#তুমি_বৃষ্টি_হয়ে_নামলে
#পর্বঃ১৩
#লেখনীতে_তানিয়া
“তুই যে সাহসটা আজকে দেখিয়েছিস সেই সাহসটা যদি বছর পাচেঁক আগে দেখাতি তাহলে হয়তো আমি জীবনে একটা ভুল মানুষ বেছে নেওয়া থেকে বেচেঁ যেতে পারতাম। জীবনের পাঁচটা বছর আমার এভাবে নষ্ট হতো না। ভুল মানুষকে জীবনের সবকিছু ভেবে আকঁড়ে ধরার ভ্রমের মধ্য থাকতাম না। আমার এটা ভাবতেই খুব আফসোস হয় জানিস কাকে ভালোবেসে ছিলাম আমি!! যে কিনা আমাকে কোনোদিন ভালোবাসতেই পারেনি। নিজের জেদ আর ই”গো এর কাছে যাতে নত না হতে হয় সেজন্য এতোগুলো দিন আর বছর অভিনয় করে গেছে শুধু। থেকে থেকে এগুলো ভাবলে গা গুলিয়ে উঠে। আমার সাথে বিয়ের সম্পর্ক থাকা অবস্থায় সে অন্য কারো সাথে থেকেছে আবার সেই অপবিত্র শরীর নিয়ে আবার আমার কাছেও এসেছে। আর আমিও তাকে…… ”
জাফরিন এখনো শক্ত করে নিয়াজকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে আছে। এমন একটা মুহুর্তের জন্য সে কত দিন কত রাত অপেক্ষা করেছে তার হিসেব ঠিক নেই। কত রাত বিধ্বস্ত অবস্থায় না ঘুমিয়ে শেষ হয়েছে একমাত্র সৃষ্টিকর্তা আর সে জানে। নিয়াজের জীবনে অন্য কেউ আছে এটা জানার পরেও জাফরিনের নিয়াজের প্রতি এতোটুকু আকর্ষন কমেনি আর না কমেছে ভালোবাসা। সাইক্রিয়াট্রিষ্ট দেখিয়েছে। কাউন্সলিং নিয়েছে। কত কত মেডিসিন শেষ হয়ে গেছে। মাঝে মাঝে নিজেকে যখন নিয়ন্ত্রণ করতে পারতো না তখন নিজেকে শেষ করে দিতে চাইতো কিন্তু সাহসে কুলাতো না। এর প্রমাণ তার হাতের দাগগুলো। নিয়াজের কথাগুলো জাফরিন মন দিয়ে শুনলো। জাফরিন এর তুরফা সম্পর্কিত কোনো কথা শুনতে ইচ্ছে করে না। আজকের এই বিশেষ দিনেতো আরও না। জাফরিন বললো,
” তোমাকে না বলতে পারাটা ছিলো আমার জীবনের সবচেয়ে বড় বোকামি। আমার সত্যিই তখন সাহস ছিলো না। আমি ভেবেছিলাম মনের কথা বললে যদি তুমি আমাকে সিরিয়াসলি না নিয়ে হেসেই উড়িয়ে দাও তখন সেটা মেনে নিতে পারবোনা। আবার যদি অপমান করে রিজেক্ট করতে তাহলে তোমার মুখোমুখি কিভাবে হতাম বলো? এজন্যই বলতে পারিনি। যখন সাহস করলাম বলবো বলে তখনইতো ধাক্কাটা আসলো। আসলে জীবনের এই কঠিন সময় আমাদের নিয়তিতেই বাধাঁ ছিলো। তাই আমরা কেউ এটাকে এড়াতে পারিনি “।
নিয়াজ খুব উৎসুক হয়ে বললো,
” একটা প্রশ্ন করি?
জাফরিন বললো,
“একটা কেনো যতগুলো ইচ্ছা করো”।
নিয়াজ দ্বিধা নিয়েই বললো,
” এই যে বিদেশে এতোগুলো বছর থেকে আসলি কাউকে পছন্দ হয়নি? আমার চেয়ে দুনিয়াতে আরওতো কত যোগ্য কত ভালো মানুষ আছে। এমন কারো সাথেই পরিচয় হয়নি কখনও”?
জাফরিন নিয়াজের চোখের দিকে তাকায়। এই চোখের মায়ায় জড়িয়ে সে সেখান থেকে বেরই হতে পারেনি কখনো। অন্য কাউকে কি পছন্দ করবে। জাফরিন বললো,
” প্রস্তাব পেয়েছি অনেক। সেগুলো সব গুলোই ভালো ছিলো। এমনও হয়েছে যে ল ফার্মে জব করতাম সেখানে বিদেশি কলিগও আ্যপ্রোচ করেছিলো। সুযোগ লুফে নিলে এতোদিনে ব্রিটিশ সিটিজেনও হয়ে যেতাম। কিন্তু……
নিয়াজ যেনো আরও কৌতুহল নিয়ে শুনতে চাইলো। সে বললো
” কিন্তু কি”?
জাফরিন লাজুক হয়ে নিয়াজের ডান হাতটা তার বুকের কাছে নিয়ে বললো,
” এখান থেকে তোমাকে তখনও এক চুলও সরাতে পারিনি। অন্য কাউকে কি করে জায়গা দিতাম। মনে একজনকে রেখে আর জীবনে অন্যজনকে জড়ালে কেমন বেমানান হয়ে যেতো না? কোনো দিকেই ঠিকভাবে মনোযোগ দিতে পারতাম না “।
নিয়াজ যেনো একটু কেপেঁ উঠলো জাফরিনের কথা শুনে। এই মেয়েটা তাকে এতো ভালোবাসে৷ সে কি চোখে কাঠের চশমা পড়ে থাকতো নাকি চোখে ছানি পড়েছিলো কোনটা?পরক্ষনে ভাবলো ছানিইতো পড়েছিলো। তুরফা নামক ঝড়ের ছানি। যে আসার পর থেকে জীবনের সমস্ত কিছু উল্টো পালটাই শুধু হয়েছে। শান্তির বদলে অশান্তিই হয়েছে। যতই বোঝাপড়া করে ঠিক করার চেষ্টা করতো উল্টো হয়েছে ঠিক কিছুই হয়নি। তার চেয়ে দিন দিন সম্পর্কের অবনতি ঘটেছে। নিয়াজ জাফরিনকে বললো,
” আমি তোকে খুব কষ্ট দিয়েছি না? আমার জন্য তোর অনেক কষ্ট হয়েছে না জাফু?
জাফরিন কি বলবে ভেবে পেলোনা। অনেক কষ্টইতো কালকে অবধিও হয়েছে। এই গতরাতেওতো এই মানুষটার কথা ভেবে সে কেঁদেছে। সারারাত ঠিকমতো ঘুমায়নি। আর আজকে এসব হয়ে গেলো। জাফরিন নিয়াজকে বললো,
” তাতো দিয়েছোই। অনেক কষ্ট দিয়েছো। কত কেঁদেছি তোমার জন্য তুমি জানো? বুকের মধ্য কত ব্যাথা হতো এসব নিয়ে যখন ভাবতাম। কিন্তু তুমি এসব কি করে জানতে? তুমিতো তখন তোমার এক্স বউরে ভালোবাসতে ব্যস্ত৷ তাকে আদর করতে করতে তোমার হুঁশই ছিলো না।
নিয়াজ বুঝলো জাফরিন প্রচণ্ড জেলাস এসব নিয়ে। এই জন্যই তাকে তুরফার কথা তুলে খোঁচা দিচ্ছে। নিয়াজ কথা ঘুরানোর জন্য বললো,
” তুই যে আজকে আমায় ক”ট খাইয়ে দিলি সবার সামনে সেটা কেমন হলো বলতো? আমিতো ভেবেছিলাম তোর বাপ মা আজকে আমাকে দৌড়ানি দিয়ে বাড়ি থেকে বের করে দিবে। সত্যি বলছি আমি বেশ ভ”য় পেয়েছিলাম৷ মনে হচ্ছিলো এই বুঝি বলে তাদের মেয়েকে কি না কি করেছি। তার মধ্য আবার ডিভোর্স হয়েছে। বলেই না বসে তোকে ভুলিয়ে ভালিয়ে পটানোর চেষ্টা করছি। আর ওসব!! তুই যে আমাকে হঠাৎ করে এরকম আদর করবি এটা আমি কখনোই ভাবিনি। তুই যে ইন্ট্রোভার্ট মেয়ে!! ”
জাফরিন বললো,
” আমার মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছিলো মায়ের বান্ধবীর কথা শুনে। এই মহিলাটা বলা নেই কওয়া নেই দুম করে বাড়িতে নিজের স্বামী আর ছেলেকে নিয়ে এসেছে মেয়ে দেখবে বলে। মাকে বলতে শুনেছি কিন্তু মহিলা যে এরকম কিছু করবে ভাবতে পারিনি। ছোটবেলা থেকেই দেখে আসতেছি সবকিছুর মধ্য নাক গলানোর অভ্যাস তার। দুনিয়ার সব কিছুর খবর তার কাছে থাকে বিশেষ করে কারো ঘরের হাড়ির খবর “।
নিয়াজ একটু জোরেই হাসলো আর বললো,
” তুই যদি আজকে জেদ করে ওই আন্টির ছেলেকে বিয়ের জন্য
রাজি হয়ে যেতি তাহলে কি হতো”?
জাফরিন কোনো ভনিতা না করে বললো,
” কি আর হতো!! নিজেকে বুঝাতাম তুমি কোনোভাবেই আমার কপালে নেই। আর না বুঝাতে পারলে আজকের মতোই কিছু একটা করে বসতাম হয়তো “।
এই কথা শুনে নিয়াজ জাফরিনকে আরও কাছে টেনে নেয়। এতো কাছে যে জাফরিন নিয়াজের শ্বাস গুনতে পারছে এমন অবস্থা। নিয়াজ জাফরিনকে কঠিন গলায় বললো,
” আর কোনোদিন যদি এসব চিন্তা মাথায় আসে আর একটা আ”ঘা”ত ও যদি এইভাবে গায়ে লাগাস সেদিন আমার চেয়ে খারাপ কেউ হবে না। নিজেকে কখনো এইভাবে কষ্ট দিবি না। এটা অন্যায় জাফরিন। মানুষ এই বেচেঁ থাকার জন্য কত কি করে। একদিন হসপিটালে যেয়ে দেখিস। সেখানে দেখতে পারবি দুনিয়াতে আরও দুটো দিন বেশি বাঁচার জন্য মানুষ কত চেষ্টা করে। কত হাহাকার আর আহাজারি করে”।
জাফরিন বলে,
” তোমাকে পেয়ে গেছিতো আজকে। আর এমন করবো না। প্রমিস করছি”।
নিয়াজ নরম হলো কিন্তু তটস্থ স্বরে বললো,
” মনে যেনো থাকে “।
জাফরিন বললো,
” আমিতো ভাবতেই পারিনি তুমি এভাবে রাজি হয়ে যাবে? আমিতো মনে করেছিলাম তুমি বাবার কথা শুনে রেগে অভিমান করে বাড়ি থেকে বের হয়ে যাও কিনা? আচ্ছা তুমি কি বাধ্য হয়ে বিয়েটা করেছো?তোমার একটুও ইচ্ছা ছিলো না তাইনা?
নিয়াজ ভনিতা না করে বললো,
” পুরুষ মানুষকে কখনো জোর করে বাধ্য করা যায়? পুরুষ মানুষ কখনো নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে বিয়ে করে না। বিয়ে করতে চায় বলেই করে। আমি নিজের ইচ্ছাতেই রাজি হয়েছি বিয়ের জন্য। বিয়েতো আজ হোক বা কাল বা আরও সময় পর করতামই। আমিতো সাধু সন্ন্যাসী না যে সারাজীবন একজন চি”টা”র এর জন্য নিজের জীবন ওখানেই আটকে রাখতাম। সময় নিতাম হয়তো আরও। আর মারওতো বয়স হচ্ছে। কতদিন এই মানুষটাকে আমার জন্য কষ্ট দিতাম বল। আমার অবস্থার জন্য সে অনেক হয়রান হয়েছে। আমাকে একা হাতে সামলেছে। আমিতো ওই একজন মানুষের জন্যই বলতে গেলে কিভাবে যেনো নিজেকে সামলাতে পেরেছিলাম”।
জাফরিন লম্বা একটা শ্বাস নিলো। ঘড়িতে দেখলো দুটো বাজে। তারা অনেকক্ষন গল্প করছে। নিয়াজ তাকে তাগাদা দিচ্ছিলো ঘুমানোর জন্য অথচ বউয়ের সাথে দিব্যি গল্প করছে। জাফরিন গল্পে গল্পে খেয়ালই করেনি যে নিয়াজ তাকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে রেখেছে। নড়াচড়ার একটুও সুযোগ নেই। জাফরিন নিয়াজের দিকে তাকালো। এতো সাধনার মানুষকে এতো কাছে থেকে অনুভব করছে ভেবেই এক অদ্ভুত ঠান্ডা শিহরণ তার পুরো গা বেয়ে নেমে গেলো। একটা ঘোর লেগে আসছে তার। এই সুদর্শন ডাক্তার সাহেব আজকে থেকে তার স্বামী হয়ে গেছে। এই মানুষটার শরীর, মন আরজীবন সবকিছুর উপর তার অধিকার আছে । এখন আর কোনো বাধাঁ নেই। না তাকে ছুঁতে আর না তাকে অনুভব করতে। জাফরিনকে অনেকক্ষন এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে নিয়াজ বললো,
” কি দেখছিস এমন করে? ঘুম পাচ্ছে?
জাফরিন বললো,
” তুমি আমার এতো কাছে আছো। জানো আমিতো ভেবেছিলাম বাংলা সিনেমার মতো তুমি ঘরে এসে বলবে জাফরিন আমার পক্ষে এই বিয়ে এখনই মেনে নেওয়া সম্ভব নয়। সময় লাগবে। তাই তুই বেডে ঘুমাবি আর আমি সোফায় ঘুমাবো “।
নিয়াজ জোর করে হেসে উঠলো। কয়েক সেকেন্ড পরেই তার হুশঁ হলো এখন অনেক রাত হয়েছে। কোনোরকমে হাসি চেপে রেখে বললো,
” তুই এসব বাংলা সিনেমা আর সিরিয়াল খুব দেখিস তাই না”?
জাফরিন বললো,
” এখন দেখিনা। আগে দেখতাম “।
নিয়াজ আবারও হাসলো। জাফরিনের কপালে টোকা দিয়ে বললো,
” পাগলি মেয়ে “।
জাফরিনও হাসো এসব কথায়। নিয়াজের ঠোঁটে হাসি দেখে জাফরিন এর কেনো জানি তীব্র আকর্ষন হচ্ছে। নিয়াজকে সে মনে প্রানে সবভাবে নিজের করে চাচ্ছে। হয়তো স্বামী -স্ত্রীর সম্পর্ক এমনই। দুই মেরু এক জায়গায় হলে চুম্ব”কের মতো আকর্ষন করে। জাফরিন নিজেকে আর নিয়ন্ত্রণ করতে পারলো না। চাইলোও না। নিয়াজের মুখটা আলতো করে দুই হাতের আজলায় নিয়ে নিজের মুখ বরাবর আনলো। নিয়াজ কিছু ঠাওর করার আগেই জাফরিন নিয়াজের ঠোঁটজোড়া আকঁড়ে ধরলো। দ”স্যুদের মতো জাফরিন নিয়াজের মনে কড়া নাড়লো। হঠাৎ করে জাফরিনের এই অতর্কিত আ” ক্র”ম”ন নিয়াজের সামলাতে একটু বেগ পেতে হলো। নিয়াজ চাইলেই থামাতে পারে কিন্তু সে চাইছে না। সেও চাচ্ছে জাফরিন তাকে আজকে নিঃস্ব করে দিক।অনেক ক্লান্ত আর তৃষ্ণার্ত সে। আরাম দরকার তার। একটু একটু করে মেয়েটা নিয়াজের উপর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ফেললো। মরুভূমির উত্তপ্ত বালিতে এক পশলা বৃষ্টি হলে যেমন সবকিছু শুষে নেয় তেমনি জাফরিনের প্রতিটা আদরের স্পর্শ নিয়াজকে আরও বেপরোয়া আর নিয়ন্ত্রণহীন করে ফেলছে। অবশেষে নিয়াজ আত্নসমর্পণ করলো। বাহিরে তুমুল বৃষ্টি হচ্ছে৷ যত রাত বাড়ছে আদরের স্পর্শ তত গভীর হচ্ছে। শেষ রাতে জাফরিনের কান্না নিয়াজকে আবারও অস্থির করে তুললো। নিয়াজ তার আদুরে বউয়ের কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে বললো,
” আর কাঁদিস না বউ। তোকে কাঁদতে দেখলে ভালো লাগে না”।
ব্যাস আর কি জাফরিন নিয়াজের গলা জড়িয়ে আরও বেশি কাঁদলো। কান্নাভেজা মুখ নিয়েই নিয়াজকে আরেকদফা আদর করতে মত্ত্ব হলো সে। গলায় মুখ ডুবিয়ে ফিসফিস করে বললো,
” তুমি সত্যিই আমার হয়েছো? আমার এখনো সব স্বপ্ন মনে হচ্ছে। ঘুম ভেঙে গেলে এই স্বপ্ন কি ছুটে যাবে”?
নিয়াজ জাফরিনের চুলের ভাঁজে চুলে বিলি কে”টে দিতে দিতে রসিকতা করে বললো,
“এতো আদর ভাব ভালোবাসার আদান প্রদান কি স্বপ্নে হয়? তুই স্বপ্নে নেই। এসব সবই সত্যি। আমি সত্যি। তুই সত্যি আর আজকের এই রাতের মুহুর্তগুলোও সত্যি “।
জাফরিন নিয়াজের উন্মুক্ত বুকে আশ্রয় নিলো। ভেজা চোখ থেকে কয়েক ফোটা জলও লেপ্টে গেলো। জাফরিন ওভাবেই বললো,
” ভালোবাসি, ভালোবাসি ভালোবাসি৷ ভীষণ ভালোবাসি নিয়াজ রাশিদ তোমাকে। আমার হাত ছেড়োনা কখনো৷ প্লিজ আগলে নিও”।
নিয়াজ সবটা শুনলো কিন্তু তৎক্ষনাত জবাব দিতে পারলো না। আসলে তারতো আবার ভালোবাসা বিষয়টাতে ধাতস্থ হতে হবে। জাফরিন যাতে মন ভার না করে এজন্য বললো,
” তোকে আগলে না নিলে কি করে বাঁচবো বল? এই যে হাত ধরেছি আজকে আর ছাড়বোনা কখনো। তুই ছাড়া ভালোবাসা দেবার মতো আমার জীবনে কেইবা আছে “?
এভাবেই ভাব ভালোবাসা দিতে আর নিতে নিতে তারা কখন ঘুনিয়ে পড়েছে সে খেয়াল নেই তাদের। সকাল দশটা। নিয়াজের ঘুম ভাঙলো। সকালের রোদ পর্দা ভেদ করে ঘরে এসে আবছা আলো ফেলছে। নিয়াজ এর বুকের বাম পাশটা ভারি মনে হলো। ধীরে ধীরে চোখ মেলতেই দেখলো জাফরিন নামের এক নারী তার বাম পাশে বুকের উপর শুয়ে আছে। এমনভাবে জড়িয়ে ধরে আছে নড়াচড়ার উপায় নেই। নিয়াজ আলতো করে জাফরিনকে নিজের বুকের উপর থেকে তুলে বালিশে তার মাথাটা রাখলো। জাফরিন তখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। নিয়াজ ভালো করে দেখলো জাফরিনকে। এতো মায়া কেনো এই মুখে। এই মুহুর্তে জাফরিনকে আকাশ থেকে নেমে আসা রুপকথার কোনো এক অপসরী মনে হচ্ছে। একে একে গত দিনের সব কথা মনে করে হাসলো সে। রাতে জাফরিনের করা নিয়ন্ত্রণহীন পাগ” লামোর কথাও মনে পড়লো। নিয়াজ জাফরিনের গাল ছুইঁয়ে বলে,
” এতো ভালোবাসা নিয়ে কিভাবে এতোদিন বিদেশে পড়েছিলি?
জাফরিন ঘুমের মধ্যেই একটু নড়ে উঠে। নিয়াজ জাফরিনের বাম হাতটা দেখে। ব্যান্ডেজটা ঠিক ঠাক আছে কিনা। ঠিক আছে তবে আবার ড্রেসিং করে দিতে হবে। জাফরিনকে ঘুমাতে দিয়ে নিয়াজ বিছানা ছেড়ে উঠে। ওয়ারড্রোব থেকে একটা টি শার্ট বের করে জাফরিনকে কোনোরকমে পড়িয়ে দেয় যাতে হুট করে ঘুম থেকে উঠে নিজেকে দেখে বিব্রতবোধ না করে। মেঝেতে ছড়িয়ে থাকা সমস্ত কাপড় চোপড় উঠিয়ে নিয়ে ওয়াশরুমে যায় ফ্রেশ হতে। হসপিটালে যেতে হবে তাকে। হঠাৎ করে এতোকিছু হয়ে গেলো। ছুটি নেওয়া হয়নি। আজকে গিয়ে ছুটির জন্য এপ্লাই করতে হবে। অনেক ছুটি জমা পড়ে আছে এমনিতেও৷ ফ্রেশ হয়ে এসে অফিসের জন্য রেডি হয়ে জাফরিনকে ডাকে সে। সকালের মেডিসিন আছে। জাফরিন তখনো ঘুমে আচ্ছন্ন৷ নিয়াজ তার কাছে গিয়ে বসে। জাফরিনের বেবি হেয়ারগুলো মুখে এসে পড়েছে সেগুলো আলতো করে কানের পিঠে দিয়ে দেয়। তারপর ধীরে ধীরে মাথায় হাত বুলিয়ে ডাকতে থাকে।
“জাফরিন..জাফরিন উঠতে হবে। অনেক সকাল হয়ে গেছে। কিছু খেয়ে মেডিসিন নিতে হবে। হাতের ব্যান্ডেজটাও ড্রেসিং করতে হবে। জাফরিন…”।
জাফরিন ঘুমের মধ্যই বলে উঠে,
” এই লোক আমাকে স্বপ্নের মধ্য এসেও ওষুধ খেতে বলে। কই একদিন এসেতো দু চারটা চু”মুও খেতে পারে। আনরোমান্টিক ব্যাডা “।
নিয়াজ ভ্রু কুঁচকে তাকায় জাফরিনের ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকায়। কি বললো মেয়েটা?? সে আনরোমান্টিক!! সারারাত রামায়ণ পড়ে সকালে সীতা রামের মাসি হয়ে গেলো না ব্যাপারটা। নিয়াজ মুখ ফুলিয়ে বেশ জোরেই জাফরিনকে বলে,
” এতো আদর করার পরেও আমি আনরোমান্টিক ব্যাডা মানুষ “”?
জাফরিন কথাটা শুনে ঘুম ছুটে যায়। চোখ খুলে নিয়াজকে নিজের এতো কাছে দেখতে পেয়ে ভড়কে যায় সে। হ্যাবলার মতো বলে উঠে,
” তুমি এখানে কি করছো”?
নিয়াজও কম যায়না সেও বললো,
” স্বামীর কাছে বউ কি করে?
জাফরিন বলে,
” কে স্বামী? কার স্বামী “?
নিয়াজ বলে,
” জাফরিন রিল্যাক্স হ। ঘুম থেকে উঠেছিস তাই সব গুলিয়ে ফেলছিস”।
জাফরিন স্থির হয়ে নিয়াজের দিকে তাকায়। কয়েক সেকেন্ড যেতে না যেতেই পেছনের ঘটা ঘটনাগুলো মনে পড়ে। রাতের কথাগুলো মনে পড়তেই নিজের দিকে তাকায় সে। লজ্জায় আবারও কাঁথার মধ্য মুখ লুকায়। নিয়াজ হেসে বলে,
” হুঁশে আসছেন ম্যাডাম? মনে পড়েছে সব? তুই না বললি আমি আনরোমান্টিক ব্যাডা মানুষ । আয় তোরে আরেকটু বুঝায় দেই “।
জাফরিন কাথার নিচ থেকেই বলে,
” না এখন বুঝবো না। ব্রাশ করিনি। বাসি মুখে তিতা লাগবে সব “।
চলবে……………

