#খুঁজেছি_তোকে (১৩)
#ছনিয়া_তাবাচ্ছুম_অনি
বাইরে ক্ষণে ক্ষণে বৃষ্টি হচ্ছে। বৃষ্টির মৃদু ঝাপটানি এসে নূরা’র গায়ে আঁচড়ে পড়ছে। নূরা বেলকনির গ্রিল ধরে বৃষ্টি দেখছে। বৃষ্টির পানি যে তাকে বার বার ভিজিয়ে দিচ্ছে সেদিলে কোনো হুশ নেয়। নূরা অপলক দৃষ্টি তে বাইরে তাকিয়ে আছে।
মাত্র সাতদিন। সাতদিন পর তাকে নিজের আপন নীড় ছেড়ে চলে যেতে হবে। ভাবতেই দম বন্ধ হয়ে আসছে। কান্না পাচ্ছে! কিন্তু কাঁদছে না নূরা। কেঁদে কেটে কি হবে? কেউ কি তার কথা শুনবে? শুনবে না।
সামিরের বাবা আলতাফ চৌধুরী যখন বললেন,
“- ভাই’সাব এবার আমরা নূরা মামনি কে আমাদের বাসায় নিয়ে যেতে চাই। আপনাদের কোনো আপত্তি নেই তো?
তখন নূরা কয়েক সেকেন্ডের জন্য একদম স্থির হয়ে গিছিল। এই তো কিছু দিন আগে সে বাসায় ফিরল আর এখনই তাকে এই বাড়ি ঘর নিজের আপনজন কে আবারও ছেড়ে যেতে হবে। নূরা বাবা তখন হাসলেন। বললেন,
“- কি বলেন ভাই সাব। আমাদের কোনো আপত্তি নেই। ইভেন আমার মেয়ে নূরা মামনিরও ও কোনো আপত্তি নেই। সে এবার শ্বশুর বাড়ি যেতে কোনো অমত করবে না। কি মামনি ঠিক বললাম তো?
নূরা চমকে বাবা’র দিকে তাকায়। বাবা’র গাসি মুখ খানা দেখে কিছু বলার সাহস দেখালো না।শুধু মুচকি হেঁসে জবাব দিলো,
“- জ্বি বাবা।
,
তারপর ঠিক হলো আগামী সপ্তাহে নূরা আর সামিরের চারহাত এক করে দেওয়া হবে। যেহেতু দুজনের বিয়ে হয়ে গেছে তাই আর বিয়ে নিয়ে কোনো ঝামেলা রইল না। শুধু অনুষ্ঠান করে বিদায় দিলেই হয়ে যাবে।
দেখতে দেখতে দিনগুলি কেমন যেন চলে যাচ্ছে। এই তো দুদিন আগে। দুই পরিবার মিলে বিয়ের সব কেনাকাটা করতে গিলো। আপাতত বিয়ের সব কেনাকাটা শেষ।
উদাসীন, আনমনা হয়ে দাঁড়িয়ে রইল নূরা। নূরা অনুভব করল তার দিকে কেউ এগিয়ে আসছে। নূরা পিছনে তাকাল না। কারণ সে জানে এখন কে আসছে। আজ নূরা’র হলুদ কাল বিয়ে। তার সুবিধা নূরা’র একমাত্র বেস্টফ্রেন্ড স্নিগ্ধা এসেছে। স্নিগ্ধা একেবারে বিয়ের দিন আসতে চেয়েছিল কিন্তু নূরা জোর করে এনেছে। একমাত্র বান্ধবী র কথা ফেলতে না পেরে স্নিগ্ধা কে আসতেই হয়েছে। স্নিগ্ধা আসার পর সে আরেক কান্ড ঘটেছে। স্নিগ্ধা আসার পরপরই সায়নের সাথে তার দেখা। স্নিগ্ধা আর নূরা তখন ছাদ থেকে নামছিল তখনই দু’জনের মুখোমুখি হয়। সায়ন স্নিগ্ধা কে দেখে চেচিয়ে বলে,
“- আরে আন্টি আপনি? আপনি আমাদের বাসায়?
ভাইয়ের কথা শুনে নূরা থতমত খেলো। আর স্নিগ্ধা রেগেমেগে চিল্লিয়ে বলল,
“- আপনি, এখানে কি করছেন? আর আমাকে দেখে আপনার কোন এঙ্গেলে আন্টি মনে হয় আঙ্কেল?
সায়ন মুচকি হেঁসে বলল,
“- এটা আমার বাসা আন্টি।
স্নিগ্ধা দাঁত কিড়মিড় করে বলে,
“- আর একবার আন্টি বললে আপনার মাথা আমি ফাটিয়ে দিবো মিস্টার অসভ্য আঙ্কেল।
সায়ন স্নিগ্ধা কে আরেকটু রাগানোর জন্য বলে,
“- আন্টি আপনার বাচ্চা দুই টা কোথায়? তাদের আনেননি?
“- আপনাকে তো আমি……….
“- স্টপ। সহসাই নূরা’র ধমকে দু’জনেই চুপসে গেলো। নূরা দুজনের দিকে রাগী দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
“- সমস্যা কি তোদের? এভাবে চুলোচুলি করছিস কেন? আর ভাইয়া তুমি স্নিগ্ধা কে আন্টি বলছো কেন? ওকে কি দেখতে আন্টির মতো লাগে? আর ওর বাচ্চা আসবে কোথা থেকে? ওর তো বিয়েই হয়নি।
সায়ন বাঁকা হেসে বলল,
“- সেটা উনার কাছেই শুনে দ্যাখ।
নূরা তীক্ষ্ণ চোখে স্নিগ্ধার দিকে তাকালো। নূরা’র তাকানো দেখে স্নিগ্ধা বোকা হাসলো। নূরা ভ্রু কুঁচকে বলল,
“- সমস্যা কি?
“- কই কিছু না তো.
“- তাহলে তোরা একে অপর কে আঙ্কেল আন্টি বলছিস কেন?
স্নিগ্ধা ঠোঁট উল্টে ইনোসেন্ট ফেস করে বলে,
“- উনিই আমাকে প্রথম আন্টি বলছে নূরা।
“- আমার কি দোষ! উনি যদি নিজেকে বিবাহিত দাবি করেন। দুই বাচ্চার মা দাবি করেন।তাহলে আমি উনাকে আন্টি বললে দোষ কোথায় বনু?
“- তোমাদের আগে দেখা হয়েছে?
“- হুম।
নূরা অবাক হয়ে বলে,
“- কবে? আর স্নিগ্ধা তুই তো বলিসনি আমার ভাইয়ার সাথে দেখা হয়েছে তোর?
“- আমি কি জানি নাকি এই অসভ্য লোক টা তোর ভাই লাগে। আমি তো জানি নিহাল ভাই ছাড়া তোর কোনো ভাই নেই। তাহলে বুঝবো কেমনে বল?
“- তোদের কবে দেখা হয়েছে সেটা আগে বল। ডিটেইলসে বলবি কিন্তু!
অতঃপর স্নিগ্ধা আর সায়ন সেদিনের সেই ঘটনা সব বলল৷ সব শুনে নূরা হো হো করে হাসতে হাসতে পেট চেপে ধরে। স্নিগ্ধা র এখন লজ্জা লাগছে। সে যদি জানত এই ছেলে টা নূরা’র ছোটো চাচার ছেলে তাহলে সে কখনো ওমন কথা বলতো না। ইচ্ছে করে বলে এখন নিজেই ফেঁসে গেছে।
,
,
নূরা দের ছাদ টা খুব সুন্দর করে ডেকোরেশন করা হয়েছে। ছাঁদে হলুদের অনুষ্ঠান হবে। নূরা’র কিছু কাজিন আর স্নিগ্ধা মিলে নূরা কে কাঁচা হলুদের সাজে সাজিয়ে দিছে। হলুদ রঙা শাড়িতে নূরা কে মারাত্মক সুন্দর লাগছে। স্নিগ্ধা নূরা কে লেগপুল করার জন্য বলে,
“- বান্ধবী তোর এই সাজ যদি সামির স্যার দেখে না তাহলে নির্ঘাত স্যার আজ কাত হয়ে যাবে।
স্নিগ্ধার কথা’য় নূরা’র গাল দুটো লাল হয়ে গেলো। মেয়ে টা লজ্জা পাচ্ছে। তবুও একাকজন একাক কথা বলছে। নূরা লজ্জায় আড়ষ্ট হয়ে বসে রইল।
রুমে কেউ নেই শুধু নূরা একা। নূরা বার বার নিজেকে আয়নায় দেখছে। আজ নূরা’র অদ্ভুত এক অনুভূতি হচ্ছে। বারবার সামিরের মুখ টা ভেসে উঠছে। সামিরের মুখে বউ ডাক টা বার বার নূরা’র কানে বাজছে। নিজের ভাবনাতে নূরা নিজেই অবাক। সে সামির কে নিয়ে ভাবছে কিছু কেন? সে সামির কে পছন্দ করে না। কিন্তু কেন করে না? প্রশ্ন টা অজানা নূরা’র। নূরা এমন হাজারও চিন্তা ভাবনায় মগ্ন ছিল। ঠিক তখনই কেউ পিছন থেকে এসে নূরা কে জড়িয়ে ধরে। সহসাই এমন হওয়ার নূরা আঁতকে ওঠে। ভয় মিশ্রিত কণ্ঠে বলে,
“- কে? ছাড়ুন বলছি।
নূরা খেয়াল করল রুমের লাইট বন্ধ হয়ে গেছে। ঘর অন্ধকার। নূরা ভয়ে কেঁপে উঠল। জড়িয়ে ধরা মানুষ টা কে নিজের থেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করল কিন্তু পারছে না। নূরা নীরবে কেঁদে দেয়। হঠাৎ করে নূরা’র শরীর জুড়ে মৃদু কম্পন হলো। তাকে জড়িয়ে ধরে রাখা পুরুষের শীতল হাত তার মেদহীন পেট আর কোমড়ে বিচরণ করে। নূরা ভয়ে এবার শব্দ করে কেঁদে দিয়ে বলে,
“- প্লিজ ছাড়ুন আমায়? কে আপনি? এভাবে আমার রুমে এসে আমার সাথে অসভ্যতামী করছেন কেন?
প্রেয়সীর কান্নার শব্দ পেয়ে চমকে উঠল সামির। আপনাআপনি হাত আলগা হয়ে গেলো। হাত আলগা হতেই নূরা দুরে সরে গেলো গেলো। নূরা’র চোখে মুখে ভয়। সামনের অবয়ব দাঁড়িয়ে আছে। নূরা কাঁদছে। নূরা প্রতি টা কান্নার শব্দে সামিরের বুকে গিয়ে বাদছে। তবুও সে নিশ্চুপ। সামির নূরা’র দিকে এগিয়ে যায়। নূরা আরও বেশি ভয় পেয়ে যায়। চেচিয়ে বলে,
“- আপনি আগাচ্ছেন কেন? আমি কিন্তু চিৎকার করব?
“- আমার স্পর্শ তুমি চিনতে পারলে না বউ!
একটা বাক্যে নূরা স্তব্ধ হয়ে গেলো। সামির সুইচ বোর্ডে গিয়ে রুমের আলো জ্বালিয়ে দিলো। তারপর প্রেয়সীর সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। সামির প্রেয়সীর স্তব্ধ মুখ দেখে মৃদু হাসলো। নূরা’র চোখের কার্নিশ দিয়ে পানি চুইয়ে চুইয়ে পড়ছে। সামিরের স্পর্শে নূরা কেঁপে উঠল। নূরা কাঁপা গলায় বলল,
“- আ- আপনি?
“- কেন অন্য কাউকে আশা করছিলে?
“- না মানে… আপনি এখানে।
সামির হালকা মৃদু স্বরে বলল,
“- প্রথম হলুদ টা আমিই ছোঁয়াতে চেয়েছিলাম।তাই ছুটে এসেছিলাম তোমার কাছে কিন্তু এসে যে এমন একটা পরিস্থিতিতে পড়বো বুঝতে পারিনি। আমি ভেবেছিলাম তুমি আমার স্পর্শ চিনতে পারবা কিন্তু পারো নি। আর পারবেই বা কি করে? তুমি তো আর আমায় ভালোবাসো না! তোমায় তো আমি জোর করে বিয়ে করেছি। আসলে আমারই ভুল হয়েছে। জোর করে কি আর সব হয়।
সামিরের চোখ দুটো ছলছল করছে। সামিরের কথা গুলো নূরা’র বুকে গিয়ে লাগল। নূরা বলল,
“- আসলে স্যার…
“- থাক তোমায় আর কিছু বলতে হবে না। আমি বুঝতে পারছি তোমার বিষয় টা। আজ আসি সাবধানে থেকো। বলে পা বাড়ালো সামির। কিন্তু বেশিদূর যেতে পারল না। তার আগেই একজোড়া নরম হাত তার ডান হাত টা টেনে ধরে।
চলবে~

