জলে ভাসা পদ্ম পর্ব-০১

0
1175

#জলে_ভাসা_পদ্ম
#রেহানা_পুতুল
#পর্বঃ১

জ্ঞান ফেরার পর পদ্ম নিজেকে দেখতে পায় বন্ধ একটি রুমে। রুমে সে ছাড়া দ্বিতীয় কেউই নেই। সে টলতে টলতে দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। অনেক টানাটানি করেও ভিতর থেকে দরজা খোলা সম্ভব হলোনা। বাইরে থেকে তালা দেওয়া। সে আবার গিয়ে মেঝেতে বসে পড়ে। কাঁদতে থাকে হাউমাউ করে।

বেশকিছু সময় পরে দরজা খোলার শব্দ হলো। সে উঠে দাঁড়ায়। প্রদ্বীপের মতো নিবু নিবু চোখে চেয়ে দেখে তিনজন পুরুষ দাঁড়িয়ে তার সামনে।

তারা কোথায় যেন ফোন দিয়ে বলছে,
বস মাল বুঝে পেয়েছি। না কোন সমস্যা হয়নি। নগদ টাকার কারবার হেরফের হবে কিভাবে বস? ঠিকাছে পিচ্চিটাকে নিয়ে গেলাম আমরা।

শুনে পদ্ম ঠকঠক করে কাঁপতে থাকে। আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন আপনারা? কে আপনারা? আমি এখানে কিভাবে এলাম? আধভাঙ্গা গলায় জিজ্ঞেস করে পদ্ম।

তাদের একজন বলে,আমরা এতকিছু জানিনা। আমাদের কাজ শুধু তোমাকে নিয়ে একজনের হাতে তুলে দেওয়া। সে মনে হয় তোমাকে বিদেশে পাচার করে দিবে।

পদ্ম ওমাগো… বলে তাদের পা জড়িয়ে ধরে। আমাকে ছেড়ে দেন। আমি চলে যাবো।

তোমাকে ছেড়ে দিলে আমাদের চাকরি খতম। আমরা কিভাবে চলব?

এই জঘন্য পেশা আপনাদের? নিদোর্ষ মানুষকে ধরে ধরে বিদেশে পাচার করা?

পাশ থেকে একজন বলে উঠলো। তোমাকে পাচার করবেনা। ও ভয় লাগাচ্ছে। তুমি আরামেই থাকবে।

কি বলেন কিছুই বুঝতেছিনা আমি।

চলো বলে পদ্ম’র হাত ধরে টেনে তোলে তারা। পদ্মকে নিয়ে এক অফিসে চলে গেলো তারা। সেখানে দু একজন লোক আনাগোনা করছে।

স্যার নিয়ে আসছি মেয়েটারে। চেয়ার ঘুরিয়ে সামনে ফিরলো একজন মাঝবয়েসী লোক।
ওদেরকে বলল, ঠিক আছে। তোমাদের আর কোন কাজ নেই। আসতে পারো তোমরা।

পদ্ম এক পৃথিবী ঘৃণা নিয়ে চেয়ারে বসে থাকা লোকটির দিকে চায়। লোকটিও তার দিকে তাকাতেই সে মাথা নামিয়ে ফেলে।
এই মেয়ে তোমার নাম কি?

জ্বি পদ্ম আমার নাম।

মাশাল্লাহ সুন্দর নাম। কে রেখেছে?

পদ্ম মনে মনে উচ্চারণ করে, ব্যাটা আজরাইল। তোর এতকিছুর দরকার আছে?

তোমার ক্ষুধা লেগেছে নিশ্চয়ই। কি খাবে ভাত,পোলাউ,খিচুড়ি,তেহারি না অন্যকিছু?

পদ্ম’র পেট ক্ষুধায় ছোঁ ছোঁ করছে। বলল,ভাত খাবো।

লোকটি তার অফিসের পিয়নকে দিয়ে ভাত মাছ মুরগী ডাল আনালো। তাকে বলল,মেয়েটিকে ভিতরে নিয়ে যত্ন করে খাওয়াও।
পিয়ন লোকটি পদ্মকে ডেকে নিলো অফিসের পিছনের রুমে। যত্ন করে ভাত বেড়ে দিলো প্লেটে। অফিসে ভাত খাওয়ার সরঞ্জামাদি মজুদ থাকে সবসময়।

পদ্ম পেট পুরে খেলো। পিয়নকে ফিসফিসিয়ে জিজ্ঞেস করে, আপনার নাম কি?
জ্বি রতন।
রতন ভাই আমার একটা উপকার করবেন?
কিইই?
এই অফিস থেকে লুকিয়ে বের করে দিতে পারবেন আমাকে? বকশিস দিব আপনাকে?

মাথা চুলকাতে চুলকাতে রতন জানায়, ভাগবেন কেন আপামনি? আপনিতো স্যারের অতিথি।

পদ্ম নিরীহ গলায় বলে, না রতন ভাই। আমাকে কিডন্যাপ করেছে আপনার স্যার। উনি খুব খারাপ। নাম কি তার?
রতন জানায়। স্যারের নাম আমিনুল হক। আর আপনি কি বলছেন। স্যার খুব ভালো মনের মানুষ। আপনি কোথাও ভুল করছেন আপামনি।

দূর। বাদ দেন। যেদিন আমার মতো আপনাকেও বেচে দিবে অন্যলোকের হাতে সেদিন বুঝবেন আপনার ষাঁড় কতটা ভালো মনের।

আপা আমিতো এই স্যারের অফিসে পিয়ন পদে আছি দশ বছর ধরে। কখনো মন্দ চালচলন নজরে পড়েনি।
রতনের ডাক পড়লে সে সামনে চলে যায়। পদ্ম সেই রুমেই মেঝেতে বসে থাকে দেয়ালে হেলান দিয়ে। অনেক সময় পরে পচন্ড ক্ষুধা নিয়ে ভাত খেয়েছে। তাই এখন পুরো শরীর ছেড়ে দিয়েছে। ঝিমোতে থাকে সে। ঝিমোতে ঝিমোতে ঘুমিয়ে পড়ে।

পদ্ম স্বপ্ন দেখে ঘুমের ঘোরে। বাবার হাত ধরে মেলায় যাচ্ছে। মেলায় গিয়ে বাবা তাকে পুতুল,খেলনা,বেলুন,তালপাতার বাঁশী, ম্যাজিক ঘড়ি কিনে দিয়েছে। সেগুলো নিয়ে তিড়িংবিড়িং করে লাফাতে লাফাতে বাড়ি চলে এলো। পরী আর পিহু তার পিছনে ঘুরঘুর করতো সেগুলো দিয়ে খেলতে দেওয়ার জন্য। ওরা খেলার নামে সব ভেঙ্গে ফেলে। তবুও পদ্ম বোনদের দিতো। আদরের ছোট দুবোন সারাদিন পদ্ম’র পায়ে পায়ে চলতো। ওরা পদ্মবু পদ্মবু বলে ডাকছে।

পদ্ম’র ঘুম ছুটে যায়। ভয়ে উৎকন্ঠায় গলা শুকিয়ে চৈত্রের ফাটা মাঠ হয়ে যাচ্ছে। বিডবিড়িয়ে বলতে থাকে আমার পরী,আমার পিহু,আমার মা আমাকে খুঁজে মরছে নাকি? আর বাবা? বাবাওতো খুঁজছে। কিন্তু অন্য মতলবে।

পদ্মকে ডেকে সামনে নেয় রতন। পদ্ম গুটি গুটি পাটে হেঁটে যায়। নরম সোফায় বসে আমিনুলের ইশারায়। আন্তরিকতার সাথে জিজ্ঞেস করে,
পদ্ম তুমি একা কোথায় যাচ্ছিলে? কোথায় তোমার বাড়ি? তোমার মা বাবা আপনজন বলতে কেউ নেই?

পদ্ম শুনে যায়। কিছুই বলতে পারেনা।
আমিনুল বলে তোমাকে দেখার পর আমার মেয়ের কথা খুব মনে পড়ছে। আজ বেঁচে থাকলে তোমার বয়েসী হতো।

পদ্ম ভেবে পায়না। তাহলে আমাকে ওই ঘরটাতে বন্ধী করলো কে বা কারা? ইনি আসলেই সুন্দর মনের মানুষ।

একটু পর কাচের দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকলো এক যুবক। আমিনুল তাকে দেখেই, হ্যাঁ নওশাদ আসো। ও সেই মেয়েটি। নাম পদ্ম। ভাত খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলো। তুমি ফোন দেওয়ার পরেই রতন ডেকে আনলো।

পদ্ম’র মনে আবার এক পাহাড ঘৃণা জমা হয় আমিনুলের জন্য। এইই তাহলে ভালো মানুষের মুখোশ। এখন আরেকজনের হাতে তুলে দিচ্ছে। পদ্ম নওশাদকে দেখে ভয়ে সোফায় কাত হয়ে পড়ে যায়। শরীরের সমস্ত শক্তি নিঃশেষ হয়ে গেলেও মন তার সজাগ রয়েছে। কানপেতে আছে ওদের কথা শোনার জন্য।

আমিনুল বলছে,হায় হায় মেয়েটিতো ঘুরে পড়ে গিয়েছে মনে হয়। নওশাদ তাড়াতাড়ি নিয়ে যাও ভাই। পরে মরে টরে গেলে আমি ফেঁসে যাবো। এমনিতেই তোমার জন্য কতবড় রিস্ক নিয়ে এই মেয়েকে ম্যানেজ করলাম।

আমিনুল ভাই আপনাকে ধন্যবাদ দিয়ে ছোট করবোনা। আপনি আমার বড় উপকার করেছেন। আমি ওকে নিয়ে যাচ্ছি। পরে দেখা হবে ভাই।

এদের কথার ক, খ কিছুই পদ্মর ছোট মাথায় ঢুকলোনা। চোখ মেলেও তাকাতে পারছেনা।

রতন বলে স্যার এরে কিভাবে নিবেন? এতো মরা লতার মতো পড়ে আছে।

আমি গাড়ি নিয়ে এসেছি। ড্রাইভার অপেক্ষা করছে নিচে। এই পিচ্চিকে কোলে তুলে নেয়া মামুলি ব্যাপার। এটা শুনেই পদ্ম নড়েচড়ে উঠে বসার চেষ্টা করে। নওশাদের দিকে চেয়ে বলে ভাইয়া আমাকে কোথায় নিয়ে যাবেন আবার? আমাকে ছেড়ে দেন। চলে যাবো।

নওসাদ চোখের কোনে হাসির রেখা একেঁ বলে, আচ্ছা ঠিক আছে পদ্ম। তাই হবে। বল কোথায় যাবে? আমি দিয়ে আসবো তোমাকে।

পদ্ম মাথা নামিয়ে দূর্বল স্বরে বলে জানিনা,
এই যে দেখলে তুমি নিজেই জাননা কোথায় যাবে। তার চেয়ে আমার সাথে চল বলে পদ্মকে কোলে তুলে নিলো নওশাদ। ড্রাইভার গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছে।
পদ্মকে পিছনের সিটে বসিয়ে পাশে নওশাদ ও পাশে বসলো। পদ্ম’র বুকের ভিতর টিপটিপ করছে। জুবুথুবু হয়ে বসে আছে। ভাবছে এইলোক তাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে? তাকে কি মেরে কিডনি বের করবে নাকি? এরা কি কিডনি বেচাকেনার দলের সদস্য নাকি।

কিছুক্ষণের মধ্যেই পদ্মকে নিয়ে নওশাদ তাদের বাড়ি পৌঁছালো। তিনতলা বাড়ির দোতলায় পদ্মকে নিয়ে ঢুকলো নওশাদ। ড্রয়িংরুমে নিয়ে পদ্মকে বসালো। পদ্ম ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করলো,
ভাইয়া আমাকে দিয়ে কি করবেন আপনি? এ বাসায় আর কেউ নেই?

নওশাদ স্মিত হেসে জানালো,
তোমাকে দিয়ে অনেক কিছু করাবো। আর এ বাসায় শুধু একজন আছে। তোমার কাজ তার সাথেই।

নওশাদের হাসিকে পদ্ম’র কাছে রহস্যময় ঠেকলো। বলল,আমিতো কোন কাজ জানিনা।

কাজ করতে করতেই শিখে যাবে তুমি। শুরুতে কেউই কোন কিছু পারেনা।

পদ্ম দম ছেড়ে বুঝে নিলো, আর যাই হোক আমাকে মেরে ফেলবেনা। কেটে কিডনিও নিয়ে নিবেনা।

আমি এখন কি করবো? করুণ চোখে নওশাদের দিকে চেয়ে জিজ্ঞেস করলো।
এখন এখানে চুপটি মেরে বসে থাকো। আরাম করো। বিস্রাম নাও। নওশাদ ভিতরে চলে যায়। পদ্ম কাচের টি টেবিল থেকে গ্লাসে পানি ঢেলে নেয়। গলা তুলে ঢকঢক করে পুরো গ্লাস খালি করে ফেলে।

_______
আমার মেয়ের যদি কিছু হয়, আপনের ক্ষমা নাই কইলাম। ছোট দুইটা মেয়েও বোনেরে না দেখে সারাক্ষন কান্না করতেছে। কোথায় হারিয়ে গেলো আমার পদ্ম। কাঁদতে কাঁদতে পদ্ম’র মা তার বাবাকে বলল। তার বাবা সেলিম ক্ষোভ ও আফসোসের সুরে বলল, পদ্মকে পেলে চামড়া তুলে ফেলতাম। এতটুকুন মেয়ের হিম্মত দেখলে? কই খুঁজবো আর। সব জায়গায়তো খোঁজা শেষ হয়ে গেলো।

আচ্ছা পদ্ম শহরে চলে গেলো নাকি? সেখানে গিয়ে কোন ছেলেধরার খপ্পরে পড়নাইতো আমার পদ্ম? আজ দুইদিন হলো মেয়েটা নিখোঁজ।

দেখি কাল পত্রিকায় পদ্ম’র নিঁখোজ সংবাদ প্রকাশ করা যায় কিনা।

ভালো কথা মনে করছেন। তাই করেন।
_____
এভাবে একা কতক্ষণ আর বসে থাকা যায়। পদ্ম বিড়ালের মতো নিঃশব্দ পায়ে ড্রয়িংরুমের দরজায় গিয়ে উঁকি মারে এদিক সেদিক।

পদ্ম কি দেখছ?

পদ্ম কেঁপে উঠে। পাশে দৃষ্টি ফেলে দেখে নওশাদ। থেমে গেলো পদ্ম।

আচ্ছা বুঝেছি এদিকে আসো বলে নওশাদ হেঁটে যায় অন্যরুমের দিকে। পদ্ম ও তার পিছু পিছু হাঁটে। কোনার দিকে একটি রুমের সামনে দাঁড়ায় নওশাদ। চাপানো দরজা একটু ফাঁক করে। নওশাদ বলে রুমের ভিতরে দেখ। তুমি এর সাথে থাকবে।

পদ্ম রুমের ভিতরে বিছানার দিকে থম মেরে চেয়ে থাকে।

চলবে….