Home "ধারাবাহিক গল্প "দৃষ্টির অন্তরালে নিস্তব্ধতা দৃষ্টির অন্তরালে নিস্তব্ধতা পর্ব-২০+২১

দৃষ্টির অন্তরালে নিস্তব্ধতা পর্ব-২০+২১

0
9

#দৃষ্টির_অন্তরালে_নিস্তব্ধতা
#লেখনী_মায়মুনা_আক্তার_মারিয়া
#পর্ব:২০

-“কারো পছন্দ দিয়ে আমার যায় আসে না।আমার পছন্দের জিনিস নিয়ে কথা বলা আমি পছন্দ করি না।এসব বেড হেবিটস যেনো দ্বিতীয়বার না দেখি।”

-“সামান্য একটা ঘড়ির জন্য কত্তো ঢং।”

-“তুই ঢং করতে পারবি আর আমার ঘড়ি করলেই দোষ!মেয়ে তো নয় আস্ত এক কথার খনি।”

মেহেক নিজেকে গর্বিত মনে করে বলল,
-“এই খনি বা কয়েকজন পায়?”

-“যে পাবে তার কপালে দুর্ভোগ আছে।”

-“যদি আপনার কপালে জুটে?”

-“ওসব স্টুপিট মেয়ে আমার ডিকশনারিতে রাখি না।”

কী এমন বললো যে খোঁচা মেরে কথা বলতে হবে।মেহেক ভেঙচি কেটে মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে বাইরে তাকায়।তখনি তার নজর কাড়ে রাস্তার ফুটপাতে বসে থাকা একজন মাকে দেখে।তার কোলে কয়েক মাসের সন্তান হয়তো।থালা হাতে রেখে সবার কাছে সাহায্য চাইছে আর বলছে
-“মা -বাবা রা কিছু সাহায্য করুন।আমার মেয়ে হয়েছে কিছু দিন হলো।মেয়ে হওয়ায় স্বামী বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে।আমাকে কিছু দিয়ে সাহায্য করুন।”

করুন কন্ঠে মহিলা সবার কাছে সাহায্য চাইছে কিন্তু সবাই সাহায্য করছে না।যার ইচ্ছে হচ্ছে সে পাঁচ, দশটাকে দিচ্ছে আর বাকিরা তাকিয়ে চলে যাচ্ছে।সমাজটা এখন এমন হয়ে গেছে কেউ সাহায্য চাইলে সাহায্য করার মতো মন মানসিকতা নেই।অবশ্য তাদের দোষ দেওয়া যায় না তার কারণ যারা কাজ করতে সক্ষম তারা কাজ করে না।সৎ পথে রোজগার করুক, না, তা তারা করবে না।অন্যের কাছে হাত পাতবে।এতে করে অসহায় লোকদের সংখ্যা বাড়ছে বই কমছে না।ফলে লোক জনরাও বিরক্ত হয়ে যাচ্ছে। যেখানে যাচ্ছে সেখানেই কেউ না কেউ হাত পাতছে!তবে বর্তমান দৃশ্য যে করুন।তিনি যে একজন মা।এই টুকু দুধের শিশুকে রেখে কি বা কাজ করবেন।এমন দৃশ্য দেখে মেহেকের নরম মন আঘাত পেলো।সবাই সন্তানকে দূরে ঠেলে দিলেও মা পারে না।তার মাও তো তাকে আপন করে নিয়েছে।প্রথম প্রথম অভিমান করে থাকলেও উৎসর জন্য নিশাতের থেকেও বেশি ভালোবাসে তাকে।শুধু তার মা না চৌধুরী বাড়ির সবাই তাকে প্রচন্ড ভালোবাসে।তাদের বাড়িতে মেয়ে-ছেলে নিয়ে তো পার্থক্য হয় না।কেনো এসব নিচু মানসিকতা সবার? তার বাবা তো বলে মেয়েরা পবিত্র ফুল।প্রত্যেক বাবার কাছে তার মেয়ে অনেক দামি।কিন্তু সব বাবা কী এক হয়? হলে কী ওর সাথে এমন করতো? মেহেকের কার্নিশ বেয়ে নোনাজল গড়িয়ে পড়লো।উৎসর চোখে পড়তেই গাড়ি থামিয়ে দেয়।ভ্রু কুচক্রে তাকাতেই দেখে মেহেক বাইরে তাকিয়ে আছে।ওর দৃষ্টি অনুসরণ করে তাকিয়ে ও ঠোঁট কামড়ে ধরে।মানিব্যাগ থেকে হাজার টাকার নোট বের করে মেহেকের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
-“যা দিয়ে আয়।”

মেহেক অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো।সে তো জানে তার উৎস ভাই পাষান।একটুও মন গলে না।

-“যাবি নাকি গাড়ি স্টার্ট দিবো?”
মেহেক খপ করে নোটটা নিয়ে গাড়ি থেকে নেমে গেলো।
অসহায় মহিলার পাশে হাঁটু গেঁড়ে মেহেক বসলো।তাকে দেখে কোলে থাকা বাচ্চার ঠোঁট প্রশস্ত হলো।শিশুটিকে হাসতে দেখে মেহেকও হেসে দিলো।

-“এই নিন আর রোজগার করুন।এভাবে অন্যদের কাছে হাত পেতে না চেয়ে মেয়ের কথা ভেবে কাজ করুন।”

মহিলা টাকা নিয়ে বললেন,
-“হ্যা,মা।মেয়েটা ছোট তো তাই।একটু বড়ো হলে কাজ করবো।”

-“আচ্ছা আসি।ওকে দেখে রাখবেন।”

-“দোয়া করি তুমি ভালো একটা বর পাও।”
তিনি স্বামীর সুখ পান নি।বিয়ের পর থেকেই স্বামীর অত্যাচার সয্য করেন।তাই তার কষ্টের প্রেক্ষিতে তিনি তেমন দোয়া করলেন।এটাই তো সাধারণত দেখা যায় যার মনে যা থাকে সে তাই বলে।

মেহেক হাতের ইশারায় গাড়ি দেখিয়ে বলল,
-“ওই যে কালো রঙের গাড়িটা দেখছেন না।ওইটার মধ্যেই আমার হবু বর বসে আছে।জানেন অনেক রাগি।কিন্তু আমাকে অনেক ভালোবাসে তবে বড্ড জালায় উঠতে বসতে ধমকায়।একটু উনার জন্য দোয়া করে দিবেন যাতে মাথাটা ঠান্ডা থাকে সব সময় আর একটু সুবুদ্ধি হয়।এতে করে আমি আমার ইশারায় নাচাতে পারবো।”
কথাগুলো বলেই মেহেক খিলখিল করে হেঁসে দেয়।মহিলা মেহেকের কথা শুনে হতবাক হয়।তারপর বুঝতে পারে এসব খুনসটি।

মেহেক গাড়িতে গিয়ে বসলে উৎস গাড়ি স্টার্ট দেয়।
-“আমাকে সবার কাছে পঁচানো তোর অভ্যাসে পরিনত হয়েছে?”

মেহেক অবাক হয় শুনে ফেললো নাকি।কই তাকে নিয়ে কেউ বললে তো সে কিছু শুনে না।তাহলে কী উনার কাছে একস্ট্রা পাওয়ার আছে।

-“আমাকে একটু দিন।”

-“কী দিবো?”

-“ওইটা।”

উৎস ভ্রু নাচিয়ে বলল,
-“ওইটা কী?”

-“আরে ওইটা।”

-“মাথা তোর।”

-“জান ভালো লাগে না।”

-“আমি কারো জান টান না।”

-“আপনাকে কখন জান বললাম?”

-“মাএই তো বললি।”

-“আমি তো ওইটা দিতে বলছি।”

-“হুম বুঝতে পারছি জান টান থেকে যা দিতে বলে তাই আরকি।”

-“হ্যা হ্যা”কথার ফাদে পড়ে মেহেকও হ্যা বলে দিয়েছে কিন্তু কথার মানে বুঝতেই মেহেক জিহ্বে কামড় দিয়ে আবার বলল,
-“এই না না না..আমি তো..”

-“বুঝতে পেরেছি”

-“আরে আপনি ভুল বুজছেন আমি তো”

-“আমি অবুঝ বাচ্চা না।আমাকে বুঝাতে হবে না।”

মিনিট দশেক পরই গাড়ি থামলো হাসপাতালের সামনে।মেহেক লজ্জায় আর কোনো কথা বলে নাই রাস্তায়। নতজানু হয়ে চুপটি করে বসে ছিলো।কথায় কথায় তাকে চুপ করে দেওয়া উৎসর একটা বদঅভ্যাস হয়ে গেছে। তাই সে মনে মনে ঠিক করলে এর একটা বিহীত করতে হবে, এভাবে আর কতোদন?এখন কিছু আর বলা যাবে না, না হয় দেখা যাবে আবার উদ্ভট কিছু একটা বলে তাকে চুপ করিয়ে দিবে আর সে লজ্জায় চোখ তুলে তাকাতেই পারবে না।আগে ডাক্তার দেখিয়ে বাসায় যাক তারপর এর একটা উপায় ভাববে আর সাহায্য নিবে ইয়াফার।

-“চৌধুরী কন্যা নামুন।মুখ ভোঁতা করে বসে না থেকে ডাক্তার দেখিয়ে আমাকে উদ্ধার করুন।”

-“যাবো না আমি।”
অভীমানি স্বরে মেহেক বলল।

-“বেশ যাস না।ভেবেছিলাম এখান থেকে বেরিয়ে আধা ঘন্টার জন্য ঘুরবো কিন্তু তুই যখন এখানেই সময় নষ্ট করবি তো কর।আমিও অফিসে চলে যাবো।”

-“একটু সুন্দর করে বললেই তো হয়।”

-“আমি সুন্দর করে বলতে পারি না।”

-“তা পারবেন কেনো?জীবনে তো মধু মুখে দেন নি গিলেছেন তো ওই ছাতার মাথা ব্ল্যাক কফি।ইশ!কী বাজে খেতে?”

উৎস চোয়াল শক্ত করে ধমক দিয়ে বলল,
-“ইডিয়েট,নাম।”

-“আবার ধমকাচ্ছেন! যাবো না আমি।”

-“থাপড়িয়ে বত্রিশটা দাঁত ফেলে দিবো।”

-“আমার ঊনএিশ।”

-“বাকিগুলো কোথায়?”

-“জানি না।”

-“তা জানবি কেনো? সারাক্ষণ যদি ভাবিস আমাকে কীভাবে ইশারায় নাচানো যায় তাহলে তো পরীক্ষায় ফেল করবিই।”

-“এর মাঝে পরীক্ষা কেনো টেনে আনছেন।স্কলারশিপ পেয়েছেন বলে আমাকে খোঁটা দিবেন!”

-“…..”

মেহেক আবার প্রশ্ন করলো,
-“আপনি জানেন আমার বাকি তিনটা দাঁত কোথায়?”

-“হুম।ছোট বেলায় ওই তিনটা দাঁত দিয়ে আমাকে কামড় দিয়েছিলি তাই আমি উঠাইয়া ফেলে দিছি।”

-“এই জন্যই আমার দাঁত কম।দাঁড়ান আজ বাসায় গিয়ে বড়ো আব্বুকে বিচার দিবো।”

-“যদি মনে থাকে তাহলে দিস।আমি এখন ভিতরে যাচ্ছি পিছনে পিছনে আয়।”

-“আমি পিছনে পিছনে যাবো কেনো?আপনি যাবেন পিছনে,আমি ভিআইপি।”
মেহেক গাড়ি থেকে নেমে হাঁটা দিলো।উৎসর ঠোঁটের কোণায় রহস্য জনক হাসি দেখা যায়।সে এটাই চেয়েছিলো।কিন্তু ওকে আগে যেতে বললে ও যেতো না বরং বলতো আমি বাচ্চা নাকি আমাকে দেখে রাখতে হবে আমি পিছনে যাবো আপনি আগে যান।তাই বুদ্ধি খাটিয়ে কথাটা ঘুরিয়ে বললো যাতে মেহেকও উল্টো কথা বলে।ওর শিরায় শিরায় ত্যাড়ামি মিশে গেছে। সোজা কথায় কাজ না হলে এভাবেই ফাঁদে ফেলতে হয়।

ডাক্তার দেখালে ডাক্তার জানিয়ে দেয় এখন মোটামুটি ঠিক আছে।কিন্তু অতিরিক্ত ফোন ব্যবহার করা এবং ফল,শাকসবজি, ছোট মাছ না খেলে পরবর্তীতে আরো সমস্যা হতে পারে তাই সব সময় খাবারের প্রতি সচেতন থাকতে।এই নিয়ে উৎস অসংখ্য বার মেহেককে কথা শুনিয়েছে।আর মেহেক মুখ ভোঁতা করে চুপ করে শুধু শুনে গেছে।ডাক্তারের চেম্বার থেকে বেরিয়ে উৎস মেহেককে বাসায় নামিয়ে দেওয়ার আগে একটা নার্সারিতে নিয়ে যায়।নার্সারি বললে ভুল হবে ছোট খাটো একটা পার্কও।এখান থেকেই রোদসীর ফুলের চারা নেওয়া হয়।রোদসীর সাথে মেহেক কয়েক বারই এসেছে।উৎস হঠাৎ তাকে এখানে নিয়ে আসায় ও অবাক হলো।বিচলিত হয়ে জিজ্ঞেস করেই বসলো
-“এইখানে কেনো, উৎস ভাই?”

রোদসী সিজানকে কিছু ফুলের চারা নিয়ে দিতে বলেছিলো কিন্তু সিজানের কাজের জন্য চলে যেতে হয় তাই সিজান উৎসকে বলে মেহেককে নিয়ে বের হলে এখানে আসতে জায়গাটাও সুন্দর।রোদসীর গাছ নেওয়াও হবে সাথে ওদের সময় কাটানো।ফল,ফুল গাছ দিয়ে ভরা।এখানে কেনো এসেছে তার কারণটা উৎস বললো না।মেহেককে নিয়ে ফুলের বাগান যে পাশে সে পাশে গেলো।মেহেকের কথার উওর না দেওয়ায় ও মুখে ভেংচি কাটলো উৎসের দিকে তাকিয়ে।কিন্তু উৎসের চোখ এঁড়ায় না।
-“কিছু কিছু মানুষ মুখ বাকায় এমন ভাবে যেনো দেখতে বিশ্ব সুন্দরী লাগে!”

উৎসর খোঁচা মার্কা কথায় মেহেক তেলে বেগুনে জ্বলে উঠলো।রাগ যেনো আকাশচুম্বী হলো।কটমটে চাহনিতে বলল,
-“নিজেকে আয়নায় কখনো দেখেছেন? আস্ত এক ডায়নোসর।”

উৎস ক্ষীপ্ত চাহনি নিক্ষেপ করতেই মেহেক চুপসে গেলো।অন্য পাশে মুখ ঘুরিয়ে নেয়।উৎস দাঁতে দাঁত পিষে রাগ সংযত করে।কথায় কথায় তাদের ঝগড়া বেধে যায়।অনেক তো দূরত্ব হয়েছে এবার না হয় দূরত্ব মেটাবে।কিন্তু এই মেয়ে আস্ত এক গাধী হয়েছে। হাতে পায়ে বড়ো হলে কী হবে মাথায় কোনো ঘিলু নেই।যখন যা ইচ্ছে তাই বলে তাকে রাগিয়ে দেয়।আচমকা উৎসের চোখ যায় ঝড়ে পড়া ফুলের দিকে।তার প্রিয় ফুল।তাদের পাশেই জারুল ফুল গাছ।জারুল ফুল উৎসের পছন্দের ফুল।হঠাৎ এখানে দেখতে পেয়ে বেশ অবাক হয়।আজ তার প্রিয় দুই ফুল একসাথে।কথা না বাড়িয়ে মেহেকের হাত টেনে জারুল ফুল গাছের নিচে দাঁড় করালো।সঙ্গে সঙ্গে তাদের উপর লাল পাপড়ি ঝড়ে পড়লো।উৎস গাছের ডাল থেকে কিছু ফুলের থোড়া একসাথে করে হাঁটু গেঁড়ে বসলো।উৎসের এমন অপ্রস্তুত সিদ্ধান্ত মেহেক বাকহারা।সে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো।উৎসের চাহনি শীতল হলো।মলিন স্বরে সুধালো,
-“জারুল ফুলের ন্যায় মুগ্ধ করেছো তুমি।আমার রাজ্যে জারুল ফুলের রানী হয়ে থেকো সারাটি জীবন। লজ্জায় নুইয়ে পড়া,লাল ফোলা গালে আমাকে করে দিলে মাতাল!তুমি আমার জারুল ফুল।জারুল ফুলের সিগ্ধতায় আমাকে করে দিলে শিহরিত।এক গুচ্ছ লাল গোলাপ দিয়ে নয় বরং এক গুচ্ছ লাল জারুল ফুল দিলাম তোমায়।”

#চলবে

#দৃষ্টির_অন্তরালে_নিস্তব্ধতা
#লেখনী_মায়মুনা_আক্তার_মারিয়া
#পর্ব:২১

ঘড়ির কাটা টিক টিক করে এক’টার ঘরে আসলো।কিন্তু নিশাত দু’চোখের পাতা এক করতে পারছে না।তার শ্বাস যেনো বারংবার আটকে যাচ্ছে।অশান্ত মনকে কোনো কিছুতেই শান্ত করতে পারছে না।তার ভুলের শাস্তি কেনো ওই নিরুপায় লোকটা ভুগবে। পছন্দ বলে ওতো একটা ব্যাপার আছে।বন্ধুর বোনকে স্ত্রীর জায়গা কী দিতে পারবে?তার কথা না হয় বাদ দেওয়া গেলো কিন্তু নিশাত?সে নিজেই তো এ বিয়ে মানছে না।আর না মানতে পারছে।তার কাছে সব এলোমেলো লাগছে।সম্পর্কের ভার যে বড়োই গভীর।এ সম্পর্ক কী আর পাঁচটা সম্পর্কের মতো সাধারণ হবে?নিশাত বিছানার চাদর খামচে ধরে।তার উপর তার নিজেরই ঘৃনা হচ্ছে। সে তার স্বপ্ন পূরণের দিকে এগোচ্ছিলো সেখানে এতো বড়ো বোকামী কাজ কী করে করলো সে?সে নাকি হবে বাবার মতো সৎ,দায়িত্ববান,বুদ্ধিমান উকিল।
তার নামের পাশে এডভোকেট বসালে যে তার ব্যাক্তিত্বের সাথে মিলবে না।সাদিফ ভদ্র ছেলে।সে তার মতো মেয়ে ডিজার্ভ করে না।অন্তত তাকে না।সব কিছু এগোনোর আগেই সব শেষ করা ভালো।এখনো তাদের সম্পর্ক জানা জানি হয় নি তার আগেই তাদের আলাদা হওয়াই উওম।তবে তার সিদ্ধান্তে কেউ তার পক্ষে কথা বলবে না।সবাই তো সাদিফের সাথেই ঘর করার কথা বলবে।কিন্তু সে পারবে না সাদিফের জীবন নষ্ট করতে।
নিশাত বেডসাইড থেকে ফোন হাতে নিলো।সাদিফকে কল দেয়।তখন সে খেয়াল করলো রাত এক’টা বাজে।এখন হয়তো ঘুমাচ্ছে।আর সাদিফ তো উৎস ভাইয়ের রুমে।সাথে সাথে কল কেটে দেয়।সন্ধ্যার ঘটনা তাকে বার বার ভাবাচ্ছে।সাদিফের আন্টি তাকে প্রথম দেখায় পছন্দ করে ফেলেছে।আর উনিও সাদিফের কান ঝালাপালা করে ফেলতেন বিয়ে করা নিয়ে।অবশেষে ছেলেটা বিয়ের জন্য রাজি হয়েছে এই অনেক তার কাছে।বোন চলে যাওয়ার পর থেকে সাদিফকে আগলে নিয়েছে। মানুষের মতো মানুষ করেছে।দুই পরিবার যখন তাদের বিয়েতে সম্মতি দিচ্ছে সেখানে সেই বিয়ে নিয়েই নিশাতের মনে প্রশ্নরা হানা দিচ্ছে।

সাদিফের কল বেজে উঠায় উৎস বিরক্ত হলো।সে সবে মাএ বিছানায় গা হেলিয়ে ছিলো।অফিসের কাজ শেষ করে বাসায় এসেও তাকে কাজ করতে হচ্ছে।এই কাজ মেহেকের জন্য।সামনেই ওর এইচএসসি পরীক্ষা।পড়াশোনার যা অবস্থা কোনোমতে পাস তো করতে হবে না হলে উৎসর মানসম্মান বলে কিছু থাকবে?রাত জেগে মেহেকের জন্যই কিছু নোটস করেছে।কিন্তু সাদিফের ফোন এতো রাতে বাজায় উৎসর কপালে ভাঁজ পড়ে।তাই ফোন হাতে নেয়।নিশাতের নাম্বার দেখে উৎস হতভম্ব হয়।এতো রাতে কেনো ফোন করেছে তা তো জানতে হবে তাই সাদিফকে ডেকে তোলে।
-“সাদিফ”

-“…..”

-“সাদিফ উঠ।নিশাত ফোন দিয়েছে।”

সাদিফ ঘুমের ঘোরেই বলল,
-“কেনো?”

-“সেটা তুই জিজ্ঞেস কর।তোর বউকে।”

-“ঘুমাতে দে।ডাকবি না।”
সাদিফ গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলো।উৎস লাথি দিলো।সাদিফের ঘুম ভেঙে যায়।

-“মারলি কেনো?”

-“আমার বোনকে বিয়ে করবি আবার ওকে ইগনোর ও করবি।মাথা ফাটিয়ে দিবো লাথি দিয়ে তো ওয়ার্নিং করলাম।”

-“তোর বোন তো আদর করে একবার ডাকেও না এখন কেনো ডাকছে?”

-“গিয়ে জিজ্ঞেস কর।”

-“এখন?আমি!”

-“হুম।বিয়ে করেছিস।আমার মতো কপাল পুরা না তোর।”

-“তোর বোন এতো রাতে আমাকে ডাকার কারন তো বুজলাম না।আমাকে কি মিস করছে?দাঁড়া গিয়ে দেখে আসি।”
সাদিফ খাট থেকে নেমে দাঁড়ায়।উৎস তার দিকে তাকিয়ে বাঁকা হাসি দেয়।তাকে হাসতে দেখে সাদিফ বলল,
-“রোমান্টিক মুডে আছি।এভাবে হাসবি না।তোর হাসি মানেই ঘাবলা আছে।”

-“তা তো আছেই।বিবাহিত জীবনের আলাপ করতে যে আমার বোন ফোন দেয়নি তা আমি বেশ বুঝতে পারছি।”

-“নিশাত যদি আমার রোমান্টিক মুডে পানি ঢেলে দেয় তাহলে আমিও তোর ঘরে আগুন লাগাবো।”

সাদিফ নিশাতের ঘরের দিকে পা বাড়ালো।কিন্তু দরজায় সামনে দাঁড়িয়ে রইলো। টোকা দিতে সাহস পাচ্ছে না।শুকনো ঢোক গিলে নিজেকে সান্ত্বনা দিলো।তার বিয়ে করা বউ তাকে কেনো ভয় পাবে?ফোন দিয়েছে এতো রাতে তাই সে এসেছে।সাদিফ বুক ফুলিয়ে দরজায় টোকা দিতে হাত বাড়াতেই দরজা হালকা খুলে গেলো।ভিতরে লাগানো না।তাই সে আর একটু খুলে ভিতরে ঢুকলো।দরজা খোলে কালো ছায়া পড়তেই নিশাতের গা কেঁপে উঠলো। চোখ খিঁচে চিৎকার দিবে তখনি সাদিফ ওর মুখ চেপে ধরে।
-“নিশাত আমি,আমি সাদিফ।”

-“উমউমউম”

-“চেঁচিয়ো না।”

-“উমউম..”
নিশাতের মুখ চেপে ধরায় কথা বলতে পারছে না।ইশারায় হাত সড়াতে বললো।সাদিফ সাথে সাথে হাত সড়িয়ে নেয়।নিশাত বড়ো বড়ো শ্বাস নিলো।সাদিফ পানির গ্লাস এগিয়ে দেয়।নিশাত গলা ভিজিয়ে হাঁফ ছেড়ে বসে।
-“এভাবে কেউ চেপে ধরে?”

সাদিফ অপরাধী স্বরে বলে,
-“সরি বুঝতে পারি নাই।তুমি চেঁচিয়ে উঠলে সবাই এসে পড়লে সমস্যা হয়ে যেতো।”

-“কিন্তু আপনি এখানে কেনো?”

-“তুমি তো ডেকেছো?”

নিশাত অবাক হয়ে বলল,
-“আপনাকে আমি ডাকতে যাবো কেনো?”

-“উৎসই তো বললো তুমি কল করেছো।”

-“কী?ভাইয়া”

-“হুম।আমি ঘুমিয়ে ছিলাম।উৎস ডেকে দিলো।”

-“ইশশ,ভাইয়া কী ভাবলো?”

-“যা ভাবার তাই ভেবেছে।”

নিশাত জিজ্ঞাসু স্বরে বলল,
-“কী ভেবেছে?”

-“আমরা তো নিউলি কাপ্পল। এই নিয়ে যা ভাবনা আসে।”
নিশাত জিহ্ব কামড়ে ধরে।
-“ফোন দিলেই কী আসতে হবে নাকি?”

-“বউ ডাকলে তো আসতেই হবে।”

নিশাত আশ্চর্য হলো।সে এই বিয়ে নামক বন্ধন থেকে পালাতে চাচ্ছে আর সাদিফ এই বিয়ে নিয়ে সিরিয়াস হচ্ছে।

-“আপনার সাথে আমার কিছু কথা আছে।”

-“তোমার কথা শুনে এ জীবন কাটিয়ে দিবো।”

-“একটু সিরিয়াস হোন।”

-“অসব সিরিয়াসনেস আমার নেই।বলো কী বলবে?”

-“আমার মনে হয় আমাদের ডিভোর্স হওয়াই ভালো।”

সাদিফের মুখ কালো হয়ে গেলো।নিশাতকে সে ভালোবেসে ফেলেছে।খুব সহজেই পেয়েও গেছে কিন্তু নিশাতের কথায় তার বুকের বা পাশ ছ্যাত করে উঠলো।বড্ড ভালোবেসে ফেলেছে ওকে।ভালোবাসার মানুষের মুখ থেকে ছেড়ে দেওয়ার কথা শুনলে কারো মাথা ঠিক থাকে?সাদিফেরও ঠিক থাকলো না।সে রেগে গেলো।অনেক বার নিশাতকে বুজিয়েছে সে।কিন্তু নিশাত বুজলে তো।বারবার একি কথা তুলছে।তার ইমোশন নেই?তার ভালোবাসার কোনো দাম নেই?এতো বুজানোর পর ও যখন আবার একি কথার জন্য এতো রাতে ফোন করলো তাই সাদিফ ও নিজেকে সামলাতে পারলো না।গলায় গাম্ভীর্যতা টেনে বেশ রেগে বলল,
-“অনেক হয়েছে নিশাত আর না।তোমাকে কতো বার বুজিয়েছি তারপর ও কেনো বুজছো না?আমার ভালোবাসা তোমার কাছে কোনো প্রায়োরিটি নেই?তা না থাকতেই পারে। কাউকে ভালোবাসলে তো ভালোবাসার কদর করতে জানবে।তোমার অসহায়ত্বের জন্য তোমাকে আমি করুনা করিনি। এই কথা অনেক বার বলেছি।ভালোবেসে ফেলেছি তোমায়।সত্যি অনেক ভালোবেসে ফেলেছি।তোমাকে আমি ভলোবাসি বলেই ওই দিন বাঁধা দেই নাই।তোমাকে আমি আরো আগে থেকেই এক পাক্ষিক ভালোবেসে গেছি।কিন্তু প্রকাশ করি নাই কখনো।আমি চেয়েছিলাম তুমি তোমার পড়াশোনা শেষ করো তারপর আন্টিকে বলে বিয়ের প্রস্তাব পাঠাবো কিন্তু তার আগেই সব হয়ে গেছে।এখন দেখছি আমি ভুল করে ফেলেছি।”

একটু থেমে সাদিফ আবার করুন গলায় বলল,
-“তুমি আমার ভালোবাসাকে পায়ে পিষিয়ে মারলে নিশাত।কিন্তু আমাকে ভালোবেসে দেখলে না।আসলে আমার ভাগ্যটাই খারাপ।ছোট বেলায় হারালাম বাবা-মা’কে।আর এখন যেই না একটু ভালোবাসা ভিক্ষা চাইলাম তোমার কাছে তুমিও ফিরিয়ে দিলে।আফসোস রয়ে গেলো এই জীবন নিয়ে যেখানে সব জায়গাতেই অপূর্ণ।”
কথাগুলো বলেই সাদিফ বড়ো বড়ো কদমে চলে গেলো।নিশাতকে কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়েই।নিশাত অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো সাদিফের যাওয়ার দিকে।সে আজ সাদিফকে কষ্ট দিয়ে ফেলেছে।সাদিফ তাকে অনেক বার বুজিয়েছিলো কিন্তু তাও সে আবার ডিভোর্সের কথা তুললো।তাকে সব দিক থেকে সাপোর্ট করে যাচ্ছে। তার ও তো উচিত ছিলো মানসিক ভবে সাদিফকে ঠিক রাখার।একটা সুখী পরিবার উপহার দেওয়া।সাদিফের কথাগুলো নিশাতের কানে বাজনার মতো বাজতে লাগলো।একটা সময় নিজের ভুল বুজতে পেরে কেঁদে উঠলো।

#চলবে