#Out_Of_Bounds
#Ishrat_Jahan_Jarin
#part_4
বোস্টনের রাতের হাইওয়েতে তখন নিয়ন আলোর মেলা, কিন্তু ডার্ক ক্রিমসন রঙের রোলস রয়েসের ভেতরের আবহাওয়াটা মেরু অঞ্চলের চেয়েও শীতল। গাড়ির ড্যাশবোর্ডে সচল থাকা ডিজিটাল হিটারটা কেবিনটাকে গরম রাখলেও, দুই আরোহীর মধ্যকার মানসিক দূরত্বে বরফ জমেছে। জ্যাক্সন মিলার অত্যন্ত উগ্রভাবে গাড়ি ড্রাইভ করছে। স্টিয়ারিং হুইলের চামড়ার আবরণের ওপর তার ডান হাতের শক্ত শিরাগুলো রাগে এবং ভেতরের উত্তেজনায় টানটান হয়ে ফুলে উঠেছে। তার চোয়ালের হাড় শক্ত। ড্যাশবোর্ডে খুব নিচু ভলিউমে বাজছে চপিনের একটি ডার্ক পিয়ানো কনসার্টো। সেই বিষণ্ণ সুর যেন কেবিনের ভেতরের নিস্তব্ধতাকে আরও রহস্যময় করে তুলছিল। ক্লারা বেনেট জানালার বাইরে তুষারঝরা বোস্টনের রাতের দিকে মুখ ঘুরিয়ে বসে আছে। চোখ দুটো তার অপমানে আর রাগে জ্বলছে। হুট করেই জ্যাক এক্সিলারেটরে চাপ বাড়িয়ে দিল। স্পীডোমিটারের কাঁটা এক ধাক্কায় ১০০ মাইল পার আওয়ার পার হয়ে গেল। ইঞ্জিনের গর্জন কেবিনের ভেতরেও টের পাওয়া যাচ্ছে। ক্লারা সিটের হাতলটা দুই হাতে শক্ত করে ধরে আতঙ্কে চেঁচিয়ে উঠল, “গাড়ির স্পীড কমান, মিস্টার ডাম্পস্টার! আপনি কি পাগল হয়ে গেছেন? এভাবে ড্রাইভ করলে আমরা অ্যাক্সিডেন্ট করব!”
জ্যাক কোনো কথা বলল না। তার ধূসর চোখ দুটো সোজা রাস্তার দিকে নিবদ্ধ ছিল। কিন্তু ঠিক পরের মুহূর্তে, সে হাইওয়ের এক নির্জন পাশে গাড়িটা এক ভয়ংকর ঝটকায় ব্রেক কষে থামিয়ে দিল। টায়ারের কর্কশ ঘর্ষণের শব্দে পুরো গাড়িটা কেঁপে উঠল। ক্লারা সিটবেল্ট পরা না থাকলে হয়তো উইন্ডশিল্ডের সাথে ধাক্কা খেত। সে নিজেকে সামলে নিয়ে কিছু বলার সুযোগ পাওয়ার আগেই, জ্যাক নিজের সিটবেল্ট খুলে এক সেকেন্ডের ভগ্নাংশে ক্লারার দিকে ঝুঁকে এল। জ্যাকের চওড়া শরীরটা ক্লারার ওপর এমন ভাবে ঝুঁকে এল যে ক্লারা পেছনের লেদার সিটের সাথে একদম লেপ্টে যেতে বাধ্য হলো। তার পালানোর কোনো পথ নেই। ক্লারা সোজা হয়ে বসার ব্যর্থ চেষ্টা করে চেঁচিয়ে উঠল, “আপনার সমস্যা কী বলুন তো? গাড়ি থামালেন কেন?”
জ্যাকের একটা ভারী হাত এক ঝটকায় ক্লারার সিটের ঠিক পেছনে জানালার কাচের ওপর গিয়ে আছড়ে পড়ল, যা তার যাওয়ার পথ পুরোপুরি ব্লক করে দিল। অন্য হাতটা দিয়ে সে ক্লারার সোয়েটারের কলারটা আঙুলে পেঁচিয়ে ধরে তার মুখটা নিজের মুখের অত্যন্ত কাছাকাছি টেনে নিল। তাদের মাঝখানের দূরত্ব এখন মাত্র কয়েক মিলিমিটার। জ্যাকের ঠোঁট থেকে নির্গত হওয়া গরম, ভারী বাতাস ক্লারার কাঁপা ঠোঁটে এসে বিঁধছে। জ্যাক খুব শান্ত কিন্তু কর্কশ গলায় বলল, “আমার সমস্যা কী, সেটা তোমার ওই তীক্ষ্ণ মগজ খুব ভালো করেই জানে, মিস ক্যালকুলেটর। সকালে ওই থার্ড ক্লাস ছেলেটার টেবিলে বসে বড্ড হাসিমুখে চকোলেট মাফিন খাওয়া হচ্ছিল, তাই না?”
ক্লারা রাগে, অপমানে আর এক অজানা ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বলল, “আমি কার সাথে মাফিন খাব আর কার সাথে হাসব, সেটা আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার। আমি আপনার কোনো জিনিস নই! নিজের সম্পত্তির ডিকশনারি থেকে আমার নামটা বাদ দিন!”
জ্যাকের ধূসর চোখ দুটো এই ঘুটঘুটে অন্ধকারে কোনো হিংস্র শিকারী পশুর মতো জ্বলজ্বল করছে। সে তার হাতের দীর্ঘ আঙুলগুলো দিয়ে ক্লারার নাকের ওপর থাকা চশমাটা আলতো করে একটু নিচে নামিয়ে দিল, যাতে সরাসরি ক্লারার নীল চোখের গভীরে তাকানো যায়। সে বুড়ো আঙুল দিয়ে ক্লারার নিচের ঠোঁটটা একটু চেপে ধরল। অত্যন্ত কর্তৃত্বপূর্ণ গলায় সে বলল, “ভুল বলছ, ক্লারা। তুমি আমারই। তোমার এই অবাধ্য মন, তোমার এই ক্ষুরধার মেধা, আর তোমার এই শরীর সবকিছুর ওপর এখন শুধু আমার হুকুম চলবে। আমি খুব খারাপ ধাঁচের মানুষ। আমি যা চাই, তা জোর করে, আদায় করে নিতে ভালোবাসি। সো, নেক্সট টাইম ওই মার্কাস বা অন্য কোনো ছেলের আশেপাশেও যদি তোমাকে দেখি, তবে ওর ক্যারিয়ার আমি এই ইউনিভার্সিটি থেকে চিরকালের মতো ডিলিট করে দেব। মনে থাকবে?”
ক্লারা ফুসে উঠল, “আপনি নিজেকে কি ভাবেন বলুন তো? সব কিনে নিয়েছেন?
জ্যাক সামান্য হাসল। সেই হাসিতে কোনো মমতা নেই। সে বলল, “তুমি ভালো করেই জানো আমি কি?
আর হ্যাঁ, তোমাকে ভালোবাসি, পছন্দ করি এসব সস্তা ফ্যান্টাসি মনে জায়গা দিও না। প্রজেক্ট শেষ হলে আমরা আমাদের পথে চলে যাব। কিন্তু এখন আমার সাথে প্রজেক্টে আছো মানে আমি বসতে বললে বসবে, শুতে বললে শুবে।”
ক্লারা অবাক হয়ে বলল, “মানে? শুবো মানে? আপনার লজ্জা করে না একটা মেয়ের সাথে এভাবে কথা বলতে?”
জ্যাকের চোখ দুটো এক মুহূর্তের জন্য বিপজ্জনকভাবে চকচক করে উঠল। সে বলল, “মানে যদি বলি রাস্তার মাঝে গাড়ির সামনে শুয়ে পড়ো, তাহলে শুয়ে পড়বে। কোনো প্রশ্ন করবে না। ব্যাস।”
ক্লারা নিজের দুই হাত দিয়ে জ্যাকের চওড়া বুকটা ধাক্কা দেওয়ার চেষ্টা করল, “সরুন আমার ওপর থেকে! আপনার শরীর থেকে পশুর গন্ধ আসছে।”
“পশু?” জ্যাকের ঠোঁটের কোণের হাসিটা আরও চওড়া হলো। “পশুরা তো অনেক ভদ্র হয়, ক্লারা। তারা শুধু শিকার করে। কিন্তু আমি শিকারকে খেলনা বানিয়ে খেলতে ভালোবাসি। আমি তোমাকে সহজে ছাড়ছি না। আমি তোমাকে রোজ একটু একটু করে বুঝিয়ে দিব তুমি কার সাথে লড়াইয়ে নেমেছো? সেদিন মুখের ভাষা আর আচরণ ঠিক রাখলে হয়তো দয়ামায়া করে আমার সাথে এক রাত কাটাতে অবশ্যই দিতাম। কারণ জ্যাক মিলার অত্যন্ত দয়াশীল। আমার এক রাতের দয়ায় তুমি এই দুনিয়ার নরক থেকে মুক্তি পেয়ে স্বর্গে চলে যেতে পারতে। রাতারাতি জীবন বদলে যেত। এখন স্বর্গ তো হারালেই আমার সাথে পাঙ্গা নিয়ে, এবার নরকের সর্বনিম্নে স্তরে তোমাকে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব আমার।”
ক্লারা জেদি গলায় বলল, “আমি আপনার এই নোংরা খেলা খেলব না। কালই আমি ডিন মরিসনের কাছে গিয়ে আপনার নামে কমপ্লেন করব। বলব আপনি আমাকে ব্ল্যাকমেইল করছেন।”
জ্যাক এবার তার ঠোঁট দুটো ক্লারার কানের খুব কাছে নিয়ে গেল। অত্যন্ত নিচু স্বরে ফিসফিস করে বলল, “চেষ্টা করে দেখতে পারো, ডার্লিং। কিন্তু মনে রেখো, ডিন মরিসন অভিযোগ শোনার আগেই হয়তো তোমার অনাথ আশ্রমের ফান্ডিং বন্ধ হয়ে যাবে। তখন জার্মানির সেই ছোট্ট শান্ত শহরটার এতিম বাচ্চাদের দায়ভার কে নেবে? তুমি? যে সারাদিন এদিক-ওদিক পার্ট টাইম জবের জন্য ঘুরে?”
ক্লারা নিথর হয়ে গেল। তার চোখ দুটো জলে ভরে উঠল, কিন্তু সে কান্নাটা গিলে ফেলল। সে নিজেকে ভেঙে পড়তে দেবে না। সে হিসহিস করে বলল, “আপনি একটা আস্ত শয়তান, জ্যাক্সন মিলার।”
জ্যাক সোজা হয়ে বসল। তার মুখে আবার সেই নিস্পৃহ ভাব ফিরে এসেছে। সে বলল, “ধন্যবাদ। প্রশংসাটা আমার ভালো লাগল।”
ক্লারা দরজার হাতলটা স্পর্শ করার আগেই জ্যাক তার ড্যাশবোর্ডের সেন্ট্রাল রিমোট দিয়ে দরজার লকটা আটকে দিল। একটা নিরেট শব্দে দরজাগুলো বন্ধ হয়ে গেল। বাইরের কনকনে শীতের রাতটাকে যেন এক লহমায় ঘরের ওপাশে নির্বাসনে পাঠিয়ে দেওয়া হলো। ক্লারা অত্যন্ত বিরক্ত হয়ে ঘুরে তাকাল। তার ফরসা কপালে রাগের সূক্ষ্ম রেখাগুলো কুঁচকে উঠেছে। সে বলল, “লক খুলুন, মিস্টার ডাম্পস্টার! আমার রুমে যেতে হবে। কাল সকাল সকাল আমার অ্যাসাইনমেন্ট সাবমিট করার ডেডলাইন আছে। অকারণ সময় নষ্ট করার মতো ফালতু বিলাসিতা আমার নেই।”
জ্যাক স্টিয়ারিং হুইলের ওপর নিজের লম্বা আঙুলগুলো দিয়ে অলস ভঙ্গিতে একটা নির্দিষ্ট ছন্দ ঠুকতে লাগল। সে ক্লারার দিকে তাকালও না। যেন পাশে কোনো রক্ত-মাংসের মানুষ নেই, কেবল তার নিজের খেয়ালের একটা পুতুল বসে আছে। সে উইন্ডশিল্ডের দিকে তাকিয়েই খুব ঠান্ডা গলায় বলল বলল, “আমি এখনো তোমাকে যাওয়ার পারমিশন দিইনি, মিস ক্যালকুলেটর। আমার হুকুম এখনো শেষ হয়নি।”
ক্লারা জেদি গলায় বলল, “আপনার হুকুম শোনার জন্য আমি বাধ্য নই। দরজাটা খুলুন।”
“বাধ্য নও?” জ্যাক এবার খুব ধীরলয়ে ক্লারার দিকে ফিরল। তার ধূসর চোখ দুটো ছোট হয়ে এল। “তুমি বড্ড অবুঝ, ক্লারা। দুনিয়ার নিয়মগুলো এখনো তোমার সস্তা চশমাটার আড়ালে ঢাকা পড়ে আছে। তুমি চাও বা না চাও, তুমি আমার নিয়মের ভেতর ঢুকে গেছ।”
সে খুব শীতল গলায় বলল, “কাল বিকেল তিনটেয় ইউনিভার্সিটির মেইন ইনডোর স্টেডিয়ামে বাস্কেটবল টিমের এই সিজনের সবচেয়ে বড় ম্যাচ। ফাইনাল ম্যাচ। ভিআইপি গ্যালারির একদম প্রথম সারির সাত নম্বর সিটটা তোমার জন্য বুক করা আছে। ঠিক তিনটে বেজে পাঁচ মিনিটে আমি যখন কোর্টে ওয়ার্ম-আপের জন্য নামব, আমার চোখ যেন তোমাকে ওই নির্দিষ্ট সিটেই বসে থাকতে দেখে।”
ক্লারা সিটে সোজা হয়ে বসে নিজের ব্যাগটা বুকের সাথে আরও শক্ত করে আঁকড়ে ধরল। নিজেকে শক্ত দেখানোর একটা মরিয়া চেষ্টা করে বলল, “আমি কোনোভাবেই যাব না। আমার কাল বিকেল চারটেয় প্রফেসর রিচার্ডসনের ল্যাব অ্যাসাইনমেন্টের ডেটা ক্লিনিং আছে। আপনার বাস্কেটবল ম্যাচ দেখার মতো ফালতু সময় আমার নেই। খেলাধুলা আমার পছন্দ না, আর আপনাকে তো আরও না।”
জ্যাকের ঠোঁটের কোণে একটা বিষাক্ত হাসির রেখা ফুটে উঠল। সে একটু ঝুঁকে এসে বলল, “না আসলে কী হতে পারে, সেটা তো তোমার ভালো করেই জানা আছে, ক্লারা। জার্মানির সেই সেন্ট মার্থা অনাথ আশ্রমের ল্যান্ড লিজের অরিজিনাল পেপারসগুলো এখনো আমার পার্সোনাল ল্যাপটপের একটা ডার্ক ফোল্ডারে সেভ করা আছে। আমার জাস্ট একটা ক্লিক বা একটা মেসেজ লাগবে ওটা ডিলিট করতে। ওই এতিম বাচ্চাগুলো রাস্তায় গিয়ে দাঁড়াবে। চয়েস ইজ ইয়োরস। তুমি কাল গ্যালারিতে আসবে, আর পুরো ম্যাচ জুড়ে তোমার ওই নীল চোখ দুটো দিয়ে শুধু আমার দিকেই তাকিয়ে থাকবে। এটাই আমার অর্ডার। কোনো এক্সকিউজ আমি শুনব না।”
ক্লারা রাগে ও অপমানে কাঁপতে কাঁপতে বলল, “আপনি এত নিচু মনের মানুষ? একটা অনাথ আশ্রমের বাচ্চাদের ভয় দেখিয়ে আপনি আনন্দ পান?”
“আনন্দ?” জ্যাকের ভুরু জোড়া হালকা কুঁচকে গেল। “না, আনন্দ পাই না। তবে আমার খেয়াল পূর্ণ করতে যেকোনো সীমা পার করতে আমার দ্বিধা হয় না। তুমি কাল আসবে।”
“যদি না আসি?”
জ্যাক তার দিকে একপলক তাকাল। তার চোখে তখন কুৎসিত এক স্থির জেদ। সে বলল, “না আসলে আমি কাল কোর্টে নামব না। আমাদের টিম হারবে। আর সেই হারের দায়ভার নিয়ে ইউনিভার্সিটির ট্রাস্টি বোর্ড তোমার স্কলারশিপটা বাতিল করবে। মাত্র এক সেকেন্ড লাগবে আমার বাবার সেই ক্ষমতাটা খাটাতে। সো, কাল তুমি আসছ। এবার যাও।”
জ্যাক আর কথা বাড়াল না। সে অলস ভঙ্গিতে আঙুল বাড়িয়ে খট করে সেন্ট্রাল লকটা খুলে দিল। ক্লারা আর এক সেকেন্ডও সেখানে দাঁড়াল না। সে প্রায় এক ঝটকায় গাড়ির দরজা খুলে কনকনে তুষারপাতের মধ্যেই প্রায় ছুটে ডর্মের করিডোরের দিকে চলে গেল। তুষারের ঠাণ্ডা কণাগুলো তার মুখে এসে পড়ছে, কিন্তু তার ভেতরের অপমানের আগুন নেভাতে পারছিল না। নিজের রুমে ঢুকে সে ভারী ওক কাঠের দরজায় পিঠ দিয়ে দাঁড়িয়ে অন্ধকারে জোরে জোরে হাঁপাতে লাগল। পুরো ঘরটা নিঝুম। কেবল তার নিজের নিঃশ্বাসের শব্দ শোনা যাচ্ছে। সে কপালে হাত দিল। তার গাল দুটো তখনো জ্যাকের আঙুলের সেই অবাধ্য ছোঁয়ায় রীতিমতো গরম হয়ে আছে। চামড়ার ওপর যেন একটা অদৃশ্য দাগ রেখে গেছে ওই শয়তানটা। আর বুকের ভেতরের হৃদস্পন্দনটা কোনোভাবেই স্বাভাবিক হতে পারছে না। সে নিজের হাত দুটো মুঠো করল। তার চোখ দিয়ে এবার আর জল পড়ল না, সেখানে জমা হলো তীব্র জেদ। কিন্তু মনের অবচল অংশটা তাকে ফিসফিস করে মনে করিয়ে দিল, এই গোল্ডেন বয় তাকে আস্তে আস্তে করে দমবন্ধ করা জালের গভীরে বন্দি করে ফেলছে, যেখান থেকে বের হওয়ার কোনো সুতো সে খুঁজে পাচ্ছে না। শিকারীর জালে পাখিটা আটকা পড়ে গেছে, এখন কেবল ডানা ঝাপটানোর অপেক্ষা।
–
পরদিন বিকেল তিনটে। ইউনিভার্সিটির সেন্ট্রাল ইনডোর স্টেডিয়ামে আজ যেন তিল ধারণের জায়গা নেই। মানুষের মাথার সমুদ্র। পুরো স্টেডিয়াম জুড়ে ড্রামের কানফাটানো আওয়াজ, ব্যান্ড পার্টির ড্রামবিট আর ‘টিম নম্বর সেভেন’-এর লাল-সোনালী ব্যানার-ফেস্টুনের ছড়াছড়ি। স্পিকারগুলোতে হাই-বেস রক মিউজিক বাজছে, যার কম্পন সরাসরি বুকের খাঁচায় এসে আঘাত করছে। গ্যালারিতে বসা হাজার হাজার ছাত্রছাত্রী চিৎকার করে স্টেডিয়ামের ছাদ কাঁপিয়ে তুলছে। মানুষের এই সম্মিলিত চিৎকারকে উল্লাস বলা চলে। ক্লারা বেনেট বাধ্য হয়েই এসে বসেছে প্রথম সারির সেই নির্দিষ্ট সাত নম্বর সিটটায়। তার পরনে একটা সাদা রঙের সাধারণ ঢিলেঢালা হুডি, চোখে তার সেই চেনা চশমা। সে তার চারপাশের এই কানফাটানো উন্মাদনা আর চিৎকারের পরিবেশ বিন্দুমাত্র পছন্দ করছে না। তার কাছে এই উন্মাদনাকে আদিখ্যেতা বলে মনে হচ্ছে। সে তার কোলের ওপর একটা ছোট নোটবুক খুলে জোর করে নিজের মন বসানোর চেষ্টা করছে। সংখ্যা আর সূত্রের জটিল হিসেবে ডুবে গিয়ে সে চারপাশের এই কোলাহল থেকে বাঁচতে চায়। কিন্তু মানুষের অবচেতন মন বড্ড অদ্ভুত জিনিস, তা যা এড়াতে চায়, বারবার সেদিকেই ছুটে যায়। ক্লারার অবচেতন মনও বারবার নোটবুকের পাতা এড়িয়ে স্টেডিয়ামের বিশাল ডিজিটাল ঘড়িটার দিকে তাকাচ্ছিল। ঠিক তিনটে বেজে পাঁচ মিনিট। স্টেডিয়ামের মেইন ফ্লাডলাইটগুলো একযোগে জ্বলে উঠল। এক তীব্র হলদে-সাদা আলোয় ধুয়ে গেল পুরো বাস্কেটবল কোর্ট। ঠিক তখনই মেইন করিডোরের অন্ধকার চিরে হুঙ্কার দিয়ে মাঠে ঢুকল নর্থইস্টার্ন ইউনিভার্সিটির বাস্কেটবল টিম। আর সবার সামনে ময়াল সাপের মতো চটপটে আর চিতাবাঘের মতো ক্ষিপ্র গতিতে হেঁটে আসছে তাদের দলনেতা এবং ইউনিভার্সিটির সবচেয়ে বড় ইনফ্লুয়েন্সিয়াল আইকন জ্যাক্সন মিলার। তার পরনে ডার্ক ক্রিমসন আর গোল্ডেন কম্বিনেশনের সাত নম্বর জার্সি। তার চওড়া কাঁধ, বাস্কেটবল ড্রিবল করার কারণে তার হাতের কাঁপতে থাকা শক্ত পেশি, কপালে জমে থাকা ঘামের সূক্ষ্ম কণা আর সেই অবিন্যস্ত চুল গ্যালারির মেয়েদের উন্মাদনা এক ধাক্কায় আরও একশ গুণ বাড়িয়ে দিল। পুরো স্টেডিয়াম একযোগে গর্জে উঠল, “জ্যাক! জ্যাক! জ্যাক! মিলার!” ক্লারা চশমার ফাঁক দিয়ে তাকাল। তার মনে হলো, জগতের সমস্ত আলো আর মনোযোগ যেন এই একটা মানুষের ওপর এসে পড়েছে। একেই বোধহয় বলে রাজকীয় উপস্থিতি।
জ্যাক মাঠে পা দিয়েই কিন্তু তার হাতের বলটার দিকে তাকাল না, বা ওনারে বসে থাকা কোচ কিংবা ট্রাস্টি মেম্বারদের দিকেও গেল না। সে প্রথম পদক্ষেপেই তার তীক্ষ্ণ, ধূসর চোখ দুটো দিয়ে সোজা তাকাল ভিআইপি গ্যালারির প্রথম সারির দিকে। সেখানে একদম ঠিক সময়ে, ঠিক সিটে ক্লারাকে বসে থাকতে দেখে তার ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ফুটে উঠল। সে সবার সামনে, পুরো স্টেডিয়ামের ডজন খানেক ক্যামেরা আর হাজারো চোখের তোয়াক্কা না করে সরাসরি ক্লারার দিকে চাইল। তারপর খুব ধীরলয়ে নিজের ডান হাতের দুটো আঙুল কপালে ঠেকিয়ে একটা স্যালুট দেওয়ার মতো ভঙ্গি করল এবং ঠোঁট নাড়িয়ে নিঃশব্দে ফিসফিস করে বলল,
“গুড গার্ল।” বাতাসের তো কোনো ভাষা নেই, কিন্তু ক্লারার মনে হলো সেই বাতাস জ্যাকের ঠোঁটের এই দুটো শব্দ তার কানে এনে পৌঁছে দিল। ক্লারা তীব্র ঘৃণায় আর লজ্জায় চট করে মুখ ফিরিয়ে নিল। তার ফর্সা গাল দুটো মুহূর্তের মধ্যে অপমানের তীব্রতায় লাল হয়ে উঠল। সে মনে মনে বলল, ‘শয়তান! একটা আস্ত শয়তান!’ কিন্তু খেলা শুরু হতেই জ্যাকের সেই রুদ্র এবং বন্য রূপ দেখে সে চাইলেও নিজের চোখ সরাতে পারছিল না। বিপক্ষ দলের প্লেয়াররা জ্যাকের সেই দীর্ঘ অবয়ব আর ক্ষিপ্র গতির সামনে তাকে ছোঁয়ার সাহস পাচ্ছে না। সে যখনই বল হাতে নিচ্ছে বাতাসের বুক চিরে তীরের মতো ছুটে গিয়ে বাস্কেটে ছুড়ে দিচ্ছে। প্রতিটা শটে পয়েন্ট আসছে আর স্টেডিয়াম কাঁপিয়ে শব্দ হচ্ছে। খেলার দ্বিতীয় কোয়ার্টারে, একটা দুর্দান্ত রিবাউন্ড বল ধরে জ্যাক একাই পুরো ডিফেন্স ভেঙে লাফিয়ে উঠল। সে বাতাসের মধ্যে যেন এক সেকেন্ডের জন্য মাধ্যাকর্ষণকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ভেসে রইল এবং এক ভয়ংকর ডঙ্ক শট দিয়ে বাস্কেটের লোহার রিংটা ধরে ঝুলে রইল। পুরো স্টেডিয়াম তখন উন্মাদনায় ফেটে পড়েছে। কিন্তু জ্যাক রিং ধরে ঝুলে থাকা অবস্থাতেই, কোনোদিকে না তাকিয়ে সরাসরি নিচের দিকে ক্লারার চোখের দিকে তাকাল। তার ঠোঁটে বন্য হাসি। সেই চাহনিটা যেন পুরো স্টেডিয়ামের সামনে ক্লারাকে উদ্দেশ্য করে মনে করিয়ে দেওয়া,
“দেখো ক্লারা, এই পুরো রাজত্ব আমার ইশারায় চলে। এই হাজার হাজার মানুষ আমার পায়ের নিচে। আর তুমিও আমার এই ক্ষমতার খাঁচাতেই বন্দি। তোমার পালানোর কোনো পথ নেই।” ক্লারা নোটবুকটা এত জোরে চেপে ধরল যে তার হাতের আঙুলগুলো সাদা হয়ে গেল। সে বুঝতে পারছিল, জ্যাক তাকে শুধু ভয় দেখাচ্ছে না, সে তাকে আস্তে আস্তে তার এই অন্ধকার জগতের এক বাধ্য দর্শক বানিয়ে তুলছে।
–
ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজল। পুরো স্টেডিয়াম যেন একটা জীবন্ত আগ্নেয়গিরির মতো ফেটে পড়ল। নর্থইস্টার্নের জয় হয়েছে। গ্যালারির হাজার হাজার মানুষ মাঠের দিকে ছুটে যাচ্ছে। ট্রফি প্রেজেন্টেশনের জন্য সবাই যখন কোর্টের মাঝখানে নেমে জ্যাককে চারপাশ থেকে ঘিরে ধরে উল্লাস করছে, ক্লারা তখন আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না। সে নিজের ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে ভিড় ঠেলে পেছনের করিডোর দিয়ে দ্রুত বের হয়ে গেল। এই দমবন্ধ করা কোলাহল তার সহ্য হচ্ছে না। আর সবচেয়ে বেশি অসহ্য লাগছে জ্যাকের ওই শেষ চাউনিটা। সে স্টেডিয়ামের পেছনের অন্ধকার লবি আর প্লেয়ারদের এক্সিট করিডোরটা দিয়ে হন্তদন্ত হয়ে হেঁটে যাচ্ছিল। চারপাশটা বেশ নির্জন। হঠাৎ করেই পেছন থেকে একটা শক্ত, চওড়া হাত এসে এক ঝটকায় তার কোমর জড়িয়ে ধরল। ক্লারা কিছু বুঝে ওঠার আগেই তাকে পাশের একটা অন্ধকার ডাবল-ডোর কেবিনের ভেতরে টেনে নেওয়া হলো। সে আতঙ্কে চিৎকার করতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার আগেই একটা বড়, গরম হাত তার মুখের ওপর চেপে বসল।
কেবিনের দরজাটা বন্ধ হয়ে গেল। মেটালিক লকের একটা ভারী শব্দ হলো। ঘরটা পুরোপুরি অন্ধকার। শুধু জানালার ওপার থেকে আসা স্টেডিয়ামের ফ্লাডলাইটের একটা ক্ষীণ আলো এসে দেয়ালে পড়েছে। সেই আবছা আলোয় ক্লারা দেখতে পেল তার একদম সামনাসামনি দেয়ালের সাথে তাকে চেপে ধরে দাঁড়িয়ে আছে জ্যাক্সন মিলার। সে এখনো খেলার জার্সি আর শর্টসটাই পরে আছে। ম্যাচ শেষ করেই সে সোজা এখানে চলে এসেছে। তার শরীর থেকে টপটপ করে ঘাম ঝরছে। ঘামের নোনতা গন্ধের সাথে মিশে আছে তার সেই ব্ল্যাক ওডের তীব্র সুগন্ধ। ঘাম আর পারফিউমের এই কড়া মিশ্রণ পুরো ছোট কেবিনের বাতাসে তীব্র পুরুষালি মাদকতা তৈরি করেছে। ক্লারার মাথাটা ঝিমঝিম করে উঠল। জ্যাক ক্লারার মুখ থেকে হাতটা সরাল না। তাকে দেয়ালের সাথে আরও শক্ত করে চেপে ধরল। ক্লারা তার হুডির ওপরেও স্পষ্ট অনুভব করতে পারছিল জ্যাকের বুকের দ্রুত ও অনিয়মিত ওঠা-নামা। জ্যাক তার মুখের খুব কাছে নিজের মুখটা নামিয়ে আনল। তার ঠোঁট ক্লারার কানের লতি ছুঁয়ে গেল। সে অত্যন্ত নিচু স্বরে ফিসফিস করে বলল, “কোথায় পালিয়ে যাচ্ছো, মিস ক্যালকুলেটর? আমি তো তোমাকে ম্যাচ শেষ হওয়ার আগে যাওয়ার পারমিশন দিইনি।”
ক্লারা কথা বলার চেষ্টা করল, কিন্তু মুখে হাত চাপা থাকায় শুধু একটা অস্ফুট শব্দ হলো। জ্যাক হাসল। বলল, “আমার হুকুম অমান্য করার সাহস আবার কোথা থেকে হলো তোমার? আর তাছাড়া… আমি ম্যাচ জেতার পর আমার রিওয়ার্ডটা কে দেবে?”
ক্লারা কোনোমতে নিজের মুখটা মুক্ত করার জন্য জ্যাকের হাতের তালুতে দাঁত দিয়ে সজোরে কামড়ে দিল। জ্যাক সামান্য একটা শব্দ করে হাতটা সরিয়ে নিল ঠিকই, কিন্তু তার পরের মুহূর্তেই সে তার অন্য হাতটা দিয়ে ক্লারার দুটো দুর্বল হাত এক মুঠোয় এনে দেয়ালের সাথে মাথার ওপর শক্ত করে চেপে ধরল। তার এই অতিরিক্ত রুড আচরণ ক্লারার সমস্ত শরীরকে এক মুহূর্তে অবশ করে দিচ্ছে। তার হার্টবিট আবার সেই বন্য গতিতে ছুটতে শুরু করল। ক্লারা রাগে আর অপমানে ফুঁসে উঠে বলল, “ছাড়ুন আমাকে! আপনি একটা জানোয়ার, মিস্টার ডাম্পস্টার! আপনি কোনো মানুষ নন!”
জ্যাক অন্ধকারের মধ্যেই একটু হাসল। বলল, “আমি তো আগেই বলেছি ক্লারা, আমি জানোয়ারই। বিশেষ করে তোমার মতো একগুঁয়ে আর জেদী মেয়েদের সামনে আমি নিজের ভেতরের জানোয়ারটাকে কন্ট্রোল করতে পারি না। তুমি যত ছটফট করবে, আমার তোমাকে আরও শক্ত করে ধরতে ইচ্ছে করবে।”
“আপনার কি কোনো লজ্জা নেই?”
“লজ্জা? ওটা দুর্বলদের জন্য।” জ্যাকের সেই ধূসর চোখ দুটো অন্ধকারে ক্লারার কাঁপতে থাকা ঠোঁটের দিকে নেমে এল। সে খুব ধীর গলায় বলল, “এখন সোজা আমার সাথে পার্কিং লটে যাবে, আর ওখান থেকে আমার পেন্টহাউসে। আমাদের ফিনান্সিয়াল প্রজেক্টের পরবর্তী পার্টটা আজ রাতেই আমার বেডরুমে বসে শেষ করতে হবে। আর ওটাই আমার শেষ হুকুম।”
ক্লারা তীক্ষ্ণ গলায় বলল, “আমি যাব না। আপনার বেডরুমে যাওয়ার কোনো প্রশ্নই আসে না।”
জ্যাকের মুখটা আরও কাছে চলে এল। সে বলল, “যাবে, ক্লারা। তুমি নিজে পায়ে হেঁটে যাবে। কারণ তুমি ভালো করেই জানো, আমার হুকুম অমান্য করলে কাল সকালে তোমার ওই সাধের অনাথ আশ্রমের বাচ্চারা রাস্তায় এসে দাঁড়াবে। তুমি কি সেটা চাও?”
ক্লারা নিথর হয়ে গেল। তার চোখের কোণ বেয়ে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল। সে ফিসফিস করে বলল, “আপনি বড্ড নিষ্ঠুর, জ্যাক।”
জ্যাক তার চোখের জলটা নিজের বুড়ো আঙুল দিয়ে মুছে দিল। বলল, “আমি জানি। এবার চলো।”
[চলবে…]

