অপ্রিয় প্রাক্তন পর্ব-১৯+২০

0
274

#অপ্রিয়_প্রাক্তন
১৯তম_পর্ব
~মিহি

-“আরে নিষাদ এসেছো? এসো ভেতরে এসো। বেশ তাড়াতাড়িই তো এসেছো, কল করার তো বোধহয় এক ঘণ্টাও হয়নি।” নিশাতের মা নাহার বানু মিষ্টি হেসে বললেন।

-“জ্যাম ছিল না তাই তাড়াতাড়ি এসে পড়েছি আন্টি।”

-“বসো। আমি শরবত আনছি।”

নাহার বানু চলে গেলেন। তিরার বিস্মিত দৃষ্টি প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বেড়াতে ব্যস্ত। সামান্য চিন্তাভাবনাতেই সে বুঝে গেল অর্ণব তার জন্য আসেনি। তিরার ইচ্ছে করলো নিজের গালে নিজেই থাপ্পড় দিতে। সে এটা ভাবলোই বা কেন যে অর্ণব তার জন্য এসেছে? এটাই তো তার বোকামি। অর্ণবের আত্মীয়ের বাড়ি এটা, সে আসতেই পারে। তিরার জন্য আসবে এ কথার তো আদতে কোনো ভিত্তিই নেই তবুও তিরার খানিকটা মন খারাপ হলো। অর্ণব তার জন্য আসেনি বিষয়টা তার মনে অল্পবিস্তর প্রভাব ফেলছে ঠিকই। তিরা চুপচাপ ঘরে এসে বসে পড়লো।

-“কী রে? নিষাদ ভাইয়া এসেছে?”

-“হুম। আন্টি কল করেছিল ওনাকে তাই এসেছে।”

-“ওহ। তোমার তাহলে এজন্য মন খারাপ যে তোমার কথাতে সে আসেনি?”

-“বাচ্চাদের মতো কথা বলিস না তো নিশু। উনি আমার কথায় কেন আসবে? কোনো কারণ কি আছে? না নেই!”

-“চুপ কর, চল ছাদ থেকে ঘুরে আসি।”

-“হুম চল।”

সিঁড়ি বেয়ে ওঠার সময় তিরার দৃষ্টি আবারো অর্ণবের উপর পড়লো কিন্তু অর্ণব খেয়াল করলো না বোধহয়। একবার তাকালোও না তিরার দিকে। তিরার কিছুটা মন খারাপ হলো। সে অর্ণবকে ভদ্র ভেবেছিল কিন্তু এ তো ইগোইস্টিক।

-“তুই সত্যিই নিষাদ ভাইয়ার টপিক নিয়ে সিরিয়াস না?”

-“মোটেও না। এই বিষয় নিয়ে সব আলাপ আলোচনা বাদ। ওনাকে নিয়ে ভাবার আমার সময় নেই।”

-“আচ্ছা বুঝেছি।”

নিশাত খেয়াল করলো দরজার কাছাকাছি অর্ণবের আসার শব্দ। নিশাত চটজলদি লুকিয়ে পড়লো। তিরা সামনের দিকে মুখ করে ছিল বিধায় দেখতে পারেনি ঠিকমতো। অর্ণব এসে তিরার পাশে দাঁড়িয়ে পড়লো। তিরা তখনো টের পায়নি। এমনকি তার পাশে যে নিশাত নেই, এটাও সে খেয়াল করেনি।

-“তো কী ভাবা হচ্ছে?” আচমকাই অর্ণবের ডাকে খানিকটা ভ্যাবাচাকা খেল তিরা। চোর ধরা পড়লে চোর যেমন থতমত করে, তিরা তেমন করতে লাগলো। অর্ণব মুচকি হাসছে। বাচ্চা মেয়েটার বাচ্চামিটুকুই বড্ড মন কাড়ে অর্ণবের।

-“কিছু না আর থাকলেও আপনাকে কেন বলবো?

-“আরে আমি তো তোমার ভালোর জন্য বলতেছি। কথা মনে চেপে রাখলে এসিডিটি হবে।”

-“ডাক্তার হয়েও এসব আলতুফালতু লজিক কোথায় পান আপনি? সরুন আমি নিচে যাবো।”

অর্ণব জোর করতে পারলো না। কাউকে কোনো বিষয় নিয়ে চাপ দেওয়া তার পক্ষে হয়ে উঠে না। তিরা চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই বেখেয়ালে পা পিছলে যায় তিরার। অর্ণব তৎক্ষণাৎ দু’হাতে আঁকড়ে ধরে তাকে। তিরা নিজেকে সামলে অর্ণবকে ধন্যবাদ জানায়। অতঃপর ছাদ থেকে নেমে নিচে চলে যায়। অর্ণব তখনো ছাদেই দাঁড়িয়ে। সে যে তিরার জন্য এসেছে এটা তিরাকে জানতে না দেওয়াই ভালো। তার চেয়ে বরং ভুলটাই বুঝুক। অর্ণব রেলিংয়ে দু’হাত রেখে সামনের পানে তাকালো। নিশাত তৎক্ষণাৎ আড়াল থেকে বেরিয়ে চুপচাপ নিচে নেমে গেল। ভাগ্যিস সে লুকিয়েছিল নাহলে দুজনের এমন সিনেম্যাটিক সীনটা মিস করে যেত না? মুখ টিপে হাসছে নিশাত।

____________________________

-“উহুম…উহুম…”

-“যক্ষ্মা রোগীর মতো করে কাশতেছিস কেন? কী বলবি বললেই হয়।”

-“না মানে তুই শিওর তোর আর ভাইয়ার মধ্যে কিছু নাই?”

-“শতভাগ! তুই আবার কেন এসব নিয়ে পড়লি?”

-“না আসলে ছাদে…ঐ যে পড়ে যাওয়া তারপর ধরে ফেলা…ভাবলাম কিছু একটা কেমিস্ট্রি তো আছে কিন্তু আমি জানতে পারতেছি না।”

তিরা আশঙ্কিত হয়ে উঠলো। নিশাত ছাদের ঘটনা দেখেছে! সে কি তিরাকে ভুল বুঝবে এখন? সে কি মনে করবে তিরা কতটা নির্লজ্জ যে নিয়নকে ভুলে এখন আরেকজনের সাথে সম্পর্কে জড়ানোর চেষ্টা করছে? তিরা ঘাবড়ালো। নিশাত আলতো করে ধাক্কা দিতেই খানিকটা ভয় পেয়ে সরে বসলো সে।

-“তিরা..কী হলো তোর? ভয় পেলি কেন এমন?”

-“কি…কিছু না! আমি বাসায় যাবো, একটা জরুরি কাজ মনে পড়েছে।”

-“আরে এখনি কেন যাবি? এখনো তো খাওয়া-দাওয়াই করিসনি। মা মোটেও ছাড়বে না তোকে।”

-“আমি তোর রুমের দরজা দিয়ে গেলাম। ড্রয়িংরুম দিয়ে যাবো না। তুই আন্টিকে ম্যানেজ করে নিস।”

নিশাতকে আর একটা কথাও বলতে দিল না তিরা। চুপচাপ দ্রুতগামী রেলের মতো প্রস্থান করলো। নিশাত অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে তিরার যাওয়া দেখল। তিরা এতটা অদ্ভুত ব্যবহার তো কখনো করেনি তার সাথে। হঠাৎ কী হলো?

তিরা রিকশায় বসে দু’হাতে মুখ ঢেকে নিল। নিঃশ্বাস আটকে আসছে তার। নিয়নের সাথে ব্রেকাপের পরবর্তী মুহূর্তগুলো ভেসে উঠছে যখন আবির ভাইয়া তাকে কল করেছিল। সেই দশ মিনিটের ফোনকলের কথা ভাবতে তিরা এখনো শঙ্কায় ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ে। আবির ভাইয়া বলেছিল, নিয়ন নাকি তিরাকে জঘন্য বলেছে। তিরার চরিত্রের ঠিক নেই, একজন দিয়ে হয়না। এই কথাগুলো তিরা কাউকেই বলতে পারেনি। নিশাতকেও না। কথাগুলো নিজের মনেই লুকিয়ে রেখেছে সে। যতবার নতুন করে কারো সাথে সম্পর্কে জড়ানোর কথা ভেবেছে তখন এই কথাগুলো তার কানে ঝঙ্কার তুলেছে। তিরা আবিরের কথা বিশ্বাস করতে পারেনি কখনোই তবুও কষ্ট ঠিকই পেয়েছে। তিরা প্রতিমুহূর্ত শুধু দোয়া করেছে নিয়ন যদি সত্যিই কথাগুলি বলে থাকে তবে তা যেন কেবল দূরে থাকার জন্য হয়ে থাকে। তিরা অসহায়ের মতো কল করলে নিয়নের রূক্ষতার মাঝে হুটহাট ‘ভালোবাসি’ বলা তিরাকে ক্ষীণ আশা দিয়ে গেছে। তিরা এগোতে পারেনি, এগোনোর চেষ্টাও করতে পারছে না এখন। আজ নিশাতের বলা সামান্য কথাতেও সে মারাত্মক প্রভাবান্বিত হয়ে পড়ছে। তিরা অনুভব করতে পারছে তার মেন্টাল হেলথকে সম্পূর্ণ তছনছ করে চলে গেছে নিয়ন নামটা, তিল তিল করে মানুষকে যন্ত্রণা দেওয়ার উপযুক্ত শিক্ষক হতে পারতো সে। এতকিছুর পরেও তিরা কেন যেন নিয়নকে ঘৃণা করতে পারেনা। তিরার মন বলে নিয়ন না থাকলে সে জীবনে বড্ড দুর্বল হয়েই থাকতো। এখন হয়তো দুর্বলতাটা শুধু নিয়নের প্রতি কিন্তু আগে প্রতিক্ষেত্রে তা ছিল। তিরা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। হাতে নিয়নের দেওয়া আংটিটা। তিরা আংটিটা খুললো। রিকশাওয়ালাকে বলে রিকশা থামালো। বাড়ির কাছাকাছিই এসে পড়েছে। ব্রিজ পেরোলেই বাড়ির মূল রাস্তা। রিকশাওয়ালাকে ভাড়া দিয়ে ব্রিজের উপর দাঁড়ালো তিরা। নদীর প্রবাহমান জলের দিকে অপলক তাকিয়ে অতঃপর আংটিটার দিকে তাকালো। এক পলকের ব্যবধানে আংটিটা তিরার হাত হতে নদীর জলে পতিত হলো। নদীর অতল গভীরে হারাতে ক্ষণিক সময়টুকুই লাগলো তার। তিরা ব্রিজের উপর দাঁড়িয়ে শান্ত দৃষ্টিতে কেবল পর্যবেক্ষণ করলো মুহূর্তটা। এ আংটি হারানোর যন্ত্রণায় একসময় সে কান্না করেছিল দীর্ঘক্ষণ অথচ আজ কোনো অনুভূতিই নেই তার মনে।

“তোমার উপস্থিতি আমার জীবনে এই আংটির ন্যায়ই হারালো নিয়ন। অনেক পুড়েছি আমি, এবার সময় হয়েছে এ দহন থেকে বেরোনোর। একটা মানুষের তোমার থেকে নাটক শেখা উচিত নিয়ন। জীবনটা তোমার কাছে স্ক্রিপ্ট! অনুভূতির কথাগুলোও স্ক্রিপ্টেড তোমার। এখন তোমার এই মিডিয়া জগত থেকে আমি নিজেকে ছাড়িয়ে নিলাম।” তিরা হাসলো কিঞ্চিত। এ হাসি বোধহয় একটু প্রশান্তির। নিয়ন নামক মানুষটার থেকে চিরতরে নিজেকে মুক্ত করার যে সিদ্ধান্ত তিরা নিয়েছে তা ভেবে তিরার ঠোঁটের কোণা প্রসারিত হলো। তিরা সেখানে দাঁড়িয়েই ফোন থেকে নিয়নের সমস্ত ছবি ডিলিট করলো। নিয়ন সংক্রান্ত যা কিছু ছিল সব শেষ করার পর তিরা অনুভব করলো একটু হালকা অনুভব হচ্ছে। একটা অনর্থক বোঝা দীর্ঘদিন ধরে বয়ে বেড়ানোর প্রহর থেকে নিজেকে মুক্তি দিল তিরা।

_______________________

-“তিরা কোথায়? খেতে ডাক ওকে। একসাথেই খাই।” নাহার বানু খাবার বাড়তে বাড়তে বলে উঠলেন।

-“মা..ওর কী জানি কাজ পড়ে গেছে তাই চলে গেল।”

নিশাতের কথা শুনে অর্ণব খাওয়া থামিয়ে ক্ষণিক তার দিকে তাকালো। সত্যিই কাজ পড়েছে নাকি তিরা তাকে এড়িয়ে যেতে চাইলো?

-“তোর কি আক্কেল নাই নিশাত, ওকে এভাবে যেতে দিলি কেন তুই? বস, আমি তোর প্লেট নিয়ে আসছি।”

নিশাত মন খারাপ করে অর্ণবের মুখোমুখি চেয়ারটাতে বসলো।

-“তিরা কেন চলে গেছে নিশাত? ও কি আমি এখানে আসার কারণে..”

-“না ভাইয়া, সেরকম কিছু না। ও হঠাৎই আপসেট হয়ে পড়লো কেন যেন তাই আমাকে কিছু বলতেও দেয়নি। চুপচাপ চলে গেল।”

-“আচ্ছা আমারো একটু কাজ আছে, খাওয়া শেষ আমার। আন্টিকে বললে এখন যেতে দিবে না। তুমি ম্যানেজ করো প্লিজ। টাটা!”

নিশাত পেছন থেকে অর্ণবকে ডাকলো বেশ কয়েকবার কিন্তু সে না শুনেই চলে গেল। নাহার বানু এসে দেখেন অর্ণব নেই। তিনি নিশাতের দিকে তাকালেন। নিশাত মনে মনে তিরা এবং অর্ণবের উপর দুনিয়াসুদ্ধ রাগ করে বললো,”এই দুই লাইলী-মজনুর চক্করে সব ঝাড়ি আমার খাওয়া লাগবে! আজব পাগল ভাই এরা, একদম মেইড ফর ইচ আদার।”

চলবে…

#অপ্রিয়_প্রাক্তন
২০তম_পর্ব
~মিহি

-“নিয়ন ভাইয়া টেক্সট করেছিল।”

নিশাতের কথায় তিরার মধ্যে কোনো ভাবান্তর দেখা গেল না। সে ফোনের স্ক্রিনে মনোযোগ দিয়ে রেখেছে।

-“শুনেছিস কী বললাম?”

-“হুহ, কী বলেছে সে?”

-“লম্বা একটা প্যারাগ্রাফ…একজন মেয়ের খেয়াল তার বাবার পরে যে পুরুষ রাখতে পারে সে অবশ্যই মেয়েটির প্রেমিক। আরো কী কী জানি, দেখ তুই।”

নিশাতের কথায় তিরা আচমকা হেসে উঠলো। নিশাত বিস্মিত দৃষ্টিতে তিরার দিকে তাকালো। তিরার হাসি থামছে না। এমন পাগলের মতো হাসা দেখে বিরক্ত লাগলো নিশাতের।

-“পাগলের মতো ক্যান হাসতেছিস তুই? বিয়ে ঠিক হইছে তোর?”

-“আরে নাহ! আমার ফোনের দিকে তাকা তাহলেই বুঝবি!”

নিশাত কপট রাগ দেখিয়ে ফোনটা নিয়ে স্ক্রিনে তাকালো। ‘বেলাবোস’ পেইজ থেকে হুবহু এমন একটা পোস্ট দেওয়া হয়েছে একদিন আগে।

-“তার মানে ভাইয়া এই পোস্ট কপি পেস্ট করেছে?”

-“হুম! পোস্টটা হুট করে সামনে এসে ভালোই হলো, অনেকদিন পর মন খুলে হাসলাম।”

-“আমি ভাবছিলাম মন থেকে বলছে তোকে নিয়ে।”

-“নিশু, ও যদি শুধু এটুকু বলতো যে আমি তিরার খেয়াল করবো। সেটুকু যথেষ্ট ছিল আমার জন্য। ঐ একটা লাইন লেখার চেয়ে কপি করা যার কাছে বেটার মনে হয়েছে তার জন্য আর কত নিজেকে দুঃখ দিব বল! সে তো নিজের সত্যি আমাকে জানাতে চায়না। আমি কেন জোর করবো? সবকিছু নতুন করে শুরু করবো। নিয়ন নামের মানুষটার অস্তিত্ব আর আমি নিজের জীবনে রাখতে চাই না। ও ওর মনের মানুষকে নিয়ে সুখে থাকুক।”

-“তুই কিভাবে জানলি ভাইয়ার জীবনে অন্য কেউ আছে?”

-“তিন বছর ধরে একজন মানুষের সোশ্যাল একাউন্ট স্টক করার ধৈর্য যার আছে, তার এটুকু বোঝার ক্ষমতাও আছে। নিয়ন সবসময় বলতো ওর লাইফটা সোশ্যাল মিডিয়ায় পাবলিক করা। ও সব পোস্টই পাবলিকলি করতো। সুতরাং না বোঝার কিছু ছিল না। মেয়েটা নিয়নের কলিগ, সেইম ইনস্টিটিউটে পড়তো ওরা।”

-“তোর ভালোবাসা এত বছরে একটুও কমেনি তিরা, তুই নিজেকে ধোঁকা দেওয়ার চেষ্টা করছিস!”

তিরা দীর্ঘশ্বাস ফেললো। নিজেকে অনেক ধোঁকা দিয়েছে সে। এখন আর নিজেকে নিয়ে খেলা করার সময় না।

-“আমার জীবনে নিয়ন ফিরুক আমি চাইনা। আমি কখনো আর ওকে মেনে নিতে পারবো না। মেনে নেওয়ার ক্ষমতা থাকলে আমি ওকে ফিরাতাম না কিন্তু আমার মন সবসময় আমাকে আটকেছে। বারংবার নিয়নের ভালোবাসি বলাটা আমাকে দুর্বল করেছে কিন্তু আমার পক্ষে সম্ভব না ফিরে যাওয়া। তুই দয়া করে ওকে ব্লক কর।”

-“আচ্ছা, তুই প্যারা খাস না। অর্ণব ভাইয়ার সাথে সেটিং করে নে।”

-“না আমি নিয়নের কাছে ফিরবো না তোর অর্ণব ভাইয়ার সাথে আমার কিছু হবে। এইসব চিন্তা বাদ দে। আসছিলাম কুইজের জন্য প্র্যাকটিস করতে আর এসব গল্প করতেছি!”

নিশাত নিজের কপালে হাত দিয়ে আলতো করে বাড়ি দিল। অতঃপর ফোন রেখে বই নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লো। তিরা বসে বসে ফোন থেকে জিকে দেখতে লাগলো। কুইজটাতে পার্টিসিপেট করার ইচ্ছে ছিল না তিরার। শেষমেশ ভাবলো রাজশাহী যাওয়ার এখনো অনেকটা সময় বাকি আছে, নিজেকে এখন একটু ব্যস্ত রাখা দরকার।

-“গ্রুপের বাকিরা তাও বাসায় বসে পড়তেছে, তোর এখানে এসে আমার পড়াই হচ্ছে না।”

-“নিশাতের বাচ্চা! যা তো তুই, বের হ বাড়ি থেকে।”

-“তাই বলে এভাবে তাড়িয়ে দিবি?”

-“তাইলে চুপ করে বসে থেকে পড়!”

-“এই চল দুজনে শাড়ি পড়ে ছবি তুলবো।”

-“মাথা পুরোটাই গেছে তোর?”

-“নাহ চল!”

তিরাকে ঠেলে তুললো নিশাত। রাজি করাতেও খুব একটা সময় লাগলো না। তিরা ওয়ারড্রোবে শাড়ি খুঁজতে লাগলো। ওয়ারড্রোবে বড়জোর তিন-চারটে শাড়ি আছে। তিরার মা শাড়ি পড়েন না, বিয়ের সময়কার শাড়ি সব গ্রামের বাড়িতে রাখা। খুঁজে খুঁজে নীলরঙা আর লালরঙা দুটো শাড়ি পেল তিরা। শাড়ি দুটো বিছানায় মেললো।

-“লালটা তুই পড়, নীলটা আমি পড়বো!”

-“এই আমি লাল শাড়ি পড়বো না।”

-“নিশু, সোনা আমার! লাল শাড়ি আমি পড়বো না কোনভাবেই!”

-“তুই এটুকু করতে পারবি না আমার জন্য?”

নিশাতের ইমোশনাল টর্চার থেকে নিজেকে বাঁচাতে পারলো না তিরা। উপায় না পেয়ে তিরাকে লাল শাড়িটাই পড়তে হলো। এই শাড়ির সাথেও অল্পবিস্তর স্মৃতি জড়িয়ে আছে। এই শাড়ি পড়েই নিয়নকে একবার ভিডিও কল করেছিল তিরা। নিয়ন বলেছিল তিরাকে একদম ঠিক তার বউ বউ লাগছে। এখন কোথায় সেসব কথা! হারিয়েছে দূর মেঘের আড়ালে নাকি একজোড়া জুতো দ্বারা পিষে ফেলা হয়েছে সেসব আবেগের ফুলগুলো?

________________________

ছবি প্রায় কম করে হলেও পঞ্চাশটে ওঠানো হলো। বেশিরভাগ নিশাতই তুলেছে, সেলফির সংখ্যা বেশি। ছবিগুলো ভালোই লাগছে। তিরা ভেবেছিল লালরঙা শাড়িতে তাকে বোধহয় অদ্ভুত লাগবে। খুব একটা খারাপ লাগছে না।

-“দেখছিস তোরে লাল শাড়িতে সেই লাগতেছে!”

-“তুই পড়ার জন্য আসছিলি! পড়া বাদে সব করছিস।”

-“ধূর! এই তোরে ট্যাগ করে ডে দিলাম।”

-“ফ্রেন্ড সার্কেলের বাইরে সবাইকে হাইড করবি!”

নিশাত মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেও অর্ণবকে হাইড করার কথা তার মাথায় আসলো না। বলতে গেলে অর্ণবের ব্যাপারটাতে সে ততটা ধ্যান দেয়নি। তিরাও বন্ধুদের বাইরে মোটামুটি সবাইকে হাইড করেই ডে দিল। মুসিবতটা হলো রাতে। অর্ণবের এক টেক্সটে তিরার অস্বস্তির সূচনা।

-“লাল শাড়ি তোমাকে এভাবে মানাবে না তিরা, সাথে একটা বর থাকলে তখন মানাবে।”

-“আপনি কোথায় দেখলেন?”

-“তোমায় বলবো কেন সেটা?”

-“আজব লোক তো আপনি!”

-“আজবই তো, ডাক্তারদের আজবই হতে হয়। নরমাল হলে তো মানুষ কসাই বলতে পারবে না।”

-“আমি সেটা মিন করিনি।”

-“আমি জানি। এই একটু দাঁড়াও, একটা ইমার্জেন্সি আছে।”

তিরা আর কোনো টেক্সট করলো না। কী ইমার্জেন্সি আছে জিজ্ঞাসা করার ইচ্ছে থাকলেও নিজেকে দমালো সে। যেচে বিরক্ত করার অভ্যেসটা রাখা উচিত না। বলেছে যখন ইমার্জেন্সি তখন পরে জেনে নিলেও চলবে। তিরার এখন আর কারো সাথে খুব বেশি মিশতে ইচ্ছে করে না, ভয় হয় প্রতিমুহূর্তে। ফোনের দিকে তাকালো সে, নয়টা আঠারো বাজে। এখনো তারান্নুম বেগম আসেননি। অফিসে কাজের চাপ বুঝতে পারছে তিরা। তন্বী টিভি দেখছে পাশের ঘরে। তিরা বিছানায় হেলান দিতেই অল্পক্ষণের মাঝেই ঘুমিয়ে গেল। একবার ঘুমালে বাড়িসুদ্ধ ভূমিকম্প হয়ে গেলেও তাকে তোলা যেত না আগে কিন্তু এখন সামান্য শব্দেও কেঁপে উঠে সে। কী দারুণ পরিবর্তন এনেছে নিয়ন তিরার জীবনে। আর যাই হোক, একটু সাহসী তো বানিয়েছে মেয়েটাকে। মাঝরাস্তায় হাত ছেড়ে দিয়ে বুঝিয়েছে কিভাবে একা চলতে হয় শিখে নাও। তিরা নিয়নের প্রতি কৃতজ্ঞ, নিয়নের বলা প্রতিটা কথার ভীড়ে তিরা অনেক কিছু শিখেছে। কখনো ধন্যবাদ জানানোর সুযোগটা হয়তো হয়নি তবুও তিরা কৃতজ্ঞতাবোধটা রেখেছে।

রাত আড়াইটা নাগাদ তিরার ফোন বেজে উঠলো। তিরা চমকে ঘুম থেকে উঠলো। মেসেঞ্জারে কল করেছে অর্ণব। ওয়াইফাই অন থাকায় কলটা এসেছে। তিরা কল কেটে দিল। এত রাতে ফোনে কথা বলার দুঃসাহস সে কল্পনাতেও আনতে পারবে না।

-“কল কেন? কোনো দরকার আছে?”

-“ঘুমিয়েছিল? স্যরি!”

-“আড়াইটার দিকে কি মানুষ জেগে জেগে মহাভারত দেখে?”

-“আরে স্যরি বললাম তো ম্যাডাম, এত রাগ কেন?”

-“আপ পানি মে যাও, ছাপাক!”

-“ইন্সটাগ্রাম রিলস মাথার মধ্যে ঢুকায়ে রাখছো এত? বাচ্চাই তুমি!”

-“তো বাচ্চাই তো, আপনার মতো বুড়ো নাকি?”

-“তুমি আমাকে আরো আগে খুঁজে পেলে এখন আমাদের একটা বাচ্চা থাকতো!”

-“এক্সকিউজ মি?”

-“এই স্যরি স্যরি, আই মিন তুমি বিয়ে করলে এই বয়সে তোমার একটা বাচ্চা থাকতো।”

-“রাত আড়াইটার দিকে আপনার এসব কথা বলার সময়?”

-“ওকে সিরিয়াস কথা, তিরা তুমি কি আমায় পছন্দ করো?”

-“এসব কোন ধরনের….”

-“যদি করো তাহলে এখনি বলে ফেলো, আমি দ্বিতীয়বার জিজ্ঞাসা করবো না। এখন না বললে পরে হ্যাঁ বলার সুযোগটা আর পাবেনা, ইভেন আমাকে খুঁজেও পাবেনা।”

-“আমি পছন্দ করিনা আপনাকে।”

-“ওকে আল্লাহ হাফেজ।”

অর্ণব আর কিছু না বলেই অফলাইনে গেল। তিরার মাথা ঝিমঝিম করছে। এতক্ষণ ধরে হচ্ছিলটা কী তার সাথে?

চলবে…