#চিরদিনই_তুমি_যে_আমার
#নূরা_ফাতেহা
||১১||
ফ্রেশ হয়ে বসে আছে তারীন। কি করবে বুঝতে পারচ্ছে না। এই বাড়ির সকলের সাথে তার এখনো তেমন মিলন বদ্ধন তৈরি হয়নি কাছে থেকেও দূরে এইরকম এক অবস্থা এর মধ্যে ফুফু রোকসানা কফি হাতে রুমে ঢুকলেন নিচে রান্না কাজ করচ্ছে কাজের খালারা।
—”কি করচ্ছো মা তারীন?”
—”কিছুনা, ফুফু এতো বসে আছি।”
—”নেও কফি খাও। আমি নিজে বানিয়ে নিয়ে এসেছি৷”
তারীন হাত বাড়িয়ে কফিটা নিলো। রোকসানা চৌধুরী বিছানায় বসে কফি মগে চুমুক দিলেন৷ অতঃপর মুখের কফিটা শেষ করে তিনি বললেন,
—”কি এতো একা ঘরে বসে থাকো? একটু নিচে যাবে আমাদের সাথে গল্প করবে,বাগানে হাঁটবে, বই পড়বে তবেই না মনটা ভালো লাগবে।”
তারীন চুপ করে শুনল। কফির মগে চুমুক দিলো নীরবে। তিনি ফের বললেন,
—”বিয়ে, জন্ম, মৃত্যু এইগুলো না, মানুষের হাতে না ওই গুলো সব আল্লাহ্ নির্ধারণ করেন মা! প্রতিটা মানুষকে তিনি জোড়া জোড়া পাঠান। তোমার জোড়া আমাদের ছেলেটা। সম্পর্ক ভাঙতে চাইলে ভাঙতে এক সেকেন্ড ও লাগে না মা। আর গড়তে কিন্তু অনেক সময় লাগে। নিজের স্বামী সংসারকে ভালোবাসো মা। মেয়েদের জীবনে স্বামী-সংসার, বাচ্চা-কাচ্ছা অধিক গুরুত্বপূর্ণ। নিজের স্বামী ব্যধীত অন্য কোনো পুরুষকে মনে ঠাঁই দেওয়া ও পাপ।”
—”জ্বি আমি চেষ্টা করবো।”
—”কাল তোমাকে তোমার মা-বাবা নিতে আসবে। কয়টা দিন ঘুরে আসো ভালো লাগবে।”
—”জ্বি।”
এমন সময় ঘরে থাকা টেলিফোনটা বেজে উঠল শব্দ করে। তারীন টেলিফোনের সামনেই ছিলো তাই ফুফু ধরার আগে সে ফোনটা তুলে কানে ধরে বলল,
—”হ্যালো কে বলছেন?”
—”আমি তোমার স্বামী বলছি।”
‘আমি তোমার স্বামী বলছি’ কথাটা কানে যেতেই কেমন লজ্জাগুলো ঘিরে ধরল তাকে। সে আলতো করে বলে উঠল,
—”ও আপনি! পৌঁছে গেছেন?”
—”হুম অনেকক্ষণ আগে পৌঁছেছি। কি করচ্ছো?”
—”এইতো ফুফুর সাথে কথা বলছি।”
—”ও!”
রোকসানা চৌধুরী যেই বুঝলেন আযরাফ কল করেছে, তখনি ওনি চলে গেলেন৷ ঘরের ভিতরে তারীন আর কানে ধরা ফোন যার ওপাশে আছে প্রফেসর। দুইজনই কেমন চুপ করে আছে। শুধু শ্বাসপ্রশ্বাসের শব্দ শুনা যাচ্ছে।
নীরবতা ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়ে আযরাফ বলল,
—”ফুফু চলে গেছে?”
তারীন বলল,
— “হুম।”
— “কেন গেল?”
— “জানি না।”
— “আমি ফোন করেছি বলে চলে গেছে। বুদ্ধিমতী মহিলা। বুঝতে পেরেছেন যে স্বামী-স্ত্রীর কথা শোনা উচিত না।”
তারীন লজ্জা পেল। এই লোকটা সবসময় এমন করে কথা বলে। সরাসরি স্বামী-স্ত্রী বলে দেয়। তার মুখ লাল হয়ে যায়।
— “কি করছো এখন?”
— “কফি খাচ্ছি।”
— “ফুপুর বানানো কফি?”
— “হ্যাঁ। আপনি কি করে জানলেন?”
— “আমি সব জানি। ফুপু যখন কফি বানায়, তখন কফিতে এলাচ দেয়। তোমার কফিতে কি এলাচের গন্ধ আছে?”
তারীন কফিতে চুমুক দিয়ে দেখল। সত্যিই এলাচের গন্ধ।
— “হ্যাঁ, আছে।”
— “আমি বলেছিলাম না, আমি সব জানি।”
তারীন চুপ করে রইল। ফোনের ওপাশে আযরাফ চুপ করে আছে। তারপর খুব আস্তে বলল,
— “তারীন।”
— “হুম?”
— “তোমাকে একটা কথা বলি?”
— “বলুন।”
— “আমাকে মিস করছো?”
তারীন থমকে গেল। ফোনটা কানে ধরে রেখেছে, কিন্তু উত্তর দিচ্ছে না। তার বুকের ভেতর ধকধক করছে। এই প্রশ্নের উত্তর কি দেবে সে? হ্যাঁ বলবে? না বলবে? হ্যাঁ বললে লোকটা কি ভাববে?
আযরাফ বলল,
— “চুপ করে আছো কেন? উত্তরটা কি এত কঠিন?”
তারীন বলল,
— “আমি..আমি জানি না।”
আযরাফ হাসল। ফোনের ওপাশ থেকে তার হাসির শব্দ শোনা গেল।
— “জানো না মানে মিস করছো। মানুষ যখন কাউকে মিস করে, তখন সরাসরি বলতে পারে না। তাই সে বলে, জানি না।”
— “আপনি সব জানেন তাই না?”
— “হুম। জানি।”
আযরাফের কথা শেষ হতেই ওপাশে আবার একটা দীর্ঘ নীরবতা এসে ভর করল। তারীন রিসিভারটা কানে চেপে ধরে রইল। তার হাত কিছুটা ঘামছে। বাইরে থেকে একটা হালকা ঝোড়ো বাতাস জানালার রেশমি পর্দাটা উড়িয়ে দিয়ে গেল।
ফোন লাইনের ওপাশ থেকে আযরাফ খুব নিচু, ভারী স্বরে বলল,
— “শোনো শ্রাবণকন্যা।”
— “বলুন।”
— “আমি আজ রাতে বাড়ি ফিরছি না। ডিপার্টমেন্টের কাজে কয়েকজন কলিগ সহ সাভারে একটা সেমিনারে থাকতে হচ্ছে। ফিরতে ফিরতে কাল বিকেল।”
তারীনের বুকের ভিতরটা আচমকা যেন একটু খালি হয়ে গেল। সে ভাবতেও পারেনি এই কথাটা শুনে তার এতটা অচেনা লাগবে। কাল সকালেই তো সে বাবার বাড়ি চলে যাবে। তার মানে, যাওয়ার আগে লোকটার সাথে আর দেখা হচ্ছে না?
তারীন নিজের অজান্তেই খুব ছোট করে বলে ফেলল,
— “কাল বিকেলে? কিন্তু কাল দুপুরে তো আব্বু আমাকে নিতে আসবেন।”
লাইনের ওপাশে আযরাফ কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল। অতঃপর বলল,
— “হুমায়ূন আহমেদের বইয়ে পড়া একটা কথা মনে পড়ছে তারীন। কিছু দেখা না হওয়া নাকি খুব ভালো। অসম্পূর্ণ দেখা মানুষকে সারা জীবন তাড়িয়ে বেড়ায়। তুমি যখন বাপের বাড়ি গিয়ে জানালার পাশে বসবে, তখন তোমার মনে হবে লোকটার সাথে দেখা হয়ে গেলে কেমন হতো?”
— “আপনি আবার শুরু করলেন? সব কথাতেই এত পেঁচান কেন?”
— “পেঁচাই না পাখি, সত্যিটা বলি। তুমি আমাকে মিস করবে। ভীষণভাবে মিস করবে। কিন্তু তোমার অহংকার তোমাকে তা স্বীকার করতে দেবে না।”
— “আমি মোটেই মিস করব না! একদম না।”
আযরাফ হালকা একটা হাসি দিল। সেই হাসির শব্দে তারীনের কান ঝাঁঝাঁ করে উঠল। আযরাফ বলল,
— “ঠিক আছে, মিস কোরো না। এখন গিয়ে কফিটা শেষ করো, ঠান্ডা হয়ে জল হয়ে গেছে। আর শোনো?”
— “কী?”
— “রাতে জানালার পর্দা টেনে ঘুমাবে। কালকের মতো যেন আবার ধুম জ্বর তুলে বসে থেকো না। তোমাকে সামলানোর জন্য সেখানে তোমার এই অত্যাচারী স্বামী থাকবে না।”
কথাটা শেষ করেই আযরাফ লাইনটা কেটে দিল। ‘টু-টু’ শব্দ হতে লাগল টেলিফোনে।
তারীন কিছুক্ষণ রিসিভারটার দিকে বোকার মতো তাকিয়ে রইল। অদ্ভুত লোক! একদম কাঠখোট্টা, অথচ কথা বলার ধরন এমন যে মাথার ভেতর সারাক্ষণ ঘুরঘুর করতে থাকে। সে রিসিভারটা নামিয়ে রেখে কফির মগটা হাতে নিল। কফি সত্যিই একবারে ঠান্ডা হয়ে গেছে। ঘরের ভেতর অন্ধকার নেমে আসছে। বাইরের আকাশে আবার মেঘ জমেছে। বৃষ্টির দিনগুলো বড় বিষাদের হয়। মানুষের মনকে অযথা উদাস করে দেয়।
তারীন বিছানায় এসে বসল। তার চোখ গেল ঘরের কোণে রাখা আযরাফের পড়ার টেবিলটার দিকে। টেবিলে গাদা গাদা মোটা মোটা ইংরেজি বই, একটা চশমার কেস আর ডায়েরি। তারীন ধীরপায়ে টেবিলটার কাছে এগিয়ে গেল।
একটা নেভি ব্লু রঙের ডায়েরি আধখোলা হয়ে পড়ে আছে। তারীন দ্বিধা নিয়ে হাত বাড়াল। কারও ডায়েরি পড়া চরম অন্যায়, কিন্তু এই লোকটা তো তার স্বামী! তাছাড়া লোকটা তো তাকে নিয়ে হাজারটা খেলা খেলছে, একটু জানা কি খুব দোষের?
তারীন পাতা ওল্টাল। ডায়েরির প্রথম পাতাতেই খুব সুন্দর, স্পষ্ট অক্ষরে লেখা,
❝ শ্রাবণকন্যা,
মানুষের জীবনে কিছু মানুষ থাকে, যাদের কাছে পাওয়াটা ভাগ্য, আর না পাওয়াটা বেঁচে থাকার এক অদ্ভুত যন্ত্রণা। তোকে প্রথম যেদিন ভিজতে দেখেছিলাম, সেদিনই বুঝেছিলাম এই মেয়েটা আমার শান্ত জীবনে কালবৈশাখী ঝড় হয়ে এসেছে। তোকে পাওয়ার জন্য আমি স্বর্গ-মর্ত্য এক করে ফেলতে পারি। তুই আমাকে ঘৃণা কর পাখি, কিন্তু আমার কাছ থেকে দূরে যাস না। কারণ আযরাফ চৌধুরী তোর দেওয়া বি’ষও হাসিমুখে পান করতে পারে, কিন্তু তোর অনুপস্থিতি সহ্য করতে পারবে না।❞
লেখাটি পড়ে তারীনের গায়ের লোম খাড়া হয়ে গেল। বুকের ভেতরটা তীব্র আলোড়নে কেঁপে উঠল। চিরকুটের নিচে তারিখ দেওয়া ঠিক এক বছর আগের।
তারীন স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। এক বছর আগে? যখন সে আযরাফ চৌধুরীকে ভালো করে চিনতও না? তখন থেকেই এই লোকটা তাকে এভাবে ছায়ার মতো অনুসরণ করে এসেছে?
হঠাৎ দরজায় হালকা শব্দ হলো। তারীন দ্রুত ডায়েরিটা গুছিয়ে রাখল। অতঃপর নিজেকে স্বাভাবিক করে বলল,
—”কে?”
—”আমি তোমার ফুফুআম্মা। নিচে আসো মা। আমি এখনি খাবার দিবো।”
তারীন দ্রুত ভিরানো দরজাটা টেনে খুলে বলল,
—”আব্বা আসবেন না ওনি এলেই না হয় খাবো?”
—”ওমা ভাইজানের আসতে দিরে হবে। এসো খেয়ে নিবে।”
চলবে,,

