নেশাময় ভালোবাসার আসক্তি পর্ব-৯+১০

0
192

#নেশাময়_ভালোবাসার_আসক্তি
#পর্ব-৯
#নীলাম্বরী_সেন_রাধিকা

(কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ । যদিও পোস্ট করেন লেখিকার নাম দিয়ে পোস্ট করবেন)

পাখিদের কিচির মিচির শব্দ থেমে যাচ্ছে ধীরে ধীরে, লাল আভার প্রকোপ কমছে অন্তর্নিলে।গোধূলি লগ্নের সৌন্দর্য যেনো নতুন পথের শোভা বাড়ায়। আর এই দিকে কেউ সেই সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারছে না। কারণ তার মনে আজ অমাবশ্যা উঠেছে। খুবই তীক্ষ্ণ অনুভূতি হচ্ছে। প্রিয় জনকে মনে পড়ছে যে তার বারে বারে। যাকে ছাড়া সে কোনো কিছুই করার মতো জোর পাই না। আজ সেই ব্যাক্তিটি মনে হচ্ছে অনেক দূরে। মেঘা বেলকনির গ্রিল ধরে দাড়িয়ে আছে। আর কাল থেকে হয়ে যাওয়া সব কিছুই ভাবছে। সাথে তার আব্বুর কথা খুব মনে পড়ছে। সারাদিন না খাওয়া তে শরীর টাও ঢুলছে। হঠাৎ করেই দরজা খোলার আওয়াজ হলো। কিন্তু তার কোনো হেলদুল নেই।

ঠান্ডার মধ্যে এইখানে কি করছো? আর সারাদিন খাও নি কেনো?

……………….

কি হলো? আমি কিছু জিগ্গেস করেছি।

………………

আদ্রিয়ান মেঘাকে টেনে নিজের খুব কাছে আনলো। এরপর হিস হিসিয়ে বললো

আমার ধর্যের পরীক্ষা নিও না জান। আমার কাজ কিভাবে আদায় করতে হয় সেটা আমি খুব ভালো করেই জানি

বলেই আদ্রিয়ান সার্ভেন্ট কে ভেতরে আস্তে বললো যিনি আদ্রিয়ান আসার সাথে সাথে দরজার কাছে দাড়িয়ে ছিলো। সার্ভেন্টকে খাবার টেবিলে রাখতে বললে সে খাবার রেখে চলে যায়। এরপর মেঘাকে টেনে নিয়ে বিছানা তে বসায়। দরজা ভেতর থেকে লক করে ওয়াশরুমে গিয়ে হাত ধুয়ে এসে ভাত মাখা শুরু করে।এরপর এক লোকমা যখন মেঘার সামনে নিয়ে ধরে তখন মেঘা মুখ সরিয়ে নেই।
আবার যখন সেই দিকে লোকমা ধরে তখন সে আবার যখন সরিয়ে নেই তখন বাম হাত দিয়ে মুখটা চেপে ধরে খাবার জোর করে খাওয়াতে লাগলে মুখ থেকে ভাত আদ্রিয়ান এর মুখে ফেলে দেই। হঠাৎ করেই এসব করাতে আদ্রিয়ান এর মেজাজ প্রচন্ড খারাপ হই। ইচ্ছে করছে থাপড়ে থাপড়ে খাওয়ায়। কিন্তু পরে কিছু একটা ভেবে পকেট থেকে ফোন বের করে গার্ড কে কল করলো, কিছু একটা আনার কথা বলে ফোন টা কেটে পকেটে ঢোকালো।গার্ড দরজায় নক করলে আদ্রিয়ান উঠে দরজা খুললো। গার্ড এর হাতে থাকা বক্স টি নিয়ে দরজা বন্ধ করে মেঘার সামনে বসলো। এত ক্ষন মেঘা সব কিছুই খেয়াল করেছে। তারও কৌতহল জাগছে বক্স টা তে কি আছে। কিন্তু বেশি ক্ষন অপেক্ষা করতে হয়নি তখনই বক্স এর প্যাকেট খুললো আর সাথে সাথে বিকট চিৎকার করেই দৌড়ে দূরে চলে গেলো। কারণ বক্সের ভেতরের বয়াম ভর্তি তেলাপোকা ছিলো। যা মেঘা প্রচন্ড ভয় পাই।

এই যে তেলাপোকার সদস্যরা খুব খুব সরি গো তোমাদের। এইভাবে তোমাদের ভয় পাওয়ানোর জন্য। কি করছো জান এইভাবে কেউ চিৎকার করে? বেচারা তেলাপোকারা ভয় পেয়ে জার থেকে বেরোতে চাইছে। একটা কাজ করি ওদের কে কষ্ট না দিয়ে বের করে দেই। কি বলো জান?

নাহ্,,,হ,,হ,,,, একদম না। এইসব কি হাতে নিয়েছেন? এগুলোকে বাইরে ফেলেন বলছি। কি হলো নিয়ে যান।

আদ্রিয়ান মেঘার ভীতু চেহারা দেখে খুব কষ্টে হাসিটা চেপে রেখেছে। উপরে উপরে কঠোর মনোভাব রেখে

কি বলো জান। বাইরে কেনো ফেলবো। ফেললে তো এখানেই ফেলবো। এখানে এক অবাধ্য মেয়ে থাকে যে আমার কথা একদম শুনতে চাই না। তাই ভাবলাম যখন কথা শুনেই না তখন আমিও তার কোনো কথাই শুনবো না।

বলেই যখনি বয়ামের মুখ খুলবে তখনই

শুনবো শুনবো

কি শুনবে?

মানে আপনার কথা শুনবো

সিউর?

হ্যা

ঠিক আছে। বয়াম টা আমি টেবিলে রাখছি। এখন দেখি লক্ষী মেয়ের মতো এখানে বসবে। আমি হাত ধুয়ে আসতেছি

বলেই আদ্রিয়ান হাত ধুয়ে এসে ভাতের প্লেট নিয়ে লোকমা ধরলে

বয়াম টা দূরে রাখুন না প্লীজ। ওইগুলো দেখলে আমি এমনিতেই বমি করে দেবো খেতে পারবো না

আদ্রিয়ান একটি কাপড় নিয়ে ওইটার উপর রেখে দিলো। এরপর ধীরে ধীরে খাওয়াতে লাগলো। আর মেঘাও ভয়ে ভয়ে খেতে লাগলো। কিন্তু দুই তিন লোকমা ভয়ে ভয়ে খেলেও পরের গুলো তৃপ্তি সহকারে খেলো। কারণ তার প্রিয় মাটন বিরিয়ানি করেছে। আর রোস্ট টাও খুব মজার ছিল (আপনাদের লেখিকা আপুরও কিন্তু খুব প্রিয়) এরপর খাওয়া শেষে সুন্দর করে মুখ মুছিয়ে দিলো।

এরপর এক গ্লাস জুস খেতে বললে তাও খেয়ে নিলো। কিন্তু জুস টা খুব তিতা টাইপের ছিলো। আদ্রিয়ান জুসের মধ্যে আগে থেকেই ওষুধ মিশিয়ে এনেছিল যা ডক্টর এ গতকাল সাজেস্ট করেছে

এখন তো সব কথা শুনলাম। এখন বয়াম টা নিয়ে যান

আদ্রিয়ান হঠাৎ করেই মেঘার খুব নিকটে আসলো। এতে মেঘা হালকা দূরে সরে গেলে আদ্রিয়ান মেঘার মাথার পিছনে হাত রেখে আদ্রিয়ান এর মুখের সামনে আনলো। এতে দুজনের নিশ্বাস এর শব্দ দুজনেই শুনতে পাচ্ছে।

গুড ,, ভেরি গুড এইভাবেই আমার কথা শুনবে। আমার কথার খেলাপ একদম হবে না। না হলে কঠোর রূপ টাই বাহির হবে । যা এই নরম ফুলের জন্য প্রযোজ্য নয়। এই নরম ফুলের সাথে শুধু নরম মানায়। কঠোর হলে ফুলটা রুক্ষ হয়ে যাবে। আমার রুক্ষ নয় স্নিগ্ধ পছন্দ।

ঘোর লাগা কণ্ঠের ধ্বনি শুনতেই নিজের মধ্যেও এক অদ্ভুত অনুভূতি হতে লাগলো। যেনো আক্ষেপ গুলো খুব যতন করেই প্রকাশ করছে। একটু অযত্ন হলেই মনে হয় আক্ষেপ গুলো ভেঙ্গে যাবে। নাকে হাতের স্পর্শ পেতেই মেঘার ঘোর কাটলো। এত ক্ষন সে কি ভাবছিল।

এই যে ভাবনাকুমারি। এই ছোট্ট মাথায় এসব প্রেসার দিতে হবে না। আমার ইম্পর্ট্যান্ট কাজ আছে আমি এখন আসছি। কোনো উল্টা পাল্টা কাজ যেনো একদম না দেখি। তা নাহলে

বলেই আবার মেঘার নাক টেনে বের হয়ে দরজা লক করে চলে গেলো। এইদিকে মেঘা নিজের নাকে হাত বোলাচ্ছে। এইসব নাক, গাল টানা একদম পছন্দ করে না। লোকটা তার অপছন্দের জিনিসই বেশি করে।

অসভ্য লোক। আরেকবার আমার নাক টানুক। একদম হাত ভেঙ্গে রেখে দেবো। আমাকে এখনও চিনে নাই। হুমমম

কিন্তু এই লোকটা আমাকে আটকে কেনো রেখেছে। যতো টুকু বুঝলাম এই লোক আমাকে যেতে দিবে না। আমাকেই কোনো কিছু করতে হবে। কিন্তু লোকটার নাম কি? এখনও তো জানা হলো না? ( আচ্ছা কোনো পর্বে কি উল্লেখ করে ছিলাম যে মেঘা আদ্রিয়ান এর নাম জানে বা আদ্রিয়ান নিজের নাম মেঘাকে বলেছিল?)

…………………………………………………………………

আদ্রিয়ান নিজের সিক্রেট অফিস রুমে গেলো যেটা তার বাড়ির এক গোপনীয় স্থানে দেওয়ালের সাথে অ্যাটাচ করা। কেউ বুঝতেও পারবে না যে এই জায়গায় কোনো সিক্রেট রুম আছে। শুধু মাত্র তার বিশ্বস্ত অ্যাসিস্ট্যান্ট আসাফ আর একজন সিক্রেট গার্ড জানে। আর সেই গার্ড টি আপাতত সেই রুমে উপস্থিত আছে

রুশ আপডেট বলো

ইয়েস স্যার। স্নেক দলের লোক আমাদের কোম্পানি তে গুপোনীও স্পাই ক্যামেরা সেট করেছে। যার সব গুলোই স্ক্যান করা হয়েছে। আর সেই লোক এখন গোডাউনে বন্ধী আছে

খাতির যত্ন করো ঠিক মত। কোনো কিছুর কমতি যাতে না হয়। আর হ্যা অবশ্যই থার্ড ডিগ্রীর যত্ন টাও দিবে।

ওকে স্যার

ঠিক আছে এখন তুমি যাও

গার্ড বের হয়ে যাওয়ার পর আদ্রিয়ান সামনের এলইডি গুলো অন করলো। যা সারা বাড়ির সিসি ক্যামেরা ধারা আবৃত। যেই রুমে মেঘাকে রাখা হয়েছে সেখানের ক্যামেরা অন করলো। সাথে সাথে এক মোহনীয় মুহুর্ত দেখলো। যা দেখেই তার মনের মধ্যে সূক্ষ্ম এক অনুভূতি হলো। বুকে হাত দিয়ে মেঘাকে দেখতে লাগলো।

আর কত ভাবে বিক্ষত করবে আমায় স্নিগ্ধ পরী? তোমার এই সরল রূপেই তো আমি নিজের অস্থিত্ব কে তোমার অস্তিত্বে বিলিয়ে দিয়েছি।

মেঘা নামাজ পড়ার উদ্দেশ্য নিজেকে ওড়না দিয়ে আবৃত করে নিয়েছে। আর নিচে জায়নামাজ বিছিয়ে নিজেও তার উপর বসে নামাজ পড়তে লাগলো

আর এই সব আদ্রিয়ান দেখছে। আর মুগ্ধ হচ্ছে।

জান আর কিছু সময় অপেক্ষা করো। তোমার জন্য বড়ো সারপ্রাইজ অপেক্ষা করছে। আল্লাহর কাছে যা চাওয়ার চেয়ে নাও এরপর থেকে সব চাওয়া আমাতেই শুরু হবে আর আমাতেই শেষ।

বলেই আদ্রিয়ান বাকা হাসলো।

……………………………………………………………….

হ্যা হ্যা তোর মেয়ে ঠিক মত পৌঁছেছে। কোনো চিন্তা করিস না বন্ধু। ও এখানে একদম নিরাপদে থাকবে।

ফোন ধরছে না,, ও হ্যা,, তার ফোন টা নাকি আসার পথে কারো সাথে ধাক্কা খেয়ে ভেঙ্গে গেছে।

না না এখন টাকা পাঠাতে হবে না আমি কয়েক দিন পর কিনে দেবো।

এখন তো মেঘামনি ঘুমোচ্ছে। না না কোনো অসুখ করেনি। হয়তো এত দুর জার্নি করেছে তাই টায়ার্ড লাগছে। আমি পরে তোর সাথে কথা বলিয়ে দেবো।

আচ্ছা ঠিক আছে এখন রাখি বন্ধু। ভালো থাকিস

বলেই ফোন রেখে ভয়ে ভয়ে পিছনে তাকালো। কারণ তার কলিজার টুকরোর মাথায় রাইফেল ধরা। সাথে তার স্ত্রী আর নিজেরও।

খুব ভালো করেছেন আংকেল। স্যার যেইভাবে বলেছে ঠিক সেই ভাবেই কাজ করেছেন। সে যাই হোক এইভাবেই হ্যান্ডেল করেন আলতাফ স্যার কে। কোনো মতেই জানতে দিবেন না যে মেম আপনাদের সাথে নেই। কথার খেলাফ হলে আপনার স্ত্রী আর মেয়ে,,, বুঝতেই পারছেন। যতদিন না স্যার চাইছে ততদিন ওনার কথাই কাজ করেন। এতে আপনাদের মঙ্গল

বলেই আদ্রিয়ান এর গার্ড রা চলে গেলো।

ইনি হচ্ছেন আলতাফের এক বিশ্বস্ত বন্ধু। মারুফ হাসান। যার কাছে মেঘাকে পাঠাতে চেয়েছিল। কিন্তু কি থেকে কি হয়ে গেলো ।

আমাকে ক্ষমা করিস বন্ধু আমি তোর ভরসা রাখতে পারলাম না। আমার পরিবার যে ঝুঁকিতে ছিলো রে বন্ধু। আল্লাহ জানে মেয়ে টা কেমন আছে কে জানে। আমাকে মাফ করে দিস বন্ধু

ফ্ল্যাশব্যাক-

মেঘাকে তার আব্বু সিলেটের বাসে তুলে দেওয়ার জন্য খুব ভোরে স্টেশনে এসেছিল। এরপর বাস ছাড়লে তার আব্বুও অন্য কাজের উদ্দেশ্য চলে যায়। আর মেঘাও ভয়ে ভয়ে গাড়িতে বসে থাকলো। আব্বুকে তো আশ্বাস দিলো যেতে পারবে। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে খুবই ভুল করেছে। এখনও তো এক ঘন্টাও হয়নি। এরকম করতে করতে একসময় সে ঘুমিয়ে পড়ে। যখন ঘুম থেকে উঠে তখন প্রায় অনেকটায় চলে এসেছিল। হঠাৎ করেই পাশে কাও কে হুডি পড়ে বসে থাকতে দেখলো। কিন্তু ওর যতো টুকু মনে আছে ওর পাশে কোনো মহিলা বসে ছিলো। হয়তো নেমে গেছে। খুব পানি পিপাসা পেয়েছে দেখে ব্যাগ থেকে পানি নিয়ে গলাটা ভিজিয়ে নিলো। এরপর পানি রেখে ফোন টা হাতে নিয়ে টাইম টা দেখে নিলো। এখনও অনেক সময় বাকি দেখে মোবাইল ঘাটতে লাগলো। কিন্তু চোখের সামনে ঝাপসা ঝাপসা মনে হচ্ছে। মাথাটাও কেমন ঘুরছে। মাথাটা ধরতে ধরতে ফোন টা হাত থেকে পড়ে গেলো আর মাথাটাও পাশের হুডি পড়া লোকের কাঁধে পড়লো। আর সেই হুডি পড়া লোকটাও খুবই যত্নে আগলে রাখলো। আর মেঘার ফোনটা নিয়ে সিম খুলে ভেঙ্গে ফেললো। আর মোবাইলও জানালার বাইরে ফেলে দিলো।

“ওয়েলকাম জান। আমার রাজ্যর অধীনে তোমাকে স্বাগতম জান”

#চলবে_কি?

#নেশাময়_ভালোবাসার_আসক্তি
#পর্ব -১০
#নীলাম্বরী_সেন_রাধিকা

(কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। যদিও পোস্ট করেন লেখিকার নাম দিয়ে পোস্ট করবেন)

দিবা প্রহর কেটে রাত্রি হয়েছে। রাত্রির শেষভাগে আবার সোনালী সকাল। এই ভাবেই কেটে গিয়েছে ছয় দিন। মেঘার কাছে এই ছয় দিন খুব একটা খারাপ লাগে নি। অবশ্য লোকটার নাম জানা হয়েছে। আদ্রিয়ান চৌধুরী। লোকটাকে যতটা খারাপ ভেবেছে ততটা খারাপ না হলেও ধমক টা ঠিকই দেই। গন্ডার একটা। অবশ্য এর মধ্যে দুইবার পালানোর চেষ্টা করেছে কিন্তু সফল হতে পারেনি। তাই এখন পালানোর জন্য স্ট্রং একটি প্ল্যান করেছে। এখন কাজে লাগলে হলো। এই ভাবে বন্ধি জীবন বিরক্ত লাগছে তার।

সকাল সকাল আজ ঘুম থেকে উঠেই আদ্রিয়ান এর রুমে গিয়ে দরজায় নক করলো। অবশ্য তিন দিন পর থেকেই মেঘাকে রুমে আটকে রাখে না।

দুইবার নক করার পরও যখন কোনো সাড়া শব্দ পাওয়া যাচ্ছে না তখন দরজাটা হাল্কা খুলে ভেতরে ঢুকলো। রুম টি পুরো বরফের মত হীম শীতল হয়ে আছে। মেঘার সাথে সাথে শরীরের লোম গুলো দাড়িয়ে গেলো। শীতও লাগছে। পুরো অন্ধকার করে আছে রুমটি। হাঁটতে হাঁটতে বেডের পাশে গিয়ে আবছা ছায়ায় আদ্রিয়ান কে দেখা যাচ্ছে। উপর হয়ে খালি গায়ে শুয়ে আছে। সামনের সিল্কি চুল গুলো কপালে এলোমেলো হয়ে আছে। ইচ্ছে করছে চুল গুলো ঠিক করে দেই। কিন্তু পর মুহুর্তে নিজের ইচ্ছের উপর বিরক্ত হলো। ঘুমিয়ে যখন আছে তখন ডাকা টা ঠিক হবে না। পরে না হয় আবার আসবে বলে যেই পিছে ফিরবে ওমনিই হাতে টান পড়লে আদ্রিয়ান এর বুকের উপর পড়লো। হঠাৎ করে এমন হওয়াতে চিৎকার করে উঠলো তখনই

হূসস,,, চিৎকার করে কি আমার কানের বারোটা বাজাতে চাইছো?

মেঘা বড়ো বড়ো করে নিশ্বাস ফেলতে লাগলে

এইভাবে নিশ্বাস ফেলো না জান নিজেকে কন্ট্রোল করা কঠিন হয়ে পড়বে।

বলেই মেঘার সামনের ছোটো ছোটো চুল গুলো কানের পিছে গুঁজে দিলো। আর সেই স্পর্শে মেঘা হালকা কেপে উঠলো। সাথে সাথে চোখ দুটো বন্ধ করে ফেললো

আদ্রিয়ান মেঘার দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। এই যে মুখে ফোঁটা ফোঁটা পানি জমে আছে হয়তো ফ্রেশ হয়ে মুখও মুছেনি। কিন্তু এতেও খুবই মায়াবী লাগছে। মেঘা ছাড়া পাওয়ার জন্য ছোটা ছুটি করছে তখন আদ্রিয়ান আরেকটু শক্ত করে ধরে আরেকটু নিজের সাথে মিশিয়ে নিলো।

কি হলো ছাড়ুন

এসেছো নিজের ইচ্ছায় কিন্তু যাবে আমার ইচ্ছায় জান।

বলেই কানের লতিতে হালকা কামড় মারলে মেঘা আদ্রিয়ান এর লোমশ বুকে তার হাতের নখ ধারা চেপে ধরলো জোরালো ভাবে।

মেঘার থেকে অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছে। বুকের বাম পাশের ছোট্ট মাংসপিণ্ড টা খুব দ্রুতই লাফালাফি করছে। এমন কেনো হচ্ছে। আমার তো এই গন্ডারের স্পর্শ ভালো লাগার কথা নয়। কিন্তু

সারাদিন কি আমার উপরই থাকার ইচ্ছে আছে

আদ্রিয়ান এর কথাই হুস আসলো। এরপর তাড়াতাড়ি আদ্রিয়ান এর বুক থেকে উঠে পড়ল। আর ওমনিই রুম থেকে দৌড় মেরে বেরিয়ে গেলো। আদ্রিয়ান মেঘার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলো। তার স্নিগ্ধ পরীর মনে একটু একটু অনুভূতি উদয় হচ্ছে তার জন্য।

…………………………………………………………………

মেঘা তাড়াতাড়ি নিজের বরাদ্দকৃত রুমে এসে হাঁপাতে লাগলো। কি হচ্ছে তার সাথে? কি করতে গেলো আর কি হলো। তাড়াতাড়ি ওয়াশরুমে গিয়ে মুখে পানি ঝাপটিয়ে নিজেকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করলো

না না,, এখানে আর থাকা যাবে না। তানাহলে ওই অদ্ভুত পুরুষটির মায়াজালে আটকে পড়বো। কিন্তু কিভাবে কি করবো? সব কিছুই তো এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। কি বিশ্রী ব্যাপার। উফফ

…………………………………………………………….….

কিরে তনু মা তোর কি হয়েছে? তুই ঘর থেকে
তেমন বের হোস না। কারো সাথে তেমন কথাও বলিস না। কলেজেও যাচ্চিস না। সামনে তো পরীক্ষা মা তোর, এই ভাবে করলে চলবে বল মা

তন্বী জানালার পাশে দাড়িয়ে দাড়িয়ে বাইরের দৃশ্য দেখছিল। চোখ মুখ শুকিয়ে গেছে, চোখের নিচেও কালি পড়েছে। মনে হয় অনেক দিন ঘুম হয় না। হবে কি করে রাত্রির বেশির ভাগ সময় তো সায়নের সাথে কথা বলে কাটাতো। কিন্তু এখন তো ভেবেই দীর্ঘ নিশ্বাস ফেললো। হঠাৎ করেই মায়ের আওয়াজ পেয়ে ভাবনার জগৎ থেকে বের হলো

অমন কিছু হইনি আম্মু। শরীর টা ভালো লাগছিলো না। আর নিজেকেও তো একটু রিফ্রেশমেন্ট দেওয়া দরকার তাইনা মা!

তোর আবার কিসের রিফ্রেশমেন্ট? সব সময় তো হাসি খুশিই থাকিস

বেশি হাসি থাকি তো তাই চেষ্টা করছি একটু দুঃখী থাকার। তানাহলে হাসির চেহারায় নজর পড়বে যে আম্মু

কি হয়েছে রে মা তোর? আম্মুকে বল মা। আমিতো তোর মা কম বেস্ট ফ্রেন্ড বেশি। খুলে বল মা হয়তো তোর সমস্যা সমাধান করতেও পারি

মায়ের এরূপ কথা শুনে আর নিজেকে আটকে রাখতে পারেনি হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলো। তন্বীর আম্মুও মেয়েকে কাঁদতে দিলো।

আম্মু আমি হেরে গেছি গো। মানুষ চিন্তে ভুল করেছি আম্মু। আম্মু আমার সাথে কেনো এমন হলো? ও আম্মু বলোনা

এরপর তন্বী তার মাকে সব কিছু খুলে বললো। এরপর তন্বীকে বেডের কাছে বসিয়ে টেবিল থেকে পানির গ্লাস থেকে ঢাকনা ফেলে তন্বীকে দিলো। তন্বী কোনো দ্বিরুক্তি ছাড়াই পানি টা খেয়ে নিলো। এরপর তন্বীর আম্মু বিছানায় সুন্দর করে বসে তন্বীকে তার কোলে মাথা রাখতে বললে তন্বী সাথে সাথেই মায়ের কোলে মাথা রেখে গুটি মেরে শুয়ে পড়লো। এরপর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে

দেখ মা আমরা জন্ম থেকে কিছু শিখে আসিনা। দেখতে দেখতেই শিখি। মানুষের পাঁচ আঙ্গুল যেমন সমান নয় তেমনই মানুষের ব্যক্তিত্বও সমান নয়। মানুষ তো কত জনকে ঠকায় নিজেও ঠকে। তুইও ঠকে ছিশ। কিন্তু একটা কথা কি চিন্তা করে দেখছিস সায়ন যদি তোর সর্বনাশ করে দিতো তখন তো তার উদ্দেশ্য সফল হয়ে যেতো। আর তোর জীবন টাও শেষ হয়ে যেতো। কিন্তু আল্লাহর অশেষ কৃপায় তার উদ্দেশের আগেই সব কিছুই তোর সামনে চলে আসছে। তোর যদি কিছু হতো তাহলে আমাদের কি হতো একবার ভেবে দেখিস। মারে দুনিয়া বড্ড খারাপ। ওই খারাপ থেকেই আমরা বেরিয়ে আসতে পারলে আমাদের জীবন সুন্দর হয়। নইলে অন্ধকার জগতে তলিয়ে যায়। তাই অন্ধকারে কি হয়েছিল তার থেকে শিক্ষা নিয়ে আলোর পথে পা দে। দেখবি খুব সুখে থাকবি। আর আমি জানি আমার মেয়েটা খুব স্ট্রং। সে পারবে। তাইনা আম্মু?

এতক্ষন মনোযোগ দিয়ে মায়ের কথা শুনছিল তন্বী। সত্যি ভাগ্য করে এমন একজন মা পেয়েছে।

অবশ্যই আম্মু। কিন্তু আমার একটু সময় দরকার। কিন্তু প্রমিজ করছি আম্মু খুব জলদিই তোমার হাসি খুশি মেয়েকে ফেরত পাবে।

এইতো আমার লক্ষ্মী মেয়ে। ঠিক আছে অনেক কথা হয়েছে এখন খেতে আয়। তোর পছন্দের ডিমের কোরমা করেছি ঝাল ঝাল করে।

তুমি যাও আমি ফ্রেশ হয়ে আসছি

ঠিক আছে

বলেই তন্বীর মা চলে গেলো। আর তন্বী তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হয়ে ডাইনিং রুমে গেলো।

…….…………….………………………………………………

মেঘা বসে বসে বোর হচ্ছিলো। তখনই একজন সার্ভেন্ট এসে দরজায় নক করে ঘরে প্রবেশ করলো

মেম,, স্যার আপনাকে এই ড্রেস টা পড়ে পনেরো মিনিটের মধ্যে নিচে যেতে বলেছে।

কি ব্যাপার এই গন্ডার টা কোথায় নিয়ে যাবে(মনে মনে)

তোমাদের স্যার কিছু বলেছে কি কোথায় নিয়ে যাবে?

না মেম ওই বিষয়ে কিছু বলেনি।

ঠিক আছে তুমি যাও আমি কিছুক্ষন পর আসছি

সার্ভেন্ট চলে গেলে প্যাকেট টি খুলে দেখলো ব্লু কালারের কাজ করা খুব সুন্দর একটি গাউন। সাথে স্টুনের উপর কাজ করা খুব সুন্দর একটি হিজাব। দেখেই বোঝা যাচ্ছে অনেক দামি হবে। ড্রেস টি নিয়ে ওয়াশরুমে গিয়ে চেঞ্জ করে এসে নিজেকে হালকা পরিপাটি করে চুল গুলোকে বেঁধে হিজাব সেট করে নিল। চোখে হালকা কাজল, ঠোঁটে হালকা লিপস্টিক আর মুখে হালকা প্রসাধনী দিয়ে নিজেকে আয়নায় দেখলে নিজেই অবাক হয়ে যাই। এত অল্প সাজেও খুব সুন্দর লাগছে।

মেম,, স্যার জলদি যেতে বলেছে

হ্যা হ্যা আসছি। হয়ে গেছে

বলেই তাড়াতাড়ি নিচে নামতে লাগলো। এরপর মেইন দরজার বাইরে গেলে দেখে আদ্রিয়ানও মেঘার সাথে ম্যাচিং করে ব্লু কালারের ড্রেস পড়েছে। ভেতরে সাদা শার্ট। উপরের ব্লু ব্লেজার, কোট,প্যান্ট পড়েছে। মেঘা আদ্রিয়ান এর দিকে তাকিয়ে হালকা ক্রাশ খেলো। এরপর নজর সরিয়ে নিজের উপস্থিতি বুঝানোর জন্য হালকা গলা ঝাড়ল

আদ্রিয়ান এত ক্ষন অফিসের ইম্পর্ট্যান্ট ডকুমেন্ট গুলো চেক করছিলো মোবাইলে। হঠাৎ গলা ঝাড়া পেয়ে সামনের দিকে কিছুক্ষন তাকিয়ে বুকের মধ্যে হাত দিলো। এই ছোট্ট জান টাকে আজ অনেকটায় বড়ো মনে হচ্ছে। ইচ্ছে করছে এই বুকেই লুকিয়ে রাখি।যেনো কেউ তার জান কে না দেখে। অবুঝ পরী যে তার।

এই যে শুনছেন! কতক্ষন ধরে তো দাড়িয়ে আছি কোথায় যাবেন?

গেলেই দেখতে পারবে

বলেই গাড়ির দরজা খুলে দিয়ে মেঘাকে বসতে বললে উঠে বসলো। এরপর নিজেও বসলে ড্রাইভার গাড়ি স্টার্ট দিলো

প্রায় ত্রিশ মিনিট পর কোনো এক সাজানো ফার্ম হাউসে আসে। গাড়িটি যখন গেট দিয়ে ঢুকছিল তখন চারিদিকে ফেরিলাইটের আলোতে গাছের জীবন্ত ফুল গুলো যেনো আরো জীবন্ত মনে হচ্ছে। গাড়ি মেইন দরজার সামনে এসে থামলে একজন গার্ড এসে আদ্রিয়ান এর পাশের দরজা খুলে দিলো । সে বের হয়ে কোট পরে নিলো। এরপর মেঘার পাশের গাড়ির দরজা খুলে দিয়ে হাত বাড়িয়ে দিলো মেঘাও কোনো দ্বিরুক্তি না করে হাতে হাত রাখলো। কিন্তু এতে হালকা লজ্জা পেলো। কেনো যে সে এসবে সাই দিচ্ছে সে নিজেও জানে না।

আদ্রিয়ান মেঘাকে গাড়ি থেকে বের করে হাত ধরে নিয়ে যেতে লাগলো ভেতরে। ভেতরে গিয়ে মেঘা অবাক হয়ে গেলো। বাইরে থেকে বাড়িটিকে ঐতিহ্যবাহী বাড়ি লাগলেও ভেতরে খুবই আলিশান ভাবে সাজানো। ভেতরে প্রবেশ করতে করতে মেঘা সামান্য এগিয়ে গেলো। ওমনিই লাইট নিভে গেলো। ছোটো ছোটো ফেরি লাইট গুলোর আবছা আলোয় কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। আবার সাথে সাথে বড়ো একটি লাইটের ফোকাস তার উপর পড়লো(এই লাইট গুলোকে কি বলে আমি ঠিক জানি না) আর উপর থেকে ফুল ঝরতে লাগলো। এত এত ফুলের বর্ষণ দেখে মেঘার মন টা ছোটো বাচ্চার মতো হয়ে গেলো। প্রাণোচ্ছল হাসি দিয়ে ঘুরতে লাগলো। এরপর তার সামনে আরো একটি লাইট ফোকাস ফেললো। কেউ একজন রজনীগন্ধার তোরা নিয়ে সামনে এসে হাঁটু গেড়ে বসলো। এরপর মুখ তুলে মেঘার দিকে সম্মোহিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে

জানি না কিভাবে শুরু করবো। কিন্তু তোমার হৃদয়কাড়া হাসির সুর যবে থেকে হৃদয়ে ঠাই নিয়েছে তবে থেকে শান্তি নেইগো। প্রত্যেক মুহুর্ত জ্বালাতন করেছে , জ্বালাতন করেছে তোমার ঐ অনুপস্থিতিতে। কিন্তু বেশিক্ষন অনুপস্থিত রাখিনি যেভাবেই হোক নিয়ে এসেছি তোমায় এই অন্ধকার মানবের কাছে। কখনোই এমন অনুভূতি হয়নি যেমনটি তোমার কাছে আসাতে হয়। কিন্তু কাছে থাকা সত্ত্বেও তুমি অনেক দূরে। আমাকে তোমার কাছে থাকার অনুমতি দিবে হা হবে পবিত্র বাঁধনের ডোরের সুতায় গাঁথা থাকবে।

“উইল ইউ মেরি মি স্নিগ্ধ পরী??”

#চলবে_কি?