Home "ধারাবাহিক গল্প "গোধূলী লগ্নে তুমি গোধূলী লগ্নে তুমি পর্ব-১৫

গোধূলী লগ্নে তুমি পর্ব-১৫

0
11

#গোধূলি_লগ্নে_তুমি
#কলমে_ফাহিমা_ইসলাম
#পর্ব_১৫

[ অনুমতি ব্যতীত কপি করা কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ 🚫]

হাসপাতালের দীর্ঘ করিডোরটায় অস্থির পায়ে পায়চারি করে চলেছে আয়াশ। কখনো কয়েক কদম এগিয়ে যাচ্ছে,
আবার পরমুহূর্তেই থেমে যাচ্ছে। দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে, কিন্তু স্থির থাকতে পারছে না। বুকের ভেতরটা কেমন অজানা আশঙ্কায় ভারী হয়ে আছে। ঘড়ির কাঁটার প্রতিটা শব্দ যেনো তার হৃদপিণ্ডের স্পন্দনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলছে। ইনায়াকে ডাক্তার ভেতরে নিয়ে যাওয়ার পর থেকেই এই মানুষটার পৃথিবীটা যেনো দরজাটার ওপাশে আটকে আছে। একটা বন্ধ দরজা। অথচ সেই দরজার ওপাশেই তার সমগ্র অস্তিত্বের দুটো প্রান্ত আটকে আছে। একজন তার স্ত্রী, অন্যজন তার অস্তিত্বের নতুন পরিচয়।

আয়াশ আবারও কয়েক পা এগিয়ে গেলো। বন্ধ দরজাটার দিকে তাকিয়ে রইলো। কিছুক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে দৃষ্টি নামিয়ে নিলো সে। বুকের ভেতরটা কেমন করে ওঠলো।এতদিনের অভিমান, দূরত্ব, প্রত্যাখ্যান, না বলা ভালোবাসা, সবকিছু আজ যেনো অর্থহীন হয়ে গেছে। ইনায়া তাকে যতই দূরে সরিয়ে রাখুক, যতই তার ভালোবাসাকে গ্রহণ করতে অস্বীকার করুক, আজ তার কাছে কেবল একটা প্রার্থনাই গুরুত্বপূর্ণ। ইনায়া যেনো সুস্থ থাকে। তার সন্তান যেনো সুস্থ থাকে। আর কিছু চায় না আয়াশ। দু’হাত মুখের সামনে তুলে নেয় সে। চোখ দুটো অনতিবিলম্বে বন্ধ হয়ে আসে। ঠোঁট নড়ে ওঠে নিঃশব্দ প্রার্থনায়।

“হে আল্লাহ, আমার ইনায়াকে ভালো রেখো। আমার বাচ্চাটাকে ভালো রেখো। ওদের দু’জনের কাউকেই আমার কাছ থেকে কেড়ে নিও না। আমি আর কিছু চাই না। ওরা দু’জন সুস্থভাবে আমার কাছে ফিরে আসুক। আমার আর হারানোর মতো শক্তি নেই।”

প্রার্থনার শেষ শব্দগুলো কেমন ভারী হয়ে উঠেছে। নফল নাজাম আদায় করেছে, মাথায় এখনো টুপিটা রয়েছে।
হারিয়ে ফেলার ভয়টা আজ এতটা প্রকট কেনো? এতদিন তো ইনায়া তার কাছেই থেকেও কত দূরে ছিল। তার ভালোবাসাকে প্রত্যাখ্যান করেছে, তার দেওয়া জিনিস ফিরিয়ে দিয়েছে, নিজের চারপাশে অদৃশ্য এক দেয়াল তুলে রেখেছে। তবুও আয়াশ জানে, সে মেয়েটাকে হারাতে চায়নি কোনোদিন। আজ সেই হারানোর ভয়টাই যেনো বুকের ভেতর বিষণ্ণ কোনো আশঙ্কার মতো শিকড় গেড়ে বসেছে।
ইনায়া যদি না থাকে? ভাবনাটুকু মাথায় আসতেই আয়াশ চোখ মেলে তাকায়। দ্রুত মাথা নাড়িয়ে সেই চিন্তাটাকে সরিয়ে দিতে চাইলো।না,এমন কিছু হতে পারে না। আল্লাহ তার দোয়া ফিরিয়ে দেবেন না। আবার পায়চারি শুরু করে আয়াশ। একবার পকেট থেকে ফোন বের করে সময় দেখে। কয়েক মিনিটই কেটেছে, অথচ তার কাছে মনে হচ্ছে অনন্তকাল।

হাসপাতালের করিডোরে মানুষের আনাগোনা রয়েছে। নার্সরা দ্রুত পায়ে হেঁটে যাচ্ছে, দূরে কোথাও যন্ত্রের ক্ষীণ শব্দ ভেসে আসছে। অথচ আয়াশের কাছে চারপাশের কোনো শব্দই স্পষ্ট নয়। তার সমস্ত মনোযোগ কেবল সেই বন্ধ দরজাটার দিকে। যে দরজার ওপাশে ইনায়া। তার ইনায়া। যদিও মেয়েটা হয়তো এখন তাকে নিজের মানুষ বলে স্বীকার করতে চায় না। তবুও আয়াশের কাছে ইনায়া শান্তির নীড়। যে নীড় ছাড়া আয়াশ হয়তো পুরোপুরি ভেঙে গুঁড়িয়ে যাবে। দ্বিতীয় বার শক্ত হয়ে উঠে দাঁড়ানোর শক্তি তার আর নেই।

*

সময় গড়িয়েছে, প্রতীক্ষার প্রহর বেড়েই চলেছে। নাওমি, মেহরিন, রুমাইয়া তিন জনই উপস্থিত। উপস্থিত সবাই চিন্তিত, ভিতর থেকে এখন অব্দি কোনো খবর আসেনি। তাই আয়াশের অস্থিরতা যেনো বেড়ে চলেছে, হাসফাঁস করছে সে। তখনই হঠাৎ করেই ভেতর থেকে কারো দ্রুত পদধ্বনি শোনা গেলো। আয়াশ থমকে দাঁড়ালো। বুকের ভেতরটা এক মুহূর্তের জন্য যেনো থেমে গেলো। দরজা খুলে একজন নার্স বেরিয়ে আসে। সাদা পোশাকের নার্সটির দুই বাহুর মাঝে সযত্নে জড়িয়ে আছে সাদা কাপড়ে মোড়ানো এক ক্ষুদ্র মানবপ্রাণ। সদ্য পৃথিবীর আলো দেখা এক নবজাতক। আয়াশের দৃষ্টি স্থির হয়ে যায়। পৃথিবীর সমস্ত শব্দ যেনো এক নিমেষে স্তব্ধ হয়ে গেছে। তার চোখ আটকে আছে সেই ক্ষুদ্র কাপড়ে মোড়ানো প্রাণটার দিকে। এত ছোট্ট! এত নিষ্পাপ! এতদিন ধরে যার অস্তিত্ব কেবল ইনায়ার উদরের ভেতর অনুভব করেছে, আজ সে সত্যিই তার সামনে। তার সন্তান। আয়াশের বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেঁপে ওঠে। চোখের কোণে অনিচ্ছাকৃতভাবেই অশ্রু জমে ওঠেছে। এটাই কি তবে পিতৃত্ব?

এমন এক অনুভূতি, যার জন্য কোনো ভাষা যথেষ্ট নয়।
নার্সটা আরও কাছে এগিয়ে আসে। আয়াশ এক পা এগিয়ে গিয়েও থেমে যায়। হাত দুটো কেমন অসহায়ভাবে পাশে ঝুলে থাকলো। মনে হচ্ছে, এত ছোট্ট প্রাণটাকে ছোঁয়ার অধিকারও বুঝি এখনো তার অর্জিত হয়নি।কাঁপা কণ্ঠে প্রথম কথাটাই বেরিয়ে আসে-

“আমার স্ত্রী কেমন আছে?”

নিজের সন্তানের দিকে তাকিয়েও প্রথম প্রশ্নটা সন্তানের জন্য নয়। ইনায়ার জন্য, যে নারী এতো যন্ত্রণা সহ্য করে নতুন প্রাণকে এই ধরণীর বুকে এনেছে তাকে কি করে ভুলবে? নার্সের মুখে আশ্বস্ত করা হাসি ফুটে ওঠে।

“ আপনার স্ত্রীও সুস্থ আছে, জ্ঞান ফিরলে দেখা করতে পারবেন।”

নার্সের কথাটা শুনে আয়াশের বুকের ওপর চেপে থাকা অদৃশ্য ভারটা যেনো খানিকটা সরে গেলো। তারপরই আবার দৃষ্টি নামে সাদা কাপড়ে মোড়ানো ক্ষুদ্র প্রাণটার দিকে।আয়াশ ধীরে ধীরে হাত বাড়ায়। কাঁপতে থাকা আঙুলগুলো নবজাতকের ক্ষুদ্র হাতের কাছে পৌঁছাতেই বুকের ভেতরটা কেমন মোচড় দিয়ে ওঠলো।

নার্স মৃদু হেসে বলে,

“বাবু, আপনার ছেলেকে কোলে নেবেন না?”

অতি সাধারণ একটা প্রশ্ন। অথচ প্রশ্নটা আয়াশের অন্তঃস্থলে যেনো বজ্রপাতের ন্যায় আঘাত হানলো। ছেলে!
শব্দটা কানে প্রবেশ করতেই বুকের ভেতর কোথাও যেনো থমকে গেলো হৃদস্পন্দন। তার ছেলে! আয়াশের অধর দুটো কেঁপে উঠলো। কোনো উত্তর বের হলো না। চোখের পাতা ভারী হয়ে আসে অদ্ভুত এক অনুভূতিতে। আনন্দ, বিস্ময়, ভয়, অবিশ্বাস, ভালোবাসা, সবকিছু যেনো একইসঙ্গে এসে তার বুকের ভেতর জায়গা করে নিয়েছে। একজন মানুষ ঠিক কতটা সুখে অভিভূত হলে নিজের অনুভূতিগুলোকে ভাষা দিতে ভুলে যায়, আজ আয়াশ যেনো তারই উদাহরণ। নার্স শিশুটাকে অত্যন্ত যত্নে তার দিকে এগিয়ে দেয় তার দিকে। আয়াশের দুই হাত মাঝপথেই থেমে যায়। এত ক্ষুদ্র! এত কোমল!

তার এতদিনের প্রতীক্ষা আজ তার চোখের সামনে একটা ছোট্ট মানবশিশুর রূপ নিয়ে শুয়ে আছে। হাত দুটো কীভাবে রাখবে, কোথায় স্পর্শ করবে, কীভাবে এই ক্ষুদ্র অস্তিত্বটাকে নিজের বাহুর নিরাপদ আশ্রয়ে নেবে, কিছুই যেনো বুঝে উঠতে পারে না সে। নার্স মৃদু স্বরে বলে-

“ভয় পাবেন না। মাথাটা একটু ভালো করে ধরে নিন।”

আয়াশ যেনো ঘোরের মধ্যে মাথা নাড়ে। কাঁপতে থাকা হাত দুটো ধীরে ধীরে এগিয়ে যায়। প্রথমে শিশুটার মাথার নিচে একটা হাত রাখে, অপর হাতটা খুব সাবধানে পিঠের নিচে নিয়ে আসে। এতটুকু প্রাণ যেনো তার সামান্য অসাবধানতায়ও কষ্ট না পায়, সেই ভয়েই প্রতিটা স্পর্শে অস্বাভাবিক সতর্কতা।। অবশেষে ছেলেকে বুকের কাছে তুলে নিতেই আয়াশের সমগ্র অস্তিত্ব স্তব্ধ হয়ে যায়। কী আশ্চর্য অনুভূতি! নিজের বুকের ওপর নিজের রক্তের অস্তিত্ব। আয়াশ নিচের দিকে তাকিয়ে থাকে। শিশুটার ক্ষুদ্র মুখখানি চোখে পড়তেই তার দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসলো। এতদিন যে মুখটা কল্পনায় এঁকেছে, আজ সেই মুখ তার বুকের ওপর নিঃশব্দে নিশ্বাস ফেলছে। আঙুলের ডগা দিয়ে ছেলের গাল স্পর্শ করতে গিয়েও থেমে যায় আয়াশ। স্পর্শ করার সাহসটুকুও যেনো হারিয়ে ফেলেছে। পরমুহূর্তে অতি সন্তর্পণে একটা আঙুল রাখে শিশুটির গালে। মুহূর্তেই তার বুকের ভেতরটা কেমন মোচড় দিয়ে ওঠে।

“হেই বাডি!”

শব্দ দুটা এতটাই ক্ষীণ যে আশেপাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর কারো কানে পৌঁছালো না। অথচ আয়াশ নিজেই যেনো নিজের অস্তিত্বের গভীরতম কোনো কুঠুরি থেকে শব্দ দুটা শুনতে পাচ্ছে। চোখের কোণ বেয়ে নেমে আসে অশ্রুর সরু রেখা। এ কান্না দুঃখের নয়। এ কান্না সেই পিতৃত্বের, যার স্বাদ পাওয়ার জন্য একজন মানুষ কতগুলো দীর্ঘ রাত অপেক্ষা করেছে। ইনায়ার কথা মনে পড়তেই বুকের কোথাও আবার অদৃশ্য এক ব্যথা জন্ম নিলো। এত আনন্দের মুহূর্তেও তাদের মাঝখানে জমে থাকা মান, অভিমান আর দূরত্বটুকু যেনো একেবারে মুছে যায়। এই শিশুটাই তাদের দুজনের সবচেয়ে নিষ্পাপ সাক্ষী, অথচ তার জন্মের মুহূর্তেও মা আর বাবার মাঝখানে কত অমীমাংসিত অভিমান। আয়াশ ছেলের কপালের কাছে মুখ নিয়ে খুব ধীরে ফিসফিস করে বলে-

“তোমার মা তোমাকে অনেক কষ্ট করে পৃথিবীতে এনেছে। তুমি জানো না, মাকে কখনো কষ্ট দিবে না। পাপা খুব খারাপ, তাই কষ্ট দিয়ে ফেলেছি। কিন্তু তুমি কক্ষণো কষ্ট দিবে না কেমন?”

কথাগুলো বলতে গিয়েই কণ্ঠ ভারী হয়ে আসলো। দূরে দাঁড়িয়ে থাকা নাওমিরা এতক্ষণ নিঃশব্দে দৃশ্যটা দেখছিল। আয়াশের চোখের অশ্রু দেখতে পেয়ে তার নিজেদেরও চোখের কোণ অকারণে ভিজে ওঠলো। পাশে দাঁড়ানো মেহরিন নিঃশব্দে নাওমির হাত চেপে ধরে। আর রুমাইসারা দুই হাত মুখের কাছে এনে বিস্মিত চোখে তাকিয়ে থাকে ক্ষুদ্র শিশুটার দিকে। তিনজনই এখন ইনায়ার কাছের মানুষ। ইনায়ার অসংখ্য কান্না, অভিমান, অপেক্ষা আর নিঃসঙ্গতার সাক্ষী তারা। তাই আজকের এই মুহূর্তে তাদের আনন্দের মধ্যেও কোথাও একটা অদৃশ্য কষ্ট মিশে আছে।
নাওমি চোখ মুছে ফিসফিস করে বলে-

“ইনায়া যদি এখন এটা দেখতে পেত!”

মেহরিন দীর্ঘশ্বাস ফেলে। চোখের দৃষ্টি স্থির আয়াশের বুকের ওপর ঘুমিয়ে থাকা শিশুটির দিকে।

“ও দেখবে। সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে একদিন।”

রুমাইসারা মৃদু হেসে বলে-

“ ও আসার পর যদি ওনাদের মাঝে সব ঠিক হয়।”

আয়াশ কথাগুলো কর্ণকুহরে পৌঁছালো না। তার সমস্ত মনোযোগ তখন ক্ষুদ্র মুখটির ওপর নিবদ্ধ। শিশুটির ক্ষুদ্র আঙুল হঠাৎ নড়ে ওঠলো। অজান্তেই আয়াশ নিজের তর্জনীটি তার মুঠোর কাছে নিয়ে যায়। মুহূর্তেই ক্ষুদ্র আঙুলগুলো তার আঙুলটুকু আঁকড়ে ধরে। আয়াশের বুকটা কেঁপে ওঠলো।এই সামান্য স্পর্শেই যেনো পৃথিবীর সমস্ত প্রাপ্তি এসে তার বুকের ভেতর জমা হয়। এতদিন ইনায়ার কাছে ফিরে পাওয়ার যে আকাঙ্ক্ষা তাকে প্রতিটা মুহূর্তে তাড়িয়ে বেড়িয়েছে, আজ তার মাঝখানে এই ক্ষুদ্র প্রাণটা এসে দাঁড়িয়েছে। অভিমান আছে, দূরত্ব আছে, না বলা কত কথা আছে, তবুও এই শিশুটার মুঠোবন্দী আঙুলে যেনো তাদের সম্পর্কের সমস্ত ভাঙাচোরা সেতুর ওপর নতুন করে একটা পথ তৈরি হয়। আয়াশ শিশুটির কপালে অতি সাবধানে ঠোঁট ছোঁয়ায়।

“বাবা আছি। তোমার মা যতই অভিমান করুক, যতই দূরে থাকুক, তোমাদের দুজনকে ছেড়ে কোথাও যাবো না।”

কথাটি উচ্চারণ করার পর নিজেই কিছুক্ষণ নিশ্চুপ থাকে সে। আয়াশ আবারও তার ক্ষুদ্র মানবপ্রাণটার দিকে তাকিয়ে বলে-

“ অবশেষে তুমি এসে গেলে। তোমাকে ছুঁয়ে দেখার কত অপেক্ষায় ছিলাম জানো? তুমি আমাকে তোমার মায়ের অভিমান ভাঙাতে সাহায্য করবে তো বাডি? ড্যাডি নিউ ইউর হেল্প!”

নার্স দূর থেকে মৃদু হেসে তাকিয়ে দেখলো। নাওমি, মেহরিন আর রুমাইসারার চোখেও তখন একসঙ্গে জল আর হাসি।
অথচ আয়াশের পৃথিবী এখন কেবল ওই ছোট্ট বুকের ওঠানামায় সীমাবদ্ধ। চারিদিকের কিছুই তাকে স্পর্শ করতে পারছে না। নিজের সন্তানকে প্রথমবার কোলে নেওয়ার অনুভূতি যে এতটা গভীর, এতটা অবর্ণনীয় হতে পারে, তা হয়তো কোনো ভাষাতেই লেখা সম্ভব নয়। যা শুধু অনুভব করা যায়। নিজের বুকের ঠিক কাছে, নিজের রক্তের ক্ষুদ্রতম অস্তিত্বটাকে আগলে রেখেছে।

“ বাবুর আন্টিদেরও দিন ভাইয়া, আমরাও অপেক্ষায় আছি।”

মজা করে নাওমি বলে ওঠে। আয়াশ নিজের ঘোর থেকে বের হয়ে এলো। সে কোনো রকম হাসার চেষ্টা করে অতি সাবধানে নাওমির কাছে শিশুটিকে এগিয়ে দিলো। নাওমি কোলে নিলো, তিনজনই মেতে উঠলো সদ্য জন্মানো নবজাতক শিশুর মাঝে। আয়াশ পকেট থেকে ফোন বের করলো, বাড়িতে সবাই অপেক্ষায় আছে। সে দেরি করলো না, তাড়াতাড়ি ভিডিও কল দিলো। ওপাশ থেকে হয়তো তার কলেরই অপেক্ষায় ছিলো। দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কলটা রিসিভ হলো। আইরিন, আয়শা বেগম, জুয়েল সাহেব উষ্কখুক হয়ে অপেক্ষা করছিলো। একসঙ্গে প্রশ্ন করে বসলো আয়শা বেগম।

“ ইনায়া কেমন আছে? ও ঠিক আছে তো? সমস্যা হয়নি তো নরমালে কোনো?”

“ ঠিক আছে উনি, কেবিনে দিক,তারপর আমি দেখছি।””

আয়াশ পিছনের ক্যামেরা অন করে সদ্য জন্মানো নবজাতকের দিকে ফোনটা তাক করলো।

“ আল্লাহর লাখ লাখ শুকরিয়া! আমাদের ঘরে নতুন রহমত পাঠিয়েছে।”

আইরিন পাশ থেকে বলে ওঠে।

“ তাড়াতাড়ি এইসব মান-অভিমান শেষ কর। আমাদের ছেলেকে আমরা আমাদের বাড়িতে চাই। আর মেয়েকেও চাই।”

আয়াশ ক্ষুন্ন হেসে বলে-

“ চেষ্টা করছি তো। ইনায়া চাইলে আমরা বাড়ি ফিরবো।”

“ চেষ্টা না, ওকে ফিরিয়ে আনবি। দায়িত্ব নিয়ে যেমন, কষ্ট দিয়েছিস। তেমনিই দায়িত্ব নিয়ে কষ্টে লাঘব লাগিয়ে ফিরিয়ে আনবি।”

আয়াশ আর বাকিরা অনেকটা সময় কথা বললো। জুয়েল সাহেব ঢাকায় মিষ্টি বিলিয়েছে। আয়াশও ইতিমধ্যে মিষ্টির অর্ডার দিয়েছে, রাস্তার গরিব-দুঃখীদের সহ সবাইকে খাওয়াবে।

—-

সময় অতিবাহিত হয়েছে অনেকটা। ঘড়ির জাটায় এখন রাত বারোটা বেজে পঁচিশ মিনিট। ইনায়ার হালকা নড়ে উঠলো। জ্ঞান ফিরেছে আরও আগে, মেডিসিনের কারণে ঘুমিয়েছিলো। ঘুম ভাঙার পর অনুভূতিটা ইনায়ার কাছে প্রথমে কেমন অস্পষ্ট লাগলো। চারপাশের অস্তিত্ব যেনো ঘন কুয়াশায় ঢাকা। চোখের পাতাগুলো ভারী হয়ে আছে, শরীরের প্রতিটা অস্থিসন্ধিতে যেনো ক্লান্তির গভীর ছাপ। দীর্ঘ এক পথ পাড়ি দিয়ে ফিরে আসা কোনো পথিকের মতোই তার সমস্ত সত্তা অবসন্ন। ঠোঁট দুটো শুকিয়ে কাঠ, কণ্ঠনালি শুষ্কতায় ভারী, শরীরটাও নিজের বলে মনে হচ্ছে না। সামান্য নড়াচড়াতেই যেনো ক্লান্তির ঢেউ এসে সমগ্র অস্তিত্বকে আচ্ছন্ন করে ফেলছে। কতক্ষণ ধরে এমন নিস্তব্ধতায় পড়ে আছে, জানে না ইনায়া। চোখ দুটো সম্পূর্ণ মেলার আগেই পায়ের পাতায় এক অতি পরিচিত উষ্ণতার অস্তিত্ব অনুভব করলো সে। কারো হাত তার পায়ের ওপর নিবিড় যত্নে স্থির হয়ে আছে। স্পর্শটুকুতে কোনো অস্থিরতা নেই, নেই কোনো অধিকার ফলানোর কোনো প্রচেষ্টা। বরং মমতা মিশে আছে, যা ইনায়ার ঘোরগ্রস্ত চেতনাকেও ধীরে ধীরে বাস্তবতার দিকে ফিরিয়ে আনছে। ইনায়ার পলক ভারী হয়ে উঠলো।

আরেকবার চেষ্টা করতেই ঝাপসা দৃষ্টির সামনে ঘরের অবয়ব ধীরে ধীরে স্পষ্ট হতে শুরু করলো। মাথা সামান্য ঘুরিয়ে নিচের দিকে তাকাতেই স্থির হয়ে গেলো ইনায়ার দৃষ্টি।
আয়াশ, মানুষটা বিছানার পাশে বসে আছে। তার এক হাত ইনায়ার পায়ের পাতাকে অত্যন্ত সাবধানে আগলে রেখেছে, অপর হাতে ছোট্ট একটা নখ কাটার যন্ত্র। অতি যত্নে, একেবারে ধীরস্থিরভাবে ইনায়ার পায়ের নখ কেটে দিচ্ছে সে। যেনো সামান্য অসাবধানতাতেও এই দুর্বল মানুষটার কোনো অস্বস্তি হতে পারে, সেই ভয়েই প্রতিটা স্পর্শ মেপে মেপে রাখছে। দৃশ্যটা দেখে ইনায়া বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে।
ইনায়ার দুর্বল চোখের পাতা আবারও কেঁপে ওঠে।

আয়াশের দৃষ্টি তখনো তার পায়ের পাতাতেই নিবদ্ধ। ইনায়া জেগে উঠেছে, সেটাও বোধহয় খেয়াল করেনি। নখের ক্ষুদ্র অংশটুকু যত্ন করে কেটে শেষ করে সে খুব সাবধানে পা নামিয়ে রাখতে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই ক্ষীণ কণ্ঠস্বর ভেসে এলো,

“আমার… বাচ্চা?”

মাত্র দুটি শব্দ। অথচ শব্দ দুটোই যেনো আয়াশের বুকের ভেতর কোথাও গিয়ে আঘাত করলো। সে সঙ্গে সঙ্গে মুখ তুলে তাকালো। ইনায়ার চোখ দুটো তখন অস্থির। দুর্বল শরীরটাকে সামান্য উঠিয়ে বসার চেষ্টা করতেই আয়াশ দ্রুত তাকে থামিয়ে দিলো।

“এখন উঠতে হবে না। আপনি অনেক দুর্বল।”

কিন্তু ইনায়া যেনো তার কথা শুনতেই পাচ্ছে না। মাতৃত্বের প্রথম আকুলতা সমস্ত দুর্বলতাকে অতিক্রম করে তার চোখেমুখে ছড়িয়ে পড়েছে।

“ আ..আমার বাচ্চা কোথায়?”

কণ্ঠটা এবার আরও কেঁপে উঠলো। এতদিনের অপেক্ষা। উদরের ভেতর ছোট্ট প্রাণটার প্রতিটি নড়াচড়া অনুভব করা। রাতের পর রাত তার সঙ্গে কথা বলা। অসংখ্য দোয়ার শেষে একটা মাত্র প্রার্থনা করা, সন্তান যেনো সুস্থভাবে পৃথিবীর আলো দেখে। সেই সন্তান আজ পৃথিবীতে এসেছে। অথচ এখনো তাকে নিজের চোখে দেখেনি ইনায়া! ই ভাবনাটুকুই যেনো তার সমস্ত স্থিরতা কেড়ে নিচ্ছে। আয়াশ কিছুক্ষণ নীরবে তার দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর অত্যন্ত শান্ত কণ্ঠে বলে-

“আছে। একদম ঠিক আছে। ঘুমাচ্ছে।”

ইনায়ার চোখ দুটো মুহূর্তেই অশ্রুসিক্ত হয়ে ওঠে।

“আমাকে দেখান।”

কতটা আকুলতা মিশে আছে সেই দুটি শব্দে! আয়াশ আর কিছু বলে না। ধীর পায়ে ঘরের একপাশে রাখা ছোট্ট শিশুটির কাছে যায়। ঘুমন্ত শিশুটিকে অত্যন্ত সাবধানে কোলে তুলে নেয়। ক্ষুদ্র মুখখানি নিদ্রার আবেশে শান্ত, ছোট্ট আঙুলগুলো মুঠো হয়ে আছে। পৃথিবীর এত বিশাল অস্তিত্বের মাঝে সেই প্রাণটুকু কতই না ক্ষুদ্র! কিন্তু একজন মায়ের কাছে এটাই তো তার সমগ্র পৃথিবী। আয়াশ ফিরে আসে। ইনায়ার পাশে বসে প্রথমে বালিশটা একটু উঁচু করে দেয়। তারপর শিশুটাকে অত্যন্ত সাবধানে তার কোলে তুলে দেয়। ক্ষুদ্র শরীরটা নিজের বুকে স্পর্শ করতেই ইনায়া যেনো নিঃশ্বাস নিতে ভুলে গেলো। এটাই তো তার সন্তান। যে প্রাণটাকে এতদিন নিজের শরীরের ভেতর আগলে রেখেছে, আজ সে তার বুকের ওপর নিঃশব্দে শুয়ে আছে। এতদিন যার অস্তিত্ব কেবল অনুভব করেছে, আজ তাকে স্পর্শ করতে পারছে । তার ক্ষুদ্র কপাল দেখা যাচ্ছে। ছোট্ট নাক, মুঠো করা আঙুল, নিঃশব্দে ওঠানামা করা বুক, সবকিছুই যেনো অবিশ্বাস্য কোনো স্বপ্নের অংশ।ই নায়ার চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে। কিন্তু এই অশ্রু কষ্টের নয়। এ অশ্রু সেই দীর্ঘ প্রতীক্ষার, যে প্রতীক্ষা আজ পূর্ণতা পেয়েছে।

কাঁপা আঙুলে শিশুটির গাল ছুঁয়ে দিলো ইনায়া। স্পর্শটুকু এতটাই কোমল, যেনো একটু জোর হলেই তার বহু প্রতীক্ষিত পৃথিবীটা ভেঙে যাবে।

“তুমি সত্যিই আমার?”

কণ্ঠস্বরটা কান্নায় জড়িয়ে যাচ্ছে। শিশুটি ঘুমন্ত। কোনো উত্তর দিলো না। তবুও ইনায়ার মনে হচ্ছে, এই নীরবতাই যেনো পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর উত্তর।মাতৃত্ব এমনই হয়তো।
একটা প্রাণ নিজের অস্তিত্বের সঙ্গে মিশে থাকে মাসের পর মাস। তার প্রতিটি নড়াচড়া মায়ের হৃদস্পন্দন বদলে দেয়। তার জন্য দুশ্চিন্তা, তার জন্য প্রার্থনা, তার জন্য অগণিত অপেক্ষা। অথচ যখন সেই প্রাণটাই একদিন এসে বুকের ওপর আশ্রয় নেয়, তখন মনে হয় এতদিনের সমস্ত কষ্ট বুঝি এই একটা মুহূর্তের জন্যই ছিল ইনায়া শিশুটাকে আরও একটু কাছে টেনে নেয়। চোখ বন্ধ করে ক্ষুদ্র কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিলো। অশ্রুসিক্ত মুখে ফুটে ওঠে এমন এক হাসি, যার সঙ্গে পৃথিবীর কোনো সুখের তুলনা চলে না। আয়াশ নিঃশব্দে প্রতিটা মুহুর্ত উপভোগ করছে, তার মনটা ভড়প উঠছে। যেকোনো ছেলের জন্য এর চেয়ে মধুর আর কিছুই হতে পারে না।

“মা তোমার জন্য কত অপেক্ষা করেছে জানো?”

কণ্ঠস্বর ক্ষীণ।

“কতদিন ধরে শুধু তোমাকে একবার ছুঁয়ে দেখার জন্য অপেক্ষা করেছি।”

আয়াশ তাকিয়ে রয়েছে, তার নিজেকে এখন সুখী ব্যক্তি মনে হচ্ছে। তার চোখে কোনো কথা নেই। ইনায়া একবারও তাকায় না তার দিকে। অথবা হয়তো তাকাতে চায় না।
এখনো তাদের মাঝখানে জমে থাকা অভিমান পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। এত বছরের কষ্ট, এত না বলা কথা, এত দূরত্ব একটা রাতেই তো বিলীন হওয়ার নয়। তবুও আজ আয়াশের এই নীরব উপস্থিতিকে অস্বীকার করার মতো শক্তিও নেই ইনায়ার। মানুষটা কিছু চাইছে না। শুধু পাশে আছে। যেনো ইনায়া তাকে ক্ষমা করুক কিংবা না করুক, তার প্রয়োজনের মুহূর্তে সে সরে যাবে না। আয়াশ একবার শিশুটির দিকে তাকালো। তারপর ইনায়ার দিকে।চোখে অদ্ভুত এক প্রশান্তি। এই দৃশ্যটার জন্যই হয়তো এতদিন অপেক্ষা করেছে সে। নিজের সন্তানকে প্রথমবার মায়ের বুকে নিশ্চিন্তে শুয়ে থাকতে দেখা, আর সেই মায়ের ক্লান্ত মুখে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর পূর্ণতার হাসি দেখা। ইনায়া শিশুটির ক্ষুদ্র হাতটা নিজের আঙুলের মধ্যে নিয়ে ফিসফিস করে বলে-

“অবশেষে মায়ের বুকে এসে গেলে তুমি। মা তোমাকে ছুঁয়ে দেখার জন্য কত আপেক্ষা করেছি। মাই স্ট্রং বয়! মা সবসময় তোমাকে আগলে রাখবো। মায়ের স্ট্রং বয় হবে কেমন?”

কথাটা বলতে গিয়েই তার চোখ আবারও ভিজে ওঠলো।
আর ঠিক তখনই আয়াশ খুব নিঃশব্দে উঠে এসে তার মাথার পাশে রাখা পানির গ্লাসটা এগিয়ে দিলো। কোনো কথা বললো না,ইনায়াও কিছু বলে না। শুধু এক মুহূর্তের জন্য দুজনের চোখাচোখি হয়। সেই দৃষ্টিতে কিছুটা একটা ছিলো।
অপূর্ণতার দীর্ঘ ইতিহাস পেরিয়ে পাওয়া এক ক্ষুদ্র পূর্ণতা।
একজন মা,একজন বাবা। আর তাদের মাঝখানে ঘুমিয়ে থাকা ছোট্ট এক পৃথিবী।

#চলবে