Home "ধারাবাহিক গল্প ক্লান্তিহীন তুই আমার ফরিয়াদ ক্লান্তিহীন তুই আমার ফরিয়াদ পর্ব-২৩+২৪

ক্লান্তিহীন তুই আমার ফরিয়াদ পর্ব-২৩+২৪

0
125

#ক্লান্তিহীন_তুই_আমার_ফরিয়াদ
#পর্বঃ২৩
#সুমাইয়া_জান্নাত_ইলমা

“এই মেয়ে ন’ষ্টা ওর সাথে আমার নাতির বিয়া আমি হইতে দিমু না, কোনো মতেই না। পুরা ২ মাস কই যেন থাইকা আইসে এই মাইয়া। কে জানে কই কি কইরা আইসে। আদেও শুদ্ধচরিত্রা আছে কিনা।”

সকাল সকাল দরজায় বেল বাজার আওয়াজ পেয়ে আসিয়া বেগম দরজা খুলে দিতেই আসিফের দাদি হুড়মুড়িয়ে ভেতরে ঢুকে পড়লেন। তখন থেকেই তিনি এসব আজেবাজে কথা বলে যাচ্ছেন। ইশাতের বাড়ি ফেরার খবর কানে আসতেই তিনি সকাল সকাল এসেছেন তাদের কথা শোনাতে। ইশাত তখন সবে মাত্র বাহিরে এসে দাঁড়িয়েছে। তাকে দেখা মাত্র বয়স্ক মহিলাটা ভড়কে উঠে বললেন।
— এইযে ন’ষ্টা মাইয়া, আমার নাতির জীবন নষ্ট কইরা কই গেছিলি ফষ্টি’নষ্টি মা’রাইতে? আমার নাতি তোর দুঃখে খাওয়া নাওয়া বাদ দিয়া দিশেহারা হইয়া তোরে খুঁজছে, আর তুই না জানি কই যাইয়া রঙ্গ করে বেরাইসোস। এই মুখ নিয়া ফিরসোস কেমনে লজ্জা করে না? আমি তোরে সাবধান কইরা গেলাম, আর আমার নাতির পিছে ঘুরবি না। আমি বাইচা থাকতে তোর লগে আমার নাতির বিয়া এইজীবনে হইতেই দিমু না।

ইমরান তখন বাসায়ই ছিল। বাহিরে চেঁচামেচির আওয়াজ পেয়ে সানজিদা আর সে বাহিরে এসে এমন উশৃঙ্খল অবস্থা দেখলো। বোনকে নিয়ে আসিফের দাদির মুখে এমন লাগামহীন কথা শুনে বোনকে আড়াল করে দাঁড়িয়ে সে ক্রোধ নিয়ে বলল।
— খবরদার!! আমার বোনের ব্যাপারে আর একটা বাজে কথা বললে আপনার খবর আছে। এতদিন মুরব্বি বলে সম্মান করে কিছু বলি নি। একবার সেই সম্মান উঠে গেলে আমি আর বয়সের পরোয়া করব না। তাই আমাকে বাধ্য করবেন না। আর বিয়ের প্রশ্ন যদি উঠে সেই ক্ষেত্রে বলে রাখি, আপনারাই আগে এসেছিলেন আমাদের কাছে প্রস্তাব নিয়ে। আসিফ ভালো ছেলে সেটা ঠিক। কিন্তু আমি আর আপনাদের পরিবারে আমার বোনকে বিয়ে দিব না। যাওয়ার আগে আপনাদের দেওয়া শাড়ি গহনা সব নিয়ে যাবেন।

আসিয়া বেগম পরিস্থিতি সাম্ভাল দিতে এবং ছেলেকে শান্ত করতে ইমরানের কাধে হাত রাখলেন। সানজিদাও ইমরানকে থামানোর চেষ্টা করছে। ইশাত মাথা নিচু করে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। কিছু না করেও তার ভেতর অপ’রাধবোধ কাজ করছে কারণ তার জন্যেই আজ তার পরিবার এভাবে অপমানিত হচ্ছে। বৃদ্ধ মহিলাটি তখন নাকের পাটা ফুলিয়ে বলে উঠলেন।
— তেজ তো দেহি ভালাই তোগো, বাহিরে যাইয়া দেখ একবার এলাকায় সবাই এই মাইয়ার নামে কি কি সমালোচনা করতাসে। তোর এমন বইনরে কেউ আর বিয়াও করতো না।

ইমরান তখন রক্তিম চোখে ইশাতের দিকে তাকিয়ে বলল।
— ইশাত যা উনাদের দেওয়া শাড়ি, গহনা যা যা আছে সব নিয়ে আয়।

ইশাত চোখের পানি মুছে তড়িৎ রুমে গিয়ে সব গুছিয়ে নিয়ে এসে ভাইয়ের হাতে তুলে দিল। ইমরান সেটা নিয়ে আসিফের দাদির হাতে তুলে দিয়ে বলল।
— আমার বোনের বিয়ে হবে কি হবে না সেটা আমরা দেখব, আপনার সব বুঝে পাওয়া শেষ তো? এখন তাহলে আপনি আসতে পারেন।

ইমরানের আচরনে আসিফের দাদি ঘোর অপ’মানবোধ করলেন। তিনি জিনিসগুলো খতিয়ে দেখে বললেন।
— দেখমু নি কে বিয়া করে তোর বোনরে।

ইমরান তাকে হাত দিয়ে দরজা দেখিয়ে বলল।
— বের হন।

বৃদ্ধ মহিলাটা তখন নাক মুখ ছিটকে বেরিয়ে গেলেন। ইমরান কড়া গলায় ইশাতকে আদেশ করলো তার রুমে যেতে। সে তার ভাইকে এমন রাগতে এর আগে কখনো দেখে নি। ইশাত ভয়ে ভয়ে ইমরানের রুমের দিকে পা বাড়াবে ঠিক তখন পেছন থেকে আসিফের কন্ঠ তার পা জোড়া থেমে গেলো। আসিফের দাদি বেরিয়ে যাওয়ার পর আসিয়া বেগম যখন দরজা লাগাতে যাবেন তখন আসিফ এসে দরজার কাছে দাড়ালো। দাদির পরে সে ইশাতের ফেরার খবর পেয়ে এক প্রকার ছুটে এসেছে। ইশাতের দিকে সে কিছুক্ষণ চাতক চোখে তাকিয়ে আসিয়া বেগমের উদ্দেশ্যে বলল।
— এই মাত্র আমার দাদি এসে ইশাতকে কি বলে গেছে আন্টি?

আসিফের প্রশ্নে ইমরান এসে উত্তর দিল।
— সরি আসিফ, তোমার সাথে আমার বোনের বিয়ে হচ্ছে না। তোমার দাদির হাতেই বিয়েতে তোমাদের দেওয়া সবকিছু ফিরিয়ে দিয়েছি। তার সাথে কথা বলে সব মিটিয়ে দিয়েছি এখন আর কিছু বাকি নেই।

ইমরানের কথা শুনে আসিফের মাথায় যেনো আকাশ ভেঙে পড়লো। সে অনুরোধ করে বলল।
— প্লীজ ভাইয়া এমনটা বলবেন না। আপনি জানেন আমি ইশাতকে কতটা ভালোবাসি।

ইমরান তখন এগিয়ে এসে আসিফের কাঁধে হাত রেখে বলল।
— দেখো আসিফ বিয়েটা ছেলে খেলা নয়। সব বিষয় বিবেচনা করে একটা বিয়ের কাজ এগোয়। ইশাতের জন্য তোমাকে আমার অনেক পছন্দ ছিল, তোমাকে আমি উপযুক্ত মনে করেছিলাম। তোমাদের বিয়ের বিষয়ে আমি কখনো আপত্তি করি নি, কিন্তু এখন করছি। কারণটা তোমার দাদি। উনি শুরু থেকেই বিনা কারণে আমার বোনকে পদে পদে অসম্মান করে কথা বলেছেন। আমার বোনকে নিয়ে তার দৃষ্টিভঙ্গি অসন্তোষজনক। প্রথমে আমি ভেবেছিলাম এসব ঠিক হয়ে যাবে, কিন্তু দিনদিন ওনার ভাষার পরিবর্তন আমার সিদ্ধান্ত বদলে দিয়েছে। এটুকুতেই আমার বোঝা হয়ে গেছে, তোমাদের পরিবারে আমার বোন গেলে শান্তিতে থাকতে পারবে না। আমি আমার বোনকে অনেক আদর যত্নে বড় করেছি। কেউ ওকে কটু কথা বলুক সেটা আমি ভাই হয়ে মানতে পারব না।

অফিস ইমরানকে আশ্বাস দিয়ে বলল।
— যদি সমস্যা আমার দাদি হয়, তবে দরকার হলে বিয়ের পর আমি ইশাতকে নিয়ে আলাদা হয়ে যাব। তবুও এমনটা বলবেন না। আমি ইশাতকে ছাড়া থাকতে পারব না।

ইমরান আপত্তি দেখিয়ে বুঝিয়ে বলল।
— তোমার বাবা মা তোমাকে অনেক ভালোবাসেন। আমার বোনের জন্য তুমি তাদের কেন শূন্য করবে? বাবা মার সন্তানদের ঘিরে কত আশা আকাঙ্খা থাকে। তোমার বাবা মারও আছে তোমাকে ঘিরে। শেষ বয়সে সেই সন্তানই তো বাবা মায়ের সম্বল। তুমি আমার বোনের জন্য তাদের থেকে কেন আলাদা হবে? তারা কি অপ’রাধ করেছে? আর তাছাড়া তোমার দাদির আমার বোনকে পছন্দ না। আমি যদি তোমার কথা শুনে আমার বোনকে তোমার হাতে তুলেও দেই তখন দেখা যাবে তিনি রোজ রোজ অশান্তি করবেন। তুমি বাড়িতেই বা কতক্ষণ থাকবে? বাকিটা সময় আমার বোনকে একা পেয়ে তিনি কষ্ট দিবেন অ’ত্যাচার করবেন। এর চেয়ে ভালো তুমি তোমার দাদির পছন্দমত মেয়েকে বিয়ে করে সুখে থাকো। নাহলে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে তাকে কষ্ট দিয়ে তুমিও সুখী হতে পারবে না।

আসিফ তার কথায় অনড় থেকে বলল।
— আপনি এসব কিভাবে বলতে পারছেন? আপনি জানেন আমি ইশাতের জন্য কয়টা বছর যাবত অপেক্ষা করেছি।

— জানি কিন্তু এখন পরিস্থিতি বুঝে আমি আমার বোনকে তোমার হাতে তুলে দিতে পারছি না। আমি যা করছি বুঝে শুনেই করছি। আর এটাই আমার শেষ সিদ্ধান্ত, আশা করি তুমি আমার সিদ্ধান্তকে সম্মান করবে।

আসিয়া বেগম শুধু দাড়িয়ে তাদের কথা শুনছিলেন ছেলের সিদ্ধান্তের বাহিরে তিনি কিছুই বলতে পারলেন না। ইমরান তার শেষ কথাটা বলে রুমে চলে গেলো। আসিফ বাকরুদ্ধ হয়ে দাড়িয়ে রইলো। ইশাতও ভাইয়ের পিছু গেলো। তার বুক থেকে যেন মস্তবড় একটা বোঝা নামলো। সে গিয়ে ভাইয়ের রুমে পা রাখতেই ইমরান তাকে বসতে বলল। ইশাত মাথা নিচু করে বসলো। ইমরান তখন শান্ত গলায় বলল।
— কে কি বলল তুই কানে নিস না বোন। আমি সব কিছু জানতে চাইছি, আমার কাছে কিছুই লুকাবি না। আম্মুর ব্যাপারটা আমি দেখব।

ইশাত নিজেকে ধাতস্থ করে সব সত্য ভাইকে বলে দিল। এভিয়ান যে ইমরানের সাথে প্রতি’শোধ তুলতে তার বোনকে কিড’ন্যাপ করে দূর দেশের এমন একটা জায়গায় আটকে রেখেছিল এটা জানার পর ইমরানের রাগ দপদপ করে কয়েকগুন বেড়ে গেলো। ইশাত তখন ভাইকে শান্ত করে বলল।
— ভাইয়া তুমি তোমার বোনকে বিশ্বাস করো তো?

ইমরান শব্দহীন সম্মতি জানালো। ইশাত বলল।
— উনি আমার সাথে খারাপ কিছুই করেন নি। উনি শুধু তোমাকে পেরেশানিতে ফেলতে এমনটা করেছেন।

ইমরান নিঃশব্দে তাচ্ছিল্য হেসে বলল।
— ইশাত তুই এখনো ওকে ভালোবাসিস তাই না?

ভাইয়ের কথাটা ইশাত কোনমতে এড়িয়ে গেলো। সে কথা ঘুরিয়ে বলল।
— আমার কাছে একটা প্লেন আছে ভাইয়া। তোমার সাহায্য লাগবে।

—————————-

বিকেলে ইশাত বিছানায় শুয়ে একটা বই পড়ছিল। তখন তার রুমে হুড়মুড়িয়ে আদিবা ঢুকলো। কোলে তার দশ মাসের ছোট মেয়ে অহনা। ইশাত তাকে দেখে খুশি হয়ে সঙ্গে সঙ্গে বিছানা ছেড়ে উঠে বাবুটাকে কোলে নিলো। আদিবা উদ্বিগ্ন হয়ে তাকে জিজ্ঞাসা করলো।
— এতদিন তুই কোথায় ছিলি ইশু? সবাই তোকে কত খুঁজেছি। বিয়ে করবি না বলে এভাবে পালিয়ে যাবি?

ইশাত কিছু উত্তর দিতে যাবে তার আগেই আসিয়া বেগম রুমে এসে উপস্থিত হলেন। গতকাল রাতে তিনি ইশাতকে মুখে কিছু না বললেও আজ সকালের ঘটনার পর থেকে তার চোখে মুখে রাগ স্পষ্ট দৃশ্যমান। তার থেকে বেশি ক্ষুব্ধ তিনি ইশাতের নিস্তব্ধতায়। তিনি অসন্তুষ্ট গলায় আদিবাকে বললেন।
— ওসব কি আর ও বুঝবে? এমন একটা কাজ করার আগে আমাদের কথা একটিবারও ভেবেছে? কোথায় ছিল কার সাথে ছিল কিছুই বলছে না আমাদের। ওর ভাই ওকে পাগলের মতো কোথায় না খুঁজে নি? তুমি ওকে জিজ্ঞাসা করো আদিবা ও কোথায় ছিল!

ইশাত তখন দাঁতে দাঁত চেপে সত্য লুকিয়ে বলল।
— আম্মু আমি আমার একটা পরিচিত বান্ধবীর বাসায় ছিলাম। ও অন্য ডিস্ট্রিকে থাকে।

কথাটা বলে ইশাত অনুতপ্ত হয়ে মনে মনে বলল।
“আম্মু আমাকে মাফ করে দিও। আমাকে এটা করতেই হবে।”

আসিয়া বেগম তখন তপ্ত চাহনিতে প্রশ্ন ছুঁড়ে বললেন।
— আমি গতকাল তোকে কিছু বলি নি বলে আমার নীরবতাকে অসহায়ত্ব ভেবে ভুল করিস না ইশাত। আমি তোকে সময় দিয়েছি কিন্তু ছেড়ে দেই নি, আমাকে বল কে ওই মেয়ে কতদিন হলো তার সাথে তোর পরিচয়? যে তোকে এতোগুলো দিনের জন্য ওদের বাসায় ঠাঁই দিল? ওদের পরিবারের কেউ কিছু বলল না তোকে দেখে? কারণ জানতে চাইলো না? আদিবা ও যার কথা বলছে তুমি কি চেনো ওই মেয়েকে?

আদিবা তখন বোকা বনে গেল। তার জানা মতে এমন কোনো মেয়ের সাথে ইশাতের পরিচয় নেই, তাহলে ইশাত এমনটা কেন বলছে? সে কি উত্তর দিবে বুঝে পাচ্ছিল না তখন ইশাত বিষয়টা সামলে বলল।
— আম্মু ভাইয়া আমার ওই বান্ধবীকে চেনে। আমি ভাইয়াকে সব জানিয়েছি।

আসিয়া বেগম তখন ইশাতকে আতঙ্কে ফেলে প্রশ্ন করলেন।
— ইশাত তুই কি কাউকে ভালোবাসিস?

ইশাত ঘাবড়ে গিয়ে বলল।
— আম্মু তুমি এটা কেমন প্রশ্ন করছো? তুমি কি আমাকে সন্দেহ করছো?

আসিয়া বেগম কড়া গলায় বললেন।
— তুই যে কাজটা করেছিস, এখন আর তোর কোনো কিছুতেই আমার বিশ্বাস আসছে না। আমার বিশ্বাস তুই নিজেই নষ্ট করেছিস। এখন এলাকার মানুষের সামনে আমি মাথা তুলে দাঁড়াতে পারছি না। নজর মিলাতে পারছি না।আমাদের পরিবারের সম্মান তুই ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছিস। আসিফের মতো এতো ভালো একটা ছেলে তোর জন্য কয়টা বছর অপেক্ষা করলো। আর তুই ওকে এই প্রতিদান দিলি?

ইশাত মৃদু গলায় বলল।
— আম্মু আমি জানি তুমি এসব রাগের বশে বলছো। আমাকে তুমি ক্ষমা করো, আমি স্বীকার করছি আমার ভুল ছিল। আমি ঘাবড়ে গিয়েছিলাম বলে এমন একটা কাজ করে বসেছি। পড়ে অনুশোচনা হচ্ছিল বলে আমার বিবেক আমাকে ফিরতে দিচ্ছিল না।

আসিয়া বেগম এবার একটু নরম হলেন। তিনি বললেন।
— যদি ক্ষমা পেতে চাও তাহলে আমাকে সব জানাতে হবে। এর পেছনে যদি কোনো যুক্তিযুক্ত কারণ দেখি তাহলে তোমাকে আমি ক্ষমা করব। সমাজ তোমাকে নিয়ে কি বলল আমি সেটা নিয়ে ভাবছি না, আমি জানতে চাইছি আমার বুঝদার মেয়েটা এমন একটা কাজ কিভাবে করে বসলো? আমার দেওয়া শিক্ষা কি সে নিজের মধ্যে ধারণ করতে পারে নি? নাকি মা হিসেবে আমি ব্যর্থ হয়েছি তাকে সঠিক শিক্ষায় সুশিক্ষিত করতে?

ইশাত মাথা নামিয়ে বলল।
— বলো আম্মু কি জানতে চাও।

— যে মেয়ের সাথে তুমি এতদিন ছিলে তার নাম কি? তার পরিচয় কি?

ইশাত বাধ্য হয়ে বলল।
— আ..আম্মু ওর নাম জে..জেরিন। সে একজন সার্জেন।

আসিয়া বেগম আদেশ করে বললেন।
— আমি ওর সাথে দেখা করতে চাই। ওকে বলবে একদিন আমাদের বাসায় এসে দেখা করে যেতে।

কথাটা শেষ করে আসিয়া বেগম বেরিয়ে গেলেন। ইশাত দুশ্চিন্তায় পড়ে গেলো। আদিবা মেয়েকে ইশাতের কোল থেকে নিয়ে বিছানায় বসিয়ে ইশাতের থেকে সে সব জানতে চাইলো। ইশাত তখন আদিবাকে সব কিছু বলতেই আদিবা হকচকিয়ে গেল। সে বিস্মিত নেত্রে বলল।
— এটা কি হয়ে গেলো তোর সাথে? ভাগ্য ভালো যে তুই সুস্থ সবল ফিরতে পেরেছিস। লোকটাকে দেখতে যত না বেশি আকর্ষণীয় তার থেকে আরো বেশি ডে’ঞ্জারাস। তাকে দেখে কেউ বুঝবেই না যে সে এসব কাজে জড়িত।

ইশাত তখন ধেয়ানমগ্ন হয়ে বলল।
— কিন্তু এখন কথা হচ্ছে, আমি জেরিন আপুকে কোথায় পাবো? আম্মু তো আমাকে শর্ত দিয়ে গেল। আম্মু কখনো এভাবে আমার সাথে রাগেন না। আর আজকে তার রাগটা জায়েজ ছিল।

আদিবা গালে হাত দিয়ে বলল।
— আমিও সেটাই ভাবছি।

দুজন একসাথে চিন্তায় পড়ে কোনো উপায় ভাবতে লাগলো।

চলবে ( ইনশাআল্লাহ )……….

#ক্লান্তিহীন_তুই_আমার_ফরিয়াদ
#পর্বঃ২৪
#সুমাইয়া_জান্নাত_ইলমা

এজে ইন্ডাস্ট্রিতে নতুন এমপ্লয়দের ইন্টার্নিংয়ের জন্যে ইন্টারভিউ নেওয়া হচ্ছে। ইশাতও বাকি সকল ক্যান্ডিডেটদের সাথে বাহিরে অপেক্ষা করছে। এক এক করে সবার নাম ডাকা হলে অবশেষে ইশাতের নাম ডাকা হলো। সকলের সিভি আগেই জমা নিয়ে নেওয়া হয়েছিল। ইশাত ভেতরে ঢোকার আগে সালাম দিয়ে ঢুকলো। এভিয়ান ইজি চেয়ারে বসে পায়ের উপর পা তুলে সবার ইন্টারভিউ নিচ্ছিল পাশেই তার ম্যানেজার সিয়াম সবার জমা করা সিভি দেখছিল। হঠাৎ ইশাতকে ইন্টারভিউ রুমে ঢুকতে দেখে এভিয়ানের কপাল কুঁচকে গেল। সে ইশাতকে সেখানেই থামিয়ে বলল।
— স্টপ রাইট দেয়ার, তুমি এখানে কি করছো?

ইশাত মৃদু হেসে ভদ্রতার সাথে উত্তরে বলল।
— আসসালামু আলাইকুম স্যার, বাকিরা যা করতে এসেছে আমিও তাই করতে এসেছি।

এভিয়ান আবারো প্রশ্ন করলো।
— হোওয়াট ডু ইউ মিন?

ইশাত তখন বাকিটা বুঝিয়ে বলল।
— আমার ইনস্টিটিউট থেকে আপনার ইন্ডাস্ট্রিতে আমাকে ইন্টার্নিংয়ের জন্য বাছাই করা হয়েছে। কেন? আমার সিভি তো অনেক আগেই জমা দেওয়া হয়েছিল, চেক করেন নি স্যার?

এভিয়ান তখন সিয়ামের দিকে তীক্ষ্ম দৃষ্টি নিয়ে তাকালো। যেকিনা সব সিভি চেক করছে। সিয়াম সবে মাত্র ইশাতের সিভি হাতে নিয়ে অসহায় দৃষ্টিতে এভিয়ানের দিকে তাকালো।যার অর্থ এই ছিল যে সে এতো এতো সিভির মধ্যে ইশাতের সিভি এতক্ষন খেয়াল করে নি। করলে তাকে ঢোকার আগেই ফিরিয়ে দিত। এভিয়ান তখন সিয়ামকে কড়া চোখে শাসিয়ে পুনরায় ইশাতের দিকে তাকিয়ে বলল।
— তোমার ইন্টার্ভিউ নেওয়া হচ্ছে না।

সে আবার সিয়ামকে আদেশ ছুঁড়ে বলল।
— কল দা নেক্সট ওয়ান।

ইশাত তখন রুখে দাড়িয়ে বলল।
— কেন আমার ইন্টার্ভিউ নেওয়া হবে না? এখানে আমার ভুলটা কোথায়? আপনি তো আমার সিভিটাও ঠিক মতন দেখলেন না, তাহলে আমার ত্রুটি কীভাবে চিহ্নিত করলেন?

এভিয়ান নির্বিকার জবাবে বলল।
— সেটা আমি বুঝব। ইউ মে গো আউট।

ইশাত বুঝলো এভাবে কাজ হবে না তাই সে এভিয়ানের দাম্ভিকতায় আ’ঘাত করে বলল।
— এমন তো নয়? যে আপনি কোনো ভাবে আমাকে নিয়ে ভয় পাচ্ছেন বলে ফিরিয়ে দিতে চাইছেন?

ইশাতের কথায় এভিয়ানের চাওয়া কপালে কয়েক ভাজ পড়লো। সে অপ্রসন্নতা নিয়ে বলল।
— কিসের ভয়ের কথা বলছো?

ইশাত উপহাস করে বলল।
— এইযে আমি একজন আইজিপি অফিসারের বোন বলে। যদি আমি আপনার কালো ব্যবসার সব তথ্য নিয়ে ভাইয়ার হাতে তুলে দেই তখন?

এভিয়ান তার তীক্ষ্ম ব্রু উঁচিয়ে কটাক্ষ করে বলল।
— ও রিয়েলি? আমাকে কি তোমার এতোটাই কাঁচা খেলোয়াড় মনেহয়? আমার ব্যবসার তথ্য খুঁজে পাওয়া কি এতোই সহজ? যা তোমার ভাই এতো বছরে করতে পারে নি সেটা তুমি পেরে যাবে? সো ফানি। আর ভয়ের বিষয় এলে, এভিয়ান জারিয়াথ ভয় পাবে এমন মানুষই দুনিয়াতে জন্ম নেয় নি।

— আপনার এই অহংকারই একদিন আপনাকে ডুবাবে। নিজের ক্ষমতা নিয়ে আপনার এতো অহংকার আর বড়াই অথচ আমার মতো একটা সাধারণ মেয়েকে নিয়ে মনে এমন আতঙ্ক কেন?

এভিয়ান গলার আওয়াজ উচু করে বলল।
— সাট আপ, তুমি কি ভেবেছো আমাকে এসব বললেই আমি তোমাকে সুযোগ দিয়ে দেব? আমাকে এতো বোকা মনেহয়?

ইশাত তাকে উসকে দিতে বলল।
— আমি তো মনে করবো আপনি ভয় পেয়ে পিছিয়ে যাচ্ছেন। আপনি না মাইন্ড গেম খেলতে ভালোবাসেন? নিজের পাওয়ার খাটিয়ে মানুষকে দমাতে পছন্দ করেন? তাহলে আমার ক্ষেত্রে এতো কপটতা কেন?

— সো, হোওয়াট ডু ইউ ওয়ান্ট নাও?

ইশাত চোখে আত্মবিশ্বাসের ঝলক ফুটিয়ে এভিয়ানকে তার কৌশলে ফেলতে বলল।
— ট্রায় মি, আপনার প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আমাকে গ্রহণ করুন।

— করতাম যদি প্রতিদ্বন্দ্বী কোনো পুরুষ হতো। আই ডোন্ট প্রিফার উইমেন। দে আর ডিসেপ্টিভ।

ইশাত তাকে নিজের কথার জালে ফেলে বলল।
— ক্লারা যদি মেয়ে হয়ে আপনার প্রতিদ্বন্দ্বী হতে পারে তবে আমি কেন নই? এটা আপনার অনর্থক অজুহাত ছাড়া আর কিছুই না।

ইশাতের কথার ধাঁচ দেখে এবার এভিয়ানের কাছে খেলাটা বেশ চ্যালেঞ্জিং লাগলো। সে ঠোঁটের কোণে বক্র হাসি নিয়ে তার লম্বা লম্বা আঙুলের ভাঁজে পেপারওয়েট ঘোরাতে ঘোরাতে বলল।
— আই থিঙ্ক ইউ ডোন্ট নিড ফ্রিডম। ভেবেচিন্তে মুক্তি দিয়েছিলাম তোমাকে, কিন্তু তুমি তো দেখছি নিজে থেকেই সেই মুক্তির পথ বন্ধ করতে চাইছ। আমার আন্ডারে থাকা মানে আমার কবলে বন্ধি থাকা সেটা জানো তো? এনিওয়েস, আই ডোন্ট মাইন্ড যদি ভি’কটিম নিজেই আমার হাতে ধরা দেয়।

ইশাত বুকে হাত ভাঁজ করে এভিয়ানের মতো করে এক ব্রু উঁচিয়ে বলল।
— ভি’কটিম কে? সেটা নাহয় পড়ে দেখা যাবে।

এভিয়ান শীতল চাহনি নিয়ে বলল।
— ইউ লুক ইন্টারেস্টিং। অলরাইট, জয়েন ফ্রম টুমোরো।

— আর আমার ইন্টার্ভিউ?

— সেটার প্রয়োজন নেই।

— ওকে স্যার, থ্যাংকস।

ইশাত ভদ্রিতাসুলভ হেসে নিজের ফাইল নিয়ে ইন্টার্ভিউরুম থেকে বেরিয়ে গেলো। ইশাত যেতেই সিয়াম চিন্তিত হয়ে বলল।
— কাজটা কি ঠিক হলো স্যার?

প্রত্যুত্তরে এভিয়ান ঠোঁটে রহস্যময় হাসি ধরে রেখে বলল।
— তুমি জানো আমি আমার কাজে কোনো কম্প্রোমাইজ করি না।

সিয়াম সম্মতিসূচক মাথা দুলিয়ে বলল।
— জ্বী স্যার।

এদিকে ইশাত অফিস বিল্ডিং থেকে বেরিয়ে এসে একটা অটো ডাকলো। অটোতে উঠে বসতেই সে তার ভাইকে কল লাগালো। ইমরান কল তুলতেই ইশাত সালাম দিয়ে জানালো।
— কাজ হয়ে গেছে ভাইয়া। কাল থেকে আমার জয়েনিং ওখানে। সুযোগ বুঝেই ধীরে ধীরে আমি উনার সকল ড্রাগ’স সাপ্লাইয়ের গোপন ফ্যাক্টরির তথ্যগুলো বের করে তোমাকে দেব। আমি তোমাকে তোমার মিশনে সাহায্য করব ইনশাআল্লাহ। কিন্তু তুমি যেটা কথা দিয়েছ তোমার মনে আছে তো? তুমি তার পরিচয় প্রকাশ না করেই ফ্যাক্টরিগুলো সিলগালা করে দিবে।

— তুই এমনটা কেন চাইছিস? ও যে অ’পরাধ করেছে এতে সমাজের চোখে ওর ভালোর মুখোশটা টেনে বের করা উচিত। এটাই ওর প্রাপ্য।

— আমি সেটা ছাড়াই তাকে নিজের পন্থায় সঠিক পথে আনতে চাইছি ভাইয়া। নাহলে সে তার অন্যায়গুলো বুঝবে না। সে নিজের ক্ষমতা আর দাপটের অহংকারে অন্ধ হয়ে আছে। উনার মধ্যে আমি অনুতাপ দেখতে চাইছি। তুমি চিন্তা করো না, আমি পুরোপুরি আল্লাহর উপর নির্ভরশীল। তিনিই আমাকে পথ দেখাবেন।

— তুই ভুল করছিস ইশাত। আমি তোকে এই কাজে কখনোই এগোতে দিতাম না। শুধু তোর জেদ আমাকে দমিয়ে রেখেছে বলে। আমি এই প্রফেশনে এমন অনেক কেস হ্যান্ডেল করেছি, এদের মতো মানুষ কখনো ভালো হয় না। তুই নিজের ক্ষতি নিজে ডেকে আনিস না। প্লীজ বাস্তবতা বুঝ।

— আল্লাহ যদি চান তবে কোনো কিছুই অসম্ভব নয়। তিনি হৃদয়ের পরিবর্তনকারী। আমি যা করছি সব বুঝে শুনেই করছি ভাইয়া। ভাইয়া আমি একজন গ্রোনআপ ইন্ডিপেন্ডেন্ট মেয়ে। তুমি আমাকে ভালো মন্দ শিখিয়েই বড় করেছ। আমি তোমার সেই বোন, যেকিনা এসবে ভয় পায় না। আমাকে তুমি পিছে হটা শেখাও নি।

ইমরান বুঝলো সে তার বোনকে হাজার বুঝিয়েও ফেরাতে পারবে না তাই সে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল।
— আমি জানি আমার বোন কখনো ভুল কিছু করবে না। আমার তোর উপর বিশ্বাস আছে। শুধু নিজের খেয়াল রাখিস। যেকোনো বিপদ আঁচ করলে আমাকে সঙ্গে সঙ্গে জানাবি। এখন কোথায় আছিস?

— এইতো পথেই আছি, বাসায় ফিরছি।

— ঠিকাছে, তাহলে সাবধানে যাস রাতে দেখা হচ্ছে।

————————–

অটোতে করে এপার্টমেন্টের সামনে এসে নামতেই ইশাত খেয়াল করলো তাকে দেখে এলাকার কয়েকজন মহিলা গুনগুন করে কিছু বলছে। সেদিকে পাত্তা না দিয়ে টাকা পরিশোধ করে সামনে এগোতেই ইশাতের কানে কিছু কথা স্পষ্ট এসে লাগলো। একটা মহিলা ইশাতকে দেখিয়ে অন্য একজন মহিলাকে বলছে।
“মেয়েটাকে দেখো কি বেহায়া, নির্লজ্জ। এতবড় কে’লেঙ্কারি ঘটিয়েও কীভাবে ঢ্যাং ঢ্যাং করে দিব্যি বাহিরে চলাফেরা করছে। ও আমার মেয়ে হলে আমি ওকে মে’রে কে’টে লবণ মরিচ লাগিয়ে দিতাম। এই মেয়ে আইজিপির বোন বলে আমার হাত থেকে বেঁচে গেলো। নইলে এমন একটা মেয়েকে এই এলাকায় আমি থাকতে দিতাম না। ভাবি শুনেন, এই মেয়ের থেকে নিজেদের মেয়েদের দূরে রাখবেন নাহলে ও এলাকার পরিবেশ নষ্ট কিরে ফেলবে।”

ইশাত ফিরে মহিলাটার চেহারা দেখে নিল। মহিলাটাকে দেখে তার মনে পড়লো, এই মহিলা এলাকায় মানুষের সমালোচনা নিয়ে পড়ে থাকে। তাকে সবাই চেনে। কারো বিষয়ে কোনো দুর্নাম পেলেই হলো, অমনি তিনি ঝাপিয়ে পড়েন আরও বেশি করে সেই ব্যক্তির নামে কুৎসা রটাতে। তিনি সারাদিন অন্যের বিষয়ে সমালোচনা নিয়ে পড়ে থাকলেও, কিছুদিন আগে তার নিজের ছেলেই একটা ঘটনা ঘটিয়ে এসেছিল। তখন নিজের ছেলেকে নিয়ে তার কোনো মাথাব্যথা ছিল না। ইশাত কোনো প্রতিবাদ করলো না। তার ইচ্ছে হলো না তাদের সাথে কথা বলে কথা বাড়ানোর।

সে তাদের অগ্রাহ্য করে পাশকাটিয়ে উপর তলায় এসে দরজায় বেল দিতেই সানজিদা দরজা খুলে দিল। ইশাত ফ্যান ছেড়ে ড্রয়িং রুমে জিরাতে বসলো। সানজিদা এসে তাকে পানির গ্লাস এগিয়ে দিলো। ইশাত তাকে ধন্যবাদ জানিয়ে পানিটুকু পান করে পানির গ্লাস রাখতে গিয়ে দেখলো আসিয়া বেগম দুপুরের রান্নার কাজ শুরু করেছেন। সানজিদাও তাকে সাহায্য করছে। ইশাত আর দাড়িয়ে না থেকে মাকে সাহায্য করতে এগিয়ে গেলো। সে সানজিদাকে চোখে ইশারা দিতেই সানজিদা তার ইশারা বুঝে অজুহাত বানিয়ে আসিয়া বেগমকে বলল।
— মা আমি বরং আহনাফকে গোসল করিয়ে দিয়ে আসি। ইশাত যেহেতু এসে গেছে বাকি কাজটুকু নাহয় ও করে ফেলুক।

তখন আসিয়া বেগম সবজি কাটছিলেন ইশাত সেগুলো মায়ের হাত থেকে নিয়ে নিজেই কাটতে লেগে গেলো। সানজিদা মুচকি হেসে সেখান থেকে চলে গেলো। কাজের ফাঁকে ফাঁকে ইশাত মায়ের সাথে এইসেই বিষয়ে কথা বলার চেষ্টা করছে কিন্তু আসিয়া বেগম সাড়া দিচ্ছেন না। ইদানিং তিনি প্রয়োজন ছাড়া বাড়তি কোনো কথা মেয়ের সাথে বলেন না। ইশাত বুঝলো মা তার সাথে এখনো অভিমান করে রয়েছে। ইশাত দীর্ঘশ্বাস ফেলে মনে মনে নিজেকে সান্ত্বনা দিয়ে বুঝালো যে পর্যন্ত সে মায়ের দেওয়া শর্ত পূরণ না করছে ওই পর্যন্ত মায়ের অভিমান যাবে না।

হাতে হাতে রান্নার কাজ শেষ হতেই ইশাত উদাস মনে রুমে এসে ফ্রেশ হয়ে যুহরের নামাজ পড়ে নিলো। এরপর রুম থেকে বেরিয়ে আগে আগে গিয়ে ডাইনিং টেবিলে সব খাবার এনে রাখলো। আসিয়া বেগম নামাজ পড়ে বেরোতেই দেখলেন মেয়ে তার সব খাবার এনে টেবিলে বেড়ে রেখেছে। তিনি সানজিদাকে ডাক ছুঁড়ে বললেন ছেলেকে নিয়ে খেতে আসতে। সানজিদা আহনাফকে নিয়ে আসতেই আসিয়া বেগম নাতিকে কোলে বসিয়ে প্লেটে ভাত তরকারি বেড়ে সেটা জুড়িয়ে হাতে মাখিয়ে আহনাফকে খাইয়ে দিতে লাগলেন।

সানজিদা আহনাফকে খাইয়ে দিলে ছেলেটা না খাওয়ার জন্য বায়না ধরতো। কিন্তু দাদির হাতে সে কোনো বায়না করা ছাড়াই চুপচাপ খেয়ে নিচ্ছে। অহনাফকে খাইয়ে আসিয়া বেগম ইশাত আর সানজিদাও চুপচাপ খেয়ে উঠে গেলো।

বিকেলে ইশাত আহনাফের সঙ্গে বসে তার লেগো সেট মিলাতে সাহায্য করছিল। তখন সানজিদার বাবা মা এলেন ইশাতকে আর নাতিকে দেখতে। ইশাত তাদের সোফায় বসিয়ে কিছুক্ষণ কথা বলে চলে গেলো নাস্তা বানিয়ে আনতে। সানজিদাও বাবা মার সাথে কথা বলে ইশাতের সাথে কাজে সাহায্য করতে চলে গেলো। আহনাফ নানা নানীর ডাকে তাদের কোলে উঠে বসে গল্প জুড়ে দিলো। আসিয়া বেগমও বিয়ান বিয়াইয়ের সঙ্গে আলাপ করতে বসে পড়লেন। সন্ধ্যার দিকে তারা ফিরে গেলো। ইশাত দৈনন্দিনের সব কাজ শেষ করে রাতের দিকে তাড়াতাড়ি ঘুমোতে চলে গেলো। কাল তার অফিসের প্রথম দিন দেরি করলে চলবে না।

ঘড়ির কাটা তখন রাত ১১ টার দিকে ঘুরছে। ইশাত সেসময় ঘুমে আচ্ছন্ন। আকস্মাৎ ফোনের রিং বাজতেই তার ঘুমে বিঘ্ন ঘটলো। পাশ থেকে হাতড়ে ফোনটা নিতেই সে দেখলো আসিফের কল। এতো রাতে আসিফ কেন কল করেছে তাকে? কি প্রয়োজনে হতে পারে? ইশাত দ্বিধাদ্বন্দে পড়ে কলটা অবশেষে তুলে সালাম দিলো। কিন্তু বিপরীত পাশ থেকে কোন উত্তর এলো না। শোনা গেলো শুধু ভারী শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ। ইশাত প্রশ্ন করলো কিন্তু কোনো উত্তর আসছে না। এভাবে কিছুক্ষণ নিস্তব্ধতার পর যখন ইশাত ফোন কাটতে যাবে তখন অপরপাশে থেকে আসিফের অস্পষ্ট ভাঙ্গা কন্ঠ শুনা গেল।
“ইশাত আমি ভালো নেই, তোমাকে ছাড়া আমি একদমই ভালো নেই। তুমি একটু তোমার ভাইয়াকে বোঝাও। তুমি বললে সে নিশ্চই আমাদের বিয়ের জন্য মানবে।”

আসিফের এমন উক্তিতে ইশাতের কপাল কুচকে এলো। সে বিস্মিত কন্ঠে জিজ্ঞাসা করলো।
— আপনি কি ড্রাঙ্ক?

আসিফ বেহুশের মতো প্রত্যুত্তর করলো।
— উমম!! হয়তো।

ইশাত রাগান্বিত হয়ে বলল।
— এইভাবে আমাকে আর কখনো কল করবেন না। ভাইয়া যা বলার তখনই বলে দিয়েছে।

কথাটা বলে আর এক মুহূর্ত অপচয় না করে ইশাত কল কেটে দিলো। ফোনটা রেখে পুনরায় সে বালিশে মাথা রাখলো। কিন্তু চোখে আর ঘুম ধরা দিল না। তাই সে উঠে বারান্দায় গিয়ে নিস্তব্ধ আকাশের পানে নিশ্চুপ তাকিয়ে রইলো।

চলবে ( ইনশাআল্লাহ )…………………..