তুই যে আমারই পর্ব-০৫

0
6191

#তুই_যে_আমারই
#আঁখি আজমীর নুরা
part 5

সকালে ঘুম থেকে উঠে নামায আদায় করে নিলাম। এরপর জগিং করতে চলে যায়। আজকে একটু তাড়াতাড়ি চলে আসলাম। কারণ বাইরে গুড়িগুড়ি বৃষ্টি হচ্ছে। আকাশে অনেক মেঘ। মনে হচ্ছে মেঘেরা সবাই একসাথে প্রস্তুতি নিচ্ছে। একসাথে বর্ষণ হওয়ার জন্য। ফিরে এসে ব্রেকফাস্ট করতে এলাম। হঠাৎ নোটিশ করলাম আঁখি নেই। আজিফা?

হুম ভাইয়া কিছু বলবে?
আঁখি কই? ওকে টেবিলে দেখছি না যে! তখন আম্মু বলে উঠলো সে আগেই নাস্তা করে চলে গেছে। আছে হয়তো কোথাও!
হঠাৎ?
নিশ্চয় তোর ভয়ে। মানুষ যেমন বাঘের কাছ থেকে দূরে দূরে থাকে। মেয়েটাও তেমন তোর কাছ থেকে দূরে থাকলেই বাঁচে। আঁখির কাছেতো তুই বাঘের থেকে কম কিছু না। হাহাহাহাহা। সবাই হেসে উঠলো। আলতাফ চৌধুরী বলে উঠলেন, কথাটা মন্দ বলোনি রোজিনা।
আয়াজ মনে মনে বলে.. আসলেই মেয়েটা এত্তো ভয় পায় আমাকে। মনে মনে হাসে।

আজিফা বলে ওঠে, আম্মু বাইরে তো মনে হয় প্রচুর বৃষ্টি। হুম তাইতো দেখছি। আম্মু আজকে কিন্তু খিচুড়ি রান্না করতে হবে। বৃষ্টির দিনে খিচুড়ি খাওয়ার মজাই আলাদা। সাথে ভাজাপোড়া হলেতো আরতো কোনো কথায় নেই।

বাপরে বাপ তোর কথা শুনে মনে হচ্ছে রেইনি সিজন চলতেছে। পড়েতো শীত!

আলতাফ চৌধুরী বলল, আমিও তাই ভাবছি। মাঘ মাসে এ কেমন বৃষ্টি। রোজিনা চৌধুরী বললেন এমন বৃষ্টি মাঘ মাসে একটু আধটু হয়। ব্যাপার না।
সবাই খোশগল্প করে নাস্তা করে যে যার রুমে, কাজে চলে গেলো। শনিবার হওয়ায় অফিস অফ। তাই আয়াজ একদমই ফ্রী।
আর ওইদিকে বৃষ্টি হচ্ছে দেখে আঁখি আর স্কুলে যাচ্ছে না। আসলে যাচ্ছে না বললে ভুল হবে। প্রতিবেশী ফ্রেন্ডসরা কেউ স্কুলে যাচ্ছে না দেখে সেও আর যাচ্ছে না। আর তাছাড়া সাদিয়া, আরোহী, রিয়া,বৃষ্টি ওরাও ফোন করে জানিয়েছে ওরাও নাকি যাবে না। তাই মহারাণী ও আর যাবেন না। আসলেই বয়সটাতো এমনই।

আয়াজ উপরে বসে বসে বই পড়ছে আর কফি খাচ্ছে। কিন্তু বাইরে বাচ্চাদের চেঁচামেচির জন্য বইয়ে ঠিকমতো মন বসাতে পারছে না। তাই উঠে বেলকনিতে গেল, দেখার জন্য।
গিয়ে যা দেখলো, আয়াজের চক্ষু যেন চড়কগাছ। গিয়ে দেখলো বৃষ্টির মধ্যে কিছু ছেলেমেয়েরা একসাথে ফুটবল খেলছে। ও.ম.জ. এগুলোর মধ্যে তো আমাদের ইবলিশটাও আছে দেখছি। তাও আবার বৃষ্টির মধ্যে। এই মেয়ের ভিতর কি ভয়ডর কিছুই নেই। শরীরে যে জ্বর আসবে সেই চিন্তা ও নেই দেখছি।

হঠাৎ খেয়াল করলাম, সবকটা জাহিদ আঙ্কেলের বাড়ির আঙ্গিনায় উঁকিঝুঁকি মারছে। এবার যা দেখলাম মনেতো হচ্ছে চৌধুরী বাড়ির মানসম্মান সব আজকে ধুলোয় মিশে যাবে। কারণ তারা জাহিদ আঙ্কেলের বরই গাছ থেকে বরই চুরি করছে। আর গাছে উঠেছে তো উঠেছে তাও যে কেউ নয়, আমার বদমায়শিনিটা। এসব করার জন্য এই মেয়ে আজকে স্কুলে যায়নি। আর পড়া চুরিতে তো এক ধাপ এগিয়ে।

কিন্তু এবার মেজাজ যেনো আমার আকাশে উঠে গেছে। কারণ উঁচু হয়ে বরই নিতে যেয়ে, পাতলা ফুলহাতা গেঞ্জিটা উপরে উঠে গেছে। যার কারণে পেট, নাভি স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। তারউপর বৃষ্টিতে ভিজার ফলে শরীরের সবকিছু বোঝা যাচ্ছে। এই মেয়ে বড়ো হচ্ছে ঠিকই কিন্তু বুদ্ধি চিটফোটাও বারে নি। বয়সের সাথে সাথে যে বডিশেইপ ও চেঞ্জ হচ্ছে সেটা কি বোঝে না।

আঁখি! আঁখি….. কে ডাকে আমাকে আবার?
আঁখি… আরে এটাতো মনে হয় আয়াজ ভাইয়ার ডাক। ভয়ে ভয়ে পিছনে তাকাতেই আমার আত্মা কেঁপে উঠলো। কারণ আয়াজ ভাইয়া চোখ মুখ শক্ত করে এমন করে তাকিয়ে আছে, মনে হচ্ছে আমাকে ভষ্ম করার জন্য তার ওই লাল চোখই যথেষ্ট।

এখনি বাসায় আয়! নয়তো আমি নিচে নামলে তোর অবস্থা খারাপ করে ফেলবো। আমিও ভয়ে এক দৌড়ে বাসায়।
আমাকে এমন ভিজা গায়ে দেখে খালামনি বলে উঠলো, একি তোর এই অবস্থা কেন? তুই বাইরে গেলি কখন। আসলে খালামনি! থাক আর বলতে হবে না। নিশ্চয় খেলতে গিয়েছিস। হুম। যা তাড়াতাড়ি চেঞ্জ করে নে। নয়তো ঠান্ডা লেগে জ্বর বেধে যাবে।

আমি রুমে গিয়ে দরজা লক করে সামনে থাকাতেই কলিজা কেঁপে উঠলো। কারণ সামনে আর কেউ নয়, সয়ং আয়াজ ভাইয়া দাড়িয়ে আছে। এসেই আমাকে আমাকে টান দিয়ে দেয়ালের সাথে চেপে ধরে। আর বলে উঠলো কোন সাহসে এই শীতের দিনে তুই ভিজেছিস। জাহিদ আঙ্কেলের বাগান থেকে কুল চুরি করার সাহস কে দিয়েছে তোকে? এসব করার জন্য আজকে তুই স্কুলে যাসনি। রেগে চিৎকার করে কথা গুলো বলে উঠলো ভাইয়া। আমি ভয়ে ভয়ে বললাম সসসরি ভাইয়া আআর ককরবো না। সাট অাপ! আয়াজ ভাইয়ার ধমকে আমি লাফিয়ে উঠি। যাকে বলে এক প্রকার ক্যাঙ্গারু লাফ। ভয়ে রীতিমতো বুকের ভিতর ঢিপঢিপ করছে।

আয়াজ ভাইয়া একবার আমার পা থেকে মাথা অবধি চোখ বুলিয়ে নিলো। তারপর অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে কয়েকটা জোরে জোরে নিশ্বাস নিলো। আর বলল এই মূহুর্তে চেঞ্জ করে আয়। জাস্ট পাঁচ মিনিট সময়। আমিও মারলাম এক দৌড়। কারণ আয়াজ ভাইয়ার সামনে থেকে যেতে পারলেই যেনো আমি বাঁচি।

এই মেয়েটা আমার দম বন্ধ করেই ছাড়বে। মেয়েটা কেনো বোঝে না, এভাবে দেখলে আমি নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারি না।
চেঞ্জ হয়ে এসে খাটের এক কোণে মাথা নিচু করে দাড়িয়ে আছি। কারণ আয়াজ ভাইয়া এখনো যায় নি।

আর আয়াজ সেতো অপলক তাকিয়ে আছে আঁখির দিকে। কারণ ভিজা চুল, নাকে মুখে হালকা হালকা পানি, যেন আমার সামনে একটা ভেজা ফুটন্ত ফুল দাঁড়িয়ে আছে। আমি আস্তে আস্তে আঁখির দিকে এগিয়ে গেলাম। আয়াজ ভাইয়া কে এভাবে হঠাৎ আমার দিকে এগিয়ে আসতে দেখে আমি যেন ভড়কে গেলাম। ভাইয়া আমার সামনে এসে আমার কোমর জড়িয়ে দরে নিজের দিকে টেনে নেই। আয়াজ ভাইয়া আমার দিকে কেমন করে তাকিয়ে আছে। আয়াজ আস্তে আস্তে আঁখির দিকে ঝুঁকতে থাকে। আর আঁখির মুখের উপর একটা ফুঁ দিয়ে বলে উঠে, আজকের পর থেকে যেনো কোনো ছেলের সাথে মিশতে না দেখি গম্ভীর গলায় বলে উঠলো। আর বাইরে বের হলে লং কামিজ আর ওরনা পরে বের হবি। এসব টি-শার্ট, গেঞ্জি পড়ে বেরিয়েছিস তো নলা ভেঙে হাতে ধরিয়ে দিবো, রাগী গলায় আয়াজ বলে উঠলো। আমি মাথা নিচু করে চুপ করে আছি। আমাকে চুপ থাকতে দেখে ভাইয়া দিলো এক ধমক। কি হলো চুপ করে আছিস কেনো, কি বললাম শুনতে পাসনি। হুমম। হুম কী? আ আ আপনার কথা শশশুনবো।
এরপর আয়াজ বেরিয়ে গেলো। আর যাওয়ার সময় কাজের খালা রহিমা আন্টিকে বললাম, আন্টি আঁখিকে এক গ্লাস গরম দুধ দিয়ে আসুন। বলবেন আমি পাঠিয়েছি। না খেলে আমার কথা বলবেন। আর বলবেন একটা নাপা এক্সট্রা খেয়ে নিতে।

জ্বি বাবা..
আয়াজ ভাইয়া যেতেই রুমে দেখছি, রাঙা আন্টি এসেছে। উনাকে আমি ছোটো বেলা থেকেই রাঙা আন্টি বলে ডাকি। কিন্তু উনার হাতে দুধ দেখে মেজাজ গরম গেলো। উফফ রাঙা আন্টি এটা কি আনলা।
কেন, দুধ আইনসি। কিন্তু আমিতো তোমাকে দুধ আনতে বলি নি। ভ্রু কুঁচকে কাথাটা বলে উঠলাম।

রাঙা আন্টি একগাল হেসে বলল, আরে আমাকেতো আয়াজ বাবা পাঠাইসে। হে কইসে তোমারে যেনো দুধ দিয়া যায়। না খাইলে আয়াজ বাবারে কইয়া দিতে কইসে। এখন তুমি খাইবা নাকি আমি যামুগা।
থাক যেতে হবে না দেও। নাক চেপে ধরে এক চুমুকে দুধটা সাবার করে দিলাম।
নিন গ্লাসটা। রাঙা আন্টি গ্লাসটা নিয়ে যেতেই, আবার ফিরে আসলো, আর আমাকে বলল, ওহহো তোমারেতো আরেকখান কথা কইতে ভুলে গেসি।
কী?
আয়াজ বাবাজি কইলো, তোমারে কি নাপা এশটারা খাইতে কইসে।
উফফ রাঙা আন্টি এটা এশটারা না এক্সট্রা।
রাঙা আন্টি জ্বিহ্ব কামড়ে বলল সরি সরি। ভুল অয় গেসে।
বলো এক্স.. এস।
উফফ এস না এক্স.. ওকে কইতাসি এএকসসস.. তারপর বলো ট্রা!
টেরা… কী টেরা? বলেন ট্রা! টটটরা।
হুম এবার কি হলো। এক্সট্রা। দেখি বলেন আমার মুখে মুখে এক্স..ট্রা। এশশ.. টেরা
হোওওও হতাশ গলায়।
কি?
না কিছু না। তুমি যাও। এরপর গিয়ে মেডিসিন টা খেয়ে নিলাম। নয়তো আবার কপালে দুঃখ আছে।

এদিকে আয়াজ নিজের রুমে চলে গেলো। কারণ ওখানে আর বেশিক্ষণ থাকলে নিজেকে কন্ট্রোল করা অনেক কঠিন হয়ে যেতো।

নিজের রুমে গিয়ে কম্ফোর্ট চেয়ারে বসে চোখ দুটি বন্ধ করে পুরোনো দিনের কথাগুলো ভাবতে থাকে।
সময় তখন গ্রীষ্মকাল। বাইরে কাঠপোড়া রোদ। আমি তখন মাঠে খেলতে যায়। বিকেলে খেলাধুলা করে বাসায় ফিরার পথে দেখি বাগানে আম গাছটার নিচে কে যেন কান্না করছে। গিয়ে দেখি আঁখি! মাটিতে বসে বসে কান্না করছে। আমি দৌড়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, কী হয়েছে? কাঁদছিস কেন? তখন আঁখি তার বাম পাটা উঁচু করে আমাকে দেখালো। দেখলাম পায়ে বড় একটা কাঁটা বিঁধে গেছে। যার ফলে পাটা ভিষণ ক্ষত হয়। বেশিখানিকটা ব্লিডিং ও হয়েছে দেখছি। আমি বললাম দেখি পা টা আমাকে দে। আমি দেখছি। কাটা টা বের করতে হবে। কিন্তু মেয়েতো নাছোড়বান্দা, দিবে না সে। আমি কাটা বের করলে নাকি সে ব্যাথা পাবে। অনেকক্ষণ সাদার পরও দেখছি গলছে না। তাই আমি ভাবলাম নাহ, এভাবে হবে না। তাই জোর করে পা টা নিয়ে কাঁটাটা বের করে ফেললাম। বাপরে বাপ সে কি কান্না। আমার চুল ছিড়ে, খামচে রাখে নি।এরপর কোলে করে নিয়ে বাসায় এনে পাটা ড্রেসিং করে দিলাম।

সেদিন বাসায় হাসান রহমান আর নুরী রহমান ও ছিলেন। তারাও সেদিন একটা কাজে এসেছিলো। যেটা আমি তখন ও জানতে পারি নি। আসলে আমার আম্মু আব্বু আর ছোটো আন্টি আঙ্কেল আমাদের ছোটো বেলা থেকে বিয়ে ঠিক করে রেখেছিল। কারণ ছোটো আন্টি যখন প্রেগন্যান্ট ছিলো, তখন আমার আম্মু বলেছিল তোর যদি মেয়ে হয়, তাহলে আমার আয়াজের জন্য বউ করে আনবো। তোর কোনো আপত্তি থাকবে। না আপু আমার আপত্তি কেনো থাকবে, এটাতো আরো খুশির খবর। আমি জানি আমার মেয়ে আমার থেকে ও তোমার কাছে বেশি আদরে থাকবে।

তাদের এই বোনে বোনে সিদ্ধান্ত তাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও, দিন দিন আঁখির প্রতি আমার পাগলামো গুলো দেখে তারা ভাবলো ছোটো কালেই আমার আর আঁখির বিয়ে দিবে। তখন আমার বয়স ছিলো বারো বছর। আর আঁখির বয়স মাত্র চার বছর। আমার সবকিছু সুস্পষ্ট মনে থাকলেও আঁখির তখনকার কথা কিছুই মনে নেই। সেদিন আমাদের কবুল বলে দুই হাত এক করে দেয়। কাগজে কলমে আমার বউ না হলেও সেদিন ইসলামিক ভাবে আমরা এক সুতোয় বাঁধা পড়ে যায়।

আঁখি খুব ছোট থাকায় আঁখির সেদিনের বিয়ের কথা কিছুই মনে নেয়। কিন্তু আমার সব মনে আছে। কারণ তুইতো বিয়ে মানে কি সেটাই বুঝতিস না। যখন তোকে কবুল বলতে বলা হয় তখন তুই গটগট করে কবুল বলে দিয়েছিস। তোর কবুল বলা দেখে সবাই অট্টহাসিতে মেতে উঠেছিল।

এখন শুধু তুই বড়ো হওয়ার পালা। এখনো তুই অনেকটা ছোট। তাই যথাসম্ভব নিজেকে তোর থেকে দূরে রাখি। আর একটু বড়ো হ, তারপর তোকে সারাজীবনের জন্য নিজের করে নিবো। আমার মন পিঞ্জিরায় একেবারে সারাজীবনের জন্য বন্দী করে রাখবো।

দুপুরের আযানের শব্দে ধ্যান থেকে ফিরে আসলাম। উঠে নামায আদায় করে নিলাম। তারপর নিচে লাঞ্চ করতে নামলাম। কিন্তু নিচে….
চলবে