#খুঁজেছি_তোকে (১৪) স্পেশাল পর্ব
#ছনিয়া_তাবাচ্ছুম_অনি
সামিরের চোখ দুটো ছলছল করছে। সামিরের কথা গুলো নূরা’র বুকে গিয়ে লাগল। নূরা বলল,
“- আসলে স্যার…
“- থাক তোমায় আর কিছু বলতে হবে না। আমি বুঝতে পারছি তোমার বিষয় টা। আজ আসি সাবধানে থেকো। বলে পা বাড়ালো সামির। কিন্তু বেশিদূর যেতে পারল না। তার আগেই একজোড়া নরম হাত সামিরের ডান হাত টা টেনে ধরে। সামির পিছনে ঘুরে তাকালো। নূরা কে তার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে দেখে বলল,
“- কিছু বলবে?
নূরা মাথা ঝাকিয়ে হ্যাঁ বলল। সামির মৃদু স্বরে বলল,
“- বলো।
“- আমাকে কেমন লাগছে স্যার?
এমন একটা প্রশ্ন শুনে আশ্চর্য হলো সামির।কারণ নূরা’র মুখ থেকে এমন কথা আশা করে নি সামির। সামির নিশ্চুপ হয়ে নূরা’র পানে চেয়ে রইল। নূরা মুখ গোমড়া করে বলল,
“- আমাকে ভালো লাগছে না তাই না সামির?
সামির যেন আবার অবাক হলো। নূরা’র প্রশ্নের পাল্টা জবাব দিতে বেমালুম ভুলে গেছে সে। নূরা এবার করুন গলায় বলল,
“- আপনি কথা বলছেন না কেন সামির?
সামিরের এবার হুশ এলো। বলল,
“- হ্যাঁ, কি বলছিলে বলো।
“- কি বলেছি আপনি শুনেননি?
“- আবার বলো?
নূরা লাজুক হেঁসে মাথা নিচু করে বলে,
“- আমাকে কেমন লাগছে?
“- অসম্ভব সুন্দর।
“- আপনাকেও।
“- কিহ।
নূরা নিচ থেকে চোখ তুলে সামিরের চোখের দিকে তাকাল। সামিরও নূরা’র দিকে গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। নূরা ঠোঁট কামড়ে বলে,
“- কিছু না।
“- তা বললে হবে না তো। আবার বলো? আমি শুনতে চাই।
“- হলুদ পাঞ্জাবি তে আপনাকে সুন্দর লাগছে।
“- তুমি আমাকে নোটিশ করছো?
“- হু।
মুহূর্তে সামিরের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটে ওঠে। এমন একটা দিনের জন্য ই সে অপেক্ষা করছিল। যেদিন নূরা নিজ থেকে তার প্রশংসা করেছে। খুশিতে সামির একটা কান্ড ঘটিয়ে ফেললো। নূরা’র দিকে এগিয়ে গিয়ে নূরা কে কোলে তুলে নেয়। তারপর নূরা কে নিয়ে ঘুরতে থাকলো। হঠাৎ এমন হওয়ায় নূরা ঘাবড়ে গেলো। ভয়ে সামিরের গলা জড়িয়ে ধরে বলল,
“- কি করছেন সামির পড়ে যাবো তো। প্লিজ নামিয়ে দেন।
সামির দাঁড়িয়ে গেলো কিন্তু নূরা কে কোল থেকে না নামিয়েই বলল,
“- আমি থাকতে তুমি পড়বে কেন বউ। পড়ার আগেই টুপ করে ধরে ফেলবো জান। আমি আজ খুব খুশি জানো। এই দিনটা জন্য আমি এত গুলো দিন অপেক্ষা করেছি। অবশেষে সেই দিনের দেখা মিলল।
নূরা কিছু বলল না। নিচে নামার জন্য ছটফট করতে লাগলো। নূরা’র ছটফটানি দেখে সামিরের রাগ হলো। তবুও হজম করে নিলো। নূরা মিনমিন করে বলে,
“- নামিয়ে দেন না স্যার। যেকোনো সবাই সবাই চলে আসতে পারে।
“- তাতে আমার কি?
নূরা’র রুমের বাইরে দরজায় দাঁড়িয়ে আছে সায়ন স্নিগ্ধা আর নূরা’র কিছু কাজিন। নিহাল ও ছিল কিন্তু ছোটো বোনের সামনে বড়ো ভাই থাকলে নূরা আরও লজ্জা পেতে পারে ভেবে চলে গেছে। সায়ন খুকখুক করে কেশে বলল,
“- আসতে পারি।
সায়নের কণ্ঠ স্বর পেতেই চমকে উঠল নূরা। চটজলদি সামিরের কোল থেকে নেমে গেলো। সামির দরজার দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে। সায়ন রা হাসতে হাসতে ভিতরে ঢুকল। নূরা লজ্জায় গুটিয়ে গেলো। সায়ন হেঁসে বলল,
“- আমরা সবাই কিন্তু সব দেখেছি নূরা।
নূরা চোখ রাঙিয়ে সায়নের দিকে তাকায়। সায়ন দাঁত বের করে হাসে। বাকি সবাই ও মিটমিট করে হাসছে। যা দেখে বাঁকা হেসে নূরা কে টান দিয়ে নিজের কাছে টেনে নিয়ে কোমড় চেপে ধরে। সামিরের কাজে নূরা চোখ বড়বড় করে তাকায়। সামির বাকা হেঁসে বলল,
“- আরও রোমান্স দেখবে শালাবাবু? আমার কিন্তু তোমাদের সামনে রোমাঞ্চ করতে কোনো প্রবলেম নেই।
সামিরের কথা শুনে সবার চোখ বেড়িয়ে আসার উপক্রম হলো। সবাই একে অপরের দিকে তাকাচ্ছে। নূরা দাঁত কিড়মিড় করে সামিরের দিকে তাকায়। সামিরের ঠোঁটের কোণে হাসি লেগে আছে। নূরা হিসহিসিয়ে বলে,
“- আপনি কিন্তু বাড়াবাড়ি করছেন স্যার। লজ্জা সরম কি কিছু নেই আপনার। ছাড়ুন আমায় দুরে থাকবেন।
“- এতদিন তো দুরে দুরে ই ছিলে আর কত দুরে থাকবে বউ।
সায়ন কেশে দুষ্টু হেঁসে বলল,
“- ওকে আমরাও দেখতে চাই জিজু।
স্নিগ্ধা রাগী চোখে সায়নের দিকে তাকিয়ে বলে,
“- আপনি তো খুব অসভ্য। চুপচাপ এখান থেকে চলুন।
স্নিগ্ধা স্যার হিসেবে সামির কে খুব রেসপেক্ট করে। বান্ধবী র বর হিসেবে তার সাথে এখনো কোনো কথা’য় হয়নি। স্যারের সামনে এভাবে থাকতেও লজ্জা করছে তার।
,
,
ঘন্টা খানেক আগে নূরা’র হলুদ শেষ হয়েছে। নূরা ফ্রেশ হয়ে বেলকনিতে দাঁড়ায়। একটু পর স্নিগ্ধা এসে নূরা’র পাশে দাঁড়ালো। নূরা কে জিজ্ঞেস করল,
“- একটা কথা বলবো নূরা?
নূরা শান্ত চোখে স্নিগ্ধা র দিকে তাকালো। তারপর বলল,
‘- হ্যাঁ বল।
“- তুই তো স্যার কে মন থেকে মেনে নিতে পারিস নি তাহলে আজ যেটা ঘটলো সেটা কি ছিল। যদি মন থেকে মেনেই না নিস তাহলে এভাবে। সবকিছু কিন্তু আমার মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে। তোর মাথায় কি চলছে একটু খুলে বলবি প্লিজ।
স্নিগ্ধা র কথা শুনে নূরা মুচকি হাসল। নূরা’র হাসির মানে বুঝল না স্নিগ্ধা। অবাক হয়ে বলল,
“- হাসছিস কেন বইন।
“- এমনি।
“- আচ্ছা, এত ঢং না করে বলবি নাকি আমি তোদের বাসা থেকে চলে যাবো কোনটা?
“- তোকে কোথাও যেতে হবে না সব টা বলছি আমি।
“- বল।
– দু’দিন আগে। সেদিন আহমেদ বাড়ি আর চৌধুরী বাড়ির সবাই বিয়ের কেনাকাটা করতে বের হয়েছিল। যেহেতু আমার বিয়ে তাই আমাকেও যেতে হয়েছিল। অবশ্য আমি যেতে চাইছিলাম বাবা আমাকে জোর করে পাঠিয়েছিল। বাবার কথা রাখতে সেদিন গিয়েছিলাম। সেদিন সামির ও গিছিল। তো সবাই যখন কেনাকাটা করতে ব্যস্ত তখন আমি নিজের মতো হেঁটে ঘুরে ঘুরে সব দেখছিলাম। আর তখনই…
“- থেমে গেলি কেন? তখন কি হয়েছিল?
নূরা একটা দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বলে,
“- সেদিন ভাইয়া আর সামির স্যারের কথা শুনে আমি যেন আকাশ থেকে পড়লাম।
“- দু’জনে কি কথা বলছিল?
“- সামির স্যার নাকি আমাকে ভালোবাসেন। তবে সেটা একদিন দুই দিন না। দীর্ঘ ৬ বছর ধরে নিশ্চুপ আমাকে ভালোবেসে আসছে। বিশ্বাস কর স্নিগ্ধা আমি জানতাম না এই মানুষ টা আমাকে নীরবে একতরফা ভালোবাসে! শুধু এই না আমি তাদের আরও কিছু শুনেছিলাম। সামিরের স্যার ভাইয়া কে বলছিল, তোর বোন আমায় না ভালোবাসলেও চলবে নিহাল। নূর ( জানিস সামির স্যার না ভালোবেসে আমাকে নূর বলে ডাকেন। তবে সেটা আমার সামনে না আড়ালে।) আমার নূর শুধু আমার চোখের সামনে থাকলেই হবে। আমার নূর আমার কাছে থাকলেই আমি সারাটা জীবন একতরফা ভালোবেসে পার করে দিতে পারবো। আমার শুধু নূর কে লাগবে।
স্যারের চোখে সেদিন পানি দেখেছিলাম। সামির স্যার আমার জন্য কাঁদছিলেন। তুই ভাব যে মানুষ টা আমাকে ভালোবেসে আমারই আড়ালে এই ভাবে কাঁদতে পারে। আর আমি যখন সেটা নিজ চোখে দেখি অনুভব করি তাহলে সেই মানুষ টা কে মেনে না নিয়ে পারি কি করে বল? সেদিন সামিরের চোখের পানি আমার বুকে গিয়ে লাগছিল। আমি বিস্ময় হতবাক হয়ে মানুষ টাকে শুধু দেখে যাচ্ছিলাম। তার আমার ভালোবাসা লাগবে না শুধু আমাকেই লাগবে। সেই মানুষ টার ভালোবাসা কি করে পায়ে ঠেলে দেই বল তুই ? তাই মন থেকেই মানুষ টাকে আমি মেনে নিলাম। হয়তো এখন ভালোবাসি না কিন্তু আস্তে আস্তে ঠিকই একদিন ভালোবেসে ফেলবো। হয়তো তার মতো এতটা বাসতে পারব না কিন্তু কমও পারবো না। আমি আমার সবটুকু দিয়ে মানুষ টাকে ভালোবাসবো, ভালো রাখার চেষ্টা করব!
নূরা’র কথা শুনে স্নিগ্ধা নিজেই অবাক। হা হয়ে নূরা’র দিকে তাকিয়ে রয়েছে। নূরা বাইরের দিকে দৃষ্টি রেখে টানা নিশ্বাস নেয়। স্নিগ্ধা ঘোর থেকে বের হয়ে বলে,
“- ইউ আর ভেরি লাকি পার্সন বেইব। সত্যি তুই অনেক ভাগ্যবতী। নইলে সামির স্যারের মতো একজন কে নিজের জীবনে পাস! ইশশ, স্যার কিন্তু হেব্বি রোমান্টিক!
নূরা লাজুক হেঁসে বলল,
“- কি যে বলিস না তুই।
স্নিগ্ধা হেঁসে বলল,
“- আমি ঠিকই বলছি সোনা। সত্যি ই স্যার অনেক অনেক রোমান্টিক নইলে আজ সবার সামনে রোমান্স করার কথা বলতো তুই বল।
নূরা ঠোঁট কামড়ে হাসল। স্নিগ্ধা নূরা কে গুতা দিয়ে বলল,
“- লজ্জা পেও না জান। কালকের জন্য কিছু লজ্জা তুলে রাখো।
স্নিগ্ধার কথা শুনে নূরা আরও বেশি লজ্জায় নইয়ে গেলো।
চলবে~

