Home "ধারাবাহিক গল্প "অবহেলার মুক্তা অবহেলার মুক্তা পর্ব-১৪

অবহেলার মুক্তা পর্ব-১৪

0
7

#অবহেলার_মুক্তা
#আরিবা_নাওশীন
#পর্ব_১৪

দক্ষিণ পাড়ার ভয়ংকন খু-নের পর পীরপুর গ্রামে যেন এক নিচ্ছিদ্র ভয়ের চাদর নেমে এসেছে। সন্ধ্যার পর গাঁয়ের কোনো পুরুষও একা রাস্তায় নামার সাহস পায় না।

ভাদ্রমাস পেরিয়ে আশ্বিনের মধ্যভাগ। কাঁচা সুবাস ছড়ানো হালকা হিমেল হাওয়া রাতে ভিটের আমগাছের পাতায় মৃদু দোলা দিয়ে যায়। তখন বিদ্যুৎহীন ওই অজপাড়াগাঁয়ে একমাত্র ভরসা কেরোসিনের টর্চ আর লাল সলতের হারিকেন।

রাত তখন সাড়ে দশটা। বড় কামড়ার বারান্দার খুঁটি ধরে দাঁড়িয়ে ছিল মরিয়ম। তার পরনে একটা নীল রঙের কাঁচা সুতির ছাপা শাড়ি, চুলগুলো আলতো করে পিঠে ছড়িয়ে দেওয়া। গর্ভের বয়স চার মাস ছুঁইছুঁই, সামান্য স্ফীত পেটটা শাড়ির আঁচলের আড়ালে সযত্নে ঢাকা।

উঠোনের অন্ধকার পাহারায় রফিকের সাথে গাঁয়ের জোয়ানরা টহল দিতে গেছে। মরিয়মের চোখে ঘুম নেই। হারিকেনের কাঁচটা একটা পুরোনো সূতির কাপড়ের কোণা দিয়ে সে ধীরে ধীরে পরিষ্কার করছিল। সলতের লাল শিখাটা কাঁচের ভেতর থেকে এসে মরিয়মের স্নিগ্ধ মুখে এক মায়াবী আলো ফেলেছিল।
ঠিক সেই সময় বারান্দার কাঠের সিঁড়িতে ভারী বুটের আওয়াজ পাওয়া গেল।

রফিক শেখ ফিরে এসেছে। ওর হাতে সেই পিতল বাঁধানো মোটা লাঠি, পরনে সাদা ঢিলেঢালা ফতুয়া আর সুতির ধুতি। সারাদিনের ধকল আর রাতের পাহারার ক্লান্তি উনার চোখে-মুখে স্পষ্ট, কিন্তু ঘরে ঢুকে মরিয়মকে সামনে দেখেই উনার সেই কঠোর চেহারার সমস্ত কাঠিন্য এক মুহূর্তেই গলে যেন জল হয়ে গেল।
রফিক ওর হাতের লাঠিটা বারান্দার কোণে রাখল।

মরিয়ম তড়িঘড়ি করে হারিকেনটা টেবিলে রেখে এগিয়ে এল, “আপনি এসেছেন? শরীর ঠিক আছে তো? আমি এক গ্লাস ঠান্ডা পানি এনে দিই?”

রফিক একহাত তুলে মরিয়মকে থামাল। উনার গলার স্বর অতি নিচু, কেবল উনার ও মরিয়মের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।

“তুমি এই এত রাতেও জেগে আছ বউ? তোমার না শরীরের ওপর জোর দেওয়া নিষেধ?”

মরিয়ম আলতো করে একচিলতে মিষ্টি হাসল যেই হাসিতে কোনো কৃত্রিমতা নেই, আছে কেবল এক নারীর পরম তৃপ্তি। সে শাড়ির আঁচলটা একটু টেনে বলল, “আপনি বাইরে টহল দিচ্ছেন, গ্রামের কী যে সব জঘন্য অবস্থা! আপনাকে ঘরে না দেখা পর্যন্ত আমার চোখে ঘুম আসে বলেন?”

রফিক ধীরপায়ে মরিয়মের একদম কাছে এসে দাঁড়াল।

রফিক ওর শক্ত, খসখসে হাতটি বাড়িয়ে দিয়ে মরিয়মের ফর্সা, নরম ডান হাতের ওপর রাখল। রফিকের হাতের উত্তাপ মরিয়মের পুরো শরীরে এক অদ্ভুত শিহরণ ছড়িয়ে দিল। মরিয়ম লজ্জা পেয়ে একটু চোখ নিচু করল

“মরিয়ম,” রফিকের গলার স্বর আজ একদম ভেলভেটের মতো নরম। “আমার এই কঠিন, রুক্ষ জীবনে তুমি আসার পর থিকা আমি বুঝতে পারছি বাঁচাল অর্থ কী। কিন্তু গ্রামের এই পরিস্থিতির মধ্যে তোমার মনে কি কোনো ভয় বা সংশয় জাগে না?”

মরিয়ম মাথা তুলে রফিকের চোখে চোখ রাখল। উনার গভীর, বিশ্বস্ত চোখ দুটোতে চোখ রেখে মরিয়ম স্নিগ্ধ গলায় উত্তর দিল, “আমার কিসের ভয়? যখন পুরো গ্রাম আমার গায়ে কাদা ছিটিয়ে চোর আর কুলটা বানাতে চাইছিল, তখন তো আপনি এক পাহাড়ের মতো আমার সামনে এসে দাঁড়িয়েছিলেন। যে পুরুষ নিজের স্ত্রীর সম্মান আর নিজের বাচ্চার পরিচয়ের জন্য পুরো দুনিয়ার সাথে লড়াই করতে পারে, তার পাশে থাকলে ভয় শব্দটাও তো লজ্জা পায়।”

কথাগুলো রফিকের বুকের ভেতর এক গভীর দোলা দিল। রফিক আলতো করে মরিয়মের গালের কাছে লেপ্টে থাকা একগাছি চুল কানের পেছনে গুজে দিলেন। উনার শক্ত আঙুলের ছোঁয়া পেয়ে মরিয়মের কপাল ঘেমে উঠল, তার হৎপণ্ডটা দ্রুত তালে বাজতে লাগল।

“তুমি সত্যি অনেক সহ্য করেছ মরিয়ম,” রফিক বলল, ওর গলার মধ্যে এক গভীর আবেগ। “আমার ছোট ভাই আর ওই শিউলি তোমারে তিলে তিলে কষ্ট দিছিল। এই শেখ ভিটা তোমারে শুধু অবহেলাই দিয়ে গেছে। কিন্তু আজ থিকা,,,, আমার জীবনের শেষ নিঃশ্বাস থাকা পর্যন্ত আমি তোমারে এই ভিটার রানী বানিয়ে রাখব।”

রফিক পকেটের ভেতর হাত ঢুকিয়ে একটা লাল স্বস্তিকের ন্যাপকিনে পেঁচানো ছোট একটা উপহার বের করলেন।

“এটা নাও।”

মরিয়ম অবাক হয়ে তাকাল, “এটা কী?”

রফিক ন্যাপকিনটা খুলতেই হারিকেনের আলোয় ঝিলমিল করে উঠল একটা খাঁটি রূপার পাতলা নুপুর আর একজোড়া রূপার ঝুমকা! নিখুঁত কারুকাজ করা, যা গ্রামের সাধারণ দোকানে সচরাচর পাওয়া যায় না।
মরিয়মের চোখ দুটো বিস্ময়ে বড় বড় হয়ে গেল, “এত সুন্দর ঝুমকা! আপনি কখন আনলেন?”

“আজ বিকেলে যখন হাটে গেছিলাম,” রফিক মৃদু হেসে বলল। “শহরের স্যাকরা এসেছিল হাটে। দেখে মনে হলো আমার বউয়ের কানে এটা খুব ভালো মানাবে। পরবে না?”

মরিয়ম আবেগে বাকরুদ্ধ হয়ে গেল। যে জাহিদ একদিন তার সহজ-সরল চাওয়াগুলোকেও তাচ্ছিল্য করে ছুড়ে ফেলেছিল, সেখানে এই গম্ভীর রফিক শেখ উনার কঠিন রূপের আড়ালে কতটা সুক্ষ্মভাবে মরিয়মের প্রতিটা ইচ্ছা আর ভালোলাগাকে খেয়াল রাখে!

মরিয়ম কুণ্ঠাবোধ করে বলল, “আপনি নিজেই পরিয়ে দিন না,,,”

রফিক থমকে গেল। তারপর এক অনাবিল স্নিগ্ধতায় ভরে উঠল উনার মুখ।

রফিক শেখ ঘরের এক কোণে থাকা পিঁড়িটা টেনে মরিয়মকে বসাল। নিজে হাঁটু গেড়ে বসল মরিয়মের ঠিক সামনে!

রফিক খুব সাবধানে মরিয়মের আলতা-পরা পায়ের গোড়ালিটা নিজের শক্ত হাতের তালুতে তুলে নিল। ওর হাতের স্পর্শে মরিয়মের গা শিউরে উঠল। রফিক রূপার নুপুরটা মরিয়মের পায়ে পরিয়ে দিয়ে তার ছোট ছোট খিলগুলো আটকে দিল।

নুপুরটা পরানো শেষ হলে রফিক মরিয়মের চোখের দিকে তাকাল। দুটো মনের দূরত্ব তখন এক সুতোর ব্যবধানে এসে আটকে গেছে। হারিকেনের লাল আলো তাদের ভালোবাসাকে যেন আরও মায়াবী করে তুলেছে।

রফিক ঝুমকা জোড়া মরিয়মের কানের লতিতে পরিয়ে দিতে দিতে ফিসফিস করে বলল, “বউ,,,, কাল সকালে মা তোমারে যেন কোনো কাজে না হাত দিতে দেন, তা আমি নিজে বলে দেব। তুমি শুধু সুন্দর করে সেজেগুজে এই ঘরে থাকবে। তোমারে খুশি দেখাটাই এখন আমার একমাত্র কাজ।”

মরিয়ম আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে ঝোঁকের মাথায় রফিকের শক্ত, চওড়া বুকের ওপর নিজের মাথাটা আলতো করে রেখে দিল।

রফিকের বুকে হাত রাখতেই মরিয়ম শুনতে পেল উনার বিশাল বুকের ভেতর হৎপণ্ডটা কীভাবে দ্রুত গতিতে স্পন্দিত হচ্ছে! রফিকও আর দ্বিধা না করে নিজের একহাতে মরিয়মের পিঠ জড়িয়ে ধরল, আর অন্য হাতটা আলতো করে মরিয়মের স্ফীত পেটের ওপর রাখল। যেখানে উনাদের ভালোবাসার প্রথম প্রদীপ বেড়ে উঠছে।

“শুনুন” মরিয়ম ফিসফিস করে বলল, “আমায় কোনোদিন ছেড়ে যাবেন না তো?”

রফিক মরিয়মের মাথায় নিজের ঠোঁট ছোঁয়াল। এক গভীর, পবিত্র সুবাসে ভরে উঠল উনার মন।

“মরিয়ম, এই রফিক শেখ কোনোদিন নিজের প্রতিশ্রুতি থেকে পিছু হটে না। তুমি আমার শুধু স্ত্রী নও, তুমি আমার সম্মান, আমার সংসার, আমার আলো। ম-রণ ছাড়া তোমায় আমার কাছ থেকে আলাদা করার ক্ষমতা কারও নাই।”

বাইরে তখন আশ্বিনের হিমেল হাওয়া বইছে, গাছে গাছে পাতার খসখস শব্দ। কিন্তু শেখ বাড়ির বড় কামড়ার ভেতরে কেবলই দুটি হৃদয়ের গভীর স্পন্দন, নিঃশব্দ ভালোবাসা আর নব্বইয়ের দশকের এক নিখাদ অনুভূতির সুর।

কিন্তু ঘরের এই রোমাঞ্চকর ও স্নিগ্ধ পরিবেশের বাইরে, জানালার আঁধার কোণে দাঁড়িয়ে হিংসায় জ্বলেপুড়ে ছারখার হচ্ছিল শিউলি! শিউলির চোখে তখন এক বিষাক্ত পরিকল্পনা। এত ভালোবাসা, এত সুখ সে মরিয়মকে উপভোগ করতে দেবে না। গ্রামের এই পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডের সুযোগ নিয়েই সে মরিয়মের এই সুখের প্রাসাদে আগুন ছড়াবে!

চলবে,,,,,