#অপ্রিয়_শহরে_আপনিটাই_প্রিয়
#লাবিবা_আল_তাসফি
৭.
বহুদিন বাদে সকল ফ্রেন্ড একত্রিত হয়ে আনন্দ উল্লাশে মেতে উঠেছে। গ্রাজুয়েশন শেষে প্রায় সবাই এখন কর্মজীবনে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। কেউবা সংসার সামলাচ্ছে। এত ব্যস্ততার মাঝে বন্ধুদের খোঁজ রাখা মুশকিল প্রায়। জমজমাট আড্ডা শেষে বাসায় ফেরার পালা এলো। প্রিয়তা ফুটপাত ধরে একা হাঁটতে লাগলো।
‘আইসক্রিম খাবেন?’
প্রিয়তার এই কন্ঠের মালিককে চিনতে কষ্ট হল না। সে পাশ না ফিরেই বলল,
‘এখানে কি করছ আয়াজ? তোমাকে না আমার থেকে দূরে থাকতে বলেছি?’
আয়াজ ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসলো। নির্লিপ্ত ভাবে বলল,
‘আপনি যতবার দূরে যেতে বলবেন আমি তত স্টেপ আপনার কাছে এগিয়ে আসব। চাইলে ট্রাই করে দেখতে পারেন।’
প্রিয়তা কিছু বলল না। সে জানে আয়াজ যেটা বলেছে সেটাই করবে। হঠাৎ আয়াজ বলে উঠলো,
‘এখানেই দাঁড়ান। আমি আসছি। কোথাও জাবেন না প্লিজ।’
প্রিয়তা শুনলো। চুপচাপ একই জায়গায় দাঁড়িয়ে রইল। আজ তার মন ভিষণ রকম ভালো। সে ভেবেছে আজ আয়াজের ছোট আবদারগুলো সে পূরণ করবে। কেমন হয় আয়াজকে চমকে দিলে?
মিনিট খানেক বাদে দুটো আইসক্রিম হাতে আয়াজ এগিয়ে এলো। একটা প্রিয়তার দিকে এগিয়ে দিতেই প্রিয়তা মিষ্টি করে হাসলো। আয়াজের হাত থমকে গেল। মুগ্ধ হয়ে সে প্রিয়তার পানে চাইল। কাঁপা কন্ঠে বলল,
‘আপনি হাসবেন না প্রিয়। আমি তাহলে নিয়ম ভঙ্গ করে কোনো অন্যায় করে ফেলব।’
প্রিয়তা দু পা দূরে সরে দাঁড়ালো। কথার প্রসঙ্গ পাল্টাতে বলল,
‘ফ্রি আছ তুমি?’
আয়াজ যেন আবার চমকাল। আজ প্রিয়তা একের পর এক চমক দিয়ে চলছে। আয়াজ মিষ্টি করে হাসলো। সুন্দর করে উত্তর দিলো,
‘আপনি বললে আমি সর্বদা ফ্রি।’
প্রিয়তা মাথা নাড়াল। কিছু না বলে সামনের দিকে পা বাড়ালো। আয়াজ প্রিয়তার না বলা কথা বুঝে নিল যেন। মুচকি হেসে সেও প্রিয়তার পাশাপাশি হাঁটতে লাগলো। হাঁটতে হাঁটতে সে সুর ধরলো,
‘তোর এক কথায়
আমি রাখব হাজার বাজি।
তোর ইশারায়,
আমি মরে যেতেও রাজি।’
____________
বাসায় ফেরার পুরো রাস্তাটা হেঁটেই এলো তারা। আয়াজ প্রিয়তাকে তার বাসা পর্যন্ত এগিয়ে দিলো। পুরো রাস্তায় তাদের কোনো কথা হয়নি কিন্তু তবুও এই সময়টুকু আয়াজের জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় ছিল।
ছোটবেলা থেকে অযত্নে বড় হওয়া প্রিয়তা বড্ড ভালোবাসার কাঙাল। একটুখানি ভালোবাসা পেতে সে নিজের জীবন উৎসর্গ করতেও রাজি। সেখানে আয়াজের এই নিখুঁত ভালোবাসাকে সে কিভাবে পায়ে ঠেলে দিবে? কিন্তু তার যে ভয় হয়। ভিষণ ভয়। এই সমাজ আর সমাজের মানুষের ভয়। তারা যে এ সম্পর্ককে স্বাভাবিক ভাবে নিবে না। আর আয়াজের পরিবার? তারা কি কখনো প্রিয়তাকে মেনে নিবে?
রাত আনুমানিক দুটোর কাছাকাছি। তীব্র ঝাঁকুনিতে ঘুম আলগা হয়ে এলো প্রিয়তার। চোখ টেনে মেলে পরিস্থিতি বুঝতে কয়েক সেকেন্ড সময় নিল। বালিশের নিচে মোবাইল ফোন ভাইব্রেট হচ্ছে। বিরক্ত ভঙ্গিতে ফোন কানে ধরলো। কোনোরূপ কথা ছাড়াই গম্ভীর কণ্ঠে শুধাল,
‘রাত বিরাতে কল করা ভিষণ রকম অযৌক্তিক কাজ। অন্যের ঘুমে ব্যাঘাত ঘটানো এক রকম অভদ্রতা। আ…’
আর কিছু বলতে নিবে তার পূর্বেই গম্ভীর পুরুষালি গলায় আয়াজ বলে উঠলো,
‘আপনাকে দেখতে ইচ্ছে হচ্ছে। এই মুহূর্তে ছাদে আসবেন। টাইম অনলি ফাইভ মিনিট। কুইক।’
কল কেটে গেল। ঘুমের ঘোরে প্রিয়তা কিছু বুঝলো না। কপাল কুঁচকে আবারো তলিয়ে গভীর ঘুমে। তার জীবনে এখন একমাত্র লক্ষ ঘুম। পাঁচ মিনিট অতিক্রম হতেই মোবাইল বেজে উঠল। প্রিয়তা নড়েচড়ে উঠলো। এবার তার ঘুম কিছুটা হালকা হয়েছে। কল রিসিভ করতেই আয়াজের গম্ভীর কণ্ঠস্বর ভেসে এলো।
‘ছাদে আসুন। নয়তো আমি আপনার রুমে চলে আসব ফর সিওর।’
প্রিয়তার ঘুম উড়ে গেলো। হতভম্ব হয়ে উঠে বসলো। এ কোন রূপ প্রকাশ করতে শুরু করেছে ছেলেটা? প্রিয়তা চাপা কন্ঠে বলল,
‘তুমি পাগল আয়াজ। এখন কি ছাদে আসার সময়?’
আয়াজ সুন্দর নম্র ভাবে জবাব দিলো,
‘অপেক্ষা করছি।’
ফোন কেটে গেল। প্রিয়তা থম মেরে বসে রইল কিছুক্ষণ। ছেলেটাকে আস্কারা দিয়ে ভিষণ রকম ভুল করেছে সে। মোবাইল স্ক্রিনে সময় দেখে গখয়ে ওড়না জড়িয়ে চুপিসারে সিঁড়ি বেয়ে ছাদে উঠে এলো। কাঁপা পায়ে ছাদে উঠতেই একজোড়া হাত তাকে টেনে পাশে নিয়ে এলো। প্রিয়তা আতকে উঠল। চাঁদের আলোতে আয়াজের মুখ স্পষ্ট হতে প্রিয়তা স্বস্তি পেল।
‘এত রাতে এসবের মানে কি আয়াজ?’
‘মিস করছিলাম।’
প্রিয়তা থামলো। গভীর দৃষ্টিতে তাকালো আয়াজের পানে। চাঁদের আলোতে আয়াজের মুখটা ভিষণ কোমল পবিত্র লাগছে। প্রিয়তা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগল। আয়াজের চোখের পখপড়ি গুলো বড় বড়। আচ্ছা ছেলেদছর চোখের পাপড়ি এত সুন্দর হয়? আগেতো সে লক্ষ করেনি। আয়াজ চুপ করে প্রিয়তার কর্মকাণ্ড দেখতে লাগলো। মিটিমিটি হেসে সে আরো একটু ঘনিষ্ঠ হয়ে দাঁড়ালো। প্রিয়তা চমকে উঠলো। পিছিয়ে যেতে যেয়ে বাঁধা পেল। আয়াজ শক্ত বাঁধনে আটকে ফেলেছে তাকে। প্রচন্ড গতিতে ছুটতে থাকা হৃৎপিণ্ড যেন কয়েক সেকেন্ডের জন্য থমকে গেল। পা দুটোও বেঈমানি করলো যেন। বিন্দু মাত্র স্থান থেকে নড়লো না। প্রীয়তা অনুভব করলো সে কাঁপছে। প্রচন্ড গতিতে কাঁপুনি দিচ্ছে তার হাত পা। আয়াজ গভীর চোখে প্রিয়তার চোখে চাইল। আচানক তপ্ত ঠোঁট ছোঁয়াল প্রিয়তার কপালে। প্রিয়তা স্তব্দ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। কয়েক সেকেন্ড পর আয়াজ সরে এলো। কোনো কথা ছাড়া ছাদের রেলিং টপকে নেমে গেলো নিচে। প্রিয়তা চোখ কপালে নিয়ে তাকালো। দ্রুত পায়ে রেলিংয়ের কাছে আগাতেই দেখলো দুই বিল্ডিংয়ের মাঝে ভারসাম্য রেখে খুব সহজেই নেমে গেছে আয়াজ। প্রিয়তা স্বস্তি পেল। একটুর জন্য তার প্রাণ উড়ে গিয়েছিল।
বাকি রাতটুকু প্রিয়তার নিদ্রাহিনতায় কাটলো। লজ্জা রাগ ভয়ের সংমিশ্রণে তৈরি অন্যরকম অনুভূতি অনুভব হচ্ছে তার। একটা অনিশ্চিত সম্পর্কের দিকে পা বাড়াচ্ছে সে। আদেও কি এর কোনো ভবিষ্যৎ আছে? চোখ ভিজে উঠেছে তার। হারাতে হারাতে সব হারিয়ে ফেলেছে সে। আর কিছু সে হারাতে চায় না।
__________
প্রিয়তা দুদিন ধরে ঘরের বাইরে যাচ্ছে না। স্কুল থেকে অসুস্থতার কথা বলে ছুটি নিয়েছে। হেডমাস্টার ভদ্রলোক ও প্রিয়তার মিথ্যা অসুস্থতার নাটককে সত্য ভেবে ব্যাথিত হয়ে ছুটি মঞ্জুর করেছেন। স্নেহের কন্ঠে শুধালেন,
‘একটু ফল খাও। ঔষুধে অনিয়ম করো না। তোমার এখন ইয়াং এইজ। খাওয়া দাওয়া নিয়মিত করা দরকার। আমি সুযগ পেলে তোমায় এসে দেখে যাব। তুমি আমার মেয়ের মতো। আমি চাই তুমি দ্রুত সুস্থ হয়ে ফের। আর ছুটির ব্যাপারে একদম চিন্তা করতে হবে না। তুমি নিশ্চিন্তে রেস্ট নাও।’
প্রিয়তা মিথ্যায় পটু না হলেও সে খুব সুন্দর ভাবে তার অসুস্থতা রিপ্রেজেন্ট করেছে। নিজের এমন নিখুঁত অভিনয়ে নিজেই হতবাক হলো। কিন্তু ভদ্রলোকের জন্য খারাপ লাগলো। সে কতটা না স্নেহ নিয়ে প্রিয়তাকে আস্বস্ত করলো! কিন্তু সে তো জানেই না তার মেয়ের মতো মেয়েটা তাকে কি দারুণ মিথ্যার জালে ফাঁসিয়েছে।
ড্রয়ার থেকে ফোন বের করে অন করতেই একের পর এক টেক্সট, ভয়েস ম্যাসেজ আসতে লাগলো। এই দুদিন প্রিয়তা সকল প্রকার যোগাযোগ মাধ্যম বন্ধ করে রেখেছিল। প্রয়োজন ব্যতিত রুমের দরজাও মিনিটের জন্য খোলা রাখেনি সে। একপ্রকার বন্দি বানিয়ে নিয়েছে নিজেকে। এমনটা নয় সে ভিষণ মানসিক চাপে আছে। নিজেকে টাইম দেওয়ার নামে গন্ডারের মত পরে পরে ঘুমিয়েছে। দুদিনের টানা ব্রেকে তার মন মেজাজ বেশ ফুরফুরে। সকাল থেকে সুজলা নানা কথা বলে যাচ্ছে। মিনিটের জন্য তার মুখ বন্ধ হচ্ছে না। কিন্তু প্রিয়তার তাতে মাথা ব্যাথা নেই। সে নিজের মতো করে খেয়ে দেয়ে রুমে চলে এসেছে। তাতে সুজলা আরো ক্ষিপ্ত হলো। হুংকার ছেড়ে বলল,
‘শরীরে তেল বেশি হইছে? আমার কথাকে দাম দিচ্ছিস না যে?’
‘কে বলেছে দাম দেই দেই না মামি? মাস শেষে সাত হাজার করে টাকা দেই। এটা কি যথেষ্ট না?’
কথাটা বলে প্রিয়তা রুমে চলে গেল। এদিকে সুজলা চিৎকার করেই চলছে। রত্না মুখ টিপে হাসছে। আজ একদম তার মন মত জবাব দিছে প্রিয়তা।
চলবে……….
#অপ্রিয়_শহরে_আপনিটাই_প্রিয়
#লাবিবা_আল_তাসফি
৮.
এক মগ গরম কফি হাতে ছেলের রুমে ঢুকলেন শাকিলা। আয়াজ তখন ল্যাপটপের স্ক্রিণে তাকিয়ে ভিষণ মনোযোগ দিয়ে অফিসের কিছু ফাইল দেখছে। কফির মগটা পাশে রেখে ছেলের পাশে বসলেন তিনি। পরম স্নেহে ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন,
‘বেশি চাপ পড়ে যাচ্ছে বাবা? ক্লান্ত লাগছে তোমাকে। এত প্রেশার এখনি কেন নিতে গেলে?’
আয়াজ শুকনো করে হাসলো। ল্যাপটপ কোল থেকে নামিয়ে মায়ের কোলে মাথা রেখে বাচ্চাদের মতো করে গুটি মেরে শুয়ে পড়লো। ক্লান্ত কন্ঠে বলল,
‘এই সামান্য কাজ আমাকে দুর্বল করার ক্ষমতা রাখে না মা। তোমার বৌমার নিরব আঘাত আমাকে ভেঙে দিচ্ছে। তোমার উচিত বৌমাকে শাসন করা। তোমার একমাত্র ছেলেকে সে এভাবে কষ্ট দিচ্ছে এর শাস্তি কি হওয়া উচিত?’
শাকিলা বিস্ময় নিয়ে ছেলের দিকে চাইলেন। কোন বৌমার কথা বলছে আয়াজ? সে তো কোনো বৌমাকে চেনে না। ছেলেকি তাদের না জানিয়ে বিয়ে করে নিল? শাকিলা গম্ভীর কণ্ঠে জানতে চাইল,
‘তুমিকি আমাদের না জানিয়ে বিয়ে করেছ?’
‘উহু।’
‘তাহলে বৌমা কে?’
‘যাকে আমি বিয়ে করবো।’
‘তুমিকি মেয়ে ঠিক করে ফেলেছ?’
‘চার বছর পূর্বে।’
‘তোমাদের সম্পর্ক এতদিনের আর আমাকে জানালে না!’
‘তার পর্যন্ত পৌঁছাতে আমাকে এখনো এক সাগর পরিমাণ পথ পারি দিতে হবে মা। খুব পাষাণ হৃদয়ের মানবী সে মা। এই দেখ আমি কতটা পুড়ছি তার জন্য কিন্তু আজ দুদিন ধরে সে তার সাথে যোগাযোগের সব মাধ্যম বন্ধ করে দিয়েছে।’
বাচ্চাদের মতো করেই একের পর এক অভিযোগ করে চলল আয়াজ। শাকিলা চুপ করে ছেলের অভিযোগ শুনলো। আয়াজ ছোট থেকেই গম্ভীর। খোলামেলা ভাবে কথা বলেনা সে কখনো। নিজের মাঝে সবটা লুকিয়ে রাখতেই সে পছন্দ করে। আজ তার ছেলেটা কতটা কষ্ট পেয়ে তার সাথে সব শেয়ার করছে ভেবেই তির চোখ ছলছল করে উঠলো। মেয়েটাকে সামনে পেলে সে অবশ্যই এর জবাব চাইবে। শাকিলা স্বযত্নে ছেলের মাথায় হাত ছোঁয়াল।
__________
প্রিয়তা আজ নীল রঙের একটা শাড়ি পড়েছে। হাতে নীল রেশমি চুড়ি। খোঁপায় ফুটন্ট গন্ধরাজ ফুল। চোখ ভরা কাজল। আর লালে রাঙানো ঠোঁট। বাতাসের তালে তালে কানের ঝুমকো জোড়া দুলছে। কপালের দুপাশে নেমে আসা সরু চুলগুচ্ছ বারবার বাতাসে নিজের স্থান থেকে নড়ে যাচ্ছে। প্রিয়তা বিরক্ত হলেও খুব যত্ন নিয়ে তা গুছিয়ে নিচ্ছে। বাসস্টপে দাঁড়িয়ে বিরষমুখে আশপাশে নজর বুলাল প্রিয়তা। তার এত যত্ন করে সাজা কি ব্যর্থ হলো? প্রিয়তার সুন্দর মুখটা মুহূর্তেই মলিন হয়ে এলো। রাগ হলো ভিষণ। এ মুহূর্তে নিজের গালে কষিয়ে দুটো থাপ্পর লাগাতে পারলে কিছুটা হলেও শান্তি লাগত। নিজের থেকে ছোট কোনো ছেলের প্রেমে হাবুডুবু খেয়ে এরকম সেজেগুজে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা মোটেই তাকে সোভা পায় না। কিন্তু সে ষোল বছরের এক কিশোরীর মতো প্রেমিকের জন্য অপেক্ষা করছে। বারবার ব্যস্ত চোখে প্রেমিককে খুঁজছে। এগুলো নেহাত বোকামি ছাড়া অন্য কিছু নয়।
আয়াজ এলো ঠিক দু ঘন্টা পর। এলোমেলো চুল, চোখের নিচে কালচে ছাপ আর অগোছালো পোশাকে আয়াজকে দেখে প্রিয়তার বুকের ভিতর হাহাকার করে উঠলো। এতক্ষণ জমিয়ে রাখা রাগটা যেন নিমিষেই উদাও হয়ে গেলো। আয়াজের দিকে এগিয়ে আসতেই আয়াজ ব্যথাতুর কন্ঠে শুধাল,
‘আমায় কষ্টের মাঝে রেখে আপনার এ সাজ কার জন্য প্রিয়? সে কি আমার থেকেও বেশি ভালোবাসে আপনাকে?’
আয়াজের চোখ ছলছল করে উঠলো। এই কঠিন ছেলেটার চোখে পানি দেখে প্রিয়তা চমকাল। পরমুহূর্তে ভিষণ ভালোলাগা কাজ করলো। এই অতিব সুদর্শন পুরুষটা যে কেবল তার উইল সে হাতে পেয়ে গিয়েছে। প্রিয়তা মুচকি হেসে জবাব দিলো,
‘এক বাচ্চা প্রেমিকের অপেক্ষায় ছিলাম। অলরেডি তিনি আমাকে দু ঘন্টা অপেক্ষা করিয়েছে। আর এখন নিজেই কেঁদে বুক ভাসাচ্ছে।’
প্রিয়তা একটু থেমে আবারও বললো,
‘এসব বাচ্চা সামলানো ভিষণ কষ্টের বুঝলে? কখন না কেঁদে দেয়! মানুষ কি ভাববে বলোতো?’
আয়াজ হেসে ফেলল প্রিয়তার কথা বলার ভঙ্গি দেখে। সাথে প্রিয়তাও হাসলো। আয়াজ হাসলে ডান গালে গভীর খাদের সৃষ্টি হয়। যা এই প্রথম প্রিয়তার নজরে এলো। সে মুগ্ধ হয়ে তার ছোট্ট প্রেমিকে দেখলো। নিঃসন্দেহে ছেলেটা ভিষণ সুন্দর। আগে কেন নজরে এলো না?
__________
‘আপনার পাশে আমায় বড্ড বেমানান লাগছে প্রিয়।’
ফুটপাত ধরে হাঁটতে হাঁটতে বলল আয়াজ। প্রিয়তা বিরোধিতা করলো। বলল,
‘তোমায় উদাস প্রেমিকের মতো লাগছে আয়াজ। সুন্দরী প্রেমিকার পাশে উদাস প্রেমিকের কম্বিনেশন সবথেকে সুন্দর। বেমানান লাগার কোনো প্রশ্নই আসে না। আমি যতবার শাড়ি পড়ব তুমি এমন অগোছালো ভাবেই আমার পাশে হাঁটবে।’
আয়াজ মাথা নাড়িয়ে হাসলো। সূর্যের সরু আলো প্রিয়তার মুখে পড়ছে। চমৎকার লাগছে দেখতে। আয়াজ হাত দিয়ে আড়াল করলো সূক্ষ সে রশ্মিকে। অভিযোগ করে বলল,
‘আমি ছাড়া আপনাকে কেউ ছুলে আমার ভিষণ হিঃসা হয় প্রিয়। সূর্যের ও জানা উচিত আপনি কেবল আমার। আপনাকে ছোঁয়ার সাহস দেখানো তার মোটেই উচিত নয়।’
প্রিয়তা খিলখিল করে হেসে উঠলো। আয়াজ মুগ্ধ হয়ে তা দেখলো। প্রেয়সীর এ রূপ তার প্রথম দেখা। প্রিয়তাকে এভাবে প্রাণখুলে হাসতে আগে কখনো সে দেখেনি। ভালো লাগায় ছেয়ে গেলো মন।
____________
প্রিয়তা বাড়ি ফিরল সন্ধ্যা করে। পুরোটা দিন সে আজ বাড়ির বাহিরে কাটিয়েছে। ড্রয়িংরুমে বসে জাহিদ প্রিয়তার ফেরার অপেক্ষা করছিল। প্রিয়তা ড্রয়িংরুমে মামাকে দেখেও না দেখার মতো করে রুমে চলে যাচ্ছিল কিন্তু বাঁধা দিল জাহিদ। গম্ভীর কণ্ঠে ঢাকে বলল,
‘এখানে এসে বসো। কথা আছে।’
প্রিয়তা দ্বিরুক্তি করলো না। চুপচাপ মামার দেখানো সোফায় বসলো। জাহিদ প্রিয়তার দিকে একবার তাকিয়ে বলল,
‘কোথাও গিয়েছিলে?’
‘হুম।’
‘সারাদিন বাসায় ফেরোনি। তুমি এখন যথেষ্ট বোঝ। এভাবে সারাদিন বাসার বাহিরে থাকা কি সোভা পায়?’
প্রিয়তা মাথা নিচু করে রইল। উত্তর দিলো না। জাহিদ দীর্ঘশ্বাস ফেলল। পরপর বলল,
‘তাহলে তোমার মামি আমাকে যা কিছু বলেছে সব সত্যি? তুমি সত্যিই কারো কথা শুনছ না?’
প্রিয়তা এবারো কোনো কথা বলল না। তার ভিষণ অভিমান হলো। সে তো মাত্র আজ একদিন বাহিরে ছিল। মামা কিভাবে মামির সবকথা বিশ্বাস করে নিল?
প্রিয়তার নিস্তব্দতা জাহিদের পছন্দ হলো না। তার মনে হলো অতি আদর দিয়ে প্রিয়তাকে সে চরম বিয়াদপ বানিয়ে ফেলেছে। বাড়ির মেয়ে কাউকে না জানিয়ে সারাদিন ঘরের বাহিরে থাকছে এটা মানুষ জানলে কত কথা রটাবে! তিনি আবারও দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
‘তোমার যথেষ্ট বয়স হয়েছে। তোমার বয়সের মেয়েরা সংসার করে খাচ্ছে। তোমার আপত্তি থাকায় এতদিন আমি তোমায় কিছু বলিনি। কিন্তু সবকিছুর একটা নিয়ম আছে। আমি চাই খুব শীঘ্রই ভালো কোনো পাত্র দেখে তোমায় তার হাতে তুলে দিতে। আশি করি তোমার কোনো আপত্তি নেই।’
‘যদি থাকে?’
প্রিয়তার পশ্নে জাহিদ ভিষণ রকম বিরক্ত বোধ করলো। কপাল কুঁচকে তিনি কঠিন কন্ঠে বলল,
‘এখনো তুমি বলতে চাইছ তোমার আপত্তি আছে? আমার ঘরেও একটা মেয়ে আছে। আমার একটা সংসার আছে এটা ভুলে যেও না। আমি চাইনা তোমাকে নিয়ে এ সংসারে আর কোনো ঝামেলা হোক। এখন সিদ্ধান্ত তোমার হাতে।’
কথাগুলো বলে জাহিদ গটগট করে হেঁটে চলে গেলেন। প্রিয়তা ঠাঁয় বসে রইল। জাহিদের বলা কথাগুলো বারবার তার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। আজ মামাও তাকে বলতে চাইল সে এই পরিবারের অশান্তির কারণ! প্রিয়তা উঠে দাঁড়ালো। টলমলে পায়ে এগিয়ে গেল নিজের রুমের দিকে। তার নিজেকে ভিষণ একা লাগছে। এলোমেলো অবস্থায় বিছানায় ধপ করে শুয়ে পড়ল। তাকে একটা চুড়ান্ত সিদ্ধান্তে আসতে হবে। আর কত অবহেলা সইবে সে? এ বাড়ির কেউ তাকে মানুষ ভাবে না। তার যে একটা মন আছে সেটাই সবাই ভুলে বসেছে।
চলবে……….