চাঁদ উজাড় পূর্ণিমা পর্ব-০৬

0
667

#চাঁদ_উজাড়_পূর্ণিমা💚🦋

#পর্ব_০৬

#লেখক_ঈশান_আহমেদ

আরশ তার রুমে এসে দরজা লক করে বসে আছে।রাগে তার সারা শরীর কাঁপছে।চোখ-মুখ লাল বর্ণ ধারণ করেছে।

“এতোটা খারাপ তুমি রাইতা?আমি কি দেখে তোমাকে ভালোবাসে ছিলাম।ছিঃ আমার এখন নিজের প্রতিই ঘৃণা হচ্ছে।”

হঠাৎ আরশের রুমের দরজায় কেউ টোকা দিলো।আরশ চোখ-মুখ মুছে দরজা খুলে দেখলো অয়ন সাহেব দাঁড়িয়ে আছে।আরশ অয়ন সাহেবকে দেখে মাথা নিচু করে ফেললো।

“আরশ আমি জানি তুমি এমন কিছু করতে পারো নাহ্।আর মিথির জ্বর আসলে কোনো হুশ থাকে নাহ্।যা আমরা ভালো করে জানি।আর মন থেকে সায় না দিলে বিয়েটা করো নাহ্।”

আরশ নিজেকে স্বাভাবিক করে বললো,

“আঙ্কেল একটা মেয়ের চরিত্রে দাগ লাগলে বিষয়টা অনেক বড়।আমি যদি আজ সত্যি কিছু করতাম তাহলে আমাকে কেউ কিছু বলতো নাহ্।সবাই মৌকেই উল্টাপাল্টা বলতো।আর মৌকে বিয়ে করতে আমার কোনো আপত্তি নেই।তবে আমার তো মনে হয় আমাকে নিয়ে আপনাদের সমস্যা হওয়ার কথা।কারণ আমার আগে একটা বিয়ে আছে।”

“বাবা তুমি যে কতটা ভালো ছেলে তা আমি ভালো করে জানি।আর ডিভোর্স তো তুমি দেওনি ওই মেয়েটা দিয়েছে।তাহলে তো তোমার কোনো দোষ নেই এখানে।”

আরশ চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে।অয়ন সাহেব আরশের কাঁধে হাত দিয়ে তার রুম থেকে চলে গেলো।

/🦋/

মৌ চোখ খুলে দেখে অনেকে তার চারিপাশে দাঁড়িয়ে আছে।মৌ চশমাটা চোখে পড়ে আস্তে করে উঠে বসলো।মিতা বেগমকে উদ্দেশ্য করে বললো,

“আমার কি হয়ে ছিলো আম্মু?”

“তোর অনেক জ্বর এসেছিলো।যার কারণে জ্ঞান হারিয়ে ছিলি আর ডাক্তার এসে ঔষধ দেওয়া পরে এই তোর জ্ঞান আসলো।”

মৌ মাথায় হাত দিয়ে বললো,

“ওফ!মাথাটা ঝিমঝিম করছে।”

পাশে থেকে একটা মহিলা বললো,

“মিতা ভাবি খালি তো বললেন জ্বরের কথা।আমিন সাহেবের ছেলে কি করছে সেটা তো বলেন!”

মিতা বেগম বিরক্তি নিয়ে বললো,

“আহ্ ভাবি চুপ করুন।এইসব কথা বাদ দিন।”

মৌ মহিলাটার মুখের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে।মিতা বেগমকে বললো,

“আম্মু উনি কি বলছেন?”

মিতা বেগম মৃদু হেসে বললেন,

“কিছু না মা।উনি এমনি বলেছেন।”

আরেকজন মহিলা বললো,

“যা কুকর্ম করেছো দুজনে আবার ভালো সাজছো!যাক আমরা আর কি বলবো একটু পরে তো বিয়েই হবে।”

মৌ অবাক হয়ে বললো,

“বিয়ে?কার বিয়ে আম্মু?”

মিতা বেগম কিছু না বলে উঠে নিপা বেগমের পাশে গিয়ে দাঁড়ালো।অয়ন সাহেব রুমে প্রবেশ করে বললো,

“এখানে তো কোনো অনুষ্ঠান চলছে নাহ্।আপনারা এই রুমটা ফাঁকা করুন।”

অয়ন সাহেবের কথায় একেক জন একেক রকম কথা বলে চলে গেলো।সবাই রুম থেকে বের হয়ে চলে গেলো।মিতা বেগম আর নিপা বেগম কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে অয়ন সাহেবের সাথে বের হয়ে চলে গেলো।এখন রুমে শুধুমাত্র মৌ আর দিথি রয়েছে।

“দিথু তুই বল তো কার বিয়ে?”

“তোর আর আরশ ভাইয়ার।”

মৌ উচ্চস্বরে বললো,

“কি?”

দিথি দীর্ঘশ্বাস ফেলে মৌকে সবটা বললো।মৌ সবটা শুনে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললো,

“ইশ!উনি আমার জন্য মানুষের এতোগুলো কথা শুনলো।”

“কথা তো তোকেও শুনিয়েছে মৌ।”

“দেখ আমি যদি উনার গায়ে ঢলে না পড়তাম তাহলে তো আর উনাকে কেউ কিছু বলতো নাহ্ প্লাস আমাকেও না।সো আসল দোষ আমারই।”

“তুই কি বিয়েটায় রাজি?”

“অমত হওয়ার কি কোনো কারণ আছে!”

মৌয়ের কথায় দিথি মুচকি হেসে বললো,

“আমার তো মনে হচ্ছে তুই আরশ ভাইয়ার প্রেমে পড়েছিস।”

মৌ দিথি কথা শুনে চোখ রাঙিয়ে বললো,

“আমি তোর মতো লুচু নাহ্।”

“হ্যাঁ আপনি তো অনেক ভালো।”

“জ্বি আমি ওটাই।”

“আচ্ছা শোন আরশ ভাইয়াকে কষ্ট দিস না।কারণ রাইতা আপুর সাথে ডিভোর্স হওয়ার পরে অনেক আপসেট থাকেন উনি।”

মৌ নাক ঘষে বললো,

“তাহলে তুই গিয়েই বিয়ে কর।তোর যখন এতো দরদ।”

দিথি হাসি দিয়ে মৌকে জড়িয়ে ধরে বললো,

“বান্দরনী।”

/🌸\

রাইতা তার রুমে এসে চুপ করে বসে আছে।আরশ যে এমন সিদ্ধান্ত নিবে সে কখনো ভাবেনি।সে চেয়েছিলো আরশ জেনো অপমানিত হয় সবার সামনে।অপমানিত হয়েছে ঠিকই কিন্তু এমন একটা কথা বললো।

“আরশ আমাকে একটুও ভালোবাসতো নাহ্।নাহলে ও কি করে ওই মেয়েকে বিয়ে করতে চায়!”

রাজ ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে রাইতার কথাটা শুনতে পারলো।রাজ রাইতার সামনে এসে বললো,

“তুমি যেভাবে আমাকে বিয়ে করেছো ঠিক সেইভাবেই আরশও মৌকে বিয়ে করবে।”

রাইতা রাজের কথায় চমকে যায়।তার চোখের কোণে জমে থাকা পানিটা মুছে ফেলে।

“তুমি কি কাঁদতেছিলে রাই?”

“ধূর আমি কেনো ওই অসভ্যটার জন্য কাঁদবো!”

রাইতা বিছানা থেকে নেমে ওয়াশরুমে চলে গেলো।

—|🌿|—

কাজী বিয়ে পড়াচ্ছে।আরশ চুপচাপ বসে আছে।মৌ ঠিকভাবে বসতে পারছে নাহ্।তাই সে বালিশে হেলান দিয়ে আছে।তবে তার চোখ আরশের দিকে।আরশের মুখ দেখে মনে হচ্ছে সে অনেক দুশ্চিন্তায় আছে।

আরশ আর মৌয়ের বিয়েটা হয়ে গেলো।আরশ আর এক মুহূর্ত দেরি না করে রুম থেকে বের হয়ে চলে গেলো।আরশ হোটেলের ছাদে দাঁড়িয়ে আছে।তার চোখ দিয়ে দু-এক ফোঁটা জল পড়ছে।

“রাইতা তোমার জায়গা আমি অন্য একজনকে কিভাবে দিবো তা আমি জানি না।তবে মৌ এখন আমার স্ত্রী।ও-কে আমি কখনোই ছেড়ে যাবো নাহ্।ওর বিপদে-আপদে,সুখ-দুঃখে সবসময় ওর পাশে থাকবো ওর ছায়া হয়ে।”

আরশ কথাগুলো বলে দীর্ঘশ্বাস ফেলে হোটেলের রুমের দিকে গেলো।রুমের সামনে যেতেই রাইতার মুখোমুখি হলো।আরশ রাইতাকে দেখে সাইড কেটে চলে যেতে গেলে রাইতা তার সামনে এসে দাঁড়ালো।

“তা মি.আরশ আহমেদ বিয়েটা করেই ফেললে তাহলে!”

আরশ ভ্রু কুচকে বললো,

“তা তুমি চলে গেছো বলে কি আমি দেবদাস হয়ে ঘুরবো?”

“বাহ্ ভালোই তো কথা শিখেছো।”

আরশ তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বললো,

“এইসব কথা শিখতে হয় না।কিছু অতীত মানুষকে চরম শিক্ষা দিয়ে দেয়।জানি সে দ্বিতীয়বার তার ভদ্রতা দেখিয়ে আর বোকা না হয়।”

“হ্যাঁ দেখো নাহ্ তোমার নতুন বউ কতোদিন টিকে।”

“রাইতা একটা কথা বলি শোনো।নিজের চরকায় তেল দেও।শিশপ্রিয়া যদি আমাকে ছেড়ে চলেও যায় আমি তাতে কিছু মনে করবো নাহ্।কারণ আমাদের বিয়েটা যেই পরিস্থিতিতে হয়েছে তাতে ওর এমনটা করা স্বাভাবিক।কিন্তু তুমি…….”

আরশ এইটুকু বলে থেমে গেলো।আরশ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো,

“এইসব কথা তোমাকে বলে লাভ নেই।তুমি বুঝবে নাহ্।”

আরশ রাইতার সামনে থেকে তার রুমে চলে গেলো।রাইতা আরশের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে আছে।

“আরশ তুমি এতোটা পাল্টে গেলে।”

||🌼||

মৌ দিথির হাত ধরে বসে আছে।

“দিথু আরশ আহমেদ কে আমি কি বলবো?”

“তোর জামাই।তোর যা ইচ্ছা তাই বলবি।”

“নাম ধরেই ডাকি।”

“হুম ডাকতে পারিস।”

“আচ্ছা উনি বিয়ে শেষ হতেই ওমন উঠে চলে গেলো কেনো?”

“আমার কোনো আইডিয়া নেই।বলতে পারছি নাহ্।”

“মেইবি আপসেট।”

“কিরে মৌ বিয়ে হতে না হতেই বরের প্রতি এতো টেককেয়ার?”

“আচ্ছা তোকে একটা সত্যি কথা বলি।”

“মৌ তুই আবার আমাকে মিথ্যা কথাও বলিস!”

“একটা জিনিস তোকে বলা হয়নি।”

“আচ্ছা বল।”

“আমি যেদিন আরশকে ফাস্ট দেখেছিলাম সেদিনই ও-কে আমার ভালো লেগেছিলো।বাট ওর সাথে প্রথম থেকে শুধু আমার ঝগড়াই হচ্ছে।তবে আজ যখন শুনলাম ওর ডিভোর্স হয়ে গেছে দ্যান একটু খারাপ লেগেছিলো।তবে পরে আবার ভেবে দেখলাম এতে তো ওর দোষ নেই।সো ও-কে ভালোবাসাই যায়।”

মৌ কথাগুলো বলে মাথা নিচু করে মুচকি মুচকি হাসছে।

“আরে বাব্বাহ্!এতো কিছু ঘটে গেছে আর আমি জানি না।”

“তোকে বলার সুযোগ পাইনি।”

“আচ্ছা মৌ তুই এখন একটু রেস্ট নে।ডক্টর অনেক পাওয়ারের ঔষধ দিয়েছে।”

“ওকে।”

মৌ বিছানায় শুয়ে পড়লো।দিথি হাসি দিয়ে রুম থেকে বের হয়ে চলে গেলো।মৌ শুয়ে শুয়ে ভাবছে।

“আরশ কি আমাকে মেনে নিতে পারবে?সমস্যা নেই আমিই পটিয়ে ফেলবো।”

মৌ কথাগুলো বলে হেসে দিলো।তারপরে আস্তে করে চোখ বন্ধ করলো।

––🌿––

আরশ আমেনা বেগমের কোলে মাথা দিয়ে শুয়ে আছে।আর আমেনা বেগম তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে।

“দিদুন তুমিও কি আমাকে অবিশ্বাস করো?”

“কি কস এডি তুই!মুই তোরে কহনোই অবিশ্বাস করতে পারুম না।আমি জানি আমার নাতিন অনেক ভালা।আর একটা জিনিস জানোস মুই না অনেক খুশি।মোর কাছে ওই কি জানি নাম হয় মৌ।মোর নতুন নাতবউ রে অনেক ভালা লাগছে।”

আরশ উঠে বসে আমেনা বেগমের দিকে তাকিয়ে আছে।

“আরে দিদুন তুমি অনেক কিছুই জানো নাহ্।ওই মেয়ে নাম্বার ওয়ান সাইকো।”

“সাইকো কিতা?”

আরশ হাসি দিয়ে বললো,

“মানে পাগল আরকি।”

“চুপ।একদম মোর নাতবউরে কিছু কবিনা কইলাম।”

“ওরে বাবা!প্রথম দিনই এই অবস্থা।পরে কি করবে আল্লাহ জানে।”

“আর হুন ওই রিয়া নামের মাইয়ার তে দূরে থাকবি।ওর চোখ ভালা নাহ্।”

আমেনা বেগমের কথা শুনে আরশ জোরে হেসে দিলো।

“আইচ্ছা আমার বুড়ি ডার্লিং।”

আরশ আমেনা বেগমকে জড়িয়ে ধরলো।

#চলবে………………………….

[ভূল-ভ্রান্তি ক্ষমার চোখে দেখবেন।]