Home "ধারাবাহিক গল্প "Out Of Bounds Out Of Bounds পর্ব-১১+১২

Out Of Bounds পর্ব-১১+১২

0
7

#Out_Of_Bounds
#Ishrat_Jahan_Jarin
#part_11 (১ম অংশ)

মানুষের জীবনটা বড্ড অদ্ভুত। সে যত বেশি বাঁধন থেকে পালাতে চায়, নিয়তি তাকে তত বেশি শক্ত শিকল এনে উপহার দেয়। ক্লারা ভেবেছিল ‘ইনফার্নো’ ক্লাবের চাকরিটা ছেড়ে দিলে বোস্টন শহরের বুকে জ্যাক্সন মিলার নামের ওই ধূসর চোখের ডেভিলটার নজর থেকে সে অন্তত কিছুটা আড়াল হতে পারবে। নিজের ডর্মের খরচ আর মিউনিখের আশ্রমের বাচ্চাদের জন্য টুকটাক জমানো, এসবের জন্য তার একটা পার্ট টাইম কাজ খুব দরকার ছিল। তাই সে ইউনিভার্সিটির লাইব্রেরি থেকে অনেক দূরে, শহরের এক কোণে অবস্থিত ‘ব্লু মুন’ নামের একটা মাঝারি মানের শান্ত ফ্যামিলি রেস্টুরেন্টে ওয়েট্রেস আর টেবিল বুকিংয়ের কাজটা নিয়েছে। এখানে খুব বেশি হইচই নেই, নিয়ন আলোর ঝলকানি নেই, বড্ড ছিমছাম একটা পরিবেশ।

আজ ক্লারার এখানে প্রথম ডিউটি। পরনে হালকা নীল রঙের একটা সাধারণ অ্যাপ্রন, চোখে চশমা। সে কাউন্টারের সামনে দাঁড়িয়ে আজকের রিজার্ভেশন লিস্টটা চেক করছিল। ঠিক তখনই রেস্টুরেন্টের পুরোনো ম্যানেজার মিস্টার গমেজ হন্তদন্ত হয়ে তার সামনে এসে দাঁড়ালেন। গমেজের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম, হাত দুটো কাঁপছে। সে ক্লারার দিকে তাকিয়ে এক অদ্ভুত চোখে তাকাল। গমেজ ফিসফিস করে বলল, “ক্লারা, শোনো। আজ রাতে তোমার অন্য কোনো টেবিলে যাওয়ার দরকার নেই। তুমি শুধু টেবিল নম্বর সাতের অর্ডার নেবে। আর হ্যাঁ, খুব সাবধানে থাকবে।”

ক্লারা একটু অবাক হয়ে চশমাটা নাকের ওপর ঠিক করল। সে খুব শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করল, “কেন মিস্টার গমেজ? টেবিল নম্বর সাতে কি কোনো বিশেষ গেস্ট এসেছেন? আমি তো সবার জন্যই সমান সার্ভিস দিই।”

গমেজ একটা শুকনো ঢোক গিলে বলল, “বিশেষ গেস্ট? ওহ হো, তুমি এখনো জানো না তাহলে। আজ দুপুর পর্যন্ত এই ব্লু মুনের মালিক ছিলেন মিস্টার হেন্ডারসন। কিন্তু ঠিক বিকেল চারটেয়, একজন কমবয়সী ছেলে এসে হেন্ডারসনের সামনে ডাবল প্রাইসের একটা ব্ল্যাঙ্ক চেক ছুঁড়ে দিয়ে এই পুরো রেস্টুরেন্টটাই কিনে নিয়েছে। এক ঘণ্টার মধ্যে আইনি কাগজপত্র সব বদল হয়ে গেছে। আর সেই নতুন মালিকের স্পষ্ট হুকুম, এই জায়গায় ক্লারা বেনেট ছাড়া অন্য কেউ তার টেবিলে অর্ডার নিয়ে যেতে পারবে না।”

ক্লারার হাতের কলমটা মেঝেতে পড়ে গেল। তার বুকের ভেতরটা এক মুহূর্তে ওলটপালট হয়ে গেল। সে কোনো কথা না বলে ধীর পায়ে ভেতরের লাউঞ্জের দিকে এগিয়ে গেল। টেবিল নম্বর সাতটা একদম কোণায়, যেখানে কাঁচের দেয়াল দিয়ে বাইরের তুষারপাত দেখা যায়। সেখানে ম্লান হলুদ আলোর নিচে অলস ভঙ্গিতে পা ক্রস করে বসে আছে জ্যাক্সন মিলার। তার পরনে একটা ব্ল্যাক লেদার জ্যাকেট, কলারটা একটু উঁচানো। সে তার আঙুলের ডগায় একটা ক্রিস্টালের খালি গ্লাস ঘোরাচ্ছিল। ক্লারা টেবিলের সামনে এসে দাঁড়াল। তার চোখ দুটো রাগে কাঁপছে। সে খুব নিচু কিন্তু ধারালো গলায় বলল, “আপনি এখানেও চলে এসেছেন, মিস্টার মিলার? আপনি কি আমাকে একা ছাড়তে পারবেন না? আপনি কি এই রেস্তোরাঁ কিনেছেন?”

জ্যাক গ্লাসটা টেবিলের ওপর রাখল।সে চেয়ারে হেলান দিয়ে বলল, “আমি এখানে আসিনি, মিস ক্যালকুলেটর। আমি এই জায়গাটাই নিজের পকেটে পুরে নিয়েছি। যাতে আমি ছাড়া তোমার ওপর কথা বলার মতো সাহস এই বোস্টন শহরে আর দ্বিতীয় কোনো পুরুষের না থাকে। আজ থেকে এই রেস্টুরেন্টে তুমি আসবে, কিন্তু কোনো কাস্টমারের টেবিল পরিষ্কার করতে নয়, স্রেফ আমার সামনে এই চেয়ারটায় বসে থাকার জন্য। অর্ডার নোট করো, এক কাপ কফি, কড়া চিনি ছাড়া। ঠিক যেমনটা তোমার ওই রাগী চোখ দুটো দেখতে।”

ক্লারা টেবিলের ওপর কফি অর্ডারের প্যাডটা ছুড়ে মারল। তার হাত দুটো রাগে কাঁপছে। সে বলল, “আপনি একটা সাইকোপ্যাথ, মিস্টার মিলার। একটা আস্ত মানসিক রোগী! পুরো বোস্টন শহরটা কি আপনার বাবার কেনা সম্পত্তি যে যেখানে যাব সেখানেই আপনি জমিদারি নিয়ে হাজির হবেন?”
জ্যাক কফির কাপে চুমুক দিল না। সে খুব অলস ভঙ্গিতে নিজের জ্যাকেটের ভেতরের পকেট থেকে একটা অফিশিয়াল খাম বের করে টেবিলের ওপর স্লাইড করে দিল। খামটার ওপর জার্মান অ্যাম্বাসির সিলমোহর দেওয়া। জ্যাক চেয়ারে পিঠ ঠেকিয়ে চুরুট ধরাবার ভঙ্গিতে বলল, “চিৎকার করে গলা না ভেঙে এই কাগজটার অংকটা মেলাও, ক্লারা। তোমার ওই সেন্ট মার্থা আশ্রমের লিজের মেয়াদ কিন্তু আজ রাত বারো টায় শেষ হচ্ছে। জার্মানির ল্যান্ড অথরিটি অলরেডি উচ্ছেদ নোটিশ দিয়ে দিয়েছে। তুমি যদি এই মুহূর্তে এই রেস্টুরেন্টের দরজা পার হও, তবে কাল সকালে ওই কুড়িটা বাচ্চা মাইনাস চার ডিগ্রি বরফের মধ্যে ফুটপাতে এসে দাঁড়াবে। এবার ঠান্ডা মাথায় ভাবো তুমি কি নিজের ইগো বাঁচাতে চাও, নাকি ওই বাচ্চাদের মাথা গোঁজার ছাদটুকু?” ক্লারা খামটা খুলে ভেতর থেকে মূল আইনি নোটিশটা বের করল। নোটিশের নিচের স্বাক্ষর আর সিলমোহর একদম আসল। তার চোখের সামনে মিউনিখের সেই ছোট্ট মারিয়া, লিও আর পিচ্চি পিচ্চি বাচ্চাদের মুখগুলো ভেসে উঠল, যারা শীতের রাতে চাদর মুড়ি দিয়ে গল্প শোনার জন্য তাকে জড়িয়ে ধরে। তার চোখের কোণ দিয়ে এক ফোঁটা গরম জল গড়িয়ে কাগজের ওপর পড়ল। সে কাঁপতে থাকা গলায় বলল, “আপনার কি কোনো মা-বোন নেই জ্যাক? এতটা নিচ আপনি কী করে হতে পারেন? ওইটুকু বাচ্চারা আপনার কী ক্ষতি করেছে?”

জ্যাক কোনো জবাব দিল না। সে টেবিলটা ঘুরে এসে ক্লারার একদম মুখোমুখি দাঁড়াল। তার চওড়া কাঁধ আর পারফিউমের তীব্র গন্ধ ক্লারার চারপাশের বাতাসটাকে এক মুহূর্তে ভারী করে দিল। জ্যাক আচমকা ক্লারার কাঁধের ওপর দুই হাত রেখে তাকে দেয়ালের সাথে চেপে ধরল। তার হাতের আঙুলগুলো ক্লারার চামড়ায় বসে যাচ্ছে। সে ফিসফিসানি গলায় বলল, “ওরা আমার কোনো ক্ষতি করেনি, কিন্তু তুমি করেছ। বোস্টন ইউনিভার্সিটির প্রথম দিন থেকে তুমি আমার দিকে এমনভাবে তাকাও যেন আমি একটা নর্দমার কীট। অথচ ওই ফেলনা মার্কাস যখন তোমার পাশে এসে দাঁড়ায়, তোমার চোখে তখন মেঘ কেটে রোদ ওঠে। এই জ্যাক্সন মিলার কোনোদিন কারও অবহেলা সহ্য করেনি, ক্লারা। তুমি আমার ভেতরের হিংস্র মানুষটাকে নিজের হাতে টেনে বের করেছ। এখন এর শেষ না দেখে আমি থামব না।”
ক্লারা দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলল। নিজেকে বড্ড অসহায় আর নিঃস্ব মনে হচ্ছিল তার। সে ফিসফিস করে বলল, “আপনার জেদ তো আমাকে নিয়ে। ওদের লিজের ফাইলটা ছেড়ে দেওয়ার বিনিময়ে আপনি কী চান?”
জ্যাক তার পকেট থেকে আরেকটি নীল রঙের লিগ্যাল পেপার বের করল। ওটা কোনো সাধারণ দাসখত নয়, ওটা একটা অফিশিয়াল কোর্ট ম্যারেজ সার্টিফিকেট। যেখানে বরের জায়গায় জ্যাক্সন মিলারের নাম অলরেডি সই করা আছে। জ্যাক একটা দামি ফাউন্টেন পেন ক্লারার জড়োসড়ো হয়ে থাকা আঙুলগুলোর ফাঁকে গুঁজে দিল। তারপর ক্লারার কানের খুব কাছে মুখ এনে চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, “আমি কোনো সস্তা রোমান্স চাই না, ক্লারা। আমি চাই তুমি প্রতি মুহূর্তে এটা ভেবে ছটফট করো যে তুমি এখন আমার আইনি সম্পত্তি। এই সার্টিফিকেটে সই করো। আজ রাতেই তুমি মিসেস জ্যাক্সন মিলার হবে। কোনো আলো জ্বলবে না, কোনো চার্চের যাজক এসে আশীর্বাদ করবে না। এটা স্রেফ তোমার ওপর আমার জয় আর তোমার পরাজয়ের একটা দলিল।”

ক্লারা ফাউন্টেন পেনটা হাতে নিয়ে এক মুহূর্ত স্থির হয়ে রইল। তার নীল চোখ দুটোতে যে পানি ছিল, তা অপমানের তীব্র উত্তাপে শুকিয়ে উবে গেল। সে হঠাৎ করেই কলমটা টেবিলের ওপর সজোরে ছুড়ে মারল। ফাউন্টেন পেনের নিবটা ভেঙে দামি নীল কালি ছড়িয়ে পড়ল সাদা টেবিলক্লথের ওপর। জ্যাকের ভুরু দুটো কুঁচকে গেল। তার ধূসর চোখে এক মুহূর্তের জন্য বিস্ময় ফুটল। ক্লারা একটু হাসল। সে বলল, “আপনি নিজেকে বড্ড বুদ্ধিমান ভাবেন, তাই না মিস্টার মিলার? ফাইন্যান্সের স্টুডেন্ট হয়েও আপনি একটা মস্ত বড় ভুল করে বসে আছেন।”
জ্যাক সোজা হয়ে দাঁড়াল। তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। সে বলল, “ভুল? কীসের ভুল?”
“লিজের মেয়াদ আজ রাত বারোটায় শেষ হচ্ছে, ঠিক। কিন্তু জার্মান ল্যান্ড অ্যাক্টের সেকশন ফোর অনুযায়ী, কোনো চ্যারিটেবল ট্রাস্ট যদি উচ্ছেদের মুখোমুখি হয়, তবে তারা কোর্ট অর্ডারের মাধ্যমে ন্যূনতম নব্বই দিনের গ্রেস পিরিয়ড পায়। কাল সকালেই বাচ্চারা রাস্তায় নামছে না, জ্যাক্সন মিলার! আমার হাতে পুরো তিন মাস সময় আছে।”
ক্লারা এক কদম এগিয়ে এল। এবার সে নিজের আঙুল দিয়ে জ্যাকের শক্ত বুকের ওপর আলতো করে টোকা দিল। প্রতিটা টোকা যেন এক একটা চাবুকের আঘাত।
সে বলল, “এই তিন মাসে আমি আপনার ওই পুরো মিলার ডাইনেস্টির যত ইনসাইডার ট্রেডিং আর ট্যাক্স ফাঁকির ফাইল আছে যা আমি গত রাতে আপনার বাবার ব্যালেন্স শিট ঘেঁটে বের করেছি সব বোস্টন প্রেসের কাছে পাঠিয়ে দেব। আপনার ওই কোটি টাকার কাগজের প্রাসাদ ধসে পড়তে তিন দিনও লাগবে না। বাচ্চাদের ছাদ কাড়ার শখ আমি আপনার মিটিয়ে দেব।” জ্যাকের চোখ দুটো এক সেকেন্ডের জন্য কুৎসিত ব্ল্যাক হোলের মতো অন্ধকার হয়ে গেল। সে ভাবতেও পারেনি এই সাধারণ মেয়েটা এত দূর চাল চেলে রেখেছে। তার পার্সোনাল সেক্রেটারি হ্যামিল্টন ঠিকই বলেছিল, এই মেয়েটার মাথায় মগজ নয়, একটা আস্ত সুপার কম্পিউটার ঘোরে।
জ্যাক হঠাৎ করেই ক্লারার দুই কবজি চেপে ধরে তাকে নিজের দিকে হ্যাঁচকা টানে টেনে নিল। তাদের মধ্যে এখন সুতো পরিমাণ দূরত্ব। জ্যাকের শ্বাস-প্রশ্বাস ঘন হয়ে আসছিল রাগে আর অবাধ্য আকর্ষণে।
সে দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “তুমি বড্ড বেশি খেলছ, ক্লারা। আমার সাম্রাজ্য ভাঙার ক্ষমতা তোমার ওই সস্তা ল্যাপটপের নেই।”

“চেষ্টা করে দেখতে পারেন,” ক্লারা বিন্দুমাত্র চোখ সরাল না। “আমি যদি আজ রাতে এই রেস্টুরেন্ট থেকে বের হয়ে যাই, আপনি কি আমাকে গুলি করবেন? মারবেন? মারুন! কিন্তু ক্লারা বেনেট সই করবে না।”

জ্যাকের ভেতরেরপুরুষালী জেদ এবার ভয়ংকর দেয়ালে গিয়ে ধাক্কা খেল। সে মেয়েটাকে সম্পূর্ণ ভাঙতে চেয়েছিল, কিন্তু মেয়েটা উল্টো তার ভিত নাড়িয়ে দিচ্ছে। ঠিক তখনই লাউঞ্জের দরজায় মিস্টার গমেজ হন্তদন্ত হয়ে ঢুকলেন। তার হাতে একটা ফোন। সে কাঁপতে কাঁপতে বলল, “মিস্টার মিলার… জার্মানি থেকে কল এসেছে। আপনার বাবা মিস্টার উইলিয়াম মিলার লাইনে আছেন। উনি খুব রেগে আছেন… বললেন কী একটা ফাইল নাকি লিক হয়েছে…”

ক্লারা জ্যাকের চোখের দিকে তাকিয়ে এক চিলতে হাসল। সে ধীর গলায় বলল, “খেলা তো আমি এখনো শুরুই করিনি, মিস্টার মিলার। সাপ আর নেউলের লড়াইয়ে সাপ বিষ ঢালতে পারে, কিন্তু নেউল জানে সাপের ঘাড় কীভাবে মটকাতে হয়।”

জ্যাক ক্লারার কবজিটা ছেড়ে দিল। তার হাতটা সামান্য কাঁপছে। রাগে নাকি এই প্রথম হেরে যাওয়ার আশঙ্কায়, সে নিজেও জানে না। সে গমেজের হাত থেকে ফোনটা কেড়ে নিয়ে ক্লারার দিকে তাকিয়ে রইল। ক্লারা নিজের ব্যাগটা কাঁধে তুলে নিল। তারপর চশমাটা নাকের ওপর ঠিক করে বলল, “আপনার কফিটা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে, মিস্টার মিলার। খেয়ে নেবেন। কড়া চিনি ছাড়া… ঠিক যেমনটা আমার চোখ দেখতে।”
সে ঘুরে দাঁড়িয়েরেস্টুরেন্টের দরজা ঠেলে বাইরের মাইনাস ডিগ্রি ঠান্ডার মধ্যে বেরিয়ে গেল। জ্যাক ফোনের ওপাশে তার বাবার চিৎকার শুনতে পাচ্ছে, কিন্তু তার চোখ স্থির ছিল দরজার ওপারে কুয়াশায় মিলিয়ে যাওয়া ক্লারার অবয়বটার দিকে। তার ঠোঁটের কোণের হাসিটা আজকে আর ফিরে এলো না। সেখানে কেবল জমাট বেঁধে রইল এক চরম পরাজয়ের নীল অন্ধকার।

রেস্টুরেন্টের ভারী কাঁচের দরজাটা যখন ক্লারার পেছনে বন্ধ হলো, বোস্টনের কনকনে ঠান্ডা বাতাসটা তার মুখে এসে লাগল। তার পুরো শরীর তখনো উত্তেজনায় কাঁপছে। সে জিতেছে। জ্যাক্সন মিলারের মতো অহংকারী লোককে সে আজ সবার সামনে এক চরম পরাজয়ের স্বাদ দিয়ে এসেছে। এই প্রথম তার মনে হলো, সে মুক্ত।কিন্তু মানুষের নিয়তি বড্ড নিষ্ঠুর জিনিস। সে যখনই মনে করে সে শিকল ভেঙে ফেলেছে, নিয়তি তখন পেছন থেকে আরও একটা অদৃশ্য ফাঁস তার গলায় পরিয়ে দেয়। রাস্তার মোড়ে ট্যাক্সির জন্য দাঁড়াতেই ক্লারার কোটের পকেটে ফোনটা সজোরে কেঁপে উঠল। স্ক্রিনে তার একমাত্র কাছের বান্ধবী লিলির নাম ভাসছে। ক্লারা ফোনটা কানে নিতেই ওপাশ থেকে লিলি কোনো কথা বলতে পারল না, শুধু একটা গোঙানি আর কান্নার আওয়াজ ভেসে এল। চারপাশ থেকে কিছু চটুল পুরুষালী হাসির শব্দ আর একটা গাড়ির স্টার্ট নেওয়ার গর্জন শোনা গেল। “লিলি? লিলি কী হয়েছে? তুই কাঁদছিস কেন?” ক্লারার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। ওপাশ থেকে একটা কর্কশ গলা লিলিকে ধমকে উঠল, “চুপ কর!” তারপর ফোনটা সেই লোকটা নিজের কানে নিয়ে অত্যন্ত ঠান্ডা গলায় বলল, “মিস ক্লারা বেনেট? আপনার বান্ধবী লিলি আমাদের সাথে বোস্টন হাইওয়ে ধরে একটু লং ড্রাইভে বের হয়েছে। মেয়েটার গায়ের চামড়া অনেক নরম, এই শীতে ফ্রস্টবাইট হয়ে গেলে দেখতে খারাপ লাগবে।”

ক্লারা স্তব্ধ হয়ে গেল। তার পায়ের তলার মাটি যেন এক মুহূর্তে সরে গেল। সে চিৎকার করে বলল, “তোমরা কারা? লিলির গায়ে হাত দিলে আমি পুলিশে দেব!” ওপাশের লোকটা হা হা করে হেসে উঠল। “পুলিশ? বোস্টন শহরের পুলিশ কার ইশারায় চলে, তা জানা নেই? শোনো মেয়ে, বড়দের সাথে চাল চালতে নেই। মিস্টার মিলার যা চান, তা তিনি পান। এখন ঘড়ির দিকে তাকাও। ঠিক পনেরো মিনিট সময়। এর মধ্যে যদি মিস্টার মিলারের সেই নীল কাগজে তোমার সই না পড়ে, তবে তোমার এই বান্ধবীকে আমরা মাঝরাস্তায় গাড়ি থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেব। এই ঠান্ডায় মাইনাস ফোর ডিগ্রিতে একটা মেয়ে একা কতক্ষণ বাঁচবে, হিসেব করে নাও। টিক ট্যাক… সময় শুরু হলো।”

ফোনটা কেটে গেল। ক্লারা মোড়ের ল্যাম্পপোস্টটা ধরে কোনোমতে দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখের সামনে পুরো পৃথিবীটা ঘুরছো। মিউনিখের বাচ্চাদের জন্য সে তিন মাসের সময় পেয়েছিল, আইনি লড়াইয়ের সুযোগ ছিল। কিন্তু লিলির জন্য কোনো সময় নেই। লিলি, যে মেয়েটা তার অসুস্থতায় রাত জেগে কপালে জলপট্টি দিত, সেই সরল মেয়েটা আজ ক্লারার জেদের কারণে মৃত্যুর মুখে। জ্যাক্সন মিলার কোনো মানুষ নয়। সে একটা পিশাচ। সে আইন বোঝে না, সে বোঝে শুধু জেদ। আর সেই জেদ পূরণের জন্য সে যেকোনো স্তরে নামতে পারে। ক্লারা তার চোখের জলটা মুছে ফেলল। এবার আর কোনো দ্বিধা নেই, কোনো উপায় নেই। তার সেই গর্ব, তার সেই সাজানো আত্মসম্মান এক নিমেষে ভেঙে গুঁড়ো হয়ে গেল। এক চরম পরাজয়ের গ্লানি নিয়ে সে আবার ঘুরে দাঁড়াল। ধীর পায়ে সে আবার হেঁটে চলল সেই ব্লু মুন রেস্টুরেন্টের দিকে। প্রতিটা কদম যেন তার নিজের ফাঁসির মঞ্চের দিকে এগিয়ে যাওয়া। রেস্টুরেন্টের ভেতরে তখনো সেই ম্লান হলুদ আলো। টেবিল নম্বর সাতের সামনে এসে ক্লারা যখন দাঁড়াল, জ্যাক তখনো আগের মতোই বসে আছে। তার বাবার ফোনটা সে কেটে দিয়েছে। তার মুখে কোনো উত্তেজনা নেই, কোনো ভয় নেই। যেন সে জানত, এই মেয়েটা ফিরে আসবেই। জ্যাক তার ধূসর চোখ দুটো তুলে ক্লারার দিকে তাকাল। ক্লারার ফ্যাকাশে মুখ, চোখের জল আর কাঁপতে থাকা শরীর দেখে তার ঠোঁটের কোণে কুৎসিত বিজয়ের হাসিটা আবার ফিরে এল। জ্যাক আলতো গলায় বলল, “ফিরে এলে মিস ক্যালকুলেটর? কফিটা কিন্তু এখনো পুরোপুরি ঠান্ডা হয়নি।” ক্লারা কোনো কথা বলল না। সে টেবিলের ওপর থেকে সেই নীল রঙের ম্যারেজ সার্টিফিকেট আর ফাউন্টেন পেনটা তুলে নিল। কলমটার নিব ভাঙা ছিল, নীল কালি লেপ্টে ছিল। ক্লারা সেই ভাঙা নিবটা দিয়েই নিজের সর্বশক্তি দিয়ে কাগজের ওপর সই করল, “ক্লারা বেনেট।” নামটা লেখা শেষ হতেই জ্যাক এক ঝটকায় কাগজটা নিজের হাতে নিয়ে নিল। তার ধূসর চোখ দুটোতে তখন পাশবিক তৃপ্তির আলো জ্বলে উঠেছে। সে কলমটা নিজের পকেটে রেখে ক্লারার বরফের মতো ঠাণ্ডা হাতটা শক্ত করে নিজের হাতের মুঠোয় নিল। সে বলল, “চলো, মিসেস মিলার। আমাদের নতুন সংসারে যাওয়ার সময় হয়ে
কাগজটা সই করার পর সে জ্যাকের দিকে তাকাল। তার নীল চোখ দুটোতে এখন জমে আছে অতলান্ত, জমাট বাঁধা ঘৃণা। যে ঘৃণা একটা মানুষকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারতে পারে। সে টেবিলের ওপর ঝুঁকে এসে জ্যাকের একদম মুখোমুখি হয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, “আমি সই করেছি, মিস্টার মিলার। লিলির যেন এক ফোঁটা রক্তও না পড়ে। আর একটা কথা মনে রাখবেন আজ থেকে এই পৃথিবীতে আপনার চেয়ে জঘন্য, আপনার চেয়ে ঘৃণ্য কোনো বস্তু আমার কাছে আর নেই। আমি আপনাকে আমার জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ঘৃণা করব। প্রতিটা সেকেন্ডে ঘৃণা করব।”

জ্যাক সোজা হয়ে দাঁড়াল। সে ক্লারার সেই তীব্র ঘেন্নায় ভরা চোখ দুটোর দিকে তাকাল। এই মেয়েটার চোখে সে কোনোদিন ভালোবাসা বা সমর্পণ দেখতে চায়নি। সে দেখতে চেয়েছিল এই অবাধ্যতা, এই তীব্র আগুন। জ্যাক ক্লারার গালের ওপর নিজের শক্ত আঙুলগুলো আলতো করে ছুঁইয়ে দিল। ক্লারা ঘেন্নায় মুখটা সরিয়ে নিতে চাইল, কিন্তু জ্যাক তাকে নড়তে দিল না। সে খুব নিচু, তপ্ত গলায় ফিসফিস করে বলল, “তোমার এই ঘৃণাই তো আমি দেখতে চেয়েছিলাম, মিসেস জ্যাক্সন মিলার। এবার চলো, আজ আমাদের বাসর রাত। তোমাকে তো বলাই হয়নি, আমার পেন্টহাউসের খাঁচায় বন্দি হওয়ার জন্য তোমার এই রূপটা বড্ড বেশি সুন্দর দেখাচ্ছে।”

রেস্টুরেন্টের বাইরে তখন রোলস রয়েস গাড়িটা স্টার্ট দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। বডিগার্ডরা দরজা খুলে দিতেই জ্যাক ক্লারাকে প্রায় টেনে গাড়ির পেছনের সিটে বসিয়ে দিল। গাড়ির ভেতরে দমবন্ধ করা নীরবতা।
ক্লারা জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল। সে বিড়বিড় করে বলল, “আপনি আমাকে জোর করে বিয়ে করতে পারেন জ্যাক্সন মিলার, কিন্তু আমার এই শরীর আর মন কোনোদিন আপনার হবে না। আপনি শুধু একটা খাঁচায় বন্দি পুতুলই পাবেন।” জ্যাক গাড়ির অন্ধকারে বসে নিজের হুইস্কির ফ্ল্যাস্ক থেকে এক চুমুক দিল। তারপর খুব শান্ত, প্রায় নিষ্ঠুর গলায় বলল, “পুতুলই সই, ক্লারা। আমার এই একাকীত্বের রাজপ্রাসাদে একটা সুন্দর পুতুলের বড্ড অভাব ছিল। আর শরীর? আমি জোর করে শরীর ছোঁওয়ার মতো সস্তা পুরুষ নই। যেদিন তুমি নিজের ইচ্ছেয় আমার এই বুকে ধরা দেবে, সেদিনই আমাদের আসল বাসর হবে। তার আগে পর্যন্ত এই বন্দিত্বই তোমার সংসার।”

হঠাৎ জ্যাকের ফোনটা বেজে উঠল। সে লাউডস্পিকার অন করতেই ওপাশ থেকে লিলির কান্নামাখা গলার আওয়াজ ভেসে এলো, “ক্লারা! ওরা আমাকে ডর্মের সামনে নামিয়ে দিয়ে গেছে… আমি ঠিক আছি, ক্লারা! তুই কোথায়?” ক্লারা কোনো কথা বলতে পারেনি, শুধু জ্যাকের দিকে এমন এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে, যাতে একটা আস্ত সাম্রাজ্য পুড়ে ছাই হয়ে যেতে পারত। জ্যাক ফোনটা কেটে পকেটে রেখল। তার মুখে কোনো অনুশোচনা নেই না। সে বলল, “তোমার বান্ধবী নিরাপদ, মিসেস মিলার। এবার চলো, রাত এখনো পুরোটাই বাকি”

চলবে?

#Out_Of_Bounds
#Ishrat_Jahan_Jarin
#part_12

বোস্টনের সকালটা আজ খুব শান্ত। জানালার ওপাশে কুয়াশা আস্তে আস্তে কেটে যাচ্ছে। ঘরের ভেতর হিটার চলছে। ক্লারা বিছানায় উঠে বসল। তার চশমাটা টেবিলের ওপর রাখা। সে হাত বাড়িয়ে চশমাটা চোখে পরল। চারপাশটা পরিষ্কার হয়ে গেল। বিছানার অন্য পাশটা খালি। জ্যাক্সন মিলার নেই। বালিশটা ঠিক আগের মতোই মাঝখানে বর্ডার হয়ে পড়ে আছে। ক্লারা একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। যাক, ছেলেটা অন্তত নিজের কথা রেখেছে। সে ঘর থেকে বের হয়ে ড্রইংরুমে এল। পেন্টহাউসের এই অংশটা বিশাল। কাঁচের বড় জানালার সামনে একটা সোফায় জ্যাক বসে আছে। তার পরনে একটা কালো রঙের ট্রাউজার আর ধূসর হুডি। কোলে একটা ল্যাপটপ। সে খুব মন দিয়ে কী যেন দেখছে। তার কপালে হালকা ভাঁজ। ক্লারাকে দেখে জ্যাক ল্যাপটপ থেকে চোখ তুলল। তার ধূসর চোখ দুটোয় সকালের আলো পড়ে কেমন যেন অদ্ভুত সুন্দর দেখাচ্ছে। সে বলল, “ঘুম ভাঙল? টেবিলের ওপর কফি আছে, খেয়ে নাও।”

ক্লারা কফির কাপটার দিকে তাকাল। ধোঁয়া উঠছে। সে ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে কাপটা হাতে নিল। কফিতে চুমুক দিয়ে সে একটু অবাক হলো। চিনি ছাড়া কড়া ব্ল্যাক কফি ঠিক যেমনটা সে খায়। জ্যাক কী করে জানল? ক্লারা কিছু জিজ্ঞেস করল না। সে সোফার অন্য প্রান্তটায় বসল। তাদের মাঝখানের দূরত্বটা খুব বেশি নয়, কিন্তু মানসিকভাবে যেন কয়েক যোজন মাইলের। সে খুব শান্ত গলায় বলল, “আজকে আমার ইউনিভার্সিটিতে একটা জরুরি প্রজেক্ট জমা দেওয়ার কথা। আমি কি যেতে পারি?”

জ্যাক ল্যাপটপটা বন্ধ করে টেবিলের ওপর রাখল। সে সোফায় একটু হেলান দিয়ে বসল। তার মুখে সেই হাসিটা ফিরে এল। তার ধূসর চোখের গভীর দৃষ্টি এবার ক্লারার ঠোঁটের ওপর এসে থামল, যেখানে কফির সামান্য একটু সাদা ফেনা লেগে আছে। জ্যাকের চাউনিটা এতই সম্মোহনী আর তীব্র যে ক্লারার গায়ের লোম খাড়া হয়ে গেল। সে অবচেতনভাবেই গরম কাপের গায়ে নিজের হাতটা আরও শক্ত করে ধরল। জ্যাক ধীরলয়ে বলল, “যেতে পারো। কিন্তু আমার বডিগার্ড তোমাকে ড্রপ করে দিয়ে আসবে। আর হ্যাঁ, বিকেল পাঁচটার মধ্যে এই ঘরে ফিরে আসতে হবে। এটা মনে রেখো।”

ক্লারা একটু তিতা গলায় বলল, “আপনি কি আমাকে চব্বিশ ঘণ্টা নজরে রাখবেন?”

“হ্যাঁ।” জ্যাক খুব সহজ গলায় বলল। সে হঠাৎ সোফায় একটু ঝুঁকে এল ক্লারার দিকে। তাদের ওজনের ভারসাম্য হারিয়ে সোফার নরম কুশনটা একটু ডেবে গেল। জ্যাকের শরীর থেকে আসা পুরুষালি, মাদকতাময় সুবাস ক্লারার নাসিকারন্ধ্রে এসে ধাক্কা দিল। জ্যাক তার একটা হাত অলসভাবে ক্লারার বসার ঠিক পেছনে সোফার পিঠে রাখল, দূর থেকে দেখলে মনে হবে সে ক্লারাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে আছে। সে গম্ভীর গলায় বলল, “তুমি এখন আমার স্ত্রী, ক্লারা বেনেট। আর আমার জিনিসের ওপর অন্য কারো চোখ পড়ুক, এমনকি সেটা একটা সাধারণ চাউনিও হোক সেটা আমি একদম বরদাশত করি না।”

ক্লারা পিছু হটল না। সে চশমাটা নাকের ওপর সোজা করে সরাসরি জ্যাকের চোখের দিকে তাকাল। “জিনিস? আমি কোনো বস্তু নই, মিস্টার জ্যাক্সন মিলার। আপনার অহংকার এতই বেশি যে অহংকার আর জিদের বসে আপনি পরিকল্পনা করে আমাকে জোর করে বিয়ে করেছেন। এত দেমাক বেশি দিন থাকবে না মিলিয়ে রাখেন।

জ্যাকের ঠোঁটের কোণের হাসিটা আরও চওড়া হলো। সে তার বাঁ হাতের তর্জনীটা বাড়িয়ে ক্লারার থুতনির ঠিক নিচে নরম ত্বকে স্পর্শ করল। তার আঙুলের কনকনে ঠান্ডা ছোঁয়াটা ক্লারার জ্বর-তপ্ত ত্বকে লাগতেই একটা তীব্র বৈদ্যুতিক তরঙ্গের মতো খেলে গেল সারা শরীরে। ক্লারা ঝটকা দিয়ে সরে যেতে চাইল, কিন্তু জ্যাকের আঙুলের মৃদু চাপ তাকে আটকে দিল। জ্যাক আরও কিছুটা কাছে এগিয়ে এসে ফিসফিস করে বলল, “তোমার এই কথাগুলোই আমার বড্ড প্রিয়, ক্যালকুলেটর। তবে তোমার এই লজিকহীন কথায় আমার কিছু যায় আসে না। এখন তুমি আমার বউ, আমি তোমাকে মেরে কেটে নদীতে ভাসিয়ে দিলেও কারো কাছে সাহায্য চাইতে পারবে না। আর হ্যাঁ আমি ঠিক এই কারনেই তোমাকে বিয়ে করেছি।” কথাটা শুনেই ক্লারার কান দুটো ঝাঁ ঝাঁ করে উঠল।

“ আর কাল রাতেও তোমার জ্বর এসেছিল। রাতে বর্ডার ক্রস করে আমার বুকের সাথে যেই মহারানী লেপ্টে ছিল তার মুখে এত পবিত্র বাণী মানায় না।”

ক্লারার গাল দুটো লজ্জায়, অপমানে লাল হয়ে উঠল। কাল রাতের আবছা স্মৃতির কিছু টুকরো তার মনে পড়ল। একটা তীব্র ওলটপালট করা ঘ্রাণ। সে কি সত্যিই কাল রাতে অবচেতনভাবেই জ্যাকের এতো কাছে গিয়েছিল? নিজের ওপর প্রচণ্ড রাগে আর ঘেন্নায় তার ভেতরটা রি রি করে উঠল। সে হাত দিয়ে জ্যাকের হাতটা সরিয়ে দিল।

“ওটা আমার অসুস্থতা আর দুর্বলতা ছিল, আপনার কোনো অধিকার নয়।” ক্লারা সোফা থেকে তড়িৎ গতিতে উঠে দাঁড়িয়ে তার কফির কাপটা সশব্দে কাঁচের টেবিলের ওপর রাখল। জ্যাক নিজের জায়গায় বসেই তার চলে যাওয়ার ভঙ্গির দিকে তাকিয়ে এক চোখ টিপল। সে শান্ত গলায় বলল, “দুর্বলতা আর অধিকারের মাঝের রেখাটা বড্ড সূক্ষ্ম, ক্লারা। বিকেল পাঁচটা। এক মিনিটও যেন দেরি না হয়। নয়তো ইউনিভার্সিটি থেকে তোমাকে কীভাবে সবার সামনে কোলে তুলে এনে গাড়িতে বসাতে হয়, সেটা আমার ভালো করেই জানা আছে।”

ক্লারা আর এক সেকেন্ডও কথা বাড়াল না। এই ছেলের সাথে তর্ক করা মানে নিজের সময় নষ্ট করা এবং নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারানো। সে হনহন করে হেঁটে নিজের ব্যাগটা গোছাতে চলে গেল, কিন্তু তার বুকের ভেতরের ধকধকানি আর জ্যাকের আঙুলের সেই ঠান্ডা স্পর্শের রেশ তখনো থামেনি।


দুপুর তিনটে। ক্লারা ইউনিভার্সিটি থেকে বেশ তাড়াতাড়িই ফিরে এসেছে। পাঁচটা বাজার অনেক আগেই তার ফিরে আসা দেখে জ্যাকের ঠোঁটের কোণে একটা চোরা তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠলেও, তার মুখের সামগ্রিক ভাব এবার বেশ গম্ভীর। টেবিলের ওপর চার-পাঁচটা বিজনেস ফাইল খোলা। সে বারবার ফোনে কারো সাথে কথা বলছে আর রেগে গিয়ে ফোন কেটে দিচ্ছে। ক্লারা নিঃশব্দে তার ঘরের দিকে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই জ্যাকের ধারালো গলা তাকে থামিয়ে দিল। “ক্লারা, এদিকে এসো।”

ক্লারা থমকে দাঁড়াল। পিঠের ওপর ব্যাগটা আরেকটু চেপে ধরে সে বলল, “কী হয়েছে?”

“এই ফাইলটা একটু দেখ তো,” জ্যাক ল্যাপটপটা ক্লারার দিকে ঘুরিয়ে দিল। তার গলার স্বরে এবার আর সেই অলস ফ্লার্ট করার ভঙ্গি নেই, সেখানে এক ধরণের জরুরি তাগিদ। “আমাদের জার্মানির নতুন প্রজেক্টের ফিনান্সিয়াল ডাটা এটা। কিন্তু কেন জানি মেলানো যাচ্ছে না। আমাদের মেইন সার্ভারে একটা ম্যালওয়্যার অ্যাটাক হয়েছে। পুরো সিস্টেম ব্লক হয়ে আছে। এক ঘণ্টার মধ্যে যদি এই ক্যালকুলেশন ঠিক না হয়, তবে আমাদের কয়েক মিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হবে। আমাদের আইটি টিম কিছুই করতে পারছে না।”

ক্লারা ফিনান্সের স্টুডেন্ট, আর ম্যাথমেটিক্যাল কোডিংয়ে তার মাথা খুব ভালো চলে। সে ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে তাকাল। সারি সারি জটিল সংখ্যা, গ্রাফ আর সাইবার কোড। সে নিজের ব্যাগটা সোফায় রেখে জ্যাকের পাশে বসল। তার নীল চোখ দুটো চকচক করে উঠল। সংখ্যার খেলা সে খুব ভালোবাসে, আর জ্যাক্সন মিলারকে বিপদে পড়তে দেখাটা তার জন্য প্রচ্ছন্ন আনন্দ। সে ল্যাপটপটা নিজের কোলের ওপর টেনে নিল। তার ফর্সা, জাদুকরী আঙুলগুলো খুব দ্রুত কিবোর্ডের ওপর চলতে লাগল। খটখট শব্দে ভরে উঠল নিস্তব্ধ ড্রইংরুম। জ্যাক চুপচাপ তার পাশে বসে দেখছিল। তাদের শরীর এখন এতটাই কাছাকাছি যে ক্লারার নিশ্বাসের ওঠানামা জ্যাক স্পষ্ট অনুভব করতে পারছে। ক্লারা যখন খুব মনোযোগ দিয়ে কাজ করে, তখন তার নাকের ডগাটা একটু কুঁচকে যায়, আর চশমাটা নাকের ওপর থেকে সামান্য নিচে নেমে আসে। জ্যাকের কেন জানি এই দৃশ্যটা দেখতে খুব ভালো লাগছে। তার ধূসর চাউনিটা গভীর থেকে গভীরতর হলো। সে ল্যাপটপ ছেড়ে সোজা তাকাল ক্লারার ফর্সা ঘাড়ের দিকে, যেখানে দু-একটা আলগা চুল অবাধ্য হয়ে উড়ে বেড়াচ্ছে। জ্যাকের ইচ্ছে হলো চুলগুলো সরিয়ে সেখানে নিজের আঙুল ছোঁয়াতে, কিন্তু সে নিজেকে সামলে নিল। এই মেয়েটার মনস্তত্ত্ব বুঝতে হলে তাড়াহুড়ো করলে চলবে না। ঠিক কুড়ি মিনিট পর ক্লারা একটা লম্বা শ্বাস ফেলে কিবোর্ডের এন্টার বাটনটা চাপল। স্ক্রিনের লাল রঙের ওয়ার্নিং সাইনটা চলে গিয়ে সবুজ হয়ে গেল। পুরো ফিনান্সিয়াল ডাটা একদম পরিষ্কার লাইনে চলে এসেছে।।ক্লারা ল্যাপটপটা জ্যাকের দিকে এগিয়ে দিয়ে একটু অহংকারী হাসল। “হয়ে গেছে। আপনাদের ওই কোটি টাকার আইটি টিম বড্ড কাঁচা, মিস্টার মিলার। ওরা একটা সাধারণ ফিশিং কোড ধরতে পারছিল না। আর এই ফিনান্সিয়াল হিসেবটায় ওরা তিন জায়গায় ইচ্ছে করে ভুল করেছিল। আমি কোডটাও ডিক্রিপ্ট করেছি আর হিসেবটাও ঠিক করে দিয়েছি।”

জ্যাক ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে তাকাল না। সে সরাসরি ক্লারার মুখের দিকে ঝুঁকে এল। তাদের ঠোঁটের দূরত্ব এখন মাত্র কয়েক ইঞ্চি। জ্যাকের তামাকের চেনা কড়া ঘ্রাণটা ক্লারাকে আবার আচ্ছন্ন করে ফেলল। জ্যাক খুব নিচু, ফিসফিসানি গলায় বলল, “আমি জানি ওরা ভুল করেছিল, ক্লারা। আসলে আইটি টিম কাঁচা নয়, ওই ম্যালওয়্যারটা আমি নিজেই মেইন ফ্রেমে ঢুকিয়েছিলাম। স্রেফ দেখার জন্য যে, আমার এই নতুন পার্টনার সংকটের মুখে কতটা ঠান্ডা মাথায় সিদ্ধান্ত নিতে পারে।”

ক্লারা ধাক্কা খাওয়ার মতো চমকে উঠল। “তার মানে… আপনি নিজেরদের কোম্পানির ক্ষতি করে এই নাটক সাজিয়েছেন?”

“লাখ কয়েক ডলার লস হলে জ্যাক্সন মিলারের কিছু যায় আসে না, ক্যালকুলেটর।” জ্যাকের হাতটা এবার ক্লারার অবাধ্য চুলগুলো খুব আলতো করে কানের পেছনে গুঁজে দিল। তার ঠান্ডা আঙুলের স্পর্শে ক্লারার পুরো শরীর শক্ত হয়ে গেল। জ্যাক তার বাঁকা হাসি ফুটিয়ে বলল, “কিন্তু তোমার এই খুরধার বুদ্ধির প্রমাণ সামনাসামনি দেখার লোভ সামলাতে পারলাম না। ইউ আর জিনিয়াস, ক্লারা বেনেট। আর এই মেধা এখন আমার ব্র্যান্ডের অংশ। এখন বলো, এই উপকারের বদলে আমার কাছে কী পুরস্কার চাও?”

ক্লারা জ্যাকের বুক লক্ষ্য করে একটা মৃদু ধাক্কা দিয়ে সোফা থেকে উঠে দাঁড়াল। তার বুক দুরুদুরু কাঁপছে, কিন্তু সে নিজের গলার স্বর শক্ত রেখে বলল, “আপনার নোংরা খেলা বন্ধ করুন, মিস্টার মিলার। আমি কোনো পুরস্কার চাই না। বিকেল পাঁচটার আগে ঘরে ফিরে নিজের চুক্তি পূরণ করেছি, ব্যস। এবার আমি আমার ঘরে যাচ্ছি।”

ক্লারা হনহন করে ঘরের দিকে হেঁটে চলে গেল। জ্যাক সোফায় হেলান দিয়ে তার যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে রইল। তার ধূসর চোখে তখন এক চরম বিজয়ের আনন্দ। সে ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করল, “তুমি চাইলে এখন আমার থেকে দূরে সরতে পারো, ক্লারা। কিন্তু নিজের এই তুখোড় প্রতিভাকে আমার থেকে দূরে রাখবে কী করে? খুব শীঘ্রই তুমি নিজেই এই খেলার নিয়ন্ত্রণ আমার হাতে তুলে দেবে।” বলেই জ্যাক ক্লারার পেছন পেছন গেল। আসলেই সব ডাটা এখন একদম নিখুঁত। যে জটিল ক্রিপ্টো-কোডের জটলা ছুটাতে গিয়ে তার পুরো আইটি টিম গত দুই ঘণ্টা ধরে মাথা কুটে মরছিল, এই মেয়েটা স্রেফ বিশ মিনিটে খুব অবলীলায় তার সমাধান করে দিল। সংখ্যার ওপর ওর এই অদ্ভুত দখল প্রতিবারই জ্যাককে নতুন করে চমকে দেয়। জ্যাকের ঠোঁটের কোণে এক অদ্ভুত প্রশংসা আর প্রচ্ছন্ন গর্বের হাসি ফুটে উঠল। সে সোফার পাশে রাখা তার দামি চামড়ার ব্যাগ থেকে একটা ব্ল্যাক-গোল্ডেন চেকবই বের করল। খুব ক্যাজুয়াল ভঙ্গিতে কলম দিয়ে একটা চেকে সই করল। তারপর চেকটা ছিঁড়ে ক্লারার দিকে বাড়িয়ে দিল। ক্লারা চেকটার ওপর চোখ পড়তেই স্তব্ধ হয়ে গেল। সেখানে স্পষ্ট অক্ষরে লেখা, “পঞ্চাশ লাখ ডলার।”

ক্লারা চশমাটা নাকের ওপর ঠিক করে নিয়ে প্রায় চিৎকার করে উঠল, “আপনি কি পাগল, মিস্টার মিলার? এটা কী রসিকতা?”

জ্যাক খুব শান্ত গলায় বলল, “মিলার সাম্রাজ্যে কাজের মূল্যায়ন এভাবেই হয়, ক্লারা। তুমি আজ আমার কোম্পানির কয়েক মিলিয়ন ডলারের সাথে সাথে জার্মানির বাজারের গুডউইল বাঁচিয়ে দিয়েছ। এটা তার একটা ছোট অংশ মাত্র। নিজের যোগ্যতার দাম নিতে শেখো।”

ক্লারা চেকটা টেবিলের ওপর ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে বলল, “আমি এই টাকা নেব না। এত টাকা দিয়ে আমি কী করব? আর আমার এই টাকার কোনো প্রয়োজন নেই। আমি স্রেফ একটা অ্যাকাডেমিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে কোডটা সলভ করেছি, আপনার দয়ার পাত্রী হতে নয়।”

জ্যাক একটু হাসল। সে সোফা থেকে উঠে ধীরপায়ে এগিয়ে এসে চেকটা আবার টেবিল থেকে তুলে নিল। তারপর ক্লারাকে কোনো সুযোগ না দিয়েই তার জ্যাকেটের পকেটের ভেতর সেটা গুঁজে দিল। পকেটে হাত রাখার বাহানায় সে ক্লারার বড্ড কাছে চলে এল। তার উষ্ণ নিশ্বাস ক্লারার গালে এসে লাগল, যার ফলে ক্লারার হৃদস্পন্দন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল।
জ্যাক ক্লারার কানের খুব কাছে মুখ এনে নিচু গলায় বলল, “রেখে দাও, ক্যালকুলেটর। পঞ্চাশ লাখ ডলার আমি এক সেকেন্ডে ওড়াতে পারি, আর আমার বাবা এই টাকা ন্যানোসেকেন্ডে কামায়। মিলার পরিবারের স্ত্রীর পকেটে এতটুকু খুচরো পয়সা থাকাটা খুব স্বাভাবিক ব্যাপার। এটাকে তোমার মেধার পারিশ্রমিক ভাবো, আমার দয়া নয়। জ্যাক্সন মিলার কাউকে দয়া করে না।”

জ্যাকের গলার সেই তীব্র আত্মবিশ্বাস ক্লারাকে স্তব্ধ করে দিল। এই মানুষের অহংকার আর টাকার গরমের সত্যিই কোনো সীমা নেই। সে আর পকেট থেকে চেকটা বের করল না, তবে তার জেদি নীল চোখ দুটো এক মুহূর্তের জন্য চকচক করে উঠল। একটা চমৎকার আইডিয়া তার মাথায় খেলে গেল।
সে পকেটের ওপর হাত চেপে সরাসরি জ্যাকের ধূসর চোখের দিকে তাকাল। তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে বিজয়ের হাসি। সে বলল, “ঠিক আছে, মিস্টার মিলার। আপনার এই ‘খুচরো পয়সা’ কীভাবে খরচ করতে হয়, তা আমার ভালো করেই জানা আছে। আশা করি মিলার পরিবারের বউ যদি এই টাকা কোনো ভালো কাজে ওড়ায়, আপনার ইগোতে লাগবে না?”

জ্যাক এক ভুরু উঁচিয়ে তাকাল, তার চোখে কৌতূহল। “তোমার যা ইচ্ছা করতে পারো, ক্লারা। টাকাটা এখন তোমার।”

ক্লারা মনে মনে ঠিক করল, এই অহংকারী টাইকুনের অহংকারের টাকা দিয়েই সে মিউনিখের অনাথ আশ্রমের বাচ্চাদের জন্য একটা আধুনিক ত্রিতল লাইব্রেরি আর কম্পিউটার ল্যাব বানিয়ে দেবে। যে বাচ্চাদের সে পথের ধুলোয় নামাতে চেয়েছিল, তাদের ভাগ্যই এখন তার টাকা দিয়ে বদলাবে। এর চেয়ে মধুর প্রতিশোধ আর কী হতে পারে! সে আর এক সেকেন্ডও সেখানে দাঁড়াল না, নিজের ঘরের দিকে পা বাড়াল। পিছন থেকে জ্যাকের অলস হাসির শব্দ তখনো তার কানে আসছে, যেন সে ক্লারার মনের ভেতরের হিসাবটাও খুব সহজে পড়ে ফেলেছে।

পরদিন বিকেলে ইউনিভার্সিটির ক্যাফেটেরিয়া। বোস্টনের মেঘলা আকাশটার মতোই ক্যাফেটেরিয়ার ভেতরের পরিবেশটাও কেমন যেন ভারী হয়ে আছে।
ক্লারা একটা টেবিলের কোণায় বসে স্যুপ খাচ্ছিল, যদিও স্যুপের বাটিতে চামচ নাড়ানো ছাড়া তার কোনো মনোযোগ ছিল না। ঠিক তখনই লিলি এসে তার উল্টো দিকের চেয়ারটায় ধপ করে বসল। লিলির মুখটা উদ্বেগে শুকিয়ে ছোট হয়ে গেছে। লিলি চারপাশটা একবার দেখে নিয়ে ফিসফিস করে বলল, “ক্লারা, তুই ইদানীং কোথায় থাকিস বলতো? ডর্মে তোকে আজকাল একদম পাওয়াই যায় না। তোর বইখাতা, জামাকাপড় সব ওখানেই পড়ে আছে, কিন্তু তুই রাতে ফিরছিস না। কী লুকাচ্ছিস আমার কাছে? কী হচ্ছে এসব?”

ক্লারা স্যুপের চামচটা নাড়তে নাড়তে চোখ নিচু করে বলল, “আমি একটু বিশেষ দরকারে অন্য একটা অ্যাপার্টমেন্টে থাকছি লিলি। পরিস্থিতি একটু জটিল। তোকে সময় হলে পরে সব বুঝিয়ে বলব, প্লিজ এখন কিছু জিজ্ঞেস করিস না।” ঠিক তখনই ক্যাফেটেরিয়ার মূল দরজা ঠেলে মার্কাস ভেতরে ঢুকল। তার নিচের ঠোঁটটা এখনো একটু কেটে ফুলে আছে, সেখানে একটা সাদা ব্যান্ড-এইড লাগানো। তার কাঁধের ব্যাগটা একপাশে ঝুলে আছে আর তার হাঁটার ভঙ্গিতে সেই প্রাণবন্ততা আজ উধাও। সে ক্লারাকে দেখে ধীর পায়ে এগিয়ে এল। সে ক্লারার টেবিলের সামনে এসে দাঁড়াল। তার চোখ দুটো ক্লান্ত আর বিষণ্ণ। খুব নিচু গলায় বলল, “ক্লারা, তুমি… তুমি ঠিক আছ?”

ক্লারা মার্কাসের ফোলা ঠোঁট আর মলিন মুখের দিকে তাকিয়ে বড্ড অপরাধবোধে ভুগল। সে বলল, “আমি ভালো আছি মার্কাস। তোমার আঘাতটা কি খুব বেশি? ব্যথাটা কি এখন একটু কম?”

“হ্যাঁ, কম।” মার্কাস একটু জোর করে মলিন হাসার চেষ্টা করল। তারপর সে টেবিলের ওপর খানিকটা ঝুঁকে এসে গলার স্বর আরও নামিয়ে বলল, “ক্লারা, একটা কথা আমাকে সত্যি করে বলবে? আজ সকাল থেকে পুরো ডিপার্টমেন্ট আর ক্যাম্পাসে একটা অদ্ভুত গুজব রটেছে। বোস্টনের নামী বিজনেস টাইকুন জ্যাক্সন মিলার নাকি কাউকে গোপনে বিয়ে করেছে। আর সেই মেয়েটা নাকি… তুমি? এটা কি সত্যি, ক্লারা?” কথাটা শুনে লিলি চোখ দুটো কপালে তুলে ক্লারার দিকে তাকাল। ক্যাফেটেরিয়ার হট্টগোলের মাঝেও তাদের এই টেবিলটার চারপাশের পরিবেশ এক মুহূর্তে থমথমে হয়ে গেল। ক্লারা কী বলবে বুঝতে পারল না। সে চশমাটা নাকের ওপর ঠিক করার বাহানায় চোখ সরিয়ে নিল। তার এই থমকে যাওয়া আর অপরাধী নীরবতাই মার্কাস আর লিলির কাছে সব প্রশ্নের উত্তর পরিষ্কার করে দিল। লিলি নিজের মুখ হাত দিয়ে চেপে ধরে ফিসফিস করে উঠল, “ওহ মাই গড, ক্লারা! এটা কী শুনছি!”

মার্কাস একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তার চোখ দুটোতে এক তীব্র কষ্ট আর অসহায়ত্ব ফুটে উঠল। সে টেবিলের ওপর হাতটা মুঠো করে বলল, “আমি বুঝতে পেরেছি। ক্লারা, ওই অহংকারী ছেলেটা তোমাকে ব্লাকমেইল করেছে, তাই না? ও নিজের টাকা আর ক্ষমতার জোর খাটিয়ে তোমাকে বাধ্য করেছে। তুমি ভয় পেও না, তুমি চাইলে আমি আইনি সাহায্য নিতে পারি। মিস্টার হ্যারিসনকে বলতে পারি, এমনকি পুলিশে….”

“না মার্কাস!” ক্লারা খুব শক্ত গলায় মার্কাসের হাতটা চেপে ধরে তাকে থামিয়ে দিল। তার নিজের হাত তখন কাঁপছিল। “কোনো পুলিশ নয়, কোনো আইনি লড়াই নয়। আমি নিজের ইচ্ছেয়… এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তোমরা প্লিজ এই বিষয়ে আর কোনো ঘাঁটাঘাঁটি কোলো না।”

ক্লারা মার্কাসের চোখের দিকে তাকাল, যেখানে তার নিজের কারণে লেগে থাকা বিপদের ছায়া সে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিল। সে আরও গম্ভীর গলায় বলল, “জ্যাক্সন মিলার নিজের জেদ পূরণ করতে কতদূর যেতে পারে, তা তোমরা কল্পনাও করতে পারবে না। আমি কোনোভাবেই চাই না আমার এই ব্যক্তিগত লড়াইয়ের মাঝে জড়িয়ে তোমাদের কোনো ক্ষতি হোক। মার্কাস, লিলি… যদি আমাকে একটুও ভালোবাসো, তবে এই সত্যিটা এখানেই ভুলে যাও।”

মার্কাস ক্লারার শক্ত মুঠির দিকে তাকিয়ে রইল। সে বুঝতে পারল, ক্লারা মুখ ফুটে সব না বললেও, সে আসলে তাদের দুজনকে এক বিরাট বিপদের হাত থেকে বাঁচানোর জন্যই নিজেকে আড়াল করে নিচ্ছে। ক্যাফেটেরিয়ার বড় ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে ক্লারার হঠাৎ মনে পড়ল বিকেল পাঁচটা বাজতে আর বেশি সময় বাকি নেই।


রাত আটটা। পেন্টহাউসের ডাইনিং টেবিলে আজ খুব ভারী পরিবেশ। বোস্টনের বাইরের কনকনে ঠান্ডা আবহাওয়াটা যেন কোনো এক উপায়ে এই বিলাসবহুল ঘরের ভেতরেও ঢুকে পড়েছে। জ্যাক আর ক্লারা দুজনেই চুপচাপ ডিনার করছে। শেফ আজ খুব যত্ন করে রোস্টেড চিকেন আর সালাদ বানিয়েছে। খাবারের সুবাস পুরো ঘরে ছড়িয়ে থাকলেও ক্লারার গলার ভেতর দিয়ে এক গ্রাস খাবারও গলছে না। তার মাথায় তখনো ক্যাফেটেরিয়ায় দেখা মার্কাসের সেই ফ্যাকাশে মুখ আর ঠোঁটের ব্যান্ড-এইডটা ঘুরছে। অপরাধবোধ তাকে ভেতর থেকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে। জ্যাক হঠাৎ নিজের কাঁটাচামচটা প্লেটের ওপর মৃদু শব্দে রাখল। সেই সামান্য শব্দেই নিস্তব্ধ ঘরটা কেঁপে উঠল। সে খুব ঠান্ডা গলায় বলল, “আজকে ক্যাফেটেরিয়ায় তুমি ওই মার্কাসের সাথে কী কথা বলছিলে, ক্লারা?”

ক্লারা চমকে উঠে জ্যাকের দিকে তাকাল। তার ভেতরের ভয়টা এক মুহূর্তে জেদে রূপ নিল। সে নিজের কাঁটাচামচটা রেখে বলল, “আপনি কি আমার ইউনিভার্সিটিতেও স্পাই রেখে দিয়েছেন? প্রতিটা পদক্ষেপে নজরদারি করাটা কি আপনার কোনো মানসিক রোগ, মিস্টার মিলার?”

“নজরদারি নয়, এটা নিজের অধিকার রক্ষা করা,” জ্যাক সোজা হয়ে বসল। “আমি তোমাকে বর্ডার লাইনটা স্পষ্ট বুঝিয়ে দিয়েছিলাম, ক্লারা। আমার অধিকারের ভেতর অন্য কারো সামান্যতম অনধিকার প্রবেশও আমি বরদাশত করি না। বিশেষ করে ওই সস্তা ছেলেটার তো নয়ই।”

ক্লারা প্লেট ঠেলে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। সে রাগে আর অপমানে কাঁপতে কাঁপতে বলল, “ও আমার বন্ধু, জ্যাক্সন মিলার! সই করা একটা কাগজের জোরে আপনি হয়তো দুনিয়ার সামনে আমার নামের পাশে আপনার পদবিটা বসাতে পেরেছেন, কিন্তু আমার অতীত আর আমার সম্পর্কগুলো মুছে ফেলার ক্ষমতা আপনার নেই!”

জ্যাকও এক ঝটকায় চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। সে ধীর পায়ে টেবিলটা ঘুরে এসে সরাসরি ক্লারার মুখোমুখি দাঁড়াল। ক্লারা সরে যাওয়ার আগেই জ্যাক তার ডান হাতটা খপ করে ধরে নিজের দিকে টেনে নিল। জ্যাকের হাতের মুঠোটা বড্ড শক্ত কিন্তু তাতে ক্লারাকে আঘাত করার চেয়ে তাকে নিজের দখলে রাখার আকুলতাই যেন বেশি প্রকাশ পাচ্ছে।
জ্যাক আরও কিছুটা ঝুঁকে এল ক্লারার মুখের ওপর। তার ধূসর চোখ দুটো এখন ক্লারার নীল চোখের গভীরে কিছু একটা খোঁজার চেষ্টা করছে। সে খুব ফিসফিসানি গলায় বলল, “অতীত ঘাঁটাঘাঁটি করা মানুষ আমার পছন্দ নয়, ক্লারা। যে সম্পর্কের কোনো ভবিষ্যৎ নেই, তা আজই চুকিয়ে ফেলো। আজ থেকে তোমার চারপাশের দেয়াল আর তোমার সমস্ত মনোযোগের কেন্দ্রে শুধু আমি থাকব। নিজের এই সীমানা ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করো না, কারণ এর পরিণতি তোমার ওই বন্ধুদের জন্য মোটেও ভালো হবে না।”

ক্লারা তার চোখের দিকে তাকিয়ে টের পেল, এই মানুষটা স্রেফ অহংকার করছে না মার্কাসের ক্ষতি করার প্রচ্ছন্ন হুমকি দিচ্ছে সে। জ্যাক আলতো করে ক্লারার হাতটা ছেড়ে দিল, কিন্তু তার আঙুলের সেই কড়া স্পর্শের উষ্ণতা তখনো ক্লারার ত্বকে লেগে রইল।
জ্যাক আর এক মুহূর্তও না দাঁড়িয়ে নিজের স্টাডি রুমের দিকে চলে গেল। ড্রইংরুমের বিশাল কাঁচের জানালার ওপাশে বোস্টনের রাতের তুষারপাত তখন আরও তীব্র হতে শুরু করেছে। পুরো শহর সাদা চাদরে ঢেকে যাচ্ছে। ক্লারা নিস্তব্ধ ডাইনিং টেবিলের এক কোণায় দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখ দিয়ে এক ফোঁটা নীরব তপ্ত জল গড়িয়ে পড়ল। সে বুঝতে পারছে, এই জটিল মানুষের সাথে তার মনের যুদ্ধটা দিন দিন আরও জটিল আর নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে উঠছে।

চলবে?