Home "ধারাবাহিক গল্প প্রণয়ের অন্তরমহল প্রণয়ের অন্তরমহল পর্ব-১৭+১৮

প্রণয়ের অন্তরমহল পর্ব-১৭+১৮

0
652

#প্রণয়ের_অন্তরমহল
#তাহরিশমিতা_মুনতাহা
#পর্বঃ১৭

⚠️ অনুমতি ব্যতীত কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ 🚫

আজ দিনটা শুক্রবার। আর শুক্রবার মানেই খান বাড়ির ঈদের দিন। আজ সকাল সকাল বাড়ির মেয়ে বউ রা উঠে পড়েছে। জোর দমে রান্না চলছে উঠোনের উনুনে। এসব থেকে কিছুটা দূরে চেয়ারের উপর মনমরা হয়ে বসে আছে দিয়া। সে সবার হাতে হাতে টুকটাক কাজ করে দিচ্ছিল, ঠিক তখনই কোথা থেকে যেন নির্ণয় এলো।

—“এই মেয়ে এখানে কি করছ তুমি? তোমাকে এসব কে করতে বলেছে?

দিয়া কপাল কুঁচকে তাকালো নির্ণয়ের দিকে। বলল-

—“কেউ বলেনি আমি নিজে থেকেই এসেছি”

—“মুখে মুখে কথা না বলে ঘরে যাও। এখানে বাহিরের অনেক মানুষ আসবে”

—“আসুক তাতে আমার কি?”

দিয়ার বেশ ভালো লাগে নির্ণয়ের সাথে ঘাড় ত্যাড়ামি করতে। লোকটা ওকে খুব কষ্ট দিয়েছে তাই তো এখন মুখে মুখে কথা বলার অভ্যেস হয়েছে।

—“দিব এক ঠাঁটিয়ে চড়’ কিছু বলি না দেখে কী মাথায় উঠে ভাত রান্না করা শুরু করেছিস, বেয়াদব মেয়ে”

নির্ণয়ের এহেন কথায় দিয়া চোখ ছোট ছোট করে তাকালো ওর দিকে। ভাবুক কন্ঠে বলল-

—“ওমা মাথায় আবার ভাত ও রান্না করা যায়? আগে জানা ছিল না”

—“এই তোরা চুপ করবি? সারাক্ষণ দুটো সতীনের মতো লেগে থাকিস। দিয়া মা তুমি যাও ওই ওখানে গিয়ে বসে থাকো তোমার কাজ করতে হবে না।”

আশা বেগমের কর্কশ কন্ঠে দু’জনেই চুপ হয়ে গেল। দিয়া নির্ণয়ের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলল-

—“গিদর একটা’ কোথাও গিয়ে একটু শান্তি নাই’ দূর ভালো লাগে না”

বলতে বলতে দিয়া পা বাড়ালো ঘরের দিকে। নির্ণয়ের পিছু ডেকে বলল-

—“নিল রঙের শাড়িটা পড়ে আসো কেমন”

দিয়া মুখ বাঁকিয়ে বলল-

—“কখনোই না’ হুহহহ”

বলেই দিয়া ফের হাঁটা ধরলো! নির্ণয় চেঁচিয়ে বলে উঠল-

—“স্বামীর কথা অমান্য করলে কখনো জান্নাতে যেতে পারবে না!

দিয়ার পা হঠাৎ থেমে গেল ঘাড় ঘুরিয়ে নির্ণয়ের দিকে তাকিয়ে মুখ বাঁকিয়ে বলে উঠলো।

—“ইশশ্ আপনি মনে হয় চেল-চেলাইয়া জান্নাতে যাবেন!

নির্ণয় দিয়ার কথা শুনেও না শোনার ভান করে বললো।

—“কি বললে শুনিনি, আবার বলো।

দিয়া এবার কয়েক কদম এগিয়ে এসে নির্ণয়ের কানের কাছে মুখ নিয়ে চেঁচিয়ে বলে উঠলো।

—“আমি বলেছি- দুনিয়ায় যে পাপ করতেছেন! একবার শুধু কবরে গিয়ে দেখেন- ফেরেস্তারা আপানার পু*ট*কি দিয়ে গরম রড় দিবে।

নির্ণয় সঙ্গে সঙ্গে জ্বিব কামড়ে ধরলো’ রাগে গজগজ করে বলে উঠলো।

—“তুই মনে হয় এই দোয়াই করিস সারাক্ষণ! দুধ কলা দিয়ে ঘরে এক্ষান কাল নাগিন পুষতাছি। চুত-মারানি সর চক্ষের সামনে তে নয়তো মাথায় তুলে দিব এক আছাড়।

দিয়া ফের আগের ন্যায় বলে উঠল-

—“আমার মনেহয় ঠ্যাকা পড়ছে আপনার সামনে এমন ছাগলের তিন নাম্বার বাচ্চার মতো দাঁড়িয়ে থাকতে! হুহহ যত্তসব”

বলেই দিয়া গটগট পায়ে চলে গেল উপরের ঘরে। নির্ণয় ভ্যাবলার মত দাঁড়িয়ে আছে এখনো। মেয়েটা এখন আর তাঁকে ভয় পায় না। কোনো কথাই শুনতে চাই না। নাহ এভাবে চলবে না’ কিছু একটা করতে হবে।

দিয়া কে একটা শিক্ষা দেওয়া উচিত’ কিন্তু কি করা যায়? ভাবতে ভাবতে নির্ণয় সামনের দিকে এগিয়ে যেতেই সজোরে কারো সাথে ধাক্কা খেলো। যেই না চেঁচিয়ে কিছু বলতে যাবে ওমনি চোঁখে পড়লো নদী কে।

—“সরি আসলে আমি দেখতে পায়নি”

নির্ণয় সৌজন্যমূলক হেঁসে বলল-

—“আরেহ কোনো বেপার নাহ’ আমারই ভুল, আমি অন্যমনস্ক ছিলাম’ সরি।

নদী মেকি হেঁসে বলল-

—“ইটস্ ওকে”

নির্ণয় কে অন্য দিনের তুলনায় আজ একটু বেশিই সুন্দর লাগছে। কালো প্যান্ট’ কালো পাঞ্জাবী’ চুল গুলো ঝেল দিয়ে সেট করা’ হাতে সোনালী রঙের একটা ঘড়ি’ নদী মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে দেখছে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সুদর্শন পুরুষ টাকে। ইশশ্ এই মানুষটাই তো তার হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে আজ সে নিজেরই ছোট বোনের হাসবেন্ড।

নদীকে ওভাবে নিজের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে নির্ণয় নদীর চোখের সামনে দুই আঙ্গুলে তুরি বাজিয়ে বলল-

—“ও হ্যালো কোথায় হারিয়ে গেলে?

নদীর দ্যান ছুটলো। আমতা আমতা করে বলল-

—“কিছুনা’ তবে একটা কথা বলি?”

নির্ণয় ভ্রু যুগল নাচিয়ে বলল- “কী?

নদী মৃদু হেঁসে বলল-

—“আপনাকে আজ বেশ আকর্ষণীয় লাগছে”

নির্ণয় হাঁসলো’ বলল-

—“এগুলো কিন্তু ভারি অন্যায়, বড় বোন হয়ে ছোট বোনের হাসবেন্ডের দিকে কুনজর দিচ্ছেন ছ্যাহ?”

নদী ঠোঁট কামড়ে হেঁসে বলল-

—“বোনের হাসবেন্ড যদি এতো হ্যান্ডসাম হয় তাহলে তো একটু আধটু নজর দেওয়ায় যায়’ কি বলেন?”

—“সাবধানে বোন কিন্তু আপনার বেশি একটা সুবিধার নয়”

—“ক্যান”

নির্ণয় বাঁকা হেঁসে বলল-

—“হলো কি? আপনার শরীর আছে সুন্দর চেহারাটাও আছে কিন্তু চোখ দুটো নাই’ বিষয় টা তখন কেমন হয়ে যাবে না? তাই বলি কি চোখ দুটো হেফাজতে রাখেন” চলি….

বাক্য শেষ করেই নির্ণয় সামনের দিকে এগিয়ে গেলো। নদী নির্ণয়ের পিঠের দিক তাকিয়ে ভাবতে লাগলো বিয়ের দিনের ঘটনা”

________________

৭-মাস আগে-

এমনি এক শুক্রবার মোল্লা বাড়িতে আত্নীয় স্বজনে গিজগিজ করছে। করবেই বা না কেনো? বড় মেয়ের বিয়ে বলে কথা। সবাই কত আনন্দীত’ হাঁসি ঠাট্টায় মাতোয়ারা পুরো বাড়ি। তবে নদী বসে আছে বিছানার এক কোনে। মুখটা মলিন দেখে বুঝা যাচ্ছে সে এই বিয়েতে রাজি না। কিন্তু কিছু করার নেই বাবা কে সে কখনোই মুখ ফুটে বলতে পারবে না যে সে অন্য কাউকে ভালোবাসে এই বিয়েটা করতে পারবে না তাহলে তো বাবা মেরেই ফেলবেন।

নদী কি করবে বুঝতে পারছে না। মাথাটাও ধরেছে খুব। হঠাৎই মাথায় এলো একবার নির্ণয়ের সাথে কথা বলে দেখা উচিত। যেই ভাবনা সেই কাজ। কল লাগালো নির্ণয়ের নাম্বারে, কল তো দিল কিন্তু এসব বলবে কীভাবে? ভাবতে ভাবতে নোখ কামড়াচ্ছে নদী। হঠাৎ-

—“হ্যালো’

নদীর ভয়ে বুকটা ধুক করে উঠল। তবুও নিজেকে সংবিরন করে নিচু স্বরে বললো-

—“আসসালামু আলাইকুম’

—“ওয়ালাইকুম আসসালাম’ কে?

নদী আমতা আমতা করে বলল-

—“জ্বি আমি নদী বলছিলাম”

নির্ণয় স্ক্রু হাঁসলো’ সে জানতো নদী তাকে ফোন করবে অবশ্যই। তবুও না জানার ভান ধরে গম্ভীর গলায় বলল-

—“এখন ফোন করেছেন যে? কিছু হয়েছে?”

নদীর গলাটা বার বার শুকিয়ে যাচ্ছে লোকটার ভারি কন্ঠ স্বর শুনলেই আত্মা বেরিয়ে আসার উপক্রম হয়। তবে ভয় পেলে চলবে না তাই নদী শুকনো ঢোঁক গিলে মিনমিনে গলায় বলল-

—“আপনি কি আমার সাথে এক্ষুনি দেখা করতে পারবেন? প্লিজ খুব জরুরী!”

নির্ণয় অবাক হয়ে বলল-

—“এখন?”

—“জ্বি”

—“কি বলবেন ফোনেই বলেন’ আমি এখন যেতে পারবো না”

—“প্লিজ একটু বুঝার চেষ্টা করুন’ এতো কথা ফোনে বলা সম্ভব নয়।”

নির্ণয় খানিক্ষণ কপাল চুলকে কি যেন ভাবলো’ অতঃপর বলল-

—“কোথায় আসবো?”

—“পুকুর পাড়ে আসেন আমি ওখানেই আপনার জন্য অপেক্ষা করছি”

—“ওকেই”

বলেই ফোনটা কেটে দিলো নির্ণয়। খান বাড়ি থেকে মোল্লা বাড়িতে আসতে বেশি একটা সময় লাগে না’ ওই ৩০’মিনিট এর মতো লাগে। নদী বড় করে ঘোমটা টেনে পায়চারি করতে লাগলো পুকুর পাড়ে।

____________________

বেশ কিছুক্ষণ পর সেখানে নির্ণয় এলো। তার আসতে বেশি সময় লাগেনি ১০’মিনিটের মাথায় চলে এসেছে। বাইক নিয়ে এসেছে তাই হয়তো অল্প সময়ে চলে এসেছে।

—“জ্বি বলেন”

নদী কিছুক্ষণ আমতা আমতা করে বলল-

—“আমি এই বিয়েটা করতে পারব না’ আপনি প্লিজ বিয়ে টা ভেঙ্গে দিন”

নির্ণয়ের মুখে তেমন ভাবান্তর দেখা গেলো না। মনে হলো সে আগে থেকেই সব জানে।

—“কেনো?”

—“আসলে আমি অন্য কাউকে ভালোবাসি”

—“তো?”

—“আপনি বিয়ে টা ভেঙ্গে দিন”

—“পসিবল নয়”

—“কেনো?”

—“এটা আমাদের খান পরিবারের মানসম্মানের বিষয়”

নদী শব্দ করে কেঁদে উঠে আচমকা নির্ণয়ের পা দুটো জাপটে জড়িয়ে ধরল-

—“একজন কে মনে রেখে অন্য জনের সাথে সংসার কীভাবে করবো বলেন? আপনি কি পারবেন মনে একজন কে রেখে অন্য আরেকজনের সাথে ঘর বাঁধতে? এটা তো অন্যায় তাই না?”

নির্ণয়ের নদীর প্রশ্ন এড়িয়ে গিয়ে আগের তুলনায় আরো গম্ভীর গলায় বললো-

—“এখন আমি কী করতে পারি?”

—“বিয়ে ভে……

—“খাবারদাবার বিয়ে ভাঙার কথা ভুলেও মুখে আনবেন নাহহ”

#চলবে

#প্রণয়ের_অন্তরমহল
#তাহরিশমিতা_মুনতাহা
#পর্বঃ১৮

⚠️ অনুমতি ব্যতীত কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ 🚫

নির্ণয়ের কথায় ভ্যাবাচ্যাকা খেল নদী। লোকটা ঠিক কী বলতে চাইছে, বোধগম্য হলো না ওর। কপাল কুঁচকে তাকিয়ে রইল নির্ণয়ের মুখের দিকে। নির্ণয় নদীর চাহনি দেখে মৃদু হেসে কোনো রকম ভনিতা ছাড়াই বলল—

—“বুঝতে পারলেন না আমার কথা?”

নদী দুই পাশে মাথা নেড়ে ‘না’ বলল। নির্ণয় ফের গম্ভীর গলায় বলল—

—“বিয়ে ভেঙে কী করবে? আমি বিয়ে ভেঙে দিলে তোমার বাবা কি আবার অন্য কোথাও তোমার বিয়ে ঠিক করবেন?”

নদী চট করে বলে উঠল—

—“আমরা খুব তাড়াতাড়ি বিয়ে করে নেব।”

—“কত তাড়াতাড়ি?”

নদী তৎক্ষণাৎ কিছু বলতে পারল না। তা দেখে নির্ণয় বলল—

—“তুমি চাইলে আমি তোমাদের সাহায্য করতে পারি।”

নদী মৃদু স্বরে বলল—

—“কীভাবে?”

—“তুমি বললে আমি তোমাকে পালাতে সাহায্য করতে পারি।”

নদী চট করে দৃষ্টি তুলে তাকাল নির্ণয়ের দিকে। বলল—

—“আমি পালিয়ে গেলে আপনার কী হবে? এই বিয়েটার, আব্বু-আম্মুর কী হবে? সবার মানসম্মান তো ধুলোয় মিশে যাবে।”

—“তাহলে তুমি কি এই বিয়েটা করতে চাইছ?”

—“নাহ, আমি সেটা বলতে চাইনি।”

—“তাহলে?”

—“আপনি বলুন, কী করতে হবে?”

নদীর প্রশ্নে নির্ণয় খানিকক্ষণ ভাবল, এরপর বলল—

—“তোমার উনি কী বলেছেন?”

নদীর সোজাসাপ্টা উত্তর—

—“পালিয়ে যেতে।”

—“কোথায়?”

—“ওনার কাছে।”

—“ও কি তোমার জন্য অপেক্ষা করছে?”

—“হ্যাঁ।”

—“তাহলে চলে যাও। বাকিটা আমি সামলে নেব। তুমি কি আগে থেকেই পালিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে এসেছ?”

নদী মাথা নেড়ে সম্মতি দিল। নির্ণয় আর কথা বাড়াল না। বাইক স্টার্ট করে নদীর উদ্দেশ্যে বলল—

—“বোসো।”

নদী বাইকে উঠতে সংকোচ বোধ করছে। নির্ণয় বলল—

—“কোনো সমস্যা হবে না। আপনি উঠুন, আমি পৌঁছে দিয়ে আসছি আপনার গন্তব্যে।”

নদী আর কিছু বলল না। চুপচাপ উঠে বসল বাইকের ব্যাক সিটে। সোঁ সোঁ শব্দ তুলে বাইকটি ছুটল গন্তব্যের দিকে।

_________________

ছোট একটা কাজী অফিসের সামনে এসে বাইক থামাল নির্ণয়। অদূরে দাঁড়িয়ে আছে বেশ লম্বা, শ্যামলা ফর্সা ধরনের একটা ছেলে! নদী বাইক থেকে নেমে ছুটে গেল ছেলেটার নিকটে। ছেলেটা নদীকে দুই হাতে পরম আহ্লাদে জড়িয়ে নিল বাহুতে। দূর থেকে এই দৃশ্য দেখে ঠোঁট প্রসারিত করে হাঁসল নির্ণয়। এগিয়ে গেল ওদের দিকে।

ছেলেটা কিছুটা ভীত হলো নির্ণয়কে দেখে। নদী ছেলেটার হাত ধরে আশ্বস্ত করল। বলল—

—“ভয় পেয়ো না আশিক। উনি কিছু করবেন না আমাদের।”

নির্ণয় মৃদু হেসে নিজ থেকেই হাত বাড়িয়ে বলল—

—“হ্যালো।”

আশিক নিজেকে ধাতস্থ করে হাত মেলাল। মৃদু স্বরে জানতে চাইল—

—“আপনি নিজেই নিজের হবু বউকে এভাবে পালাতে সাহায্য করছেন? নিশ্চয় এর পেছনে আপনার কোনো উদ্দেশ্য আছে?”

নির্ণয় কুটিল হাসল। বলল—

—“উদ্দেশ্য ছাড়া আমি আবার কিছু করি না। ওটা আমার ডেস্টিনিতে নেই।”

আশিক শুধু হাসল। নির্ণয় ফের বলল—

—“চলো, তোমাদের বিয়ের দেরি হয়ে যাচ্ছে। আমারও আবার বাড়ি ফিরতে হবে।”

—“হ্যাঁ, চলেন।”

কিছু সময়ের মধ্যেই ওদের বিয়ের কাজ সম্পন্ন হলো। নির্ণয় ওদের বিদায় জানিয়ে বেরিয়ে পড়ল বাড়ির উদ্দেশ্যে।

________________

—“এই নদী, নদী! ওখানে দাঁড়িয়ে আছিস কেন? এদিকে আয়।”

কারো তীক্ষ্ণ ডাকের স্বরে ঘোর কাটল নদীর। তাড়াহুড়ো করে পেছনে তাকিয়ে দেখল দিয়া দাঁড়িয়ে আছে। নদী মেকি হেসে বলল—

—“আসছি।”

নদী যেতে যেতে মনে মনে আওড়াল—

—“যেটা আমার, সেটা যেকোনো মূল্যে আমার করেই ছাড়ব। যা কিছু হয়ে যাক না কেন।”

নদী মনে মনে হাজারখানেক গুটি সাজিয়ে ফেলেছে। নির্ণয়কে নিজের করতে সে সব কিছু করতে রাজি আছে, সেটার মূল্যে তার শুধু নির্ণয়কে চাই।

নদীকে চিন্তিত দেখে দিয়া শুধাল—

—“তোর কি কিছু হয়েছে? তোকে খুব চিন্তিত দেখাচ্ছে যে!”

নদী মেকি হেসে বলল—

—“আরেহ, তেমন কিছুই না।”

থেমে—

—“আরেহ, তোর ওই নীল শাড়িটা তো বেশ সুন্দর। আমাকে দে না, পরি একটু।”

দিয়া একটু অপ্রস্তুত হলো, কেননা নির্ণয় শাড়িটা ওকে পরতে বলেছে, আর খুব বেছে বেছে ওর জন্য পছন্দ করে নিয়ে এসেছে! এখন কী করবে? সে তো বোনকে ‘না’ করতে পারবে না। তাই ভাবল সে না হয় অন্য শাড়িটা পরে নিবে। নদী না হয় এটা পরুক। আর নির্ণয়কে বুঝিয়ে বললেই হবে। দিয়া মৃদু হেসে শাড়িটা নদীর হাতে দিয়ে বলল—

—“নে পর। তোকে বেশ মানাবে শাড়িটা।”

নদী খুশিতে গদগদ হয়ে দিয়াকে জড়িয়ে ধরে বলল—

—“থ্যাংক ইউ, বনু!”

দিয়া নদীকে নিজের থেকে ছাড়াতে ছাড়াতে বলল—

—“অ্যাই ছাড় বলছি! বাল, এমন করে ধরছিস কেন? আমি কি তোর জামাই লাগি?”

নদী শব্দ করে হেসে বলল—

—“হ্যাঁ!”

দিয়া নদীকে টানতে টানতে ওয়াশ রুমের দিকে নিতে নিতে বলল—

—“যাহ, তাড়াতাড়ি শাড়িটা পরে আয়।”

—“আচ্ছা বাবা, যাচ্ছি।”

বলেই ওয়াশ রুমের দরজাটা ঠাস করে লাগিয়ে দিল নদী। দিয়া দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে এগিয়ে গেল আলমারির দিকে। এখন সে কোন শাড়িটা পরবে? ভাবতেই নির্ণয়ের দেওয়া প্রথম খয়েরি শাড়িটা চোখে পড়ল।

________________

তখন প্রায় বিকেল চারটা—

দিয়া আর নদী হাসতে হাসতে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামছে। বাড়ির সকলের দৃষ্টি আটকে আছে সেদিকটায়। দুই বোনকে আজ বেশ আকর্ষণীয় লাগছে। বিশেষ করে দিয়াকে বোধহয় একটু বেশিই অদ্ভুত সুন্দর লাগছে। নির্ণয়ের দৃষ্টি আটকে আছে দিয়াতে।

তবে হঠাৎই যখন দৃষ্টি গেল নদীর পরিহিত নীল শাড়িটার দিকে, নির্ণয়ের মাথার রক্ত টগবগ করে উঠল। রাগে চোয়াল শক্ত হয়ে এল নিমিষেই। প্রিয়া নির্ণয়ের পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল। ভাইয়ের যে রাগ হয়েছে, তা বেশ বুঝতে পেরেছে সে।

নির্ণয় রাগে নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে। চোখ দুটো লাল বর্ণ ধারণ করেছে। কপালের রগগুলো ফুলে ফেঁপে উঠেছে। রাগে গজ গজ করতে করতে সামনের দিকে পা বাড়াতেই প্রিয়া খপ করে ধরে ফেলল নির্ণয়ের হাত। নিম্ন স্বরে বলল—

—“ভাইয়া, পাগলামি কোরো না। অনেক মানুষজন আছেন বাড়িতে।”

নির্ণয় রক্তচক্ষু নিয়ে তাকাল প্রিয়ার দিকে। প্রিয়া ভয়ে শিউরে উঠল, তবে হাত ছাড়ল না। হাত ছাড়লেই আজ এখানে একটা কেলেঙ্কারি ঘটে যাবে। তাই তো প্রিয়া শুকনো ঢোঁক গিলে আমতা আমতা করে বলল—

—“ভাইয়া, একটু বোঝার চেষ্টা করো। অনেক মানুষজন বাড়িতে। নিজেকে একটু সংযত করো, প্লিজ।”

নির্ণয় ঝটকা মেরে প্রিয়ার হাতটা ছাড়িয়ে, বড় বড় কদম ফেলে বেরিয়ে গেল বাড়ি থেকে। প্রিয়া পিছনে পিছনে গেল। ডাকল, তবে নির্ণয় সাড়া দিল না প্রিয়ার ডাকে। প্রিয়া নিজের মাথার চুল টেনে ধরে বলল—

—“আল্লাহ, আজকে ভাবির ওপর দিয়ে সুনামি যাবে। এই মেয়েটা কেন যে ভাইয়ার কথা শোনে না! দূর, ভালো লাগে না। যাই, নিলা আর মিলাকে খবরটা জানিয়ে আসি।”

________________

নির্ণয় একটা গাছের নিচে বসে একের পর এক সিগারেট ফুঁকেই চলেছে। ইতিমধ্যেই এক প্যাকেট সিগারেট শেষ। তবে নির্ণয়ের রাগ কিছুতেই নিয়ন্ত্রণে আসছে না। কালো পাঞ্জাবিটা ঘামে ভিজে একাকার। চুলগুলোও এলোমেলো হয়ে পড়ে আছে কপালে।

চোখগুলো এখনও লাল। নির্ণয় রাগ হয়েছে একটা বিষয়ে। মেয়েটা শাড়ি পরবে না, ভালো কথা। শাড়ি ফেলে দিক নয়তো পুড়িয়ে ফেলুক, কিন্তু ওই শাড়ি অন্য কাউকে কেন দেবে? চোখের সামনে নদীর ওই শাড়ি পরা দৃশ্যটা ভেসে উঠতেই নির্ণয়ের রাগ মাত্রা ছাড়িয়ে চলেছে।

নির্ণয় রাগে নিজের চুলগুলো খামচে ধরল দুই হাতে। মেয়েটা খুব বাড় বেড়েছে ইদানীং। কোনো কথাই শুনতে চায় না। এটার একটা হেস্তনেস্ত করতেই হবে। নয়তো দিয়া মাথায় উঠে নাচবে। না, এটা কিছুতেই হতে দেওয়া যাবে না। নির্ণয় মনে মনে আওড়াল—

—“বাড়িটা শুধু খালি হোক। আজ তোকে জ্যান্ত দাফন করব, চুতমারানি।”

#চলবে

(ভুল ত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন)