#দৃষ্টির_অন্তরালে_নিস্তব্ধতা
#লেখনী_মায়মুনা_আক্তার_মারিয়া
#পর্ব:৩২
গভীর রাত।চারোদিকে নিস্তব্ধতা,বাহির থেকে ঝিঁঝি পোকার ডাক ভেসে আসছে।ঘরের সব বাতি নেভানো।পুরো ঘরটায় নিরেট অন্ধকার।এই নিরেট অন্ধকারে নিজের অস্তিত্ব ছাড়া আর কিছুই যেন টের পাওয়া দায়।বিছানার এক কোণে গুটিসুটি মেরে শুয়ে আছে মেহেক। একটু আগেও যে চোখে জল ছিল, এখন সেখানে কেবল এক আকাশ অভিমান।তার চুলে জড়ানো বালিশের একপাশটা চোখের জলে ভিজে ভারী হয়ে আছে। অভিমানটা যতটা না রাগের, তার চেয়েও বেশি এক বুক আক্ষেপের। ভালোবাসার মানুষটির একটু অবহেলা বা না বলা কথা এই বয়সে কতটা তীব্র ক্ষত তৈরি করতে পারে, তা এই নিস্তব্ধ ঘরটাই যেন টের পাচ্ছে।মেহেকের প্রতিটি নিস্তব্ধ হাহাকার বলে দিচ্ছে উৎসর প্রতি তার কতো অভিমান জমেছে।খুব কাছের মানুষের কাছ থেকে কষ্ট পেলে নিজেকে সামলানো যায় না।ঠোঁট শুকিয়ে কাটকাট হয়ে আছে।কান্নারা গলায় এসে আটকে যাচ্ছে।বুকের চাপা অভিমান প্রকাশ করতে পারছে না। বালিশে মুখ গুঁজে শুয়ে আছে মেহেক। তার প্রতিটি দীর্ঘশ্বাস যেন এই ঘুটঘুটে অন্ধকার ঘরের শূন্যতায় ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসছে।বালিশে চোখের জলে ভিজে তার চুলগুলো এলোমেলো হয়ে আছে। সে কোনো কথা বলছে না, কাঁদছেও না শব্দ করে; বরং তার ভেতরের জমা হওয়া কষ্টগুলো নিঃশব্দে শরীরের ভেতর জমাট বেঁধে যাচ্ছে। ঘরের ভারী বাতাস যেন তাকে দমবন্ধ করে দিচ্ছে।আচমকা লাইট অন করায় অশ্রু শিক্ত চোখ জোড়া কেঁপে উঠলো।চোখ মেলে তাকাতে পারল না ভালো করে তবুও পিটপিট করে তাকিয়ে দেখলো কে।ঘাড় ঘুরিয়ে দরজার দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষনের জন্য থমকে গেলো।উৎসকে দেখে মেহেক অবাক হলো।একবারের জন্য হলেও মনে হয়নি উৎস তার কাছে আসবে।মেহেকের চোখ যায় উৎসর হাতে।নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারল না।পরক্ষণেই মনে পড়লো কয়েক ঘন্টা আগের ঘটনা।তাই মেহেক মুখ ঘুরিয়ে নিলো।তাকে মুখ ঘুরাতে দেখে উৎস মনে মনে বলল আজ ওর খবর আছে।মেহেকের ক্রোধ প্রগাঢ় হয়।তেজ দেখিয়ে বলল,
-“লাইট কেনো অন করা হয়েছে? আমি ঘুমাবো।”
উৎস স্বাভাবিক ভাবেই বলল,
-“খেতে আসিছ নাই কেনো?”
মেহেক গলা ভারী করে বলল,
-“খিদে নেই আমার তাই।”
-“আমি তো জানি খালি পেটে কারো ঘুম হয় না।”
-“……”
-“রাগ কি অনেক করেছিস?”
মেহেক পুনরায় রাগ দেখিয়ে বলল,
-“এখানে কী চাই?”
-“তোকে চাই।”
মেহেকের বক্ষপট কেঁপে উঠে। এই প্রথম উৎসর মুখ থেকে শুনতে পেলো উৎস তাকে চায়।
কিন্তু খুশি হতে পারলো না।জমা অভিমানটুকু আরো গাঢ় হলো।
-“চলে যান।”
-“ফিরিয়ে দিচ্ছিস।তোর জন্য আমারও খাওয়া হয়নি।তার বড় আম্মু খেতে দেয়নি তোকে মারার অপরাধে।”
মেহেক না তাকিয়েই বলল,
-“তাই বুজি এসেছেন।”
উৎস হাতের প্লেট বেড সাইড টেবিলে রাখলো।মেহেকের পাশে বসে।মেহেক আন্দাজ করলো উৎস খাটে বসেছে তবুও ঘার ঘুরালে না।
-“উঠে বস।”
-“না”
উৎস এক হেঁচকা টানে মেহেককে শুয়া থেকে তার পাশে বসিয়ে ফেলে।মেহেক টাল সামলাতে না পেরে উৎসর উপর পরে। উৎস মেহেককে নিয়েই খাটে শুইয়ে পড়ে।উৎসর হাত চলে যায় মেহেকের পিঠে।মেহেকের ছটফট কমিয়ে এলো।শরীর ঠান্ডা হয়ে গেলো উৎসর মোলায়েম ছোঁয়ায়।নেশা নিয়ে তাকিয়ে রইলো।উৎস অধিকার খাটিয়ে বলল,
-“ওই ছেলের সাথে কেনো নাচবি তুই?আর মারলেই আমার দোষ!”
মেহেক পাল্টা কথা শুনিয়ে দিলো।
-“আপনি গান গাইতে পারবেন আর আমি নাচলেই দোষ!”
-“আমি ছেলে”
-“আমিও মেয়ে।”
-“কেনো আমার ধৈর্যের পরীক্ষা নিচ্ছিস?”
-“আমাকে ছাড়ুন।”
-“ছাড়বো না কি করবি কর।”
-“আপনার মন মতো হবে নাকি সব!যখন ইচ্ছে হবে কাছে টানবেন আবার যখন ইচ্ছে হবে মারবেন।”
উৎস মেহেকের গালের সাথে ওর গাল লাগিয়ে বলল,
-“তুই আমার।শুধুই আমার।তোকে মারবো আমি।বকবো আমি।আদর করবো আমি,ভালোবাসব আমি।তাতে তোর কী?”
-“ওই মেয়ের সাথে আপনি কেনো গান গাইবেন?আর এই ভাবে গায়ে ঢলে পরছিলো কেনো?”
-“অল্পতে রেগে যাস কেনো?এর পিছনে কারণ আছে।”
-“কী কারণ আমাকেও বলেন আমিও শুনতে চাই।”
-“রায়ান সোহানাকে পছন্দ করে কিন্তু সোহানা আমাকে নিয়ে সিরিয়াস।তোর কথা রায়ান জানে কিন্তু সোহানাকে বলতে পারিনি।”
-“কেনো?”
-“কোনো এক কারনে বলা হয়নি।”
-“বলবেন কেনো?আমি আপনার কে?”
-“তাই বলেছিলাম বিয়েটা করে নে।”
-“আপনি পালিয়ে বলেছেন।আমি পালিয়ে বিয়ে করতে পারবো না।”
-“পালিয়ে বিয়ে করা আমার অনেক শখ।চল না করে সবাইকে সারপ্রাইজ দেই।”
-“আম্মু?”
উৎস জানত মেহেক সবার আগে ওর মার কথাই বলবে।তাই এর জন্য ওর উত্তর ও প্রস্তুত।
-“সন্তান হিসেবে মানতে পারলে সবই পারবে।আরেক মা রাজি হলেই হবে।করবি বিয়ে?”
-“আপনি আমাকে থাপ্পড় দিয়েছেন। দেখেন লাল হয়ে আছে গাল এখনো।”
মেহেক গাল দেখিয়ে বললো।
উৎস দেখলো সত্যি লাল হয়ে আছে। দুইটা আঙুলের ছাপ বসে গেছে।থাপ্পড়টা জোড়েই লেগেছে।
-“সরি জান।”
কথাটা বলেই উৎস মেহেকের গালে তার ওষ্ঠের ছোঁয়ায় ভরে দিলো।মেহেক বাকরুদ্ধ হয়ে চুপ করে দেখে গেলো উৎসর পাগলামি।
-“অন্য কিছু করতি রাগানোর জন্য এটা কেনো করলি?”
-“…”
-“আয় খাবি।”
-“না”
-“কেনো?”
-“আমার রাগ কমে নাই।”
উৎস ফু দিয়ে মেহেকের চোখের পাশ থেকে চুল সড়িয়ে বলল,
-“বল কী করতে হবে?কী করলে আমার নিজস্ব জারুল ফুলের রাগ ভাঙ্গবে?”
-“কান ধরে এক ঘন্টা উঠবস করবেন।”
-“কী?”
-“মনে পড়ে কিছু…।আকাশ থেকে টপকে পড়ে যখন এই বাড়িতে পদধ্বনি দিলেন তখন আমাকে একশ বার কান ধরে উঠবস করিয়েছিলেন।”
-“তোর মুখের ভাষা দিন দিন এমন হচ্ছে কেনো?”
মেহেক গাল ফুলিয়ে বলল,
-“আমি রেগে আছি কিন্তু ”
-“আমাকে ব্ল্যাক মেইল করছিস।কর কর আমার ও সময় আসবে।”
-“দেখা যাবে।”
মেহেক উৎসর উপর থেকে সরে গেলো।উৎসও উঠে বসলো।
-“চাচাতো বোন একটু দয়া মায়া কর।আমার পা আস্ত থাকবে?”
-“তাহলে হাঁটু গেঁড়ে বসে থাকুন কান ধরে।”
-“এক মিনিট দে।”
-“রাগ করে আছি কিন্তু।”
-“দশ মিনিট।”
-“রাগ করে আছি।”
-“এিশ মিনিট”
-“রাগ..”
-“থাম থাম ধরছি।”
মেহেক মৃদু হাসে।উৎস অসহায়ের মতো মুখ করে বলল,
-“কার পাল্লায় পরলাম রে।হেঁসে নে হেঁসে নে যতো পারিস হেঁসে নে।আমার ও সময় আসবে।”
-“কান ধরেন”
-“শেষে কিনা রাগ ভাঙ্গাতে এক ঘন্টা কান ধরে বসে থাকতে হবে।মান ইজ্জত সব খেয়ে দিলি।”
—————-
-“এই মেহেক”
মেহেক দুই তালার করিডর দিয়ে যাচ্ছিলো।কারো ডাক শুনে দাঁড়িয়ে গেলো।পিছন ফিরে তাকায়।উৎসর বন্ধু রায়ান।তাকে দেখে মেহেক নম্র ভাবেই বলল,
-“জি ভাইয়া বলুন।”
-“উৎসর ঘরটা দেখিয়ে দিবে।”
-“আপনি কোন ঘরে থাকছেন? ”
-“ফারাজ ভাইয়ার সাথে।”
মেহেক রাগ করে ঘর থেকে বের না হওয়ায় জানা হয়নি সোহানা আর রায়ান কোথায় থাকছে।যতোই হোক উৎস ভাইয়ের গেস্ট এুটি হলে তারই বদনাম।
-“আর আপনার সে?”
-“বাহ তুমি দেখছি সব জানো।”
-“হুম কাল উৎস ভাই বলেছে।”
-“সোহানা তোমার কোনো এক বোনের ঘরে থাকছে।এখন উৎসকে কোথায় পাবো সেটা বলো তোমার দুলা ভাই কথা বলবে।”
মেহেক ভ্রু কুঁচকে বলল,
-“সাদিফ ভাইয়া”
-“হুম।উৎস কল ধরছে না।”
মেহেক হাত দিয়ে দেখিয়ে বলল,
-“ওই যে পিংক কালারের দরজা দেখছেন তার পরের টা।”
-“পিংক কালারটা বুজি তোমার।”
মেহেক উপর নিচ মাথা নাড়িয়ে বলল,
-“হুম।”
রায়ান তারপর মেহেককে ধন্যবাদ দিয়ে উৎসর ঘরে গেলো।উৎস শাওয়ার নিয়ে মাএ বেরিয়েছে।রায়ানকে দেখে বলল,
-“বস।”
রায়ান বসল।ফোন স্পিকার দিয়ে বলল,
-“বল উৎস শুনছে।”
-“কয়টা কল দিয়েছি তোকে?হারামজাদা একটা কল বেক করলে কি হয়?”
-“বরযাএী তিনটার মধ্যে যেনো হাজির হয়।”
-“ভাই আমার দোষ কোথায়?আমি আগে জানলে প্রথমেই সাবধান করে দিতাম।”
-“আমার বোন অপেক্ষা করছে।”
-“আমাকে রাগ দেখাচ্ছিস কেনো?”
-“রাগ দেখালে বোন দিতাম তোর হাতে!”
-“কল ধরছিলি না কেনো?”
-“জামাই সাজছিলাম।বিয়ে আমার তো তাই কোনো কাজ কর্ম নাই।শিখিয়ে পড়িয়ে আজ নিয়ে আসলেই হবে।”
রাতে একটু চোখ বুজার সময় পায় নি কাজের জন্য।আবার সকাল হতেই নানান কাজে লেগে পড়েছে।
-“আচ্ছা।তোদের বিয়েটা হয়ে যাক আজ।”
-“রাখ। টাইম টু টাইম আসা চাই আর কোনো রিচুয়াল হবে না।”
-“তুই যা চাবি তাই হবে।”
সাদিফ কল কেটে দিলো।রায়ান উৎসর বিছানায় গা হেলিয়ে দিয়ে বলল,
-“সবার সাথে আমিও একমত বিয়েটা করে নে।”
-“হুম”
-“হুম কী?”
-“সারপ্রাইজ আছে সবার জন্য ওয়েট।”
-“কি সারপ্রাইজ?”
-“ভাইয়া পান্জাবি দিবে পড়ে নিস।যা রেডি হয়ে নে।”
-“ওকে কিন্তু বললি না।”
_______
ঘড়ির কাটা একটার ঘরে ছুঁই ছুঁই অবস্থা।চৌধুরী বাড়ির সকালের ব্যস্ততা জেনো দ্বিগুণ বেড়ে গেলো।বাড়ির তিন কর্তা আগেই সেন্টারে চলে গেছে সব দেখাশুনার জন্য।মূলত আজকের প্রোগ্রাম সেন্টারেই হবে।ফারাজ, উৎস ও ছিলো। সকাল থেকে হন্নে হয়ে ছুটেছে।বোনদের বিয়ে বলে কোনো কাজ ফাঁকি দেয়নি।দুই ভাই সব কাজ দাঁড়িয়ে থেকে দেখেছে।বাড়ির বউ মেয়েদের নিতে এসেছে ফারাজ, উৎস।পার্লার থেকে লোক আনিয়ে তারা সবাই সেজে নিয়েছে।তারপর ও সবার তৈরি হতে ব্যস্ত এখনো কেউ বসার ঘরে আসছে না।ফারাজ বিরক্ত হয়ে চেঁচিয়ে বলল,
-“তোমরা যাবে নাকি সাজতে সাজতে নিজেরাই বিয়ে করতে বসবে।”
নাফিসা ফারাজের কান মুলে দিয়ে বলল,
-“মায়েদের সাথে মজা করা হচ্ছে। দারা এর পরই তোদের দুই ভাইয়ের পালা।”
উৎস ফোনে টাইপিং এ ব্যস্ত।এই দিকে ধ্যান দিলো না।ফারাজ বলল,
-“সে আর বলতে। চুল পেকে যাচ্ছে এখনো বউর মুখ দেখলাম না।”
মালিহা আর সুফিয়া হাজির হলো।মালিহা বেগম বলল,
-“নির্বাচনে জিতলে বউ পাবি নয়তো বউর দেখা কি ওর টিকি টাও পাবি না।”
সবাই এই নিয়ে মজা করতে লাগলো।নিশাত,রোদসী নিচে আসলো।দুই জনই আজ লাল টুকটুকে বেনারশী পড়েছে তার সাথে হিজাব পড়েছে।বেশ লাগছে দুই বোনকে দেখতে।মালিহা বেগম নজর কেটে দিলেন।রায়ান ও সোহানা আসলো কিন্তু মেহেকের আসার নাম নেই।উৎস কপাল কুঁচকালো।রুক্ষ স্বরে বলল,
-“আমরা বরযাএী যাচ্ছি না যে দেরি করে যাবো।যার যাওয়ার সে গাড়িতে গিয়ে বসো নয়তো রেখে চলে যাবো।”
-“আরে যাচ্ছি যাচ্ছি। এই নিশাত রোদসী সবাই চল গাড়িতে গিয়ে বস।উৎস আমরা ফারাজের সাথে যাচ্ছি তুই তোর বন্ধুদের সাথে মেহেককে নিয়ে আয় সাথে করে।”
-“হুম আমার গাড়িতে আর কারো জায়গা হবে না।”
উৎস নিষ্পলক চাহনিতে দেখে গেলো মা ভাইয়ের নিদারুণ অভিনয়।যা বাকিরা ক্ষুনাক্ষরেও আন্দাজ করতে পারল না।
ফারাজের গাড়িতে সবার জায়গা হবে না বিধায় তিন মাকে বাড়ির অন্য গাড়িতে উঠিয়ে দিয়ে ড্রাইভারকে নিয়ে যেতে বলল।নিশাত ও রোদসীকে পিছনে বসিয়ে ফারাজ চলে গেলো সেন্টারের উদ্দেশ্যে।
সোহানা, রায়ান রেডি হয়ে বসে আছে কিন্তু মেহেক এখন নামছে না।সবাই চলে গেলো।পুরো বাড়ি ফাঁকা।মেহেককে নামতে না দেখে উৎস উপরে যাওয়ার জন্য পা বাড়ালে সোহানা বলল,
-“উৎস কোথায় যাচ্ছিস?”
-“মেহেককে ডেকে আনছি।”
-“আমি যাচ্ছি তুই বস।ও রেডি হচ্ছে বোধহয়।পার্সোনাল ইস্যু..”
-“আমি দেখে নিবো।”
#চলবে
#দৃষ্টির_অন্তরালে_নিস্তব্ধতা
#লেখনী_মায়মুনা_আক্তার_মারিয়া
#পর্ব:৩৩
উৎস হাত ঘড়িতে সময় দেখে ভ্রু কুঁচকালো।বিরক্ত নিয়ে বলল,
-“আর কতক্ষণ যে সাজুগুজু করবে এই মেয়ে!”
সবাই প্রায় অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছে গিয়েছে। কিন্তু উৎস,মেহেক যায়নি।নিচে রায়ান ও সোহানাও অপেক্ষা করছে।
দোতলার এক কোণে, নিজের ঘরের দরজা আধখোলা রেখেই বিছানার কিনারায় মনমরা হয়ে বসে আছে মেহেক। মাত্র আধঘণ্টা আগেই হঠাৎ তার পিরিয়ড শুরু হয়েছে। প্রথম দিন হওয়ায় তলপেটে তীব্র ব্যথা, কোমরজুড়ে টান আর শরীরজুড়ে অদ্ভুত দুর্বলতা। বিছানার পাশে সুন্দর করে সাজিয়ে রাখা গাঢ় মেরুন রঙের ভারী লেহেঙ্গাটার দিকে তাকিয়ে তার বুকটা হুহু করে উঠছিল। কতদিন ধরে এই পোশাকটা পরার জন্য অপেক্ষা করেছিল সে! বড় দুই বোনের একসাথে বিয়ে,সেখানে সে নিজে সবচেয়ে সুন্দর করে সেজে জাবে।এমনকি সবাই জেনো তার দিকে হা হয়ে তাকিয়ে থাকে সেরকম ড্রেসও নিয়েছে। কিন্তু এই মুহূর্তে বিছানা থেকে উঠেই দাঁড়াতে কষ্ট হচ্ছে। ভারী লেহেঙ্গা পরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অনুষ্ঠানস্থলে থাকা যে তার পক্ষে সম্ভব নয়, সেটা সে নিজেও বুঝতে পারছিল। ব্যথার ঢেউ উঠতেই সে চোখ বন্ধ করে ধীরে ধীরে শ্বাস নিল। এক হাত পেট চেপে ধরে বিছানায় একটু ঝুঁকে বসে রইল।ঠিক তখনই বাইরে থেকে কারও পায়ের শব্দ ভেসে এলো সাথে গলার স্বরও। উৎসের গলা,
-“মেহেক”
দরজায় নক না করেই সে একটু ফাঁক করে ভেতরে উঁকি দিলো। কণ্ঠে স্পষ্ট বিরক্তি নিয়েই বলল,
-“এখনও রেডি হসনি?সবাই তো নিচে অপেক্ষা করছে। আর কতক্ষণ লাগবে? বরপক্ষও প্রায় পৌঁছে যাবে।কতোবার তোকে ডাকা হয়েছে!কোনো সাড়াশব্দ নেই কেনো তোর? ”
অস্বস্তিতে মেহেক ফ্যানের পাওয়ার বাড়িয়ে দেওয়ায় ভোঁ ভোঁ শব্দে নিচ থেকে কারো ডাকই শুনতে পায়নি।উল্টো সে ভেবে বসে আছে সবাই তাকে রেখে চলে গিয়েছে।
মেহেক মাথা তুলল, কিন্তু কিছু বলল না। মুখটা অস্বাভাবিক ফ্যাকাশে। ঠোঁট শুকিয়ে গেছে। কপালে ছোট ছোট ঘামের বিন্দু।উৎস আবার বলল,
-“শোন, সবাই কিন্তু চলে গিয়েছে। তোর জন্য আমি বাড়িতে বসে থাকতে পারব না।”
সাধারণ সময় হলে মেহেক হয়তো সঙ্গে সঙ্গে কোনো উত্তর দিত, কিংবা পাল্টা কিছু বলে বসত। কিন্তু আজ সে শুধু খুব আস্তে বলল,
-“যাননি এখন?”
-“তোর জন্যই তো যেতে পারছি না।রায়ান,সোহানা আর তোকে নিতে এসেছি বাকিরা সবাই চলে গিয়েছে।”
-“আমি… একটু পরে আসছি।”
কথাগুলো বলতেও যেন কষ্ট হচ্ছিল।
উৎস ভ্রু কুঁচকে পুরো ঘরের ভেতরে ঢুকে বলল,
-“একটু পরে মানে? কী হয়েছে তোর?”
মেহেক চোখ নামিয়ে বলল,
-“কিছু না।”
-“কিছু না হলে এই অবস্থা কেন?খাটে সাজিয়ে রাখার জন্য এতো দামি লেহেঙ্গা কিনেছিস?”
উৎসের গলায় তখনও সামান্য বিরক্তি ছিল। কিন্তু সে যখন আরও কাছে এসে দাঁড়াল, তখন প্রথমবারের মতো ভালো করে মেহেককে দেখল।
মেয়েটা এক হাত দিয়ে পেট চেপে ধরে বসে আছে। মাঝে মাঝে খুব অল্প করে কুঁকড়ে যাচ্ছে। চোখেমুখে স্পষ্ট যন্ত্রণা।মুখ শুকিয়ে গুটিয়ে আছে।
উৎসের মুখের বিরক্তিটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল।সে কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।তারপর নিচু গলায় জিজ্ঞেস করল,
-“পেট ব্যথা করছে?”
মেহেক খুব আস্তে মাথা নেড়ে বলল,
-“অনেক?”
উৎস এক মুহূর্তেই বুঝে গেল।আর কোনো প্রশ্ন করার দরকার হলো না।তার চোখ চলে গেল বিছানায় রাখা ভারী লেহেঙ্গাটার দিকে। তারপর আবার মেহেকের দিকে।সে কল্পনাই করতে পারল না এত ভারী পোশাক পরে, গয়না পরে, ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকা এই অবস্থায় কতটা কষ্টকর হবে। কয়েক সেকেন্ড আগেও যে ছেলেটা তাড়াহুড়ো করছিল, সেই ছেলেটাই এবার সম্পূর্ণ অন্যরকম শান্ত হয়ে গেল।সে নরম স্বরে বলল,
-“এই অবস্থায় তুই এটা পরবি?”
মেহেক একটু অসহায় স্বরে বলল,
-“শখ করে তো নিয়েছি।পড়তে ইচ্ছে করছে কিন্তু সাহস পাচ্ছি না।”
-“তাহলে পড়তে হবে না।”
মেহেক অবাক হয়ে তাকাল। উৎস এবার একেবারে দৃঢ় গলায় বলল,
-“লেহেঙ্গাটা চেঞ্জ করে একটা আরামদায়ক থ্রিপিস পরে নে ।”
-“কিন্তু…”
-“কোনো কিন্তু না।”
তার গলায় এবার আদেশের দৃঢ়তা থাকলেও তাতে রাগের লেশমাত্র ছিল না।উৎস শান্তভাবেই বলল,
-“তোর শরীর আগে। ছবি একটু কম সুন্দর হলে কিছুই হবে না। কিন্তু ব্যথা বাড়িয়ে যদি পুরো অনুষ্ঠানটাই কষ্টে কাটাতে হয়, তার কোনো মানে নেই।”
মেহেক চুপ করে রইল। তার চোখ দুটো একটু ভিজে উঠেছে।
উৎস হালকা নিঃশ্বাস ছেড়ে বলল,
-“একটা পেইন কিলার খেয়ে নে।”
-“খেয়েছি”
এই ব্যাথা অল্পতে সারবে না।উৎস মেহেকের আলমারি থেকে কয়েকটা থ্রিপিস নামিয়ে বিছানার উপর রাখে।
-“এখান থেকে একটা পড়ে নে।”
-“থ্রিপিস পড়ব?”
-“হুম।ওই হালকা নীল থ্রিপিসটা পরে নে। আরাম পাবি।”
মেহেক অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।সে ভেবেছিল উৎস হয়তো রেগে যাবে, তাকে অলস ভাববে কিংবা বলবে,
-“এত নাটক করছে কেন?সবারই তো এই সমস্যা হয়!ধমক দিয়ে বলবে তারাতাড়ি তৈরি হয়ে গাড়িতে বসতে।”
কিন্তু ছেলেটা উল্টো তার ব্যথাটাই আগে বুঝে নিল।উৎস দরজার দিকে এগিয়ে গিয়ে আবার থেমে গেল।পেছন ফিরে এসে মেহেকের কপালে একটা চুমু দিয়ে বলল,
-“ধীরে ধীরে রেডি হো। তাড়াহুড়ো করিস না।আমি ওয়েট করছি।”
-“কিন্তু সবাই তো…”
-“আমি আছি।”
মুহূর্তে কথাগুলো মেহেকের কাছে অদ্ভুত এক ভরসার মতো শোনাল।উৎস নিচে নেমে যেতেই সোহানা ও রায়ান প্রশ্ন ছুড়লো।
রায়ান বলল,
-“মেহেক এখনও নামছে না কেন?”
সোহানা বলল,
-“এত দেরি করছে শরীর ভালো ওর?”
উৎস শান্ত গলায় বলল,
-“ওর শরীরটা একটু খারাপ। পাঁচ-দশ মিনিট লাগবে।”
তার গলায় এমন এক দৃঢ়তা ছিল যে এরপর আর কেউ কিছু বলল না।উৎস রায়ান ও সোহানাকে বলল গাড়িতে গিয়ে বসতে আর ওরা যেনো পিছনে বসে।
প্রায় পনেরো মিনিট পরে সিঁড়ি দিয়ে ধীরে ধীরে নিচে নামার চেষ্টা করছে মেহেক।
ভারী লেহেঙ্গার বদলে সে পরে আছে একটি সাধারণ কিন্তু সুন্দর হালকা রঙের থ্রিপিস। গয়নাও অনেক কম। মুখে হালকা মেকআপ, কিন্তু ব্যথার কারণে ফ্যাকাশে ভাবটা লুকানো যায়নি।
সিঁড়ি নামার সময় সে একবার রেলিং শক্ত করে ধরল।উৎস সেটা লক্ষ্য করল।
-“ওইখানেই দাঁড়া আমি আসছি।”
মেহেক একটু ঝুঁকে দাঁড়ালো।উৎস উপরে গিয়ে মেহেককে কুলে তুলে নিলো।মেহেক অবাক হয়ে বলল,
-“আমি যেতে পারব।”
উৎস মেহেকের কথা তোয়াক্কা করল না।সিড়ি দিয়ে নামতে নামতে বলল,
-“দৌঁড়া দৌঁড়ি করতে দেখলে পা ভেঙে বসিয়ে দিবো।একটা চেয়ার দিবো সেখানে চুপ করে বসে থাকবি।”
উৎস মেহেককে নিয়ে বাড়ির পার্কিং লট পর্যন্ত গেলো।সেখানে পৌঁছাতেই সোহানা গাড়ি থেকে নেমে গেলো।রায়ান ও নামলো।
-“উৎস মেহেকের কী হয়েছে?”
-“ছোট মেহেক তাই কুলে নিয়েছি।বড় হলে কখন ছুড়ে ফেলে দিতাম।”
উৎসর কথায় মেহেক তাৎযব বনে যায়।সেধে এসে কুলে তুলে নিলো এখন আবার বাচ্চা বলছে!তাকে বাঁশ দেওয়ার জন্য এই উৎস অলটাইম প্রস্তুত থাকে।বলবে ভালোবেসে আমার হবু বউকে কোলে নিতে ইচ্ছে করেছে তাই নিয়েছি তা না উল্টো ফালতু কথা বার্তা বলছে।রোমান্টিক না একটু ও।এই জামাই নিয়ে সংসার করতে গেলে মহা বিপদে পড়বে।এই নিয়ে নিজের প্রতি আফসোস হচ্ছে।প্রেমে যখন পড়েছিস তাহলে রোমান্টিক ছেলে দেখে কেনে প্রেমে পড়লি না রে মেহেক।পিরিয়ড হয়েছে উৎস ভাই বুঝতে পেরেছে এতেই সরম লজ্জায় মাটির নিচে ধুঁকে যেতে ইচ্ছে করছিলো।এখন এক ফালতু মার্কা কথা বলে তার মনটা দিলো বিষিয়ে।মন চাইলো দুই একটা কথা শুনিয়ে দিতে।
-“উৎস ভাই আপনি কি আমার মন কে মন মনে করেন না নাকি ফুটবল।এদিক ওদিক লাথি মারেন ঠিকই কিন্তু গোল দিবেন এক জায়গায়।”
কিন্তু বলতে পারল না।এমন ভাবে তাকালো যেনো চোখ দিয়ে গিলে খাবে।
উৎস মেহেককে গাড়িতে বসালো।সোহানা উৎসর সোজাসাপ্টা কারণ বুঝতে পারল না।আর না কারণ পছন্দ হলো।
-“সোহানা গাড়িতে উঠে বস।”
রায়ান উঠে বসলে সোহানা ও উঠে বসে।
———
-“বর এসেছে, বর এসেছে।”
-“দুই বর একসাথে এসেছে।গেইট ধরতে হবে।”
-“আজ দুই বর থেকে লাক্ষ টাকা হাতিয়ে ছাড়ব।”
কয়েকজন ছেলে মেয়ে গেইট ধরা নিয়ে কথা বলছে।মেহেক গোমরা মুখে বসে আছে এখানে আসার পর থেকে।একটু উঠে ঘুরে ঘুরে দেখবে আর ছবি তুলবে তার কোনো সুযোগ পাচ্ছে।খাম্বার মতো এক বটগাছ একটু পর পর এসে দেখে যাচ্ছে আর ঠান্ডা হুমকি দিয়ে যাচ্ছে।
-“মেহেক তুই যদি এখান থেকে উঠিস তাহলে তোর ঠ্যাংগ ভাঙতে আমার দু মিনিট লাগবে না।”
মেহেক কিছু বলতে গেলে চোখ রাঙিয়ে আবার চলে যায়।কোন দিকে আজ সূর্য উঠলো?বোধহয় পশ্চিম দিকে তাই তার সাথে এমন হচ্ছে!
-“মেহেক”
-“ইফু..”
বলে মেহেক উঠতে গিয়েও বসে পড়ল।
-“তুই এখানে বসে আছিস কেনো?”
-“তুই দেরি করলি কেনো?আমি বোর হচ্ছিলাম একা একা।দুই আপু তো স্টেজে বসেই আছে।”
-“তুই বোর হচ্ছিলি তা আমি বিশ্বাস করব!যে মেয়ের কারণে বাকিরা শান্ত হয়ে বসে থাকতে পারে না সে নাকি বোর হচ্ছে! ”
-“সবই কপাল রে কপাল।আমার কপালে সব অবিশ্বাসের দল-বল জুটেছে।”
-“কি হয়েছে বলবি?উৎস ভাইয়া কিছু বলেছে?”
-“ঠ্যাংঙ ভেঙে রেখে দিবে বলেছে আর কিছু শুনবি?”
ইয়াফা ফিক করে হেঁসে দেয়।
-“তুই হাসছিস!”
ইয়াফা হাসি আটকিয়ে বলে,
-“একমাএ উৎস ভাইয়াই তোকে পারে সামলাতে।তোর জন্য পার্ফেক্ট পুরো।”
-“হইছে এখন চল গেইট ধরব।”
-“তোর সাহস দেখে আমি অবাক হচ্ছি।আমার কথা অবাধ্য হচ্ছিস।”
উৎসর ধমক শুনে মেহেক ভুত দেখার মতো করে উঠলো।
-“আপনি রোবট না অন্য কিছু? এই দেখছি হ্যান্ডশেক করছেন আবার দেখছি কে কিভাবে খাচ্ছে তা দেখছেন ঠিক মতো খাচ্ছে কি না তারপর আবার দেখলাম বন্ধুদের খাবার সার্ভ করতে।আমাকেও পাহাড়া দিচ্ছেন আপনি পারেন ও বটে।”
-“এই শরীর তো ঠিক মতো হাঁটতে পারছিলি না তা এখন কি এমন হলো যে সব এনার্জি পেয়ে গেলি।”
-“পেইন কিলার সাথে একস্ট্রা ভিটামিন খেয়েছিলাম তাই জোড় পাচ্ছি।”
ইয়াফার মাথার উপর দিয়ে সব গেলো।মেহেকের শরীরের কি হয়েছে আর কিসের পেইন কিলার আর কিসের ভিটামিন?ইয়াফা আগ্রহ হয় জানতে।
-“মেহেক তোর কী হয়েছে?”
-“সেসব বাদ দে এখন বিন্দাস আছি চল গেইট ধরব।”
-“তোর বিন্দাস ছুটাচ্ছি আমি।”
-“আজব তো আপনার জন্য কী এখন আমি গেইট ধরতে যেতে পারব না!”
-“গেইট ধরা হলে তো।”
মেহেক অবাক হয়ে বলল,
-“গেইট ধরা হবে না মানে কেনো?”
-“রাতের পানিশমেন্ট”
-“বোন দুটো আমার,তাদের বিয়ে।আর আপনি ঠিক করবেন নো ওয়ে।আপনি জানেন বিয়ের গেইট ধরা কতো বড় একটা রিচুয়াল।ওসব জানবেনি বা কিভাবে নিয়ম কানুন সম্পর্কে ছেলেরা কিছু জানে নাকি ও ভুলেই গিয়েছিলাম ওসব আপনাদের কর্ম নয়।”
-“তুই জানলেই হবে।এখন চুপ করে বসে থাক।খেতে ডাকলে খেতে আসবি।আমি এরিদকে পাঠাচ্ছি পাহারা দিতে।”
-“উৎস ভাই এটা বিয়ে বাড়ি।”
-“আমি কি বলেছি একবারও মরা বাড়ি।”
-“বলার কি আছে আমার তো তাই মনে হচ্ছে।যান আপনার কথাই রাখব পকেট থেকে এক লাখ টাকা ফেলুন তাহলেই হবে।”
-“এক লাখ টাকা কি হাতের ময়লা।হাত ধুয়ে দিলাম আর তুই নিয়ে নিলি।”
-“আপনার আব্বা জান আর আম্মা জানের কাছে গেলেই আপনার গেইট ধরা নিষেধাজ্ঞা দূর হয়ে যাবে তা অব্যশ আপনি জানেন,তাই করব।”
-“ব্ল্যাকমেইল করছিস!”
-“একটা চেক দেন কান ধরে বলছি এক চুল ও এখান থেকে নড়ব না।”
উৎস পকেট থেকে কার্ড বের করে দিলো।
-“আনলিমিটেড।”
#চলবে

