#দখিনা বারান্দায় তুমি আমি
#আফসানা_মিমি
|পঞ্চম পর্ব |
প্রদোষকাল হতে ঢের দেরি। দুই বান্ধবী আলাপনে ব্যস্ত। পৃথিবীর সকল গল্পের ঝুড়ি নিয়ে বসেছে দুজন। গল্পের চক্করে কখনো উচ্চস্বরে হাসছে তো কখনো ফিসফিসিয়ে কানে কি যেন বলছে। দুহা মন খুলে হাসছে। চোখ দিয়ে পানি বের হয়ে আসছে। এলমা ও মহা খুশি, বিপরীত বন্ধুকে পেয়ে। কাছাকাছি বাড়ি হওয়ার সুবাদে আসা যাওয়া করা যাবে এবার।
কথার ফাঁকে দুহা চলে যায় নিচে নাস্তা নিয়ে আসতে। এলমা আধ শোয়া অবস্থায়। পা নাচিয়ে গান গাইছে। মুঠোফোনের আওয়াজে বিরক্ত প্রকাশ করে। বুড়া আঙ্কেল লেখা মানুষটার ভিডিও কল এসেছে। রিসিভ করে নেয় এলমা। লম্বা সালাম জানিয়ে বলে,
‘ আমি বন্ধুর বাসায় এসেছি আঙ্কেল। ফিরতে সন্ধ্যা হবে। ততক্ষণে আপনি আম্মুর সাথে কথা বলুন। আমি আসলে না হয় পড়বো আপনার কাছে!’
আপরপাশের এলমার কথিত বুড়া আঙ্কেল কিছু বলল না। তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। এলমা দেখে ঘাবড়ে যায়। মিনমিন স্বরে বলে,
‘ আব্বুকে কিছু বলবিন না প্লিজ! আমি একটু পর চলে আসবো। কসম, আপনার কসম।’
দুহা প্রবেশ করে ঘরে। এলমার চিন্তিত মুখশ্রী দেখে প্রশ্ন করে,
‘ কি হয়েছে।’
‘ বাড়ি ফিরতে হবে, বুড়া আঙ্কেল ক্ষেপেছে। তুমি একটু বলে দিবে! যে আমাকে বাসায় এগিয়ে দিবে।’
হেসে ওঠে দুহা। হাত বাড়িয়ে ফোন নিতে চাইলে এলমা নাকোচ করে। ফিচেল হেসে বলে,
‘ বুড়া আঙ্কেলের চেহারা ভালো না। ক্যামেরা বন্ধ করে রেখেছি। তুমি বরঞ্চ দূর থেকেই বলো।’
তাই করলো দুহা। দূর থেকে বলল,
‘ চিন্তা করবেন না। নিজ দায়িত্বে পৌঁছে দিয়ে আসবো এলমাকে।’
ফোন কেঁটে দেয় এলমা। এগিয়ে এসে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে দুহাকে।
গল্প গুজবে কখন সময় অতিবাহিত হয়ে গেছে জানা নেই। দুহা, এলমাকে এগিয়ে দিয়ে আসবে। রহিমা খালা ও যেতে চাইছিলেন কিন্তু দুহা না করে দেয়। কেননা দুহার মা এখনই বাসায় আসবেন। দুহাকে না পেয়ে চিন্তা করবেন। পাঁচ মিনিটের রাস্তায় দুহার তেমন সমস্যাও হবে না।
‘ তুই কাউকে ভালোবাসিস, দুহা?’
সময়ের সাপেক্ষে চঞ্চল এলমা দুহাকে তুই বলে সম্বোধন করে। দুহাও একই। সময় নিয়ে প্রত্যুওরে বলে দুহা,
‘ একজন ছিল। যে এসেছিল কোন এক বসন্তে। মনের গহীনে লুকায়িত ভালোবাসা প্রকাশ করেছিল। অবুঝ ছিলাম, বুঝিনি তার ভালোবাসা। অতঃপর চলে গেছে সে বহু দূরে।’
এলমা থেমে গেল। দুহাকে এক পলক দেখে হেসে ওঠলো।
‘ এসব ভালোবাসা, আবেগ দুইদিনের জন্য।’
মানুষজন জড়ো হয়ে আছে রাস্তায়। দুহা কিছু বলতে পারলো না। এলমা মেয়েটা বলতে দিলে তো? কিছু মানুষ আছে, ভালো-খারাপ উভয় বিষয় জানার আকাঙ্খা থাকে। এলমাও তাই। ভীড় ঠেলে প্রবেশ করে। ষোল বা সতেরো বছরের একজন কিশোরীর র’ক্তা’ক্ত দেহ পড়ে আছে। ভয় পায় এলমা, শক্ত করে ধরে দুহার হাত। সাদা,নীল কম্বিনেশনের পোশাক পরিহিত মৃত কিশোরীর গায়ে। দুহা আরেকটু এগিয়ে যায় ভিতরে। বক্ষঃস্থলের ব্যাজ বলে দিচ্ছে দুহার কলেজের ছাত্রী সে। আঁতকে ওঠে দুহা। নিজেদের সুরক্ষার কথা ভেবে দূর চলে আসে।
বর্তমান সময়ে ঘর থেকে বের হতেও বুক কাঁপে। জীবনের নিশ্চয়তা নেই। সেখানে অ’প’হ’র’ণ থেকে শুরু করে খু’ন, এ যেন নিত্য দিনের বিষয়।
আরান বেড়িয়েছে ঘণ্টা খানিক আগে। চোখে চিকন ফ্রেমের চশমা, হাতে মোটা ঘড়ি,পরিধানে লাল টি শার্ট। গাম্ভীর্যপূর্ণ মুখশ্রী। হাঁটতে হাঁটতে দুহাদের আশেপাশে চলে আসে। প্রায় একশত গজ দূরে জড়ো হওয়া মানুষগন। এলমা এবং দুহাকে দেখতে পায় আরান, ভয়ার্ত অবস্থায়। ভ্রু কুঁচাকায় আরান। অসময়ে দুহা, এলমাকে দেখে রেগে যায়। দুহা এলমাকে তাগদা দিচ্ছিল তাড়াতাড়ি হাঁটতে। এলমা যখন থেকে শুনেছে তাদেরই কলেজের ছাত্রী মৃত কিশোরী। তখন থেকে চুপ হয়ে যায়।
‘ এলমা, সন্ধ্যা হয়ে আসছে। আমাদের এখানে থাকা উচিত হবে না। তোকে এগিয়ে দিয়ে আমার বাসায় যেতে হবে।’
সম্বিত ফিরে এলমার। দুহার পিছনে আরানকে এগিয়ে আসতে দেখে ঘাবড়ে যায় সে। মুখ লুকায় দুহার পিছনে। এলমার দৃষ্টি অনুসরণ করে দুহাও তাকায়। আরানকে দেখে মনের ভিতর শীতল হাওয়া বয়ে যায়। দুহা চলে যায় অন্য এক জগতে।
‘ এখানে কি করছো তোমরা? বাড়িতে অভিভাবক নেই নাকি? এই সন্ধ্যায় মেয়েদের একা ছাড়ে কীভাবে।
দুহা বাস্তবে ফিরে আসে। আরানের কাঠিন্য কথা শুনে ভরকে যায়। প্রত্তুত্তরে বলে,
‘ মাকে বলে এসেছি। এলমাকে পৌছে দিয়েই চলে যাবো।’
‘ বান্ধবীকে বাসায় পৌঁছে দেয়ার নাম করে ছেলেদের সাথে দেখা করবে বুঝি? বেয়াদবের সাথে সাথে তুমি অভিভাবকের কথাও শুনো না দেখছি।’
আরানের খোঁচা কথা দুহার কর্ণধারে আসে যা শুনে না চাইতেও দুহার চোখে পানি চলে আসে। আরানের আড়ালে তা মুছে ফেলে বলে,
‘ বাবা-মা আদব কায়দার পাশাপাশি ভালো শিক্ষাও প্রদান করেছেন। এমন কিছু করব না যেন বাবা-মার সম্মানহানি হয়।’
মুগ্ধ নয়নে আরান দুহাকে দেখছে। চটপটে দুহার স্বরে বদ বাঁদড় শুনতে বড্ড ইচ্ছে করছে। বুঝতে দিলো না আরান। এলমার দিকে মনোনিবেশ করলো এবার।
‘ বাসা কোথায়?’
এলমা এখনো দুহার পিছনে লুকিয়ে। আস্তে করে উওর দেয়,
‘ ঐ যে দুই বাড়ির পরের বাড়ির পরের বাড়িটা আমাদের।’
আরান ভাবুক নয়নে তাকিয়ে। দুহা হাসছে মুখ টিপে।
‘ একা যেতে পারবে? নাকি এগিয়ে দিতে হবে।’
দুহার পিছন থেকে চঞ্চল এলমা বের হয়ে আসে। হাস্যজ্বল হয়ে বলে,
‘ যেতে হবে না। এমনিতেই আপনি ভয়ংকর। আমার আঙ্কেল দেখলে অজ্ঞান হয়ে যাবে। এখানে দাঁড়ালেই হবে, আমি এক দৌড়ে চলে যাবো বাড়িতে।’
বলা শেষ কিন্তু কাজ করতে দেরি হয়নি। দুহাকে একবার জড়িয়ে ধরে দৌড়ে চলে যায় বাড়ির দিকে। এলমা বাড়িতে প্রবেশ করা স্ব-এক্ষে দেখে দুহাও আগায় নিজ বাড়ির দিকে। বাঁধা দেয় আরান।
‘ দাঁড়াও মেয়ে! আমি যাবো তোমার সাথে। বলা তো যায় না, যদি ছেলেদের চক্করে সত্যি সত্যিই পড়ো! আজ তোমার পরিকল্পনা সফল হবে না।’
রাগে একা হাঁটা ধরে দুহা। মুচকি হাসা আরান পিছু নেয়।
পুলিশ ইতিমধ্যে মৃত কিশোরীর ঘটনাস্থলে এসে পৌঁছেছে। মৃত কিশোরীর আশপাশ থেকে মানুষদের সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। সাদা পাওডার দিয়ে লাশের চারপাশে সীল এঁকে লা’শ সরিয়ে নিচ্ছে দুজন পুলিশ। লা’শ থেকে প্রায় দশ হাত দূর পর্যন্ত সাদা-হলুদ রঙের ফিতা দিয়ে সীল দেয়া হয়েছে। দুহা ভালোভাবে সবটা পর্যবেক্ষণ করল। আরানের ধমকে পিছনে ফিরে,
‘ মনে ভয়,সংশয় কিছু নেই নাকি? এখানে দাঁড়িয়ে আছো কেন? নিজে খু’নী’দের টার্গেট হতে?’
উওর দিলো না দুহা। ভেংচি কেটে চলে আসে সেখান থেকে।
দুহা সামনে আরান পিছনে। দুজনই নীরব। আরানের এর নীরবতা অপছন্দনীয়। দুহার কথা শুনতে ইচ্ছে করছে খুব। দুহাকে প্রশ্ন করে,
‘ নাম যেন কি বলেছিলে! মিসেস অবিবাহিত, না কি যেন?’
আড়চোখে তাকায় দুহা। লক্ষ্য করছে আরানের ভাবগতি। স্বাভাবিক আরান দৃষ্টি সম্মুখে। একটু পলকের জন্যও দুহার দিকে তাকাচ্ছে না।
‘ আমার নাম দুহা। মিস দুহা। অবিবাহিত।’
আরান হাসে। দুহাকে রাগিয়ে আনন্দ অনুভব করছে।
‘ সে যাই হোক। এই সময়ে আর বের হবে না। তোমার অভিভাবককে নিয়ে আগামীকাল কলেজে আসবে। সাবধান করে দিবো যেন অসময়ে বের হতে না দেয়।’
দুহা চিন্তিত লাশটাকে নিয়ে। আনমনে বলে ওঠে,
‘ মেয়েটা আমাদের কলেজের ছিল।’
আরান পাত্তা দিলো না। দুহার থেকেও স্বাভাবিক সে। যেন এসব খু’ন-খারাবিতে তার কোন ইন্টারেস্ট নেই।
‘ পুলিশ আছে তদন্ত করার জন্য। আমাদের মাথা না ঘামালেও চলবে।’
দুহা হঠাৎ থেমে যায়। আরানের দিকে ফিরে তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে,
‘ ভালোভাবে কথা বললে কী মুখ খসে যাবে?’
‘ সম্পর্কে তুমি বউ হও! যে মুখে মধুর কথা আসবে?’
দাঁড়ালো না দুহা। এত পথ দায়িত্বপালন করা আরানকে নিজের সুরক্ষার জন্য ধন্যবাদ পর্যন্ত জানালো না। বাড়ির ভিতর প্রবেশ করলো দুহা। যাওয়ার আগে রেগে ‘বদ বাঁদড়’ বলতেও ভুলেনি।
এদিকে আরান পুরো বাড়িটা ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করে নিলো। এই বাড়ির আশেপাশেই এখন থেকে সে আবাস গড়বে। দুহা চলে যাওয়ার আগে রাগ মিশ্রিত কথা আরানের কর্ণধারে ঠিকই আসে। মুচকি হাসে আরান। বিড়বিড় করে বলে
‘ মিসেস অবিবাহিত দুহারাণী।’
চলে যায় নিজ গন্তব্যে।
————–
‘ দুহা, বাবা আগামীকাল চলে আসবে। কি লাগবে তোমার বলে দাও!’
পড়েছিল দুহা। মায়ের কথা শুনে নিচে নেমে আসে। মুঠোফোনে কথা বলছেন তিনি। টেবিলের উপর ফল সাজানো। একটা আপেল হাতে নিয়ে কামড় বসায় তাতে দুহা। মা-বাবার কথোপকথনের মাঝে কথা না বলায় ভালো মনে করে সে। প্রায় পাঁচ মিনিট অতিবাহিত হবার পর দুহার মা ফোন এগিয়ে দেয়।
অপরপাশের আদুরে স্বর শোনা যায়। দুহার বাবা দুলাল হোসেন। ব্যবসার সুবাদে প্রবাসে যেতে হয়। মেয়েকে পাশে বসিয়ে দুই গন্ড কথা কবে বলবেন অপেক্ষায় আছে।
‘ আমার আম্মির কী লাগবে শুনি?’
দুহার মুখে হাসি। বাচ্চাদের মতো বাবার নিকট আবদার করছে কি কি লাগবে তা।
মায়ের মুঠোফোন হাতে। অনেক খুঁজে মামার নাম্বার বের করল। অনেকদিন কথা হয় না। কাগজ, কলমের খোঁজ নেওয়া হয় না। অনেক বড়ো হয়েছে তাঁরা। অপেক্ষা করছে দুহা। মামা ফোন রিসিভ করে। হাসিমুখে সালাম জানায় সে।
‘ কেমন আছো মামা?’
‘ দুহা মা! কতদিন পর!
‘ মামী কোথায়?’
‘পাশেই, কথা বলবি?’
‘ হ্যাঁ।’
কাগজ,কলমের চিৎকার শোনা যাচ্ছে ফোনের অপর পাশ থেকে। ঝগড়া করছে কে কার আগে কথা বলবে। দুহার মামী দুজনকেই চুপ করান। ফোন কানে নিয়ে হাসি মুখে বলেন, ‘ মনে পড়েছে মামীর কথা?’
‘ আরান ভাইয়ার খবর জানো?’
দুহার মামী অবাক হয়ে যায়। ভালো খারাপ না জিজ্ঞেস করে দুহা আরানের কথা জিজ্ঞেস করায়।
‘ শরীর ঠিক আছে তোর? আরান না তোর চীর শত্রু? হঠাৎ তার কথা মনে পড়লো যে?’
দুহার অবাধ্য মন ব্যাকুল হয়ে আছে। মামীর ঠাট্টা এখন বিষাক্ত লাগছে। বিরক্তির সহিত বলে,
‘ আহ বলো না মামী! আরান ভাইয়া কোথায়?’
‘ শহরেই আছে। কোন এক কলেজে শিক্ষকতা করছে।’
পরিষ্কার হয়ে আসে সব। দুহা ভেবেছিল আরান চিনেও অচেনা সেজে আছে। এখন দুহা ভেবে নিয়েছে নিজ মতো। সময়ের সাথে আরান হয়তো ভুলে গেছে দুহাকে। মন খারাপ হয়ে গেলো দুহার। দুহার মায়ের হাতে ফোন তুলে দিয়ে চলে আসে ঘরে।
জানালায় ঠকঠক আওয়াজ হচ্ছে। মধ্যরাত। ঘুম ভেঙে যায় দুহার। মনে সহস জুগিয়ে জানালার কাছে এসে দাঁড়ায়। জানালা দিয়ে উঁকি না দিয়ে বারান্দায় চলে যায়। নিচে উঁকি দেয়। অনাকাঙ্খিত মানুষকে দেখে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। বিড়বিড় করে বলে,
‘ সে এখানে কি করে?’
চলবে………..