Home "ধারাবাহিক গল্প খুঁজেছি তোকে খুঁজেছি তোকে পর্ব-০৫

খুঁজেছি তোকে পর্ব-০৫

0
367

#খুঁজেছি_তোকে (০৫)
#ছনিয়া_তাবাচ্ছুম_অনি

নূরা ডেসিন টেবিলের সামনে দাড়িয়ে গুণগুণ করে গান গাইছে আর মনের সুখে চুল বেনী করছে। নূরা’র অন্য দিকে কোনো খেয়াল নেই। নূরা গান গাচ্ছে কখনো হাসছে কখনো ঠোঁট উল্টে মুখ গোমড়া করে ফেলছে। সামির পারমিশন ছাড়ায় নূরা’র রুমে ঢুকে পড়ে। রুমে একা বিধায় নূরা ওড়না নেয়নি। কারণ তার রুমে তার পারমিশন ছাড়া কেউ আসে না। সামনে দাঁড়ানো রমনী কে দেখে দরজায় দাঁড়িয়ে যায় সামির। মুগ্ধ চোখে খানিক্ষন তাকিয়ে রইল৷ হুঁশ আসতেই নিজেকে সামলে নেয় সামির। তারপর সহসাই রুমের দরজা বন্ধ করে দেয়। হঠাৎ করে দরজা দেওয়ার শব্দে চমকে ওঠে নূরা। ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনে তাকায়। সামির দরজা আঁটকে সেখানেই দাঁড়িয়ে রইল৷ সামির স্যারকে নিজের রুমে দেখে আকাশ থেকে পড়ল নূরা। কাঁপা গলায় সুধালো,

“- স্যার আপনি… এখানে ? আর দরজায় বা দিলেন কেন?

সামির এক দৃষ্টিতে নূরা’র দিকে তাকিয়ে রইল। নূরা কথার প্রতিত্তোরে সামির কিছু বলল না। নূরা বোকার মতো দাঁড়িয়ে থাকল। হঠাৎ করে নূরা’র কিছু একটা মনে পড়তেই নিজের দিকে তাকাল। নিজেকে ওড়না বিহীন দেখে চমকে উঠল। লজ্জায় দ্রুত বিছানা থেকে ওড়না নিয়ে গায়ে জড়িয়ে নেয়। সামিরের দিকে তাকাতেই ভিষণ অস্বস্তি তে পড়ল। সামির ওর দিকে কেমন ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে আছে।

সামির ধীর পায়ে নূরা’র দিকে এগিয়ে আসছে। নিজের দিকে সামির স্যার কে আসতে দেখে ঘাবড়ে গেলো নূরা। ভয়ে শুকনো ঢোক গিলে কাঁপা গলায় বলে,

“- স্যার, আমার দিকে এগিয়ে আসছেন কেন?

সামির কিছু বলল না। ধীর গতিতে আগাতে লাগল। নূরা’র খুব ভয় করছে। ভয়ে বার বার ঢোক গিছে। সামির সামনে যত এগোচ্ছে নূরা তত পিছিয়ে যাচ্ছে। এক সময় নূরার পিঠ দেয়ালে ঠেকে যায়। ততক্ষণে সামির নূরা’র খুব নিকটে এসে দাড়ায়। সামির এক হাত দেয়ালে রাখে। সামির কে নিজের এত কাছে দেখে নূরা’র ভয় আরও দ্বিগুণ বেড়ে গেলো। সামির নেশালো চোখে তাকিয়ে নূরা’র গা’লে স্লাইড করতে লাগলো। নূরা চোখ মুখ খিঁচে বন্ধ করে নেয়। নূরা’র ঠোঁট দুটো ভিষণ কাঁপছে। নূরা’র সেই গোলাপি ঠোঁটের দিকে পলকহীন তাকিয়ে রইল সামির। ঠোঁট দুটো তাকে ভিষণ টানছে। কিন্তু সে এসব কিছু ই করবে না। সামির কিছু একটা মনে করে মনে মনে দুষ্টু হেঁসে আবার নূরা’র সারা মুখে নিজের আঙুল দিয়ে স্লাইড করতে লাগলো। নূরা হালকা করে এক চোখ খুলে কাপা কাপা গলায় বলল,

“- স্যার, কি করছেন?

সহসাই সামির নূরা’র ঠোঁটের উপর হাত চেপে ধরে বলল,

“- হুঁশশ, কথা নয়!

নূরা চুপ হয়ে গেলো। নূরা সামিরের দিকে তাকাল। সামিরের ঠোঁটের কোণে হাসি দেখে পিলে চমকে গেলো নূরা’র। অজানা ভয়ে জামা খামচে ধরে। সামিরের বাহুডোরে আটকে গেছে সে৷ কিভাবে বের হবে সেটায় ভাবছে নূরা। নূরা’র ভাবনার মাঝেই সামির নেশালো গলায় বলল,

“- ওড়না ছাড়া তোমাকে দারুণ লাগে মিসেস চৌধুরী।

নূরা চমকে সামিরের দিকে তাকাল । লজ্জায় কান গরম হয়ে গেলো নূরা’র । নূরা লজ্জায় চোখ সরিয়ে ফ্লোরে রাখল। মনে মনে সামির কে হাজার টা গালি দিলো। শ্লা’র অসভ্য ব্যাটা লজ্জা করে না একা একটা মেয়ে কে রুমে পেয়ে এসব বলতে। পরমুহূর্তে নূরা লাজলজ্জা রেখে শক্ত গলায় বলল,

“- সরুন।

সামির সরল না। বরং একটা অপ্রত্যাশিত কাজ করে ফেলল। সহসাই সামির নূরা’র কোমর চেপে ধরে নিজের আরও কাছে নিয়ে আসে। ঠান্ডা হাতের স্পর্শ পেতেই পুরো শরীর শীতল হয়ে গেলো। নূরা যেন ঠান্ডায় জমে যাচ্ছে। নূরা’র ভিতরে অদ্ভুত এক শিহরণ বয়ে যায়। সামির নূরা’র কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলে,

“- এতগুলো দিন তো দুরে দুরেই ছিলেন মিসেস চৌধুরী। আর কতদিন দুরে থাকবেন।

নূরা’র ভিতরে অস্থিরতা কাজ করে। সামিরের থেকে নিজেকে ছাড়ানোর জন্য ছটফট করছে। নূরা কে এভাবে মোচড়ামুচড়ি করতে দেখে বিরক্ত হয়ে বলে,

“- উফস, এভাবে সাপের মতো মোচড়ামুচড়ি করছো কেন?

নূরা’র কণ্ঠে অস্থিরতা। নূরা বলল,

“- প্লিজ স্যার সুরুন না। আমাকে যেতে দিন।

নূরা’র ছটফটানি দেখে সামির বাকা হেঁসে বলল,

“- তোমাকে কি আমি খেয়ে ফেলছি নাকি মেরে ফেলছি হু। এভাবে মোচড়ামুচড়ি না করে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকো। নয়তো…

“- নয়তো কি করবেন?
নূরা কিছু টা জোর গলায় বলে। নূরা কে এভাবে দেখতে বেশ ভালোই লাগছে সামিরের । তবে তাকে এতগুলো বছর যে কষ্ট টা করতে হলো তার কাছে এটা তো কিছুই না। সামির সুদে আসলে সব কিছু উশুল করে নিবে। সামির নূরা’র চোখে চোখ রাখল। নূরা চোখ সরাতে চেয়েও কেন জানি না সরালো না। সামিরের মতো এক ভাবে তাকিয়ে রইল। কিন্তু সামিরের ধারালো চোখের দিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারল না নূরা। চোখ সরিয়ে নিলো।

হঠাৎ করে সামিরের কি হলো জানে না নূরা। বিদ্যুৎ চমকানোর মতো নূরা’র থেকে দুরে সরে দাঁড়ায়। হঠাৎ এমন হওয়ায় নূরা ও কিছু টা ঘাবড়ে যায়।

সামির কোনো কথা না বলে দরজা খুলে বেরিয়ে গেলো। কিন্তু যাওয়ার আগে দরজায় দাঁড়িয়ে নূরা কে সরি বলে গেলো। হঠাৎ সামিরের এমন আচরণে আশ্চর্য হয়ে গেলো নূরা। অবাক হয়ে সামিরের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল।

,
,

সামির নূরা’র রুম থেকে গোমড়া মুখে বের হয়। নিহাল সামিরের জন্য নিচে অপেক্ষা করছিল। গোমড়া মুখো সামির কে দেখে নিহাল বলল,

“- কিরে মুখ টা এমন পেচার মতো করে রাখছিস কেন? আমার বোনের হাতে কি কেলানি খেয়ে এসেছিস?

বলেই হেসে ওঠে নিহাল। সামির নিহালের দিকে রাগী চোখে তাকিয়ে বলে,

“- ছিহ্, মুখের কি ভাষা!

নিহাল সামিরের কাছে এগিয়ে এসে বলল,

“- হঠাৎ করে কি এমন হলো? এভাবে চলে আসলি? নূরা কি কিছু বলেছে তোকে? না মানে ও তো…

“- কিছু বলেনি। বাসায় যাচ্ছি আঙ্কেল আন্টি কোথায়?

স্বপ্না বেগম কিচেন থেকে হাত মুছতে মুছতে বের হয়ে বললেন,

“- এই যে বাবা, কিন্তু তুমি এত রাতে কথায় যাচ্ছো? এত রাতে তোমাকে যেতে হবে না। আর বরং তুমি এখানেই থেকে যাও। কাল সকালে চলে যেও।

সামির মৃদু হেসে বলে,

“- না না আন্টি আমাকে বাসায় যেতেই হবে। জানেনই তো সামিয়া’র এনগেজমেন্ট। বাসায় প্রুচর কাজ। এই মুহূর্তে কি এখানে থাকা যায়?

“- সেটাও ঠিক কিন্তু তোমাকে একা ছাড়তে ভালো লাগছে না।তাই থেকে যেতে বলছিলাম।

“- আপনি টেনশন করবেন না। আমি সাবধানে বাসায় পৌঁছে যাবো। আসি তাহলে।

“- সাবধানে যেও বাবা।

“- ইনশাআল্লাহ।

,
,
,

চৌধুরী বাড়ির সবাই কাজে ব্যস্ত। চৌধুরী বাড়ির একমাত্র মেয়ের এনগেজমেন্ট। জাঁকজমক ভাবে না হলে হয়। তাই তো এনগেজমেন্টের দুদিন আগে থেকেই সব সাজানো গোছানো শুরু করছে।
,
,
,

আহমেদ বাড়ির সবাই খেতে বসেছে। নূরা’র ছোটো চাচা’রা বেড়াতে গিছেলেন। সেখান থেকে সকালে ফিরেছেন তারা। নূরা’র ছোটো চাচা জামাল আহমেদ। তার এক ছেলে সায়ন আর দুই মেয়ে নাবা সাবা। জমজ বোন। দু’জনে এবার ক্লাস নাইনে পড়ে। আর সায়ন নূরা’র এক ইয়ার উপরে পড়ে। মানে সায়ন থার্ড ইয়ারের স্টুডেন্ট। দু’জনে আলাদা আলাদা ভার্সিটিতে পড়ে। সায়নের নানা বাড়ি অনেক দুরে। বেশির ভাগ সময় তারা রাতে জার্নি করে যান আবার রাতেই ফেরেন। তাই তো সকালে এসে পৌঁছেছেন। জামাল আহমেদ কাল দুপুরে ভাইয়ের কাছ থেকে জানতে পেরেছেন নূরা ফিরেছে। তাই তো রাতেই টিকিট কেটে বাসায় ফিরেছেন।

নূরা খাবার খাচ্ছিল। তখন কলিং বেল বাজলে স্বপ্না বেগম দরজা খুলে দেন। নূরা জানতো না তারা আসবেন। সবাই কে দেখে নূরা খাবার রেখে দৌড়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরে। এতদিন পর বোন কে পেয়ে সায়ন তো মহাখুশি। কারণ একসময় তারা দু’জন সারাদিন বাড়িতে ঝগড়া মারামারি করে আহমেদ ভিলা মাতিয়ে রাখতো৷ দু’জনের ছিল সাপে নেউলের সম্পর্ক। অথচ পরিস্থিতির জন্য নূরা এতগুলো দিন সবার থেকে দুরে থেকেছে।

জামাল আহমেদ ফ্রেশ হয়ে সকলের সাথে খেতে বসেন। নূরা ও আবার খেতে শুরু করে। আহমেদ বাড়ির সবাই তখন ডাইনিং এ উপস্থিত। তখন সুলাইমান আহমেদ বললেন,

“- আগামী কাল সামিরের বোনের এনগেজমেন্ট। বেয়াই আমাদের সবাই কে ইনভাইট করেছেন। তাই সবাই কে যেতে হবে।

বাবা-র কথা শুনে খাওয়া থেমে গেলো নূরা’র। সুলাইমান আহমেদ গম্ভীর কণ্ঠে মেয়ে কে বললেন,

“- নূরা কাল কিন্তু কোনো রকম বাঁদরামি করবে না। চুপচাপ ভদ্র মেয়ের মতো সবার সাথে শশুর বাড়ি যাবে। ইভেন সেখানে গিয়ে তাদের সবার সাথে ভালো করে কথা বলবে ভালো ব্যবহার করবে। কথা টা মাথায় রাখবে। বলে টেবিল ছেড়ে উঠে গেলেন। আর রেখে গেলেন নূরার চিন্তিত মুখ।

চলবে~