#অবহেলার_মুক্তা
#আরিবা_নাওশীন
#পর্ব_১০
শহরের সরকারি হাসপাতালের করিডোরে টানটান উত্তেজনা। ধূপছায়ার মতো আবছা আলোয় ভাদ্রমাসের শেষ বিকেলের ভ্যাপসা গরম। লম্বা বেঞ্চিতে একপাশে বসে আছে জাহিদ ও শিউলি। জাহিদের মুখে এক ধরনের ধূর্ত জয়ের হাসি সে নিশ্চিত, আজ ডিএনএ টেস্টের রিপোর্ট বের হলেই মরিয়মকে আর এই অনাগত সন্তানকে সে নিজের শক্ত কব্জায় টান মেরে ঘরে নিয়ে যাবে। শিউলিও ভেতরে ভেতরে ছটফট করছে, যদি কোনোভাবে প্রমাণ হয়ে যায় বাচ্চাটা জাহিদের, তবে মরিয়মকে আবার এই পরিবারে সতীন হিসেবে সইতে হবে, কিন্তু রফিকের সেই অহংকারের পাহাড় এক নিমেষে ধূলিসাৎ হবে। খুশির থেকে চিন্তাটাই বেশি হচ্ছে, নারী জাতি স্বামী যেমনই হক তার ভাগ কাউকে দিতে চাইবে না।
মেঝেতে শান্ত হয়ে বসে আছে রফিক শেখ।ওর গাম্ভীর্য আজ আরও অনেক বেশি কঠিন, যেন পাথরে খোঁদাই করা একমূর্তি। মরিয়ম ওর ঠিক পাশটিতে বসে নাখ খুটছে,ভয়ে তার হাতও একটু কাপছে বটে।
রফিক ওর শক্ত হাতটি দিয়ে মরিয়মের বরফশীতল হাতের তালুটা আলতো করে চেপে ধরল। ওর নিচু গলার আওয়াজ কেবল মরিয়মের কান পর্যন্ত পৌঁছাল, “বউ, ভয় পাচ্ছ? আমি তো আছি। আর সত্য তো কোনোদিন লুকিয়ে থাকে না।”
মরিয়ম পানিভরা চোখে রফিকের দিকে তাকাল। ওর এই অটুট বিশ্বাসই মরিয়মের জীবনের একমাত্র অবলম্বন।
এমন সময় সাদা অ্যাপ্রন পরা বয়স্ক ডাক্তার সাহেব রুম থেকে হাতে একটা খাম নিয়ে বের হয়ে এলেন। সঙ্গে আড়ালে দাঁড়িয়ে ছিলেন ইদ্রিস মাতব্বর আর গাঁয়ের দুই মুরুব্বি, যারা নিরপেক্ষ সাক্ষী হিসেবে গ্রাম থেকে এসেছিলেন।
ডাক্তার সাহেব চশমাটা নাকের ওপর ঠিক করে গম্ভীর গলায় বললেন, “আপনারা সবাই একটু ভেতরে আসুন। ল্যাব থেকে রিপোর্ট চলে এসেছে।”
সবাই হুড়মুড় করে ডাক্তার সাহেবের চেম্বারে ঢুকাল। জাহিদ এক পা এগিয়ে একপ্রকার ডাক্তার সাহেবের টেবিলের ওপর ঝুঁকে পড়ল, “ডাক্তার সাব! রিপোর্ট কী কয়? বাচ্চার বাপ কে? হিসাব তো সোজা, তিন মাসের বাচ্চা,,,, আমারই রক্ত তো?”
ডাক্তার সাহেব কড়া নজরে জাহিদের দিকে তাকালেন। তারপর খামটা খুলে কাগজটা চোখের সামনে ধরে অত্যন্ত পরিষ্কার এবং স্পষ্ট বাংলায় উচ্চারণ করলেন, “ডিএনএ প্রফাইল (DNA Profile) এবং বাচ্চার ভূণগত বয়স অত্যন্ত নিখুঁতভাবে পরীক্ষা করা হয়েছে। টেস্টের ফলাফল অনুযায়ী, এই বাচ্চার সঙ্গে জাহিদের কোনো ধরনের জৈবিক জন্মগত সম্পর্ক নেই!”
চেম্বারে যেন এক নীরবতা নেমে এল। জাহিদের মুখের হাসির রেখা এক মূহুর্তে মুছে গিয়ে মুখটা ছাইয়ের মতো ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
“কী,,,, কী কইলেন ডাক্তার সাব?” জাহিদ তোতলে উঠল, “এ কীভাবে সম্ভব? আমি তো,,,,”
ডাক্তার সাহেব বিরক্তি প্রকাশ করে কাগজটা মাতব্বরের দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, “বিজ্ঞানের ওপর কি আপনারা কথা বলবেন? দ্বিতীয় কথা, আল্ট্রাসনোগ্রাফির সূক্ষ্ম রিপোর্টে বাচ্চার প্রকৃত বয়স ও সময় পরিষ্কার করা হয়েছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের চূড়ান্ত রিপোর্ট বলছে এই সন্তানের শতভাগ পিতৃত্বের অধিকার রফিক শেখের!”
কথাটা যেন পুরো ঘরে এক পরমাণু বোমার মতো ফাটল! শিউলি তো মনে মনে মহাখুশি
জাহিদ চেঁচিয়ে উঠল, “এ মিথ্যা কথা! রফিকর সাথে তো মরিয়মের বিয়ের বয়স মোটে দুই মাস কয়েক দিন! তিন মাসের বাচ্চা রফিক ভাইয়ের হয় কীভাবে? আপনারা টাকার লোভে ভুয়া রিপোর্ট দিছেন!”
ডাক্তার সাহেব এবার রেগে গিয়ে টেবিল থাপড়ে উঠলেন, “মুখ সামলে কথা বলুন! আর বাচ্চার বয়স তিন মাস এটা আপনাদের কে বলছে? বাচ্চার বয়স দুই মাস। ল্যাব রিপোর্ট মিথ্যা বলে না। মরিয়ম বেগমের গর্ভের বয়স এবং রফিক শেখের সাথে উনার শারীরিক মি-লন ও সন্তান ধারণের নিখুঁত সূচক বিজ্ঞানের নিয়মেই প্রমাণিত। এখানে কোনো ধরনের কারচুপি হয়নি। অভিভাবক ও পিতা হিসেবে রফিক শেখের নামই চূড়ান্ত!”
জাহিদ যেন নিজের দুই পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়ানোর ক্ষমতা হারিয়ে ফেলল। সে এক ধাক্কায় পেছনের দেয়াল চেপে ধরল। তার চোখের সামনে যেন অন্ধকার নেমে এল। সে যে অংকের হিসাব কষে মরিয়মকে আবার টেনে নেওয়ার চাল চেলেছিল, সেই অংক তার নিজের বুকেই এসে আঘাত হানল! রফিকের সাথে মরিয়মের বিয়ের বয়স আর বাচ্চার বয়সের যে মিথ্যা ফাঁদ তারা সাজিয়েছিল, তা ডাক্তারের বিজ্ঞানের কাছে ধূলিসাৎ হয়ে গেল। পরম করুণাময়ের এক অদ্ভুত কুদরতে রফিক শেখই যে এই অনাগত সন্তানের আসল পিতা তা পুরো পৃথিবীর সামনে দিনের আলোর মতো পরিষ্কার হয়ে গেল।
রফিক ধীরপায়ে উঠে দাঁড়াল। ডাক্তার সাহেবকে ধন্যবাদ জানিয়ে রিপোর্টের কপিটা নিজের হাতে নিল।
তারপর সে জাহিদের একদম মুখোমুখি গিয়ে দাঁড়াল। ওর চোখের দৃষ্টিতে তখন চরম ঘৃণা আর তেজ।
“কী রে জাহিদ?” রফিকের গলার আওয়াজ চাবুকের মতো ফেটে পড়ল, “তোর সব হিসাব মিলল তো? তুই ভেবেছিলিস তুই মরিয়মকে চোর, কুলটা বানিয়ে নিজের পাপের কাসুন্দি ঢাকবি? ভেবেছিলিস বাচ্চার ভুয়া দাবি তুলে এই শেখ বাড়ির সম্মান আবার বাজারে নিলাম করবি? ডাক্তার তো তোকে জবাব বুঝিয়ে দিয়েছে!”
জাহিদ মাথা নিচু করে থরথর করে কাঁপছে তার মুখ দিয়ে কোনো শব্দ বের হচ্ছে না।
ইদ্রিস মাতব্বর ধিক্কার দিয়ে বলে উঠলেন, “জাহিদ! তুই পুরুষ নামের কলঙ্ক রে! তুই আর শিউলি মিলে নিজের ভাই আর উনার বউকে অপমান করার জন্য এত বড় জঘন্য নাটক সাজাইছিলি? তোদের থুথু দেওয়া উচিত!”
রফিক মরিয়মের হাতটা পরম শ্রদ্ধায় নিজের হাতের মুঠোয় নিল। মরিয়মের চোখে তখন অঝোর ধারায় পানির নদী বইছে, কিন্তু সে পানি আর কষ্টের নয় সে পানি সত্যের জয়ের, ভালোবাসার পরম আনন্দের। রফিক শেখ শুধু তার মান-সম্মান রক্ষা করেননি, তাদের অনাগত সন্তানকেও পুরো সমাজের পাপাচার থেকে মুক্ত করে এক পবিত্র পরিচয় এনে দিল।
রফিক জাহিদ আর শিউলির দিকে শেষ নজর রেখে বরফশীতল গলায় বললেন, “তোদের যেটুকু লজ্জা অবশিষ্ট আছে, তা নিয়ে বাপের ভিটায় পা দিস। আর মনে রাখিস আজ থেকে মরিয়ম ও আমার সন্তানের দিকে যদি তোদের কোনো কুৎসিত নজর পড়ে, তবে রফিক শেখ তোদের জন্য কতটা ভয়ংকর হতে পারে, তা তোরা কল্পনাও করতে পারবি না।”
রফিক মরিয়মকে সাথে নিয়ে ধীরপায়ে হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে এল।
আশ্বিনের পরিষ্কার আকাশে তখন মেঘ কেটে গিয়ে সোনাঝরা রোদ উঠেছে। মরিয়ম রফিকের পাশে মাথা উঁচু করে হেঁটে চলল।
চলবে,,,,

