নোলক পর্ব-০৩

0
189

#নোলক
পর্ব ৩
#তানিয়া_মেধা

পদ্মর মন আজ ভীষণ খুশি কারণ সে কাকার বাড়ি যাবে। পদ্মর মা বাবা মারা গেছে ৪ বছর আগে তারপর থেকে চাচার কাছেই থাকে সে। চাচি একটু ঝামেলা করতো কিন্তু চাচা বেশ আদর করতো কিন্তু চাচির ভয়ে প্রকাশ করতে পারতো নাহ এতো।

ব্যাগ গুছাচ্ছিল আর এগুলো ভাবছিল পদ্ম। তখনই শুভ্র এসে পদ্মকে বলে,’ রেডি হও জলদি যেতে হবে তো।’

শুভ্রর কথয় পদ্ম দাড়িয়ে বলে, ‘ আমি রেডি আছি। ‘.

শুভ্র একবার পদ্মকে মাথা থেকে পা অব্দি দেখলো। কলা পাতা রং এর শাড়ি পড়েছে। এই শাড়িতেই তাকি একদম টিয়া পাখি লাগছে৷ পদ্ম চুল গুলো কোপা করা ছিল। শুভ্র গিয়ে চুলগুলো ছেড়ে দেয়। পদ্ম একটু বিরক্ত গলায় বলে, ‘ কি করছেন গরম লাগে।’

এই বলে চুল বাঁধতে যাবে তখনই শুভ্র হাত ধরে বলে, ‘ একদমই নাহ। আমি বাতাস করবো চুপচাপ এভাবে চলো।’

পদ্ম কি করবে আর একটা তপ্ত শ্বাস ছেড়ে এভবেই যায়৷ তবে শুভ্র সারা রাস্তা তাকে বাতাস করে তার কথা মতো যদিও পদ্ম গাল ফুলিয়ে ছিল।

******
পদ্মর কাকি রহিমা পদ্মকে দেখে সাথে ব্যাগ দেখে তেলে বেগুনে জ্বলে উঠে৷ তেড়ে এসে বলে, ‘ কিরে মুখপুরি তুই ঐ বাড়ি ঝামেলা করে এসেছিস। হায়রে আমার কপাল এই ডাইনিকে ঘাড় থেকে তো নামানো যাচ্ছে নাহ।’.

পদ্ম অবাক নয়নে তাকিয়ে আছে রহিমার দিকে।এদিকে শুভ্র গাড়ি সাইড করে বাড়ির ভিতরেই আসছিল রহিমার কথা শুনে দাড়িয়ে যায় আড়ালে। পদ্মকে আরও অবাক করে দিয়ে রহিমা চর মেরে বলেন, ‘ যা কালনাগিন এনতে বাহির হইয়া যা। তুই আর এক মিনিট ও এনে থাকবি না সংসারে ফিইরা যা।’

এবার শুভ্র বাহিরে এসে চাচির উদ্দেশ্যে বলে, ‘ বাহ আপনি তাহলে ওর মায়ের মতো এটা মায়ের ধরণ।’

রহিমা শুভ্রকে দেখে ইতস্ত বোধ করতে শুরু করলো। একটু হাসার চেষ্টা করে বলেন, ‘ আরে জামাই আসো। ‘

শুভ্র তেজি গলায় বলে, ‘ যেই ঘরে আমার স্ত্রীকে অসম্মান করা হয় সে ঘরে যাবো নাহ।’

এবার পদ্মর দিকে তাকিয়ে বলে, ‘ এদের জন্য কাদছিলে! ‘

পদ্ম মাথা নিচু করে রাখে। কি আর বলবে সে? বলার তো নেই কিছু। কাকি তাকে আগে সহ্য করতে পারতো নাহ কিন্তু বিয়ের পর যে আরও সহ্য করতে পরবে নাহ জানা ছিল নাহ তার৷ শুভ্র পদ্মর হাত ধরে বলে, ‘ এ বাড়িতে আর নয় চলো।’

শুভ্র দরজা থেকেই পদ্মকে নিয়ে চলে যায়। রহিমা সেখানেই দাড়িয়ে থাকেন। কি করবেন এখন তিনি। টাকা আসার পথ তো বন্ধ হয়ে গেছে। রহিমা মনে মনে নিজেকে গালি দিতে থাকে।

********
সাবানা গালে হাত দিয়ে মুনিরার দিকে তাকিয়ে আছেন। মুনিরা রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বলেন, ‘ তোর সাহস কি করে হয় ঐ মেয়ের জন্য নোলক চুরি করার আমার ছেলের বউ আমি পছন্দ করবো কাকে নোলক পরাবো।’

সাবানা গালে হাত দেওয়া অবস্থায় জিজ্ঞেস করে, ‘ সত্যি ছেলে তোমার? ভুলে যেও না শুভ্র…..

সাবানাকে পুরোটা শেষ করতে না দিয়ে তেজি গলায় বলে, ‘ সাবধান নয়তো এই বাড়িতে তোর আর ঠাই হবে না। ‘

সাবানা আর কিছু বলে নাহ। আড়াল থেকে সব শুনে ফেলে দিলোয়ার। শুভ্র মুনিরার ছেলে নয় মানে? কি বলতে চায়ছিল সাবানা। দিলেয়ারের মাথায় যেন হাজারটা প্রশ্ন ঘুরছে। কোথায় পাবে সে এই প্রশ্নের উত্তর? সাবানা হ্যা ঐ দিতে পারবে তার সকল অজানা তথ্য।

এগুলো ভেবে দিলোয়ার ঐখান থেকে চলে যায়। সাবানা কে শাসিয়ে চলে যায় মুনিরা। সাবানা সেখানেই বসে কাঁদতে থাকে। আল্লাহ কেন তার সাথে এমন করছে? কোন পাপের শাস্তি দিচ্ছে আর তো ধৈর্য ধরতে পারছে নাহ। কেন সে দিলোয়ার এর দ্বিতীয় স্ত্রী হলো কেন একটা স্বাভাবিক জীবন মিলল নাহ তার

২৫ বছর আগে
সাবানা কনের সাজে বসে আছে বিছানায়। গায়ে তার লাল টুকটুকে শাড়ি মুখে একটু মেকআপ আর ঠোঁটে গাড় করে লাল লিপস্টিক দেওয়া পায়ে আলতা। দেখতে বেশ লাগছে সাবানাকে।

সাবানা বিছানায় বসে ছিল তখনই শোরগোল শুরু হয়। জমিদার পুত্র দিলোয়ার ঝামেলা করছে সাবানাকে বিয়ে করতে। সাবানার বাবা দিলোয়ারের হাতে ধরে বলেন, ‘ মালিক দয়া কইরা ঝামেলা করবেন নাহ আমার মাইয়াডার জীবন শেষ হয়ে যাবে। ‘

এবার দিলোয়ার তেতে উঠে বলে, ‘ হয় আমার বাপের পাওনা টাকা দে নয়তো তোর মেয়েকে আমার সাথে বিয়ে দে।’

সাবানার বাবা অশ্রভরা চোখে বলেন, ‘ টাকা তো নাই।’

দিলোয়ার এবার হাসি দিয়ে বলে,’ তাহলে তোর মেয়েকে দে।’

এই বলে পাত্রপক্ষকে বিদায় করে দিল। শেষমেশ উপায় না পেয়ে দেলোয়ারের দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে এ বাড়ি আসলো। একমাত্র ঘৃণার পত্র ছিল দিলোয়ার। মুনিরা তাকে সুযোগ পেলেই নির্যাতন করতো কিন্তু আসতে আসতে সে ঐ ঘৃণিত লোকটাকেই ভালোবেসে ফেলে৷ একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে সে।

বর্তমান
সাবানা উঠে চলে যান নিজের রুমে দরজা লাগিয়ে কাঁদতে শুরু করে।

*******
মুনিরা লোক আনালো কল দিয়ে। পদ্মকে এ বাড়ি থেকে তাড়াতে। তার ভাই ভাবি আর ভাইয়ের মেয়ে আজকেই তারা আসছে। কল কেটে হল রুমে আসতেই সদর দরজায় শুধু শুভ্রকে একা দেখে খুশি হয়ে যায় সে। মুখে একটা বিজয়ের হাসি ফুটে ওঠে এই ভেবে যে শুভ্র পদ্মকে রেখে এসেছে কিন্তু পরক্ষণেই সেই হাসি মিলিয়ে যায় পদ্মকে শুভ্রর পিছনে দেখে।

পদ্ম মুনিরাকে দেখে একটা জ্বালাময়ী হাসি দিয়ে পাশ কাটিয়ে চলে যায়। পদ্মকে দেখে যেন মুনিরা তেলে বেগুনে জ্বলে উঠে। দাঁতে দাঁত চিপে বলেন, ‘ যত খুশি হেসে নে এই হাসিই শেষ হাসি হবে।’

সন্ধ্যার দিকে হৈ-হুল্লোড় শুনে নিচে নেমে আসে পদ্ম। নিচে নেমে দেখে মুনিরা আর একটা মেয়ে সামনাসামনি দাড়িয়ে। আর পাশে দাড়িয়ে আনন্দ করছিল দুজন। মুনিরা একটা নোলক বের করে বলেন, ‘ তোকে আমার ছেলের বউ হিসেবে মানতে চায়। ‘

এই বলে নোলকটা মেয়েটার নাকের দিকে নিচ্ছিল। তখনই পদ্ম খপ করে নোলকটা নিয়ে নেয়। মুনওরা রাগী গলায় বলেন, ‘ এই মেয়ে নোলক দাও।’

পদ্ম তখন তেজি গলায় মুনিরার দিকে তাকিয়ে বলে, ‘ আমি পদ্ম জমিদার বাড়িতে তাকিয়ে বলছি এই নোলক আমার নাকেই উঠবে আর আমার শ্বাশুড়িই পড়াবে আমাকে। আমি পদ্ম বেঁচে থাকতে এই নোলক আর কারো হবে না। ‘

এই বলে পদ্ম চলে যায়। রাগে তার শ্বাস ঘন হয়ে আসছে। তার অধিকার মুনিরা অন্য কাউকে দিয়ে দিচ্ছিল। পদ্ম বুঝতে পারে এভাবে হবে না তাকে কঠোর হয়ে মাঠে নামতে হবে।

পদ্ম আয়নায় একবার নিজেকে দেখে হাসে।

******
মুনিরা তার ভাই সজল, তার ভাবি জোছনা আর তার ভাইয়ের নয়না বসে আছে। মুনিরা তার ভাইয়ে হাত ধরে বলে, ‘ ভাই দেখ ঐ মেয়েটা আমার ছেলেকে কালো জাদু কইরা বশে নিয়ে বিয়ে করছে কিন্তু আমি নয়নারেই আমার পূত্র বধূ বানাতে চাই। ‘

সজল বোনকে আস্বস্ত করে বলেন, ‘ চিন্তা করিস নাহ আমার মেয়েকে তোর ছেলের হাতেই তুলে দিবো।’

মুনিরা বেশ খুশি হয়। এবার পদ্ম যাবে কোথায় এটা ভাবতেই মনে মনে অট্টহাসিতে ফেটে পরে সে। তার ছেলেকে তার কাছ থেকে দূরে সড়ানো তার বিরুদ্ধে নেওয়া এবার বুঝবি তুই কত ধানে কত চাল। মুনিরা এগুলো ভেবে একটা মুচকি হাসি দেয় নয়নার দিকে তাকিয়ে।

চলবে?