Home "ধারাবাহিক গল্প তিমিরবসান তিমিরবসান পর্ব-০২

তিমিরবসান পর্ব-০২

0
908

#তিমিরবসান(২)
#তাবাসসুম_তাজ্বওয়ারী

স্নিগ্ধা বসে আছে ড্রেসিং টেবিলের সামনে। মাত্রই ফাহাদের মা তাকে শাড়ি দিয়ে বলে গিয়েছেন তৈরি থাকতে। সে কথা মতো তৈরি হয়ে বসে আছে। স্নিগ্ধা সবসময় শালীন পোশাকে চলতেই সাচ্ছন্দ বোধ করে। সে সবসময় হিজাব পরে নয়ত মাথায় ওড়না দিয়ে পেঁচিয়ে রাখে। কিন্তু এই বাড়ির সকলে বিলাসী জীবনযাপনের সাথে আধুনিক জীবনযাপনকে পছন্দ করে যার কারণে স্নিগ্ধা হিজাব পড়বে বলায় ফাহাদের মা নাক শিটকে বেরিয়ে যায়। ফাহাদের পছন্দের মেয়ে তাই তিনি জোর দিয়ে কিছু বলতে পারছেন না। ছেলেটা ভীষণ জেদি! নিজের উপর কারো কথা শুনবে না। মেয়েটা যেমনই হোক মেয়েটাকে নিজে যত কিছুই বলুক অন্য কাউকে বলার অধিকার দেয়নি।
একটু পর রুমে ঢুকলো ফাহাদ। স্নিগ্ধাকে আগাগোড়া পর্যবেক্ষণ করে বাঁকা হেসে বললো,

– জামান বাড়ির বড় বউ, চৌধুরী আকবর জামানের এক মাত্র ছেলের বউ এবং ফাহাদ জামানের নতুন বউকে তো দারুণ লাগছে!

স্নিগ্ধার কাছে এইটা প্রশংসার চেয়েও বি’ষ বেশি মনে হচ্ছে। স্নিগ্ধাকে চুপ থাকতে দেখে ফাহাদ আবার বললো,

– তোমাদের বাড়ির ছেঁ’ড়া ফাঁ’টা কাপড় ছেড়ে এসব দামী শাড়িতে তোমাকে বেশ মানিয়েছে, তাই না?

স্নিগ্ধার ইচ্ছা করল চিৎকার করে বলতে, ‘আপনার এই দামী শাড়ির চেয়ে আমার বাবার কেনা সুতির জামাটা অনেক বেশি আরামের ছিল’ কিন্তু পারল না চুপ করে মাথা নিচু করে বসে রইলো।

– কোনো কথা বলো না কেন বউ? চুপ হয়ে গেলে যে? আগের তেজ কই গেল? আমি তো ওই তেজি মেয়েটারে বিয়ে করার জন্য পাগল হয়ছিলাম!

– কি বলবো? কিছু বলার জন্য রেখেছেন? আমি বললে সেসব সহ্য করবেন?

ফাহাদ ওর কাছে এসে দাঁড়ালো তারপর বললো,

– যাও বাদ দাও তোমার কিছু বলতে হবে না। তুমি শুধু শুনে যাও। শোনো আজ বিকালে বাবা একটা রিসেপশন এর মতো অনুষ্ঠান করবে রেডি থাকবে। কোনও নাটক করবে না। এদিক সেদিক করলে খবর আছে। তোমার ছোট ভাইটা যেন কোথায় পড়ে? ওহ হ্যাঁ! ওই যে সরকারি স্কুলটাতে না? আমার কিন্তু ক্ষমতা আছে ওখানে…

স্নিগ্ধা বুঝতে পারলো তার ভাইয়ের পড়ালেখা শেষ করে দেওয়ার ভয় দেখাচ্ছে। এই লোক পারেই শুধু হুমকি দিতে ক্ষমতা আছে কি না!

– দেখো স্নিগ্ধা, তুমি আমার মনের মতো চলবে তাহলে তোমাকে আমি রানী বানিয়ে রাখবো। আমার কথা শুনতে হবে। বাড়ির লোকদের কথা শুনবে দেখবে ওরা তোমায় প্রিন্সেস বানিয়ে রাখবে

স্নিগ্ধা সরে গিয়ে বললো,

– প্রিন্সেস হওয়ার শখ আমার কোনোদিন ছিল না। আমাকে আমার মতো থাকতে দিন!

ফাহাদ এবার তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলল,

– তোর কোনোদিন কিছু হওয়ার শখ ছিল না, কিন্তু এখন তুই আমার দখ’লে। তাই আমার যেটা পছন্দ, সেটাই হবে তোর শখ। তাড়াতাড়ি নিচে আসবি। কোনো নাটক চাই না।

বলেই গটগট পেয়ে হেঁটে বেরিয়ে গেল। স্নিগ্ধা সেদিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। তাকে যে ফাহাদ হাতের কেনা পুতুল বানিয়ে রাখতে চাইছে সেটা বেশ বুঝতে পারছে। কিন্তু এভাবে চলতে থাকবে স্নিগ্ধা থাকবে কিভাবে? এমনিতেই এই বাড়ির বাতাস তার কাছে বি’ষাক্ত মনে হয়! সে যে বাঁ’চবে না!

বিকালে জামান ভিলার বিশাল বাগানজুড়ে আলোর রোশনাই। প্রভাবশালী ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব সকলে উপস্থিত l সবাই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে সেই মেয়েটিকে দেখার জন্য, যার জন্য চৌধুরী আকবর জামানের বিগড়ে যাওয়া ছেলেটা পাগল হয়ে বিয়ে করেছে।

স্নিগ্ধা যখন সিঁড়ি দিয়ে নামছিল, তার হাত-পা কাঁপছিল। পরনে দামী সিল্কের শাড়ি, যা ফাহাদের পছন্দ অনুযায়ী কেনা কিন্তু স্নিগ্ধার জন্য ভীষণ অস্বস্থি এবং অপমানের। সিঁড়ির শেষ ধাপে ফাহাদ দাঁড়িয়ে ছিল। স্নিগ্ধা কাছে আসতেই সে সবার সামনে ওর হাতটা শক্ত করে ধরে ফেলল। স্নিগ্ধা চমকে উঠলেও ফাহাদের চোখের ইঙ্গিত বুঝে নিজেকে সামলে নিল। ফাহাদ ফিসফিস করে বলল,

– মুচকি হাসো স্নিগ্ধা!

রিসেপশনের স্টেজটা ফুলে ফুলে সাজানো। ফাহাদ ওকে এক প্রকার টেনে নিয়ে সেখানে বসাল। অতিথিরা একে একে এসে শুভেচ্ছা জানাচ্ছে। আকবর জামান তার বন্ধুদের সামনে গর্ব করে বলছেন,

– আমার ছেলের পছন্দ বলে কথা! ওর যা চাই, তা ও অর্জন করেই ছাড়ে।

কথাগুলো স্নিগ্ধার কোথাও গিয়ে যেন বিধছে!
হঠাৎ ফাহাদের এক বন্ধু এসে বলল,

– কিরে ফাহাদ তোর বউ তো মনে হচ্ছে ধার্মিক টাইপ? তা তোর লাইফস্টাইলের সাথে কি মানাবে? তুই তো আবার রাতজাগা পাখি!

সকলে একসাথে হেসে উঠলো। ফাহাদও হেসে ওর কাঁধে হাত চাপড়ে বলল,

– মানিয়ে নেওয়াটা তো আমার কাজ নয়! ওটা তো ওর কাজ। আমি মালকিন আমি ওকে যেভাবে রাখতে চাইব, ও সেভাবেই থাকবে!

স্নিগ্ধার চোখ ফেটে জল আসতে চাইছে। সবার সামনে অপমানিত হচ্ছে সে, কিন্তু প্রতিবাদ করার পথ বন্ধ। সারাটা সময় স্রেফ একটা শোপিস হয়ে মানুষের সামনে বসে থাকতে হয়েছে তাকে।
ফাহাদ সবার সামনে ওর কাঁধে হাত রেখে পোজ দিচ্ছে ছবির জন্য। বাইরের লোক ভাবছে কী রাজকীয় জোড়! কিন্তু স্নিগ্ধায় জানে…

স্টেজ থেকে নামার পর ফাহাদের মা এবং দাদি স্নিগ্ধাকে নিয়ে গেলেন ভেতরের একটা ভিআইপি লাউঞ্জে, যেখানে তাদের কিছু উচ্চবিত্ত আত্মীয়-স্বজন বসে ছিলেন। স্নিগ্ধাকে দেখেই ফাহাদের এক ফুফু নাক সিটকে বললেন,

– তা ফাহাদের মা, ছেলের জেদের কাছে তো হারলে কিন্তু মেয়েটার ব্যাকগ্রাউন্ডের কথা ভেবেছ? আমাদের স্ট্যাটাসের সাথে কি আদেও ম্যাচ করে? শুনলাম ওর বাবা নাকি একটা ছোটখাটো চাকরি করে?

ফাহাদের মা স্নিগ্ধার দিকে একটা তাচ্ছিল্যের নজর ফেলে বললেন,

– কী আর করা বোন! ফাহাদের জেদ তো জানোই। যা ধরবে তা তার চাই-ই চাই। আর ব্যাকগ্রাউন্ডের কথা বলছ? ওসব কালচার আমি নিজেই কয়েকদিনে ঠিক করে দেব। এই বাড়ির নিয়মকানুন এই মধ্যবিত্তের মেয়েকে ভালো করেই গিলিয়ে দেওয়া হবে।

তাদের সামনাসামনি অপমান স্নিগ্ধা মুখ বুজে সইছিল। ঠিক তখনই ফাহাদের এক ছেলে কাজিন একটা জুসের গ্লাস এগিয়ে দিয়ে বলল,

– ভাবী, নাও। অনেকক্ষণ তো স্টেজে বসে ছিলে, একটু ফ্রেশ হও।

স্নিগ্ধা সকলের দিকে একবার তাকিয়ে ভদ্রতার খাতিরে গ্লাসটা হাত বাড়িয়ে সেটা নিলো। গ্লাস হাতে নিতেই চোখে পড়লো একটু দূরেই দাঁড়িয়ে আছে ফাহাদ, যার চোখ এদিকেই সীমাবদ্ধ। চেহারা দেখে মনে হচ্ছে রাগে ফেটে পড়ছে! স্নিগ্ধা একটু বোঝার চেষ্টা করলো কি ভুল করেছে। মিনিটের মধ্যে ফাহাদ এসে স্নিগ্ধার হাত টেনে ধরলো। স্নিগ্ধা সকলের দিকে এক পলক তাকালো। এরা চুপ করে আছে কেন? আর এই লোকই বা টানছে কেন! ফাহাদ ওকে টেনে ওয়াশরুমের স্পেসের সামনে নিয়ে গেল। স্নিগ্ধা হাত ছাড়তে চেয়ে বললো,

– কি সমস্যা? সবার সামনে এমন করছেন কেন?

ফাহাদ ওর গাল চেপে ধ’রে বললো,

– এই চুপ! পরপুরুষ খুব ভালো লাগে তাই না? আমার সামনেই নাটক সব করিস!

স্নিগ্ধা গালের ব্য’থায় চোখ খিঁচে রেখেছে। ফাহাদ ধমকে উঠল,

– কিরে কথা বলিস না কেন?? খুব যে পরপুরুষের হাত থেকে জিনিস নিয়ে হাসিমুখে খাওয়া হচ্ছে? ঘরের চেয়ে বাইরের মানুষের খাতির বেশি ভালো লাগে, তাই না?

স্নিগ্ধা বহু কষ্টে উচ্চারণ করল,

– কি বলছেন কি আপনি? ছাড়ুন আমাকে! আমার লাগছে!

– আমি ছুঁলেই তোর লাগে তাই না?

স্নিগ্ধা ফাহাদের হাত সরাতে চেয়ে বলল,

– ফাহাদ ছাড়ুন বলছি!

ফাহাদ ছেড়ে দিতেই ও হাঁপাতে হাঁপাতে বললো,

– উনি আপনার কাজিন হন! ওভাবে গ্লাসটা বাড়িয়ে দিলেন, তাই সবার সামনে ভদ্রতার খাতিরে…

– ভদ্রতা? ফাহাদ জামানের বউয়ের অন্য কোনো পুরুষের সাথে ভদ্রতা দেখানোর দরকার নেই! তোর সবকিছুর ওপর শুধু আমার পারমিশন চলবে। অন্য কেউ যদি তোর দিকে তাকায়, তবে তার চোখ আমি উপড়ে ফেলব। আর তুই যদি নিজে থেকে কারও দিকে হাত বাড়াস…

ও স্নিগ্ধার হাত টেনে বেসিনের কাছে নিয়ে এমনভাবে ধুয়ে দিচ্ছে যেন কোনো ময়লা পরিষ্কার করছে! এদিকে স্নিগ্ধা হাতে ব্যথা পাচ্ছে।

– কী করছেন আপনি? পা’গল হয়ে গেছেন?

– হ্যাঁ, পা’গল! তোর জন্য তো আমি অনেক আগেই পা’গল হয়েছি স্নিগ্ধা। এই হাত দিয়ে তুই অন্য পুরুষের ছোঁয়া জিনিস ধরেছিস, এটা আমি সহ্য করব না। এই হাত শুধু আমার ছোঁয়া পাবে, আর কারও না!

ফাহাদ রুক্ষ গলায় বলল। স্নিগ্ধার মনে হলো ফাহাদ কোনো স্বাভাবিক মানুষ নয়
সে চরম এক সা’ইকো! হাত ধোয়ানো শেষ করে ফাহাদ বেসিনের দেয়ালে ঝোলানো তোয়ালে দিয়ে ঝড়ের গতিতে স্নিগ্ধার হাতটা মুছে দিল। টানটান উত্তেজনায় স্নিগ্ধার বুক কাঁপছে। ফাহাদ তার খুব কাছে এসে দাঁড়িয়ে তার কানের কাছে ফিসফিস করে বলল,

– আজকের মতো ছেড়ে দিলাম। কিন্তু মনে রাখিস, এরপর যদি কোনো পুরুষের ছায়াও তোর ওপর পড়ে, তবে তোর ওই মধ্যবিত্ত পরিবারের ওপর এমন ঝড় নামাব যে তোরা মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবি না। যা এবার স্বাভাবিকভাবে বাইরে যা!

স্নিগ্ধা রোবটের মতো বেরিয়ে গেল। ভবিষ্যতে কি হবে এই ভেবে তো তার নিজেরই বুক কাঁপছে!
অনেক সময় নিয়ে অনুষ্ঠান চললো। তাদের ঘরে ফিরতে ফিরতে রাত একটা। স্নিগ্ধা রুমে ফিরে ফ্রেশ হতে ওয়াশরুমের দিকে পা বাড়াতেই হাত টান পড়লো। সে পেছন ফিরে দেখল ফাহাদ লাল চোখে কেমন করে যেন তাকিয়ে আছে। স্নিগ্ধা আঁতকে উঠে জিজ্ঞেস করলো,

– ক…কি হয়েছে?

ফাহাদ একটু ঝুঁকে স্নিগ্ধার দিকে তাকিয়ে বললো,

– কি হবে?

স্নিগ্ধার নাকে একটা বাজে স্মেল এসে ঠেকলো। সে পিছিয়ে গিয়ে বললো,

– এটা কিসের ঘ্রাণ? আপনি… আপনি নে’শা করেছেন!

ফাহাদ টাল হয়েই বললো,

– নে’শা? হ্যাঁ, নে’শা করেছি! তবে এই নে’শার চেয়েও বড় নে’শা তুমি স্নিগ্ধা।

বলতে বলতেই ফাহাদ স্নিগ্ধার খুব কাছে এসে দাঁড়াল। হাত বাড়িয়ে স্নিগ্ধার গাল ছুঁতে চাইলে স্নিগ্ধা ভয়ে দুই কদম পিছিয়ে গেল। ফাহাদ এবার একটু নরম সুরে বললো,

– পিছিয়ে যাচ্ছ কেন স্নিগ্ধা? জানো, এই দিনটার জন্য আমি কত রাত জেগে কাটিয়েছি? আমি তোমাকে সত্যিই অনেক ভালোবাসি। যা করেছি সব তোমাকে পাওয়ার জন্যই করেছি…

স্নিগ্ধার ভেতরটা ঘেন্নায় রি রি করে উঠল। সে কম্পিত গলায় বলল,

– এটা ভালোবাসা নয় ফাহাদ, এটা জু’লুম। আপনি জোর করে আমার জীবনটা শেষ করে দিয়েছেন। দয়া করে আমার থেকে দূরে থাকুন। আপনার ছোঁয়া আমার কাছে বি’ষের মতো লাগছে!

স্নিগ্ধার মুখে ‘তার ছোঁয়া বি’ষ লাগছে’ কথাটা শুনে ফাহাদের চোখের মণি জ্বলজ্বল করে উঠল। মুহূর্তের মধ্যে তার কণ্ঠের সেই মেকি নমনীয়তা উধাও হয়ে সেখানে ভর করল এক পৈশাচিক উন্মাদনা। সে স্নিগ্ধাকে দেওয়ালের সাথে চেপে দাঁত পিষে বলল,

– বি’ষ? ফাহাদ জামানের ছোঁয়াকে তুই বি’ষ বললি? তোকে ভালোবেসে বলছি বলে তুই মাথায় উঠছিস স্নিগ্ধা! ভুলে যাস না, তোকে আমি ছিনিয়ে এনেছি। আর ছিনিয়ে আনা জিনিসের ওপর আমার অধিকার কতটা, সেটা বোধহয় তোর জানা নেই।

স্নিগ্ধা দমে গেলো না। সে ছাড়া পাওয়ার চেষ্টা করে বললো,

– ছাড়ুন আমাকে! ছুঁবেন না একদম।

সে ফাহাদকে সর্বশক্তি দিয়ে ধাক্কা দিল। এই ধাক্কা যেন ফাহাদের ভেতরে থাকা হিং’স্র প’শুটাকে পুরোপুরি জাগিয়ে তুলল। সে পৈ’শাচিক হেসে স্নিগ্ধাকে এক ঝটকায় বিছানার ওপর ছুড়ে ফেলে দিল। স্নিগ্ধা তাল সামলাতে না পেরে ছিটকে পড়ল বিছানার এক কোণে। বিছানার চাদর খামচে ধরে সে উঠে পালানোর চেষ্টা করতেই ফাহাদ তার গায়ের ওপর ঝাঁ’পিয়ে পড়ল।

– প্লিজ ফাহাদ ছেড়ে দিন আমায়! এতো বড় ক্ষ’তি করবেন না!

– থা’প্পড় মেরে খুব তেজ দেখিয়েছিলি না? আজ দেখি তোর সেই তেজ তোকে কেমনে বাঁচায়! আমি যা করবো তাই বি’ষ তো? এই বি’ষই গিলতে হবে তোকে! ভালোবাসা চেয়েছিলাম দিলি না এখন ঘৃণাটাই নে।

বলেই স্নিগ্ধার উপর পাশবিক অত্যাচার করতে থাকলো। সে দুই হাত দিয়ে ফাহাদকে বাধা দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করল কিন্তু ফাহাদের পাশ’বিক শক্তির সামনে তার এই ক্ষীণ প্রতিরোধ খড়কুটোর মতো উড়ে গেল। তার আর্তনাদ ফাহাদের কান অব্দি পৌঁছাচ্ছে না আর না স্নিগ্ধার প্রতি মায়া হচ্ছে তার। সে নিজের মতো স্নিগ্ধাকে শেষ করে যাচ্ছে। রাতটা স্নিগ্ধার জন্য শুধুই অন্ধকার নয়, এক অনন্ত দ’হনের নাম হয়ে রইল।

সকালে স্নিগ্ধা বেলকনিতে দাঁড়িয়ে আছে। একবার ঘরের ভেতর উঁকি দিয়ে দেখলো ফাহাদ উপুড় হয়ে ঘুমোচ্ছে। পুরো ঘরে চোখ বুলালো সে। দামি আসবাবপত্র আর দামি জামাকাপড়। রুমটাও কম বিলাসবহুল নয়! কিন্তু স্নিগ্ধার এসব কিছুই পছন্দ নয়। এই বিলাসিতা, এই রাজকীয় জীবন আসলে একটা ফাঁ’দ! এই জামান বাড়িতে তার কোনো অস্তিত্ব নেই। সে স্রেফ ফাহাদের একটা সম্পত্তি যাকে সে নিজের ইচ্ছেমতো ভাঙবে, গড়বে, কিংবা পি’ষে মে’রে ফেলবে। শূন্য দৃষ্টিতে খোলা আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবলো,

– এর কি শেষ নেই? কেন ও এমন একটা জীবনে এসে পড়লো? এভাবে ও বেঁচে থাকতে পারবে? দুই দিনেই ওর জ্যা’ন্ত লা’শের মতো মনে হচ্ছে নিজেকে!

তখন রুমের ভেতর থেকে আওয়াজ এলো,

– আমার কফি যেন আমি ফ্রেশ হয়ে আসার আগে রেডি থাকে!

ফাহাদ ওয়াশরুমের দিকে যেতেই স্নিগ্ধা চুপচাপ রুম থেকে বেরিয়ে এলো। রুম থেকে বের হতেই সিঁড়ির মুখে দেখা হয়ে গেল ফাহাদের মা সুলতানা জামানের সাথে। স্নিগ্ধাকে দেখেই তিনি মুখটা কুঁচকে নিলেন। স্নিগ্ধা মাথা নিচু করে চলে যেতে নিলেই তিনি পেছন থেকে চড়া গলায় ডেকে উঠলেন,

– এই মেয়ে! নবাবনন্দিনীর মতো এত বেলা পর্যন্ত ঘুমালে সংসারের কাজ কে করবে? বড় লোকের বাড়ি এসে কি বাপের বাড়ির স্বভাব ভুলে গেলে? তোমাকে এখানে কে করে খাওয়াবে হ্যাঁ? যাও, রান্নাঘরে গিয়ে সকালের নাস্তাটা রেডি করো।

এইবারও স্নিগ্ধা কোনো প্রতিবাদ করল না, শুধু শুকনো একটা ঢোক গিলে রান্নাঘরের দিকে পা বাড়াল। সেদিন রান্না করতে করতেই নিজেকে বোঝালো, তাকে বাঁচতে হবে। এই বি’ষাক্ত পরিবেশ, এই পৈশা’চিক অধিকারবোধের মাঝেই তাকে টিকে থাকতে হবে, কারণ তার মধ্যবিত্ত পরিবারের যা ক্ষমতা তা এই জামান বাড়ির ক্ষমতার কাছে কিছুই না!

কিন্তু স্নিগ্ধা তখনো জানত না, এই তো মাত্র শুরু। এই তো মাত্র দুটো দিন পার হয়েছে। সামনে আরও কত দিন, কত রাত তাকে এই পৈ’শা’চিক অত্যাচার মুখ বুঁজে সহ্য করতে হবে, তা তার জানা নেই।

#চলবে…?