#অবহেলার_মুক্তা
#আরিবা_নাওশীন
#পর্ব_১৩
মরিয়মের গর্ভে সন্তান আসার সত্যটি নিশ্চিত হওয়ার পর থেকে পুরো বাড়িতে মরিয়মের স্থান হয়েছে সবার উপরে। আগের সেই অবহেলিত, লাঞ্ছিত মরিয়ম এখন রফিক শেখের পরম শ্রদ্ধেয় ‘বউ’।
আশ্বিনের সোনালী সকালের আলো যখন বড় কামরার কাঠের বারান্দায় এসে পড়ে, তখনই শুরু হয় শাশুড়ি রাবেয়া বেগমের তদারকি। যে শাশুড়ি একদিন সামান্য ভুলের জন্য মরিয়মকে বাসি ভাত দিত, আজ তিনিই ভোর থাকতে উঠে নাতির মুখ দেখার আশায় মরিয়মের খাবারের পুষ্টির হিসাব কষছেন।
“ও বড় বউ! ওঠো গো বাছা, কতক্ষণ আর শুয়ে থাকবে? সকালে খালি পেটে থাকতে নাই!”
রাবেয়া বেগম নিজের হাতে ধোঁয়া ওঠা কাসার থালায় করে বাতি বাতি খাবার সাজিয়ে মরিয়মের বিছানার পাশে এনে রাখলেন। থালায় গাভীর খাঁটি দুধ, গাঁয়ের দেশি মুরগির ডিম সিদ্ধ, লাল চালের গরম ভাত আর ডাবের পানি।
মরিয়ম চোখ ডলে উঠে বসে আলতো করে হাসল, “মা, এত খাবার আমি একা কীভাবে খাব? আপনারা অযথাই এত খাটাখাটনি করছেন।”
রাবেয়া বেগম মরিয়মের মাথায় হাত বুলিয়ে পরম আদরে বললেন, “আহা রে আমার লক্ষ্মী বউটা! এতদিন কত কষ্ট পাইছিস এই ভিটায়। এখন তোর পেটে রফিকের র-ক্ত, আমাদের শেখ বংশের প্রদীপ। তোরে কি আর অযত্নে রাখা যায়? ডাক্তার সাব বলে দিছে তোরে পুষ্টিকর খাবার খাওয়াতে। চুপচাপ সবটুকু খেয়ে নাও তো দেখি!”
মরিয়মের চোখ দুটো আবেগে ছলছল করে উঠল। যে ভালোবাসা আর সম্মান সে সারা জীবনেও আশা করেনি, তা আজ তার আঁচল ভরে এসেছে।
রফিক শেখ হাটে যাওয়ার আগে প্রতিদিন নিজের হাতে মরিয়মের জন্য ফলমূল কেটে আনছেন। আপেল, আঙুর, আর দেশি ডালিম রফিক সযত্নে মরিয়মের ঘরের টেবিলে রাখে। সকালে হাটে যাওয়ার আগে রফিক ধীরপায়ে মরিয়মের ঘরের দরজায় এসে দাঁড়াল। ওর পরনে খাদি ফতুয়া আর হাতে বাঁশের লাঠি।
“বউ,” রফিকের গলার স্বর ভারী কিন্তু অতি স্নিগ্ধ। “আমি হাটে যাচ্ছি। ডাক্তার সাবের দেওয়া ভিটামিন ওষুধগুলো সময়মতো খেয়ো। রোদে বেশি হাঁটাহাঁটি করবে না। শিউলি আর করিমনকে আমি কড়া হুকুম দিয়ে গেছি ঘরের কোনো ভারী কাজ তোমারে ছুঁতেও দেবে না।”
মরিয়ম রফিকের দিকে তাকাল। পুরুষটার চেহারায় আজ আর আগের সেই কঠোর রাগের প্রাবল্য নেই, আছে এক দায়িত্বশীল স্বামীর পরম মায়া। মরিয়ম আঁচল সোজা করে বলল, “আপনি নিজের খেয়াল রাখবেন। ইদানীং গ্রামের অবস্থা ভালো না, সাবধানে চলাফেরা করবেন।”
রফিক একটু মৃদু হাসল, যা ওর রুক্ষ চেহারায় দুর্লভ এক দৃশ্য। সে মাথায় হাত রেখে চলে গেল।
দুপুরের রোদ যখন কড়া রূপ নিল, তখন রান্নাঘরে শিউলির মেজাজ চরম তুঙ্গে।
উস্কোখুস্কো চুলে ডেকচি মাজতে মাজতে শিউলি দাঁতে দাঁত ঘষছিল। পাশে করিমন পান চিবোচ্ছিল আর সর্ষের শাক কুটছিল। শিউলি রাগে এক আছাড় মেরে মাটির থালাটা মেঝেই ফেলে দিল!
“অসহ্য! এই ঘরের দিন দিন কী হচ্ছে বুবু?” শিউলি বিষ উগরে দিল, “আমরা হলাম এই ঘরের কামলা দাসী, আর মরিয়ম কালঙ্কী এখন রাজরানী! সকাল হইতে না হইতে শাশুড়ি মা উনারে দুধ-ডিম খাইয়ে মাথায় তুলে রাখছে, আর রফিক ভাই শহর থিকা আপেল-আঙুর কিনে এনে উনার পায়ের কাছে সঁপে দিচ্ছে! আমাদের কপালে কি শুধু ডেকচির কালি আর ঝাঁটার লাথি?”
করিমন মুখ বিকৃত করে ফিসফিস করে বলল, “চুপ কর শিউলি! বেশি চিল্লাচিল্লি করলে রফিক ভাই শুনলে তোর খাটুনি আরও বাড়ায় দেবে। ওরে এখন ছোঁয়া যাবে না, পেটে রফিকের বাচ্চা আইছে। সবাই উনার গোলাম হয়া গেছে।”
শিউলি চোখ গোল গোল করে হিংসায় জ্বলতে জ্বলতে বলল, “বাচ্চা আইছে তো কী হইছে? আমার এই অপমান সইবে না বুবু! যেই মরিয়ম আমার পায়ের তলায় থাকত, সে আজ আমারে দিয়ে থালাবাটি মাজায়! আমি এই রূপ আর এই যত্ন বেশিদিন সহ্য করতে পারমু না, কিছু একটা করতেই হবে!”
বিকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামার মুখে এক অদ্ভুত দৃশ্য ঘটল শেখ বাড়ির পেছনের আমবাগানের কোণে।
জাহিদ ভেতরের অনুশোচনা তাকে কুরে কুরে খাচ্ছে নিজের ঘরে বসে শিউলির খিটখিটে কটু কথা আর গালিগালাজ সইতে না পেরে চুপচাপ বাইরে বেরিয়েছিল। মরিয়মের প্রতি তার যে অপরাধবোধ আর অতীতের আফসোস, তা আজ তাকে এক চরম আত্মগ্লানিতে পুড়িয়ে ম-ারছে।
জাহিদ খুব আড়ালে, শিউলি বা মার চোখ বাঁচিয়ে নিজের জামার আড়ালে লুকিয়ে রাখা একটা ছোট মাটির খাঁচা আর কাঁচের বয়াম নিয়ে মরিয়মের বড় ঘরের বারান্দার পেছনের জানালার কাছে এল।
বয়ামে ছিল খাটি গাওয়া ঘি, আর ছোট খাঁচাটায় কয়েকটা টাটকা দেশি খাঁটি ছানার মিষ্টি যেটা সে পাশের বাজারের নামকরা দোকান থেকে নিজের জমানো শেষ কয়েকটা টাকায় কিনে এনেছে।
জাহিদ জানালার খিল ফাঁক করে কাঁপা কাঁপা হাতে মিষ্টির বয়ামটা ঘরের কোণের টেবিলে রেখে দিল। সে জানে, মরিয়ম মিষ্টি খেতে ভালোবাসে। কিন্তু জাহিদের সেই সাহস নেই যে সে মরিয়মের সামনে গিয়ে দাঁড়াবে।
টেবিলে খাবারটা রেখে জাহিদ পিছিয়ে যেতেই কাঠের মেঝেতে মৃদু শব্দ হলো। মরিয়ম ঘরের ভেতরে শাড়ি ভাঁজ করছিল, শব্দ পেয়ে সে ঘুরে তাকাল।
জানালার ওপাশে জাহিদকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মরিয়ম থমকে গেল।
জাহিদ মাথা নিচু করে অপরাধীর মতো ফিসফিস করে বলল, “ম-মরিয়ম,,,, ভয় পাইও না। আমি কোনো মতলব নিয়ে আসি নাই। বাজারে গেছিলাম,,,, ছানার মিষ্টিগুলো তোর বড্ড প্রিয় ছিল, তাই লুকিয়ে এনে রেখে গেলাম। আর ঘিটা মাকে বলিস তোকে দুবেলা ভাতে দিতে,,,, এতে নাকি শরীরের ক্ষমতা বাড়ে।”
মরিয়ম শান্ত কিন্তু দৃঢ় চোখে জাহিদের দিকে তাকাল। তার চোখে কোনো আক্রোশ নেই, আছে এক সমুদ্র সমপরিমাণ বিরক্তি ও দূরত্ব।
“এসব কেন করছ জাহিদ?” মরিয়মের গলার স্বর বরফের মতো ঠান্ডা। “আমার স্বামী রফিক শেখ আমার জন্য যা আনেন, তাতেই আমার আর আমার বাচ্চার জন্য যথেষ্ট। তোমার এই করুণা বা লুকানো ভালোবাসার প্রয়োজন আমার নেই। এসব খাবার তুমি নিয়ে যাও।”
জাহিদের চোখে পানি চলে এল। সে ধীরকন্ঠে বলল, “আমি জানি তোর ওপর আমি অমানুষিক অত্যাচার করেছি মরিয়ম। শিউলির ফাঁদে পড়ে তোকে তাড়িয়ে দিয়েছিলাম। কিন্তু আজ তোকে রফিকের পাশে এত শান্তিতে আর সম্মানে থাকতে দেখে আমার বুকের ভেতরটা ছিঁড়ে যায়। আমি তোকে কিছু দিতে পারি নাই,,,,, এইটুকু অন্তত ফিরিয়ে দিস না মরিয়ম!”
“তুমি আমাকে আঘাত দেওয়া ছাড়া আর কিছুই দেও নাই জাহিদ,” মরিয়ম সোজাসুজি উত্তর দিল। “আর আজ আমি রফিক শেখের ঘরণী। উনার সম্মান আমার সম্মান। উনার অজান্তে তোমার আনা এক ফোঁটা খাবারও আমি মুখে তুলব না। তুমি এগুলো নিয়ে যাও, আর কোনোদিন এই ঘরের আশেপাশে এমন কাজ করবে না।”
মরিয়ম জানালার কপাট এক ঝটকায় আটকে দিল।
জাহিদ বারান্দার কোণে মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে রইল। তার হাত দুটি কাঁপছিল। সে বুঝল, যে মুক্তাকে সে অবহেলা করে ফেলে দিয়েছিল, সেই মুক্তা আজ অন্য রাজপ্রাসাদের শোভা। তার আর কোনো অধিকার নেই সেই মুক্তায় হাত দেওয়ার।
কিন্তু জানালার আড়াল থেকে পুরো দৃশ্যটি দেখে ফেলেছিল শিউলি!
শিউলির চোখের মনি দুটো হিংসায় আর আক্রোশে কুঁকড়ে গেল। জাহিদ নিজের শেষ সম্বল দিয়ে মরিয়মের জন্য খাবার এনেছে! শিউলি দাঁতে দাঁত চেপে বিড়বিড় করল, “এত ভালোবাসা? জাহিদ তোর জন্য গোপনে মিষ্টি আনে? দাঁড়া মরিয়ম, তোরে আর তোর পেটকে আমি এমন শিক্ষা দেব যা তুই স্বপ্নেও ভাবিস নাই!”
ঠিক সেই মুহূর্তে গ্রামের পরিবেশ এক নিমেষে বদলে গেল।
পীরপুর গ্রামের দক্ষিণ সীমানায় নদীর ধারের বাঁশঝাড় থেকে ভেসে এল শত শত মানুষের শোরগোল আর বিকট কান্না! ডুগডুগির শব্দে পুরো গ্রাম কেঁপে উঠল।
“ওরে বাবারে! বাঁচাও! এ কোন আজাব নামল রে গ্রামে! আরেকটা খু-ন হইছে!”
খবরটা দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ল। রফিক শেখ ততক্ষণে হাট থেকে ফিরে এসেছিল, খবর শোনামাত্রই লাঠি হাতে জোয়ানদের নিয়ে ছুটল দক্ষিণ পাড়ার দীঘির পাড়ে।
পিছনে পিছনে গাঁয়ের মুরুব্বি ইদ্রিস মাতব্বর, জাহিদ এবং গ্রামের শত শত মানুষ জমা হলো সেই দীঘির পাড়ে। মশালের ঘোলাটে লাল আলোয় যা দেখা গেল, তা দেখে উপস্থিত সবার বুকের র-ক্ত জমে যাওয়ার উপক্রম হলো!
পূর্বের খু-নের চেয়ে এই মৃ-ত্যু বহুগুণ বেশি ভয়ঙ্কর, নৃশ-ংস আর পৈশ-াচিক!
দীঘির পাড়ের এক পুরোনো বট গাছের ডালে উল্টো করে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে গ্রামের প্রবীণ মাতব্বর জমিল কাকার লাটাবোঝাই দেহটা!
তার পুরো শরীরে কাপড়ের কোনো চিহ্ন নেই। শরীরজুড়ে ধারালো কোনো অ-স্ত্র দিয়ে জালের মতো আঁচড় কাটা হয়েছে, যেন তিলে তিলে চামড়া ছুলে নেওয়া হয়েছে! কিন্তু সবচেয়ে ভয়ঙ্কর বিষয় হলো মৃ-তদেহের বুকের ঠিক মাঝখানে রক্ত দিয়ে এক অদ্ভুত জ্যামিতিক নকশা আঁকা, আর উনার দুটো চোখই কোটর থেকে উপড়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে! শরীরে অনেক অংশই পাওয়া যাচ্ছে না। হয়তো আছে আসেপাশে।
দৃশ্যটা দেখে অনেক সবল পুরুষও বমি করে দিল।
ইদ্রিস মাতব্বর কাঁপতে কাঁপতে মাটিতে বসে পড়লেন, “এ,,,,, এ কোনো সাধারণ ডাকাত দলের কাজ না রে! এ কোনো পিচাশের কাজ! মানুষ মানুষের সাথে এমন পৈশাচিকতা কীভাবে করতে পারে?”
রফিক শেখ আগুনের মশালটা উঁচিয়ে লা-শটির কাছে গিয়ে দাঁড়াল। ওর রুক্ষ চোয়াল শক্ত হয়ে উঠেছে, র-ক্তচক্ষু থেকে বের হচ্ছে তেজের স্ফুলিঙ্গ। সে খুব ভালো করে সেই বুকের র-ক্ত দিয়ে আঁকা চিহ্নটার দিকে তাকাল।
ওর অভিজ্ঞ চোখ বুঝতে পারল এটা কোনো সাধারণ সিঁধেল চুরি বা সম্পত্তির লোভ নয়। এর পেছনে রয়েছে কোনো গভীর অন্ধ উপাসনা, কোনো প্রাচীন শয়তানি চক্র, বা এমন এক ভয়ঙ্কর আক্রোশ যা পুরো পীরপুর গ্রামকে একে একে গ্রাস করতে এসেছে!
রফিক শেখ বজ্রকণ্ঠে হাঁক ছাড়ল, “গাঁয়ের লোক শোনো! এই মৃ-ত্যু কোনো ডাকাতের ডাকাতি নয়, এ এক সুপরিকল্পিত নর-কীয় খেলা! যে বা যারা এই পীরপুরের মাটিতে এমন পৈশাচিক র-ক্তের হোলি খেলছে, তারা মনে রাখুক রফিক শেখ বেঁচে থাকতে এই পীরপুরকে ন-রক বানাতে দেবে না!”
ঠিক তখনই ঝুমকা বাতাসের সাথে সাথে বট গাছের পেছন থেকে এক অদ্ভুত বাঁশির মতো বিকট সুর ভেসে এল, যা মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল ঘন বাঁশঝাড়ের আঁধারে।
গ্রামজুড়ে নেমে এল এক ঘন, বিষাক্ত অন্ধকারের ছায়া। একদিকে মরিয়মের গর্ভের অনাগত সন্তানের সুরক্ষা, ঘরের ভেতরে শিউলির বিষাক্ত ষড়যন্ত্র, আর অন্যদিকে গ্রামজুড়ে শুরু হওয়া এই ভয়ঙ্কর নৃসংশ হত্যাকাণ্ডের আসল নেপথ্য নায়ক কে?
চলবে,,,

