#ক্লান্তিহীন_তুই_আমার_ফরিয়াদ
#পর্বঃ২১
#সুমাইয়া_জান্নাত_ইলমা
সকালে এভিয়ানকে আর কটেজে দেখা গেলো না। এভিয়ান বেরিয়ে যাওয়ার পরপর ম্যানেজার সিয়াম ইশাতের লিস্ট করা খাবার এনে দিলে সে কিচেনে গিয়ে রান্না বসালো। ইশাত আজ ঠিক করেছে সে এভিয়ানকে হালাল খাবারের স্বাদ চাকাবেই। তাই সে বেশ যত্ন সহকারে মেডদের কোনো সাহায্য ছাড়াই এক একটা কাজ নিজ হাতে করছে। সিয়াম ইশাতের উপর নজর রাখার জন্য মেডদের সেখানে দাড় করিয়ে রেখে গেছে। ইশাত অবশ্য এসব গায়ে মাখলো না। কিছুক্ষণ পর ইশাত রান্না শেষ করে এক এক করে সব খাবার টেবিলে এনে রাখলো। রান্নার কাজ চাপাতেই সে শাওয়ার নিয়ে যুহরের নামাজ পড়ে এভিয়ানের ফেরার অপেক্ষায় রইলো।
দুপুরে ধরণীর বুক চিড়ে মুক্ত দানার মতো নেমে এলো বারিধারা। গাছের শুকনো পাতাগুলো মুহূর্তেই ভিজে গেল। তবে জঙ্গলের আকাশচুম্বী এবং ঘন গাছগুলোর অবস্থানের কারণে বৃষ্টির ফোঁটা মাটি ছুঁতে বেশ সময় নিলো। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে প্রকৃতি সেই মুক্তর ছোঁয়ায় সতেজ হয়ে উঠল।জানালার স্বচ্ছ কাচ বেয়ে পড়ছে স্নিগ্ধ শীতল বৃষ্টি কণা। জঙ্গলের পশু পাখিরা নিজেদের সুরক্ষিত আর শুকনো রাখতে চলে গিয়েছে তাদের নিজ নিজ গড়া আশ্রয়স্থলে। ইশাত জানালা দিয়ে মুগ্ধ চোখে সেই সৌন্দর্যটুকু পরম আবেশে আহরণ করে নিচ্ছে।
হঠাৎ তার মনে পড়লো বৃষ্টিকালীন নবীজির করা সুন্নতের কথা। সঙ্গে সঙ্গে সে হাতের কিছুটা অংশ উন্মুক্ত করে বৃষ্টির ফোঁটায় সেই অংশটুকু ভিজিয়ে বৃষ্টির সময়ের দোয়া পড়ে নিলো। তার ঠোঁটে তখন আপনা আপনি উষ্ণ হাসিরেখা ফুটে উঠলো। সারা দুপুরজুড়ে বৃষ্টি হলো। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে এলো বৃষ্টি অনেক আগেই থেমে গেছে। কিন্তু এভিয়ান আর কটেজে ফিরলো না। ইশাত তখন মনে মনে ভেবে নিলো এভিয়ান হয়তো দেশে ফিরে গেছে কিন্তু তাকে ভুল প্রমাণ করে ঘড়ির কাটা ধরে রাত ৮ টার দিকে এভিয়ান কটেজে ফিরলো।
ইশাত নিচ তলায় কাউচেই বসেছিল। সে দেখলো এভিয়ান হনহনিয়ে ভেতরে প্রবেশ করছে তার পিছু পিছু আসছে রিজভী আর জেরিন। তাদের বেশ উত্তেজিত দেখাচ্ছে। রিজভী তো অস্থির ভঙ্গিতে এভিয়ানের বাহু টানতে টানতে বলছে।
— এভিয়ান তোর সাথে এতো কিছু হয়ে গেল আর আমাদের খবরও দিলি না? এমন কেন তুই আপন মনে করিস না আমাদের?
জেরিনও তাল মিলিয়ে বলছে।
— কাজটা তুই একদমই ঠিক করিস নি।
এভিয়ান তখন রিজভীর হাত থেকে তার বাহু ঝাড়া মে’রে ছাড়িয়ে বলল।
— তোদের এসব খবর কে দেয়? সারাদিন কি আমার আগে পিছে সিসি ক্যামেরা লাগিয়ে রাখিস নাকি? বল কে খবর দেয়? তার খবর আমি আনাবো।
রিজভী তখন আমতা আমতা করলো। পাশেই সিয়াম দাড়িয়ে ছিল। সে ভয়ে ভয়ে রিজভীকে ইশারায় বলছে এভিয়ানকে তার কথা না বলতে। কিন্তু এভিয়ানের চতুর নজর তা এড়াতে পারলো না। সে সিয়ামকে ইঙ্গিত করে রাগান্বিত গলায় বলল।
— কোথায় সেই সিসি ক্যামেরা? আমিও একটু দেখি। নিশ্চই আমার আশেপাশে কোথাও রয়েছে। অথবা পাশেই দাঁড়িয়ে। কে সেই বিশ্বাস ঘা’তক? আমি খুঁজে বের করব নাকি সে নিজে থেকেই আত্মপ্রকাশ করবে?
সিয়ামও বুদ্ধিমান সে বুঝে গেছে সে যে ধরা খেয়ে গেছে বসের হাতে। তাই সে নিজে থেকেই আগ বাড়িয়ে কাঁদো কাঁদো গলায় বলল।
— বস মাফ করে দিন, আমি ইচ্ছা করে করি নি। আমাকে এই রিজভী স্যার ব্ল্যা’কমেইল করেছে।
রিজভী তখন খেকে উঠে বলল।
— ওই ব্যাটা বাটপার! আমি কিসের ব্ল্যা’কমেইল করলাম?
জেরিন তখন তাদের মাঝে ফোড়ন কেটে বলল।
— ওই থাম তোরা। ভালো হয়েছে খবর নিয়েছি। নাহলে জানতাম কি করে ওই সাং’ঘাতিক মেয়েটা এমন কাণ্ড ঘটাবে?
এভিয়ান তাদের কথা গায়ে না মেখে উপর তলায় যেতে নিয়ে বলল।
— যা হওয়ার হয়ে গেছে এখন এসব বলে লাভ নেই। আমি রেস্ট নিব তোরা যা।
এভিয়ান স্টেয়ার কেসে পা বাড়াতেই সে ইশাতের গলার মৃদু আওয়াজ শুনতে পেলো।
— শুনুন!! আমি দুপুরে রান্না করেছিলাম কিন্তু আপনি ফেরেন নি। তাই একটু আগেই ডিনার তৈরি করেছি। ফ্রেশ হয়ে নিচে আসুন গরম করে রাখছি।
এভিয়ান নির্বিকার গলায় উত্তর দিল।
— খাবো না।
এমন একরোখা উত্তরে রাগে ইশাতের কপাল কুচকে এলো। রিজভী তখন আগ বাড়িয়ে চেয়ার টেনে বসতে বসতে বলল।
— আমি আছি। আমি খাবো।
রিজভীর দেখাদেখি জেরিনও চেয়ার টেনে বসতে বসতে বলল।
— যেহেতু ইশাত রান্না করেছে তাই আমিও খাবো। এভিয়ান খাক কি না খাক।
ইশাত তখন মিষ্টি হেসে খাবার গরম করতে কিচেনে চলে গেলো। রান্নাঘর থেকে খাবার গরম করে ফিরতেই ইশাত দেখলো এভিয়ানও তাদের সাথে বসে। তখন সে আশ্চর্য হয়ে প্রশ্ন করলো।
— আপনি না বললেন খাবেন না? তাহলে বসলেন যে?
এভিয়ান তার দাম্ভিকতা বজায় রেখে বলল।
— আমি আমার বন্ধুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এসেছি। দেখতে এসেছি তুমি যে খাবার বানিয়েছ সেটাতে পয়ে’জন দিয়েছ কিনা।
ইশাত এভিয়ানের কথায় অ’পমানবোধ করলো তারথেকে বেশি কষ্ট পেলো তার অবিশ্বাস দেখে। তাই সে মাথা নিচু করে বলল।
— আপনি চাইলে আমি প্রত্যেকটা খাবার চেখে প্রমাণ করতে পারি আমি যে কিছু মিসাই নি। তাছাড়া আপনি তো মেডদের সব সময় আমার আসে পাশে লাগিয়ে রাখছেন আমার উপর নজর রাখার জন্য। তাহলে এতো কিসের সন্দেহ?
এভিয়ান কোনো ভাবান্তর ছাড়াই বলল।
— ডু ইট।
ইশাত না বুঝে প্রশ্ন করলো।
— কি??
এভিয়ান তাকে প্রমাণ করার জন্যে বলল।
— যা মুখে বলেছ তা করো।
ইশাতও তাই করলো। জেরিন মাঝ দিয়ে এভিয়ানকে এভাবে বলতে বারন করলেও ইশাত এক এক করে প্রত্যেকটা খাবার চেখে প্রমাণ করলো যে সে সত্য বলেছে। এভিয়ান নিশ্চিত হয়ে উঠে যেতে নিলে ইশাত তাকে থামিয়ে বলল।
— এসেছেন যখন না খেয়ে উঠে যাচ্ছেন কেন? প্রমাণ তো করেই দিলাম।
জেরিন তখন এভিয়ানকে হাত ধরে টেনে বসিয়ে বলল।
— অনেকদিন হলো একসাথে খাই না আমরা। এমন করিস না প্লীজ।
ইশাত এভিয়ানের ম্যানেজার সিয়ামকেও বসতে বলল। কিন্তু সিয়াম বসলো না। বসের সমকক্ষে বসে সে কখনো খেতে পারবে না। এটা তার কাছে অপ’রাধের সমান। কিন্তু তাকে অবাক করে এভিয়ানই হাতের ইশারায় বলল।
— সিট।
সিয়াম আর বসের কথা অমান্য করতে পারলো না। সে সঙ্গে সঙ্গে বসে পড়লো। এভিয়ানও বন্ধুদের আবদার ফেললো না। সে নিজেও সামনে রাখা প্লেট উল্টে রাখলো। ইশাত খাবার বেড়ে দিতে নিলে এভিয়ান প্লেট সরিয়ে রেখে তীক্ষ্ম গলায় বলল।
— আমি নিজে নিয়ে খেতে জানি।
ইশাত সরে দাঁড়ালো। জেরিন তখন বলল।
— ইশাত তুমি বসবে না?
ইশাত মাথা দুলিয়ে জানালো।
— আমি পড়ে খেয়ে নিব।
এতে জেরিন মানলো না সে আবারো বলল।
— উহু! আমাদের সাথেই বসো।
ইশাত অস্বস্তি নিয়ে বলল।
— আমি এখানে বসবো না আপু। সবার খাওয়া শেষে আমি রুমে গিয়ে খেয়ে নিব।
জেরিন তখন চেয়ার থেকে উঠে বলল।
— ঠিকাছে তাহলে আমিও তোমার সাথে পরে খাবো।
— আপনি পরে কেন খাবেন আপু? এখনই খেয়ে নিন।
জেরিন নাকচ করে বলল।
— ওরা খেয়ে উঠুক, আমরা বরং একসাথে তোমার রুমে গল্প করতে করতে খাবো কেমন?
ইশাত জেরিনের আন্তরিকতায় আরেক দফা আপ্লুত হলো। সে মাথা দুলিয়ে সায় জানালো। ইতিমধ্যে খাবারের গন্ধে চারপাশ মৌ মৌ করছে। রিজভী আর অপেক্ষা করতে পারলো না সেও খাবার প্লেটে তুলে নিলো। সিয়াম ইতস্তত বোধ করলে জেরিন তার প্লেটে খাবার তুলে দিল। রিজভী তো খেতে খেতে বলল।
— উফ!! ইশাত কি রেধেছ, জেরিন তো এমন রান্না করতেই জানে না। ওকে একটু শিখিয়ে দিয়ো তো।
কথাটা বলেই রিজভী জিব্বায় কামড় বসালো। জেরিনের দিকে তাকিয়ে দেখলো সে দাঁত কটমট করে চোখ রাঙিয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে। সঙ্গে সঙ্গে রিজভী মিইয়ে গেল। ইশাত সেটা দেখে ঠোঁট টিপে হাসলো। এদিকে এভিয়ান মাত্র মুখে একটা লোকমা তুলেছে। এতক্ষন তার মুখের ভাবভঙ্গিতে গম্ভীরতা থাকলেও এই মুহূর্তে সেটা পরিবর্তিত হয়ে তাকে নরম দেখালো। তার চোখগুলো স্বাভাবিকের তুলনায় প্রশস্ত হলো। জেরিন তখন এভিয়ানের দিকে ফিরে প্রশ্ন করলো।
— কিরে এভিয়ান তুই তো কিছু বলছিস না। খাবার কেমন হয়েছে?
এভিয়ান তখন মুখ ফসকে বলে উঠলো।
— একদম মায়ের হাতের রান্নার মতো স্বাদ।
সে বলেও চুপ হয়ে গেল। বুঝতে পারলো সে মুখ ফসকে কি বলে ফেলেছে। এদিকে ইশাত মুখ তুলে বিস্মিত চোখে তাকালো এভিয়ানের দিকে। এভিয়ান তার দৃষ্টি উপেক্ষা করলো। সে ইশাতের রান্না করা খাবারে ছোটবেলার মায়ের হাতের রান্না করা খাবারের তৃপ্তি খুঁজে পেয়েছে, যা তাকে ফিরিয়ে নিয়ে গেছে অতীতের সেই আবেগঘন স্মৃতিগুলোতে। যা একটু হলেও তার মনে স্বস্তি তৈরি করতে পেরেছে। তবে এভিয়ান তা প্রকাশ করতে চাচ্ছে না। সে তার আবেগ কাউকে দেখাতে চায় না।
কিন্তু ইশাতের কাছে যেন এটা শুধুই কোনো প্রশংসা নয় বরং প্রাপ্তি ছিল। সে উজ্জ্বল হাসি নিয়ে জেরিনের দিকে তাকালো। জেরিনও সেই হাসিতে তাল মিলিয়ে হাসলো। এতবছর পর এভিয়ান ভীষণ তৃপ্তি নিয়ে খেলো। খাওয়া শেষ করে এভিয়ান উপর তলায় চলে গেল রিজভীও তার পিছু পিছু গেল।
জেরিন তখন ইশাত আর তার জন্যে প্লেটে খাবার নিয়ে ইশাতের রুমের দিকে চললো। দুজন একসাথে গল্প করতে করতে খেয়ে উঠলো। অকস্মাৎ তখন জেরিন বাইরে থেকে রিজভীর ডাক শুনতে পেলো। ডাকে সাড়া দিয়ে সে বাইরে চলে গেল। একটুপর জেরিন রুমে ফিরে এসে ইশাতকে বলল।
— ইশাত আমি কয়েকদিন তোমার সাথেই থাকব। রিজভী আর এভিয়ান দেশে ফিরে যাচ্ছে বিজনেসের কাজে। এমনিতেও দেশের বাহিরে থাকায় অনেকদিন হলো তারা সশরীরে অফিস যাচ্ছে না। যাওয়ার আগে বলার জন্য রিজভী ডেকেছিল আমাকে। কিছুদিন পর আমিও ফিরব দেশে। তাই যে কয়দিন আমেরিকাতে আছি তোমার সাথেই থাকব।
ইশাত নিজেকে স্বাভাবিক দেখানোর প্রয়াসে ঠোঁটে মৃদু হাসি নিয়ে বলল।
— ঠিকাছে।
কিন্তু মনের এক কোণে তার খারাপ লাগা কাজ করলো তার পরিবারের জন্যে। জেরিন ক্লান্ত ছিল তাই তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়লো। ইশাত ওযু করে এসে ইশার নামাজ পড়ে নিলো। নামাজ শেষ করে সে আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল।
— ইয়া আল্লাহ তুমি এই দুনিয়া এবং জান্নাতের সৃষ্টিকর্তা। সকল জানা অজানা দেখা অদেখা কোনো কিছুই তোমার থেকে গোপন নয়। তুমি সবচেয়ে দয়ালু এবং পরাক্রমশালী। তোমার উপরে কারো কর্তৃত্ব নেই। একমাত্র তুমিই সকল শক্তির উৎস। তোমার জন্য কোনো কিছুই অসম্ভব নয়। বরং তুমি অসম্ভবকে সম্ভব করার ক্ষমতা রাখো। আমি আমার সকল বিশ্বাস শুধু মাত্র তোমার উপরই স্থাপন করে আমার ইচ্ছাগুলো তোমার কাছেই তুলে ধরেছি। যদিও আমার জানা নেই কি করে তোমার কাছে চাইতে হয়। কিভাবে চাইলে তুমি কবুল করবে। তবুও আমি তোমার সীমাহীন দয়া এবং কুদরতের উসিলা করে দোয়া করছি আমার হৃদয়ে তুমি স্বস্তি দান করো এবং আমার পথগুলোকে সহজ করে দাও। আমি যেন সহজেই হতাশ না হই। আমি জানি এটা তোমার পরীক্ষা তবে এই পরীক্ষায় আমি যেন তোমার সন্তুষ্টি অর্জন করতে সক্ষম হই। সেই তাওফিক আমাকে দান করো।
ইশাত দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে জানালা থেকে সরে কুরআন নিয়ে বসলো। কুরআন থেকে সে সুরা মুলক পড়ে নিলো। এরপর যত্ন সহকারে কুরআনটা সঠিক জায়গায় রেখে ঘুমাতে চলে গেল। বিছানার কাছে গিয়ে সে দেখলো জেরিন আরাম করে ঘুমোচ্ছে। সে মিষ্টি হেসে জেরিনের শরীরে কমফোর্টার টেনে দিয়ে নিজেও জেরিনের পাশে শুয়ে ঘুমানোর দোয়া পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে গেলো।
চলবে ( ইনশাআল্লাহ )……………………..
#ক্লান্তিহীন_তুই_আমার_ফরিয়াদ
#পর্বঃ২২
#সুমাইয়া_জান্নাত_ইলমা
সময়ের স্রোতে বেশ কয়েকদিন কেটে গেলো। ইশাত আর জেরিন এই কয়দিনে কটেজে একসাথে অনেক সুন্দর সুন্দর মুহূর্ত কাটিয়েছে। তারা একসাথে রান্না করেছে, এরিয়ার আশেপাশে ঘুরেছে, এমনকি জেরিনকে ইশাত তার সঙ্গে নামাজও পড়িয়েছে। এই কয়দিনে জেরিন ইশাতের কাছ থেকে ইসলাম বিষয়ে অনেক অজানা বিষয়ও জানতে পেরেছে। তার এখন নিজে থেকেই আগ্রহ কাজ করে নামাজ পড়ার হিজাব পড়ার। জেরিন এখন নিজে থেকেই চাইছে নিজের ভুলগুলো শুধরে নিজেকে পরিবর্তন করতে।
কাল ভোর হলে জেরিনও বাংলাদেশে ফিরে যাবে ইশাতকে এখানে একা রেখে। তাই তার মনটা ভীষণ খারাপ। ইশাত এটা নিয়ে তাকে বুঝিয়েছে কিন্তু তবুও জেরিনের মনে অনুশোচনা কাজ করছে, সে ইশাতকে চাইলেও দেশে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পারছে না বলে।
ঘড়িতে সময় তখন রাত ৮টা। ইশাত জানালার কাছে দাড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে মনের কথাগুলো এখান্তেই রবের কাছে প্রকাশ করছে। ইদানিং তার একটা নতুন অভ্যাস তৈরি হয়েছে। সে যেকোনো কিছু হলেই আকাশের দিকে তাকিয়ে রবের কাছে সেগুলো তুলে ধরবে। একা একাই রবের সাথে কথা বলবে। যে কথাগুলো সে কাউকে বলতে পারে না সেগুলোও সে বিনা দ্বিধায় রবের কাছে বলে ফেলে। ঠিক সেভাবেই সে এখনো জানালার কাছে দাড়িয়ে বিনয়ী স্বরে রবের সাথে কথা বলে যাচ্ছে।
— হে হৃদয়ের পরিবর্তনকারী, তুমি তো মুখে হও বলেই সেটা হয়ে যায়। তুমি তো অন্তরের গোপন থেকে গোপন দোয়াগুলোর ব্যাপারেও অবগত। আমার জন্য যা কল্যাণকর তা তুমি সহজসাধ্য করে দাও। যা আমার জন্য তুমি লিখে রেখেছ তা আমাকে সবচেয়ে সুন্দররূপে খুঁজে পাওয়ার তাওফিক দান করো। আমার রূহকে ধৈর্যশীল করে দাও। আমার জন্য সেই দরজাগুলোও খুলে দাও যেগুলো আমি ভেবেছি কখনই খুলবে না। আমার অবর্তমানে আমার পরিবারকে তুমি দেখে রেখো। আমি চাইলেই এখান থেকে পালাতে পারতাম কিন্তু আমি শুধুই তোমার সাহায্যের অপেক্ষায় আল্লাহ।
জেরিন ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে এসে দেখলো ইশাত আকাশের দিকে তাকিয়ে একা একাই কি যেন বলছে। সে প্রায় প্রায় লক্ষ্য করেছে ইশাতকে এমনটা করতে। তাই এবার আর কৌতূহল দমাতে না পেরে সে পেছন থেকে ইশাতের কাঁধে হাত রেখে বলেই ফেলল।
— তুমি এভাবে কার সাথে কথা বলো ইশাত?
এভাবে হুট করে করা প্রশ্নে ইশাত চকিতে পেছনে ফিরে তাকালো। জেরিনের চোখে কৌতুহল দেখে সে হাস্যোজ্জ্বল মুখে উত্তর দিলো।
— যে আমার সবচেয়ে কাছের।
জেরিন কপাল কুচকে বলল।
— কিন্তু এখানে তো কেউই নেই? সে কি অদৃশ্য কেউ নাকি?
ইশাত চোখে মুখে স্নিগ্ধতা টেনে বলল।
— সে আমার রব।
জেরিন এবার দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল।
— সেটা বলবে তো, আমি ভাবলাম কি না কি।
ইশাত তখন তাকে তাড়া দিয়ে বলল।
— তুমি লাগেজ গুছাবে না? সকালেই তো তোমার ফ্লাইট। এখনই গুছিয়ে ফেলো।
জেরিন মন খারাপ করে বলল।
— মন চাইছে না তোমাকে রেখে যেতে।
ইশাত তখন কিছু বলতে যাবে তার আগেই জেরিনের ফোন বেজে উঠলো। জেরিন কল তুলতেই ওপাশের কেউএকজন কয়েকটা বাক্য বলেই জেরিনের উত্তরের তোয়াক্কা না করে ফোন কেটে দিলো। অপরপাশের ব্যক্তি ফোন কাটতেই জেরিনের চোখে মুখে মুহূর্তেই উচ্ছ্বাসের ঝলকানি দেখা দিলো। ইশাত তাকে প্রশ্ন করতেই জেরিন ইশাতের হাত ধরে তাকে ঘোরাতে ঘোরাতে বলল।
— ইয়াপ্পি! এভিয়ান বলেছে তোমাকে সাথে করে দেশে ফিরতে।
— কিহ!! সত্যি বলছো আপু?
— হ্যা, ও বলল তোমাকে আটকে রেখে ওর আর কোনো কাজ নেই ও বিষয়টা অন্যভাবে হ্যান্ডেল করবে।
ইশাত মুখে হাত রেখে বলল।
— আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহ আমার দোয়া শুনেছেন, অবশেষে এতদিন পর আমি আমার দেশে ফিরব, পরিবারের কাছে ফিরব। আল্লাহ জানে তারা কেমন আছেন। আমি এখনই নফল পড়ে আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করে আসি।
ইশাতের খুশিতে জেরিনও খুশি হয়ে গেল। সে ইশাতের হাতে হাত রেখে বলল।
— আমি তোমার জন্য অনেক খুশি, কাল তাহলে দুজন একসাথে ফিরছি। যাও আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করে নাও।
ইশাত মাথা দুলিয়ে ওযু করে এসে দুই রাকাত নফল আদায় করে সিজদায় পড়ে আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করতে থাকলো। জেরিনও সাথে যোগ দিল। এরপর তারা একসাথে লাগেজ গুছিয়ে শুয়ে পড়লো। ইশাত শুধু সেদিন পড়া তার বিয়ের লেহেঙ্গা আর গহনাগুলোই লাগেজে ভরেছিল। সে এখানকার কিছুই তার সাথে করে নিয়ে যেতে চায় না। তখন জেরিন অভিমান করে বলল পোশাক আর বাকি দরকারী জিনিসগুলো তো তার দেওয়া। সেটা যদি ইশাত ফেলে রেখে যায় তাহলে সে কষ্ট পাবে। তাই জেরিনের মন রাখতে ইশাত সেগুলোও লাগেজে ভরে নিলো।
পরেরদিন ভোর হতেই নাস্তা করে গন্তব্যের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়লো তারা। আগেরবার যখন ইশাত এতদূর পথ অতিক্রম করে এখানে এসেছিল তখন সে সজ্ঞানে ছিল না। সে কীভাবে কোন মাধ্যমে এসেছে তার কিছুই জানা ছিল না। কিন্তু এইবার সে সব নিজ চোখে আস্বাদন করছে। কিছুক্ষণ আগে জেরিন তাকে নিয়ে বিশাল একটা ক্রুজ শিপে উঠেছে। যদিও তাদের সামনে পেছনে বিস্তৃত হয়ে রয়েছে অনেকগুলো গার্ড। বিশাল জাহাজটি যখন চলতে শুরু করলো, ইশাতের কাছে মনে হলো যেন সমুদ্রের বুকে ভাসমান এক বিশাল বিলাসপুরী।
জেরিন ইশাতকে নিয়ে জাহাজটি ঘুরে দেখাতে লাগলো। জাহাজটির ভেতরে এমনকিছু নেই যা অনুপস্থিত। বিলাসবহুল স্যুইট,লিফট এবং বড় বড় করিডোর তো রয়েছেই সাথে চিকিৎসা ব্যবস্থার জন্য হাসপাতালের মতো বিশাল আলাদা একটি বিভাগও রয়েছে। আরেকটু ঘুরতেই ইশাত দেখলো ভেতরে থিয়েটার, ক্যাসিনো, গেম জোন এবং থিম ভিত্তিক বারও রয়েছে। উপরে ডেকে সুইমিং পুল এবং আরও কিছু সুব্যবস্থাও ছিল। তার কাছে মনে হচ্ছে এ যেন সমুদ্রের উপর ভাসমান একটি শহর। জেরিন তখন ইশাতকে জানালো এটা এভিয়ানের বিজনেস ক্রুজ। ভেতরে এসব সেটিংগুলো দেখে ইশাতেরও কোনো সন্দেহ রইলো না।
দুপুর গড়াতেই জেরিন ইশাতকে লাঞ্চের জন্য নিয়ে গেল। ইশাত দেখলো জাহাজের বিশেষ সেফ তার বিশেষ কুইজিন ব্যবহার করে ভিন্ন ধরনের খাবার তৈরি করে রেখেছেন। ইশাত খাবারগুলো দেখে প্রশ্নবোধক চাহনি নিয়ে জেরিনের দিকে তাকালো। জেরিন তার দৃষ্টির মানে বুঝে বলল।
— খাবারগুলো সব হালাল, তুমি অবশ্যই এগুলো খেতে পারবে। আমি নিজে বলে দিয়েছিলাম সব খাবারই হালাল রাখতে।
ইশাত এবার নিশ্চিন্ত হয়ে বসলো। ক্রুজে করে দেশে ফিরতে তাদের বেশ কয়েকদিন লাগলো। ক্রুজটি দেশের সীমানায় এসে পৌঁছাতেই জেরিন আর ইশাত নেমে দেখলো তাদের জন্য সেখানে একটি সাদা গাড়ি আগে থেকেই অপেক্ষা করছিল। জেরিন আর ইশাত সেই গাড়িতে উঠে বসলো। গাড়িটি যতই এগোচ্ছিল ইশাতের হৃদয়ের ধুকপুকানি তত বাড়ছিল। এতদিন পর পরিবারকে দেখার আনন্দ তাকে কাবু করে আছে। অবশেষে অপেক্ষার ইতি ঘটিয়ে টানা দীর্ঘ কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে গাড়িটি ইশাতের এলাকার কাছাকাছি চলে আসতেই ইশাত গাড়িটা থামাতে বলে নেমে গেলো।
জেরিন অবাক হয়ে প্রশ্ন করলে ইশাত তাকে বলল।
— আমি এখানে না নামলে তোমার বিপদ হবে আপু। আমার ভাইয়া নিশ্চই আমি নিখোঁজ হওয়ার পর বসে নেই সে সব জায়গায় তার মানুষ লাগিয়ে রেখেছে। তুমি ধরা পড়লেই সমস্যা। আল্লাহ চাইলে আবার কখনো দেখা হবে আপু। আমি তোমাকে অনেক মিস করব, তোমার সাথে কাটানো মুহূর্তগুলো খুব মিস করব। কিন্তু এখন প্লীজ চলে যাও ভাইয়ার নজরে পড়ার আগে।
জেরিন বুঝার মতো করে মাথা দুলিয়ে ড্রাইভারকে বলল এগোতে। ড্রাইবার গাড়ি স্টার্ট করতেই গাড়িটি মুহূর্তেই চোখের আড়ালে চলে গেলো। ইশাতও তখন সেখান থেকে চলে এলো। তখন রাত প্রায় ১২টার কাছাকাছি। ইশাত তাদের এপার্টমেন্টের কাছে এসে দাঁড়াতেই তাকে দেখে দারোয়ান অবাক হয়ে গেল। সে ইমরানকে ডাকতে উঠে যাবে অমনি ইশাত তাকে বারন করে নিজেই উপড়ে গিয়ে তাদের ফ্ল্যাটের দরজায় বেল দিলো। কিন্তু কেউ দরজা খুললো না। সে যখন পুনরায় বেল বাজাতে যাবে তখনই হুট করে দরজা খুলে গেল। দরজা খুলতেই ইশাত দেখলো এলোমেলো অবস্থায় ইমরানকে। ইমরানের মাথার চুল অগোছালো, চোখের নিচে কালি জমে আছে। দেখে মনে হচ্ছে না জানি কত রাত সে ঘুমায় নি।
ভাইকে এভাবে দেখে ইশাতের ভেতর মোচড় দিয়ে উঠলো। তার ভাই তো এমন ছিল না। ইমরান সব সময় পরিপাটি আর গোছানো একটা ছেলে। সে সব সময় সব পরিস্থিতিতে নিজেকে শক্ত রাখতে জানে। ইশাতের ভাবনার মাঝেই তড়িৎ তাকে ঝাপটে ধরে ইমরান অস্থির ভঙ্গিতে একনাগাড়ে বলতে লাগলো।
— বোন তুই কোথায় ছিলি? কত খুঁজেছি তোকে। তুই ঠিক আছিস তো? তোর কোনো ক্ষতি হয়নি তো? আমি জানি তুই পালিয়ে যাওয়ার মেয়ে নস, আমার সন্দেহ ওই এভিয়ানের উপর। আমাকে তুই সব খুলে বল তোর সাথে কি হয়েছে? আমি ভাই হিসেবে অযোগ্য তোকে খুঁজে বের করতে পারি নি। কিন্তু ভাইয়া আর তোকে কিছু হতে দেবে না। আমার ছোট্ট বোনটা পুরো ২টা মাসের মত নিখোঁজ ছিল। আমার উপর দিয়ে যে ঝড় প্রবাহিত হয়ে গেছে। আমি এই অসহায়ত্ব কাউকে বুঝাতে পারব না।
ইশাত ইমরানের পিঠে হাত রেখে তাকে শান্ত করে বলল।
— ভাইয়া তুমি শান্ত হও, আমার কিচ্ছু হয়নি আমি ঠিক আছি দেখো। আম্মু কোথায়?
বাহিরের আওয়াজ শুনে তখন আসিয়া বেগম ভেতরের রুম থেকে তার রুগ্ন শরীর টেনে বিচলিত হয়ে বাহিরে বেরোতে বেরোতে জিজ্ঞাসা করলেন।
— ইমরান ইশাতের কি কোনো খোঁজ পেলি বাবা? মেয়েটা আমার…
বাকিটা কথা আসিয়া বেগমের মুখেই আটকে গেল। মেয়েকে দরজায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তার মুখের শব্দগুলো সেখানেই স্তব্ধ হয়ে গেলো। ইমরানের আর কোনো উত্তর দিতে হলো না। আসিয়া বেগম ছুটে এসে মেয়েকে জড়িয়ে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠলেন। ইশাতও মাকে জড়িয়ে ধরে কান্নাবিজরীত কন্ঠে বলল।
— আম্মু কি অবস্থা করেছ নিজের দেখেছ?
আসিয়া বেগম তখন ইশাতের হাতে লাগেজ দেখে অস্থির হয়ে বললেন।
— কোথায় ছিলি তুই? তুই কি সত্যিই পালিয়ে গিয়েছিলি? আসিফকে বিয়ে না করতে চাইলে আমাকে জানালি না কেন?
ইশাত মাকে চিন্তায় না ফেলতে কথাগুলো এড়িয়ে গিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল।
— আম্মু আমি নাহয় ধীরে সুস্থে কাল তোমাদের সব বলবো। এখন শরীরটা অনেক দুর্বল লাগছে।
ইমরান বোনকে সময় দিয়ে বলল।
— আম্মু ওকে রেস্ট করতে দাও। আমি কাল সব জেনে যা ব্যবস্থা নেওয়ার সব নিব।
ইমরান মনে মনে সংকল্প করলো সে কাল ইশাতের কাছ থেকে সব জেনে যদি দেখে তার সন্দেহই সঠিক, তবে সে এই বিষয়ে কঠিন কোনো পদক্ষেপ নিবে। অন্যদিকে আসিয়া বেগম মেয়েকে কিছুই বলতে পারলেন না। মায়ের মন বলে কথা সন্তানের সামনে নিতান্তই সে অসহায়। তাই এতদিন পর মেয়েকে খুঁজে পাওয়ার খুশিতে সে চলে গেলেন আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করতে।
ইশাত ইমরানকে জিজ্ঞাসা করলো আহনাফের কথা। ইমরান জানালো ছেলেটা প্রতিদিন তার কাছে যাওয়ার বায়না ধরে কেঁদেকেটে ঘুমিয়ে পড়ে। সানজিদা ছেলেকে অনেক আগেই ঘুম পাড়িয়ে নিজেও ঘুমিয়ে পড়েছে। ছেলেটার এমন অবস্থার কথা শুনে ইশাতের মন খারাপ হয়ে গেল। সে ঠিক করলো এতো রাতে ঘুম থেকে ডেকে সে আহনাফের ঘুম নষ্ট করবে না। একেবারে সকাল হলেই বাচ্চাটার সাথে দেখা করবে। এই ভেবে সে রুমে চলে এলো।
রুমের একপাশে লাগেজ রেখে সে ওয়াসরুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নিলো। ইশার নামাজ এখনো পড়া হয়নি বিধায় ওযু করে পড়ে নিলো। নামাজ শেষ করে দোয়া পড়তে পড়তে সে বিছানায় শুয়ে পড়লো। শূন্য মস্তিষ্কে তখন এভিয়ানকে নিয়ে কিছু প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে লাগলো। এভিয়ান কেন তাকে এতো সহজে ফিরতে দিলো? হঠাৎ তার এমন কি হলো? নাকি এর পিছনেও কোনো উদ্দেশ্য ছিল। এসব ভাবতে ভাবতে তার চোখ লেগে গেলো।
প্রত্যেকদিনের মত অভ্যাসবশত আজও ফজরের আগে তার ঘুম ভেঙে গেলো। যদিও এতদিন সে আমেরিকাতে ছিল আর সেখানকার সময়ের তুলনায় বাংলাদেশের সময়ের অনেক তফাৎ রয়েছে। তবুও ঠিক তাহাজ্জুদের জন্য নির্ধারিত সময়ে একা একাই তার ঘুম ভাঙ্গলো। ঘুম ভাঙ্গা চোখে ইশাত বিছানায় উঠে বসতেই তার চোখের সামনে এভিয়ানের মুখ ভেসে উঠলো, তবে সব সময়কার মতো গম্ভীর এভিয়ান নয় এটা হাস্যজ্জল এভিয়ান। ইশাত নিজের কল্পনা দেখে নিজেই আশ্চর্য হচ্ছে। এভিয়ানের এমন নি’শংস রূপ দেখার পর তার উচিত এভিয়ানকে ঘৃণা করা। কিন্তু সে তবুও পদে পদে সেই একই ভুল করে যাচ্ছে। ইশাত নিজের বিবেককে ধিক্কার জানিয়ে উঠে চলে গেলো।
——————————
সকালে ৭ টার দিকে কারো আলতো স্পর্শে ইশাতের ঘুম ভাঙ্গলো। ফজরের পর আবারও একটু শুয়েছি সে তখনই চোখ লেগে গিয়েছিল। সে চোখ মেলতেই দেখলো আহনাফ তার গালে হাত রেখে ব্যাকুল দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। ইশাত সঙ্গে সঙ্গে উঠে তাকে জড়িয়ে ধরে চুমু খেলো। আহনাফ তখন ফুপিয়ে ফুপিয়ে কেঁদে বলল।
— টুমি কি আমাল সাথে লাগ করে টলে গিয়েছিলে ফুপ্পি? আমি আল দুষ্টামি কলবো না কতা দিচ্চি। আম্মু বলেচে আমি গুড বয় হয়ে থাকলে টুমি আবালো এসে পোলবে। আমি এখন লোজ লাতে দুধ খেয়ে ঘুমাই। দেকো আমি গুড বয় হয়ে গেচি। আমাকে আল ছেলে যেও না ফুপ্পি প্লীজ!
আহনাফের ভাঙ্গা ভাঙ্গা অস্পষ্ট অনুরোধ মাখা কথাগুলো শুনে ইশাতের চোখে পানি এসে পড়লো। শেষের কথাটা আহনাফ ছোট হাত দুটো জোড় করে বলল। ইশাত আহনাফকে তার কোলে বসিয়ে আদরের হাত বুলিয়ে বলল।
— সরি বাবা, আর কখনো যাবো না। ফুপ্পি তার গুড বয়কে রেখে আর কোথাও যাবে না।
ইশাতের আশ্বাসে আহনাফের ছোট মন থেকে ভয়টা কাটলো। সে মিষ্টি হেসে ইশাতের দিকে একটা চকলেট এগিয়ে দিলো। ইশাত বুঝলো তার ভাইয়ের ছেলে একদম ভাইয়ের মতোই হয়েছে। হঠাৎ তখন বাহিরে উচ্চ শব্দে চেঁচামেচির আওয়াজে ইশাত হকচকিয়ে গেল। সে আহনাফকে তার ঘরেই বসে থাকতে বলে হিজাব মাথায় জড়িয়ে বাহিরে চলে গেলো।
চলবে ( ইনশাআল্লাহ )…………………..

