#তুমি_বৃষ্টি_হয়ে_নামলে
#পর্বঃ৪
#লেখনীতে_তানিয়া
“কোন মুখ নিয়ে তুমি আমার ছেলের কাছে এসেছো? তোমার লজ্জা করে না? যেখানে গিয়ে তোমার শরীর আর মনের লজ্জা বেচেঁ দিয়ে এসেছো সেখানে চলে যাও। খবরদার আমার ছেলের আশেপাশে ঘেষার চেষ্টা করবে না। কেমন মেয়ে মানুষ তুমি স্বামী সংসার রেখে আরেক পুরুষের ঘর অবধি ফুর্তি করতে পৌঁছে যাও?
হাসপাতালের করিডোরে নিয়াজের মা সালেহা রাশিদ চিৎকার করে কথাগুলো বললো তুরফাকে। নিয়াজকে হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়েছে। টিভিতে খবরটা শোনার পর সে জ্ঞান হারিয়েছিলো। তাই তাকে ভালো চিকিৎসার জন্য প্রাইভেট হসপিটালে আ্যাডমিট করা হয়েছে। ডাক্তাররা পরীক্ষা করছেন তাকে। ছেলের এই অবস্থার জন্য বিলাপ করে কাঁদছেন। তার এতো শান্ত শিষ্ট ছেলেটার এই অবস্থা তিনি মেনে নিতে পারছেন না। তার সুস্থ ছেলেটা কিভাবে অসুস্থ হয়ে গেছে। নিয়াজের অন্য কলিগরাও এসেছে এখানে। তারা নিয়াজের মাকে শান্তনা দিচ্ছে। এদিকে তুরফার সাথে সাথে তার বাবা মাও এসে পৌছেছে। মেয়ের দিকে তাকাতেই তাদের চোখ মুখ শক্ত হয়ে আসলো। তুরফার বাবা মেয়েকে কিছু বলতে যাবে তার আগেই ডাক্তার ভেতর থেকে বের হয়ে বললো,
” পেশেন্ট এর বাড়ির লোকজন কে”?
সালেহা রাশিদ বললো,
” আমি ওর মা। কি হিয়েছে নিয়াজের? আমার ছেলে ও সুস্থ আছেতো?
ডাক্তার বললো,
” ভ”য়ের কিছু নেই উনি সুস্থ আছেন৷ রিপোর্ট সব নরমাল এসেছে। প্রচণ্ড মেন্টাল স্ট্রেস নেওয়ার জন্য জ্ঞান হারিয়েছিলেন। আর উনি বোধ হয় গত কয়েকদিন রাতে ঠিকমতো খাওয়া দাওয়া করেনি সাথে ঘুমাননি। যার কারনে প্রেশার আপডাউন হয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ে মনে হয়েছিলো স্ট্রোক করেছেন এমন কিছু। না সৃষ্টিকর্তার অশেষ রহমতে ভালো আছেন। ঘুমের ওষুধ দেওয়া আছে। ঘুমাচ্ছেন। ঘুম থেকে উঠলে আপনারা উনাকে বাড়ি নিয়ে যেতে পারবেন। উনার খাবার দাবার আর ঘুমের দিকে নজর দিতে হবে। হেলাফেলা করা যাবে না। ডাক্তার মানুষ নিজের প্রতি এতো বেখেয়াল হলে চলে?
উপস্থিত সবাই যেনো এতোক্ষন দম ধরে ছিলো। ডাক্তারের কথায় শ্বাস ফেললো।
_______________
দুদিন পর। নিয়াজ হসপিটাল থেকে বাড়ি ফিরে বিশ্রামে আছে। ডাক্তার তাকে বিশ্রাম নিতে বলেছে। সবকিছু বিবেচনা করে তাকে দুই সপ্তাহের ছুটি দেওয়া হয়েছে। তুরফা এই দুদিন বাবার বাসায় ছিলো। নিয়াজের মা তুরফাকে সহ্যই করতে পারছে না। নিয়াজ আজকে সুস্থ বোধ করছে। তাই তুরফার সাথে খোলাখুলি কথা বলার জন্য ডেকেছে বাসায়। তুরফা আর নিয়াজ নিজেদের সেই চেনা ঘরে। কিন্তু তারাই যেনো আজকে দুজনের কাছে সবচেয়ে অপরিচিত। নিরবতা ভেঙে নিয়াজই বলে উঠলো,
“স্বামী থাকতেও পরপুরুষ এর বিছানায় গিয়ে তার স্পর্শ শরীরে বয়ে নিয়ে এসে কিভাবে আবার আমাকে ছুয়েঁছো? নিজেকে অচ্ছুৎ অপবিত্র মনে হয়নি একবারো? নিজেকে আয়নায় দেখে গা ঘিন ঘিন করে উঠেনি? গা গুলিয়ে উঠে বমি পায়নি? পরপুরুষ এর ছোয়াঁটা মনে হয় খুব ভালো লেগেছে তোমার কাছে তাই না? এইজন্যই আমার আড়ালে দিনের পর দিন এই আদিম খেলায় মত্য হয়ে ছিলে? কি ভেবেছিলে এভাবেই চালিয়ে যাবে সব? তোমার মধ্য কি লজ্জা হায়া বলতে কিছু নেই তুরফা?
তুরফা নিয়াজের মুখোমুখি। তুরফার মধ্য কি চলছে ঠাওর করা যাচ্ছে না। তবে তার চোখ বলছে সে যতটা না নিয়াজের মুখোমুখি হতে ভ”য় পাচ্ছে তার চেয়ে বেশি চিন্তা করছে নিজের আগামী দিনগুলো নিয়ে। সে জানে নিয়াজকে আর কোনোভাবেই থামানো সম্ভব না। নিয়াজের সাথে তার সংসারটা টিকবে না৷ স্বামী হিসেবে তুরফা শুধু তাকে ভালো মানুষের রুপ নিয়েই দেখেছে। চার বছরের সংসারে তার অসংখ্য ভুল ত্রুটি অন্যায় আবদার মেনে নিয়েছে। মানিয়ে নিয়েছে। তুরফা এতোটাই দাম্ভিক আর আত্নকেন্দ্রীক একটা মেয়ে যে সে কখনোই নিয়াজকে নিজের স্বামী হিসেবে জীবনের প্রথম গুরুত্বের জায়গায় বসায়নি। সে নিজে যেটা বুঝতো সেটাই তার কাছে ঠিক মনে হতো। অন্যকেও সেটাই মনে করতে হতো না মানতে চাইলেও। নিয়াজ মাঝে মাঝে হাঁপিয়ে যেতো সম্পর্কের ব্যালেন্স করতে গিয়ে। তারপরেও তুরফাকে সে ভালোবেসেছে। তার প্রতিদান সে আজকে এইভাবে পেলো যা সে কল্পনাও করেনি। তুরফাকে চুপ করে থাকতে দেখে নিয়াজ বললো,
” কি ব্যাপার চুপ করে আছো যে? আজকে কোনো চিৎকার করে কথা বলছো না? চুপ করিয়ে দিচ্ছো না। জেদ করছো না? কি ব্যাপার এতো শান্ত কেনো?
নিয়াজের এই বিদ্রুপ যেনো তুরফাকে আরও বেশি গ্রাস করে ফেললো। কি বলবে সে। কি সাফাই দিবে? সাফাই দিলেও কি নিয়াজের সাথে সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে? তুরফা কাপাঁ কাঁপা গলায় বললো,
আমাদের মধ্য এতো বেশি দূরত্ব তৈরী হয়ে গিয়েছিলো যে বুঝতেই পারিনি আমরা কবে একে অপর থেকে এতো দূরে চলে গিয়েছি। আসলে আমরা আমাদের সম্পর্কে সময় দেইনি যার কারনে…..
নিয়াজ কঠিন গলায় প্রশ্ন করে,
” যার কারনে স্বামী রেখে আরেক পুরুষের বিছানায় গিয়ে সেই খায়েশ পূরণ করে ফেলেছো এইতো? নিজের চরিত্রে এতো বড় একটা দাগ লাগানোর আগে তোমার কি একবারো বুক কাঁপে নি? আমাকে কি কখনোই একটুও ভালোবাসোনি? এতোদিন ধরে কিভাবে অভিনয় করে গেছো?ক্লান্তি আসেনি? একবার আমাকে বলতে পারতে। আমি তোমাকে মুক্ত করে দিতাম এই সম্পর্ক থেকে। তারপর এসব লীলা খেলায় মত্য হতে৷ আমার স্ত্রী হয়েই কেনো”?
তুরফা যেনো এবার বেশ ক্ষুব্ধ হলো। নিয়াজ শুধু তাকেই দোষারোপ করে যাচ্ছে। দোষ কি তারও ছিলো না। রাগে বলেই ফেললো,
” তুমি কি কখনো জানতে চেয়েছো আমি তোমার সাথে সুখী কিনা? তোমার উপর আমি সন্তুষ্ট কিনা? শুধু স্বামী হলেই হয় না বউকেও সুখী রাখতে হয় “।
নিয়াজ তাচ্ছিল্যের সুরে হেসে বললো,
” কিসে অসুখী ছিলে তুমি? কোন জিনিসটা আমার কাছে চেয়েছো বলা মাত্রই তোমাকে আমি দেইনি? যা বলেছো মেনে নেইনি? যা করতে চেয়েছো করতে দেইনি? কি সুখের কম ছিলো তোমার?
তুরফা সোজাসুজি বললো,
” তোমার এই ভালোমানুষিটাই আমার অসহ্য লাগে। এতো ভালো মানুষ হয়ে থাকো যে আমার রীতিমতো দম বন্ধ হয়ে আসে তোমার সাথে থাকতে”।
নিয়াজ কি বলবে কি বলা উচিত আর কি প্রশ্ন করা উচিত বুঝলো না৷ তারপরেও বললো,
_ এজন্য স্বামী রেখে বাহিরে অপকর্ম করে বেড়াতে হবে? এতোই যখন সমস্যা ছিলো বলোনি কেনো?শেষ করে দিতাম সব। এভাবে এতোগুলো জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলার অধিকারতো তোমার নেই তুরফা। এই জন্যই কি তুমি ট্রান্সফার নিতে চাইছিলে না? পিরিতের নাগরকে ছেড়ে আসতে হবে দেখে তুমি ট্রান্সফার না নেওয়ার এতো অজুহাত আমাকে দিচ্ছিলে?
তুরফা খেই হারিয়ে বললো,
” হ্যা হ্যা তুমি ঠিকই বুঝেছো। এই জন্যই আমি আসতে চাইনি। তোমার এই এতো বড় পরিবারে এতো মানুষজনের সাথে আমি কিছুতেই থাকতে চাইনি। আমার কখনোই ভালো লাগেনি তোমাদের বাড়ি থাকতে। কোনো প্রাইভেসি নাই। যখন তখন যে কেউ ঘরে ঢুকে যায়। যেটুকু সময় পেতাম দুজনে মাঝখানে তোমার মা এসে সংসার কিভাবে করতে হবে লেকচার শুনিয়ে যান৷ এটা করা যাবে না সেটা কেনো করো কত প্রশ্ন সবার”।
নিয়াজ যেনো অবাক এর চরম সীমানায় গেলো। এসব কি বলছে তুরফা? চার বছরের সংসারে দুই ঈদ ছাড়া কবে তুরফা সবার সাথে দুটো দিন ভালো করে থেকেছে তার মনে পড়ে না। তারাতো কবে একটানা এক সপ্তাহ ভালো করে একসাথে থেকেছে সেটাও হাতে গুনে বলে দেওয়া যাবে। তুরফা এ বাড়ি আসতে চাইতো না ওর মা জোর করে তুরফাদের বাড়ি পাঠিয়ে দিতো তাকে। যাতে কোনো ঝামেলা যেনো না হয়। এতোদিন পর এসে এসব বলে কি বুঝাতে চাচ্ছে সে? নিয়াজ বললো,
” তুমি কতদিন সবার সাথে থেকেছো যে তোমার এই সংসারে আমার কাছে থাকতে প্রাইভেসি নষ্ট হয়েছে? তুমিতো ছুটি পেলেই বাবার বাড়ি যেতে। যার জন্য প্রাইভেসি নষ্ট হয়েছে বলে দোষারোপ করছো সে নিজে আমাকে ধরে বেধে তোমাদের বাড়ি পাঠাতো। তুমি সংসারের কোনো কাজ কখনো করতে? আমাকেতো কখনো এক কাপ চা “টাও করে খাওয়াওনি। আর আজকে এতো অভিযোগ। এসব বলে কি ভেবেছো তোমার পা/প কমবে? তুমি যে চরিত্রে দাগ লাগিয়েছো সেটা মুছে যাবে? আমার ভাঙা বিশ্বাস, মান, সম্মান সব ঠিক হয়ে যাবে”।
তুরফা আর সহ্য করতে না পেরে বললো,
“এতোই যখন সমস্যা আমাকে ডিভোর্স দিয়ে দাও। তুমিও বাচোঁ আমিও বেচেঁ যাই।
” সমস্যাতো সেই শুরু থেকেই ছিলো। সব কিছুতো শেষ করেই দিয়েছিলাম। তুমিতো নিজের স্বার্থে আর বেপরোয়া জেদে আবার আমাকে বাধ্য করেছিলে এই সম্পর্কে ফিরতে। আচ্ছা তুমি ঠিক কি চাও বলোতো? আমারতো মনে হয় তুমি নিজেও বুঝতে পারোনা আসলে তুমি কি চাও। তুমি ঠিক সেটাই করো যেটা করলে তোমার জেদ আর ইগো বজায় রাখতে পারো। বাকি দুনিয়া যা হয় হয়ে যাক। এখানে আমাকে মোহড়া কেনো বানিয়েছিলে বলবে আমায়? তাহলে অন্তত নিজেকে বুঝ দিতে পারতাম জীবনে কত বড় ভুল করেছি তোমার মতো মেয়েকে ভালোবেসে বিয়ে করে। বারবার সুযোগ দিয়ে।
তুরফা আর ধৈর্য রাখতে পারলো না। রাগের মাথায় বলে ফেললো,
” আমি কি পারি আর না পারি সেই কৈফিয়ত তোমাকে দিতে বাধ্য নই। আমি এখন যেটা চাই তা হচ্ছে মুক্তি। আমি এই সম্পর্ক এই বিয়ে থেকে মুক্তি চাই। আমি তোমার কাছ থেকে মুক্তি চাই। তোমার সাথে থাকতে আমার আর ভালো লাগে না। আমি তোমার সাথে কোনোভাবেই খুশি না। শারীরিক বা মানসিক কোনোভাবেই তোমার উপর আমি সন্তুষ্ট হতে পারি না। আমি আবেগের বসে ভুল করেছি। আমার এখন মনে হয় তোমার প্রতি আমার কোনোকালেই ভালোবাসা বলতে কিছু ছিলো না। যা ছিলো সব আবেগ, মোহ আর জেদ। সব যখন সামনে এসেই গেছে তখন আর এসব নাটকের কোনো দরকার নাই। আমি আর অভিনয় করতে পারবো না। আমি ভালো থাকতে চাই আর সেটার কারন আমি পেয়ে গেছি”।
নিয়াজ শুধু তুরফার নিলর্জ্জ আর নির্লিপ্ত ভাবটা দেখছে আর অবাক হচ্ছে। একজন নারী কতভাবে নিজেকে নিচে নামাতে পারে সেটা তুরফাকে না দেখলে সে বুঝতো না। এখন তার মনে হচ্ছে মাটি দুভাগ হয়ে যাক আর সে ঢুকে পরুক তার মধ্যে। নিজের হাতে নিজের জীবনকে সে এই নরকে ঠেলে নিয়ে আসছে। একটা মেয়ে তার জীবনকে আজ সুনামির মতো তান্ডব চালিয়ে ভেসে নিয়ে যাচ্ছে। নিয়াজ নিজেকে সংযত করেবললো,
” বাহ্ এতোদিনে এসে তাহলে সত্যিটা উপলব্ধি করতে পেরেছো যে তুমি শুধু আমার সাথে অভিনয়ই করে গেছো। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তুমি কোনোদিন আমার প্রতি ভালোবাসা কি অনুভবই করো নি। করবে কি করে তুমিতো কোনোদিন চেষ্টাই করোনি। আর কি বললে শারীরিক বা মানসিকভাবে আমার উপর সন্তুষ্ট না? আমি স্বামী হয়ে তোমাকে সন্তুষ্ট করতে পারিনি এজন্য তুমি বাহিরে গিয়ে অন্য পুরুষের সাথে বেড শেয়ার করে সেই সুখ আর সন্তুষ্টি পেয়েছো। বাহ্ দারুন তুরফা। তোমাকেতো এই সাহসিকতার জন্য পুরস্কার দেওয়া উচিত। কিভাবে এই সুখ পাওয়ার গল্প শুরু হলো আমাকেও বলো। আমিও একটু জানি তোমার বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্কের রসালো গল্প। কি বলবে না?
তুরফা চোখ মুখ শক্ত করে প্রায় চিৎকার করে বললো,
” নিয়াজ তুমি কিন্তু এখন প্রচন্ড বাড়াবাড়ি করছো। সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছো সবকিছুর।
নিয়াজ তাচ্ছিল্যের সুরে হেসে বললো,
“আমি সীমা ছাড়াচ্ছি। আর তুমি কি করেছো বলো? তুমি সব সীমা অনেক আগেই ছেড়েছো। আর তুমি বলছিলে না তোমার মুক্তি চাই আমার থেকে। ঠিকাছে আমি রাজি। আমি সব দিক থেকে প্রস্তুত তোমার এই চাওয়া পূরণ করতে”।
তুরফা হকচকিয়ে গেলো। রাগের মাথায় বলেতো ফেলেছে সে মুক্তি চায় কিন্তু সত্যি সত্যি যদি নিয়াজ তাকে ডিভোর্স দিয়ে দেয় তাহলে এই মুহুর্তে সে আরও বাজে ভাবে ফেসে যাবে সবদিক থেকে। তার চাকরিটা এমনিতেই যাই যাই অবস্থা। মান সম্মানটাও নড়বড়ে হয়ে গেছে। এখন যদি সংসারটাও যায় তাহলে সে একেবারে শেষ হয়ে যাবে। সে সবদিক থেকে কোণঠাসা হয়ে গেছে। তুরফা নিয়াজকে কিছু বলতে যাবে তার আগেই নিয়াজ ঘর ছেড়ে বাহিরে বসার ঘরে চলে আসে। নিয়াজের পরিবার আর তুরফার বাবা মা উপস্থিত সেখানে৷ এতোক্ষণ তারা সবই শুনেছে। নিজের মেয়ের এসব কীর্তি শুনে লজ্জায় মাথা হেইট হয়ে যাচ্ছে তার। নিয়াজ এর মতো ছেলেকে তার মেয়ে ঠকিয়েছে ভাবতেই আহাজারিতে বুকের মধ্য হাহাকার করে উঠছে তার। তুরফার মা স্তব্ধ হয়ে গেছে। নিজের মেয়েকে মানুষ করতে পারেনি এই লজ্জায় তার আর বাঁচতে ইচ্ছে করছে না।যেই মেয়েকে সে এতো আদর আহ্লাদ দিয়ে মানুষ করেছে সেই মেয়ের জন্য আজকে তারা ঘর থেকে বের হতে পারছে না লজ্জায়। তারা নিয়াজের দিকে করুন দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে৷ এই ছেলেকে তাদের মেয়ে কত কষ্টই না দিয়েছে৷ তবুও কোনোদিন অভিযোগ করেনি। প্রচন্ড ভাবে ভালোবেসেছে তাদের মেয়েকে। কিন্তু সবার কপালে কি সুখ সয় তার মেয়ে যে কাজটা করেছে তার জন্য ছেলেটার কাছে তারা সবচেয়ে বড় দোষী। নিয়াজ ফোস করে শ্বাস নিলো। তারপর সবাইকে উদ্দেশ্য করে বললো,
” যেহেতু দুই পরিবারই এখানে আছে তাই সবকিছু সোজাসুজি ভাবে বলাই ভালো। তুরফার সাথে আমার আর থাকা সম্ভব না। এতো কিছুর পরেও নিজের নির্লজ্জতার সর্বনিম্ন স্তরে নিজেকে টেনে নিয়ে যাবার পরেও তার মধ্যে কোনো অনুশোচনা অনুতাপ বলতে কিছু নেই। সে আরও বুক ফুলিয়ে আমার কাছ থেকে মুক্তি চেয়েছে এবং আমিও এই নিয়ে আর কোনো সময় নষ্ট করতে চাইছি না। যদিও আর খারাপ হওয়ারই কি আছে। নিজের জীবনটাই তছনছ হয়ে গেছে আমার।
তুরফার বাবা অপ”রাধীর মতো নিয়াজের দিকে এগিয়ে এসে বললো,
_ আমাদের মাফ করে দাও বাবা। আমরা আমাদের মেয়েকে পড়ালেখা শিখিয়েছি ঠিকই কিন্তু মানুষ করতে পারিনি। তোমার সাথে আজ যা হচ্ছে তার জন্য আমরা দায়ী। আমরা ওকে সঠিক শিক্ষা দিতে পারিনি।
নিয়াজ তুরফার বাবাকে বললো,
” এভাবে বলবেন না। ভাগ্যে যা ছিলো তাই হয়েছে। আমার জীবনের এই দূর্যোগের জন্য আমি নিজেই দায়ী। পা”প যখন করেছি তার প্রায়শ্চিত্ত আমাকেই করতে হবে”।
নিয়াজের মা বললো,
” কি করতে চাইছিস বাবা? আমি কিন্তু এই মেয়েকে আর কিছুতেই বরদাস্ত করবো না। না তোর জীবনে আর না এই সংসারে। অনেক ছাড় দিয়েছি আর না। সব কিছু মাফ করতে পারলেও এরকম চরিত্র”হীন মেয়েকে মাফ করার মতো ভালো মানুষ হওয়ার সবর আমার মধ্যে নেই। তোর সবচেয়ে বড় ভুল ছিলো এই মেয়েকে নিজের জীবনে জায়গা দেওয়া। আর সেই ভুল করিস না। অনেক হয়েছে। যথেষ্ট হয়েছে এসব৷ মানুষ থু থু দিচ্ছে। কানাঘুষা করছে। মান সম্মান আর কিছু বাকি নেই”।
নিয়াজ চুপ করে আছে। কথা বলার শক্তি যেনো হারিয়ে ফেলেছে। নিজেকে এতো অসহায় মনে হচ্ছে তার। সেতো ভালোবেসেছিলো। এটাই কি তার অন্যায় হয়েছিলো? নিয়াজ আর তুরফা মুখোমুখি ঠিক যেমন দুজনের প্রেম শুরুর প্রথম দিনের মতো। সেদিন নিয়াজ ছিলো প্রচন্ড নার্ভাস কিন্তু আজকে সে একজন পরিণত শক্তপোক্ত মানুষ। যার মধ্য দয়া মায়ার লেশ মাত্র আছে কিনা বুঝার উপায় নেই। তুরফার দিকে এক পলক স্থির হয়ে তাকালো। তারপর উচ্চারণ করলো পরপর তিনটা শব্দ
_”এক তালাক”, দুই তালাক, তিন তালাক
ঘরের মধ্য সবাই শান্ত স্থির হয়ে তাকিয়ে আছে নিয়াজের দিকে। শুধু হতবিহ্বল হয়ে থমকে দেওয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে তুরফা। নিয়াজের তিন বার উচ্চারণ করা শব্দ শুনলো সে। চিৎকার করতে চাইলো কিন্তু গলা দিয়ে আওয়াজ বেরোলো না। নিয়াজ শেষ বারের মতো বললো,
_ তুরফা নামক কোনো নারীকে আমি আজ এই মুহুর্তে নিজের জীবন থেকে দা/ফ/ন করলাম। আজকের পর তার আর কোনো অস্তিত্ব আমার জীবনে নেই। অফিসিয়াল নোটিশ সময়মতো পৌছেঁ যাবে। কোনো রকম আওয়াজ ছাড়া সে যেনো আমার বাড়ি ছেড়ে এই মুহুর্তে চলে যায়।
নিয়াজ ঘরের ভেতর চলে গেলো। নিয়াজের প্রস্থান তুরফাকে জানিয়ে দিলো সে হারালো এমন এক মানুষকে যাকে সে একটু একটু করে নিঃশেষ করে দিয়েছে।
চলবে……………

