Home "ধারাবাহিক গল্প তিমিরবসান তিমিরবসান পর্ব-০৩

তিমিরবসান পর্ব-০৩

0
401

#তিমিরবসান(৩)
#তাবাসসুম_তাজ্বওয়ারী

স্নিগ্ধা এবং ফাহাদের বিয়ের বিশ দিন পেরিয়ে গিয়েছে। এই বিশ দিনে ফাহাদের নিষ্ঠুর রূপ দেখে নিয়েছে স্নিগ্ধা। ফাহাদকে যতটা খারাপ ভেবেছিল তার চেয়েও খারাপ ফাহাদ! নারী আ’সক্তিকে সে ভালোবাসা বলে চালিয়ে যায় এবং সেই ভালোবাসা নামক অত্যা’চারে জর্জ’রিত হয়ে যাচ্ছে স্নিগ্ধার জীবন। স্নিগ্ধার পুরো শরীরে বিভিন্ন ক্ষ’ত চিহ্ন যেগুলো ফাহাদের দেওয়া, ফাহাদের ভালোবাসা! কথায় কথায় স্নিগ্ধার গায়ে হা’ত তুলে এখন এবং এটাকেই সে সঠিক মনে করে। স্নিগ্ধাকে সে কি ভাবে জানা নেই তবে নিজেকে স্নিগ্ধার মালকিন মনে করে যেন সে যা চাইবে সব করতে পারবে স্নিগ্ধার সাথে কিন্তু স্নিগ্ধা কোনো প্রতিবাদ করতে পারবে না।

ফাহাদের মা স্নিগ্ধাকে দু চক্ষে দেখতে পারে না কিন্তু ফাহাদের মা চাইলেও স্নিগ্ধাকে কিছু বলতে পারে না। কারণ ছেলে তার ভীষণ জেদী। ছেলে বউকে যা খুশি বলবে করবে কিন্তু অন্য কেউ কিছু বলতে পারবে না।

– এই মেয়ে এভাবে বসে আছো কেন? কাজগুলো সব কে করবে? সকালে নাস্তা টাও আমার বানাতে হয়।

ফাহাদের মায়ের গলায় স্নিগ্ধার ধ্যান ভঙ্গ হল। সে মাথা নেড়ে উঠে গেলে তিনি আবার বলল,

– তোমার বাপের বাড়িতে নিশ্চয়ই এভাবে বসে বসে কাটাতে না? অবশ্য তোমাদের বসে কাটানোর সময় কই! তোমরা তো গরিব পরিবার তোমাদের কি আর কাজের লোক থাকে?

ফাহাদের মা ফাহাদ বাড়ি থেকে গেলে তাকে দিয়ে বাড়ির সমস্ত কাজকর্ম করান। স্নিগ্ধা অবশ্য বুঝতে পারে সেটা। সে এসেছে পর দেখেছে দুটো কাজের লোক ছিলো তাদের কিন্তু বিয়ের কদিন পর থেকেই তাদের আর দেখা যাচ্ছে না। হয়ত তাদের বিদায় করে দিয়েছে কারণ স্নিগ্ধা আছে! আর প্রতিনিয়ত এমন কথা শুনতে হয় তার।

.

– খাবারের এই অবস্থা কেন? লবণ কম ঝাল বেশি!

ফাহাদের এমন প্রশ্নে থতমত খেয়ে যায় স্নিগ্ধা। ফাহাদের মা এমন ভাবে তাড়া দিচ্ছিল সে ঠিক মতো ধীরে সুস্থে রান্না করতে পারছিলো না আর না পেরেছিল লবণ চেক করতে। সে আমতা আমতা করতে করতে কিছু বলবে তার আগে ফাহাদের মা ওকে চুপ করিয়ে বললো,

– ঝাল বেশি হয়েছে? ইশ ভুলবশত হয়ে গিয়েছে মনে হয়! আর লবণ এনে দিচ্ছি আমি।

– ভুলবশত মানে কি মা? এতবছর রান্না করলো তখন তো এমন হয়নি! আজ হঠাৎ?

– দাদুভাই এতো কথা বলে না খাওয়ার সময়। আজ নাহয় একটু কম বেশি হয়েছে। খেয়ে নাও

সাফাই দেওয়ার ভঙ্গিতে বলে উঠলো ফাহাদের দাদি।

– না! কে রান্না করেছে? আজকে সব এমন পরিবর্তন হবে কেন? ডাকো দেখি…

ফাহাদের মা আগুন চোখে তাকালো স্নিগ্ধার দিকে যার অর্থ একটা কাজ ঠিক মতো করে না! স্নিগ্ধা শুকনো ঢোক গিললো। ফাহাদ আবার তাড়া দিলো কিন্তু সবাই চুপ করে আছে। ফাহাদের বাবার এইসব ঝামেলা পছন্দ নয় তিনি চুপচাপ ছিলেন কিন্তু এখন বিরক্ত হয়ে বললো,

– তোমরা দাঁড়িয়ে আছো কেন? কাজ শেষে এসে এত ঝামেলা ভালো লাগে না। যা করার দ্রুত করে খেতে বসো।

ফাহাদের তাড়া দেওয়ার জন্য আর না পেরে ওর মা বললো,

– কাজের লোক নেই।

– নেই মানে? কাজ শেষ?

ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করলো।

– না বিদায় করে দিয়েছি।

ফাহাদের বাবা ও অবাক হয়ে তাকাল।

– বিদায় করে দিয়েছ মানে? কিজন্য? তোমরা কেউ ঘরের কাজ কর?

– বাড়িতে বউ এনেছি তাই আর রাখিনি। কি দরকার শুধু শুধু…

ফাহাদ রাগী গলায় বললো,

– মানে! আর রান্না কে করেছে?

– তোর বউ।

– আমি কি বিয়ে করে বুয়া এনেছি?

– ঘরের কাজ করলে কেউ বুয়া হয়ে যায় না ফাহাদ!

– এতদিন তো তোমরা কেউ ‘ঘরের কাজ’ বলে নিজেরা করনি!

সে এবার স্নিগ্ধার কাছে তেড়ে গিয়ে কটমট করে বললো,

– এই তোমাকে এইসব করার জন্য বিয়ে করেছি? আমার সেবা করবে আমার সব কাজ করবে কিন্তু তুমি আমার কাজ বাদ দিয়ে এগুলা করতেছ তুমি?

স্নিগ্ধা কিছু বলতে মুখ খুলার আগে ফাহাদের বাবার গম্ভীর কন্ঠ ভেসে আসলো,

– সুলতানা(ফাহাদের মা) কাজের লোক যে বিদায় করেছো তুমি কি কারো সাথে পরামর্শ করেছো?

– পরামর্শ করার মতো কিছু ছিলো না।

– মা ওকে আমি আমার কাজে ব্যবহার করবো। আমার সেবা করবে ও। এই কারণে আমি ওকে এনেছি কিন্তু ঘরের কাজ কাজের লোক রেখে করবে।

‘ব্যবহার’ শব্দটা শুনতেই স্নিগ্ধার গা ঘৃণায় রিরি করে উঠল। ফাহাদ ওকে বস্তু সামগ্রী বানিয়ে রেখেছে। এর চেয়ে রান্না বান্না কাজ করাটা ওর কাছে সম্মানজনক! ফাহাদ চুপচাপ খেয়ে নিলো। পুরো সময় কিছু বললো না। খেয়ে রুমে চলে গেলে সব গুছিয়ে স্নিগ্ধা যখন ঘরে গেল ফাহাদ ওকে বললো,

– তোমাকে আমি কী বলেছি স্নিগ্ধা? তোমার পুরো মনোযোগ শুধু আমার ওপর থাকবে। এই জামান বাড়ির কারও কথা শোনার দরকার নেই তোমার। মা কাজ করতে বলেছে আর তুমি বাধ্য মেয়ের মতো করতে চলে গেলে? কেন? ফাহাদ জামানের দেওয়া রাজকীয় জীবন কি তোমার পছন্দ হচ্ছে না?

স্নিগ্ধা তাচ্ছিল্যের সঙ্গে জবাব দিলো,

– রাজকীয় জীবন? এই রাজকীয় জীবন আমি চাইনি এই রাজকীয় জীবন আমার কাছে জা’হান্না’মের মতো লাগছে!

ফাহাদের পুরুষতান্ত্রিক অহংকারে যেন কেউ তপ্ত সী’সা ঢেলে দিয়েছে! যে মেয়েকে পাওয়ার জন্য সে পুরো পরিবারকে জি’ম্মি করল, এত টাকা-পয়সা আর বিলাসিতার মধ্যে রাখল, সে তার দেওয়া জীবনকে জাহা.ন্নাম বলছে? সে ঝড়ের গতিতে এগিয়ে এসে স্নিগ্ধার দুই কাঁধ শক্ত করে চেপে ধরে দেওয়ালের সাথে ঠেসে ধরে বললো,

– কী বললি? জাহা’ন্নাম? এত বড় সাহস তোর! এই ফাহাদ জামানের ঘর তোর কাছে জাহা’ন্নাম মনে হয়? বাইরে হাজারটা মেয়ে এই জামান বাড়ির বউ হওয়ার জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে থাকে, আর তুই…

স্নিগ্ধা দমে গেল না বরং উঁচু কণ্ঠে বললো,

– তো কি বলবো? যেখানে কোনো মানুষের স্বাধীনতা থাকে না, যেখানে একটা পশুর মতো অবলা প্রাণীকে খাঁচায় বন্দি করে রাখা হয়, সেটাকে আর কী বলা যায়? আপনি আমাকে মানুষ ভাবেন না ফাহাদ! একটা বস্তু ভাবেন! আপনার মা দাদি আমাকে খেলনা ভাবে, আর আপনি ভাবেন ব্যবহারের সামগ্রী!

ফাহাদ অদ্ভুত পৈশাচিক হাসি দিয়ে স্নিগ্ধাকে ছেড়ে পিছিয়ে এল। রহস্যময়ী কণ্ঠে বললো,

– ঠিকই তো বলেছে দাদি, তুই আমার খেলনা! আর আমি আমার খেলনা যেভাবে ইচ্ছে সেভাবে ব্যবহার করব।

এর মধ্যে কেটে গিয়েছে আরও সপ্তাহ খানেক। স্নিগ্ধা যেন আরও নীরব, আরও নিথর হয়ে গেল। ফাহাদের মধ্যে কোনোরকম পরিবর্তন আসেনি সেই ছন্নছাড়া, সাই,কো টাইপ মানুষ! এখনো যে বাইরে নারী নেশায় বুঁদ হয়ে থাকে সেটাও স্নিগ্ধা জানে কিন্তু কিছু বলতে পারে না আর না সইতে পারে। আর সুলতানা জামান? তিনি সুযোগ পেলেই স্নিগ্ধাকে কটু কথা শোনান।
এদিকে বিয়ের পর থেকে স্নিগ্ধার বাসার মানুষের সাথে কথা হয়েছে শুধু একবার। তার বাবার সাথে কথা হলেও তার মায়ের সাথে কথা হয়নি। তবে বাবার মাধ্যমে তিনি জানিয়েছেন যেন মেয়ে এখানে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। স্নিগ্ধার মা বরাবরই ছেলেদের প্রতি বেশি কনসার্ন। তিনি ছেলেদের প্রয়োজনের থেকেও বেশি ভালোবাসে। তিনি জানিয়ে দিয়েছেন মেয়েদের কাছে বেঁচে থাকাকালীন শশুরবাড়ি হলো আসল ঠিকানা তাই বিয়ে যখন একবার হয়েছে যেভাবেই হোক না কেন, সে যেন মানিয়ে নেয়। আর বড় লোক ফ্যামিলিতে বিয়ে হয়েছে তাই সে ভালো থাকবে তাই যেন মানিয়ে নেয়। স্নিগ্ধা শুধু হেসেছিল। কারণ সে জানে তার মা এটা বলবে। তার মায়ের কাছে টাকা সম্পত্তি সবকিছুর আগে। তার ধারণা টাকা থাকলেই সুখী হওয়া যায়।
অবশ্য স্নিগ্ধা নিজেও ভেবে নিয়েছিল সে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করবে কারণ যতই হোক বিয়ে তো হয়েছে। আর সে মধ্যবিত্ত ফ্যামিলির মেয়ে তার সংসার ভেঙ্গে গিয়ে সেই ফ্যামিলিতে গিয়ে পরে থাকা সম্ভব নয় আর সমাজের ঊর্ধ্বে গিয়ে বেরোনোর মতো ক্ষমতা সে রাখে না। বিভিন্ন কটু কথা শুনতে হবে বিভিন্ন পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হবে যদিও সেটা এখন থেকে বেরোনোর পর। এখন থেকে বেরোনোর পথটাই তো নেই তার কাছে। তাই এখন থেকে সে মানিয়ে চলার চেষ্টা করে। ফাহাদকে মন না চাইতেও স্বামী মেনে নিতে চাই কিন্তু ফাহাদের ব্যবহার দিনদিন ওর মনে জায়গা করে নেওয়া তো দূর বরং ঘৃণা আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে।
স্নিগ্ধা রুম গুছাচ্ছিল তখনই ওর ফোনে কল আসে। ফোন হাতে নিতেই দেখে ওর বাবা। ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠে। কল রিসিভ করে কানে দিয়ে কিছু বলবে তার আগে ওপাশ থেকে ভেসে এলো একটা অতি পরিচিত কণ্ঠস্বর,

– স্নিগ্ধা? মা বলছিলাম রে…

স্নিগ্ধা খুশি হওয়ার চেয়ে অবাক হলো বেশি। এতদিন পর হঠাৎ মায়ের ফোন? চোখ দুটো আবার জলে ভিজে উঠল। বুক চিরে একটা কান্না বেরিয়ে আসতে চাইল। সে কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,

– মা! কেমন আছো তোমরা? বাবা কেমন আছে?

– আমরা সবাই ভালো আছি রে… তুই নিশ্চয়ই ভালো আছিস? অত বড় বাড়িতে বিয়ে হলো ভালো তো থাকারই কথা! কপাল গুণে পেয়েছিস রে স্নিগ্ধা! রাজরানি হয়ে রেখেছে নিশ্চয়ই তোকে?

এতক্ষণের আবেগ ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। মুহূর্তেই ঠোঁটে ফুটে উঠলো তাচ্ছিল্যের হাসি। সে তার মাকে চিনে তাও কি করে ভাবল কে জানে! চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে হলো, “মা! তোমার দেওয়া এই রাজরানির খেতাব আমার দরকার নেই। ফাহাদ একটা পি’শা’চ! টাকার ছড়াছড়ি থাকলে কী হবে একটা মানুষ বেচে থাকার মতো পরিবেশ নেই!” কিন্তু বলতে পারলো না! বাবার অসহায় মুখ আর ফাহাদের দেওয়া সেই র’ক্তহিম করা হুমকির কথা মনে পড়তেই সে নিজের কান্না গিলে নিল। গলাটা স্বাভাবিক করে বলল,

– হ্যাঁ মা, আমি ভালো আছি। খাওয়া-পরার কোনো কমতি নেই এখানে।

– হ্যাঁ রে মেয়ে, সেটাই তো স্বাভাবিক। অত বড় ঘরের বউ হয়েছিস। ফাহাদ একটু জেদি আর রাগী হতে পারে, কিন্তু পুরুষ মানুষের ওমন একটু আধটু রাগ তড়প থাকেই। তুই একটু মানিয়ে চলিস, নিজের বুদ্ধিতে চলিস না। স্বামীর কথামতো চললে দেখবি একসময় সব ঠিক হয়ে যাবে। সংসার টিকিয়ে রাখাটাই মেয়েদের আসল লক্ষ্য!

এবার আর নিজেকে আটকালো না স্নিগ্ধা।

– শুধু রাগী জেদী? তোমরা ফাহাদকে চেনো না? ও একটা মেয়ে’বাজ! নে’শাখো’র, ই’ভটি’জার! এগুলো তোমার কাছে একটু আধ্তু মনে হচ্ছে? আমি ম’রে গেলে তবেই কি তোমাদের হুঁশ ফিরবে মা?

স্নিগ্ধার মা চুপ হয়ে গেল। কিছুক্ষণ পর নিচু স্বরে বলল,

– এসব কী কথা বলছিস? নিজের স্বামী সম্পর্কে মুখে এমন নোংরা কথা আনতে তোর লজ্জা করল না? পুরুষ মানুষ বিয়ের আগে-পরে একটু-আধটু এই পথে চলেই, ওসব নিয়ে মেতে থাকলে সংসার হয় না। তুই এখন চৌধুরী বাড়ির বউ। দেয়ালেরও কান আছে। এই কথা যদি জামাইয়ের কানে যায়, তবে আমাদের পুরো পরিবারটাকে রাস্তায় নামিয়ে দিতে ওদের সময় লাগবে না, জানিস না তুই?

মায়ের মুখে নিজের জন্য হাহাকার না শুনে জামাইয়ের হয়ে সাফাই গাওয়া দেখে স্নিগ্ধা অবাক হলো না মোটেই!

– আমি মেয়ে বলে তুমি আমায় বোঝা ভাবছো তো? ভাবো! কিন্তু তোমার কথাকে আমি কিছুতেই সমর্থন করবো না। টাকার চশমাটা চোখ থেকে খোলো মা, খোলো! ও মানুষ নয়, ও একটা পশু!

– চুপ কর স্নিগ্ধা, একদম চুপ কর! তোর শ্বশুর বিয়ের সময় বলেছে আমার ছেলেকে একটা ভালো চাকরি দিবে! তুই এসব পাগলামি করে আমাদের সব স্বপ্ন নষ্ট করিস না। মেয়েদের একটু আধটু সহ্য করতেই হয়। মুখ বুঁজে সব সহ্য করে নে, একসময় ও ঠিক তোর আঁচলের তলায় চলে আসবে। আর একটা কথাও আমি শুনতে চাই না।

ফোন কেটে দিলো। স্নিগ্ধার রাগে দুঃখে গা কাঁপছে। ইচ্ছা করছে সব শেষ করে দিতে কিন্তু সে নিজেই তো নিরুপায়!
স্নিগ্ধা এখন সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে ফাহাদকে মেনে নিয়ে সংসারে মন দিতে। কিন্তু ফাহাদের স্বভাব তো বদলাবে না!
একদিন স্নিগ্ধা স্বাভাবিক হয়ে বলেছিল,

– আমরা কি একটু বাইরে যেতে পারি না? বিয়ের পর তো কোথাও ওভাবে যাওয়া হয়নি। সারাদিন এই বন্ধ ঘরে থাকতে থাকতে আমার দমবন্ধ লাগে। তাই…

ওকে কোথা সম্পূর্ণ করতে না দিয়ে বলল,

– এত বড় বাড়িতে তোমার দমবন্ধ লাগে? সত্যি? নাকি মানুষের ভিড়ে ঠেলাঠেলি করার শখ জেগেছে?

স্নিগ্ধা অবাক হয়ে বললো,

– মানে? কি বলছেন?

– বলছি এই বাড়ির বিশাল ছাদ, বাগান এতগুলো ঘর এগুলো কি তোর বাপের বাড়ির চেয়ে ছোট মনে হয়? নাকি বাইরে গিয়ে মানুষের সামনে নিজের রূপ দেখানোর নতুন কোনো ধান্দা আছে তোর?

স্নিগ্ধা অপমানে চুপ হয়ে গেল। প্রতিনিয়ত এইভাবে ওকে দ’গ্ধ করে চলেছে ফাহাদ আর স্নিগ্ধা চুপচাপ সহ্য করে চলেছে। প্রতিটা কথায় যেন খোটা দেয় ফাহাদ। স্নিগ্ধা কতদিন এইসব সহ্য করবে? আদৌ কি করবে?

অন্য একদিনের কথা, ফাহাদ তখন বিছানায় শুয়ে ল্যাপটপে কী যেন দেখছিল। তার মেজাজটা অন্য দিনগুলোর চেয়ে আজ কিছুটা শান্ত মনে হচ্ছিল। স্নিগ্ধা ধীরপায়ে এগিয়ে গিয়ে খাটের এক কোণে বসল। কিছুক্ষণ চুপ থেকে আমতা আমতা করে বলল,

– আপনাকে একটা কথা বলার ছিল…

ফাহাদ ল্যাপটপ থেকে চোখ না সরিয়েই ভ্রু কুঁচকে বলল,

– কী বলবে, বলো। টাকা লাগবে? আলমারিতে ক্যাশ রাখা আছে, নিয়ে নাও।

স্নিগ্ধা শুকনো ঢোক গিলে বলল,

– না আমার টাকা লাগবে না…আসলে বলছিলাম… আমার সারাদিন খুব একাকীত্ব লাগে। আমাকে কিছু সুতো আর কুশিকাটার জিনিসপত্র এনে দেবেন? ওইসব উল সুতো দিয়ে টেবিল ম্যাট বা কুশন কভার বানাতে আমার খুব ভালো লাগে। একটু সময়ও কাটত আর মনটাও ভালো থাকত।

স্নিগ্ধার কথা শেষ হতে না হতেই ফাহাদ ল্যাপটপটা ধড়াম করে বন্ধ করে দিল। ফাহাদ স্নিগ্ধার দিকে এমন এক নজর তাকাল, যেন সে কোনো মহাবিপদজনক কথা বলে ফেলেছে। সে একটা কুৎসিত তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলল,

– কী বললে? কুশিকাটার কাজ? সুতো দিয়ে ম্যাট বানাবে?

স্নিগ্ধা ভয়ে ভয়ে মাথা নাড়ল।

– তোমার ওই সস্তা মধ্যবিত্ত মেন্টালিটি আর বাপের বাড়ির গরিবী স্বভাব তুমি কোনোদিনই ছাড়তে পারলে না, তাই না স্নিগ্ধা? এই জামান বাড়ির বউ হয়ে তুমি এখন ঘরে বসে সুতো কাটবে? কেন, ফাহাদ জামানের কি এতই অভাব পড়েছে যে তার বউকে এখন দর্জিদের মতো কুশিকাটার কাজ করে দিন কাটাতে হবে?

– আমি তো কোনো ব্যবসার জন্য বলছি না ফাহাদ। শুধু নিজের মনটাকে ভালো রাখার জন্য একটা শখের কথা বলেছি…

– এইসব ফালতু শখের কোনো দরকার নেই। বাড়িতে বসে থাকো আমার সেবা করো!

এরপর থেকে স্নিগ্ধা নিজেকে গুটিয়ে নিলো। কোনো শখ ভালো থাকা কোনকিছুতেই যেন যায় আসে না। এক অনুভূতিহীন জীবন যাপন করতে শুরু করলো। সে মন বসাতে চেয়েছিল এই প’শুর মতো মানুষটাকেই নিজের স্বামী বলে মেনে নিয়ে একটু শান্তিতে বাঁচতে চেয়েছিল। কিন্তু ফাহাদ তাকে বারবার মনে করিয়ে দেয়, সে কোনো মানুষ নয়, সে কেবলই একটা সস্তা দাম দিয়ে কিনে আনা খাঁচার পাখি যার নিজের কোনো মন, শখ বা মানসিক শান্তি থাকার অধিকার নেই। তার মনে হলো, এই মানুষটাকে ভালো করার চেষ্টা করা বা নিজের মন বসানোর চেষ্টা করাটাই তার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল ছিল। এর চেয়ে ঘৃণা বুকে নিয়ে বেঁচে থাকাটাই অনেক সহজ!

#চলবে…?