#দৃষ্টির_অন্তরালে_নিস্তব্ধতা
#লেখনী_মায়মুনা_আক্তার_মারিয়া
#পর্ব:৫
সন্ধ্যা নেমে এলো ধরণীর বুকে।দিনের কোলাহলপূর্ন পরিবেশটা কিছুটা শান্ত হলো।কিন্তু শান্ত হলো না চৌধুরী নিবাসের চিৎকার চেঁচামেচি।উৎস মেহেক ও এরিদের জন্য একজন মেম রেখে দিয়েছে।সেই এসেছে পড়াতে কিন্তু তারা একজনও পড়তে বসতে রাজি না।নিশাত,রোদসী ঘরের দরজা দিয়ে পড়তে বসেছে উৎসের কথামতো না হয় দেখা যাবে ওদের জন্য তাদের পড়ায় মনোযোগ বসবে না।উৎস মেহেকের কলেজের মেমকে ঠিক করেছে ওদের পড়ানোর জন্য।কিন্তু মেম এসেছে সেই কখন কিন্তু একটাও পড়তে বসতে চায়নি।অবশেষে উৎস রেগে যায় ড্রয়িং রুমেই উৎস পড়াতে বলে এবং সে সেখানেই বসে থাকবে যতক্ষণ না পড়া শেষ হয়।মেহেক ও এরিদ মুখ গোমরা করেই পড়তে বসে।আর উৎস ডাইনিং টেবিলের চেয়ারে বসে কানে হেডফোন গুঁজে খবর শুনতে থাকে।
উৎসের কানে হেডফোন দেখে মেহেক মৃদু স্বরে বললো,
-“মেম”
-“হুম বলো”
-“ওয়াশরুম”
-“আমার মনে হয় কারো ওয়াশরুমের প্রয়োজন নেই মেম। সুতরাং, কাউকে উঠতে দিবেন না।”
উৎসের কথায় মেহেকের মুখ চুপসে যায়।এই লোকের কী কানে অনেক পাওয়ার নাকি!আমার জীবনটাকে তেনা তেনা করতে এসেছে।মেহেক উৎসের দিকে ভেঙচি কেটে পড়ায় মন দিলো।দুজনেই কিছুক্ষন মন দিয়ে পড়লো।মেম এরিদের সাধারণ জ্ঞান বইটি নিয়ে এরিদকে প্রশ্ন করলো
-“বলো তো সবচেয়ে বড় সাপ কোনটি?”
-“আজগর আলীর বাপ।”
এরিদের উওর শুনে মেম হতবাক হয়ে যায় আর মেহেক শব্দ করে হেঁসে দেয়।হাসির মাএা বাড়ায় উৎস ভ্রু কুচক্রে গম্ভীর চোখে মেহেকের দিকে তাকায়। মেহেকের দৃষ্টি উৎসের দিকে যাওয়ার সাথে সাথেই তার হাসি মিলিয়ে যায়।
-“মেম এরিদ অজগরকে আজগার আলী বলে ফেলে ওর মনে থাকে না।”
-“ওহ আচ্ছা! সমস্যা নেই উৎস, আমি শিখিয়ে দিবো।”
এক ঘন্টা হয়ে যাওয়ার পর মেম পড়িয়ে বের হয়ে যায়।এরিদ তার বই না গুছিয়ে রান্না ঘরে দৌড় দেয় কিছু খাওয়ার জন্য মেহেকও যাওয়ার জন্য পা বাড়ালে উৎস পিছন থেকে বাঁধা দিয়ে বলে,
-“বই খাতা গুছিয়ে রুমে রেখে আয় আগে।”
-“পরে। এখন আমার খিদে পেয়েছে।”
-“কানের নিচে দুইটা থাপ্পড় পড়লে বুঝবি। ”
মেহেকের হাসি মুখটা ভোঁতা হয়ে যায়।মলিন মুখেই মিহি স্বরে বললো,
-“উৎস ভাই।”
-“দাঁড়িয়ে থেকে সময় নষ্ট করেছিস তাই তোর তার সাথে এরিদের বইগুলো গুছিয়ে নিয়ে যা সাথে।”
মেহেক আর কোনো উপায় না পেয়ে দাঁত কিড়মিড় করতে করতে টেবিল থেকে বই-খাতা নিয়ে তার রুমের দিকে হাঁটা দিলো।
কিছুক্ষন পর মেহেক বই রেখে নিচে নামার সময় দেখলো উৎসের হাতে গিটার। গিটারে টুংটাং শব্দ হচ্ছে।সিজান ও ফারাজও আছে।উৎস খুব ভালো গান গায় আর বিদেশেও তার গিটার ছিলো সেটা আনা হয়নি। মূলত ফারাজকে উৎস বলেছিলো তার জন্য গিটার নিয়ে আসার জন্য এবং কিছু ডিজাইন করে এনে দিতে। মেহেক সিড়ি দিয়ে নামার সময় লক্ষ্য করলো উৎসের হাতের গিটারে কিছু একটা খোদাই করা।দূর থেকে সেটা রংধনুর মতো চিকচিক করছে করার কথাও বটে কারন সেরকমভাবে খোদাই করা।উৎস ভাইয়ের কিছু মানে সেটা সুন্দর কিছু তো হবেই।উৎসের পছন্দ খুব ভালো প্রশংসা করার মতো।তার আগ্রহ বেরে গেলো দেখার জন্য তাই সে ওদের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো।মেহেককে সামনে দাঁড়াতে দেখে উৎস ভ্রু নাচিয়ে বললো,
-“কী চাই?”
-“আপনার গিটারে কী খোদাই করা দেখবো।”
-“আমি দেখেছি। ”
-“আমি তো দেখিনি।”
-“তুই কে দেখার।”
পড়ের কথাটা শুনার জন্য সিজান ও ফারাজ মেহেকের দিকে কৌতূহল চোখে তাকালো।
-“আমি তো আপনার বো”
মেহেকের কথার মাঝেই ফারাজ বাধা দিয়ে বললো,
-“বনু মুখ বন্ধ করে এদিকে আয়।”
বোন কথাটা যদি উৎসের কানে একবার যায় তাহলে কি ঘটবে সেটা উৎস আর উপরওয়ালা ছাড়া কেউ জানে না।তাই ফারাজ মেহেককে থামিয়ে দিয়ে তার কাছে টেনে নিয়ে দাঁড় করালো। মেহেকের দিকে উৎস রাগী দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।মেহেক উৎসের দিকে তাকিয়ে অবুঝ শিশুদের মতো করে বললো,
-“আমি কী করলাম?”
-“তোর কিছু করা লাগে নাকি!”
-“দেখতেই তো চেয়েছিলাম। ”
-“দেখার যোগ্য হলে তখন দেখিস।”
-“আমি দেখার যোগ্য না।”
উৎসের সোজাসাপটা উত্তর
-“না”
মেহেকের খুব খারাপ লাগলো কিন্তু সে তো ঘাড়ত্যাড়া মেয়ে। ওকে কেউ কিছু করতে না করলে ও সেটা বেশি করে করবে।মেহেক মনে মনে ঠিক করে নিলো আজ দেখেই ছাড়বে তাই উৎসের আরো কাছাকাছি গিয়ে উঁকি ঝুঁকি দেয়।উৎসও কম যায় না সে দেখতে দিবে না তাই সে হাত দিয়ে ধেঁকে রাখার চেষ্টা করছে।ভাই বোনের ছেলে মানুষি দেখে সিজান ও ফারাজ হো হো করে হেঁসে দিলো তাদের দুই জনের থেকেই তো উৎস ও মেহেক ছোট।
-“ওয়াও, কী সুন্দর! ”
মেহেকের গলার স্বর শুনে সিজান ও ফারাজ উৎসের হাতের দিকে তাকিয়ে দেখে উৎস হাত সড়িয়ে রেখেছে। স্পষ্ট ভেসে উঠেছে একটা গোলাপ ফুল ও খোদাই করে লেখা Rose।খুব সুন্দর করে ডিজাইনটা করা তাকিয়ে থাকার মতো।উৎস ইচ্ছে করেই তার হাত সড়ায় নাহলে সে না চাইলে মেহেক এটা দেখতে পারবে না।
————
চোখ ডলতে ডলতে মেহেক কুয়াশার মধ্যে দিয়ে হাঁটছে।সাতসকালে তার ঘুমটা ভেঙে দিয়েছে উৎস।গতকালের মেহেকের পোস্ট দেখে উৎস বলেছিলো সকালে নিয়ে যাবে কিন্তু এতো ভোর বেলায় উঠিয়ে তার ঘুমের বারোটা বাজিয়ে দিবে কে জানতো?কিন্তু সেটা আসল কথা না বরং মেহেক তো সকালে আসতেই চায়নি গতরাতে ভাইদের সামনে উৎস তাকে অপমান করেছে!এর পরেও সে কেনো তার সাথে কুয়াশায় বের হবে?মেহেক হেলেদুলে হাঁটছিল তার হাঁটার ধরণ দেখে উৎসের বিরক্ত লাগলো।এভাবে কোনো মেয়ে হাঁটে নাকি!উৎসের মাথা এমনিতেই গরম হয়ে আছে কিছুক্ষন পর পর সিজান ওর দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসি দিচ্ছে যা উৎসের পছন্দ হচ্ছে না।সিজান এমন করার কারণ হচ্ছে সে উৎসের পার্সোনাল সময়ে রোদসীকে নিয়ে আসতে পেরেছে এর মানে সে রোদসীর সাথেও পার্সোনাল সময় কাটাতে পারবে।উৎস চেয়েছিলো তার রোজকে নিয়ে সে একা সময় কাটাবে কতোদিন,কতোমাস, কতোবছর তার প্রিয় মানুষটার থেকে দূরে থেকেছে! তার প্রাণ তো এখানেই পরেছিলো।বড় ভাই হওয়ায় সিজানকে কিছু বলতে পারছেও না উৎস।
সকাল ছয়টা—
চৌধুরী নিবাসের সবাই ঘুমে কাতর।বাড়ির গিন্নিরাও এতো সকালে শীতকালে উঠে না সাতটা বাজলে সবাই উঠে। নামাজ পড়ে যে যার রুমেই থাকে কেউ বের হয় না।ঘড়ির কাঁটা যখন সাতের ঘরে আসে তখনি বাড়ির তিন গিন্নি রান্নাঘরে এসে হাজির হয় শুরু হয় তাদের দিনের ব্যস্ততা। সারাদিন একের পর এক কাজ করে যায়।বিলকিসকে রাখা হলেও সে আসবে নয়টায় আবার চলে যাবে বারোটা বাজলেই।বিলকিস কিছু কাজ করলেও এমন অনেক কাজ পরে থাকে যা তাদের নিজেদের করতে হয়।চার দেয়ালের মাঝে শত ব্যস্ততার মধ্যেই তাদের দিন কাটে।কীভাবে যে দিনের পর দিন গিয়ে বছর কেটে যায় তারা কেউই বলতে পারে না।সংসার বলতে অন্ত প্রাণ তিন গিন্নি।
বাইরে এখনো ভালো করে দেখা যাচ্ছে না। সূর্যও উঠেনি!কুয়াশায় চারিপাশ ঢাকা অথচ গ্রীষ্মের দিন হলে সূর্যের আলোয় চারোদিকে ভরে যেতো।উৎস বাহিরের পরিবেশটা দেখে বারান্দা থেকে চলে আসলো। ওয়াশরুমে ধুকে ফ্রেশ হয়ে নিলো।
ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে মেহেকের রুমের দিকে গেলো উৎস।কয়েকবার টোকা দিলো কিন্তু কোনো সাড়া শব্দ না পেয়ে এবার উৎস নাম ধরেই ডাকলো
-“মেহেক,মেহেক”
-“…”
-“মেহেক”
মেহেক মোচড়াতে মোচড়াতে এসে দরজা খুললো।মেহেকের চোখ বোঝানো চোখ বন্ধ করেই দরজা খুলতে এসেছে। কী মরার ঘুম ঘুমায় এই মেয়ে!
-“চোখ খুল”
-“ঘুমাচ্ছি তো”
-“জেগে ঘুমাস।আমি বাহিরে আছি জলদি ফ্লেশ হয়ে আস।”
মেহেকের মাথার টনক নড়লো চোখ পিটপিট করে খুলে তাকিয়ে দেখলো তার সামনে উৎস দাঁড়িয়ে। মেহেকের চোখ বড় বড় হয়ে আসলো।আজও কী দেড়ী করে ঘুম থেকে উঠলো নাকী! মেহেক খাটের উপর রাখা ফোনে দেখলো ছয়টা বাজে।তখনি চিরচেনা গলার গম্ভীর আওয়াজ ভেসে এলো
-“কারো যে কুয়াশার মাঝে হাঁটতে ইচ্ছে করে অন্য ছেলের সাথে! সেটা কী তার উকিল বাপ আর ব্যবসায়ী বাপ জানে নাকি জানাতে হবে।”
-“আমি কী একবারও বলেছি অন্য ছেলের সাথে হাঁটবো!”
-“তো কী বলেছিলি?”
-“মানে.. আসলে..”
-“মানে আসলেটা কী?”
মেহেক তার কাঁধে অযত্নে পড়ে থাকা বেনুনি’টাকে সামনে এনে আঙুলে পেঁচাতে পেঁচাতে লজ্জা পাওয়ার মতো মুখ নিয়ে বললো,
-“বিয়ের পর আমার জামাইর সাথে বলেছি।তার হাতের আঙুলের ভাঁজে আমার হাতের আঙুল থাকবে তারপর সে আমার কোমড়ে হাত দিবে এক পা দু পা করে রোমান্টিক মুডে হাঁটবো।”
মেহেক তার দুই হাত দিয়ে তার মুখ ঢেকে ফেললো।সে লজ্জা পেয়েছে এগুলো ভেবে!তার এমন ন্যাকামো দেখে উৎসের ঠোঁটের কোণায় বাঁকা হাসি ফুটে উঠলো কিন্তু সেটা অদৃশ্য হয়ে রইলো।বরং উৎস রাগি স্বরে বললো,
-“থাপড়িয়ে বএিশটা দাঁত ফেলে দিবো।পড়ালেখায় ঘোড়ার আন্ডা মারো আর এখন আসছে বড় ভাই বোনদের আগেই বিয়ের স্বপ্ন দেখতে।”
মেহেক উৎসের ধমাকানি খেয়ে মৃদু স্বরে বললো,
-“আমার বএিশটা দাঁত নেই এিশটা আছে আর থাপড়িয়ে ফেলবেন কী আমার তো মনে হয় বকতে বকতেই এিশটা দাঁত ফেলে দিবেন।”
-“কে কার দাঁত ফালাচ্ছে?আমাকে না জানিয়েই! ডাক্তার তো চৌধুরী নিবাসেই আছে।”
-“তুমি কার্ডিওলজিস্ট (হৃদরোগের চিকিৎসক) ছেড়ে ডেন্টিস্ট হলে কবে!”
-“হয়নি তবে ভাবছি হবো”
-“ফালতু কথা রেখে বলো এখানে কেনো?”
-“জগিং এ বের হচ্ছিলাম কিন্তু কানের কাছে এক মাছি এসে ভো ভো করে তোদের কথা বলে গেলো।”
-“তো যাও।”
-“আগে বল তুই এখানে এতো সকালে কী করছিস?”
-“এমনি এসেছিলাম”
উৎস এতো সকালে কোনো কারণ ছাড়া শুধু শুধু আসার মানুষ না তো আর এমন ও না যে মেহেককে মিস করছে ধৈর্য ধরছে না তাই ভোরেই চলে এসেছে এগুলো ভাবতে ভাবতেই সিজান মেহেকের দিকে তাকিয়ে ভ্রু জোড়া নাচালো।
মেহেক নীরব দর্শকের মতো তাদের কথা এতোক্ষণ গিলছিলো এখন সে মুখ খুলে দিলো।
-“আরে সিজান ভাই কুয়াশায় হাঁটতে নিয়ে যাবে আমাকে উৎস ভাই।তুমিও চলো আমাদের সাথে।”
সিজান একবার উৎসের দিকে তাকালো উৎস স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে মেহেকের দিকে,চোখে মুখে বিরক্তির ছাপ।সিজানও সুযোগের সৎ ব্যবহার করতে জানে তাই সেও বললো সে যাবে আর এই কথা শুনে উৎসের মুখ ফাঁটা বেলুনের মতো চুপসে গেলো।মেহেক অবশ্য খুশি হলো সিজান থাকলে কম ধমকাবে উৎস তাকে।সিজান জগিং এর পোশাক পালটানোর কথা বলে চলে গেলো রোদসীকে ডাকতে।
-“মাথা মোটা মেয়ে”
-“আশ্চর্য তো আমার মাথা কতো ছোট আর আপনি বলছেন আমার মাথা মোটা!”
-“হুম তাই ভাবি ছোট মাথায় বুদ্ধি কী থাকে নাকি।বুদ্ধি তো তোর হাঁটুর নিচে।”
-“উৎস ভাই।”
-“ভে ভে না করে নিচে আয় অপেক্ষা করছি।”
প্রায় মিনিট দশেক পর মেহেক নিচে নামে।গায়ে গতকালের অর্ডারকৃত ওভারকোটটি।ঠোঁটে ও মুখে কিচ্ছু দেয়নি! দিয়েই বা কি হবে কুয়াশায় যেভাবে ছবি তুলতে চেয়েছিলো ওভাবে তো পারবে না।একটা জামাই থাকলে সে হয়তো পারতো।আফসস তার কোনো জামাই নেই! এমনিতেই মেহেকের গায়ের রং কোনে অংশে কম নয়। শরীর দেখে যে কেউ বলতে পারবে এই মেয়ের শরীর তুলোর মতো তুলতলে কিন্তু শীতে ঠোঁট শুকিয়ে আছে।
-“বাসায় কী কিছু নাই ঠোঁট মুখের এই অবস্থা কেনো?”
-“তেল তেল করে ”
-“তেল দিতে তো বলিনি।”
-“কিরীমের কথাই তো বলছি।”
হঠাৎ তাদের কানে ভেসে আসলো রোদসী আর সিজানের কন্ঠ। রোদসীকে টেনে নিয়ে আসছে সিজান এমন কিছুই যে হবে সেটা উৎস আন্দাজ করতে পেরেছিলো। রোদসী মেহেক আর উৎসকে দেখে চুপ করে দাঁড়ালো ওদের সামনে।বোকা,মোটা মাথাওয়ালা মেহেক রোদসীকে টেনে আনায় আরো খুশি হলো।খুশিতে গদোগদো হয়ে বললো,
-“নিশাত আপুকেও ডেকে আনি।”
-“আর এক পা এগোলে ঠেং ভেঙে রাখবো।”
উৎসের গম্ভীর কন্ঠে মেহেক চুপ করে দাঁড়ালো।
দুই জোড়া চড়ুই পাখি সদর দরজা পেরিয়ে বেরিয়ে গেলো গেরেজের দিকে।
-“জীবনে বাইকে উঠলাম না গাড়িতেই জীবন কাটাতে হবে দেখছি।এতোগুলা ভাই থেকেও লাভ হলো না ভাবছি বাইকার ছেলে দেখে বিয়ে করতে হবে।”
মেহেকের কথায় উৎস, সিজান ও রোদসী হতবাক।সিজান ঠাট্টার স্বরে বললো,
-“তাহলে বাইকার ছেলে খোঁজা শুরু করি।”
উৎস অগ্নি দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সিজানের দিকে।রোদসী তার হাতের কনুই দিয়ে খোঁচা মেরে চুপ করতে বললো।কিন্তু সিজান থামলে তো সে আবার বললো,
-“মেহেক যদি তোর কপালে বাইক চালানোর ছেলে না জুটে গাড়ি চালানো ছেলে জুটে?”
মেহেকের মুখের কথা টেনে নিয়ে উৎস বললো,
-“দুটোই জুটবে। গাড়িতে বসো সবাই।”
———–
উৎস পকেটে হাত গুজে গাছে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।সিজান বুঝতে পারলো সে বড় ভাই হওয়ায় তাকে কিছু বলতে পারছে না। আগে যতোই বউ বউ করুক না কেনো ছেলেটা এখন বড় হয়েছে বড়দের সামনে লাজ লজ্জা হারিয়ে উল্টো পাল্টা বলা ঠিক না।সিজান উৎসের কাছে গিয়ে দাঁড়ালো। উৎসের কাঁধে হাত রেখে বললো,
-“রোদকে উল্টো দিকে নিয়ে যাচ্ছি কান্টিনিউ।”
উৎস সিজানের দিকে ঘাড় ঘুড়িয়ে তাকালে সিজান চোখ মারে।দুই ভাইয়ের ঠোঁটের কোণায় রহস্যজনক হাসি ফুটে উঠে।
মেহেক তার ওভারকোটের ভিতর হাত ঢুকিয়ে আনমনে হাঁটছে।মাথা ঠান্ডায় জমে যাচ্ছে। আসার সময় একটা ঝুটি করে এসেছিলো। মেহেকের কোমড় অব্দি চুলগুলো দোলনার মতো দুলচ্ছে।
আচমকা মেহেক অনুভব করলো তার মাথায় কেউ কিছু পেঁচাচ্ছে তার সাথেই পায়ে তাল রেখে হাঁটছেও।চোখ তুলে পাশের জনকে দেখে হতবাক হয়ে যায়। তার পা থমকে যায়।
উৎস তার গলায় পেঁচানো মাপলাড়টা মেহেকের মাথায় সুন্দর করে পেঁচিয়ে দিলো।কানসহ ঢেকে দেওয়ায় ঠান্ডা কম লাগছে।
-“আপনার তো ঠান্ডা লাগবে।”
-“এতো কিছু ভাবতে হবে না।”
মেহেক মাথা ঘুরিয়ে সিজান ও রোদসীকে খোঁজতে লাগলো কিন্তু কারোর টিকিটিও দেখতে না পেয়ে মেহেক বললো,
-“সিজান ভাইয়া আর রোদসী আপু কোথায়?”
-” তোর সিজান ভাই কিছু ছবি তুলবে তাই রোদসীকে নিয়ে গেছে ছবি তুলতে।”
-“ওহ আচ্ছা।”
দু’জনেই চুপচাপ হাঁটতে লাগলো হঠাৎ উৎস মেহেককে জিজ্ঞেস করলো
-“তোর বাইক ভালো লাগে?”
-“হুম অনেক।গাড়িতে উঠলে দম বন্ধ হয়ে আসে।”
-“রাতে কয়টা বাজে ঘুমিয়েছিস?”
এই রে এখন কী হবে?মেহেক মাথা চুলকাতে লাগলো। সে তো উৎসের প্রোফাইল ঘেটেছে সারারাত, ঘুমিয়েছে রাত দুইটার পর।এই কথা বললে উৎস সত্যি সত্যি কানের নিচে দুইটা দিবে।বলবে আমাকে দেখার কী আছে এতো!আমি বললাম আর তুই দেখলি খুঁটিয়ে!সাধেই কী তোকে গাধী বলি!আশেপাশে মেহেক চোখ বুলালো তার নজরে কিছু কাপল দেখতে পেলো যারা ছবি, ভিডিও করায় ব্যস্ত।ছবি তুলবেই না কেনো জায়গাটা তো অনেক সুন্দর চারিদিকে সরিষা ক্ষেত,কুয়াশায় ঢাকা চারিপাশ তার সাথে ঘাসগুলো শিশিরে ভিজে আছে।অবশ্য উৎসের ছোট বেলার একটা ছবি দেখেছিলো মেহেক তাদের পরিবারের অ্যালবামে সেখানে হলুদ রঙের শার্ট পরে বাচ্চা উৎস সরিষা ক্ষেতে দাঁড়িয়ে আছে। ছবিটার মধ্যে উৎসকেও মনে হচ্ছিল একটা সরিষা গাছ তারপর থেকেই মেহেক সরষে নাম দিয়েছে উৎসের।
-“মুখে কোনো কথা নেই কেনো?”
-“কথা তো কেঁড়ে নিয়েছেন।”
উৎস কথা না বাড়িয়ে মেহেকের হাতের আঙুলের ভাঁজে তার আঙুল গুঁজে দিলো।মেহেক অবাক চোখে উৎসের দিকে তাকিয়ে আছে।
উৎসের চোখে মুখে মুগ্ধতা ভেসে উঠেছে।এই মুগ্ধতাই তো মেহেক দেখেছিলো গত রাতে উৎসের অসংখ্য ছবিতে।এই মানুষটাকে যতোই গম্ভীর, রাগী মনে হোক না কেনো গভীরভাবে উপলব্ধি করলে হয়তো তার প্রেমে অসংখ্য নারী উষ্টা খেয়ে পড়বে।মেহেকের এসব ভাবনার মাঝে উৎস বললো,
-“আমার প্রতি কদমে পা মিলিয়ে হাঁটবি তখন চোখ বন্ধ করেও অনুভব করতে পারবি পৃথিবীতে সব সুখ নিয়ে কেউ তোর জন্য অপেক্ষা করছে।”
মেহেকের চোখে ভেসে উঠলো অনাকাঙ্ক্ষিত কিছু প্রশ্ন কিন্তু সেই প্রশ্নকে তোয়াক্কা না করে উৎসের নেশাভরা চোখে তাকিয়ে রইলো মেহেক।
দু’জন দুই জনের দিকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে হেঁটে চলছে সামনের দিকে।
#চলবে

