Home "ধারাবাহিক গল্প তিমিরবসান তিমিরবসান পর্ব-১৬

তিমিরবসান পর্ব-১৬

0
262

#তিমিরবসান(১৬)
#তাবাসসুম_তাজ্বওয়ারী

স্নিগ্ধা বসে আছে গাড়িতে। নিজের চেনা পরিবেশ ছেড়ে অচেনা এক পরিবেশে স্থায়িত্ব গাড়তে যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে তার। চুপচাপ বসে আছে সে। বাড়ি থেকে বিদায় নিতে কান্নাও পায়নি তার। শুধু পুরনো স্মৃতি মস্তিষ্কে হানা দিয়েছে। একসময় ফাহাদের সাথেও সে এখান থেকে বেরিয়েছিল তবে মানুষ আর পরিবেশটা ভিন্ন ছিলো। অতীতের সেই ক্ষ’তগুলো ভেসে উঠতেই চোখ দুটো ঝাপসা হয়ে এলো স্নিগ্ধার।। সে মাথা নিচু করে চোখ দুটো মুছে নিলো। স্নিগ্ধা একবার ঘাড় ঘুরিয়ে চাইলো ওয়াজেদের পানে। আয়াত ওনারই বাহুতে ঘুমিয়ে আছে। স্নিগ্ধা চোখ সরাতেই ওর কাঁধ জড়িয়ে ধরলো একটা হাত। স্নিগ্ধা কিছু বুঝে উঠার আগেই একটা ঠান্ডা কণ্ঠ কানে এলো,

– অতীতের যে ছায়া আপনাকে অতটা তাড়া করে সেই ছায়াকে আজ আর এ গাড়িতে সাথে নিয়ে যাওয়ার কোনো দরকার নেই, স্নিগ্ধা। পেছনের ফেলে আসা পথটাকে পেছনেই থাকতে দিন। যে হাতটা আজ আপনি ধরেছেন, তা কোনো পরিস্থিতির চাপে পড়ে ধরেছেন ঠিকই কিন্তু এই হাত আপনাকে কোনো দিন অতীতে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে না। বিশ্বাস রাখুন।

ওয়াজেদের এই সুদৃঢ় বাণীগুলো স্নিগ্ধার বুকের ভেতরের দুশ্চিন্তার পাহাড়টাকে হালকা করে দিল। আসলেই তো! অতীতের ভুত তাড়া করে বেড়ালে ও কীভাবে এই নতুন জীবনকে আপন করবে? ওই অতীতও তো ওর নিজের কিছু ছিলো না! সেটাও চাপে পড়ে জীবনের সাথে বেঁধে গিয়েছিলো।

কিছুক্ষণ পর গাড়িটা ওয়াজেদদের সুদৃশ্য এক তিনতলা বাড়ির প্রধান ফটক দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করল। গাড়ি থামতেই স্নিগ্ধার বুকের ধুকপুকানি বেড়ে গেল। ওয়াজেদ গাড়ি থেকে নেমে নিজেই স্নিগ্ধার পাশের দরজাটা খুলে দিল এবং একহাতে আয়াতকে সাবধানে আঁকড়ে ধরে স্নিগ্ধাকে নামতে সাহায্য করল। স্নিগ্ধা ধীরপায়ে ওয়াজেদের পাশ ঘেঁষে ভেতরে পা বাড়াল। ড্রয়িংরুমে উপস্থিত আত্মীয়স্বজন ও চেনা-অচেনা মানুষদের কৌতুহলী চোখগুলো ওদের ওপর এসে বিঁধল। স্নিগ্ধা মাথা নিচু করে নিজেকে যতটা সম্ভব আড়াল করার চেষ্টা করল। ওর স্পষ্ট মনে হচ্ছিল, এই বুঝি কেউ বি’ষাক্ত কোনো ক’টূক্তি ছুড়ে মা’রল, এই বুঝি কেউ ওর অতীত, ওর ডিভোর্স আর কোলের বাচ্চাটাকে নিয়ে কোনো বাঁকা কথা বলে উঠল! বুকের ভেতরটা প্রবল আ’তঙ্কে থরথর করে কেঁপে উঠল ওর। তবে সেরকম কিছুই হলো না। স্নিগ্ধাদের বাড়িতে ওয়াজেদের স্নিগ্ধার পক্ষে হয়ে দাঁড়ানোতে বোধহয় কেউ কিছু বলার সাহস করে নি! ভিড়ের মাঝ থেকে এগিয়ে এলেন ওয়াজেদের মা, ফারহানা বেগম। এসেই স্নিগ্ধার মাথায় হাত বুলিয়ে হেসে বললেন,

– আসতে কোনো কষ্ট হয় নি তো?

স্নিগ্ধা কোনোরকম মাথা নাড়িয়ে না বলল। ফারহানা বেগম ওয়াজেদের কোলে আয়াতকে দেখে মিষ্টি হাসলো। হাত বাড়িয়ে একটু ছুঁয়ে দিয়ে বললো,

– ঘুমিয়ে পড়েছে? তাহলে এখন আর কোলে না নেই। তোরাও টায়ার্ড, যা রুমে গিয়ে রেস্ট নে।

ওয়াজেদ সায় জানালো। ফারহানা বেগম স্নিগ্ধাকে বললেন,

– তুমি যাও অনেক ধকল গিয়েছে। ফ্রেশ হয়ে রেস্ট নাও আমি খাবার পাঠিয়ে দিচ্ছি।

ফারহানা বেগম তাড়া দিতেই ওয়াজেদ স্নিগ্ধাকে ইশারা করে পা বাড়াল। ওয়াজেদের পেছন পেছন গুটি গুটি পায়ে এগোতে থাকলো স্নিগ্ধা। ওয়াজেদ হাঁটার গতি কমিয়ে দিয়ে স্নিগ্ধাকে পাশাপাশি আসার সুযোগ করে দিল। দুজন পাশাপাশি আসতেই ওয়াজেদ সামনে তাকিয়ে নিচু স্বরে বললো,

– এত ভয় পাচ্ছিলেন কেন স্নিগ্ধা? ঘাবড়ে গিয়েছিলেন?

স্নিগ্ধা ইতস্তত করলো। ফিসফিস করে বললো,

– ইয়ে তেমন কিছু না…

– এত চিন্তা করার কোনো প্রয়োজন নেই। কাউকে কোনো কৈফিয়ত দেওয়ার প্রয়োজনও আপনার নেই, স্নিগ্ধা। এই বাড়ি আপনার, আর আপনার সম্মান রক্ষা করার দায়ভার সম্পূর্ণ আমার। তাই নিশ্চিন্তে থাকবেন।

কথাটা শেষ করেই ওয়াজেদ ঘরের দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করল। ঘরটি বেশ বড়, পরিপাটি আর সুবিন্যস্ত। ঘরের মাঝখানে চওড়া কিং সাইজ খাট। ওয়াজেদ খুব সাবধানে ঘুমন্ত আয়াতকে বিছানার ঠিক মাঝখানে নামিয়ে দিল। তারপর আয়াতের দুপাশে দুটি বালিশ চাপা দিয়ে একটা নিরাপদ সীমানা তৈরি করে দিল, যাতে ও গড়িয়ে পড়ে না যায়।

স্নিগ্ধা দরজার কাছে দাঁড়িয়ে নিস্তব্ধে লোকটার দায়িত্বশীল কাণ্ডকারখানা দেখছিল। লোকটা কতটা সহজ আর স্বাভাবিক ভঙ্গিতে নিজের দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে, সেখানে কোনো কৃত্রিমতা বা বাহাদুরি দেখানোর চেষ্টাটুকুও নেই! যেন সবই নরমাল। ওয়াজেদ আয়াতকে শুইয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল। তারপর সুতি পাঞ্জাবির কলারটা একটু ঢিলে করে স্নিগ্ধার দিকে ফিরে তাকাল। স্নিগ্ধা এখনো আড়ষ্ট হয়ে দরজার পাশেই দাঁড়িয়ে আছে দেখে ওর ঠোঁটের কোণে সেই চেনা প্রশ্রয়ের হাসি ফুটে উঠল।

– ঘরটা কিন্তু এখন থেকে আপনারও, স্নিগ্ধা। দরজার মুখে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকার কোনো কারণ দেখছি না।

স্নিগ্ধা ধীরপায়ে ভেতরে এসে দাঁড়াল। ওয়াজেদ আবার বললো,

– আয়াত ঘুম থাকতেই ফ্রেশ হয়ে নিন। আমি পাশের রুমের ওয়াশরুম ইউজ করছি। আপনি এই ঘরেরটা ইউজ করুন।

স্নিগ্ধা মাথা নেড়ে লাগেজের দিকে এগোলো। নিজের জামা কাপড় নিয়ে ফ্রেশ হতে চলে গেল।

কিছুক্ষণ পর একটা সাধারণ সুতির থ্রি-পিস পরে বেরিয়ে এলো। শাড়ির ভারী গয়না আর সাজগোজ ছেড়ে হালকা পোশাকে নিজেকে বেশ হালকা লাগল। ঘরে ঢুকে স্নিগ্ধা দেখল ওয়াজেদও ইতিমধ্যে পাশের রুম থেকে ফ্রেশ হয়ে চলে এসেছে। তার পরনে একটা কালো সুতির টি-শার্ট আর ট্রাউজার। চুলগুলো এখনো কিছুটা ভেজা, তোয়ালে দিয়ে মোছার চেষ্টা করছে। ওয়াজেদ স্নিগ্ধার দিকে একপলক তাকিয়ে বেশ স্বাভাবিক কণ্ঠেই বলল,

– আপনার জন্য কাপড় চোপড় রাখার জন্য আলমারির বাঁ পাশের দুটো তাক খালি করে রাখা হয়েছে। আর বাকিটা খালি করতে হলে বলবেন, আমি ব্যবস্থা করে দেব। সময়ের জন্য সব গুছিয়ে উঠতে পারিনি।

স্নিগ্ধা একটু অবাক হয়েই আলমারির দিকে তাকাল। লোকটার প্রতিটি পদক্ষেপে এমন এক শৃঙ্খলা আর সূক্ষ্ম খেয়াল রাখার মানসিকতা, যা স্নিগ্ধার একদম অনভ্যস্ত। সে ধীরস্বরে বলল,

– না না, ঠিক আছে। এতটুকুই যথেষ্ট।

ঠিক তখনই ঘরের দরজায় মৃদু নক হলো। ফারহানা বেগম নিজেই ট্রেতে করে দুটো প্লেটে গরম খাবার আর আয়াতের জন্য আলাদা কিছু নিয়ে ভেতরে এলেন। ট্রে-টা টি-টেবিলে রাখতে রাখতে বললেন,

– স্নিগ্ধা মা, আয়াত ঘুমিয়ে আছে তো? তুমি এসে খেয়ে নাও। ওয়াজেদ, তুইও বসে পড়। সারাদিন তোদের পেটে কিছুই পড়েনি বোধহয়।

স্নিগ্ধা ইতস্তত করে বললো,

– আপনি কষ্ট করে আনতে গেলেন কেন…

ফারহানা বেগম হেসে স্নিগ্ধার গালে হাত রেখে বললেন,

– আজকে তোমাদের রেস্ট নেওয়ার দিন। কাল থেকে না হয় তুমি পুরো সংসারের হাল ধরবে! এখন চুপচাপ খেয়ে নাও।

খাবার রেখে ফারহানা বেগম বেরিয়ে গেলেন। ওয়াজেদ বসে স্নিগ্ধাকে ডাকলো।

– আসুন স্নিগ্ধা খেয়ে নিন।

স্নিগ্ধা চুপচাপ বসে পড়লো। খিদেও পেয়েছে মেয়েটার।
খাবার খাওয়ার মাঝেই হঠাৎ বিছানা থেকে একটা ছোট ফোঁস ফোঁস আওয়াজ ভেসে এলো। স্নিগ্ধা আর ওয়াজেদ দুজনেই একসাথে সেদিকে তাকাল। দেখা গেল আয়াত ঘুম ভেঙে চোখ কচলানো শুরু করেছে আর কোলবালিশের ধাক্কায় মুখটা কুঁচকে কঁকিয়ে ওঠার উপক্রম করছে।
স্নিগ্ধা চামচ রেখে উঠতে নেওয়ার আগেই ওয়াজেদ তাকে হাত তুলে থামাল।

– আপনি খাওয়া শেষ করুন, আমি দেখছি।

ওয়াজেদ উঠে গিয়ে বিছানার পাশে বসল। অত্যন্ত সাবধানে আয়াতকে কোল তুলে নিয়ে ওর গালে পিঠে আলতো চাপড় দিতে লাগল। আয়াত কান্নার সুর ধরতেই ওয়াজেদ বললো,

– হেই হেই লিটল লেডি! কান্না করছেন কেন? ঘুম ভেঙ্গে গেছে?

আয়াত ওয়াজেদের চেনা গম্ভীর স্বর শুনে থামল। ডাগর ডাগর চোখ জোড়া মেলে কিছুক্ষণ ওয়াজেদের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল সে। ওয়াজেদ হেসে বলল,

– এভাবে দেখছেন কেন নতুন ঘর পছন্দ হয়নি? নাকি বাবার কোলে থাকাটা অপছন্দ হচ্ছে?

ওয়াজেদের মুখে প্রথমবার নিজেকে আয়াতের কাছে ‘বাবা’ বলা শব্দটা শুনে স্নিগ্ধার হাত স্বয়ংক্রিয়ভাবেই থমকে গেল। প্লেটে থাকা চামচটা থেকে নজর সরিয়ে সে চকিতে ওয়াজেদের দিকে তাকাল। ওয়াজেদের মুখে কোনো কৃত্রিমতা নেই বরং অতি স্বাভাবিক ভঙ্গিতে, কত সহজে দায়িত্বের জায়গাটা নিজের করে নিয়েছে সে!
আয়াত অবশ্য কোনো উত্তর দিল না। তবে ঘুমভাঙা চোখ দুটো কুঁচকে ওয়াজেদের টি-শার্টের কলারটা ছোট ছোট আঙুলে শক্ত করে আঁকড়ে ধরল। তারপর নিজের নরম গালটা ওয়াজেদের চিবুকে ঘষে দিয়ে একটা হালকা ফোঁস নিঃশ্বাস ফেলল। স্নিগ্ধা একদৃষ্টে চেয়ে রইল দৃশ্যটার দিকে। বুকের ভেতর জমে থাকা সবকটা কঠিন বরফ যেন ওয়াজেদের এই অকৃত্রিম ব্যবহারে নিঃশব্দে গলে যাচ্ছে। অতীত তাকে বহু আঘাত দিয়েছে, বহু অনাদর দেখিয়েছে, কিন্তু ওয়াজেদের সাথে একেকটা মুহূর্তটা তার জীবনের সমস্ত ক্ষ’ত একটু একটু করে মুছে দিচ্ছে।
ওয়াজেদ আয়াতকে কোলে নিয়ে দোলাতে দোলাতেই স্নিগ্ধার দিকে ঘুরে তাকাল। ওকে বসে থাকতে দেখে বলল,

– স্নিগ্ধা? আপনি কি এখনো ভাবছেন? খাওয়া শেষ করবেন নাকি আপনার শাশুড়ি মার কাছে নালিশ খাবেন? আপনার শাশুড়ি কিন্তু খাওয়ার ব্যাপারে খুব কড়া!

ওয়াজেদের রসিকতা শুনে ঠোঁটের কোণে হাসি নিয়ে সে এক চিলতে অমলিন হাসি হাসল। সেভাবেই বলল,

– জি, খাচ্ছি।

খাওয়া শেষ করে স্নিগ্ধা প্লেটগুলো গুছিয়ে রাখার সময় ওয়াজেদ আয়াতকে কোলে নিয়ে বারান্দার খোলা হাওয়ায় গিয়ে দাঁড়াল। স্নিগ্ধা যখন হাত ধুয়ে এসে দরজার কাছে দাঁড়াল, তখন বাইরের ঝিরঝিরে বাতাসে ওয়াজেদের পিঠের সুঠাম অবয়ব আর ওর কোলে নিশ্চিন্তে মাথা রেখে থাকা আয়াতের ছোট্ট শরীরটা দেখে স্নিগ্ধার মন বলে উঠল, না, এটি কোনো ক্ষণিকের মোহ নয়। এই মানুষটা সত্যিই তাদের জীবনের তিমির কাটিয়ে এক নতুন আলো নিয়ে এসেছে। সত্যি সত্যিই ঘটে গেছে তিমিরবসান!

.

বেশ কিছুদিন কেটে গেছে। স্নিগ্ধা আর ওয়াজেদের সম্পর্ক এখনো আগের মতোই। তবে স্নিগ্ধা নিজের সংসার গুছিয়ে নিয়েছে। পুরোদিন প্রায় সংসারেই কাটিয়ে দেয়। তার পছন্দ হয়েছে বলতে হয়! রান্নাঘরের তদারকি থেকে শুরু করে সকাল সন্ধ্যার চা, সবকিছুতেই এখন স্নিগ্ধার হাত ফুটে ওঠে। শাশুড়ির মাতৃত্বসুলভ আগলে রাখা আর নতুন এই পরিবেশের ভালোবাসা পেয়ে স্নিগ্ধার মনের ক্ষ’তে প্রলেপ পড়ে গেছে অনেকটাই।
তবে একটাই অনুভূতির জায়গা এখনো কিছুটা থমকে আছে সেটা হলো ওয়াজেদ আর তার নিজস্ব সম্পর্কটুকু।
বাড়ির বাকি সবার সামনে ওয়াজেদ যেমন দায়িত্বশীল স্নিগ্ধার প্রতিও সে অতিমাত্রায় যত্নশীল আর শ্রদ্ধাশীল। স্নিগ্ধার কোনো কিছুর যেন এতটুকু অভাব না হয়, আয়াত যেন একটুও কষ্ট না পায় সবদিকে লোকটার প্রখর দৃষ্টি। কিন্তু নিজেদের মধ্যকার জায়গাটাতে এখনো এক অদৃশ্য সূক্ষ্ম দেয়াল রয়ে গেছে। ওয়াজেদ নিজে থেকে কখনোই কোনো বাড়তি অধিকার ফালাতে আসে না, স্নিগ্ধার ইতস্তত ভাব কিংবা মানসিক স্বাচ্ছন্দ্যকে সে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়।

একটু আগে আয়াতকে ঘুম রেখে স্নিগ্ধা রান্না করতে গিয়েছে। পাশে ওয়াজেদ কাজ করছে দেখে সে আর বলে গেল না। স্নিগ্ধা রান্নার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লেও ওয়াজেদ ঘরেই ল্যাপটপ খুলে কাজ করছিল। বিছানায় ঘুমিয়ে থাকা আয়াতের দিকেও তার খেয়াল ছিল। সে মনোযোগ দিয়ে কাজ করছিল। সম্পূর্ণ মনোযোগ এবং দৃষ্টি ল্যাপটপে।

– আআআ… বুউউ!

ওয়াজেদের টাইপিং আচমকা থেমে গেল। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলো অদূরেই আয়াত ঘুম থেকে উঠে চোখ কচলাচ্ছে। আশেপাশে মাকে না দেখে ছোট ছোট চোখ দুটো চারপাশটা খুঁজে বেড়াল। হঠাৎ চোখ পড়লো ওয়াজেদের উপর। কান্না না করে হেসেই সে ওয়াজেদের কাছে আসার প্রয়াস চালাচ্ছে। ওয়াজেদ ভ্রু নাচতেই আয়াত আবার হামাগুড়ি দিয়ে আসার চেষ্টা করলো। ছোট্ট দুই হাঁটু ফেলে ফেলে এগোতে গিয়ে ওর পরনের ঢোলা জামাটা বার বার পায়ে আটকে যাচ্ছিল। কিন্তু অদম্য জেদ! ফোঁস ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলতে ফেলতে অবশেষে সে ওয়াজেদের কোল পর্যন্ত পৌঁছে গেল।

ওয়াজেদের ঠোঁটের কোণে মুহূর্তেই একচিলতে প্রশ্রয়ের হাসি ফুটে উঠল। সে ল্যাপটপটা একপাশে সরিয়ে রেখে আয়াতকে ধরে শূন্যে একটু তুলে আবার নিজের বুকের ওপর নামিয়ে আনলো। হেসে বললো,

– এই যে লিটল লেডি কি চায় হু? ঘুম ভেঙ্গে গেছে?

আয়াত কোলে বসেই কোনো কথা না শুনে ওয়াজেদের টি-শার্টের কলারটা ধরে টানতে লাগলো। তারপর হঠাৎ করে ওয়াজেদের গালের কাছে মুখ নিয়ে সোজা কা’মড় বসিয়ে দিল। ওয়াজেদ ব্যথা না পেলেও ভান করে একটু ব্যথার শব্দ করে বলল,

– আরে! ডিরেক্ট অ্যা’টাক? এটা তো মারাত্মক অন্যায়, আয়াত ম্যাডাম!

স্নিগ্ধা তখন মাত্রই রুমে এসেছিল। ওয়াজেদের কাজের মাঝে এভাবে আয়াতকে এভাবে কোলে উঠতে দেখে থমকে গেল তারপর আবার কা’মড় দেওয়ার বিষয়টা দেখে সে আচমকা কোথা থেকে তড়িঘড়ি করে এসে ওর কোল থেকে আয়াতকে নিয়ে নিলো। ওয়াজেদ অবাক কণ্ঠে বললো,

– কি হয়েছে? নিয়ে নিলেন কেন?

– আপনি কাজ করুন। আমি আসলে রান্না বসিয়েছিলাম তাই আয়াতকে দেখতে পারিনি…ও তো ঘুমাচ্ছিল জেগে যাবে…

এবার ওয়াজেদ কেমন কঠোর হলো। কথা শেষ করতে না দিয়ে কঠোর ভঙ্গিতে বললো,

– ওকে আমার কাছে দিন বলছি এক্ষুনি!

স্নিগ্ধা একটু ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেল। ওয়াজেদের এমন হঠাৎ কঠোর ব্যবহারে ওর বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। ভাবল, ও বুঝি কিছু ভুল করে ফেলেছে! আয়াতকে কোল থেকে নেওয়ার অপরাধে লোকটা এভাবে রাগ করল?

স্নিগ্ধা দ্বিধা আর খানিকটা আতঙ্ক নিয়ে আয়াতকে ওয়াজেদের দিকে বাড়িয়ে দিল। ওয়াজেদ দ্রুত আয়াতকে আবার নিজের কোলে টেনে নিয়ে সোজা হয়ে বসলো। ওয়াজেদ স্নিগ্ধার চোখের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল। তারপর আঘা’ত পাওয়া গলায় বলল,

– আপনি বারবার এমন করেন কেন, স্নিগ্ধা? প্রতিটা পদক্ষেপে আপনি আমাকে কেন বুঝিয়ে দেন যে আমি আপনাদের পর?

স্নিগ্ধা চমকে উঠে ওয়াজেদের দিকে তাকাল। সে এমনটা কখন বুঝালো?!

– আ… আমি এমন..

ওকে থামিয়ে দিয়ে ওয়াজেদ বললো,

– আমি ভেবেছিলাম এই বাড়িতে আসার পর আপনি নিজেকে সম্পূর্ণ নিরাপদ আর মুক্ত মনে করবেন। কিন্তু আপনি এখনো আমাকে শুধু একজন উপকারকারী বা তৃতীয় ব্যক্তি মনে করছেন অথচ আমি আপনার কোনো উপকারই করিনি! আমার প্রয়োজন ছিলো আপনাদের তাই আপনাদের নিজের করে নিয়েছি ব্যাস!
আপনার কি মনে হয় আয়াত কেঁদে উঠলে বা আমার কাজে ব্যাঘাত ঘটালে আমি বিরক্ত হব? ও আমার কাছে আসছিল, আমার সাথে খেলছিল তাতে আপনার এত অপরাধবোধ হচ্ছে কেন?

স্নিগ্ধা অপরাধীর মতো মাথা নিচু করে ফেলল। ও তো এমন কিছু ভেবে করেনি! অপরাধবোধে ওর চোখ দুটো আবার টলমল করে উঠল। সে ফিসফিস করে বলল,

– না আমি তো আসলে সেভাবে ভাবিনি… আপনার তো গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিল…

– কাজ চিরকালই থাকবে, স্নিগ্ধা। কিন্তু সংসারের এই ছোট্ট মুহূর্তগুলো প্রতিদিন ফিরে আসবে না।

ওয়াজেদ উঠে দাড়িয়ে স্নিগ্ধার একদম কাছাকাছি এসে দাঁড়াল। ওর কণ্ঠস্বর এবার আরও খানিকটা কোমল হয়ে এলো,

– যে দেয়ালটা আপনি এখনো আমাদের মাঝখানে দাঁড় করিয়ে রেখেছেন, সেটা ভাঙার দায়িত্ব কিন্তু শুধু আমার একা নয়। আমি আয়াতকে আমার নিজের সন্তান হিসেবে মেনে নিয়েছি কোনো দয়া থেকে নয়, মন থেকে। তাই ওর কোনো দায় বা বায়না আমার ওপর চাপাতে আপনার এত দ্বিধা কেন? আমাকে এত ভয় আর এত পর ভাবা বন্ধ করুন, প্লিজ। আমার নিজের কাছেই অপরাধী মনে হয়।

ওয়াজেদের বাক্যের প্রতিটা শব্দ স্নিগ্ধার বুকের ভেতরে গিয়ে বিঁ’ধল। একটা মানুষের মনের গভীরতা কতটা হলে এতটা নিঃস্বার্থভাবে সবকিছু আপন করে নেওয়া যায়! স্নিগ্ধা চোখ তুলে ওয়াজেদের দিকে তাকাল।

– স্যরি আমি ওরকম কখনোই ভাবিনি। আপনাকে কষ্ট দেওয়ার উদ্দেশ্য আমার ছিলো না।

ওয়াজেদ মৃদু হেসে বললো,

– ইটস ওকে। মানিয়ে নিতে সময় লাগবে এটা মেনে নিবো কিন্তু আয়াতকে নিয়ে টানাটানি মানবো না। এবার নিন, রান্নাটা শেষ করে আসুন। এরপর থেকে আয়াত আমার কাছে থাকলে, কাজ ডিস্টার্ব হচ্ছে বলে ওকে কেড়ে নিয়ে যাওয়ার সাহস করবেন না একদম!

স্নিগ্ধা চোখের কোণের জমা জলটুকু সামলে নিয়ে ঠোঁটে এক চিলতে মিষ্টি হাসি ফুটাল। ধীরস্বরে আওড়ালো,

– আর কখনো এমন ভুল হবে না… ওয়াজেদ।

#চলবে….?