#প্রণয়ের_অন্তরমহল
#তাহরিশমিতা_মুনতাহা
#পর্বঃ৯
⚠️ অনুমতি ব্যতীত কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ 🚫
নির্ণয়ের হঠাৎ আক্রমণের কারণ খুঁজে পেলো না দিয়া। লোকটা বড়ই অদ্ভুত কখন কী করে বসে সে হয়তো নিজেও জানে না। নির্ণয় এতো জোরে গলাটা চেপে ধরেছে যে দিয়ার দম বন্ধ হয়ে আসার উপক্রম হয়েছে। তবুও নির্ণয়ের ছাড়ার নাম নেই। দিয়া কোনো রকমে বলে উঠলো-
—“গলাটা যখন টিপেই ধরেছেন, দয়া করে আর ছাড়িয়েন নাহ। একে বারে মেরেই ফেলেন।
দিয়ার এহেন কথা শুনে ফট করে গলাটা ছেড়ে দিলো নির্ণয়। কিড়মিড়িয়ে বললো-
—“তোকে এতো সহজে মারি কী করে বল? তোকে তো আমি তিলে তিলে একটু একটু করে মারবো, তবেই না আসবে আসল মজা।
দিয়া গলা ধরে মেঝেতে বসে পড়েছে, বড় বড় করে শ্বাস নিচ্ছে। নির্ণয়ের কথা শুনে চোখ তুলে তাকালো নির্ণয়ের মুখের দিকে। ঠোঁট বাঁকিয়ে হেঁসে বলে উঠলো-
—“তাহলে তো খুব বেশী দেরী হয়ে যাবে মিস্টার মন্ত্রী মসায়। ততদিনে আমিই না আপনাকে মেরে দেই, কে জানে।
দিয়ার কথা শুনে নির্ণয় সশব্দে হেঁসে উঠলো। দিয়ার পাশে মেঝেতে বসতে বসতে বলে উঠলো-
—“তাহলে আরও ভালো, মেরে দেও যত তাড়াতাড়ি সম্ভব মেরে দেও, নয়তো কিন্তু তোমার বাঁচা হারাম করে দিবো।
দিয়া কিছু বললো না চুপ করে রইলো কিছু সময়। নির্ণয় দিয়াকে চুপ থাকতে দেখে বললো-
—“আমার বোনেদের উস্কানি দিচ্ছো কেনো?
দিয়া ফের হাঁসলো, বসা থেকে উঠে বিছানার দিকে এগিয়ে যেতে যেতে ছোট্ট করে বললো-
—“আমার ঠ্যাকা লাগছে? আপনার বোনদের উস্কানোর জন্য। আর হ্যাঁ আপনার লজ্জা লাগে না লুকিয়ে লুকিয়ে অন্যদের কথা শুনতে, যত্তসব ছোটলোকি কারবার।
নির্ণয় ঠোঁট কামড়ে হাসলো। ও অনেকক্ষন আগেই এসেছিল তবে তিন বোন ও বউ এর কথা বার্তা শুনে দরজার কাছেই থেমে যায় আর চুপিসারে শুনতে থাকে তাদের সকল কথা। দিয়াও তখন কিচ্ছু বলতে চাইছিলো না ওদের তবে যখন দেখলো নির্ণয় দরজার বাহিরে পর্দার পেছনে দাঁড়িয়ে আছে তখনই চালাকি করে সবকিছু বলে দেই ওদের। যার দরুন নির্ণয় রেগে গিয়ে দিয়ার গলা টিপে ধরে।
—“তারমানে তুই আমাকে দেখেছিলি?
দিয়া নির্দ্বিধায় বলে উঠলো-
—“হ্যাঁ, তো?
—“তুই ইচ্ছে করে ওদের চোখে আমাকে ছোট করেছিস?
—“হ্যাঁ করেছি!
এবারও ছোট্ট উত্তর দিয়ার। নির্ণয় অবাক চোখে তাকিয়ে দেখলো দিয়া কে। এক রাতের মধ্যে এতো পরিবর্তন?
—“এতে তোর লাভটা কি?
দিয়া আরাম করে বসলো বিছানার উপর-
—“সবকিছুতে লাভ লোকসান খুঁজতে নেই মিস্টার।
নির্ণয় এবার আরো খানিকটা অবাক হলো। তবে তা দিয়া কে বুঝতে না দিয়ে ফের গিয়ে বসলো দিয়ার পাশে-
—“কোথায় ছিলি কাল সারারাত? কোন নাগরের সাথে ছিলি?
দিয়া হালকা হেঁসে বললো-
—“একটা নাগর থাকলে বোধহয় আজ খুবই উপকারী হতাম, কিন্তু ওই যে কপাল ফোঁটা তাই কোনো নাগরই জুটলো না কপালে।
নির্ণয় ঠোঁট এলিয়ে হাঁসলো-
—“বেশী উড়িস না, নয়তো ডানা ছেঁটে দিবো।
*
—“আসবো……?
হঠাৎ দরজায় কড়াঘাত শুনে উঠে দাঁড়ালো দিয়া। মাথায় উর্না টেনে মিহি স্বরে বললো-
—“আসেন”
হুড়মুড়িয়ে ভেতরে প্রবেশ করলো আরিয়ান, নির্ণয় কপাল কুঁচকে তার দিকেই তাকিয়ে আছে, আরিয়ান আমতা আমতা করে বললো-
—“ও…ওভাবে তাকিয়ে আছো কেনো? খেয়ে ফেলবে নাকি?
নির্ণয় কপাল কুঁচকে সূক্ষ্য দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করলো আরিয়ান কে। ছেলেটা হাপাচ্ছে বোধহয় দৌড়ে এসেছে। নির্ণয় গম্ভীর গলায় বললো-
—“কি বলতে এসেছিস সেটা বলে ফেল”
আরিয়ান শুকনো ঢোঁক গিলে বললো-
—“ভাবীর বোন ফিরে এসেছে ভাইয়া, কি যেন নাম..?
—“নদী..”
দিয়ার কথায় ওর দিকে তাকিয়ে দাঁত বের করে হাসলো আরিয়ান-
—“হ্যাঁ, নদী আপু উনি ফিরে এসেছেন! হসপিটালে ভর্তি করেছে, অবস্থা খুব একটা ভালো নয়। তোমাদের এক্ষুনি যেতে বললো।”
আরিয়ান কে ওভাবে ছুটে আসতে দেখে ইতিমধ্যেই নির্ণয়ের ঘরে সবাই ছুটে এসেছেন। নদী ফিরে এসেছে কথা বোধহয় নিলা মিলা প্রিয়া কারোরই পছন্দ হলো না। প্রিয়া মুখ বাঁকিয়ে বিড়বিড় করে উঠলো-
—“ওই যে আরেক আপত এসে হাজির”
নিলা প্রিয়া কে কনুই দিয়ে গুঁতো মেরে বললো-
—“আসতে বল কেউ শুনে ফেলবে”
—“শুনলে শুনবে আমি কী কাউকে ভয় পায় নাকি?
মিলা দু’জন কে ধমক দিয়ে বললো-
—“এই তোরা চুপ করবি? আগে ঘটনা কি শুনতে দে”
মিলার ধমকে চুপ হয়ে গেলো দুই বোনই। তবে আরিয়ানের চোখে-মুখে ছিল উচ্ছ্বাস আর আনন্দের এক স্পষ্ট ছাপ, সে যেন খবরটি জানাতে পেরে এতটাই আপ্লুত হয়েছিল যে তার উৎসাহ ছিল বাঁধভাঙা। কিন্তু সেই উল্লাসের বিপরীতে, দিয়ার মুখমণ্ডলে ততটা ভাবান্তর দেখা গেল না। তার অভিব্যক্তি ছিল সম্পূর্ণ নিস্পৃহ, যেন সে এমন একটি খবর শোনার জন্য প্রস্তুত ছিল অথবা খবরটি তার কাছে কোনো গুরুত্বই বহন করে না।
আরিয়ানের উত্তেজনার পারদ যখন তুঙ্গে, তখন দিয়া শান্তভাবে উত্তর করলো—
—“ওহ্ আচ্ছা”
দিয়ার এমন উত্তর শুনে ঘরে থাকা সকলে বেশ অবাক হলো। আরিয়ানের উচ্ছ্বাস মুহূর্তে যেন থমকে গেল, তার মুখের হাসি নিভে গেল নিমিষে। নির্ণয় ভ্রু কুঁচকে সরাসরি তাকালো দিয়ার দিকে। শুধু নির্ণয় নয় ঘরে থাকা প্রত্যেকটি মানুষ কেমন অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে দিয়ার দিকে। দিয়া অপ্রস্তুত হলো, গলা খাঁকারি দিয়ে বলে উঠলো-
—“আপনারা ওভাবে তাকিয়ে আছেন কেনো? আমি কি কিছু করলাম নাকি?
সবাই এবার দৃষ্টি ঘোরালো দিয়ার থেকে। স্বর্ণা খাঁন কিছুটা অবাক কন্ঠে শুধালেন-
—“তুমি কি খুশি নও?
দিয়া হালকা হেঁসে বললো-
—“এখানে আমার খুশি হওয়া বা না হওয়াতে কিছু যায় আসে না।
কেউ আর কোনো কথা বাড়ালেন না যে যার মতো বেরিয়ে গেলেন ঘর থেকে। প্রিয়া এসে দিয়ার হাত ধরে বললো-
—“তুমি এখন হসপিটালে যাবে ভাবী?
দিয়া মৃদু হেঁসে বললো-
—“হ্যাঁ যেতে তো হবেই”
—“তাহলে আমিও যাবো তোমাদের সাথে”
নিলা এগিয়ে এসে নিচু স্বরে বললো-
—“আমিও যাবো”
—“তাহলে আমিও যাবো”
মিলার বাক্য সম্পূর্ণ হতেই খেকিয়ে উঠলো নির্ণয়-
—“তোরা তিনডাই কি মনে করছোত আমরা বিয়া বাড়ি যায়তাছি? যে তোরা এমনে লাফাইতাছোত”
দিয়া নির্ণয়ের কথায় কান না দিয়ে ওদের তিন বোনের উদ্দেশ্যে বললো-
—“যাও তৈরি হয়ে আসো, আমি তোমাদের নিয়ে যাবো।
ওরা তিনজন খুশিতে লাফাতে লাফাতে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। আরিয়ান কে ওমন ভ্যাবলার মত দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে নির্ণয় ভেঙ্গ করে বলে উঠলো-
—“তোরে কি কোলে করে বাহিরে রেখে আস্তে হবে নাকি?
আরিয়ান এতক্ষণ ভাবনার জগতে ডুবে ছিল। নির্ণয়ের কন্ঠ শুনে ভাবনার সুতো কাটতেই তড়িঘড়ি করে বলে উঠলো-
—“না না, কোলো নিতে হবে না, আমি একাই হেঁটে চলে যেতে পারবো”
—“তাহলে না গিয়ে দাঁড়িয়ে আছিস কেনো? যাআআ”
নির্ণয়ের কর্কশ কন্ঠ শুনে এক ছুটে বেরিয়ে গেলো আরিয়ান। নির্ণয় দরজা আটকে এগিয়ে গেলো দিয়ার দিকে-
—“বড় অবাধ্য হচ্ছিস যে?
দিয়া কপাল কুঁচকে তাকালো-
—“কিসের অবাধ্য?
—“এই যে আমি ওদের না করা শর্তেও তুই নিয়ে যেতে রাজি হলি”
—“হলাম তো কি হয়েছে?
নির্ণয় হিসহিসিয়ে বলে উঠলো-
—“মুখে মুখে কথা বলবি না, জিহ্বা টেনে ছিঁড়ে ফেলবো।”
দিয়া এগিয়ে এসে নির্ণয়ের সামনে জিহ্বা খানিকটা বের করে দিয়ে বললো-
—“এই যে নেন ছিঁড়ে ফেলেন, আমার কোনো আপত্তি নেই”
নির্ণয় দুই আঙ্গুল দিয়ে চেপে ধরল দিয়ার জিহ্বা, পকেট থেকে একটা ছোট্ট Switchblade বের করে জিহ্বার কাছে এগিয়ে নিয়ে গিয়ে শয়তানি হেঁসে বললো-
—“এখন বল”
দিয়া জানে নির্ণয় ওকে ভয় দেখাচ্ছে তাই ও তাল মিলিয়ে বলে উঠলো-
—“কেঁটে ফেলেন! তবে পরে সমস্যা টা কিন্তু আপনারই হবে।”
নির্ণয় নাইপ টা পকেটে ঢুকিয়ে নিলো। দিয়ার কানের কাছে মুখ নিয়ে দুষ্টু হেঁসে বললো-
—“হ্যাঁ তা ঠিক, কেননা রাতে আদর করতে গেলে আর চেঁচাতে পারবে না! আর আদর করার সময় না চেঁচালে মজা পাওয়া যায় না, আসলে ফিল আসে না।”
দিয়ার কান গরম হয়ে উঠেছে। লোকটার কি কোনো লজ্জা শরম নাই? কি নির্লজ্জ ব্যাটা মানুষ।”
—“ছিঃ অসভ্য বদমাইশ ফালতু লোক কোথাকার। দূরে থাকেন আমার থেকে।”
নির্ণয় হেঁসে বেরিয়ে গেলো ঘর থেকে। দিয়া বুঝে উঠতে পারলো না নির্ণয়ের এই ব্যবহারের মানে। লোকটার মনে হয়তো কিছু চলছে, যার দরুন কিছু না বলে হেঁসে উড়িয়ে দিলো দিয়ার সকল কথা।
নির্ণয় ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে বিড়বিড় করে আওড়ালো-
—“সালি তুমি যদি চলো ডালে ডালে, আমি চলি পাতায় পাতায়।”
_____________
গাড়িতে তখন বিরাজ করছে এক অস্বস্তিকর নিস্তব্ধতা। ড্রাইভিং সিটে নির্ণয়, তার পাশে আরিয়ান। পেছনের সিটে জড়সড় হয়ে চেপে বসে আছে দিয়া, নীলা, মিলা আর প্রিয়া।
সবাই চুপচাপ, যেন এক অলিখিত নীরবতা পালন করছে। কেননা, মুখ দিয়ে একটা শব্দ বের করলেই বিপদ! নির্ণয় এতটাই প্রচণ্ড গতিতে গাড়ি চালাচ্ছে, যে মনে হচ্ছে নির্ণয় গাড়ি চালাচ্ছে না, সে রেস করছে। যা কি না স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি, যেন সে রাস্তা নয়, সময়কে ধরে ফেলবে বলে পণ করেছে। তার এই বেপরোয়া গতির সামনে যেন কারোরই কথা বলার সাহস নেই, পাছে একটু মনোযোগ এদিক-ওদিক হলেই না-জানি কী ঘটে যায়!
নির্ণয়ের বেপরোয়া ও নিয়ন্ত্রণহীন গতিতে ছুটে চলা গাড়িটি হসপিটালের মূল ফটকের সামনে থামতেই সকলে যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। তড়িঘড়ি করে দরজা খুলে হুড়োহুড়ি করে নেমে দাঁড়ালো সকলে, যেন এতক্ষণে তাদের হারানো প্রাণ ফিরে এলো। দিয়া, নীলা, মিলা, প্রিয়া আর আরিয়ান, সকলেই একে অপরের দিকে স্বস্তির দৃষ্টিতে তাকালো। নির্ণয় শান্তভাবে ইঞ্জিন বন্ধ করলো, যেন কিছুই হয়নি।
বাইরের খোলা বাতাস তাদের অস্থিরতা কিছুটা কমালো। তারা আর কালক্ষেপণ না করে দ্রুত পদক্ষেপে হসপিটালের ভেতরে প্রবেশ করল। লবিতে তখন মানুষজনের চাপা গুঞ্জন আর এক বিষণ্ণ পরিবেশ।
করিডোর পেরিয়ে নদীর কেবিনের সামনে এসে দাঁড়ালো সকলে, নির্ণয় প্রথমে দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করতেই হুড়মুড়িয়ে ওর বুকে এসে পড়লো নদী। দু হাতে ঝাপটে জরিয়ে ধরে ঠুকরে কেঁদে উঠলো। নদীর এই আকস্মিক আক্রমনে নির্ণয় যেন মুহূর্তে স্তম্ভিত হয়ে গেল। আরিয়ান, দিয়া এবং অন্য সকলে হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে দেখল সেই দৃশ্য।
প্রিয়া মূহুর্তেই শক্ত করে চেপে ধরলো দিয়ার হাত। আরিয়ান এসে আড়াল করে দাঁড়ালো সেই দৃশ্য! প্রিয়া ফিসফিসি করে বলে উঠলো-
—“শয়তান মাইয়ার নাটক শুরু…”
#চলবে

