অগোচরে এই বাড়িতে অনেক কিছুই ঘটেছে, যেগুলোর তুমি কিছুই জানো না। আজ শুরু করেছি যখন, সবই বলবো। একটু ধৈর্য ধরো।’

এরপর আবার কাওসারের বাবার দিকে তাকিয়ে বললেন,
‘এবার বলুন, কীভাবে চেনেন?’

ভদ্রলোক খানিক ইতস্তত করে বললেন,
‘আমার কাছ থেকে টাকা ধার নিয়েছিলেন। সেই সূত্রেই পরিচয়।’
‘কত টাকা?’
‘তিন লাখ।’
‘কী জন্য নিয়েছিলেন, জানেন?’
‘নেওয়ার সময় বলেছিলেন দোকানে মাল তুলবেন।’

রুদ্র দা মাথা নাড়লেন।
‘বুঝলাম। এবার আপনার ছেলের সঙ্গে রিম্পার বিয়ের ব্যাপারটা একটু খুলে বলুন।’

ভদ্রলোক আজিজুল হকের দিকে একবার তাকিয়ে বলা শুরু করলেন,‘সত্যি বলতে আমার তাদের সঙ্গে আত্মীয়তা করার কোনো ইচ্ছাই ছিল না। শুধু ছেলেটা পাগলামি করছিলো দেখেই রাজি হয়েছিলাম। তা না হলে এমন জোচ্চর আর কথার খেলাপ করা মানুষের সঙ্গে আত্মীয়তা কে করে! দুইবছরের কথা বলে টাকা গুলো নিয়ে চার বছর হতে চললো,এখন পর্যন্ত এক টাকাও শোধ দিতে পারেনি।

‘ওহ! তারপর?’

‘আসলে উনি যে আমার ছেলের সঙ্গে মেয়ের বিয়েটা দিতে চাইছিলেন তারও একটা কারণ ছিলো, ভেবেছিলেন আত্মীয়তা করলে হয়তো ঋণের টাকাটা আমি আর নিবো না। একদিন তো ফোন করে সেকথাও বলেছিলো। কতবড় জোচ্চর। আমিও সাফসাফ জানিয়ে দিয়েছিলাম আমি ঋণের টাকার সাথে ছেলের বিয়েকে জড়াতে পারবো না। এটা শুনেই হয়তো এসব নাটক…

ভদ্রলোককে পুরো কথা শেষ করতে না দিয়ে আজিজুল হক ক্ষিপ্ত স্বরে চেঁচিয়ে উঠলেন,
‘একদম বাজে কথা বলবেন না! আপনার কাছ থেকে টাকা নিয়েছিলাম ঠিকই, কিন্তু সেই টাকা শোধ করতে নিজের মেয়েকে ব্যবহার করবো এতটা নিচু আমি নই। এত এত যে বলছেন আপনিই বা এত ভালো কীসের শুনি। অসহায়ের সুযোগ নিয়ে মানুষকে টাকা দিয়ে চক্র হারে যে সুদের নামে মানুষের রক্ত চুষে খান সেটা কি ভালো? আমার মেয়েও জোর না ধরলে ওমন সুদখোরের সঙ্গে আত্মীয়তা করতাম না।’

পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠছে দেখে রুদ্র দা দৃঢ় কণ্ঠে বললেন,‘আহা! কী শুরু করলেন আপনারা! বিবাদ মেটাতে গিয়ে দেখি নতুন করে বিবাদ বাধাচ্ছেন। আপনারা শান্ত হন তো।’

রুদ্র দা এবার ঘুরে দাঁড়িয়ে সারার দিকে এগিয়ে গেলো। তারপর বললো,‘সারা, তোমার মোবাইলটা একটু দেবে?’

সারা অপ্রস্তুত হয়ে বলল,
‘কেন? আমার মোবাইল দিয়ে কী করবেন?’
‘এমনিই একটু দেখবো। দেবে?’

উপস্থিত সবার চোখ তখন সারার দিকে। সারা না চাইতেও কাঁপা কাঁপা হাতে মোবাইলটা এগিয়ে দিল রুদ্র দার দিকে।

মোবাইল হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ নীরবে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থেকে রুদ্র দা বললেন,
‘এখানে “জান” নামে সেভ করা নাম্বারটা কার?’

সারা থতমত খেয়ে উত্তর দিল,
‘কার আবার? পিয়াসের।’
‘তাহলে তো কল দিলে কোনো সমস্যা হওয়ার কথা নয়। একটা কল দিই। ওয়েট…’

এবার কন্ট্যাক্ট লিস্টে থাকা নাম্বারটাতে কল দিলেন রুদ্র দা। আর ঠিক তখনই ঘটল অদ্ভুত ঘটনাটা।
সারার মোবাইলে কল যাওয়ার শব্দ শোনা গেলেও পিয়াসের ফোনে কোনো রিং বাজলো না।

রুদ্র দা গলা বাড়িয়ে বললেন,’পিয়াস দ্যাখো তো তোমার মোবাইলটা বাজছে কি না?’

পিয়াস বিস্ফারিত চোখে ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে রুদ্র দার হাত থেকে ফোনটা নিয়ে নাম্বারটা চেক করতেই ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল সে। নাম্বারটা তার পরিচিত। অথচ এই নাম্বার সারা ‘জান’ লিখে কেন সেভ করেছে তার ফোনে? মাথাটা চক্কর দিয়ে উঠলো পিয়াসের। কী বলবে কিছু বুঝে উঠতে না পেরে অবচেতনে একটা নাম উচ্চারণ করে ধপ করে মেঝেতে বসে পড়লো।
ছেলেকে এভাবে মুষড়ে যেতে দেখে নূর জাহান বেগম দৌড়ে এসে তাকে ধরে বললেন,’কি হয়েছে খোকা? বল আমাকে। এমন করছিস কেন বাবা?’

কিন্তু পিয়াস আর কোনো কথা বলতে পারল না।
পাথর দৃষ্টিতে ফ্যালফ্যাল করে সারার দিকে তাকিয়ে রইল শুধু।

একটা সময় রিং হতে হতে কলটা কেটে গেলে রুদ্র দা থমথমে চোখে সারার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললো,’এখন তোমার ফোনটা নিতে পারো। আচ্ছা এখন কি নিজের মুখেই সবটা বলবা নাকি আমাকেই বলতে হবে?

তারপর পিয়াসকে উদ্দ্যেশ্য করে বললো,’শোনো পিয়াস তোমাদের বাড়িতে হঠাৎ করে ছায়ামূর্তির আবির্ভাব, গয়না চুরি,দেওয়ালে আড়ি পাতা,আর সবশেষে রিম্পার খুন সবকিছুর পিছনে যে মানুষটা ছিলো সে কে জানো?

‘কে?’

‘নাম্বারটা দেখেও কিছু আন্দাজ করতে পারো নি?’

সবাই হকচকিয়ে উঠলো। বিস্ময় জড়ানো স্বরে পিয়াস বললো,’সবুজ!তারমানে এসব কিছু সবুজ করেছে! কিন্তু কেন? এসব করে তার কি লাভ?’

লাভ লস তো এবার সারা বলবে।
রুদ্র দা এবার সারাকে উদ্দেশ্য করে বললো,’ কেন করলে এমনটা?’

সারা মাথা নিচু করে রইলো কিছুক্ষণ। তারপর কাঁদো কাঁদো স্বরে বলে উঠলো,’আমি এসব করিনি, রুদ্র দা।’

‘জানি তো, তুমি করো নি। তোমার পক্ষে এসব করা সম্ভবও নয়। কিন্তু তুমি করিয়েছো,সবুজকে দিয়ে।

রুদ্র দা এক মুহূর্ত থেমে আবার প্রশ্ন করলেন,’কিন্তু কেন? রিম্পাকে খুন করিয়ে তোমার কী লাভ হলো?’

কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর সারার চোখমুখ শক্ত হয়ে এলো এবার, করুণা প্রত্যাশি চোখজোড়া দপ করে জ্বলে উঠলো গোপন কোনো প্রতিহিংসার আগুনে। কণ্ঠে দৃঢ়তা নিয়ে বললো,’ভয়… আর হিংসে।’

ঘরের বাতাসটা হঠাৎ দমে গেলো, দমবন্ধ করে সবাই সারার দিকে তাকিয়ে রইলো হতবিহ্বলের মত। সারার মুখে এমন কথা শোনাটা হয়তো উপস্থিত মানুষগুলোর কেউ আশা করেনি।

রুদ্র দা প্রশ্ন করলেন,’কীসের ভয়? কীসের হিংসে?’

সারা এবার বলতে লাগলো,’এই বাড়িতে বিয়ে হয়ে এসেছি চারবছর হতে চললো। এই চারবছরে এই বাড়ি আমাকে কি দিয়েছে? শুধু প্রয়োজনে ব্যবহার করেছে সবাই। না পেয়েছি স্বামীর ভালোবাসা,না পেয়েছি শ্বশুরবাড়ির কারও সহানুভূতি। সবসময় সবাই দূরে ঠেলে দিয়েছে।’

রুদ্র দা চোখ সরু করে বললেন,’আর সেই একাকিত্ব ঘোচাতেই সবুজের সঙ্গে সম্পর্কে জড়ালে, তাই তো?’

সারা ভেজা চোখে ধীর কণ্ঠে বলল,’একজন মেয়ে সবচেয়ে অসহায় বোধ করে জানেন কখন? যখন তার দুঃসময়ে তার নিজের স্বামীও পাশে থাকে না। পিয়াস কোনোদিনই আমার পাশে ছিল না। এসেছে, নিজের প্রয়োজন মিটিয়েছে, তারপর আবার চলে গেছে। বউয়ের মর্যাদা কোনোদিনই পাইনি তার কাছ থেকে। আমার ভালো লাগা, খারাপ লাগা কোনোটাতেই তার কিছু এসে যেত না।
হ্যাঁ, আমি সবুজকে ভালোবাসি। কারণ এত মানুষের ভিড়ে একমাত্র সেই-ই আমাকে বুঝেছিল।

রুদ্র দা শান্ত কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে বললেন,’ভালোবাসা কোনো অপরাধ নয়। কিন্তু ভালোবাসার নামে যখন অপরাধ করা হয়, তখন তা আর ভালোবাসা থাকে না,প্রতিহিংসায় পরিণত হয়। সেদিন যখন পিয়াস তার জমানো সব টাকা মায়ের হাতে তুলে দিয়েছিল রিম্পার বিয়েতে খরচা করার জন্য, সেদিন সবাই খুশি হলেও তুমি খুশি হওনি। কারণ যেটা তোমার হওয়ার কথা ছিল, সেটা অন্য কারও হয়ে যাচ্ছিল আর সেটাই তুমি মেনে নিতে পারোনি। সেই না-পাওয়ার ক্ষোভ থেকেই এতকিছু করলে। ঠিক বলছি তো?

সারা কাঁপা গলায় বলল,’হওয়াটা কি অস্বাভাবিক, রুদ্র দা? বিয়ের পর থেকে আজ অবধি পিয়াস নিজের হাতে একটা সুতোও এনে বলেনি, ‘এটা তোমার জন্য।’ বাবা-মা নেই দেখে এক কাপড়ে এই বাড়িতে এনে তুলেছিল আমাকে। সোনার গয়না তো দূরের কথা, আমার নিজের যা ছিল তাও খুলে নিয়েছিলো। কিছু বললেই বলতো সবকিছু নাকি আমাদের ভবিষ্যতের জন্য করছে,জমাচ্ছে। অথচ সেই কষ্টের সব টাকা রিম্পার বিয়েতে দিয়ে দিল, আর আমি বউ হয়েও কিছু বলবো না?

‘সেটা অন্যভাবে বোঝাতে পারতে পিয়াসকে।’

সারা তিক্ত হেসে বলল,’সে আমার কথা শুনলে তো! বিয়েটাই তো করেছিল নিজের অমতে, বাবার চাপে পড়ে। নয়তো সে কোনোদিনই আমাকে চায়নি। বউয়ের মর্যাদা দেওয়া তো দূরের কথা।’

রুদ্র দা কণ্ঠ এবার আরও কঠিন করে বললেন,’তাই তুমি আর সবুজ দুজনে মিলে ঠিক করলে, এসব ছেড়ে অনেক দূরে চলে যাবে। আর যাওয়ার সময় গয়নাগুলোও নিয়ে যাবে। তাই তো?’

সারা কোনো উত্তর না দিয়ে মাথা নামিয়ে নিল।
রুদ্র দা আবার প্রশ্ন করলেন,’সবুজকে দিয়ে তো গয়নাগুলো সরিয়েই ফেলেছিলে তাহলে আবার কেন রিম্পাকে খুন করতে গেলে?’

‘আমি রিম্পাকে খুন করতে চাইনি। কিন্তু রিম্পা সেদিন রাতে সবুজকে আমার সাথে কথা বলতে দেখে নিয়েছিলো।
রিম্পাকে বুঝিয়ে সুজিয়ে সে রাতে মানিয়ে নিলেও পরদিন রাতে যখন গয়না হারানোর কথা সবার সামনে এলো, আর সব দোষ রিম্পার ঘাড়ে চাপলো, কাওসারের সাথে রিম্পার বিয়ে ভেঙে যাওয়ার কথা উঠলো,তখন রিম্পা এসে বেঁকে বসলো। আমি যদি নিজের মুখে সবকিছু স্বীকার না করি তাহলে সে সবাইকে সত্যিটা বলে দিবে।’

‘আর সেই ভয় থেকে বাঁচতেই সবুজকে দিয়ে তাকে সরিয়ে দিলে!’

‘আমি কিছু করিনি।’

রুদ্র দা জোর দিয়ে বললেন,’করেছো তুমি। সেদিন রাতে যখন সবাই গল্পগুজব শেষে নিজ নিজ ঘরে চলে গেলো শোবার জন্য তখন তুমি বুদ্ধি করে রিম্পার দুধের গ্লাসে অনেকগুলো ঘুমের ঔষধ মিশিয়ে দিলে। আর তারপর সদর দরজা খুলে রাখলে যাতে সবুজ মধ্যরাতে এই বাড়িতে সহজে ঢুকে তোমাদের পথের কাটা টাকে সরিয়ে ফেলতে পারে।’

সবার সাথে সাথে এবার সারাও নিশ্চুপ হয়ে গেলো কোনো উত্তর না দিয়ে মাথা নিচু করে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলো। রুদ্র দা আবার শুরু করলেন,’আমার প্রথম থেকেই সন্দেহ হয়েছিলো খুনি আমার আশপাশেরই কেউ একজন।
শুধু মুখোশ টা পরে নিজেকে আত্মগোপন করে রেখেছে।
কিন্তু মুখোশটা যে তোমার মুখেই ছিলো সেটা ভাবিনি। গতকাল রাতে বাড়ি ফিরে যখন মেঝেতে আংকেলের সেন্ডেল জোড়া উল্টো অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেছিলাম তখন রিম্পার ঘরের পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা সেদিনের সেই ছায়ামূর্তির পায়ের ছাপের সাথে আংকেলের সেন্ডেলের দাগ হুবহু দেখে আংকেলের উপর সন্দেহ হয়েছিলো আমার। কিন্তু সাদিকের মুখের বয়ান শুনে আংকেলের উপর পুরোপুরি সন্দেহ করতে পারিনি। কারণ আংকেল মুরুব্বি মানুষ অথচ সাদিক বলেছিলো লোকটার গায়ে নাকি অসুরের শক্তি ছিলো আবার ছয়টা আঙুল যেটা আংকেলের সাথে একবারেই যায় না। কাজে আবার খুঁজতে লাগলাম আসল খুনিকে। এবং অবশেষে খুনি নিজেই এসে ধরা দিলো আমার হাতে।

হঠাৎ মনে পড়ে গেলো চায়ের দোকানে দেখা হওয়া পিয়াসের বন্ধু সবুজের কথা। ত্রিশ বছরের টগবগে যুবক,কাজেই সে যথেষ্ট শক্তপোক্ত, আবার তার ডান হাতেে থাকা ছয়টা আঙুল!

সন্দেহ জাগলো সবুজের উপরে। পরে সবুজের উপর নজরদারি করতে গিয়ে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এলো।
সবুজের নাকি এই বাড়িতে অবাধ আসা যাওয়া ছিলো। যে কথাটা পিয়াস বা এ বাড়ির কেউই বলেনি আমাকে। সবুজের আশা যাওয়া আছে শুনে ভেবেছিলাম হয়তো রিম্পার সাথে সবুজের কোনো সম্পর্ক ছিলো আর রিম্পাকে হারানোর ক্ষোভ থেকেই এইসব করেছে সে। কিন্তু কাওসারের সাথে কথা বলার পর জানলাম তারা দুজনে একে অপরকে পছন্দ করেই বিয়েটা করতে যাচ্ছিলো তখন সেই ধারণাও পাল্টে গেলো।

রিম্পা আর কাওসার যেহেতু একে অপরকে পছন্দ করতো,তাহলে সবুজ নিশ্চয় রিম্পার জন্য এ বাড়িতে আসতো না৷ তাহলে কার জন্য আসতো? তখনি সারার উপরে সন্দেহটা গিয়ে পড়লো। আর পরশু রাতে প্রাচীরের ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা সবুজের সাথে লোকচক্ষুর আঁড়ালে একজনকে দেখা করতে দেখে আর বুঝতে বাকি রইলো না। আসল মুখোশধারী টা ঠিক কে।

আর তাছাড়া চিলেকোঠার ঘরে থাকা টিনের বাক্স খোলা সেখান থেকে গয়না সরানো, সবটা মিলিয়ে আর বুঝতে বাকি রইলো না এ বাড়ি থেকে আসল কলকাঠি নাড়ানোর মানুষটা আসলে কে। কারণ এ বাড়িতে একমাত্র সারার কাছেই চিলেকোঠার ঘরের এক্সট্রা চাবিটা ছিলো।

সেদিন গয়নাগুলো চুরি করার পর সে রাতেই গয়না গুলো সাবধানে চিলেকোঠার ঘরের ওই বাক্সের ভিতরে রেখে এসেছিলে তুমি। ভেবেছিলে সবকিছু মিটে গেলে সেগুলো নিয়ে সবুজের হাত ধরে পালাবে। কিন্তু আমার আগমনে তোমার সব প্লান ভেস্তে গেলো। ঠিক করলে টিনের বাক্সে লুকিয়ে রাখা গয়নাগুলো সরিয়ে অন্যখানে রাখবে আর তাই আমার অনুপস্থিতে ওই ঘরে প্রবেশ করে গয়নাগুলো সরিয়ে নিলে,কিন্তু একটা ভুলে করে ফেললে,এক কানের দুল ভুল করে ফেলে আসলে। যদি গয়নাগুলো সরানোর পর পাতিলগুলো আবার আগের মত করে রেখে আসতে তাহলে হয়তো তোমাকে ধরতে আরও কিছুটা সময় লাগতো কিন্তু কথায় আছে না অপরাধী যতই ধুরন্ধর হোক ভুল সে একটা করবেই।

আর থাকে চিলেকোঠার ঘরে পাওয়া আমার নামে বেনামি চিঠিটা, চিঠিটাও তুমিই সেদিন আমার ঘরে রেখে এসেছিলে আমাকে ভয় দেখানোর জন্য। তাই না?’
তবে চিঠির লেখাটা যে তোমার বা সবুজ দুজনার ভিতরে কারোরি নয়। সেটা তোমাদের দুজনেরই হ্যান্ড রাইটিং দেখেই বুঝেছি। এখন প্রশ্ন হলো, তাহলে এই তৃতীয় ব্যক্তিটি কে?’

আজিজুল হক এতক্ষণ চুপচাপ বসে ছিলেন,এবার মুখ খুললেন। বললেন,’ সারা নয়, তোমার ঘরে চিঠিটা আমি রেখে এসেছিলাম। ‘

উপস্থিত সবার আরও একবার বিস্ময়ে চমকে উঠলেন আজিজুল হকের কথা শুনে।
রুদ্র দা সেদিকে এগিয়ে যেতেই আজিজুল হক বলতে লাগলেন,’কারণ আমি চাই নি এই চরম সত্যটা সবার সামনে এসে আবার নতুন করে সবকিছু তছনছ হোক। একটা মেয়েকে হারানোর বেদনাটায় এখনো কাটিয়ে উঠতে পারিনি এসব জানাজানি হলে সারাকেও হারাতে হতো, আর তারপর পিয়াস। একে একে সব হারিয়ে যেতো আমার। চোখের সামনে এভাবে নিজ হাতে গড়া সংসারটাকে ধ্বংস হতে দিতে চাইনি দেখেই সবটা জেনেও মুখ বুজে ছিলাম। আমি জানতাম সারা ভুল করেছে কিন্তু তার এই ভুল পথটা বেছে নেওয়ার জন্য তো আমার ছেলেও সমান দোষী ছিলো।

তুমি যে এই বাড়িতে এমনি এমনি আসোনি তা তোমার প্রশ্ন করার ধরণ দেখেই বুঝেছিলাম। তুমি যেভাবে এক এক করে সামনে এগোচ্ছিলে ভয় হচ্ছিলো যদি আমার ভয়টা সবার সামনে চলে আসে। তাই ঘাবড়ে গিয়ে চিঠিটা লিখেছিলাম।

‘যাক তাহলে স্বীকার করলেন। এই প্রথম কোনো শ্বশুরকে দেখলাম যে নিজের ছেলের বউকে বাঁচাতে গিয়ে নিজের মেয়ের খুনকে ঢাকা দিতে। কিন্তু কেন? কারণ কি শুধু নিজের একমাত্র ছেলের বউকে বাঁচানোর জন্য নাকি অন্যকিছু?’

‘আমি চাইনি এসব নিয়ে আর লোক সমাজে আমাকে নিয়ে হাসি ঠাট্টা হোক। এই বাড়িতে আমিই সারাকে নিয়ে এসেছিলাম পিয়াসের বউ করে। যদি এসব জানাজানি হতো তাহলে কি আমার মানসম্মান থাকতো আর?’

‘একটা মিথ্যাকে বাঁচাতে গিয়ে কতবড় অপরাধ ঢেকেছেন জানেন আপনি? আর কিছু বলার নেই আমার।

আর সারা তোমাকেই বা কি বলবো, মানছি পিয়াসের দোষ ছিলো কিন্তু তুমি যেগুলো করেছো সেগুলো কি আদৌও সঠিক? অবৈধ প্রেম কোনদিনও সুখ বয়ে আনেনা,তুমি একটু সুখের আশায় একটা গোটা পরিবারকে শেষ করে দিয়েছো,একটা প্রাণ নিয়েছো। বেশ তো নিজের বুদ্ধিমত্তাকে খাটিয়ে সবকিছু মিটিয়ে নিয়েছিলে,তাহলে আবার কেন পুরনো ঘা খুঁচিয়ে ব্যথা বাড়াতে গেলে? কথায় আছে না অপরাধী যতই চালাক আর বুদ্ধিমান হোক ভুল সে একটা না একটা করেই। আর তুমিও সেই ভুলটাই করলে,নিজেকে বেশিরকম চালাক ভাবতে গিয়ে পিয়াসকে আগ বাড়িয়ে রিম্পার মৃত্যু নিয়ে কথাটা তুলে।

ভেবেছিলে, রিম্পার লাশটায় যেহেতু কবরে,শ্বশুর নিজের হাতে তখন আর কে কি করবে,পিয়াসকে একটু নাড়িয়ে নিই। আর সেই নাড়ানোটাই তোমার কাল হয়ে দাঁড়ালো।

সারা শেষবারের মত একবার মুখ তুললো,তারপর সন্দিহানের দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো,’আপনি এতকিছু কীভাবে জানলেন?’

রুদ্র দা মৃদু হাসলেন,তারপর বললেন,’ তোমার প্রেমিকের জবানবন্দি থেকেই জেনেছি। তুমি কি ভেবেছিলে সব মনগড়া বলে যাচ্ছিলাম এতক্ষণ? না। তোমার সবুজকে এতক্ষণে পুলিশ খাতির যত্ন করে ঘুম পাড়িয়ে রেখেছে। সমস্যা নেই তোমাকেও তার কাছে নিয়ে যাবে একটু পর।তারপর তোমাদের নতুন সংসারটা না হয় দুজন মিলে চার দেওয়ালের মাঝেই শুরু কোরো।

কথাগুলো বলে রুদ্র দা এবার পিয়াসের দিকে ঘুরে দাঁড়ালেন। তারপর বললেন,’পিয়াস,কিছুক্ষণের ভিতরেই পুলিশ আসবে। আমার কাজ ছিলো সত্যটা খুঁজে বার করা,করেছি। এখন বাকিটা তাদের হাতে।’

এ পর্যন্ত বলে রুদ্র দা থামলেন।
এক মুহূর্তের জন্য পুরো বাড়িজুড়ে নেমে এলো ভয়ংকর এক নিস্তব্ধতা। কারও মুখে কোনো কথা নেই, চোখে শুধু আতঙ্ক আর অবিশ্বাস।

নূর জাহান বেগম টলতে টলতে সারার কাছে এগিয়ে গেলেন। চোখেমুখে জমে থাকা ক্ষোভ আর বেদনার বিস্ফোরণ ঘটিয়ে আচমকাই সারার গালে একটা চড় বসিয়ে দিয়ে কাঁপা গলায় চিৎকার করে উঠলেন,‘আমি তো তোকে কোনোদিন কিচ্ছুটি বলিনি! সংসারের সব দায়িত্ব তুলে দিয়েছিলাম তোর হাতে। আর তুই কী করলি মুখপুড়ী! রিম্পার গলায় ফাঁস দিতে তোর একটুকুও বুক কাঁপল না? কীভাবে পারলি এতটা পাষণ্ড হতে?’

কথা বলতে বলতে গলা ধরে এলো তাঁর। আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাঙা কণ্ঠে বললেন,‘হে খোদা,আর কি করলে তোমার শান্তি হবে? এসব দেখানোর আগে আমাকেই তুলে নিতে পারতে…’

কথা শেষ না করেই তিনি আবার বিলাপে ভেঙে পড়লেন।

পিয়াস ঠাঁই দাঁড়িয়ে রইল বোবার মতো,কি করবে, কী বলবে, কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না আর। এদিকে আজিজুল হকও অশ্রুসিক্ত চোখে চেয়ারে বসে রইলেন নিথর হয়ে,নিজের কৃতকর্মের ভারে তিনিও একেবারে ভেঙে পড়লেন।

রুদ্র দা পিয়াসের দিকে এগিয়ে গিয়ে তার কাঁধে হাত রাখলেন। তারপর বললেন,‘কাজ আর সম্পর্ক এই দুটোর ব্যালেন্স করতে না পারলে কোনো সম্পর্কই টেকে না, বুঝলে? কথায় আছে না, ‘সময়ের কাজ সময়েই করা উচিত। পরে করলে সেই কাজের আর কোনো মূল্য থাকে না।’

একটু থেমে আবার বললেন,
‘বিশ্বাস করো, এভাবে তোমাদের কষ্ট দিতে চাইনি। কিন্তু কী করবো বলো? সত্যিটাকে যে সামনে আনতেই হতো।’

ঠিক তখনই বাড়ির ভেতর পুলিশের উপস্থিতিতে পরিবেশটা আরও ভারী হয়ে উঠল। ওসি সাহেব রুদ্র দার বুদ্ধিদীপ্ত অনুসন্ধানের প্রশংসা করে আরও একবার ধন্যবাদ জানালেন। তারপর সারা আর আজিজুল হককে সঙ্গে নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলেন।

সারা আর আজিজুল হককে নিয়ে যাওয়ার সময় পিয়াস কিংবা নূর জাহান বেগম কেউই আর একটি কথাও বলল না। দুজনেই যেন পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইল, নিঃশব্দে ধ্বংস হতে থাকা জীবনের দিকে তাকিয়ে।

সাদিক ঠিকই বলেছিলো এই বাড়িতে আবারও ঝড় উঠবে।
কিন্তু সেই ঝড় যে পিয়াসের পুরো জীবনটাই লণ্ডভণ্ড করে দেবে, তা কে জানতো?

সবকিছু মিটিয়ে সেদিন রাতের বাসেই শহরে ফেরার সিদ্ধান্ত নিলেন রুদ্র দা। বিদায়ের সময় নূর জাহান বেগম আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না। এই বয়সে একের পর এক আঘাতে তিনি যেন একেবারে কোনঠাসা হয়ে গেছেন। পিয়াসের অবস্থাটাও চোখে দেখার মত নয়। এত অল্প বয়সে এত বড় ধাক্কাটা সামলে উঠতেও অনেক সময় লেগে যাবে তার।
কিন্তু কী আর করার সত্য যে সবসময় সুখের হয় না।

নূর জাহান বেগম আর পিয়াসের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে রুদ্র দা বেরিয়ে পড়লেন শহরের উদ্দেশ্যে। হয়তো আবারও কোনো একদিন হাজির হবেন কোনো অমীমাংসিত হত্যা রহস্য কিংবা জটিল কোনো গোলকধাঁধার গিঁট খুলতে।
সমাপ্ত……