#দখিনা বারান্দায় তুমি আমি
#আফসানা_মিমি
|ষষ্ঠ পর্ব |
কলেজে আজ ছাত্র-ছাত্রীদের অন্তরে আনন্দের বদলে আতঙ্ক। কলেজ ছাত্রীর মৃত্যুতে পুরো কলেজে শোক নেমে এসেছে। দেয়ালে, ফটকে ছাত্রীর ছবি দিয়ে ব্যানার টাঙিয়ে শোক প্রকাশ করছে।
শ্রেণীকক্ষ আজ চুপচাপ। ক্লাস হবে না, মানব বন্ধন হবে।
ক্যান্টিনে তিন বন্ধু বসে। এলমার দিকে তীক্ষ্ম নজর দুহার। এলমা বসে নখ কামড়াচ্ছে। যেনো কোন ভুল কাজ করে ধরা পড়ে গেছে। আরমান অনেকক্ষণ যাবত দুই বন্ধুর কার্যকলাপ দেখছে। বিরক্তির উচ্চ স্তরে চলে গেছে, ধৈর্য্যের বাঁধ ভেঙে গেছে। হাঁসফাঁস করছে। এক সময়ে অধৈর্য হয়ে প্রশ্ন করল,
‘ কার ঘরের খাবার কে চুরি করে খেয়েছে যার জন্য তোমরা এমন লুকোচুরি খেলছো?’
এলমা যেন এই সুযোগের অপেক্ষায় ছিল। বসা থেকে উঠে তাড়া দেখিয়ে বলল,
‘ আমার বাড়ি চুর ঢুকেছে, আমি বরং দেখে আসি।’
‘ বোস এলমা!’
দুহার রাগ মিশ্রিত স্বর শুনে শুকনো ঢুক গিলে এলমা। বুকে ব্যাগ গুঁজে বসে যায় আগের স্থানে। আরমান নীরব দর্শক। উৎসুক দৃষ্টিতে বুঝতে চেষ্টা করছে আসল ঘটনা।
‘ কিছু করেছে এলমা?’
আরমানের প্রশ্নে এলমা পরপর মাথা নাড়ায় যেন সে নিরাপরাধ, কিছুই করেনি। দুহা মুখ খুলল। গাম্ভীর্য মুখখানায় হাসির ঝিলিক।
‘ তুই জানিস এলমা গতকাল রাতে কী করেছে?’
আরমানের অধৈর্য উওর,
‘ না বললে জানবো কীভাবে?’
দুহা গতকাল রাতের ঘটনার বর্ণনা দিতে শুরু করল,
গতকাল মাঝরাতে এলমাকে দুহা দেখতে পায়। কাকে যেন খুঁজে চলছে তাও আবার দুহার বাড়ির আশেপাশে। দুহা প্রায় পাঁচ মিনিট এলমার কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণ করে। এলমা একবার বাড়ির সামনে ঘুরেছে তো একবার গলির দিকে উঁকি দিচ্ছে। দুহা তখন ভাবনায় পড়ে যায়। ‘এত রাতে এই মেয়ে এখানে কি করছে!’
দুহা একসময় এলমা বলে ডেকে উঠে। এলমা ভয় পেয়ে যায়। দুহাকে বারান্দায় দেখে ভরকিয়ে যায়।
‘ এত রাতে এখানে কী?
দুহার নিচু স্বরও জোরে শোনা যাচ্ছে এই রাতে। এলমা প্রত্যুওরে বলে,
‘ আঙ্কেলকে খুঁজতে এসেছি। আমার আঙ্কেলটা পাগল বুঝলে! রাত বিরাতে যেখানে সেখানে চলে যায়।’
দুহা শব্দ করে ললাটে আঘাত করে। এলমার উদ্দেশ্যে কিছু বলবে তখন দেখে এলমা নিজের স্থানে নেই। দুহা প্রায় আধা ঘণ্টা এলমার জন্য অপেক্ষা করে, কিন্তু এলমার কোন খবর নেই। ঘরে এসে এলমার চিন্তা করতে করতে ঘুমিয়ে যায়।
আরমান দুহার কথা শুনে স্তব্ধ বনে যায়। একজন মেয়ে কতবড়ো বিচ্ছু হলে রাতে একা বের হয়! দুহা এখন একা নেই আরমানও সাথে আছে। এলমা পড়েছে মহা বিপদে। কী উওর দিবে ভেবে চলছে।
‘ সত্যি বল, কেন এসেছিলি? না বললে তোর সাথে বন্ধুত্ব শেষ।’
এলমা পড়েছে মহা বিপদে। মিনমিন করছে। সত্যি বলতে চাইছে না।
——-
কলেজের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক দুইজন। একজনের নাম তাহেরা অপরজন আরান আশফি। তাহেরা পুরাতন শিক্ষক। আড়াই মাসের ছুটি কাটিয়ে আজ কলেজে এসেছেন। রাগী শিক্ষকের জন্য উনাকে পুরস্কার দিলে মন্দ হয় না। সেকেন্ড ইয়ারের ছাত্র-ছাত্রীরা জমের মত ভয় পান তাহেরাকে।
‘ এখানে কি তোমাদের? সকল ছাত্র-ছাত্রী একপাশে মানব বন্ধনের জন্য তৈরী হচ্ছে আর তোমরা এখানে গল্প করছো?’
এলমার অপূর্ণ কথা আর শোনা হয়নি দুহা এবং আরমানের। তাহেরা ম্যাডাম এসে উপস্থিত হোন। মাথা নিচু করে তিনজন সকল শিক্ষার্থীদের সাথে যোগদান দিতে চলে যায় তারা।
দীর্ঘ দুই ঘণ্টা পায়ে হেঁটে রাস্তার চৌমাথায় মানব বন্ধন করে কলেজে ফিরেছে শিক্ষার্থীরা। যার যার ক্লাসে এখন সবাই। দুহার মন আস্থির। আঁখি পল্লব খুঁজে চলেছে একজনকে। আজ কলেজে মানুষটার ছায়াও দেখতে পাইনি সে। মন বিষন্ন হয়ে পড়লো দুহার। কিছু প্রশ্নের উওর পাওয়ার আশায় ছটফট করছে।
একটা ক্লাস শেষ করে কলেজ ছুটি দিয়ে দিয়েছে। নতুন ক্লাস শুরু হওয়ায় কলেজ বন্ধ দেয়াও সম্ভব হচ্ছে না।
কলেজের গেইটে পুলিশের গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে চার থেকে পাঁচটি। মূলত তদন্ত করার জন্য এখানে আসা। ছাত্র-ছাত্রীদের যেন ক্ষতি না হয় তাই ছুটি দিয়ে দেয়া হয়েছে। যেই মেয়েটা মারা গিয়েছে তার নাম তাসমিয়া। সেকেন্ড ইয়ারের ছাত্রী। গতকাল কলেজ থেকে ফেরার পথে কেউ খু’ন করে রাস্তার ড্রেনে ফেলে আসে। পোস্টমর্টেম রিপোর্ট অনুযায়ী ধ’র্ষ’ণ খু’ন করা হয়েছে সেই সুবাদে পুলিশ আসা।
দুহা মন খারাপ করে হাঁটছে। এলমার বাবা এসে নিয়ে গেছেন। আরমান বুট কিনতে গেছে পাশে। আনমনে এদিক সেদিক তাকাচ্ছে দুহা। সম্মুখে আরানকে দেখতে পেয়ে খুশিতে চোখ মুখ চিকচিক করে উঠে।
কাঁধের ব্যাগ ভালো করে চেপে এগিয়ে যায় আরানের দিকে।
‘ মামী বলল, আপনার পাশাপাশি থাকতে।’
কোন বিষয়ে চিন্তিত আরান। আকস্মিক দুহার কথায় বাঁকা হাসে। মনে মনে ভাবে,’ হঠাৎ এত দরদ কেন ম্যাডামের?’
‘ ফুপির সাথে পাঁচ মিনিট আগে কথা বললাম, এমন কিছু জানায়নি। বাসায় যাও।’
তেতো মুখের ধমক শুনে সটান দাঁড়িয়ে থাকে দুহা। এক পাও আগাবে না আজ বলে পন করে। আরান ভ্রু কুঁচকে নেয়। ফোঁস করে লম্বা নিশ্বাস ত্যাগ করে বলে,
‘ দেখো দুহা! তোমার মনের অবস্থা বুঝেছি। আমি আর আগের মত নেই। তোমাকে জ্বালাতন করার ইচ্ছেও নেই। এখানে তুমি আমার অপরিচিত, আমি তোমার অপরিচিত।’
আরানের কথাগুলো গায়ে লাগে দুহার। নিজেকে ছ্যাসড়া মনে হচ্ছে। আরান কী বুঝে নিয়েছে যে দুহা আরানকে পছন্দ করে! কে জানে? দুহার বর্তমানে ঝগড়া করার মুড চলে এসেছে। সরাসরি দুহাকে প্রত্যাখ্যান করা সহ্য হচ্ছে না । তেড়ে আসতে নিয়েও দমে যায় কলেজের সামনে দাঁড়িয়ে আছে বলে। অনেকেই তাকিয়ে আছে দুহার দিকে। কথা খুঁজে পাচ্ছে না দুহা। দাঁতে দাঁত চেপে বলে,
‘ আপনি কি ভালোভাবে কথা বলতে জানেন না?’
‘ জানি, তবে তোমার সাথে কথা বলার ইচ্ছে নেই। ছোট বাচ্চাদের সাথে কথা বলি না। তাছাড়াও তুমি তো বেয়াদব।’
‘ আমি বেয়াদব না, আমি খুবই ভদ্র মেয়ে।
স্কুল জীবনে আমার ভদ্রতার জন্য পুরস্কার পেয়েছি অনেক।’
‘ ভদ্রতার জন্য পুরস্কার পেয়েছ! নাকি মানুষের মন ভাঙ্গার জন্য পুরস্কার পেয়েছো?’
দুহা আড়চোখে তাকায়। দুহার এখনও জানা নেই সরাসরি কবে আরানের ভালোবাসা প্রত্যাখ্যান করেছে। তবে আরানের কথায় ভাবায় অনেক।
‘ আমি ইংলিশে অনেক কাঁচা, পড়াবেন আমাকে?’
‘ তোমার প্রেমিক নই। এভাবে আদর করে আমাকে বললে আমি রাজি হয়ে যাবো।’
আরানের কথায় দুহা হেসে ফেলে। আরানকে উচিত শিক্ষা দিতে এটাই মোক্ষম সুযোগ হাত ছাড়া করা যাবে না।
‘ হলে সমস্যা কী? শিক্ষক এবং ছাত্রীর মধ্যে প্রেম অহরহ হচ্ছে। ব্যাপারটা দারুন হবে কিন্তু!’
আরান রেগে যায়। আশেপাশে ভালোভাবে লক্ষ্য করে ধমক দেয়,
‘ আমি তোমার বড়ো, সম্মান দিয়ে কথা বলো।’
‘ বেশি না , দশ থেকে বিশ বছরের বড় হবেন।ওইটা আমি মানিয়ে নেবো।’
‘ তুমি কি ইনডাইরেক্টলি আমাকে বুড়া লোক বলছো ?
হেসে ফেলে দুহা। কাঁধের ব্যাগ আরেকটু গুছিয়ে উওর দেয়,
‘ ডিরেক্টলি বললাম। আপনি হচ্ছেন আশি বছরের বুড়া। যে নাকি চুল টুল ছাটাই করে, কলব লাগিয়ে হ্যান্ডসাম হয়ে ঘোরাফেরা করে।’
আরান স্তব্ধ বনে যায়। দুহা যে তাকে বুড়া বলছে তা নিয়ে কোন সন্দেহ নাই। আরান কিছু বলবে তার আগেই আরমানের আগমন ঘটে। দুহা মন ভরে হাসছে। আরানের বিস্ময়কর চাহনিতে আনন্দ পাচ্ছে। আরমানের কাছে যেতেই ইশারায় জিজ্ঞেস করে,’কি হয়েছে।’ না বোধক মাথা নেড়ে বুট খেতে খেতে চলে যায় নিজ বাড়ির উদ্দেশ্যে।
————
শুক্রবার। দুহার বাড়িতে আজ আনন্দের উৎসব। ছুটির দিনে দুহার মায়ের অফিস বন্ধ। কোমড় কেঁচে রান্না করছেন আপনমনে। দুহার বাবা আসবেন আজ। দুহা আনন্দ মনে ঘুরছে ফিরছে। তবে একটা জিনিস ভাবাচ্ছে দুহাকে। বাড়িতে রহিমা খালাকে নিয়ে সদস্য চারজন। কিন্তু দুহার মায়ের রান্নার আয়োজন দশ থেকে পনেরো জনের। দুহা এই বিষয়ে ভাবলো না আর। ছাদে যাওয়ার মনোনিবেশ করলো।
আমাদের ধারণা, ছাদ মানেই ফুল,ফল গাছের সমারোহ। সাধারণত অনেকেই ছাদে ফল,ফুল চাষ করতে পছন্দ করে। দুহা আলাদা, একদম ভিন্ন। পুরো ছাদ সাদা রং দিয়ে সাজিয়ে রেখেছে। মোটা করে রেলিং দিয়েছে যেন খুব সহজেই বসতে পারে সেখানে। দেয়াল ঘেসে বসার জন্য ইট পাটকেল দ্বারা আসন তৈরি করা হয়েছে। প্রায় সময় সেখানে বসে বই পড়ে দুহা। এক বছর ঘরে বসে যখন ক্লান্ত হয়ে যেত, রহিমা খালার সাহায্যে ছাদে এসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটাতো।
ছাদের দক্ষিণ পাশে রাস্তা। দুহা রাস্তার মানুষ দেখতে ব্যস্ত। হঠাৎ দুহার চোখ যায় তাদের কলেজের ড্রেস পড়ুয়া একজন শিক্ষার্থীর উপর। ছুটির দিনেও কলেজ ড্রেস গায়ে দেখে ভ্রু যুগল কুঁচকে আসে দুহার। রাস্তা থেকে বাড়ির দূরত্ব বেশি নয়। দুহা এই মেয়ে বলে ডেকে উঠে কয়েকবার। কিন্তু মেয়েটি শোনে না। সেই মুহূর্তে দুহাদের বাড়িতে একে একে চারটা গাড়ি প্রবেশ করে। প্রথম গাড়ি থেকে দুহার বাবা দুলাল হোসেন বের হোন। দুহা বাবা বলে চিৎকার করে নিচে চলে আসে।
সোফার ঘরে দুহা বাবাকে জড়িয়ে ধরে। দুলাল হোসেন মেয়ের কপালে চুমু এঁকে বলেন,
‘ আমি একা আসিনি মা! তোমার জন্য কাদেরকে নিয়ে এসেছি দেখো!’
কথা শেষ হতেই দুজন মানব পিছন দিয়ে দুহাকে জড়িয়ে ধরে। দুহা তাদের দেখে অবাক। দুইজন মানবের গাল টেনে ধরে আহ্লাদের স্বরে বলে,
‘ ওলে আমার কাগজ,কলম! মামী কোথায়?’
‘ মা আসেনি। তোমার জন্য পায়েস রেঁধে পাঠিয়েছে।’
দুহার মা রান্না ঘরে ছিলেন। ভাইয়ের ছেলেদের পেয়ে চোখ ভরে আসেন তার। কাছের ব্যস্ততায় বাবার বাড়ি যাওয়া হয়না অনেকদিন। ইচ্ছে পোষণ করলেন এবার ঝামেলা চুকিয়ে অনেকদিন ঘুরে আসবেন।
দুহাকে ঝাপটে ধরে কাগজ,কলমের হাতে কাগজ,কলম। আঁকিবুকি করছে দুজন। হঠাৎ কাগজ বলে উঠে,
‘ আপু, ভাইয়া আসবে সন্ধ্যায়।’
দুহার মনোযোগ খাতায়। কাগজের কথা শুনেনি। এদিকে কলম কাগজকে খোঁচা দিয়ে না করছে যেন পুরো কথ না বলে। দুইভাই ঠোঁটে আঙ্গুল দিয়ে চুপ হয়ে যায়।
———
বড় পর্দায় দুহার কলেজ ড্রেসের হাস্যজ্বল ছবি ভাসমান। কেউ একজন দুহার ছবিটার কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। মুঠোফোনে কাউকে ফোন করে বলে,
‘ নেক্সট টার্গেট এই মেয়েটা।’
চলবে……