Home "ধারাবাহিক গল্প "অবহেলার মুক্তা অবহেলার মুক্তা পর্ব-১২

অবহেলার মুক্তা পর্ব-১২

0
6

#অবহেলার_মুক্তা
#আরিবা_নাওশীন
#পর্ব_১২

দরজায় শান দেওয়া রাম-দার কোপ আর লা*থির প্রচণ্ড শব্দে বড় কামড়ার শক্ত কাঠের কপাটটা মড়মড় করে উঠল। ঘরের ভেতরে হারিকেনের আলোটা থরথর করে কাঁপছে। বাইরে ততক্ষণে এক নারকীয় তাণ্ডব শুরু হয়ে গেছে। উত্তর পাড়ার দিকে দাউদাউ করে জ্বলতে থাকা আগুনের লাল আভা শেখ বাড়ির জানালার ফাঁক গলে ভেতরে এসে পড়ছে।

শাশুড়ি রাবেয়া বেগম ভয়ে মরিয়মের হাত ধরে মাটিতে লুটিয়ে পড়ার উপক্রম হলেন। উনার ঠোঁট জোড়া কাঁপছিল, “ও বড় বউ রে! মোদের কি আজ মে-রেই ফেলবে? রফিক কই? ও রফিক,,, বাবারে মোগো বাঁচা!”

মরিয়ম কিন্তু আর আগের সেই অসহায়, দুর্বল মেয়েটি নেই। সে জানে, তার পেটে এখন আর একজন সদস্য, আর তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে এক বয়স্ক শাশুড়ি। এই মুহূর্তে ভেঙে পড়লে তাদের রক্ষা করার আর কেউ থাকবে না। রফিক তাকে বিশ্বাস করে ঘরের নিরাপত্তা আর এই চাবি সঁপে গেছেন, তাকে শক্ত হতেই হবে।

মরিয়ম শক্ত হাতে শাশুড়ির কাঁধ চেপে ধরল, “মা, ভয় পাবেন না! রফিকের কিছু হবে না, আমাদেরও না! উনি আমাদের জন্য রূপার চাবি আর গোপন কুঠুরি রেখে গেছেন। আপনি এক ফোঁটাও আওয়াজ করবেন না, ধীরপায়ে আমার সাথে আসেন।”

মরিয়ম অত্যন্ত চতুরতার সাথে ঘরের এক কোণে থাকা বিশালাকার মাটির সিন্দুকের কাছে গেল। সিন্দুকের পেছনের কাঠের দরজায় রফিকের রেখে যাওয়া সেই রূপার চাবিটা ঘোরাতেই একচিলতে গোপন দরজার খিল আলগা হয়ে গেল। এটা ছিল পুরোনো জমিদার আমলের বাড়ি—বিপদের দিনে আত্মগোপনের জন্য দেয়ালে তৈরি ছোট কুঠুরি।

মরিয়ম শাশুড়িকে সাবধানে ভেতরের আঁধার ঘরে ঢুকিয়ে দিল। নিজে ভেতরে ঢোকার ঠিক আগের মুহূর্তে দেখল দরজার কাঠের খিল ছিটকে পড়তে যাচ্ছে! সে দ্রুত ভেতরে ঢুকে কুঠুরির কপাট লাগিয়ে ভারী শেকল তুলে দিল।

ঠিক সেই মুহূর্তে ঘরের প্রধান দরজা ভেঙে ভেতরে আছড়ে পড়ল তিন-চারজন মুখোশধারী ডাকাত! তাদের হাতে খোলা রাম-দা, মুখে কালো কাপড় বাঁধা, আর পরনে স্যাঁতসেঁতে ভেজা পোশাক গা দিয়ে নদীর পচা পানি আর তাজা র-ক্তের কটু গন্ধ ভেসে আসছে।

ডাকাত দলের সর্দার বিকট এক হাঁক দিল, “কই রফিক শেখের পরিবার? ঘরের কোণে লুকাইয়া লাভ নাই! আজ এই শেখ বাড়ির কাওরে জ্যান্ত রাখুম না! রফিক শেখ অনেক বড় মাতব্বরি দেখাইছে, আমাদের পথ আটকাইতে চাইছে!”

ডাকাতরা পুরো ঘর তছনছ করতে শুরু করল। লেপ-তোশক ফঁড়ে ফেলল, পিতলের হাঁড়ি-পাতিল আছাড় মে-রে ভাঙল, কিন্তু সিন্দুকের গোপন কপাটের কথা তাদের মাথায় এল না।

বাইরে তখন শিউলি আর করিমনের চিৎকার শোনা যাচ্ছে। জাহিদ উঁকি দিতে গিয়ে ডাকাতের এক ধাক্কায় উঠোনের কাদা-পানিতে আছাড় খেয়ে পড়ে। জাহিদের কোনো সাহসাই ছিল না উঁচিয়ে আসা রাম-দার সামনে দাঁড়ানোর।

কুঠুরির ভেতর থেকে মরিয়ম একহাতে নিজের পেট চেপে ধরে অন্যহাতে শাশুড়ির মুখ চেপে রাখল। তার হৃদপিণ্ড যেন বুকের ভেতর হাতুড়ির মতো পিটছিল। সে মনে মনে শুধু আল্লাহ নাম জপছিল ‘রফিক,,, আপনি ফিরে আসেন,,।’

হঠাৎ দরজার বাইরে থেকে এক সিংহের মতো গর্জন ভেসে এল!

“তোদের এত বড় সাহস রে শয়তানের দল! আমার ভিটায় ঢুইকা আমার ঘরের ওপর নজর দিস?”

রফিক শেখ ফিরে এসেছে।

উত্তর পাড়ার আগুন যে এক বিশাল চক্রান্ত আর চাল ছিল, তা রফিক আগেই ধরে ফেলেছিল। ডাকাত দল গ্রামবাসীদের ওদিকে ব্যস্ত রেখে মূল শেখ বাড়িতে হামলা চালাতে চেয়েছিল। কিন্তু রফিক মাঝপথেই ব্যাপারটি আঁচ করতে পেরে উনার চার-পাঁচজন অনুগত চালিয়াট জোয়ানদের নিয়ে ঝড়ের বেগে ফিরে এসেছে!

ওর হাতে থাকা রাম-দাওয়ালদের ঠেকানোর মোটা বাঁশের লাঠিটা বাতাসে সাঁই সাঁই করে ঘুরছিল।

দরজার মুখে দাঁড়ানো এক ডাকাত কিছু বুঝে ওঠার আগেই রফিক ওর হাতের লাঠি দিয়ে সজোরে ওর মাথায় আঘাত করল। এক আঘাতে ডাকাতটা র-ক্তবমি করে মাটিতে ঢলে পড়ল।

“রফিক শেখ বেঁচে থাকতে আমার পরিবারের গায়ে এক ফোঁটা আঁচড় দেওয়ার সাধ্য কারও নাই!”

রফিকের বজ্রকণ্ঠ শুনে গোপন কুঠুরির ভেতর মরিয়মের বন্ধ চোখের কোণ দিয়ে স্বস্তির অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। তার পুরুষ ফিরে এসেছে!

রফিক আর ওর সঙ্গীদের সাথে ডাকাত দলের এক সংঘর্ষ শুরু হলো উঠোনে। রফিকের অসীম শারীরিক শক্তি আর তেজের সামনে সেই তিন-চারজন ডাকাত টিকতে পারল না। গ্রামের অন্য যুবকরাও লাঠিসোঁটা আর মশাল নিয়ে শেখ বাড়ির উঠোনে জড়ো হয়ে গেল। বিপদ বুঝে ডাকাত দলের সর্দার পেটে লাঠির আঘাত খেয়ে র-ক্তাক্ত অবস্থায় সঙ্গীদের নিয়ে পেছনের বাঁশঝাড় আর মধুমতী নদীর দিকে চম্পট দিল।

গ্রামজুড়ে তখন শোরগোল। আলোয় আলোয় ভরে গেছে শেখ বাড়ির উঠোন।

রফিক শেখ কোনো দিকে না তাকিয়ে, হাতের র-ক্তমাখা লাঠিটা মাটিতে ফেলে সোজা বড় ঘরের দিকে ছুটে এল। ওর ধুতি আর ফতুয়ায় কাদা-র-ক্তের ছোপ, কপালে ঘাম আর ভীতি। জীবনে প্রথমবার এই শক্ত পাহাড়সম পুরুষটার চোখে এক আকুলতা ও ভয় দেখা গেল—মরিয়ম আর তার অনাগত সন্তান ঠিক আছে তো?

“মরিয়ম! মরিয়ম! কই তুমি? দরজা খোল!” রফিকের গলার আওয়াজ কাঁপছিল।

সিন্দুকের গোপন কপাট খুলে গেল। হারিকেনের আবছা আলোয় ধীরপায়ে বেরিয়ে এল মরিয়ম। তার কপালে ঘেমে যাওয়া চুল লেপ্টে আছে, কিন্তু চোখে এক পরম প্রশান্তি।

রফিক এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেলে। ওর কঠিন হাত দুটি বাড়িয়ে দিয়ে অত্যন্ত সাবধানে মরিয়মের দুই কাঁধ জড়িয়ে ধরল।

“তুমি ঠিক আছ তো বউ? বাচ্চার কোনো ক্ষতি হয়নি তো? আমি একটু দেরি করলেই তো,,,” রফিকের মতো বিশাল ব্যক্তিত্বের পুরুষটির স্বর কান্নায় আটকে এল।

মরিয়ম রফিকের সেই বিশাল বুকের ওপর নিজের মাথাটা আলতো করে রাখল। বাইরের সমস্ত র-ক্তপাত, ভয় আর শোরগোল যেন উবে গেল এই পরম আশ্রয়ে। সে রফিকের বুকে নিজের হাত রেখে নরম গলায় বলল, “আপনার মরিয়ম আর আপনার সন্তান এক চুলও আঘাত পায় নাই। যতক্ষণ আপনার দেওয়া বিশ্বাস আর আল্লাহ আমার সাথে আছে, এই পৃথিবীর কোনো শক্তি আমাদের ক্ষতি করতে পারবে না।”

রফিক পরম স্নেহে মরিয়মের মাথায় নিজের শক্ত হাতটি রাখল। ওর বুকটা এক দীর্ঘশ্বাসে ভরে উঠল।

উঠোনে তখন ইদ্রিস মাতব্বর আর গাঁয়ের যুবকরা এসে দাঁড়িয়েছে। জাহিদ ভিটের কোণে হাঁটু গেড়ে বসে কাঁপছিল। রফিকের এই রূপ, ওর সাহসিকতা আর মরিয়মের প্রতি ওর অগাধ ভালোবাসা দেখে জাহিদের নিজের কাপুরুষতা আর এক বার নগ্ন হয়ে পড়ল। শিউলিও দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে ফ্যাকাশে মুখে সব দেখছিল।

ইদ্রিস মাতব্বর এগিয়ে এসে বললেন, “রফিক! ডাকাত সর্দার তো পালাইছে, কিন্তু নদীপাড়ের এই ডাকাত দল এতদিন সাধারণ ডাকাতি করত। আজ তারা সোজা তোর বাড়ি আইসা তোকে আর তোর পরিবারকে শেষ করতে চাইল ক্যা? এর পেছনে কি অন্য কোনো উদ্দেশ্য আছে?”

রফিক মরিয়মকে ঘরের বেঞ্চিতে সাবধানে বসিয়ে দিয়ে বাইরে এল। ওর চোখ দুটো আবার কঠিন হয়ে উঠেছে।

“কাকা,” রফিক বরফশীতল গলায় বলল, “এরা শুধু নদীর ডাকাত না। এই ডাকাতির পেছনে গ্রামেরই কারও গভীর চক্রান্ত আছে। যারা নিজেরা আমার ক্ষতি করতে পারেনি, তারা এই ভাড়াটে ডাকাতদের টাকা খাইয়ে আমার ঘর ধ্বংস করতে পাঠাইছিল! কিন্তু রফিক শেখ এই বিষাক্ত সাপের মাথা ছেঁটে ফেলবে।”

রফিক শেখের কথা শুনে উঠোনের বাতাস আবার থমথমে হয়ে উঠল।

চলবে,,,,,